ফন্ট সাইজ:
থিম:
পদ্মপাতা

৩৮তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#পদ্মপাতা~🪷

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ৩৮

🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

সুড়ঙ্গের ভারী পাথুরে দরজাটা যখন এক বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল, পদ্মর মনে হলো ওর কলিজাটা কেউ ছিঁড়ে ভেতরে রেখে দিয়েছে। সুড়ঙ্গের এপারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর ওপারে বিষাক্ত নীল কুয়াশার মাঝে ওর 'প্রাণ'—আরমান আলভীর।

“ডাক্তার মশাই!.. দরজা খুলুন!.. আরমান!...”

পদ্ম পাথরের গায়ে পাগলের মতো নখ দিয়ে আঁচড়াতে লাগল। ওর কান্নার শব্দ সুড়ঙ্গের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে।

মৃতপ্রায় জারা কোনোমতে দেওয়াল ধরে উঠে দাঁড়ালো। ওর বুক থেকে তখনো চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে।

“পদ্ম... কেঁদে লাভ নেই। আরমান ভাই জানে ও কী করছে। এই হীরেটা যদি আয়লা বেগমের হাতে পড়ে, তবে হাজার হাজার আরমান আর জারাকে মরতে হবে। আমাদের এগোতে হবে!...”

পদ্ম চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালো। ওর হাতে সেই মরণঘাতি নীল হীরেটা, যা এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় জ্বলছে।

“আপনি ঠিক বলেছেন জারা। ওনার ত্যাগের অপমান আমি হতে দেব না। চলুন!...”

সুড়ঙ্গের ওপারে, পাহাড়ের চূড়ায় তখন এক মৃত্যুপুরী।

নীল কুয়াশা বাতাসের সাথে মিশে চারপাশ আবছা করে দিয়েছে। আরমান নিজের শার্টের হাতা ছিঁড়ে নাক-মুখ চেপে ধরেছে। ওর চোখের মণি লাল হয়ে উঠছে অক্সিজেনের অভাবে। কিন্তু ওর হাতে তখন সেই অটোমেটিক রাইফেল, যা ও এক কমান্ডোর থেকে কেড়ে নিয়েছে।

হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নামল চারজন যমদূত। তাদের একজনের হাতে বিশেষ সোনালি মাস্ক। সে মাস্কটা খুলতেই আরমান থমকে গেল।

“মা?!...”

আরমান অস্ফুট স্বরে ডাকল।

দুবাই থেকে সরাসরি এই রণক্ষেত্রে হাজির হয়েছেন আয়লা বেগম। ওনার পরনে দামী ট্রাউজার আর লেদার জ্যাকেট। ওনার চোখে কোনো মাতৃত্ব নেই, আছে এক আদিম তৃষ্ণা।

“আরমান বাবা, বড্ড জেদ তোমার। হীরেটা দিয়ে দিলে আজ আমরা দুবাইয়ের বুর্জ খলিফায় বসে কফি খেতাম। কিন্তু তুমি বেছে নিলে এই পাথুরে পাহাড়ের মৃত্যু।…”

আরমান হাসল। ওর ফুসফুস তখন জ্বলে যাচ্ছে নীল গ্যাসের প্রভাবে।

“মা, কফি খাওয়ার চেয়ে এই পাহাড়ে দেশের জন্য মরা অনেক সম্মানের। হীরেটা এখন তোমার নাগালের বাইরে।…”

আয়লা বেগম ইশারা করতেই কমান্ডোরা আরমানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। আরমান পাথরের আড়ালে পজিশন নিল। ও জানত ও বেশিক্ষণ টিকবে না, কিন্তু ওকে সময় দিতে হবে—যাতে পদ্ম অনেক দূরে চলে যেতে পারে।

হঠাৎ পাহাড়ের ওপর দিয়ে এক বিশাল আলোর ঝলকানি দেখা গেল।

এটা কোনো হেলিকপ্টার নয়, এটা হলো ড্রোন স্কোয়াড্রন!.. নীলাঞ্জনা আর শায়ান গোপন ব্যাকআপ ফোর্স নিয়ে হাজির হয়েছে।

“আয়লা বেগম!.. সারেন্ডার করুন!.. ইন্টারপোল আপনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে!...”

লাউডস্পিকারে নীলাঞ্জনার গর্জন শোনা গেল।

আয়লা বেগম বুঝলেন ওনার সময় শেষ। তিনি নিজের কমান্ডোদের বললেন,

“আরমানকে জ্যান্ত ধরো!.. ও আমার শেষ ট্রাম্প কার্ড!...”

ওদিকে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছে পদ্ম দেখল এক বিশাল দিঘি। সেই দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো রঙের গাড়ি। গাড়ির পাশে এক বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন—যিনি আমিন সৈয়দের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তিনি হলেন আয়লা বেগমের বড় ভাই, দুবাইয়ের সেই আসল ডন— 'জাবেদ খান'।

“এসো খুকি। হীরেটা আমার হাতে দাও, আর তোমার ডাক্তার মশাইকে ফিরে পাও।…”

জাবেদ খান একটা ট্যাবলেট কম্পিউটার পদ্মর দিকে ঘুরিয়ে ধরল।

স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে আরমানকে।

আরমানকে কমান্ডোরা বেঁধে ফেলেছে,

আর ওর গলায় একটা ইনজেকশন পুশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে লিন্ডার সেই বেঁচে যাওয়া এক সহযোগী।

“ডাক্তার মশাই!...”

পদ্ম চিৎকার করে উঠল।

“বিনিময় হবে পদ্ম। হীরে দেবে নাকি ভালোবাসা নেবে?.?..”

জাবেদ খান হাসলেন।

পদ্ম হীরেটার দিকে তাকালো। হীরেটা এখন ওর হাতে তপ্ত আগুনের মতো লাগছে। ও জানত হীরেটা দিলে পুরো দেশ ধ্বংস হবে, আর না দিলে আরমান শেষ হয়ে যাবে।

পদ্ম হীরেটা উঁচিয়ে ধরল।

“আমার ডাক্তার মশাইয়ের এক ফোঁটা রক্ত যদি ঝরে, তবে আমি এই হীরেটা দিঘির তলায় ফেলে দেব!.. এই দিঘির নিচে এমন এক চোরাবালি আছে যা কোনোদিন কেউ খুঁজে পাবে না!...”

জাবেদ খান একটু থমকালেন।

“তুমি ধোঁকা দিচ্ছ মেয়ে!...”

“পরীক্ষা করে দেখবেন?.?...”

পদ্ম দিঘির জলের একদম কিনারে চলে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। আরমান কি নিজেকে উড়িয়ে দিল?.?.. নাকি অন্য কোনো মিরাকল হলো?.?..

পদ্ম আর জাবেদ খান—দুজনেই পাহাড়ের দিকে তাকালো। আগুনের শিখায় আকাশ তখন লাল।

— — —

পাহাড়ের চূড়ায় হওয়া সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দটা দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পদ্মর কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম করল। আগুনের একটা বিশালাকার গোল্লা রাতের আকাশকে মুহূর্তের জন্য রক্তিম করে দিল। দিঘির শান্ত জল সেই কম্পনে চঞ্চল হয়ে উঠেছে।

জাবেদ খান—দুবাইয়ের সেই কুখ্যাত ডন, যার ইশারায় বড় বড় সাম্রাজ্য কাঁপে—তিনিও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তার হাতের ট্যাবলেটে আরমানের সেই লাইভ ফিডটা ঝাপসা হয়ে তুষারপাতের মতো সাদা হয়ে গেল। কানেকশন লস্ট!

“আরমান!...’

পদ্মর চিৎকারটা বাতাসের গর্জনে মিশে গেল। ওর বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওই আগুনের শিখায় ওর অস্তিত্বটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ও দুই হাতে হীরেটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখের জল হীরেটার নীল গায়ে পড়ে মুক্তোর মতো ঝকঝক করছে।

জাবেদ খান দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে এলেন।

“মেয়ে!.. নাটক বন্ধ করো। হীরেটা আমার হাতে দাও। ওই বিস্ফোরণ তোমার ডাক্তার মশাইয়ের শেষ বিদায় হতে পারে, কিন্তু তুমি যদি বাঁচতে চাও, তবে ওটা আমাকে দিতেই হবে!...”

পদ্ম এবার ঘুরে দাঁড়ালো। ওর চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, আছে এক বিচিত্র অলৌকিক শান্ত ভাব। ও দিঘির জলের একদম কিনারে গিয়ে দাঁড়ালো, যেখানে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

“জাবেদ সাহেব, আপনি হীরে চান?.?.. যার জন্য আপনি নিজের ভাগ্নেকে মারতে দ্বিধা করেননি?.?.. যার জন্য হাজার হাজার মানুষের রক্ত ঝরিয়েছেন.?..? এই নিন আপনার হীরে!...”

পদ্ম হাতটা পেছনের দিকে নিল। জাবেদ খান চিৎকার করে উঠলেন, “না!.. ওটা ফেলো না!...”

ঠিক সেই মুহূর্তে দিঘির অপর পাড় থেকে একটা স্পিডবোটের শব্দ শোনা গেল। স্পিডবোট থেকে অন্ধকার চিরে একটা সার্চলাইট সরাসরি জাবেদ খানের চোখে এসে পড়ল।

“জাবেদ খান!.. হাত তুলুন!... বাংলাদেশ নেভি আর কোস্টগার্ড আপনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে!...”

কণ্ঠস্বরটা চেনা। ওটা শায়ানের গলা! কিন্তু শায়ান তো পাহাড়ের ওপরে ছিল?.?.. তবে কি পাহাড়ের সেই বিস্ফোরণটা ছিল এক বিশাল ডাইভারশন?.?..

জাবেদ খান পকেট থেকে রিভলভার বের করতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই একঝাঁক কমান্ডো জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে তাকে পজিশন করে ফেলল। জাবেদ খান বুঝলেন তার পাশা উল্টে গেছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,

“আয়লা... তুমি আমায় ডোবালে!..”

পদ্ম তখনো পাথরের মতো দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে। ও খুঁজছে একজনকে। ওর চোখ দুটো শুধু সেই আগুনের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ স্পিডবোট থেকে একটা দীর্ঘকায় অবয়ব দিঘির জলে ঝাঁপ দিল।

সাঁতরে সে তীরের দিকে আসছে।

পদ্মর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ওই চওড়া কাঁধ, ওই সাঁতরানোর ভঙ্গি... ওটা কি কোনো ভ্রম?.?..

লোকটা জল থেকে উঠে এল। ওর গায়ের শার্ট ছিঁড়ে গেছে, বাম কাঁধে ব্যান্ডেজটা রক্তে লাল, মুখে কালির দাগ। কিন্তু ওর চোখের সেই তীক্ষ্ণতা আর ঠোঁটের কোণের সেই ম্লান হাসিটা এক মুহূর্তেই চিনিয়ে দিল ওকে।

“আরমান!...”

পদ্ম দৌড়ে গিয়ে আরমানকে জড়িয়ে ধরল।

আরমান কাঁপতে কাঁপতে পদ্মকে জাপটে ধরল। ওর গায়ের নোনা জল আর রক্তের গন্ধে পদ্মর নাকে যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুবাস এল।

“আমি বলেছিলাম না প্রাণ... আমি ডাক্তার, আমি জানি কখন বিস্ফোরণ ঘটাতে হয় আর কখন ডুব দিতে হয়।..”

আরমান ফিসফিস করে বলল,

“পাহাড়ের ওই বিস্ফোরণটা ছিল নীলাঞ্জনার প্ল্যান। আমরা ল্যাবরেটরির সব গ্যাস সিলিন্ডার এক জায়গায় করে ওটা উড়িয়ে দিয়েছি যাতে আয়লা বেগমের হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতে না পারে। আর আমি পাহাড়ের গুহার সেই গোপন জলের ঝরনা দিয়ে স্লাইড করে সরাসরি দিঘিতে এসে পড়েছি।…”

পদ্ম আরমানের মুখটা দুই হাতে ধরল। “আপনি ঠিক আছেন তো.?..? আপনার মা... আয়লা বেগম?.?..”

আরমানের চোখ দুটো ভিজে এল।

“মা গ্রেপ্তার হয়েছেন। পাহাড়ের ওপারে নীলাঞ্জনা ওনাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়েছে। ওনার অহংকার ওই আগুনের সাথেই ছাই হয়ে গেছে পদ্ম। কিন্তু আমাদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।…”

আরমান পদ্মর হাত থেকে সেই নীল হীরেটা নিল। পাথরটা এখন নিস্তব্ধ।

“জানো পদ্ম, এই হীরেটা আসলে কী?.?. এটা কোনো সাধারণ পাথর নয়। এটার ভেতরে একটা মাইক্রো-চিপ আছে যাতে আমাদের দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ সম্পদের ম্যাপ আর ডিজিটাল লজিক লুকানো। জাবেদ খান এটা দিয়ে বিদেশের কাছে আমাদের দেশটা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল।…”

শায়ান স্পিডবোট নিয়ে পাড়ে ভিড়ল। ওর সাথে জারাও আছে, জারার ড্রেসিং করা হয়েছে কিন্তু ও এখন অনেকটা সুস্থ। জারা আরমানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।

“শায়ান ভাই, হীরেটা নিন। এটাকে ডিকোড করে এর ভেতরের সব তথ্য সরকারি সার্ভারে পাঠিয়ে দিন। এই অভিশাপ যেন আর কারোর হাতে না পড়ে।…”

আরমান হীরেটা শায়ানের হাতে দিল।

শায়ান গম্ভীর মুখে বলল,

“আরমান, তুই গ্রেট। কিন্তু একটা খবর আছে। আমিন সৈয়দ... মানে তোর বাবা... তিনি পুলিশের ভ্যান থেকে পালিয়েছেন। তিনি সম্ভবত বর্ডার ক্রস করার চেষ্টা করছেন।..”

আরমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “তিনি বেশিদূর যেতে পারবেন না শায়ান। কারণ তিনি যে ম্যাপ নিয়ে পালাচ্ছেন, ওটা আমি আগেই বদলে দিয়েছি। তিনি এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছাবেন যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে আমাদের বিশেষ বাহিনী।…”

পদ্ম আরমানের হাত ধরল।

“এখন কোথায় যাবেন ডাক্তার মশাই?.?..”

আরমান আকাশের ভোরের আলোর দিকে তাকালো।

“এখন আমি যাব আমাদের সেই পুরোনো নীলকুঠিতে।আর আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে। কিন্তু তার আগে…”

আরমান হাঁটু গেড়ে বসল পদ্মর সামনে। দিঘির পাড়ে ভোরের শীতল হাওয়ায় আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের ওপর রাখল।

“পদ্ম, অনেক রক্তপাত হয়েছে, অনেক রহস্য পেরিয়েছি। এবার কি আমরা শুধুই আরমান আর পদ্ম হতে পারি?.?.. কোনো নীল বিষের ভয় ছাড়া?.?.. তুমি কি সবসময় এভাবেই আমার সাথে থাকবে?!..”

পদ্ম হাসল। ওর চোখের জল রোদে মুক্তোর মতো জ্বলছে।

“আমি তো সবসময় আপনারই ছিলাম ডাক্তার মশাই। শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল।…”

কিন্তু দূরে পাহাড়ের আড়ালে এক জোড়া চোখ তখনো ওদের দেখছিল। আমিন সৈয়দ কি সত্যিই ধরা পড়েছেন? নাকি এই গল্পের জাল আরও গভীরে ছড়ানো?

— — —

ভোরের আলোয় যখন গ্রামের মেঠো পথটা স্পষ্ট হয়ে উঠল, আরমান আর পদ্মর জিপটা তখন পুরোনো সেই বিশাল বটগাছটা পার হচ্ছিল। দিঘির পাড়ের সেই বিভীষিকা পেছনে ফেলে ওরা ফিরছে ওদের শেকড়ে।

নীলকুঠির সেই বিশাল সিংহদুয়ারটা এখন জরাজীর্ণ, আগাছায় ঢেকে গেছে চুনকাম করা দেওয়ালগুলো। কিন্তু বাতাসের সেই পরিচিত মাটির সোঁদা গন্ধ আর পদ্মপুকুরের ঘ্রাণ পদ্মর নাকে আসতেই ওর চোখের পাতা ভিজে উঠল।

“ডাক্তার মশাই... দেখুন, আমাদের বাড়ি। কত ঝড় বয়ে গেল এই কয়েক দিনে!...”

পদ্ম জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল।

আরমান স্টিয়ারিংয়ে শক্ত মুঠোয় ধরে আছে। ওর চোখে আজ ক্লান্তির চেয়ে প্রশান্তি বেশি। ও ম্লান হেসে বলল,

“হ্যাঁ পদ্ম। দাদী বলতেন, নীলকুঠির দেওয়ালে নাকি অভিশাপ আর আশীর্বাদ দুটোই মিশে থাকে। আজ মনে হচ্ছে আশীর্বাদটাই জয়ী হলো।..”

জিপটা থামল বিশাল বারান্দার সামনে। শায়ান আর নীলাঞ্জনা অন্য একটা গাড়িতে ওদের পেছনেই এসেছে। শায়ান গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল।

“আরমান, তোদের এই জমিদার বাড়িতে আপাতত কড়া পাহারা থাকবে। আমিন সৈয়দ এখনো নিখোঁজ, ও যে কোনো সময় মরণকামড় দিতে পারে।…”

আরমান মাথা নাড়ল। ও পদ্মকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। ঠিক সেই সময় বারান্দার ওপর থেকে এক বৃদ্ধার চিৎকার শোনা গেল।

“ওরে আমার আরমান ফিরে এসেছে! আমার পদ্ম ফিরেছে!...”

আয়লা বেগমের আড়ালে থাকা সেই পুরোনো দাই মা—যিনি আরমানকে ছোটবেলা থেকে বড় করেছেন—তিনি দৌড়ে এসে পদ্মকে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার চোখে অঝোরে জল।

“কত দোয়া করেছি তোদের জন্য!... ওই ডাইনীটা (আয়লা বেগম) তোদের শেষ করে দিতে চেয়েছিল!...”

পদ্ম দাই মার কোলে মাথা রাখল। “সব শেষ দাই মা। এখন আর কোনো ভয় নেই।…”

কিন্তু আরমানের মনটা কু গাইছে। ও সোজা বাড়ির ভেতরে দাদীর সেই পুরোনো লাইব্রেরি ঘরে গেল। সেখানেই দাদীর সেই সিন্দুকটা ছিল যা এখন ফাঁকা। আরমান দেওয়ালের একটা বিশেষ খোদাই করা লতাপাতার নকশার দিকে হাত বাড়াল।

“পদ্ম, এদিকে এসো।…”

আরমান ডাকল।

পদ্ম কাছে আসতেই আরমান নকশাটা একপাশে সরাল। পেছনে একটা ছোট খুপরি বের হলো। সেখান থেকে আরমান একটা পুরোনো কাপড়ে মোড়ানো ডায়েরি বের করল।

“এটা তো পরদাদীর ডায়েরি নয়! এটা কার?.?.”

পদ্ম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

আরমান ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা— 'আশরাফুল আলম সৈয়দ, ১৯২২'।

“আমার দাদার ডায়েরি!... দাদী এটা কেন লুকিয়ে রেখেছিলেন?..?..” আরমান পড়তে শুরু করল। হঠাৎ ওর হাত কাঁপতে শুরু করল।

ডায়েরিতে লেখা আছে—

“নীল বিষ আসলে কোনো রাসায়নিক নয়, এটা একটা বংশগত জেনেটিক কোড। যারা এই পরিবারের রক্ত বহন করে, তাদের মস্তিস্কের কোষগুলো অতিমাত্রায় শক্তিশালী। কিন্তু সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে দরকার হয় 'ব্লু ডায়মন্ড'। হীরেটা আসলে এক ধরণের সিগন্যাল রিসিভার। ওটা যার কাছে থাকবে, সে এই পরিবারের সদস্যদের মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।..”

পদ্ম ভয়ে আরমানের হাত ধরল।

“তার মানে... আব্বা মানে আমিন সৈয়দ আসলে ওটা দিয়ে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন?.?..”

আরমান মাথা নিচু করল।

“ঠিক তাই। মা চেয়েছিল সম্পদ, আর বাবা চেয়েছেন ক্ষমতা। তিনি চান আমাকে একটা রোবট বানিয়ে ওনার এই সাম্রাজ্য চালাতে।…”

ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরি ঘরের বিশাল ঝাড়বাতিটা দপ করে নিভে গেল। পুরো বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে গেল। বাইরে থাকা জেনারেটরটা কেউ যেন বন্ধ করে দিয়েছে।

“শায়ান!?. নীলাঞ্জনা!...”

আরমান চিৎকার করল, কিন্তু কোনো উত্তর এল না।

অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা খুটখুট শব্দ শোনা গেল। হুইলচেয়ারের সেই চেনা শব্দ!

“অসাধারণ পড়েছ আরমান। তোমার দাদার ডায়েরিটা আসলে তোমার জন্যই রেখে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম তুমি ঠিক এই সময়েই এখানে ফিরবে।…”

অন্ধকারের মাঝে একটা টর্চের আলো জ্বলে উঠল। হুইলচেয়ারে বসে আছেন আমিন সৈয়দ। ওনার কোলে একটা রিমোট কন্ট্রোল। ওনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও চারজন মাস্ক পরা লোক।

“আব্বা!.. আপনি এখান থেকে পালাননি?.?.. তবে নীলাঞ্জনাদের কী হলো?.?..”

আরমান রিভলভার বের করতে চাইল, কিন্তু দেখল ওর হাত অবশ হয়ে আসছে।

আমিন সৈয়দ হাসলেন।

“তোমার রিভলভারে আমি আগে থেকেই একটা নার্ভ এজেন্ট গ্যাস স্প্রে করে রেখেছিলাম। তুমি ওটা ছোঁয়ার সাথে সাথেই তোমার মাংসপেশি অবশ হতে শুরু করেছে। আর শায়ান.?..? ও এখন বাড়ির বাইরে আমার ড্রোন গার্ডদের সাথে লড়ছে।…”

পদ্ম আরমানকে আগলে ধরার চেষ্টা করল।

“আপনি একজন বাবা হয়ে নিজের ছেলের সাথে এমন করতে পারছেন?.?...”

“আমি বাবা নই পদ্ম, আমি একজন কর্মকার!... আমি এমন এক প্রজন্ম গড়তে চাই যারা পৃথিবীর সেরা মেধাবী হবে।…”

আমিন সৈয়দ পদ্মর দিকে টর্চ ফেললেন।

“আর তুমি পদ্ম... তুমি হলে সেই প্রজন্মের গর্ভধারিণী। তোমার রক্তে নীলকুঠির তেজ আছে, আর আরমানের মস্তিস্ক। তোমাদের সন্তানই হবে আসল 'ব্লু ডায়মন্ড ২'!...”

পদ্ম শিউরে উঠল। ওনার উন্মাদনা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আরমান মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, ওর শরীর আর চলছে না।

“পদ্ম... পালাও... দাদীর ঘরে একটা ছোট কুড়াল আছে... দেওয়ালে... মারো ওটা!...”

আরমান বিড়বিড় করে বলল।

পদ্ম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। ও জানত আরমানকে বাঁচাতে হলে আজ ওকে স্বামীর সাহায্য করতেই হবে। ও অন্ধকারের ভেতর দিয়েই দৌড়ে গেল দাদীর ঘরের দিকে। পেছন থেকে আমিন সৈয়দের লোকরা ওকে তাড়া করল।

পদ্ম দাদীর ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিল। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ও দেখল সেই পুরোনো সাজানো কুড়ালটা। ওটা হাতে নিতেই ওর শরীরে যেন এক অদ্ভুত শক্তি এল।

দরজায় আঘাত পড়ছে। 'ধাম! ধাম!' দরজা ভেঙে ফেলছে ওরা।

পদ্ম মনে মনে বলল,

“আরমান, আমি আপনাকে মরতে দেব না। আজ এই বিষের বংশ আমি নিজ হাতে শেষ করব।…”

দরজা ভেঙে লোকগুলো ভেতরে ঢুকতেই পদ্ম কুড়ালটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জমিদার বাড়ির সেই কোমল বধূ আজ এক রণচণ্ডী বীরাঙ্গনা।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন