ফন্ট সাইজ:
থিম:
𝐓𝐡𝐞 𝐕𝐢𝐥𝐥𝐚𝐢𝐧 𝐖𝐡𝐨 𝐋𝐨𝐯𝐞𝐝 𝐌𝐞

৪র্থ পর্ব

লেখক: বুচিবুড়ি

#The_villain_who_loved_me

#বুচিবুড়ি
#পর্ব৪.
সকালের আলো তখন ক্যাস্তিলো ভিলার ভারী পর্দা ভেদ করে এলেনার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে।কিন্তু ঘরের ভেতরটা তখনও আধো অন্ধকার।এলেনা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। কয়েক সেকেন্ড সে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গত রাতের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি তার মাথায় ফিরে এলো—পার্টি, কেবিনের দেওয়া পানীয়, রক্তাক্ত নিক, পার্কিং লটের বেঞ্চ...
আর তারপর—তার মায়ের কথা।এলেনা হঠাৎ উঠে বসল।
মাথার ভেতর যেন কেউ ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে।
—উফফ...
কপালে হাত রাখতেই দরজার বাইরে থেকে একজন মহিলা কর্মচারীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
—ম্যাডাম, আপনি উঠেছেন?
এলেনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
দরজা খুলে মহিলা ভেতরে ঢুকল। হাতে একটা ট্রে।
—ব্রেকফাস্ট পাঠানো হয়েছে।
এলেনা ট্রেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—নিক কোথায়?
মহিলাটি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
—স্যার লাইব্রেরিতে আছেন।
এলেনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—আবার পড়া?
মহিলাটি মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।এলেনা বিছানা থেকে নামল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।চুল এলোমেলো।কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে চোখ।
সেখানে আগের সেই ভীতু মেয়েটা আর নেই।এলেনা ধীরে ধীরে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—আমি ভয় পাব না।
তারপর কয়েক সেকেন্ড থেমে যোগ করল,
—আর তোমার নিয়মেই তোমাকে হারাব, নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
লাইব্রেরিতে তখন নিক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।তার হাতে সেই কালো পাথরের রোজারি।একটা একটা করে পুঁতি সরছে।মার্কাস তার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় রিপোর্ট দিচ্ছিল।
—বস, গত রাতের হামলাটা কেবল একটা সতর্কবার্তা ছিল না।
নিকের আঙুল থেমে গেল।
—বলো।
—ওরা এলেনাকে লক্ষ্য করেছিল।
নিক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
—আমি জানি।
—আর একটা খবর আছে।
মার্কাস পকেট থেকে একটা ছোট খাম বের করল।
—এটা ভিলার বাইরের গেটে পাওয়া গেছে।
নিক খামটা হাতে নিল।কালো কাগজ।সামনে শুধু একটি বাক্য লেখা—
“The girl is not who you think she is.”
নিকের চোখ সরু হয়ে এলো।সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।ছবিতে একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।তার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে।মেয়েটির বয়স হয়তো পাঁচ কিংবা ছয়।নিকের আঙুল ছবিটার ওপর স্থির হয়ে গেল।
কারণ—ছবির ছোট মেয়েটার মুখ এলেনার সঙ্গে অবিকল মিলে যাচ্ছে।কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখটা দেখে নিকের চোখে প্রথমবারের মতো বিস্ময়ের ছায়া ফুটে উঠল।
১২ বছর আগে।নিক খুব নিচু গলায় বলল,
—অসম্ভব...
মার্কাস জিজ্ঞেস করল,
—বস?
নিক ছবিটা মুঠোয় চেপে ধরল।
—এই ছবিটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা বের করো।
—জি।
—আর একটা কথা।
মার্কাস থামল।নিকের গলা এবার বরফের মতো ঠাণ্ডা।
—এ ব্যাপারে এলেনা যেন কিছু জানতে না পারে।
—বুঝেছি, বস।
মার্কাস চলে যেতেই নিক আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
তার চোখে এবার সেই পরিচিত নিষ্ঠুরতা নেই।বরং আছে এক অদ্ভুত প্রশ্ন।
—তুমি আসলে কে, এলেনা?
ঠিক তখনই লাইব্রেরির দরজা খুলে গেল।এলেনা দাঁড়িয়ে আছে।নিক দ্রুত ছবিটা টেবিলের ওপর উল্টে রাখল।
—দেরি করেছ।
এলেনা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
—আজ আমি নিজে থেকেই এসেছি।
নিক ভ্রু তুলল।
—সেটা দেখতেই পাচ্ছি।
এলেনা চেয়ার টেনে বসল।তারপর টেবিলের ওপর রাখা স্প্যানিশ বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ কী শেখাবেন?
নিক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—আজ থেকে শুধু শব্দ শেখাব না।
—তাহলে?
নিক ধীরে ধীরে একটা কাগজ তার দিকে এগিয়ে দিল।
—মানুষ পড়তে শেখাব।
এলেনা কপাল কুঁচকাল।
—মানুষ?
—হ্যাঁ।
নিক চেয়ারে হেলান দিল।
—এই দুনিয়ায় শব্দের চেয়ে মানুষের চোখ বেশি সত্যি কথা বলে। কেউ হাসছে মানেই সে খুশি নয়। কেউ চুপ আছে মানেই সে দুর্বল নয়। আর কেউ তোমাকে রক্ষা করছে বলেই সে তোমার বন্ধু—এটাও ধরে নেবে না।
এলেনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।তারপর মৃদু হেসে বলল,
—এই শিক্ষা তো আপনার কাছ থেকেই পাওয়া।
নিকের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
—ভালো। অন্তত আমার ছাত্রীর বুদ্ধি বাড়ছে।
এলেনা বই খুলতে খুলতে বলল,
—একটা প্রশ্ন করতে পারি?
—করো।
—আপনি কি সত্যিই আপনার বাবাকে ভালোবাসেন?
নিকের আঙুল টেবিলের ওপর থেমে গেল।
—কেন?
—কারণ আপনি সবসময় বলেন, তিনি আপনার বাবা। আবার তার জীবনকে আমার সামনে দাবির মতো ব্যবহার করেন।
নিক কিছুক্ষণ নীরব রইল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—ভালোবাসা আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়, এলেনা।
—আপনি কি তাকে হারানোর ভয় পান?
নিক এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
—আমি কাউকে হারানোর ভয় পাই না।
এলেনা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—মিথ্যা।
নিকের চোখ সরু হয়ে এলো।
—কী বললে?
—আপনি ভয় পান।
—কাকে?
এলেনা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—নিজেকে।
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।নিকের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।কিন্তু তার মুঠো শক্ত হয়ে গেল।ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ গুলির শব্দ।ঠাস!এলেনা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল।আরেকটা শব্দ—ঠাস!নিক মুহূর্তের মধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।তার হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোমরের কাছে চলে গেল।
—এখানেই থাকো।
এলেনা এবার ভয় পেলেও নিকের নির্দেশ অমান্য করল না।
দরজা খুলে মার্কাস দৌড়ে ঢুকল।
—বস! দক্ষিণ দিকের গেটে হামলা হয়েছে!
নিকের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল।
—কতজন?
—কমপক্ষে দশজন। ওরা ভিলার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।
নিক এক মুহূর্ত এলেনার দিকে তাকাল।তারপর মার্কাসকে বলল,
—It's time to play. It was not right for them to bring only 10 people. I will play alone today. Let's see how big are their livers?
নিকের কথা শেষ হতেই ভিলার বাইরে একসঙ্গে একাধিক অটোমেটিক রাইফেলের বিকট গর্জন কেঁপে উঠল। জানালার কাঁচ থরথর করে কেঁপে উঠে কয়েকটা ফ্রেম ছিটকে ভেতরে এসে পড়ল। এলেনা আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল, কিন্তু নিকের চেহারায় ভয়ের কোনো চিহ্ন ফুটে উঠল না; বরং তার ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক অশুভ, রক্তপিপাসু হাসি।
মার্কাসকে পকেট থেকে দুটো কাস্টমাইজড ব্ল্যাক 9 মিমি পিস্তল বের করতে দেখে নিক স্রেফ হাত তুলে তাকে থামাল।
—আজ কোনো ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্স নয়, মার্কাস। লাইব্রেরির কোণ থেকে AK-47 টা বের করো।
মার্কাস কিছু বলার আগেই নিক ওয়াল-ক্যাবিনেট টেনে খুলে একটা ভারী ট্যাকটিক্যাল শটগান আর দুটো সাব-মেশিনগান বের করে নিল। সে স্লাইড টেনে গান লোড করতেই ধাতব এক ঠাণ্ডা শব্দ পুরো লাইব্রেরিতে প্রতিধ্বনিত হলো।
এলেনার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিক তার কলার ধরে নিজের কাছাকাছি টেনে আনল। চোখ দুটো তার বরফের মতো ঠাণ্ডা, কিন্তু শ্বাসে জ্বলন্ত আগুন।
—এই ঘরেই থাকবে। যদি দরজার বাইরে কোনো অপরিচিত ছায়া দেখো, সোজাসুজি শ্যুট করবে। কথা বুঝছ?
এলেনা কোনোমতে মাথা নাড়ল। নিক তার হাতে একটা গ্লক সেমি-অটোমেটিক পিস্তল গুঁজে দিয়ে লাইব্রেরির ভারী ওকের দরজা লাথি মেরে খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।নিচ তলার মার্বেলের করিডোরে তখন নরক নেমে এসেছে। প্রধান কাঠের দরজা গুঁড়িয়ে দিয়ে কালো জ্যাকেট পরা দশজন সশস্ত্র হামলাকারী ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করছিল।
নিক দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে এক নজর তাকাল। প্রথম হামলাকারী সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই নিক শটগানের ট্রিগার চেপে ধরল—ধুপ! ভারী কার্তুজের ধাক্কায় লোকটা ছিটকে পেছনে থাকা দুই সঙ্গীর ওপর গিয়ে পড়ল।
—ক্যাস্তিলো! ও উপরে! মার ওকে!
হামলাকারীদের একজন চেঁচিয়ে উঠতেই বাকিরা ওপরের দিকে ব্রাশফায়ার শুরু করল।প্লাস্টার আর কাঠের টুকরো চারিদিকে ছিটকে আসতে লাগল। নিক এক নিমেষে পিলারের পেছনে কভার নিল। তার মুখে সেই থমথমে হাসির রেখা।
—দশজন? এই কয়টা মাছি মারতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
পিলারের পেছন থেকে বেরিয়েই নিক এক হাতে শটগান ফায়ার করল আর অন্য হাতে কোমর থেকে বের করা বেলজিয়ান মেটালের ছুরিটা ছুড়ে মারল সোজা নিচের এক শুটারের গলায়। লোকটা রক্তের বমি করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
বাকিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিক দোতলার রেইলিং ডিঙিয়ে একেবারে নিচ তলার মার্বেল ফ্লোরে লাফিয়ে পড়ল। অবতরণের সাথেই এক রাউন্ড রোল করে উঠে দাঁড়িয়েই সামনের শত্রুর চোয়ালে স্রেফ শটগানের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল। হাড্ডি ভেঙে যাওয়ার বিকট শব্দের সাথে সাথে রক্তের ফিনকি দিয়ে লোকটা ঢলে পড়ল।চারপাশ থেকে গুলির বৃষ্টি হচ্ছে। নিক কিন্তু থামছে না। সে যেন এক জ্যান্ত শয়তান—প্রতিটা মুভমেন্ট মাপা, নির্মম এবং নিখুঁত।
এক হামলাকারী পেছন থেকে নিককে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতেই নিক নিজের মাথা পেছনে চালনা করে সজোরে তার নাকে আঘাত করল। লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে হাত আলগা করতেই নিক তার হাত মুচড়ে ধরে নিজের পিস্তল দিয়েই তার বুকে তিনটা গুলি চালাল—ঠাস! ঠাস! ঠাস!
—শালা আমাকে কি গে মনে হয়?
রক্তে ভেসে যাচ্ছে ক্যাস্তিলো ভিলার শ্বেতপাথরের মেঝ। বাকি চারজন এবার ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে শুরু করল। নিক তাদের দিকে পা বাড়াল, তার চোখে শুধুই হিংস্রতা। রক্তমাখা শটগানটা মেঝেতে ঘষে এক অদ্ভুত ধাতব শব্দ তৈরি করতে করতে সে সামনে এগোল।
—এত তাড়াতাড়ি শেষ? স্প্যানিশ গ্যাংগুলো কি এখন কাপুরুষদের পাঠায়?
শেষ দুজন আতঙ্কিত হয়ে বাইরের দিকে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই মার্কাস পেছন থেকে তাদের বুক ঝাঁজরা করে দিল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো করিডোর একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মেঝেতে দশটা লাশ রক্তে ভাসছে, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নিকোলাস ক্যাস্তিলো—তার সাদা শার্টে রক্তের দাগ, কিন্তু মুখে এক ফোটাও ক্লান্তির ছাপ নেই।
নিক পকেট থেকে একটা সিল্কের রুমাল বের করে হাত ও চেহারার রক্তের দাগ মুছতে মুছতে লাইব্রেরির দিকে পা বাড়াল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল এলেনা কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে শক্ত করে ধরা পিস্তলটা থরথর করে কাঁপছে। নিককে রক্তভেজা অবস্থায় ভেতরে ঢুকতে দেখে এলেনার শ্বাস আটকে এলো।নিক ধীরে ধীরে তার দিকে হেঁটে এসে নিজের রক্তমাখা আঙুল দিয়ে এলেনার চিবুক স্পর্শ করল।
—আমি বলেছিলাম না এলেনা, এই দুনিয়ায় কেউ তোমাকে রক্ষা করছে বলেই সে তোমার বন্ধু নয়। আর যারা আমাকে ছুঁতে আসবে... তাদের শেষ পরিণতি ঠিক এটাই হবে।
এলেনা নিকের চোখে চোখ রাখল। ভয় পাচ্ছিল সে, কিন্তু একই সাথে অনুধাবন করল—এই লোকটা যতটাই দানব, ঠিক ততটাই দুর্ভেদ্য।
কয়েক মাস কেটে গেছে। এই সময়টুকুর মধ্যে ক্যাস্তিলো ভিলার পরিবেশ কিছুটা হলেও বদলেছে। নিকের নির্দেশে এলেনাকে শহরের নামকরা একটি কলেজে ভর্তি করানো হয়েছে। তবে নিক আর এলেনার সম্পর্কের দূরত্ব তাতে কমেনি, বরং এক অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠেছে তাদের মাঝে। এই দীর্ঘ চার মাসে নিক আর কখনোই এলেনার ঘরের দিকে পা বাড়ায়নি। তাদের যা একটু দেখা হতো, তা কেবল সেই বিশালাকার লাইব্রেরিতে—যেখানে পড়াশোনার নামে চলত এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
অন্য দিনগুলোতে সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো নিজেই এলেনাকে কলেজে পৌঁছে দিতেন। লোকটার ভেতরে এক অদ্ভুত পিতৃস্নেহ দেখতে পেত এলেনা। কিন্তু আজ জরুরি ব্যবসায়িক কাজে সেবাস্তিয়ানকে দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও এলেনাকে কলেজে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে নিকোলাস ক্যাস্তিলোর ওপর।
সকালের স্নিগ্ধ রোদ তখন ভিলার উঠানে এসে পড়েছে। কালো রঙের রোলস রয়েস গাড়ির পেছনের দরজা খুলে শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে মার্কাস। এলেনা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। ক্যাজুয়াল জিন্স আর সাদা শার্টে তাকে বেশ মানিয়েছে। তবে গাড়ির পেছনের সিটে বসা লোকটাকে দেখে তার পায়ের গতি কিছুটা কমে গেল।
নিক বসে আছে। পরনে অলিভ গ্রিন রঙের শার্ট, চোখে সানগ্লাস, আর হাতে বরাবরের মতোই সেই কালো পাথরের রোজারি।
এলেনা নিঃশব্দে গিয়ে নিকের পাশে বসল। গাড়ি ছাড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ পুরো গাড়িতে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। এলেনা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।নীরবতা ভেঙে নিকের ঠাণ্ডা কণ্ঠ ভেসে এলো,
—পড়াশোনা কেমন চলছে?
এলেনা মাথা না ঘুরিয়েই উত্তর দিল,
—ভালো।
—আজকের ক্লাসের পর তোমার কিছু স্পেশাল নোটস দরকার হবে। আমি মার্কাসকে দিয়ে লাইব্রেরিতে পাঠাব।
এলেনা এবার নিকের দিকে তাকাল। সানগ্লাসের পেছনে নিকের চোখ দুটো বোঝা না গেলেও তার চোয়ালের শক্ত ভাব বলে দিচ্ছে সে পুরোপুরি নিজের কন্ট্রোলে আছে। এলেনা কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
—আপনি এতদিন আমার রুমে যাননি কেন?
নিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সানগ্লাসটা খুলে সোজা এলেনার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো হিংস্রতা নেই, তবে এক গভীর রহস্যের ছায়া।
—কারণ আমি চাইনি তুমি প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবো যে তুমি কোনো খাঁচায় বন্দি আছো। আমি তোমাকে ভয় দেখাতে চাই না, এলেনা।
এলেনা অবাক হলো। যে লোকটা কয়েক মাস আগে তার চোখের সামনে একাধিক মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছিল, সে আজ তাকে ভয় না দেখানোর কথা বলছে!
—কিন্তু আপনি তো আমাকে আপনার নিয়মে হারাতে চেয়েছিলেন, তাই না?
নিকের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল।
—হ্যাঁ। কিন্তু শত্রু যদি ভয় পেয়েই হেরে যায়, তবে তাকে হারানোর আসল আনন্দটা পাওয়া যায় না। তোমাকে লড়াই করার যোগ্য হতে হবে।আর তুমি কি চাও, আমি তোমার রুমে যাই?
—না!
গাড়ি এসে কলেজের বিশাল গেটের সামনে থামল। মার্কাস নেমে এসে দরজা খুলে দিল। এলেনা গাড়ি থেকে নামার আগে এক মুহূর্তের জন্য থামল।
—ধন্যবাদ, পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
নিক কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল। এলেনা নেমে ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করতেই নিকের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত একটা নম্বর।
নিক ফোনটা কানে তুলল।
—বলুন।
অপর পাশ থেকে এক ভারী, বিকৃত কণ্ঠ ভেসে এলো,
—মেয়েটাকে কলেজে পাঠিয়ে বেশ বড় ভুল করলে, নিকোলাস। আমরা তো কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম...
নিকের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। আঙুলের চাপ এত বাড়ল যে মনে হলো ফোনটাই ভেঙে যাবে।
—যদি ওর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে, তবে তোমার পুরো বংশ ধ্বংস করে দেব।
—চেষ্টা করে দেখতে পারো, ক্যাস্তিলো!
কলটা কেটে গেল। নিক এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে এলো। তার চোখ তখন কলেজের ভেতরে ভিড়ের দিকে এলেনাকে খুঁজছে...নিক লম্বা পা ফেলে এলেনার দিকে এগিয়ে গেল। এলেনা তখন ক্যাম্পাসের করিডোরের দিকে হাঁটছিল। নিকের গম্ভীর ডাক শোনামাত্র সে দাঁড়িয়ে গেল।
—এলেনা!
এলেনা পেছনে ফিরে তাকাল। নিককে এভাবে তাড়াহুড়ো করে ভেতরের দিকে আসতে দেখে সে কিছুটা অবাক হলো।
—হ্যাঁ, বলুন?
নিক এলেনার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, আর চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীব্র। এলেনার কাঁধে হাত রেখে খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
—কোনো বিপদ বুঝলেই, বা সামান্য সন্দেহজনক কিছু হলেও—তাত্ক্ষণিকভাবে আমাকে কল করবে। বুঝেছ?
এলেনা নিকের চোখের এমন আচমকা উসখুস ভাব দেখে একটু ভ্রু কুঁচকাল, তবে পরিস্থিতিটা গম্ভীর বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে।
নিক চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল,
—আমার নম্বর মনে আছে তো?
এলেনা শান্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ, মুখস্থ আছে।
নিক কিছুক্ষণ এলেনার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সে নিরাপদ থাকবে। তারপর এক পা পিছিয়ে এসে ছোট করে বলল,
—ঠিক আছে। এবার যাও।
এলেনা আর কথা না বাড়িয়ে ক্লাসরুমের দিকে হেঁটে গেল। তবে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নিকের বরফের মতো ঠাণ্ডা চাহনি আর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ফোনটা জানান দিচ্ছিল—ঝড় খুব কাছেই আসছে।
এলেনা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতেই নিক গটগট করে তার ব্ল্যাক রোলস রয়েসের দিকে ফিরে এলো। গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েই সে মার্কাসের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চেহারা তখন খুনে মেজাজে রূপ নিয়েছে।নিক গর্জে উঠে বলল,
—মার্কাস! এখনই পুরো কলেজ চত্বরে কড়া পাহারা বসাও। এলেনা কার সাথে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, ক্লাসে কী করছে—তার প্রতিটি মুহূর্তের খবর আমার চাই। এমনকি ও যদি কারো দিকে তাকায়ও, সেটাও যেন আমার জানা থাকে!
মার্কাস এক মুহূর্তও দেরি না করে মাথা নিচু করে জবাব দিল,
—ঠিক আছে, স্যার। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
—কোনো ভুল যেন না হয়, মার্কাস। ভুল হলে মাফ করব না।
—জি স্যার, বুজেছি।
কথা শেষ করে নিক গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল। মার্কাস দ্রুত ড্রাইভারে বসে স্টার্ট দিল। কালো গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে সশব্দে কলেজের গেট ছেড়ে শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল।
অন্যদিকে, এলেনা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে একবার ফিরে তাকাল। গাড়িটাকে চলে যেতে দেখে তার বুকের ভেতর অজ্ঞাত এক অজানা আশঙ্কার ঢিল পড়ল। সে জানত না, নিকের বসানো অদৃশ্য নজরদারির জাল ততক্ষণে পুরো ক্যাম্পাস ঘিরে ফেলেছে।
নিকের গাড়ি তীব্র গতিতে হাইওয়ে চিরে ছুটে চলেছে কলেজের দিকে। স্ট্রিট লাইট আর সামনের গাড়িগুলোকে পেছনে ফেলে সে যেন ঝড় তুলছিল। কলেজে এলেনাকে রেখে আসার কিছুক্ষণ পরেই মার্কাসের লোক তার কাছে ফোন করেছিল—ক্যাম্পাসের কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী নাকি এলেনাকে ঘিরে ধরে র‍্যাগিং শুরু করেছে। খবরটা পাওয়া মাত্রই নিকের মাথায় যেন আগুন ধরে যায়।
এদিকে ক্যাম্পাসের ছায়াবৃত এক কোণে এলেনাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল পাঁচ-ছয়জন সিনিয়ার স্টুডেন্ট। তাদের দলপতি 'জেসো' নামের এক মেয়ে। জেসো হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে বাঁকা হেসে এলেনাকে পর্যবেক্ষণ করছিল।
এলেনা কোনো ভয় না পেয়ে শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। জেসো আর তার বন্ধুরা তাকে বেশ কিছু অযৌক্তিক আর বিরক্তিকর প্রশ্ন করতে শুরু করল, কিন্তু এলেনা বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিটা প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে গেল।
এলেনার এত আত্মবিশ্বাস দেখে জেসোর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে এক পা এগিয়ে এসে এলেনার মুখোমুখি হয়ে ড্যাম কেয়ার সুরে জিজ্ঞেস করল,
—আচ্ছা, সকালে তোমাকে যে লোকটা নামিয়ে দিয়ে গেল—সেই নিকোলাস ক্যাস্তিলো তোমার কী হয়?
এলেনা ক্ষণিকের জন্য একটু থামল, তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
—বড় ভাই।
জেসো সাথে সাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার দেখাদেখি পেছনের ছেলেরাও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। জেসো চোখ ছোট করে বলল,
—মজা করছ আমাদের সাথে? নিকোলাস ক্যাস্তিলোর কোনো বোন নেই, সারা শহর তা জানে।
এলেনা চোখের পাতা না ফেলে সরাসরি জেসোর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
—আমি ওনার স্টেপসিস্টার।
এলেনার ধীরস্থির জবাব শুনে জেসোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবিন নামের ছেলেটি আরো এক ধাপ এগিয়ে এলো। তার মুখে একটা কুৎসিত, নোংরা হাসি। সে অত্যন্ত বাজেভাবে এলেনাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে কানের কাছে এসে শিস বাজিয়ে বলল,
—আরে তোরা থাম তো! এত ক্যাচালের কী আছে? জানেমান, রাগ করছ কেন? এসেছ যখন, সিনিয়রদের একটু খুশি করে দিয়ে যাও। স্রেফ একটা কিস করো তো দেখি!
রবিনের কথা শুনে পেছনের বাকি ছেলেও উসকানিমূলকভাবে হেসে উঠল। রবিন চোখ টিপে বিকৃত সুরে যোগ করল,
—আর এসব ফাঁকা জায়গায় ভালো না লাগলে চলো, তোমাকে কোনো খালি ক্লাসরুমে নিয়ে যাই? চিন্তাই কোরো না, তোমাকে খুশি করার সবরকম চেষ্টা আমি করব!
এলেনার হাত দুটো রাগে শক্ত হয়ে মুঠো হয়ে গেল, কিন্তু কিছু বলার আগেই পুরো পরিবেশ নিমেষে বদলে গেল।
রবিনের দেখাদেখি জেসো আর তার সাথে থাকা অন্য দুই মেয়েও হিংসায় কুৎসিতভাবে হেসে উঠল। জেসো বাঁকা চোখে এলেনার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ঠিকই তো বলেছে রবিন! অনাথের মতো এসে ক্যাস্তিলো ভিলার রুটি ভাঙছিস, এখানে এসে আবার ঢং দেখাচ্ছিস? বেশ তো শরীর দেখাচ্ছিস, একটু সিনিয়রদের বিনোদন দিলে তোর অহংকার কমে যাবে না।
রবিনের সাথে থাকা অন্য একটা ছেলেও নোংরা ইঙ্গিত করে হেসে বলল,
—অত ভাব নিও না ম্যাডাম! ক্যাস্তিলো ভিলার কাজের মেয়েদের চেহারাও নাকি আজকাল বেশ গরম হয়। রাজাদের বিছানা গরম করতে করতে অভ্যস্থ, তাই কলেজে এসে এত গরম দেখাচ্ছ?
এলেনার রাগে গা রি রি করে উঠল, হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল সে।রবিন চোখ টিপে বিকৃত সুরে এলেনার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যোগ করল,
—আর এসব ফাঁকা করিডোরে ভালো না লাগলে চলো, তোমাকে পেছনের কোনো খালি ক্লাসরুমে নিয়ে যাই? চিন্তাই কোরো না, তোমাকে খুশি করার সবরকম চেষ্টা আমি করব! দেখি ক্যাস্তিলোর কুড়িয়ে আনা মেয়ে কেমন সাড়া দেয়!
রবিনের কদর্য ইঙ্গিতের জবাবে এলেনা পিছিয়ে গেল না, বরং তার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। সে মাথা উঁচু করে, শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল,
—যাদের নিজেদের চরিত্র বলতে কিছু থাকে না, তারা অন্যকে নিচু দেখানোর চেষ্টাই করে। আপনারা স্রেফ কতগুলো নোংরা মানসিকতার মানুষ, যাদের পড়ালেখার চেয়ে অন্যের জুতোর তলায় থাকার যোগ্যতাই বেশি।
এলেনার এমন অপমানজনক কথা শুনে রবিন ও জেসো মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা না পারল এই অপমান সহ্য করতে, না পারল মুখের ওপর কোনো পাল্টা জবাব দিতে। রাগে রি-রি করে উঠল জেসোর গা।জেসো দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—অনেক হয়েছে! এই অহংকারী মেয়েটাকে সোজা প্রিন্সিপালের রুমে নিয়ে চল। আজই এর নাম এই কলেজ থেকে কাটাব!
তারা দল বেঁধে জোর করে এলেনাকে প্রিন্সিপালের রুমে নিয়ে গেল।প্রিন্সিপাল রুমে বসে ছিলেন। জেসো আর রবিন ভেতরে ঢুকে মনগড়া নাটক সাজিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করল—এলেনা নাকি নতুন এসে সিনিয়রদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেছে, তাদের গায়ে হাত তোলার হুমকি দিয়েছে এবং কলেজের পরিবেশ নষ্ট করছে।প্রিন্সিপাল ঘটনা পুরোপুরি না শুনেই এলেনার ওপর চড়াও হলেন। তিনি টেবিল থাপড়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
—কী ভাবো তুমি নিজেকে? ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েই সিনিয়রদের সাথে এমন বাজে আচরণ? এই কলেজে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়!
এলেনা নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে বলল,
—স্যার, আপনি আগে শুনুন ওরা আমাকে কী কী বলেছে—
প্রিন্সিপাল এলেনাকে থামিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলেন,
—চুপ একদম! কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। তোমার মতো বেয়াদব স্টুডেন্টকে এই কলেজে রাখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কালই তোমার গার্ডিয়ানকে নিয়ে আসবে। তোমার টিসি (TC) তৈরি থাকবে!
এলেনা শান্ত চোখে প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে রইল। বিচারহীনতার এমন নগ্ন রূপ দেখে তার ঠোঁটে একফালি বিষাদের হাসি ফুটে উঠল।ঠিক সেই মুহূর্তে—প্রিন্সিপালের রুমের ভারি কাঠের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল।ভেতরে ঢুকলো কালো স্যুটে সজ্জিত মার্কাস। তার গম্ভীর চেহারা আর অবয়ব দেখেই প্রিন্সিপাল থমকে গেলেন।
প্রিন্সিপালকে থরথর করে কাঁপতে দেখে জেসো আর রবিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। প্রিন্সিপাল চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। তার চোখ-মুখে তখন চরম আতঙ্ক। তিনি তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
—আ… আরে! মা-মার্কাস স্যার! আ-আপনি? আসুন, আসুন স্যার! বসুন! কী সৌভাগ্য আমার… আপনি হঠাৎ এখানে?
মার্কাস প্রিন্সিপালের দিকে এক পা এগিয়ে এসে হিমশীতল গলায় বলল,
—কার টিসি কাটার কথা বলছেন, প্রিন্সিপাল? আর কার গার্ডিয়ানকে ডাকতে বললেন?
প্রিন্সিপাল ঘাম মুছতে মুছতে হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে তোতলাতে লাগলেন,
—আ-আরে, তেমন কিছু না স্যার! ছোটখাটো বিষয়... আপনি বসুন, প্লিজ বসুন!
মার্কাস প্রিন্সিপালের দিকে সামান্যতম মনোযোগ না দিয়ে সোজা এলেনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে মাথা নিচু করে বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন তো? ওরা আপনাকে কোনো আঘাত করেনি তো?
এলেনা কোনো উত্তর দিল না, চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রিন্সিপাল, জেসো আর রবিন তখন হাঁ করে মার্কাসের দিকে তাকিয়ে আছে—শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী আর ভয়ঙ্কর গ্যাংস্টারের ডান হাত একটা সাধারণ মেয়েকে 'ম্যাম' ডেকে মাথা নোয়াচ্ছে!
ঠিক সেই মুহূর্তে—
**ধুম! ধুম! ধুম!**
হঠাৎ একটা ভারী শটগানের বিকট গর্জনে পুরো প্রিন্সিপাল রুমের কাঁচ থরথর করে কেঁপে উঠল! গুলির বিকট শব্দে জেসো আর তার বন্ধুরা কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল।
প্রিন্সিপাল রুমের কাঠের দরজা গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকল নিকোলাস ক্যাস্তিলো। হাতে তার সেই রক্তপিপাসু কাস্টমাইজড শটগান, চোখের মনি যেন জ্বলন্ত অঙ্গার!
নিক ভেতরে ঢুকেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। শটগান উঁচিয়ে নিমিষে ট্রিগার চেপে দিল—
**ঠাস! ঠাস!**
—আআআহহহ!
রবিনের ডান পায়ে আর জেসোর ডান হাতে গুলি লেগে রক্তের ফিনকি দিয়ে উঠল! রক্তে ভেসে যেতে লাগল প্রিন্সিপালের মেঝ। দুজন যন্ত্রণায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কুকড়ে কেঁদে উঠল। প্রিন্সিপাল ভয়ে টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলেন, নিক তাঁর পায়ের হাঁটু লক্ষ্য করে আরেক রাউন্ড শটগান ফায়ার করল—**ধুপ!** প্রিন্সিপাল চিৎকার দিয়ে মেঝতে পড়ে ছটফট করতে লাগলেন।
নিক কিন্তু কাউকে মেরে ফেলল না। কারণ এত সহজে আর এত জলদি এদের মতো পিঁপড়েদের শাস্তি দিয়ে মুক্তি দেওয়ার পাত্র নিকোলাস ক্যাস্তিলো নয়!
রক্তে ভেসে যাওয়া ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে শটগানের নলের ধোঁয়া উড়তে উড়তে নিক ধীর পায়ে এলেনার দিকে এগিয়ে এলো। চারপাশের ভয়াল তাণ্ডবের মাঝেও নিকের সমস্ত দৃষ্টি তখন শুধু এলেনার ওপর স্থির।
সে এলেনার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। এলেনার চোখের দিকে তাকিয়ে নিকের হিমশীতল গলা কিছুটা নরম হয়ে এলো।
নিক তার রক্তভেজা হাতের আঙুল দিয়ে এলেনার চিবুকটা হালকা ছুঁলো। সে এলেনার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
—তোমার গায়ে কেউ হাত তোলার সাহস পেয়েছে?
এলেনা নিকের চোখের রক্তপিপাসু চাহনি দেখে কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। সে মাথা নেড়ে মৃদু গলায় বলল,
—না।
নিক এক পলক এলেনাকে দেখে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল মেঝেতে পড়ে থাকা রবিন, জেসো আর প্রিন্সিপালের দিকে। রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝতে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রবিন কাঁপা গলায় হাত জোড় করে বলল,
—প্লিজ... ক্যাস্তিলো স্যার... মাফ করে দিন... আমরা জানতাম না ও আপনার বোন... আমাদের ছেড়ে দিন...
—মিথ্যা!! ও বলেছিল। 
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, করুণাহীন হাসি। সে ধীর পায়ে রবিনের কাছে এগিয়ে এসে নিজের ভারী বুট দিয়ে রবিনের গুলি লাগা পায়ের ওপর সজোরে চাপ দিল।
—আআআআহহহহ! স্যার! দয়া করুন!
রবিনের বিকট চিৎকারে ঘরের পরিবেশ আরও বীভৎস হয়ে উঠল। নিক নিচু হয়ে রবিনের কানের কাছে গিয়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—কিস করার শখ হয়েছিল, তাই না? ক্লাসরুমে নিয়ে গিয়ে ‘খুশি’ করার ইচ্ছা ছিল? নিকোলাস ক্যাস্তিলোর দিকে আঙুল তুললেও হাত কেটে ফেলি, আর তুই আমার এলেনার দিকে নজর দিয়েছিস?
কথা শেষ হতেই নিক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মার্কাসের দিকে তাকাল।
—মার্কাস।
মার্কাস সাথে সাথে এগিয়ে এলো,
—জি, বস।
—এদেরকে এখনই প্রাণে মারবে না। এই তিনটাকে আমি জেন্ত চাই । প্রতিদিন এদের একটা করে আঙুল কাটবে, আর এলেনার কাছে যে যে কথা বলেছিল, প্রতিটা শব্দের বদলে এদের চামড়া গুটিয়ে নুন ঢালবে। এক মাস যেন এরা না মরে—যন্ত্রণা কী জিনিস, তা প্রতি মুহূর্তে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া চাই।
মার্কাসের লোকজনেরা মুহূর্তে এসে টেনে-হিঁচড়ে চিৎকাররত জেসো, রবিন আর প্রিন্সিপালকে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রক্তে ভেসে যাওয়া ঘরে কেবল নিক আর এলেনা ছাড়া আর কেউ রইল না।
নিক তার হাতের শটগানটা পাশে রাখা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা সাদা সিল্কের রুমাল বের করে হাতটা মুছতে মুছতে এলেনার একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
—আমি তোমাকে বলেছিলাম এলেনা, এই পৃথিবীটা দয়ার যোগ্য নয়। তোমার ওপর যে নজর দেবে, তার চোখ উপড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তোমার নিজের থাকা উচিত।
এলেনা নিকের বরফের মতো ঠাণ্ডা চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—আপনি প্রতিবার এভাবে রক্তের বন্যা না ভাসালেও পারতেন।
নিকের ঠোঁটে একফালি অন্ধকার হাসি ফুটে উঠল। সে এলেনার কাঁধে হাত রেখে তাকে দরজার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
—ক্যাস্তিলো ভিলার নিয়ম এটাই, এলেনা। যে আমাদের শান্তি কাড়বে, আমরা তার জীবনটাই কেড়ে নেব। এখন চলো, আজ আর কোনো কলেজ নয়।
এলেনা নিকের সাথে রক্তভেজা প্রিন্সিপালের ঘর থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে এসে গাড়ির সামনে দাঁড়াল। বাইরে তখনও মৃদু হাওয়া বইছে, কিন্তু সেই বাতাসে লেগে আছে এক ভারী রক্তের গন্ধ। মার্কাস চুপচাপ পেছনের দরজা খুলে দাঁড়াল। এলেনা ও নিক এসে পেছনের সিটে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করার সাথে সাথে ভেতরে নেমে এলো এক চরম থমথমে নীরবতা। জানালার বাইরে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে শহরের রাজপথ। এলেনা স্থির দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার ভেতরে চলছে তোলপাড়।
নীরবতা ভেঙে নিকই প্রথম কথা বলল। সানগ্লাসটা পকেটে রাখতে রাখতে বরফের মতো শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল—
—কিছু বলার আছে, এলেনা?
এলেনা মাথা না ঘুরিয়েই উত্তর দিল,
—বললে কি দৃশ্যটা বদলে যাবে? বা মেঝেতে জমে থাকা রক্তের দাগ মুছে যাবে?
নিক হালকা হেসে নিজের ডান হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল।
—দৃশ্য বদলানোর দরকার নেই, এলেনা। ক্যাস্তিলোদের সাথে থাকতে হলে এই দৃশ্যগুলোর সাথে মানিয়ে নেওয়াই ভালো।
এলেনা এবার সোজা নিকের দিকে ঘুরে বসল। তার চোখের আলো কঠিন হয়ে উঠেছে।
—মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়া এক জিনিস নয়, নিকোলাস। আপনি ভাবছেন আপনি আমাকে রক্ষা করছেন? কিন্তু আসলে আপনি আমাকে আর নিজের ভেতর টেনে আনছেন। এই রক্ত, এই ভয়—এসবের পেছনে আপনার আসল উদ্দেশ্য কী?
নিক একমুহূর্ত এলেনার চোখের গভীরতা মেপে নিল। তারপর ধীরে ধীরে এলেনার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো।
—আমার উদ্দেশ্য খুব সহজ। ক্যাস্তিলো ভিলার ছায়া যাকে স্পর্শ করে, সে আর সাধারণ থাকে না। আজ যদি আমি ওই তিনটাকে ছেড়ে দিতাম, তবে কাল পুরো শহর তোমাকে দুর্বল ভাবত। আর আমার শত্রুরা দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।
এলেনা ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,
—কিন্তু তারা আপনাকে ভয় পায়, আমাকে নয়!
—ঠিক তাই, —নিকের গলায় নেমে এলো এক অদ্ভুত গম্ভীর সুর, —তারা আমাকে ভয় পায়। আর আমি চাই, তোমাকে ছোঁয়ার আগে যেন তারা হাজার বার ভাবে যে তোমার পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে।
এলেনা বিষাদময় হেসে বলল,
—এটা তো নিরাপত্তা নয়, এটা একটা খাঁচা।
নিকের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময়, অশুভ হাসিটি ফুটে উঠল।
—খাঁচা হতে পারে, এলেনা। কিন্তু ভুলো না—এই খাঁচার ভেতরে তুমি সবচেয়ে নিরাপদ।
এলেনা আর কোনো কথা বলল না। সে আবার জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিল। নিকোলাস ক্যাস্তিলোর বরফের মতো ঠাণ্ডা হৃদয় আর অহংকারের দেয়াল ভেদ করা অত সহজ নয়, সেটা সে বুঝে গেছে। তবে মনে মনে সে শপথ নিল, নিকের তৈরি এই নিয়ন্ত্রণের জাল একদিন সে ঠিকই ছিন্ন করবে।
গাড়িটি ক্যাস্তিলো ভিলার মূল গেট পেরিয়ে এসে বিশালাকার রাজকীয় ড্রাইভওয়েতে সশব্দে থেমে গেল। মার্কাস দ্রুত নিচে নেমে পেছনের দরজা খুলে দিল।
নিক নামার জন্য পা বাড়াতেই এলেনা এক মুহূর্ত থেমে সিটের ওপর শক্ত হয়ে বসে রইল। তার চোখ দুটি তখনও জানালার দিকে স্থির।
এলেনা নিচু কিন্তু জেদি গলায় বলল,
—আমি ভেতরে যাব না।
নিক দরজার কাছে থেমে ঘুরে তাকাল। তার ভ্রু দুটি হালকা কুঁচকে এলো।
—কী বললে?
এলেনা নিকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত অথচ অভিমানী গলায় বলল,
—আমি বাড়ি যাব না। ওই বিশাল ফাঁকা ভিলায় একা থাকতে আমার একদম ভালো লাগে না। আপনি সারাদিন নিজের কাজ আর রক্তপাত নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, বাবাও বাইরে। এমন অন্ধকার ঘরে বন্দি হয়ে থাকার চেয়ে রাস্তায় হাঁটাও ভালো।
নিক কিছুক্ষণ নীরব থেকে গভীর দৃষ্টিতে এলেনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এলেনার গলার অভিমান আর জেদটুকু নিকের মনস্তাত্ত্বিক কড়াকড়ির দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। নিক নিজের কোটের বোতামটা খুলে সিটে হেলান দিয়ে বসল।
তার ঠোঁটের কোণে একফালি বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু আর ভারী গলায় বলল,
—তাহলে? তুমি কি বলতে চাইছ—আমি এখানে বসে থাকি, তোমার সাথে সময় কাটাই?
কথাটা শুনে সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা মার্কাস নিজের হাসি আর সামলাতে পারল না। শক্ত ও কঠিন মেজাজের মার্কাসের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। যে নিকোলাস ক্যাস্তিলোর নাম শুনলে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপে, সেই নিককে একটা সাধারণ মেয়ে এভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করছে আর শর্ত দিচ্ছে—এই দৃশ্য মার্কাসের কাছে কম উপভোগ্য নয়!
এলেনা মার্কাসের মৃদু হাসি খেয়াল করে কিছুটা আড়ষ্ট হলো, কিন্তু নিকের প্রশ্নের জবাবে চোখ সরিয়ে না নিয়ে বলল,
—আমি কোনো শর্ত দিচ্ছি না। কিন্তু আপনি যদি সত্যি মনে করেন আমি নিরাপদ নই, তবে আমাকে বন্দি না রেখে নিজের সাথে রাখুন। নয়তো আমাকে একা ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না।
নিক মার্কাসের দিকে এক নজর ঠান্ডা চোখে তাকাল। মার্কাস সাথে সাথে গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে মাথা নিচু করে নিল।
তারপর নিক আবার এলেনার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা রহস্যময়তা, কিন্তু এবার তার মধ্যে কঠোরতার বদলে কিছুটা প্রশ্রয় খেলা করছে।
—আমার সাথে থাকা মানে কেবল আরামের জীবন নয়, এলেনা। আমার ছায়াতেও আগুন থাকে। সহ্য করতে পারবে তো?
এলেনা চিবুক উঁচু করে উত্তর দিল,
—আপনার ওই অন্ধকারের চেয়ে আমার কাছে সহ্য করার শক্তি বেশি আছে, নিকোলাস।
নিক কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে মার্কাসকে নির্দেশ দিল,
—গাড়ি আবার স্টার্ট দাও, মার্কাস। আমরা পোর্টের হেডকোয়ার্টারে যাচ্ছি।
মার্কাস বিনম্রভাবে মাথা নেড়ে বলল,
—জি, বস।
গাড়ির দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। রোলস রয়েসটি ভিলার গেট পেরিয়ে আবার রাজপথের দিকে ধেয়ে চলল। এলেনা জানালার কাঁচের দিকে তাকাল, তার মনে হলো—নিকের তৈরি নিয়মে নিককে হারানোর প্রথম পদক্ষেপটা সে হয়তো আজকেই ফেলে ফেলল।
গাড়ির চাকা যখন ক্যাস্তিলো পোর্টের প্রধান গেট পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন সন্ধ্যার কালো ছায়া সাগরের জলসীমায় নামতে শুরু করেছে। চারপাশ থমথমে। বিশালাকার সব কন্টেইনার সারি সারি সাজানো, আর তার মাঝে অস্ত্রধারী প্রহরী দল কঠোর নজরদারিতে ব্যস্ত।
গাড়ি থামতেই মার্কাস নেমে দ্রুত দরজা খুলে দিল। এলেনা নামার আগে একবার বাইরে তাকাল—জায়গাটার বাতাসেই এক ধরণের ভারী, ধাতব গন্ধ আর নোনা জলের ঝাপটা লেগে আছে।
নিক গাড়ি থেকে নেমে নিজের কালো কোটটা সোজা করে নিল। এলেনার দিকে না তাকিয়েই খুব শান্ত, কিন্তু বরফের মতো ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল—
—আমার এক গজ পেছনে থাকবে। নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই এখানে।
এলেনা কোনো কথা না বলে নিকের অনুসরণ করল। বন্দরের বিশাল এক গুদামের ভেতর তৈরি করা হয়েছে নিকোলাস ক্যাস্তিলোর মূল অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার। ভেতরে ঢুকতেই জনাদশেক বাঘা বাঘা লোক একযোগে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। তাদের প্রত্যেকের কোমরে ও কাঁধে ভারী অস্ত্র।
নিক ভেতরের উঁচু প্ল্যাটফর্মে রাখা বিশালাকার চামড়ার চেয়ারে গিয়ে বসল। সে বসতেই মার্কাস তার সামনে একটা ডার্ক উডেন ফাইল এগিয়ে দিল।
—বস, স্প্যানিশ কোস্টগার্ডের সাথে যে ডিলটা ছিল, ওরা হঠাৎ বর্ডার সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিয়েছে। জাহাজ পোর্টে নোঙর করতে পারছে না।
নিক ধীরহাতে টেবিলের ওপর রাখা সেই পরিচিত কালো পাথরের রোজারিটা তুলতে তুলতে জবাব দিল—
—কোস্টগার্ড প্রধানের নাম যেন কী?
—কার্লোস রোদেরিগো।
নিকের ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত, করুণাহীন হাসি ফুটে উঠল। সে রোজারির একটা পুঁতি সরিয়ে বলল—
—কার্লোসের ছেলের আজ জন্মদিনের পার্টি ছিল, তাই না? মার্কাস... ওকে স্মরণ করিয়ে দাও, তার ছেলের পরের জন্মদিনটা যেন সে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পালন করতে না হয়। আজ রাত বারোটার মধ্যে জাহাজ খালাস হবে।
কথাগুলোর মধ্যে এত সাধারণ একটা স্বর ছিল, যেন সে কোনো সাধারণ ব্যবসার নির্দেশ দিচ্ছে!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলেনার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একটা মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া বা কারো পরিবারকে ধ্বংস করার হুমকি দেওয়া এই লোকটার কাছে এত সহজ কীভাবে হতে পারে?
এলেনা নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলে উঠল—
—আপনি সত্যিই একটা দানব।
পুরো ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। উপস্থিত বডিগার্ডরা স্তম্ভিত হয়ে এলেনার দিকে তাকাল। নিকোলাস ক্যাস্তিলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে 'দানব' বলার সাহস এই শহরের কেউ কোনোদিন পায়নি!
মার্কাস চোখ সরু করে তাকাল, কিন্তু নিক কেবল এক হাত তুলে সবাইকে চুপ থাকতে নির্দেশ দিল।
নিক চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার লম্বা, ভারী পদক্ষেপগুলো এলেনার দিকে এগিয়ে এলো। এলেনা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পেছনেই কাঠের একটা ভারী টেবিল থাকায় তার পথ আটকে গেল।
নিক এলেনার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। দুই দিকে হাত রেখে এলেনাকে টেবিলের সাথে একরকম বন্দি করে ফেলল। তার চোখ দুটি থেকে যেন আগুনের উত্তাপ বের হচ্ছে।
—দানব? 
নিক খুব নিচু, ফিসফিসানি গলায় বলল, 
—তুমি এখনও দানব দেখনি, এলেনা। যে দুনিয়াকে তুমি বাইরে থেকে শান্ত দেখো, তার আসল রূপ দেখতে চাইলে আমার এই হাত দুটো দেখতে হয়। রক্ত না ঝরালে এই রাজত্ব টিকে থাকে না।
এলেনা নিকের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল—
—যে রাজত্ব ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা কোনোদিন স্থায়ী হয় না, নিকোলাস। একদিন না একদিন আপনার এই অহংকারই আপনাকে ডুবাবে।
নিক এলেনার চিবুকটা নিজের শক্ত দুই আঙুলে চেপে ধরল। তবে আগের মতো হিংস্রভাবে নয়, এবার তার স্পর্শে ছিল এক গভীর, অদ্ভুত আবেশ।
—তাহলে তুমি সেই দিনটার জন্য অপেক্ষা করো, এলেনা। কিন্তু যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন এই শহরে শুধু আমার নিয়মই চলবে... আর তুমি সেই নিয়মের সবচেয়ে বড় অংশ।
ঘরটায় হঠাৎ চরম এক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নিকোলাস মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর চারপাশ যেন একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে।
এলেনা একা বসে আছে নিকের সেই বিশালাকার, রাজকীয় চেয়ারে। চেয়ারটা সত্যিই বেশ আরামদায়ক, কিন্তু এলেনার মন একটুও আরাম পাচ্ছিল না। এতক্ষণ ধরে এই অচেনা জায়গায় একা বসে থাকা কি চাট্টিখানি কথা? এখানে কোনো চেনাজানা মানুষ নেই, কথা বলার মতো কেউ নেই। ভিলায় বা বাড়িতে থাকলে তাও একটা কথা ছিল—অন্তত টিভি চালিয়ে, ফোন হাতে নিয়ে কিংবা একটু হেঁটে সময় কাটানো যেত। কিন্তু এই গম্ভীর, থমথমে অফিসে সে একা একা কী করবে?
দমবন্ধ এক অনুভূতি গলার কাছে চেপে বসতেই এলেনা নিজের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম হালকা আলগা করে দিল। একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা করল সে।
চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিতেই চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো তার। মনটা পেছনে টেনে নিয়ে গেল একগাদা ভাবনায়। কীভাবে কী হয়ে গেল তার জীবনে! কোথায় ছিল সে, আর কোথায় এসে পড়ল এই রক্তমাখা, শীতল ক্যাস্তিলো সাম্রাজ্যে?
ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের মায়াবী মুখটা। বুকের ভেতর থেকে একটা কষ্ট ঠিকরে বের হতে চাইল। আজ মায়ের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে তার। যদি মা আজ বেঁচে থাকত... মা বেঁচে থাকলে হয়তো তাকে কোনোদিনই এমন একটা বিপজ্জনক আর অশুভ জায়গায় আসতেই দিত না। নিজের বুকের ভেতর আগলে রাখত, পৃথিবীর কোনো আঁধার তাকে ছুঁতে দিত না।
এলেনার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গাল গড়িয়ে নেমে এলো। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু নিঃসঙ্গতার সেই ভয়াল অনুভূতিটা ঘর জুড়ে তাকে ঘিরে রইল।
ঠিক পাঁচ ঘণ্টা পর মিটিং শেষ হলো। টানা পাঁচ ঘণ্টার মানসিক টানাপোড়েন আর জটিল হিসাব-নিকাশের পর নিকোলাস ক্যাস্তিলো বেশ ক্লান্ত ছিল। স্প্যানিশ ক্লায়েন্টদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি শেষ করে তাদের নিয়েই সে ধীরপায়ে নিজের পার্সোনাল কেবিনের দিকে হেঁটে এলো। উদ্দেশ্য—কাজের খুঁটিনাটি নিয়ে আরেকবার সংক্ষেপে কথা বলা।
কেবিনের ভারী ওকের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই নিকের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তার বিশালাকার চেয়ারে।
সেখানে খুব আয়েশী ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে এলেনা। ক্লান্তিতে তার মাথাটা চেয়ারের একপাশে হেলে পড়েছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে মুখে। কিন্তু নিকের ঠোঁটে ভেসে ওঠার আগেই থমকে গেল কোনো অনুভূতি। মুহূর্তের মধ্যে তার চেহারার রং বদলে গেল; চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, আর চোখ দুটো পরিণত হলো জ্বলন্ত অঙ্গারে।
নিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেছে এলেনার বুকের কাছে—অসহ্য গরমে এলেনা তার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে রেখেছিল।
পাশ ফিরে তাকাতেই নিক দেখল, তার সাথে থাকা তিনজন স্প্যানিশ ক্লায়েন্টের নজরও গিয়ে পড়েছে ঘুমন্ত এলেনার দিকে। তাদের চোখে একধরণের কুরুচিকর আর নোংরা কৌতুহল স্পষ্ট।
নিকোলাসের চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে এলো। গায়ের কোটটা এক ঝটকায় খুলে এলেনার শরীরের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সে এমনভাবে ক্লায়েন্টদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল, যাতে বাইরের কোনো আলোও এলেনার গায়ে না পড়ে। তার চোখের তারা দুটো তখন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো জ্বলছিল।
ক্লায়েন্টদের চোখের নোংরা দৃষ্টি খেয়াল করে নিকের ভেতরটা বিষাক্ত রাগে রি-রি করে উঠল। সে অত্যন্ত বরফশীতল আর থমথমে গলায় বলল—
—You should go now. বাকি কথা কাল হবে।
নিকের গলার স্বর শুনে ক্লায়েন্টদের বুকের ভেতর ভয় কেঁপে উঠল। কোনো কথা বাড়ানোর সাহস পেল না তারা। বাধ্য হয়ে তারা নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরের দিকে হাঁটা দিল।
করিডোর ধরে তখন মার্কাস হেঁটে আসছিল। ক্লায়েন্টদের এভাবে দ্রুত কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকাল। ক্লায়েন্টদের দলপতি এগিয়ে এসে মার্কাসকে থামাল। লোকটার মুখে এক ধরণের কুৎসিত কৌতূহল। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
—Who is she?
মার্কাস শান্ত চোখে তাদের দিকে তাকাল। তার চেহারা গম্ভীর হয়ে গেল। সে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল—
—কার কথা বলছেন আপনারা?
—ওই যে... স্যারের পার্সোনাল কেবিনে বিশালাকার চেয়ারে শুয়েছিল। মেয়েটা কে?
মার্কাসের ঠোঁটের কোণে একফালি ধারালো, বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে ক্লায়েন্টদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু হিমশীতল কণ্ঠে বলল—
— আপনারা কি স্যারের পার্সোনাল জিনিস সম্পর্কে জানতে এসেছেন? যদি তাই হয়, তবে আমার মনে হয় আমার কাছে না জেনে সোজাসুজি স্যারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেই আপনাদের জন্য বেশি ভালো হবে। অন্তত বিস্তারিত আর সামনাসামনি জানতে পারবেন... তবে জীবিত ফিরতে পারবেন কি না, সেই গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না।
মার্কাসের কথার স্পষ্ট হুমকি আর শীতল সুর শুনে ক্লায়েন্টদের মুখ নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কপালে জমে উঠল শীতল ঘাম। তারা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পা চালিয়ে লিফটের দিকে চলে গেল।অন্যদিকে, পার্সোনাল কেবিনের ভেতর দরজাটা সশব্দে লক করে দিল নিকোলাস। ঘরে তখন এক ভয়ানক ও থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে।
কেবিনের লক হওয়ার শব্দে এলেনার ঘুমটা হালকা ভেঙে গেল। সে চোখ ডলতে ডলতে সোজা হয়ে বসল। গায়ে একটা ভারী কোট জড়ানো দেখে সে কিছুটা অবাক হলো—হঠাৎ এই কোট এলো কোথা থেকে?
কোটটা সরিয়ে দিতেই সে দেখতে পেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিকোলাস। নিকের গায়ের কোট খোলা, শার্টের হাতা সামান্য গুটানো। তার চোখে গম্ভীর আর গভীর এক চাহনি।
—আপ...আপনার মিটিং শেষ? 
এলেনা তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল।
নিক কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরপায়ে এলেনার কাছে এগিয়ে এলো। চেয়ারের দুই পাশে হাত রেখে সে এলেনার ওপর কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়াল।
—তুই এখানে কী করছিলি? 
নিকের কণ্ঠস্বর বেশ নিচু, কিন্তু গম্ভীর।
—আ-আমি... আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... 
এলেনা আড়ষ্ট হয়ে বলল।নিকের চোখ তখন এলেনার শার্টের কলারের দিকে। সে নিজের আঙুল দিয়ে এলেনার শার্টের খোলা দুই বোতামের দিকে ইঙ্গিত করে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল—
—আর এই অবস্থা? তুই জানিস একটু আগে এই ঘরে কারা ঢুকেছিল? স্প্যানিশ ক্লায়েন্টরা! শরীর দেখাতে খুব ইচ্ছে করছে, তাই না? দেখা না, আমাকে দেখা!
এলেনা নিমেষে নিজের শার্টের কলার চেপে ধরল। তার চেহারা লজ্জায় আর হঠাৎ এমন কথায় লাল হয়ে উঠল। সে তো কেবল গরমে আর ক্লান্তিতে খেয়ালই করেনি!
—আ-আমি ইচ্ছে করে করিনি... খুব গরম লাগছিল, আর এতক্ষণ একা বসে থেকে—
—চুপ, 
নিক গর্জে না উঠলেও তার থমথমে গলার নির্দেশ পুরো কেবিনে ছড়িয়ে পড়ল। 
—ক্যাস্তিলোদের ছায়ায় থাকা কাউকে বাইরের লোক অন্য নজরে দেখুক, সেটা আমি পছন্দ করি না।
এলেনা নিকের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কঠোর শাসন থাকলেও কোনো রক্তপিপাসু হিংস্রতা ছিল না; বরং ছিল এক তীব্র একচ্ছত্র অধিকারবোধ।
—আপনি কি আমাকে দোষ দিচ্ছেন? 
এলেনার গলায় এবার অভিমান আর রাগের সুর ফুটল। 
—আমি তো আপনার মতো এই বন্দিদশা আর নিয়মে অভ্যস্ত নই! আমাকে এই ঘরে একা বসিয়ে রেখেছেন আপনি, আর এখন কথা শোনাচ্ছেন?
নিক কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে এলেনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে নিজের ঘড়িটা তুলে হাতে বাঁধতে বাঁধতে বলল—
—তর্ক করবি না। কোটটা গায়ে জড়িয়ে নিচে চল। মার্কাস তোকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে।
এলেনা কোটটা গায়ে পেঁচিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল—
—আর আপনি?
নিক এলেনার দিকে না তাকিয়েই কেবিনের দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল—
—আমার কিছু কাজ বাকি আছে। তুই বাড়ি পৌঁছানোর আগেই আমি ফিরছি।
এলেনা আর কোনো কথা বাড়াল না। নিকের গায়ের কোটটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে ধীরপায়ে কেবিন থেকে বের হয়ে এলো, আর পেছনে শান্ত অথচ ভারী পদক্ষেপে তাকে অনুসরণ করতে লাগল নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন