ফন্ট সাইজ:
থিম:
𝐓𝐡𝐞 𝐕𝐢𝐥𝐥𝐚𝐢𝐧 𝐖𝐡𝐨 𝐋𝐨𝐯𝐞𝐝 𝐌𝐞

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: বুচিবুড়ি

#The_villain_who_loved_me

#বুচিবুড়ি
#পর্ব৬.
প্রাসাদের বিশাল মাস্টার বেডরুমের চারপাশ তখন এক নিস্তব্ধ শান্তিতে ডুবে আছে। ঘরের ভারী ভেলভেটের পর্দা টপকে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে রাজকীয় কিং-সাইজ বিছানার ওপর। এলেনা নিকের বুকে মাথা গুঁজে স্থির হয়ে বসে ছিল। নিকের বুকের ভেতর থেকে ভেসে আসা ধুকপুক শব্দটা আর তার সুগঠিত হাত দিয়ে এলেনার চুলে আঙুল চালানোর স্পর্শটা এলেনার সমস্ত শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই শুষে নিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সমুদ্রের পানি, ডুবে যাওয়ার আতঙ্ক আর গালে চড়ের তীব্র ব্যথা তাকে কাবু করে ফেলেছিল। কিন্তু এখন এই বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণ প্রাসাদের বন্ধ দরজার আড়ালে, নিকোলাস ক্যাস্তিলোর শক্ত বুকের খাঁচায় যেন অদ্ভুত এক নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে।
এলেনা আস্তে করে মাথা তুলল। নিকের কোটের পারফিউমের সুবাস আর তার শরীরের উত্তাপ মিলেমিশে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছে। নিকের ধূসর-কালো চোখের দৃষ্টি সোজা এসে থামল এলেনার ফ্যাকাশে মুখের ওপর।
নিক আলতো করে এলেনার গালে হাত রাখল। চড়ের চোটে ফোলা দাগটা এখনও হালকা লালচে হয়ে আছে। নিকের কাঁপতে থাকা বুড়ো আঙুলটা সেই লাল দাগটির ওপর ছুঁয়ে যেতেই এলেনা সামান্য শিউরে উঠল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না।
—এখনও খুব ব্যথা করছে? 
নিকের কণ্ঠস্বর এখন অবিশ্বাস্য রকমের নরম, যেন কোনো কাঁচের টুকরো ছুঁয়ে দেখছে।এলেনা নিকের চোখের দিকে তাকাল। যে লোকটা কয়েক ঘণ্টা আগেও সমুদ্রে তাণ্ডব চালিয়েছে, তার চোখে এখন তীব্র এক অপরাধবোধের ছায়া। এলেনা হালকা মাথা নেড়ে বলল,
—না, এখন আর তেমন ব্যথা নেই। কিন্তু... আপনি অত রাগলেনি বা কেন? অতগুলো চড় মারার কী দরকার ছিল?
নিকের ঠোঁটের কোণে এক বিষাদময় অথচ আত্মপ্রত্যয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে এলেনার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
—তোমাকে আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না এলেনা। কিন্তু যখন দেখলাম তুমি সেই নোনা পানির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছ, তখন আমার মনে হয়েছিল আমার নিজের ফুসফুসটা কেউ চিড়ে রক্ত বের করে নিচ্ছে। আমার রাগ তোমার ওপর ছিল না... রাগ ছিল নিজের ওপর, আর তোমার ওই বেপরোয়া স্বভাবের ওপর।
এলেনা চোখ নামিয়ে নিল। সে অনুভব করতে পারছে—নিকোলাস ক্যাস্তিলো নামের এই শক্ত পাথরটার ভেতরে যে একটা আবেগপ্রবণ হৃদয় আছে, তা কেবল তার জন্যই স্পন্দিত হয়।ঠিক তখনই দরজায় তিনবার হালকা টোকা পড়ল। নিক স্বর গম্ভীর করে বলল,
—ভেতরে এসো।
দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল প্রাসাদের চিফ শেফ আর দুজন পরিচারিকা। তাদের হাতে রুপালি ট্রে-তে সাজানো গরম স্যুপ, হালকা স্ন্যাক্স আর ওষুধ। শেফ ট্রে-টা সাইড টেবিলে রেখে অত্যন্ত বিনীতভাবে মাথা নুয়ে বলল,
—মিস্টার ক্যাস্তিলো, ডক্টর আপনার নির্দেশ মতো এলেনা মিসের জন্য স্পেশাল রিফ্রেশিং স্যালাইন আর অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন। ডিনার তৈরি হতে আরও আধঘণ্টা লাগবে।
নিক মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে। তোমরা আসতে পারো।
পরিচারিকারা চলে যেতেই নিক নিজে উঠে দাঁড়িয়ে স্যুপের বাটিটা হাতে নিল। চামচ দিয়ে স্যুপটা সামান্য নেড়ে ঠান্ডা করে সে এলেনার মুখের সামনে ধরল।এলেনা অবাক হয়ে তাকাল।
—আমি নিজে খেতে পারব।
নিক এক চুলও বসল না বা চামচ সরাল না। তার গম্ভীর গলায় শুধু এটুকুই বের হলো,
—হা করো।
এলেনা আর তর্ক করার সাহস পেল না। চুপচাপ হা করে এক চামচ স্যুপ মুখে নিল। স্যুপের উষ্ণতা তার গলার ভেতরটা বেশ আরামদায়ক করে তুলল। নিক কোনো কথা না বলে অত্যন্ত নিখুঁত ধৈর্যের সাথে পুরো বাটির স্যুপটা এলেনাকে খাইয়ে দিল। তারপর হ্যাংওভার আর ব্যথানাশক ওষুধগুলো এলেনার হাতে দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল।
ওষুধ খাওয়ার পর এলেনার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল। স্যালাইন আর ওষুধের প্রভাবে শরীরের পেশিগুলো যেন শিথিল হয়ে পড়ছিল। সে বিছানায় এলিয়ে পড়ে চোখ বুজতেই নিক আবার তার গায়ে চাদরটা টেনে দিল।নিক আলতো করে এলেনার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল।
—ঘুমাও। আমি এখানেই আছি।
এলেনা আর কিছু বলতে পারল না, গভীর ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় দশটা।প্রাসাদের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন নিকোলাস ক্যাস্তিলো। পরনে তার কালো সিল্কের নাইট শার্ট আর ট্রাউজার্স। হাতে এক গ্লাস দামী ওয়াইন। বারান্দায় ঠান্ডা বাতাস বইছে, সমুদ্রের গর্জন দূর থেকে ভেসে আসছে।
নিকের পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল মার্কাস। মার্কাসের হাতে কিছু ফাইল আর আইপ্যাড।
—বস।
নিক ওয়াইনে এক চুমুক দিয়ে সমুদ্রের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
—খবর কী, মার্কাস?
—কলেজের দলটি কাল সকালে ট্যুর শেষ করে ফিরে যাচ্ছে। আমরা রিসোর্টের প্রফেসর এবং গাইডদের সাথে কথা বলেছি। তারা পুরো বিষয়টি দুর্ঘটনা বলেই মিটিয়ে দিয়েছে। আপনার নামে বা ঘটনা নিয়ে স্পেনের কোনো পত্রিকায় এক লাইনও খবর ছাপা হবে না।
—আর জেসিকা? 
নিকের শান্ত কণ্ঠ।
—মিস জেসিকাকে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তার রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মিস এলেনার সাথে তার ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই সে এখন অনেকটাই শান্ত। তবে...
মার্কাস একটু থামল। নিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
—তবে কী?
—স্পেনের আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা নতুন চক্রান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, বস। ডকহাউসের ওই দুজন লোক মারা যাওয়ার আগে কিছু নাম বলে গেছে। শত্রুরা কেবল আপনার ব্যবসায় হাত দিতে চায় না, তারা বুঝতে পেরেছে আপনার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনটা। এলেনা মিস এখন কেবল আপনার নিজস্ব সম্পত্তি নন, শত্রুদের চোখে তিনি আপনার একমাত্র 'দুর্বলতা'।
নিকের চোখের মনি মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো হিমশীতল হয়ে উঠল। ওয়াইনের গ্লাসটা তার শক্ত মুঠোয় চূর্ণবিচূর্ণ হতে গিয়েও বেঁচে গেল।নিক ধীরে ধীরে ওয়াইনের গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
—দুর্বলতা? ওরা যাকে আমার দুর্বলতা ভাবছে, সেটাই ওদের বংশ ধ্বংস করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে। ক্যাস্তিলোদের সম্পত্তিতে হাত দিলে হাত কাটা যায়, আর ক্যাস্তিলোর ভালোবাসায় হাত দিলে পুরো জাতি মুছে যায়।
মার্কাস সোজা হয়ে দাঁড়াল।
—আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী, বস?
—কাল সকালে এলেনা শহরে ফিরে যাবে। কিন্তু এবার আর শুধু দূর থেকে নজর রাখা হবে না। ওর কলেজের চারপাশে, ঘরের ভিটিতে—সব জায়গায় ছায়ার মতো আমাদের সিকিউরিটি থাকবে। আর আমি... খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে এলেনাকে আমার এই ক্যাস্তিলো প্রাসাদের চিরস্থায়ী মালকিন করে নিয়ে আসব।
—জি, বস। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
মার্কাস বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকাল।রোদ উঠতেই এলেনার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে দেখল ঘরের সাজসজ্জা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতকালের সব আতঙ্ক যেন এক রাতের ঘুমে অনেকটাই কেটে গেছে। সে বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। গালে লাল দাগটা এখন অনেকটাই মিইয়ে এসেছে, ফোলা ভাবও কমে গেছে।ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ করে ভেতরে ঢুকল দুজন পরিচারিকা। তাদের হাতে একটি অভিজাত ব্র্যান্ডের ড্রেস বক্স আর জুতো।
—গুড মর্নিং, মিস এলেনা। মিস্টার ক্যাস্তিলো আপনাকে তৈরি হতে বলেছেন। আপনাকে আপনার বন্ধুদের কাছে ফেরত নিয়ে যাওয়ার গাড়ি প্রস্তুত।
এলেনা একটু অবাক হলো।
—নিক... মানে মিস্টার ক্যাস্তিলো কোথায়?
—উনি নিচের প্রাইভেট স্টাডিতে আছেন। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিলেই উনি আসবেন।
এলেনা পরিচারিকাদের আনা সুন্দর একটি পিচ রঙের ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে নিল। হালকা মেকআপ আর খোলা চুলে তাকে অসাধারণ মিষ্টি লাগছিল।
দশ মিনিট পর নিক ঘরে প্রবেশ করল। পরনে তার ধবধবে সাদা থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সানগ্লাস হাতে ধরে রাখা। তার পুরুষালী ব্যক্তিত্ব আর আভিজাত্য দেখে এলেনা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।নিক এলেনার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ জোড়া এলেনাকে ওপর থেকে নিচে এক পলক দেখে নিল। ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
—Ready?
এলেনা হালকা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
নিক এলেনার হাতটি নিজের শক্ত হাতের তালুতে পুরে নিল। এলেনা এবার আর হাত সরানোর চেষ্টা করল না। যেন এই স্পর্শটাই এখন তার সবচেয়ে পরিচিত অনুভূতি।দুজন ধীর পায়ে প্রাসাদের বিশাল লবি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে নিকের ব্ল্যাক এসইউভি ক্যাভালকেড। সিকিউরিটি গার্ডরা দরজা খুলে প্রস্তুত।
নিক এলেনাকে পেছনের সিটে বসিয়ে নিজেও তার পাশে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল রিসোর্টের উদ্দেশ্যে, যেখানে কলেজের বাসগুলো সবাইকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।গাড়ির ভেতরের নীরবতা ভেঙে এলেনা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি আমার সাথে শহরে ফিরবেন?
নিক জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে ধীরেসুস্থে এলেনার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সানগ্লাসটা চোখের ওপর নামাল।
—আমি সবসময় তোমার সাথে আছি এলেনা। তুমি আমাকে দেখতে পাও আর না পাও... ক্যাস্তিলোর চোখ তোমাকে কখনো আড়াল হতে দেবে না।
এলেনা মৃদু হাসল। সে জানে, এই লোকটা সাধারণ নয়। তার ভালোবাসার ধরন হিংস্র, ভয়ংকর, অথচ ততটাই গভীর ও আগলে রাখার মতো।অর্ধঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল রিসোর্টের সীমানার কাছে। কিছুটা দূরে কলেজের বাসগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। ছাত্রছাত্রীরা ব্যাগেজ নিয়ে বাসে উঠছিল।
এলেনা সিট থেকে উঠতে যেতেই নিক তার হাতটা ধরে একটু নিজের দিকে টানল।নিক ঝুঁকে এসে এলেনার গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে অত্যন্ত ধীর ও গভীর গলায় ফিসফিস করল,
—পাঁচ দিনের স্বাধীনতা শেষ এলেনা। এবার থেকে প্রতিটা মুহূর্তে মনে রাখবে—তুমি কার। কেউ যদি তোমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়, আমাকে খবর দেওয়ার প্রয়োজন নেই... মার্কাসের লোক তোমাকে ঘিরে থাকবে।
এলেনার বুকটা ধক করে উঠল। সে নিকের চোখের দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—আ-আপনি কি আবার আমাকে ট্র্যাপে ফেলছেন?
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই বিখ্যাত চতুর হাসি।
—ট্র্যাপ নয় এলেনা... এটাকে বলে একচ্ছত্র অধিকার।
এলেনা আর কিছু না বলে তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল। সে দ্রুত পায়ে বাসের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় একবার পেছন ফিরে তাকাল। সেই বিশাল কালো গাড়িটার জানালার ওপাশে সানগ্লাস পরা নিকোলাস ক্যাস্তিলো শান্তভাবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।বাসের কাছে পৌঁছাতেই জেসিকা ছুটে এসে এলেনাকে জড়িয়ে ধরল।
—এলেনা! তুই ঠিক আছিস তো? উফ! কাল থেকে আমার যা অবস্থা গেছে! তুই সত্যি আস্ত ফিরে এসেছিস?
এলেনা জেসিকার কাণ্ড দেখে মুচকি হাসল।
—আরে থাম! আমি একদম ঠিক আছি। চল, বাসে উঠি।
দুই বন্ধু বাসে গিয়ে তাদের পুরানো সিটটায় বসল। বাস চলতে শুরু করল নিজ শহরের উদ্দেশ্যে। সমুদ্রের সৈকত, নোনা বাতাস আর সেই নীল পানি ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে বাস এগিয়ে যেতে লাগল।এলেনা জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তার হাতে কাল রাতের সেই ছোট্ট কাগজের টুকাটা, যেটা নিক তার ব্যাগে গুঁজে দিয়েছিল।কাগজটিতে নিকের নিজের হাতের নিখুঁত অক্ষরে লেখা—
"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."(তুমি অন্ধকারের অংশ এলেনা, আর আমিই তোমার একমাত্র আলো।)
এলেনা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। সে বুঝতে পারল, তার সাধারণ জীবনের দিনগুলো হয়তো চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া দানবটির এই অন্ধ ভালোবাসায় সে নিজেকে সঁপে দিতে আর ভয় পাচ্ছে না।দূর থেকে, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো গাড়িটার ভেতর থেকে নিকোলাস ক্যাস্তিলো চলন্ত বাসটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুলের মাঝে ঘুরে চলেছে সেই কালো পাথরের রোজারি।
—চলুন বস, 
মার্কাস বলল।নিক চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করে শান্ত গম্ভীর গলায় বলল,
—হ্যাঁ। এবার খেলা শুরু করার সময় হয়েছে।
বাসের চাকাগুলো মহাসড়কে ঘুরতে শুরু করেছে। শহরের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে আসছে, আর জানালার কাঁচ ঘেঁষে পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে স্পেনের দীর্ঘ রাস্তার ধারের পাইন গাছগুলো।বাসের ভেতরের বাকি স্টুডেন্টদের মাঝে হৈচৈ আর ফেরার আনন্দ স্পষ্ট। কিন্তু তিন নম্বর সিটে বসে থাকা জেসিকার উসখুস ভাব যেন ক্রমশ বাড়ছিল। সে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিল, তারপর এলেনার হাতের দিকে তাকাল—যেখানে নিকের রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট চিরকুটটা লুকানো।
সবশেষে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে জেসিকা এলেনার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো। সে চোখ দুটি ছোট ছোট করে, অত্যন্ত গম্ভীর ও সন্দেহী গলায় বলে উঠল—
—এই! এবার আসল কথাটা বল তো? লোকটা কে হয় তোর? আর তোর ব্যাপারটাই বা কী? কালকে থেকে আমি পুরো পাগল হতে বসেছিলাম, আর তুই কোনো কথাই বলছিস না!
এলেনা চমকে উঠে জেসিকার দিকে তাকাল। হাত থেকে চিঠিটা প্রায় খসে পড়তে নিয়েছিল, সে তড়িঘড়ি করে তা ব্যাগের গোপন পকেটে গুঁজে ফেলল।
—ক-কিসের কথা বলছিস জেসু? 
এলেনা তোতলানোর চেষ্টা করল।
—আহা! ন্যাকামি করিস না তো! 
জেসিকা এলেনার হাত ধরে একটু ঝাঁকুনি দিল। 
—ওই লোকটা... যে কাল তোকে ওই স্পিডবোটের মাফিয়া টাইপ গুন্ডাদের হাত থেকে টেনে আনল, যে তোকে নিজের বিলাস বহুল প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে গায়েব করে রাখল! আর আজ সকালে তোকে ফেরত দিতে এলো বিশাল ব্ল্যাক এসইউভির ক্যাভালকেড নিয়ে, সুট-বুট পরা সিকিউরিটি গার্ডদের পাহারা দিয়ে... ওই লোকটা কে?
এলেনা জানালার বাইরের দিকে মুখ ফেরাতে চাইল, কিন্তু জেসিকা তার চিবুক ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
—না, আজকে কোনো অজুহাত চলবে না এলেনা! লোকটার চোখের চাহনি দেখছিস তুই? যখন সে তোকে বাসের কাছে নামিয়ে দিচ্ছিল, ওরকম দৃষ্টি কোনো সাধারণ মানুষ অন্য কারো দিকে দেয় না! লোকটা তোর দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তোকে পুরো পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের পকেটে ভরে রাখবে! আর তুইও তো চুপচাপ তার আদেশ মেনে গাড়িতে বসে ছিলি... একটা শব্দও বলিসনি লোকটাকে! তোর এই নীরবতার রহস্য কী?
এলেনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, জেসিকার কাছ থেকে সবকিছু বেশিদিন লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু নিকোলাস ক্যাস্তিলোর আসল পরিচয়—সে যে স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া সিন্ডিকেটের ডন—এই সত্যিটা জেসিকাকে বললে সে ভয়ে জ্ঞান হারাবে।এলেনা জেসিকার দিকে তাকিয়ে স্বর একবারে নিচু করে ফেলল।
—জেসু... প্লিজ একটু আস্তে বল। বাসের কেউ যেন না শোনে।
—বলবি তো কী হয়েছে? 
জেসিকাও গলার স্বর কমিয়ে ফিসফিস করে উঠল।
—উনার নাম... নিক। নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
—ক্যাস্তিলো?
জেসিকার চোখ দুটি বড় বড় হয়ে গেল। সে একটু ভেবে বলল, —দাঁড়া, এই নামটা যেন কোথায় শুনেছি! স্পেনের বিজনেজ ম্যাগাজিনে... নাকি ডনদের তালিকায়? এলেনা, উনি কি সত্যি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী? নাকি অন্য কিছু?
—উনি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী একজন মানুষ, জেসু, 
এলেনা চোখ নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল। 
—উনার শত্রুর অভাব নেই। কাল যারা আমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল, তারা আসলে নিককে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য আমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
—তোকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল? তার মানে... তার মানে লোকটা তোকে চেনে? 
জেসিকা চোখ বুজে এক হাত কপালে দিল। 
—ও মাই গড, এলেনা! তুই এই ভয়ংকর চক্রে কীভাবে জড়ালি? তুই তো শুধু একজন সাধারণ স্টুডেন্ট!
—আমি নিজেও জানি না জেসু, 
এলেনার কণ্ঠে এবার সত্যি এক করুণ সুর ফুটে উঠল। 
—আমি জানতাম না উনি এত দূর পর্যন্ত চলে আসবেন। কাল যখন আমি সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হয়েছিল আমার জীবন শেষ। কিন্তু উনি নিজের জীবন বাজি রেখে পানির নিচে নেমে আমাকে তুলে এনেছেন।
জেসিকা এলেনার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। গালে চড়ের হালকা দাগটা সে আগেই লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি। সে এলেনার গালে হাত ছুঁয়ে বলল—
—তোকে আঘাত করেছে ওরা, তাই না?
—ওটা কিছু না, 
এলেনা মিথ্যা বলল। সে চায় না জেসিকা জানুক চড়টা নিক নিজে মেরেছিল। 
—কিন্তু জেসু... আমি ভয় পাচ্ছি। লোকটা আমাকে বলেছে, আমি নাকি ওর 'একচ্ছত্র অধিকার'। আমি চাইলেও আর উনার ছায়া থেকে বের হতে পারব না।
জেসিকা কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইল। তারপর সে এলেনার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
—এলেনা, তুই কি ওই লোকটাকে ভালোবাসিস? নাকি ভয় পাস?
এলেনা এই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারল না। সে জানালার কাঁচের বাইরে তাকাল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিকের সেই অন্ধকার ধোঁয়াটে ধূসর চোখ দুটো, তার শক্ত বুকের স্পর্শ, আর সেই গভীর গলায় বলা কথাগুলো—"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."
—আমি জানি না জেসু, 
এলেনা ফিসফিস করে বলল। 
—উনাকে দেখলে আমার ভয় করে, উনার ক্ষমতা আর হিংস্রতা আমাকে শিহরিত করে... কিন্তু কাল রাতে যখন আমি উনার বুকে মাথা রেখেছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—এই পৃথিবীতে এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথাও হতে পারে না।
জেসিকা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তোর অবস্থা তো দেখছি মারাত্মক, এলেনা। লোকটা দানব হতে পারে, কিন্তু সেই দানবটা তোর প্রেমে পুরোপুরি পাগল। তবে মনে রাখিস... মাফিয়াদের জগৎ কিন্তু রক্তের গল্পে লেখা হয়। একটু সামলে চলিস।
এলেনা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—আচ্ছা এলি,লোকটার সাথে তোর দেখা হলো কিভাবে?
—He is my stepbrother. 
—কি!!!!
বাসের সিট থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল জেসিকা। চোখ দুটি ছানাবড়া করে, হাঁ করে কিছুক্ষণ এলেনার দিকে তাকিয়ে রইল সে। বাসের পেছনের সারি থেকে দুজন ছাত্র ঘুরতেই জেসিকা তড়িঘড়ি করে নিজের মুখটা ঢেকে এলেনার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল।
—কী বললি তুই?! স্টেপ-ব্রাদার?! মানে তোর সৎ ভাই?! তোর মাথা কি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে এলেনা? স্পেনের এই ভয়ংকর, মাফিয়া লুকিং লোকটা তোর স্টেপ-ব্রাদার?!
এলেনা দু-আঙুলে নিজের কপাল চেপে ধরল। সে জানত জেসিকার প্রতিক্রিয়া এমনই হবে।
—আস্তে জেসু, প্লিজ! বাসের সবাই শুনে ফেলবে।
—আরে রাখ তোর বাসের সবাই! 
জেসিকা ফিসফিসিয়ে এক প্রকার গর্জে উঠল। 
—যে লোকটা তোকে উদ্ধার করতে স্পিডবোট নিয়ে মাফিয়া স্টাইলে হামলা চালাল, যে তোকে নিজের প্রাসাদে আটকে রেখে ঠোঁটে কপালে চুমু দিয়ে বলছে 'ইউ বিলং টু মি', সেই লোকটা তোর স্টেপ-ব্রাদার?! এটা কোন ধরনের গল্প শুনি?
এলেনা জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতীতের সেই তেতো দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
—আমার মা স্পেনের এক নামকরা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন—সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো। নিকোলাস ক্যাস্তিলো সেই চার্লস ক্যাস্তিলোরই প্রথম পক্ষের একমাত্র ছেলে।আর আমি সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলোর দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে।
—ও মাই গড... 
জেসিকা দু-হাতে মুখ ঢাকল। 
—তার মানে তোদের সম্পর্ক রক্তের ভাই-বোনের?
— হয়তো তা-ই, 
এলেনা নিচু গলায় বলল। 
—কিন্তু নিক কখনো আমাকে বোন হিসেবে দেখেনি, জেসু। প্রথম দিন যেদিন আমি ওই বিশাল ক্যাস্তিলো ম্যানশনে পা দিয়েছিলাম, সেদিন থেকে ওই ধূসর চোখ দুটো আমাকে রক্তের সম্পর্কে বাঁধেনি... বেঁধেছে এক আদিম আর ভয়ংকর শিকলে।
—কিন্তু তোর মা আর তার বাবা? উনারা কিছু বলেননি?
 এলেনা দু-আঙুলে নিজের কপাল চেপে ধরল। সে জানত জেসিকার প্রতিক্রিয়া এমনই হবে। সে বাসের বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতীতের সেই তেতো দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
—আমার মা মারা গেছে জেসু...
এলেনার কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্য একদম নিভে এলো।
—মা মারা যাওয়ার পরই তো আমার এই সাজানো-গোছানো পৃথিবীটা চুরমার হয়ে গেল। মা চলে যাওয়ার পর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছিলাম। তাই তো বাবা আমাকে নিজের কাছে, এই স্পেনে নিয়ে এলেন।
জেসিকার মুখের রাগের ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে বিষাদে বদলে গেল। সে এলেনার একটা হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে বলল—
—ওহ এলি... তোর মা মারা গেছেন? আই অ্যাম সো সরি! কিন্তু তোর বাবা? সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো তো এত বড় একজন প্রভাবশালী মানুষ! উনি কিছু বলেন না? নিকোলাস যে তোর সাথে এমন একটা অদ্ভুত আর হিংস্র আচরণ করে, তোর বাবা কি তা জানেন না?
এলেনার ঠোঁটের কোণে এক বিষাদময় তিতা হাসি ফুটে উঠল। সে হাত দিয়ে জানালার ঝাপসা কাঁচটা হালকা মুছে নিয়ে বলল—
—বলবেন না কেন? বাবা নিককে কম বকাঝকা করেননি! কতবার যে ওদের দুজনের মধ্যে এই নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি আর অশান্তি হয়েছে, তার হিসাব নেই। বাবা নিককে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন আমি এই পরিবারের মেয়ে, আমার সাথে যেন ও নিজের ক্ষমতার দাপট না দেখায়। কিন্তু...
—কিন্তু কী এলি?
জেসিকা প্রায় শ্বাস আটকে জিজ্ঞেস করল।
—নিক কারো কথা শোনে না জেসু,
এলেনা চোখ বুজে মাথাটা বাসের সিটে এলিয়ে দিল।
—বাবা যতবারই ওকে বকেন বা থামানোর চেষ্টা করেন, নিক ততবারই আরও উগ্র হয়ে ওঠে। ক্যাস্তিলো পরিবারের আসল শক্তি, ব্যবসা আর অন্ধকার জগতের পুরো চাবিটা এখন নিকের হাতে। বাবা চেষ্টা করেও ওকে নিজের সীমানায় বেঁধে রাখতে পারেননি। নিক বাবার মুখোপোড়ি সব বারণ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। প্রথম দিন থেকেই সে বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—আমি ওর বোন নই, আমি শুধুই নিকোলাস ক্যাস্তিলোর একমাত্র দুর্বলতা আর দখল করা সম্পত্তি।
—ওহ মাই গড! ভাই, আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না এলি!
জেসিকা দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার গলার স্বর ভয়ে আর উত্তেজনায় কাঁপছিল।
—এটা কোন ধরনের পাগলপন্তী! একদিকে তোর মা নেই, তুই একটা অচেনা দেশে একা... আর অন্যদিকে স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর লোকটা তোর বাবার বকাঝকাকে পাত্তা না দিয়ে তোকে নিজের জালে এভাবে আটকে রেখেছে! তুই এই নারকীয় সম্পর্কের মধ্যে কীভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছিস এলি?
এলেনা ক্ষণিকের জন্য চুপ হয়ে গেল। সে নিজের ব্যাগটার গোপন পকেটে হাত রাখল, যেখানে নিকের লেখা সেই চিরকুটটা রাখা আছে—"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."
—আমি জানি না জেসু...
এলেনা ফিসফিস করে বলল।
—নিকের প্রতিটা পদক্ষেপ, তার রাগ আর এই বাঁধ ভাঙা অধিকারবোধ আমাকে আতঙ্কিত করে। বাবা ওকে বকলে ও আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যি বলতে কি... কাল রাতে যখন আমি ওর বুকে মাথা রেখেছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—এই পুরো পৃথিবীতে এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আমার জন্য আর কোথাও হতে পারে না।
জেসিকা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, এলেনার জীবনের এই জটিল গল্পের রূপরেখা সাধারণ কোনো হিসেবে মিলবে না।বিকেলের সোনাঝুড়ি রোদ যখন শহরের রাস্তায় এসে পড়েছে, তখন বাসের চাকা এসে থামল কলেজের মূল ফটকের সামনে। স্টুডেন্টদের নামার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে।এলেনা আর জেসিকা বাস থেকে নিচে নেমে এলো।
—তুই কি আমার সাথে হোস্টেলে যাবি, এলি?
জেসিকা অত্যন্ত চিন্তিত চোখে তাকাল।
—না, জেসু। আমি বাড়ি ফিরব।
#The_villain_who_loved_me
#বুচিবুড়ি
#পর্ব৬.
প্রাসাদের বিশাল মাস্টার বেডরুমের চারপাশ তখন এক নিস্তব্ধ শান্তিতে ডুবে আছে। ঘরের ভারী ভেলভেটের পর্দা টপকে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে রাজকীয় কিং-সাইজ বিছানার ওপর। এলেনা নিকের বুকে মাথা গুঁজে স্থির হয়ে বসে ছিল। নিকের বুকের ভেতর থেকে ভেসে আসা ধুকপুক শব্দটা আর তার সুগঠিত হাত দিয়ে এলেনার চুলে আঙুল চালানোর স্পর্শটা এলেনার সমস্ত শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই শুষে নিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সমুদ্রের পানি, ডুবে যাওয়ার আতঙ্ক আর গালে চড়ের তীব্র ব্যথা তাকে কাবু করে ফেলেছিল। কিন্তু এখন এই বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণ প্রাসাদের বন্ধ দরজার আড়ালে, নিকোলাস ক্যাস্তিলোর শক্ত বুকের খাঁচায় যেন অদ্ভুত এক নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে।
এলেনা আস্তে করে মাথা তুলল। নিকের কোটের পারফিউমের সুবাস আর তার শরীরের উত্তাপ মিলেমিশে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছে। নিকের ধূসর-কালো চোখের দৃষ্টি সোজা এসে থামল এলেনার ফ্যাকাশে মুখের ওপর।
নিক আলতো করে এলেনার গালে হাত রাখল। চড়ের চোটে ফোলা দাগটা এখনও হালকা লালচে হয়ে আছে। নিকের কাঁপতে থাকা বুড়ো আঙুলটা সেই লাল দাগটির ওপর ছুঁয়ে যেতেই এলেনা সামান্য শিউরে উঠল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না।
—এখনও খুব ব্যথা করছে? 
নিকের কণ্ঠস্বর এখন অবিশ্বাস্য রকমের নরম, যেন কোনো কাঁচের টুকরো ছুঁয়ে দেখছে।এলেনা নিকের চোখের দিকে তাকাল। যে লোকটা কয়েক ঘণ্টা আগেও সমুদ্রে তাণ্ডব চালিয়েছে, তার চোখে এখন তীব্র এক অপরাধবোধের ছায়া। এলেনা হালকা মাথা নেড়ে বলল,
—না, এখন আর তেমন ব্যথা নেই। কিন্তু... আপনি অত রাগলেনি বা কেন? অতগুলো চড় মারার কী দরকার ছিল?
নিকের ঠোঁটের কোণে এক বিষাদময় অথচ আত্মপ্রত্যয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে এলেনার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
—তোমাকে আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না এলেনা। কিন্তু যখন দেখলাম তুমি সেই নোনা পানির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছ, তখন আমার মনে হয়েছিল আমার নিজের ফুসফুসটা কেউ চিড়ে রক্ত বের করে নিচ্ছে। আমার রাগ তোমার ওপর ছিল না... রাগ ছিল নিজের ওপর, আর তোমার ওই বেপরোয়া স্বভাবের ওপর।
এলেনা চোখ নামিয়ে নিল। সে অনুভব করতে পারছে—নিকোলাস ক্যাস্তিলো নামের এই শক্ত পাথরটার ভেতরে যে একটা আবেগপ্রবণ হৃদয় আছে, তা কেবল তার জন্যই স্পন্দিত হয়।ঠিক তখনই দরজায় তিনবার হালকা টোকা পড়ল। নিক স্বর গম্ভীর করে বলল,
—ভেতরে এসো।
দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল প্রাসাদের চিফ শেফ আর দুজন পরিচারিকা। তাদের হাতে রুপালি ট্রে-তে সাজানো গরম স্যুপ, হালকা স্ন্যাক্স আর ওষুধ। শেফ ট্রে-টা সাইড টেবিলে রেখে অত্যন্ত বিনীতভাবে মাথা নুয়ে বলল,
—মিস্টার ক্যাস্তিলো, ডক্টর আপনার নির্দেশ মতো এলেনা মিসের জন্য স্পেশাল রিফ্রেশিং স্যালাইন আর অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন। ডিনার তৈরি হতে আরও আধঘণ্টা লাগবে।
নিক মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে। তোমরা আসতে পারো।
পরিচারিকারা চলে যেতেই নিক নিজে উঠে দাঁড়িয়ে স্যুপের বাটিটা হাতে নিল। চামচ দিয়ে স্যুপটা সামান্য নেড়ে ঠান্ডা করে সে এলেনার মুখের সামনে ধরল।এলেনা অবাক হয়ে তাকাল।
—আমি নিজে খেতে পারব।
নিক এক চুলও বসল না বা চামচ সরাল না। তার গম্ভীর গলায় শুধু এটুকুই বের হলো,
—হা করো।
এলেনা আর তর্ক করার সাহস পেল না। চুপচাপ হা করে এক চামচ স্যুপ মুখে নিল। স্যুপের উষ্ণতা তার গলার ভেতরটা বেশ আরামদায়ক করে তুলল। নিক কোনো কথা না বলে অত্যন্ত নিখুঁত ধৈর্যের সাথে পুরো বাটির স্যুপটা এলেনাকে খাইয়ে দিল। তারপর হ্যাংওভার আর ব্যথানাশক ওষুধগুলো এলেনার হাতে দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল।
ওষুধ খাওয়ার পর এলেনার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল। স্যালাইন আর ওষুধের প্রভাবে শরীরের পেশিগুলো যেন শিথিল হয়ে পড়ছিল। সে বিছানায় এলিয়ে পড়ে চোখ বুজতেই নিক আবার তার গায়ে চাদরটা টেনে দিল।নিক আলতো করে এলেনার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল।
—ঘুমাও। আমি এখানেই আছি।
এলেনা আর কিছু বলতে পারল না, গভীর ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় দশটা।প্রাসাদের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন নিকোলাস ক্যাস্তিলো। পরনে তার কালো সিল্কের নাইট শার্ট আর ট্রাউজার্স। হাতে এক গ্লাস দামী ওয়াইন। বারান্দায় ঠান্ডা বাতাস বইছে, সমুদ্রের গর্জন দূর থেকে ভেসে আসছে।
নিকের পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল মার্কাস। মার্কাসের হাতে কিছু ফাইল আর আইপ্যাড।
—বস।
নিক ওয়াইনে এক চুমুক দিয়ে সমুদ্রের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
—খবর কী, মার্কাস?
—কলেজের দলটি কাল সকালে ট্যুর শেষ করে ফিরে যাচ্ছে। আমরা রিসোর্টের প্রফেসর এবং গাইডদের সাথে কথা বলেছি। তারা পুরো বিষয়টি দুর্ঘটনা বলেই মিটিয়ে দিয়েছে। আপনার নামে বা ঘটনা নিয়ে স্পেনের কোনো পত্রিকায় এক লাইনও খবর ছাপা হবে না।
—আর জেসিকা? 
নিকের শান্ত কণ্ঠ।
—মিস জেসিকাকে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তার রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মিস এলেনার সাথে তার ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই সে এখন অনেকটাই শান্ত। তবে...
মার্কাস একটু থামল। নিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
—তবে কী?
—স্পেনের আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা নতুন চক্রান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, বস। ডকহাউসের ওই দুজন লোক মারা যাওয়ার আগে কিছু নাম বলে গেছে। শত্রুরা কেবল আপনার ব্যবসায় হাত দিতে চায় না, তারা বুঝতে পেরেছে আপনার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনটা। এলেনা মিস এখন কেবল আপনার নিজস্ব সম্পত্তি নন, শত্রুদের চোখে তিনি আপনার একমাত্র 'দুর্বলতা'।
নিকের চোখের মনি মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো হিমশীতল হয়ে উঠল। ওয়াইনের গ্লাসটা তার শক্ত মুঠোয় চূর্ণবিচূর্ণ হতে গিয়েও বেঁচে গেল।নিক ধীরে ধীরে ওয়াইনের গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
—দুর্বলতা? ওরা যাকে আমার দুর্বলতা ভাবছে, সেটাই ওদের বংশ ধ্বংস করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে। ক্যাস্তিলোদের সম্পত্তিতে হাত দিলে হাত কাটা যায়, আর ক্যাস্তিলোর ভালোবাসায় হাত দিলে পুরো জাতি মুছে যায়।
মার্কাস সোজা হয়ে দাঁড়াল।
—আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী, বস?
—কাল সকালে এলেনা শহরে ফিরে যাবে। কিন্তু এবার আর শুধু দূর থেকে নজর রাখা হবে না। ওর কলেজের চারপাশে, ঘরের ভিটিতে—সব জায়গায় ছায়ার মতো আমাদের সিকিউরিটি থাকবে। আর আমি... খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে এলেনাকে আমার এই ক্যাস্তিলো প্রাসাদের চিরস্থায়ী মালকিন করে নিয়ে আসব।
—জি, বস। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
মার্কাস বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকাল।রোদ উঠতেই এলেনার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে দেখল ঘরের সাজসজ্জা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতকালের সব আতঙ্ক যেন এক রাতের ঘুমে অনেকটাই কেটে গেছে। সে বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। গালে লাল দাগটা এখন অনেকটাই মিইয়ে এসেছে, ফোলা ভাবও কমে গেছে।ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ করে ভেতরে ঢুকল দুজন পরিচারিকা। তাদের হাতে একটি অভিজাত ব্র্যান্ডের ড্রেস বক্স আর জুতো।
—গুড মর্নিং, মিস এলেনা। মিস্টার ক্যাস্তিলো আপনাকে তৈরি হতে বলেছেন। আপনাকে আপনার বন্ধুদের কাছে ফেরত নিয়ে যাওয়ার গাড়ি প্রস্তুত।
এলেনা একটু অবাক হলো।
—নিক... মানে মিস্টার ক্যাস্তিলো কোথায়?
—উনি নিচের প্রাইভেট স্টাডিতে আছেন। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিলেই উনি আসবেন।
এলেনা পরিচারিকাদের আনা সুন্দর একটি পিচ রঙের ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে নিল। হালকা মেকআপ আর খোলা চুলে তাকে অসাধারণ মিষ্টি লাগছিল।
দশ মিনিট পর নিক ঘরে প্রবেশ করল। পরনে তার ধবধবে সাদা থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সানগ্লাস হাতে ধরে রাখা। তার পুরুষালী ব্যক্তিত্ব আর আভিজাত্য দেখে এলেনা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।নিক এলেনার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ জোড়া এলেনাকে ওপর থেকে নিচে এক পলক দেখে নিল। ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
—Ready?
এলেনা হালকা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
নিক এলেনার হাতটি নিজের শক্ত হাতের তালুতে পুরে নিল। এলেনা এবার আর হাত সরানোর চেষ্টা করল না। যেন এই স্পর্শটাই এখন তার সবচেয়ে পরিচিত অনুভূতি।দুজন ধীর পায়ে প্রাসাদের বিশাল লবি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে নিকের ব্ল্যাক এসইউভি ক্যাভালকেড। সিকিউরিটি গার্ডরা দরজা খুলে প্রস্তুত।
নিক এলেনাকে পেছনের সিটে বসিয়ে নিজেও তার পাশে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল রিসোর্টের উদ্দেশ্যে, যেখানে কলেজের বাসগুলো সবাইকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।গাড়ির ভেতরের নীরবতা ভেঙে এলেনা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি আমার সাথে শহরে ফিরবেন?
নিক জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে ধীরেসুস্থে এলেনার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সানগ্লাসটা চোখের ওপর নামাল।
—আমি সবসময় তোমার সাথে আছি এলেনা। তুমি আমাকে দেখতে পাও আর না পাও... ক্যাস্তিলোর চোখ তোমাকে কখনো আড়াল হতে দেবে না।
এলেনা মৃদু হাসল। সে জানে, এই লোকটা সাধারণ নয়। তার ভালোবাসার ধরন হিংস্র, ভয়ংকর, অথচ ততটাই গভীর ও আগলে রাখার মতো।অর্ধঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল রিসোর্টের সীমানার কাছে। কিছুটা দূরে কলেজের বাসগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। ছাত্রছাত্রীরা ব্যাগেজ নিয়ে বাসে উঠছিল।
এলেনা সিট থেকে উঠতে যেতেই নিক তার হাতটা ধরে একটু নিজের দিকে টানল।নিক ঝুঁকে এসে এলেনার গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে অত্যন্ত ধীর ও গভীর গলায় ফিসফিস করল,
—পাঁচ দিনের স্বাধীনতা শেষ এলেনা। এবার থেকে প্রতিটা মুহূর্তে মনে রাখবে—তুমি কার। কেউ যদি তোমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়, আমাকে খবর দেওয়ার প্রয়োজন নেই... মার্কাসের লোক তোমাকে ঘিরে থাকবে।
এলেনার বুকটা ধক করে উঠল। সে নিকের চোখের দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—আ-আপনি কি আবার আমাকে ট্র্যাপে ফেলছেন?
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই বিখ্যাত চতুর হাসি।
—ট্র্যাপ নয় এলেনা... এটাকে বলে একচ্ছত্র অধিকার।
এলেনা আর কিছু না বলে তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল। সে দ্রুত পায়ে বাসের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় একবার পেছন ফিরে তাকাল। সেই বিশাল কালো গাড়িটার জানালার ওপাশে সানগ্লাস পরা নিকোলাস ক্যাস্তিলো শান্তভাবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।বাসের কাছে পৌঁছাতেই জেসিকা ছুটে এসে এলেনাকে জড়িয়ে ধরল।
—এলেনা! তুই ঠিক আছিস তো? উফ! কাল থেকে আমার যা অবস্থা গেছে! তুই সত্যি আস্ত ফিরে এসেছিস?
এলেনা জেসিকার কাণ্ড দেখে মুচকি হাসল।
—আরে থাম! আমি একদম ঠিক আছি। চল, বাসে উঠি।
দুই বন্ধু বাসে গিয়ে তাদের পুরানো সিটটায় বসল। বাস চলতে শুরু করল নিজ শহরের উদ্দেশ্যে। সমুদ্রের সৈকত, নোনা বাতাস আর সেই নীল পানি ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে বাস এগিয়ে যেতে লাগল।এলেনা জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তার হাতে কাল রাতের সেই ছোট্ট কাগজের টুকাটা, যেটা নিক তার ব্যাগে গুঁজে দিয়েছিল।কাগজটিতে নিকের নিজের হাতের নিখুঁত অক্ষরে লেখা—
"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."(তুমি অন্ধকারের অংশ এলেনা, আর আমিই তোমার একমাত্র আলো।)
এলেনা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। সে বুঝতে পারল, তার সাধারণ জীবনের দিনগুলো হয়তো চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া দানবটির এই অন্ধ ভালোবাসায় সে নিজেকে সঁপে দিতে আর ভয় পাচ্ছে না।দূর থেকে, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো গাড়িটার ভেতর থেকে নিকোলাস ক্যাস্তিলো চলন্ত বাসটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুলের মাঝে ঘুরে চলেছে সেই কালো পাথরের রোজারি।
—চলুন বস, 
মার্কাস বলল।নিক চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করে শান্ত গম্ভীর গলায় বলল,
—হ্যাঁ। এবার খেলা শুরু করার সময় হয়েছে।
বাসের চাকাগুলো মহাসড়কে ঘুরতে শুরু করেছে। শহরের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে আসছে, আর জানালার কাঁচ ঘেঁষে পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে স্পেনের দীর্ঘ রাস্তার ধারের পাইন গাছগুলো।বাসের ভেতরের বাকি স্টুডেন্টদের মাঝে হৈচৈ আর ফেরার আনন্দ স্পষ্ট। কিন্তু তিন নম্বর সিটে বসে থাকা জেসিকার উসখুস ভাব যেন ক্রমশ বাড়ছিল। সে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিল, তারপর এলেনার হাতের দিকে তাকাল—যেখানে নিকের রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট চিরকুটটা লুকানো।
সবশেষে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে জেসিকা এলেনার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো। সে চোখ দুটি ছোট ছোট করে, অত্যন্ত গম্ভীর ও সন্দেহী গলায় বলে উঠল—
—এই! এবার আসল কথাটা বল তো? লোকটা কে হয় তোর? আর তোর ব্যাপারটাই বা কী? কালকে থেকে আমি পুরো পাগল হতে বসেছিলাম, আর তুই কোনো কথাই বলছিস না!
এলেনা চমকে উঠে জেসিকার দিকে তাকাল। হাত থেকে চিঠিটা প্রায় খসে পড়তে নিয়েছিল, সে তড়িঘড়ি করে তা ব্যাগের গোপন পকেটে গুঁজে ফেলল।
—ক-কিসের কথা বলছিস জেসু? 
এলেনা তোতলানোর চেষ্টা করল।
—আহা! ন্যাকামি করিস না তো! 
জেসিকা এলেনার হাত ধরে একটু ঝাঁকুনি দিল। 
—ওই লোকটা... যে কাল তোকে ওই স্পিডবোটের মাফিয়া টাইপ গুন্ডাদের হাত থেকে টেনে আনল, যে তোকে নিজের বিলাস বহুল প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে গায়েব করে রাখল! আর আজ সকালে তোকে ফেরত দিতে এলো বিশাল ব্ল্যাক এসইউভির ক্যাভালকেড নিয়ে, সুট-বুট পরা সিকিউরিটি গার্ডদের পাহারা দিয়ে... ওই লোকটা কে?
এলেনা জানালার বাইরের দিকে মুখ ফেরাতে চাইল, কিন্তু জেসিকা তার চিবুক ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
—না, আজকে কোনো অজুহাত চলবে না এলেনা! লোকটার চোখের চাহনি দেখছিস তুই? যখন সে তোকে বাসের কাছে নামিয়ে দিচ্ছিল, ওরকম দৃষ্টি কোনো সাধারণ মানুষ অন্য কারো দিকে দেয় না! লোকটা তোর দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তোকে পুরো পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের পকেটে ভরে রাখবে! আর তুইও তো চুপচাপ তার আদেশ মেনে গাড়িতে বসে ছিলি... একটা শব্দও বলিসনি লোকটাকে! তোর এই নীরবতার রহস্য কী?
এলেনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, জেসিকার কাছ থেকে সবকিছু বেশিদিন লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু নিকোলাস ক্যাস্তিলোর আসল পরিচয়—সে যে স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া সিন্ডিকেটের ডন—এই সত্যিটা জেসিকাকে বললে সে ভয়ে জ্ঞান হারাবে।এলেনা জেসিকার দিকে তাকিয়ে স্বর একবারে নিচু করে ফেলল।
—জেসু... প্লিজ একটু আস্তে বল। বাসের কেউ যেন না শোনে।
—বলবি তো কী হয়েছে? 
জেসিকাও গলার স্বর কমিয়ে ফিসফিস করে উঠল।
—উনার নাম... নিক। নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
—ক্যাস্তিলো?
জেসিকার চোখ দুটি বড় বড় হয়ে গেল। সে একটু ভেবে বলল, —দাঁড়া, এই নামটা যেন কোথায় শুনেছি! স্পেনের বিজনেজ ম্যাগাজিনে... নাকি ডনদের তালিকায়? এলেনা, উনি কি সত্যি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী? নাকি অন্য কিছু?
—উনি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী একজন মানুষ, জেসু, 
এলেনা চোখ নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল। 
—উনার শত্রুর অভাব নেই। কাল যারা আমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল, তারা আসলে নিককে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য আমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
—তোকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল? তার মানে... তার মানে লোকটা তোকে চেনে? 
জেসিকা চোখ বুজে এক হাত কপালে দিল। 
—ও মাই গড, এলেনা! তুই এই ভয়ংকর চক্রে কীভাবে জড়ালি? তুই তো শুধু একজন সাধারণ স্টুডেন্ট!
—আমি নিজেও জানি না জেসু, 
এলেনার কণ্ঠে এবার সত্যি এক করুণ সুর ফুটে উঠল। 
—আমি জানতাম না উনি এত দূর পর্যন্ত চলে আসবেন। কাল যখন আমি সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হয়েছিল আমার জীবন শেষ। কিন্তু উনি নিজের জীবন বাজি রেখে পানির নিচে নেমে আমাকে তুলে এনেছেন।
জেসিকা এলেনার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। গালে চড়ের হালকা দাগটা সে আগেই লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি। সে এলেনার গালে হাত ছুঁয়ে বলল—
—তোকে আঘাত করেছে ওরা, তাই না?
—ওটা কিছু না, 
এলেনা মিথ্যা বলল। সে চায় না জেসিকা জানুক চড়টা নিক নিজে মেরেছিল। 
—কিন্তু জেসু... আমি ভয় পাচ্ছি। লোকটা আমাকে বলেছে, আমি নাকি ওর 'একচ্ছত্র অধিকার'। আমি চাইলেও আর উনার ছায়া থেকে বের হতে পারব না।
জেসিকা কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইল। তারপর সে এলেনার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
—এলেনা, তুই কি ওই লোকটাকে ভালোবাসিস? নাকি ভয় পাস?
এলেনা এই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারল না। সে জানালার কাঁচের বাইরে তাকাল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিকের সেই অন্ধকার ধোঁয়াটে ধূসর চোখ দুটো, তার শক্ত বুকের স্পর্শ, আর সেই গভীর গলায় বলা কথাগুলো—"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."
—আমি জানি না জেসু, 
এলেনা ফিসফিস করে বলল। 
—উনাকে দেখলে আমার ভয় করে, উনার ক্ষমতা আর হিংস্রতা আমাকে শিহরিত করে... কিন্তু কাল রাতে যখন আমি উনার বুকে মাথা রেখেছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—এই পৃথিবীতে এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথাও হতে পারে না।
জেসিকা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তোর অবস্থা তো দেখছি মারাত্মক, এলেনা। লোকটা দানব হতে পারে, কিন্তু সেই দানবটা তোর প্রেমে পুরোপুরি পাগল। তবে মনে রাখিস... মাফিয়াদের জগৎ কিন্তু রক্তের গল্পে লেখা হয়। একটু সামলে চলিস।
এলেনা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—আচ্ছা এলি,লোকটার সাথে তোর দেখা হলো কিভাবে?
—He is my stepbrother. 
—কি!!!!
বাসের সিট থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল জেসিকা। চোখ দুটি ছানাবড়া করে, হাঁ করে কিছুক্ষণ এলেনার দিকে তাকিয়ে রইল সে। বাসের পেছনের সারি থেকে দুজন ছাত্র ঘুরতেই জেসিকা তড়িঘড়ি করে নিজের মুখটা ঢেকে এলেনার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল।
—কী বললি তুই?! স্টেপ-ব্রাদার?! মানে তোর সৎ ভাই?! তোর মাথা কি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে এলেনা? স্পেনের এই ভয়ংকর, মাফিয়া লুকিং লোকটা তোর স্টেপ-ব্রাদার?!
এলেনা দু-আঙুলে নিজের কপাল চেপে ধরল। সে জানত জেসিকার প্রতিক্রিয়া এমনই হবে।
—আস্তে জেসু, প্লিজ! বাসের সবাই শুনে ফেলবে।
—আরে রাখ তোর বাসের সবাই! 
জেসিকা ফিসফিসিয়ে এক প্রকার গর্জে উঠল। 
—যে লোকটা তোকে উদ্ধার করতে স্পিডবোট নিয়ে মাফিয়া স্টাইলে হামলা চালাল, যে তোকে নিজের প্রাসাদে আটকে রেখে ঠোঁটে কপালে চুমু দিয়ে বলছে 'ইউ বিলং টু মি', সেই লোকটা তোর স্টেপ-ব্রাদার?! এটা কোন ধরনের গল্প শুনি?
এলেনা জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতীতের সেই তেতো দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
—আমার মা স্পেনের এক নামকরা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন—সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো। নিকোলাস ক্যাস্তিলো সেই চার্লস ক্যাস্তিলোরই প্রথম পক্ষের একমাত্র ছেলে।আর আমি সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলোর দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে।
—ও মাই গড... 
জেসিকা দু-হাতে মুখ ঢাকল। 
—তার মানে তোদের সম্পর্ক রক্তের ভাই-বোনের?
— হয়তো তা-ই, 
এলেনা নিচু গলায় বলল। 
—কিন্তু নিক কখনো আমাকে বোন হিসেবে দেখেনি, জেসু। প্রথম দিন যেদিন আমি ওই বিশাল ক্যাস্তিলো ম্যানশনে পা দিয়েছিলাম, সেদিন থেকে ওই ধূসর চোখ দুটো আমাকে রক্তের সম্পর্কে বাঁধেনি... বেঁধেছে এক আদিম আর ভয়ংকর শিকলে।
—কিন্তু তোর মা আর তার বাবা? উনারা কিছু বলেননি?
এলেনা দু-আঙুলে নিজের কপাল চেপে ধরল। সে জানত জেসিকার প্রতিক্রিয়া এমনই হবে। সে বাসের বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতীতের সেই তেতো দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
—আমার মা মারা গেছে জেসু...
এলেনার কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্য একদম নিভে এলো।
—মা মারা যাওয়ার পরই তো আমার এই সাজানো-গোছানো পৃথিবীটা চুরমার হয়ে গেল। মা চলে যাওয়ার পর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছিলাম। তাই তো বাবা আমাকে নিজের কাছে, এই স্পেনে নিয়ে এলেন।
জেসিকার মুখের রাগের ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে বিষাদে বদলে গেল। সে এলেনার একটা হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে বলল—
—ওহ এলি... তোর মা মারা গেছেন? আই অ্যাম সো সরি! কিন্তু তোর বাবা? সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো তো এত বড় একজন প্রভাবশালী মানুষ! উনি কিছু বলেন না? নিকোলাস যে তোর সাথে এমন একটা অদ্ভুত আর হিংস্র আচরণ করে, তোর বাবা কি তা জানেন না?
এলেনার ঠোঁটের কোণে এক বিষাদময় তিতা হাসি ফুটে উঠল। সে হাত দিয়ে জানালার ঝাপসা কাঁচটা হালকা মুছে নিয়ে বলল—
—বলবেন না কেন? বাবা নিককে কম বকাঝকা করেননি! কতবার যে ওদের দুজনের মধ্যে এই নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি আর অশান্তি হয়েছে, তার হিসাব নেই। বাবা নিককে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন আমি এই পরিবারের মেয়ে, আমার সাথে যেন ও নিজের ক্ষমতার দাপট না দেখায়। কিন্তু...
—কিন্তু কী এলি?
জেসিকা প্রায় শ্বাস আটকে জিজ্ঞেস করল।
—নিক কারো কথা শোনে না জেসু,
এলেনা চোখ বুজে মাথাটা বাসের সিটে এলিয়ে দিল।
—বাবা যতবারই ওকে বকেন বা থামানোর চেষ্টা করেন, নিক ততবারই আরও উগ্র হয়ে ওঠে। ক্যাস্তিলো পরিবারের আসল শক্তি, ব্যবসা আর অন্ধকার জগতের পুরো চাবিটা এখন নিকের হাতে। বাবা চেষ্টা করেও ওকে নিজের সীমানায় বেঁধে রাখতে পারেননি। নিক বাবার মুখোপোড়ি সব বারণ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। প্রথম দিন থেকেই সে বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—আমি ওর বোন নই, আমি শুধুই নিকোলাস ক্যাস্তিলোর একমাত্র দুর্বলতা আর দখল করা সম্পত্তি।
—ওহ মাই গড! ভাই, আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না এলি!
জেসিকা দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার গলার স্বর ভয়ে আর উত্তেজনায় কাঁপছিল।
—এটা কোন ধরনের পাগলপন্তী! একদিকে তোর মা নেই, তুই একটা অচেনা দেশে একা... আর অন্যদিকে স্পেনের সবচেয়ে ভয়ংকর লোকটা তোর বাবার বকাঝকাকে পাত্তা না দিয়ে তোকে নিজের জালে এভাবে আটকে রেখেছে! তুই এই নারকীয় সম্পর্কের মধ্যে কীভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছিস এলি?
এলেনা ক্ষণিকের জন্য চুপ হয়ে গেল। সে নিজের ব্যাগটার গোপন পকেটে হাত রাখল, যেখানে নিকের লেখা সেই চিরকুটটা রাখা আছে—*"You belong to the Dark, Elena. And I am your only light."*
—আমি জানি না জেসু...
এলেনা ফিসফিস করে বলল।
—নিকের প্রতিটা পদক্ষেপ, তার রাগ আর এই বাঁধ ভাঙা অধিকারবোধ আমাকে আতঙ্কিত করে। বাবা ওকে বকলে ও আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যি বলতে কি... কাল রাতে যখন আমি ওর বুকে মাথা রেখেছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—এই পুরো পৃথিবীতে এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আমার জন্য আর কোথাও হতে পারে না।
জেসিকা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, এলেনার জীবনের এই জটিল গল্পের রূপরেখা সাধারণ কোনো হিসেবে মিলবে না।বিকেলের সোনাঝুড়ি রোদ যখন শহরের রাস্তায় এসে পড়েছে, তখন বাসের চাকা এসে থামল কলেজের মূল ফটকের সামনে। স্টুডেন্টদের নামার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে।এলেনা আর জেসিকা বাস থেকে নিচে নেমে এলো।
—তুই কি আমার সাথে হোস্টেলে যাবি, এলি?
জেসিকা অত্যন্ত চিন্তিত চোখে তাকাল।
—না, জেসু। আমি বাড়ি ফিরব।
এলেনা মৃদু হাসল। কিন্তু বাস থেকে নামতেই সে দেখতে পেল—গেটের ঠিক বাইরে দুটি ধবধবে কালো মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে আছে। সুট-বুট পরা দুজন দীর্ঘকায় সিকিউরিটি গার্ড সোজা তাকিয়ে আছে এলেনার দিকে।জেসিকা লোকগুলোকে দেখে গলায় থুতু গিলে বলল—
—এলি... ওরা কি...?
—হ্যাঁ, জেসু। ওরা নিকের লোক।
এলেনা জেসিকাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল—
—তুই সাবধানে যাস। আমি তোকে পরে কল করব।
জেসিকা বিদায় নিয়ে চলে যেতেই এলেনা ধীর পায়ে কালো গাড়িটার দিকে হেঁটে গেল। গাড়িটার কাছে পৌঁছাতেই গার্ড অত্যন্ত বিনীতভাবে পেছনের দরজা খুলে দিল।
—ওয়েলকাম ব্যাক, মিস এলেনা। মিস্টার ক্যাস্তিলো আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
এলেনা এক মুহূর্তের জন্য পেছনের মুক্ত আকাশটার দিকে তাকাল, তারপর এক গভীর নিশ্বাস ফেলে গাড়িটার ভেতরে উঠে বসল।বিশাল কালো গাড়িটা যখন ক্যাস্তিলো ম্যানশনের বিশালাকার প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। গাড়ি থেকে নেমে এলেনা ম্যানশনের ভেতরে পা রাখল। প্রাসাদসম এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় যেন আভিজাত্য আর রাজকীয়তার ছাপ স্পষ্ট। মাথার ওপর ঝুলে থাকা বিশালাকার ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়ছে সোনালী আলো, দামি মার্বেলের মেঝেতে এলেনার পায়ের জুতো হালকা শব্দ তুলল।
ড্রয়িং রুমের বিশাল ও অভিজাত সোফায় বসে ছিলেন সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো। হাতে তার চুরুট আর সামনের টেবিলে কিছু বিজনেস ফাইল। এলেনাকে ঢুকতে দেখে তিনি চুরুটটা অ্যাশট্রেতে নামিয়ে রাখলেন। তার গম্ভীর মুখে এক চিলতে প্রশান্তির ছায়া ফুটে উঠল।
—ট্রিপ কেমন ছিল মা?
সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলোর কণ্ঠস্বরে একজন বাবার চিরাচরিত আবেগ ও চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
এলেনা মৃদু হেসে বাবার দিকে এগিয়ে গেল। সে জানে, এই মানুষটা তাকে কতটা ভালোবাসেন, কিন্তু তার নিজের ভাগ্যটাই যে এমন এক জালে আটকা পড়ে আছে যা কাটানোর ক্ষমতা বাবারও নেই। এলেনা শান্ত গলায় উত্তর দিল—
—ভালো, বাবা।
—হুম। অনেক ক্লান্ত লাগছে তোকে। আচ্ছা, তুমি রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে রেস্ট নাও। রাত্রে ডিনার টেবিলে কথা হবে।
—ঠিক আছে বাবা।
এলেনা আর কথা না বাড়িয়ে বিশাল রাজকীয় সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল। দ্বিতীয় তলার একপাশে তার সুসজ্জিত রুমটি। রুমে ঢুকে এলেনা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সারা দিনের ধকল আর জার্নির ক্লান্তিতে শরীরটা যেন আর চলছিল না।
---
রাত তখন প্রায় দশটা।এলেনা বাথরুম থেকে গরম পানির শাওয়ার নিয়ে বের হলো। পরনে তার শুধু শরীর পেঁচিয়ে রাখা একটি সাদা তোয়ালে। তোয়ালের সুতো বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরে পড়ছে মেঝের ওপর। হাতে আরেকটা ছোট তোয়ালে দিয়ে সে নিজের ভেজা চুলগুলো মুছছিল আর আপন মনে মৃদু স্বরে গান গাইছিল। ঘরে ড্রেসিং টেবিলের নরম হলুদ আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই।
হঠাৎ করেই ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল।
ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষতে ঘষতেই এলেনার গায়ের প্রতিটা লোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল। এক অদ্ভুত পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়া দেখে এলেনা থমকে গেল। সে চমকে উঠে পেছনে তাকাতেই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ধীর পায়ে হেঁটে সামনে এলো এক দীর্ঘকায় পুরুষ।
পরনে তার রাজকীয় কালো সিল্কের শার্ট আর ট্রাউজার্স, শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা। চোখে সেই বিখ্যাত ধূসর-কালো শীতল দৃষ্টি, আর ঠোঁটের কোণে বাঁকা ও ভয়ংকর এক চতুর হাসি।
নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
নিক ধীরপায়ে এলেনার দিকে এগিয়ে এলো। এলেনা ভয়ে বুক চেপে ধরে এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু পিঠ ঠেকে গেল পেছনের ঠাণ্ডা দেয়ালটাতে।
নিক এলেনার একদম গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। তার ধূসর চোখের দৃষ্টি সোজা এসে থামল এলেনার খোলা কাঁধ, ভেজা চুল আর তোয়ালে পেঁচানো শরীরের ওপর। নিক হাত বাড়িয়ে এলেনার ভেজা চুল থেকে পানির একটা ফোঁটা নিজের আঙুলে তুলে নিল, তারপর এলেনার কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে বরফশীতল অথচ গভীর গলায় ফিসফিস করে উঠল—
—Welcome to hell, my little sister...
কথাটা এলেনার কানের ভেতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো শিরদাঁড়ায় গিয়ে আঘাত করল। এলেনার বুকটা দ্রুত ওঠা-নামা করতে লাগল। সে তোয়ালেটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাপা গলায় বলল—
—নি-নিক?! আপনি... আপনি আমার রুমে কী করছেন?! বাবা নিচে আছেন! আপনি এখান থেকে যান!
নিকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া আর ভয়ংকর হয়ে উঠল। সে নিজের বুড়ো আঙুলটা এলেনার ঠোঁটের ওপর আলতো করে ছুঁইয়ে দিল।
—বাবা?
নিক এক চিলতে উপহাসের হাসি হেসে বলল,
—সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো নিচে আছেন বলেই তো খেলাটার আনন্দ আরও বেশি, এলেনা। সে মনে করে এই বাড়িতে তোমাকে সে নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছে... কিন্তু সে ভুলে গেছে, এই ক্যাস্তিলো ম্যানশনের প্রতিটা ইঁট আর পাথরের মালিকও নিকোলাস ক্যাস্তিলো।
—আপনি প্লিজ বের হন!
এলেনা তোতলাতে তোতলাতে বলল।
—আমি ড্রেস চেঞ্জ করব... প্লিজ!
নিক এক চুলও সরাল না। তার শক্ত হাতটা সোজা গিয়ে থামল এলেনার নগ্ন কাঁধের ওপর। তার স্পর্শের উত্তাপ এলেনার শরীরের কাঁপুনি আরও বাড়িয়ে দিল। নিক এলেনার চোখে চোখ রেখে ধীর ও গম্ভীর গলায় বলল—
—আজ রাতে এখান থেকে বের হওয়ার জন্য আসি নি এলেনা। তোমাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি—তুমি যাকেই তোমার রক্ষাকর্তা ভাবো না কেন, এই ঘরের বন্ধ দরজার আড়ালে তুমি শুধুই আমার।
এলেনার কপালে জমতে থাকা পানির ফোঁটাগুলো ভয়ের তীব্রতায় জমে বরফ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তোয়ালের হালকা সীমানা ভেদ করে নিকের শক্ত, উষ্ণ বুকের স্পর্শ তার অস্তিত্বকে যেন কাঁপিয়ে তুলছিল। নিকের ধূসর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আটকে আছে এলেনার ফ্যাকাশে ঠোঁট আর ভেজা গলার ওপর।
—নি-নিক... আপনি কী করছেন?! প-প্লিজ দূরে সরুন!
এলেনা কাঁপা হাতে নিকের চওড়া বুক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নিকোলাস ক্যাস্তিলো নামক এই পাহাড়সম মানুষটাকে এক চুলও নাড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব। নিক কোনো কথা না বলে এলেনার কোমরটা এক হাতে পেঁচিয়ে ধরে নিজের দিকে এক ঝটকায় টেনে নিল। এলেনার শরীরটা এসে আছড়ে পড়ল নিকের শক্ত বুকে। তোয়ালের পেছনের গিঁটটা যেন যেকোনো মুহূর্তে খসে পড়বে।
নিক তার ভেজা চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে এক দীর্ঘ শ্বাস নিল। তার ঠোঁটের উষ্ঞ পরশ এলেনার নগ্ন কাঁধ থেকে ধীরে ধীরে কানের লতি স্পর্শ করল। নিকের গম্ভীর, মাতাল করা কণ্ঠস্বর এলেনার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উঠল—
—তোমাকে এই অবস্থায় দেখে দূরে সরে যাওয়ার মতো পুরুষ নিকোলাস ক্যাস্তিলো নয়, এলেনা। তুমি কী ভেবেছিলে? তোয়ালে পেঁচিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে আর আমি সাধু পুরুষ হয়ে বেরিয়ে যাব?
এলেনার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে দুই হাতে নিজের বুক ঢেকে রাখা তোয়ালেটা আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে উঠল—
—নিক, প্লিজ... আমি আপনার বোন না হলেও আপনার অধিকার তো নেই আমার ওপর! এমন করবেন না...
—অধিকার?
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক, মাতাল হাসি। সে এক হাতে এলেনার থুতনিটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই এলেনার ভেজা, কাঁপা ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে বসাল।
এলেনা চোখ দুটি শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। নিকের তীব্র, হিংস্র অথচ ব্যাকুল চুম্বন তাকে এক মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিল। নিকের হাতের বাঁধন এলেনার কোমরে আরও শক্ত হয়ে উঠতে লাগল, তার শরীরটা ধীরে ধীরে এলেনাকে একদম বিছানার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে শুরু করল।
নিকের স্পর্শের উত্তাপ এলেনার শরীরের সমস্ত ভয়, প্রতিরোধ আর মানসিক শক্তিকে যেন এক এক করে গলিয়ে দিচ্ছে। এলেনা বুঝতে পারছে—আজকের এই অন্ধকারে, এই বন্ধ ঘরের আড়ালে নিকোলাস ক্যাস্তিলোর এই সর্বগ্রাসী ভালোবাসার আগুন থেকে তাকে বাঁচানোর আর কেউ নেই...
তোয়ালে পেঁচানো এলেনাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে রাজকীয় কিং-সাইজ বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলল নিক। বিছানার নরম তোষকে পিঠ ঠেকতেই এলেনা ভয়ে সামলে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই নিকোলাস ক্যাস্তিলো চিতাবাঘের মতো তার ওপর চেপে বসল।
—নি-নিক... না! প্লিজ!
এলেনার আকুতি নিকের কানে পৌঁছালই না। নিকের এক হাতের হিংস্র টানে এলেনার গায়ে জড়িয়ে থাকা তোয়ালেটা এক মুহূর্তে খসে গিয়ে মেঝের ওপর গিয়ে পড়ল। এলেনা ভয়ে দু-হাতে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু নিক তার দুটো কব্জি একসাথে ধরে মাথার ওপর বিছানায় শক্ত করে চেপে ধরল।
নিকের ধোঁয়াটে ধূসর চোখে তখন এক পৈশাচিক উন্মাদনা। সে কোনো সুযোগ না দিয়েই এলেনার উন্মুক্ত গলায়, নগ্ন কাঁধে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। নিকের তীব্র, হিংস্র ও ব্যাকুল স্পর্শের তাপে এলেনার শিউরে ওঠা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। এলেনার ফিসফিসানি আকুতি ধীরে ধীরে এক অজানা অনুভূতির আবেশে মিশে যেতে লাগল।
রাত তখন প্রায় একটা।ঘরের ভেতরে কেবল এলেনার ক্লান্ত, অনিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ। ড্রেসিং টেবিলের হালকা আলোয় পুরো ঘর যেন এক মায়াবী অথচ নারকীয় রূপ নিয়েছে। বিছানার একপাশে এলোমেলো চাদরের ওপর এলেনা আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে।
টানা কয়েক ঘণ্টার এই অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের ধাক্কায় এলেনার অবস্থা এখন মারাত্মক খারাপ। শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র অবসাদ আর ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। তার ফ্যাকাশে মুখটা এখন চরম উত্তেজনায় ও যন্ত্রণায় লাল হয়ে আছে, কপালে আর বুকে জমে আছে ঘামের বিন্দুকণা। ক্লান্তিতে চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছে, সে যেন প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম।
নিক তখনও বিছানায় তার পাশে বসে। কালো সিল্কের শার্টটা ঢিলেঢালাভাবে পরা, উসকোখুসকো চুলে তাকে লাগছে এক তৃপ্ত বিজয়ীর মতো। সে আঙুল দিয়ে এলেনার লাল হয়ে থাকা গালে ভেজা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল।
নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই অন্ধকার, চতুর হাসি। সে এলেনার লাল হয়ে আসা আধবোজা ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—
—জ্ঞান হারিয়ে ফেলো না, মাই লাভ... এটা তো কেবল শুরু। প্রতিটা রাতে, এই ক্যাস্তিলো ম্যানশনের বন্ধ দরজার আড়ালে তুমি ঠিক এভাবেই আমার ভালোবাসায় নিঃশেষ হবে।
এলেনা নিকের দিকে তাকানোর মতো শক্তিটুকুও আর খুঁজে পেল না। তার অক্ষিপট ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো, আর সে নিকের বুকের ওপর ঢলে পড়ে সম্পূর্ণ চেতনার বাইরে তলিয়ে গেল...
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা তখন পুরো ক্যাস্তিলো ম্যানশনকে গ্রাস করেছে। ঘরের ভেতরের ধোঁয়াটে পরিবেশে কেবল এলেনার ক্লান্ত, অনিয়মিত নিঃশ্বাসের ওঠানামা।
নিক এলেনাকে বুকের আরও কাছাকাছি টেনে নিল। এলেনার অচৈতন্য, ঢলে পড়া শরীরটার উষ্ণতা তার বুকে এক অন্যরকম অধিকারবোধের প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। নিকের লম্বা আঙুলগুলো ধীরগতিতে এলেনার পিঠের ওপর থেকে মাথার চুলে নেমে এলো। সে এলেনার কপালে জমতে থাকা ঘামের ফোঁটাগুলো নিজের শার্টের হাতা দিয়ে আলতো করে মুছে দিল, তারপর তার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রইল বহুক্ষণ।
—তুমি কোনোদিন আমার থেকে পালাতে পারবে না, এলেনা... কোনোদিন না, —নিকের স্বর এখন প্রায় অস্পষ্ট, এক গভীর নেশাক্ত ফিসফিসানি।
হঠাৎ করেই ম্যানশনের নিচতলা থেকে ভারী জুতো পায়ে কারো হেঁটে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। সেবাস্তিয়ান ক্যাস্তিলো বোধহয় এখনও জেগে আছেন, অথবা ম্যানশনের নাইট সিকিউরিটি তাদের নিয়মিত রাউন্ডে বেরিয়েছে।
নিকের ধূসর চোখে মুহূর্তের জন্য তীব্র সতর্কতার ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু তা পরক্ষণেই আবার শান্ত, হিমশীতল ভাবমূর্তিতে ফিরে এলো। সে এলেনার ওপর থেকে পাতলা, রাজকীয় সিল্কের চাদরটি একদম গলা পর্যন্ত টেনে দিল, যাতে এলেনার গায়ের লাল দাগগুলো চাদরের আড়ালে ঢেকে যায়।
নিক বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। নিজের কালো সিল্কের শার্টের বোতামগুলো একে একে আটকে নিতে নিতে সে একবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের চেহারায় ফুটে ওঠা বিজয়ীর তৃপ্তি সে নিজেই দেখল।
সে ধীর পায়ে বারান্দার স্লাইডিং ডোরের দিকে এগিয়ে গেল। কাঁচের দরজাটা সামান্য সরাতেই রাতের ঠাণ্ডা বাতাস ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল, যা এলেনার ক্লান্ত শরীরে লেগে তার ঘুমকে আরও গভীর করে তুলল।
বারান্দায় পা রেখেই নিক পকেট থেকে একটি দামি সিগারেট বের করে ধরাল। লাইটারের ছোট আগুনটাতে তার ধূসর চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল। প্রথম টানের ধোঁয়া বাতাসে ছাড়তেই তার ফোনটা সাইলেন্ট মোডে কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে—মার্কাস।নিক ফোনটা কানে তুলল, তার কণ্ঠস্বর এখন আগের মতোই গম্ভীর ও নির্দয়।
—বলো, মার্কাস।
—বস, শহরের ডক এলাকায় যারা কাল ঝামেলা করেছিল, তাদের পেছনের আসল লোকটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে। স্প্যানিশ পুলিশ এখন ওই জায়গায় রেড দেওয়ার প্ল্যান করছে। যদি তারা সেখান থেকে কোনো ক্লু পায়, তবে সেবাস্তিয়ান স্যারকে রিপোর্ট পাঠাতে পারে।
নিক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে বলল—
—রেড দেওয়ার আগেই পুরো এলাকাটা ছাই করে দাও, মার্কাস। কোনো প্রমাণ বা কোনো মানুষকে যেন জ্যান্ত রাখা না হয়। ক্যাস্তিলো সাম্রাজ্যের চাবি যার হাতে, আইনও তার পেছনে হাঁটবে।
—জি, বস। সব কাজ শেষ করে আপনাকে জানাচ্ছি।
নিক ফোনটা কেটে দিয়ে সিগারেট শেষ করল। সে আবার ঘরে ফিরে এলো, শান্ত পায়ে হেঁটে এসে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ঝাপসা চোখে ঘুমিয়ে থাকা এলেনাকে দেখল। এলেনার মুখে এখনও হালকা লালচে আভা, ঠোঁট দুটো যন্ত্রণায় সামান্য ফাঁক হয়ে আছে।
নিক এলেনার গালে নিজের ঠান্ডা হাতটা ছুঁইয়ে দিল। এলেনা ঘুমের মাঝেই সামান্য শিউরে উঠে নিকের হাতটার দিকে মুখটা আরও একটু চেপে ধরল—যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই ভয়ংকর দানবটার স্পর্শেই সে চরম নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছে।
নিকের ঠোঁট জোড়া এলেনার কানের কাছে নেমে এলো—
—কাল সকালে যখন চোখ মেলবে, তখন নিজেকে আমার একচ্ছত্র সীমানায় আবিষ্কার করবে, মাই লিটল সিস্টার...
নিক নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে রাতের অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে গেল।
পরদিন সকাল ৮টা।এলেনার যখন ঘুম ভাঙল, ঘরের ভারী পর্দা সরিয়ে সকালে রোদের নরম আলো ভেতরে এসে পড়েছে। চোখ মেলতেই এলেনার সারা শরীরে এক তীব্র যন্ত্রণা ও অবসাদ ছড়িয়ে পড়ল। কাল রাতের সেই নারকীয়, অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের স্মৃতিগুলো এক এক করে মাথার ভেতর ভেসে উঠতেই সে ভয়ে শিউরে উঠল।
সে চাদরটা বুকের কাছে চেপে ধরে উঠে বসার চেষ্টা করতেই দেখতে পেল—বিছানার পাশে নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখা আছে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর নিকের সেই নিজস্ব পারফিউমের ঘ্রাণে মাখা একটি ছোট চিঠি।কাগজটিতে কালো কালিতে লেখা—
"Drink the water and take the medicines. You are mine to break, but you are also mine to protect. Get ready for breakfast."(পানিটা খেয়ে ওষুধগুলো নাও। তোমাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অধিকার যেমন আমার, তেমনই তোমাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমার। ব্রেকফাস্টের জন্য তৈরি হও।)
এলেনা কাগজটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে নিরবে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা পানি।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন