#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ০৩
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
🪷🪷🪷
পদ্ম যেই পিছনে ফিরলো, দেখতে পেলো ওর দাদী উস্তাদ ও তার ছেলেদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্ম এবার বেশ ঘাবড়ে গেল, এরা কি ওকে মাস্টার মশাই কে বাসে তুলে দিতে দেখে ফেলেছে??!... তাহলে তো সর্বনাশ!...
“দাদী আসলে আমি!..”
কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু দাদী পদ্ম কে কিছু বলতে না দিয়েই ওর বাহু ধরে টেনে আনলো। তারপর ওকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো ওদের বাড়ির দিকে।
“আয় আজ তুই, তারপর দেখ তোর সাথে এবার কি হয়। এক রত্তি মেয়ে, তার মাথায় এতো চালাকি বুদ্ধি। এইবার তোর মজা দেখাচ্ছি।..”
এই বলেই দাদী পদ্ম কে ধাক্কা মেরে ক্ষেতের মধ্যে ফেলে দিলেন। পদ্মর মা এগিয়ে এসে মেয়ে কে টেনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।
“পদ্ম কে কিছু বলবেন না মা।
ওকে ক্ষমা করে দিন, ও ভুল করে ফেলেছে।..”
পদ্মর মা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো। কিন্তু দাদী পদ্মর মায়ের কোনো কথাই শুনলেন না।
“ও শুধু রুপা কে সাহায্য করতে চেয়েছিল। ওকে ক্ষমা করে দিন মা।…”
কিন্তু দাদী পদ্মর মায়ের কোনো কথাই শুনছেন না। তিনি পদ্ম কে টেনে ধরে গলা টিপে ধরলেন।
“এই সর তুই, নিজেকে বেশি চালাক ভাবিস না। এবার আমি তোকে মেরেই ফেলবো।…”
দাদীর এমন টানাহেঁচড়ার মধ্যেই পদ্ম অস্থির হয়ে উঠলো। ওর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
“পদ্ম.. এমন করছিস কেন মা??!.. কষ্ট হচ্ছে?!.. কোথায় কষ্ট হচ্ছে?!.. এই নে এই নে এটা নে..”
এই বলে পদ্মর মা ওর দিকে একটা ইনহেলার এগিয়ে দিল। আসলে পদ্মর ছোট বেরা থেকেই অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে। কিন্তু ইনহেলার টা পদ্মর দাদী নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন।
“এটার জন্যই যত জ্বালা, এটার জন্যই যত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জানিনা কোন অশুভ সময়ে এমন একটা রোগ নিয়ে এই মেয়ের জন্ম হয়েছে। আর ওর বাবা ওকে সুস্থ করার জন্য সবার কাছে ধার করেছে। আজ না এই রোগের জন্যই তোকে মরতে হবে।..
“এমনটা বলবেন না মা, দয়া করে এমন টা বলবেন না। ও ছাড়া আমার আর কেই বা আছে , বলুন??!..”
“কত ভালোবেসে তোর বাবা তোর নাম রেখেছিল প্রানেশা রহমান পদ্ম। ভেবেছিল পদ্ম ফুলের মতোই তুই আমাদের ঘরে আলো সৌন্দর্য ছড়াবি। কিন্তু তুই তো এই পরিবারের অভিশাপ
হয়ে রয়ে গেলি। তোর জন্য আমাদের বাড়ি হারালাম, আমাদের জমি হারালাম। আর সবথেকে বড় কথা বাবা কে ঋণে ডুবিয়ে দিলি। আমার ছেলেটাকে পালাতে হলো, মা'র কাছ থেকে দূরে যেতে হলো। আজ তোকে ছারবো না।..”
দাদী বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন। পদ্ম ও তার মাও কাঁদছে।
“এমনটা বলো না দাদী, বলো না। আমার জন্য যা কিছু হারিয়েছে, ঐ সবকিছু আমি আবার ফিরিয়ে আনবো। আমি বাবার সব ঋণ শোধ করে দেবো।..”
পদ্ম জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলে উঠলো। ওর মা ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“আরে কোথা থেকে শোধ করবি?!.. তুই মেয়ে মানুষ রে , তুই মেয়ে মানুষ।..”
এই বলে দাদী আবারও পদ্ম কে মারতে লাগলেন। ওর মা কাঁদতে কাঁদতে ওর দাদী কে বাঁধা দিচ্ছে।
“যখন মেয়েদের নামের আগে রানী বলা হয়, তখন তাকে চাকরানী বলা হয়। ও নাকি আবার ঋণ শোধ করবে।..”
এই বলে পদ্মর দাদী ওদের মা মেয়ে কে ওভাবেই ফেলে রেখে চলে গেল। আর তারপর পদ্মর মা উঠে গিয়ে ইনহেলার টা কুড়িয়ে এনে দিলেন।
“নে মা শ্বাস নে, মুখ খোল , মুখ খোল।..”
এই বলে পদ্মর মা ইনহেলার দিয়ে পদ্ম কে শ্বাস নিতে সাহায্য করলো।
“তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে নাকি পদ্ম???..”
পদ্মর মা কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে কে বলে উঠলেন। পদ্ম মায়ের কোলে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল…
“আমাকে বাবা কথা দিয়েছিল যে তিনি ফিরে আসবেন। আর আমিও কথা দিয়েছিলাম যে বাবা ফিরে আসার আগেই আমি সব ঋণ পরিশোধ করে দেবো।
তারপর ঐ শামসু জোমাদ্দারের কাছ থেকে আমাদের জমি ফিরিয়ে আনবো।..”
“হ্যাঁ পদ্ম, আল্লাহ চাইলে আমরা অবশ্যই পারবো। তুই ঠিক সবকিছু ফিরিয়ে আনতে পারবি, আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের পাশে আছেন।..”
এই বলে পদ্মর মা মেয়ে কে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। ওরা মা মেয়ে ক্লান্ত হয়ে ওখানে ক্ষেতের মধ্যেই বসে রইল।
— — —
প্রচন্ড কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে কুসুমপুর গ্ৰাম। পদ্ম সেই কুয়াশা ভেদ করে সকাল সকাল নিজের পুরোনো সাইকেল টা নিয়ে এসেছে গ্ৰামের একমাত্র কুসুমপুর সহকারী ব্যাংক এ। যেখানে মানুষ কে লোন দেওয়া হয়। আর পদ্মও সেই আশাতেই এসে বারবার খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। তবে এবার পদ্ম নিশ্চিত যে ওদের লোন টা পাস হবেই হবে ইনশাআল্লাহ।
পদ্ম অফিস কক্ষের সামনে সাইকেল টা রেখে পাটের তৈরি ব্যাক টা নিয়ে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো।
“আরে মালতি কাকী, শুনলাম তুমি নাকি কাল থেকে গ্ৰামের বিকাশে যাচ্ছো। এই নাও এটা তোমার জন্য!...”
এই বলে পদ্ম ব্যাংকের এক মহিলা কর্মী কে একটা ছোট্ট উপহার দিল। আর তারপর অন্য একজন পুরুষ কর্মীর ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল।
“আর কাকা তুমি নাকি সামনের মাসে সেবা সম্পাদক হতে চলেছো। তাই এটা তোমার জন্য!..”
এই বলে সেই পুরুষ কর্মী কেও একটা উপহার দিল।
“আরে পদ্ম মা এগুলোর কি দরকার ছিল। তুমি এগুলো কেন আনলে?!...”
মন খারাপ করে মালতি নামের সেই মহিলা টা বলে উঠলো।
“আরে কেন আনবো না?!.. তোমরাও তো আমাকে খুশির চাবি দিতে চলেছো। যেটা দিয়ে আমি আমার ভাগ্যের তালা খুলবো।..”
পদ্ম মালতি কাকীর ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁসি মুখে বললো। তবে ওর এই কথা শুনে মালতি কাকী মন খারাপ করে মাথা নিচু করে নিল। পদ্ম সেটা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লো।
“কাকী, আমার লোন টা পাস হয়ে গেছে তাই না?!..”
কিন্তু মালতি কাকী পদ্মর কথার কোন উত্তর দিল না। পদ্ম এবার ঘুরে ঘুরে সবার দিকে তাকালো। সবাই মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে।
“কাকা, কাকা তোমরা কিছু বলছো না কেন??!... আমি আমার লোন টা পাচ্ছি তো কাকা?!...”
কাকা কিছু না বলে ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ বের করে পদ্মর হাতে দিলেন। পদ্ম সেটা দেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল…
“এই এই লাল কালি কেন?.. কাকা তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছিলে যে আমি এবার লোন টা পাবো। আর তারপর সেই টাকা দিয়ে আমাদের জমি টা ছাড়াবো।..”
পদ্ম কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো। ওর হাতের কাগজটিতে স্পষ্ট করে লেখা আছে রিজেক্ট!..
“কি করবো রে মা, তোর লোনের জন্য যে গ্যারান্টি দিয়েছিল না, এখন তো সে নিজেই পিছিয়ে গিয়েছে। তুই কাল গ্ৰামে ঐ বিয়েটা আটকে ছিলি না,সেই জন্য।…”
কাকা এই কথা বলে চুপ করে রইলো। আর পদ্ম বুক ভাঙ্গা কান্নায় ভেঙে পড়লো। এবারেও ওর ধোন টা পাস হয়েও হলো না। বাহিরে ঝুঁপঝুঁপিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর পদ্ম সেই বৃষ্টির মধ্যেই নিজের পুরোনো সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর যেতে যেতে ওর বাবাকে দেওয়া কথাগুলো মনে পড়ছে। আর ওতো আজকে শামসু জোমাদ্দার কেও বলেছে যে ওদের জমি ও কিনেই ছাড়বে। কিন্তু যে লোনের ভরসায় এই কথা বলেছিল, সেই শোন টাই যে ওর কপালে জুটল না। এবার মাকেই বা কীভাবে এই সত্য কথাটা বলবে?!..
এসব ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে পদ্ম একটা ভাঙাচোরা কুটিরে ঢুকলো। ওর মা ঘরের ভেতরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। পদ্ম কে দেখেই তিনি হাঁসি মুখে ওর দিকে এগিয়ে এলেন। ওর দাদী চটের বিছানায় বসে ওদের দিকে তাকিয়ে দেখছেন।
পদ্মর মা ওর সামনে এসে দাঁড়াতেই পদ্ম নিজের হাতে থাকা কাগজ টা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। পদ্মর চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ওর মা ভেজা চোখে মেয়ের কাঁধে হাত রাখলো।
“কিরে লোন পাস হয়ে গেছে?!.. তুই পেয়েছিস শোন?!.. আরে অলক্ষ্মী মুখপুরী তুই কি ভেবেছিল?!.. তুই এইভাবে বিয়ে গুলো থামিয়ে দিবি, এই গ্ৰামের সবার বিরুদ্ধে যাবি। আর ওরা তোর লোন পাস হতে দেবে?!??..”
দাদীর এই কথা শুনে পদ্ম ও তার মা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো। আসলে ওদের তো এখন আর বলার মতো কিছুই নেই।
“ব্যাস, অনেক হয়েছে, তুই এভাবে আমাদের অনেক অপমান করিয়েছিস। এখন আমি যা বলছি তোকে সেটাই শুনতে হবে। বুঝতে পেরেছিস?!..?..”
পদ্মর দাদী চিৎকার করে বলে উঠলেন। পদ্ম দাদীর কথায় কেঁপে উঠলো। ওর মা কান্না থামিয়ে বললো..
“আপনি একটু চুপ করুন না মা, এমনিতেই মেয়েটার মনটা ভালো নেই। এরমধ্যে আপনি দয়া করে এভাবে বলবেন না।..”
“মন ভেঙেছে মা, তবে মনোবল ভেঙে যায়নি। আমি আবারও চেষ্টা করবো, একবার ঠিক পাস হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না মা!..”
পদ্ম ভেজা চোখ মুছে মাকে সাহস দিয়ে বলে উঠলো। ওর মা মেয়ের কথা শুনে মন খারাপ করে বললেন..
“কি বল তো মা, আমাদের গরীব মানুষের কপালে না শুধু হারই লেখা থাকে।..”
বলতে বলতেই পদ্মর মায়ের চোখ আবারো ভিজে উঠলো। পদ্ম মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলল..
“না মা গরীব রা হারে না, হয়তো জেতে নয়তো শেখে। আর আমিও এটা শিখেছি যে জিদ নিজের কর্ম দিয়ে আসে। অন্য কারো উপরে ভরসা করে নয়।..”
“কিন্তু পদ্ম মা..”
“মা তুমি চিন্তা করো না, আমি আবার লোনের জন্য দরখাস্ত করবো। আর এইবার আমাদের জমি শামসু জোমাদ্দারের কাছ থেকে ছাড়িয়েই ছাড়বো।..”
পদ্ম মায়ের দু গালে ভরসার হাত রেখে বলে উঠলো। আর এরমধ্যেই দেখা গেলো শামসু জোমাদ্দার ও তার চ্যালারা পদ্মদের ঘরের সামনে এসে গিয়েছে। ওর ছেলেরা সাথে করে নিয়ে আসা গদি পেতে তার উপর চাদর বিছিয়ে দুপাশে দুটো কোল বালিশ দিয়ে দিল। আর তারপর শামসু জোমাদ্দার এসে সেখানে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ল।
“এই পদ্ম ফুল!..”
এই বলে চিৎকার করে পদ্ম কে ডেকে উঠল শামসু জোমাদ্দার। পদ্ম ঘরের ভেতরে থেকে চমকে উঠে মাকে ছেড়ে দাঁড়ালো।
“মা আমি এক্ষুনি দেখে আসছি।..”
এই বলে পদ্ম খড়কুটো ও ধানের নাড়া দিয়ে তৈরি একটা দোচালা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালো। আর তখন বাহিরে তাকিয়ে শামসু জোমাদ্দার ও তার চ্যালাদের দেখতে পেলো। ওদের এই সময়ে এখানে দেখে পদ্ম বেশ ঘাবড়ে গেল।
কালো রঙের স্যুট বুট পড়ে গদিতে বসে থাকা শামসু জোমাদ্দার দরজার সামনে পদ্ম কে দেখে চোখের কালো চশমা খুলে পদ্মর দিকে তাকালো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেল । এরমধ্যেই পদ্মর মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পদ্মর পিছনে দাঁড়িয়েছে।
“আপনি এই সময়ে এখানে কী করছেন??!..”
পদ্ম শামসু জোমাদ্দারের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলে উঠলো।
— — —
“সরি তোমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যাচ্ছি। কিন্তু কি করবো?!.. গ্ৰামের হসপিটাল সেন্টার, তাই আর্জেন্ট জয়েন করতে হচ্ছে। আর বাড়ির লোকজন এমনিতেই ভয় পেয়ে রয়েছে। আরে না না গ্ৰামে পোস্টিং এর জন্য নয়। আরে ওরা শুনেছে যে আমি যেই গ্ৰামে এ্যজ এ ডক্টর হিসেবে জয়েন করতে চলেছি। সেই খানে নাকি জোর করে ছেলেদের কে কিডন্যাপ করে জোর করে গ্ৰামের মেয়েদের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। প্রথাটার একটা নাম আছে বুঝলে।..”
আরমান গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে ব্লুটুথের মাধ্যমে কারো সাথে কথা বলছিল। আর এর মধ্যেই ওর গাড়ির গ্লাস দিয়ে একটা বন্দুক এসে ওকে নিজের টার্গেট বানালো। আরমান কথা বলার চক্করে পড়েই হয়তোবা গাড়িটি থামিয়ে ফেলেছিল। ও বেশ চমকে উঠে গাড়ির জানালার দিকে তাকালো।
“বাঁচতে চাইলে এক্ষুনি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসো।..”
বন্ধুক ধারী লোকটা গম্ভীর গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো। আরমান চমকে উঠে বিষয়টি বোঝার জন্য সাথে সাথে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ