#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৫২
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
নিশিন্দীপুরের সেই শান্ত বিকেলটা মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল। শায়ানের হাতের সেই হলদেটে খামটা যেন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। আমান তখন আরমানের বুকে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে, ওর নিষ্পাপ মুখটা দেখে বোঝার উপায় নেই যে বাইরের পৃথিবীতে আবার কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস এসেছে।
আরমান শায়ানের হাত থেকে খামটা ছিনিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু শায়ান সরিয়ে নিল।
“না আরমান, এটা শুধু পদ্মর জন্য। লিন্ডার শেষ ইচ্ছা ছিল এটা যেন অন্য কেউ না পড়ে। এমনকি তুমিও না।…”
পদ্ম একটু কেঁপে উঠল। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে খামটা হাতে নিল। ওর আঙুলগুলো কাঁপছে। লিন্ডা জেল থেকে কেন ওকে চিঠি পাঠাবে?.?.. সেই বিষাক্ত ল্যাবরেটরির স্মৃতি তো ওরা কবর দিয়ে এসেছে।
“পদ্ম, ভেতরে যেও না। এখানেই খুলে দেখো।…”
আরমান উদ্বিগ্ন গলায় বলল। ওর ডাক্তারী মন কু ডাকছে।
পদ্ম খামটা ছিঁড়ে ফেলল। ভেতরে কোনো ডায়েরি নেই, বরং একটা ছোট মেমোরি চিপ আর একটা হাতে লেখা চিরকুট। তাতে রক্তবর্ণ কালিতে লেখা:
“সৈয়দ বংশের রক্তে যে বিষ মিশে আছে, তা কেবল ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি। পদ্ম, তোমার শ্বশুরের আলমারির সেই গোপন ড্রয়ারটা কি কোনোদিন খুলে দেখেছ?.?.. নীলকুঠির আসল চাবিকাঠি তো ওখানেই লুকানো।….”
পদ্মর মাথাটা ঘুরে উঠল। ও আরমানের দিকে তাকালো। আরমান চিরকুটটা পড়ে পাথর হয়ে গেল। সৈয়দ আমিন (আরমানের বাবা) তো এখন তওবা করে একদম বদলে গেছেন। ওনার আলমারিতে আবার কীসের গোপন চাবিকাঠি?.?..
“শায়ান, লিন্ডা কি পাগল হয়ে গেছে?.?.. বাবা তো এখন সারাদিন তসবিহ পড়েন!...”
আরমান গর্জে উঠল।
শায়ান গম্ভীর মুখে বলল,
“লিন্ডা কাল রাতে জেলে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে আরমান। মরার আগে ও এই খামটা আমার হাতে দিয়ে বলেছে— 'পদ্মকে বলো, ওর ছেলে আমানের জীবনের সুরক্ষা ওই ড্রয়ারের ভেতরেই আছে।' আমি ঝুঁকি নিতে পারছি না।…”
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটা বিকট শব্দ শোনা গেল। কাঁচ ভাঙার শব্দ!...
আরমান আর শায়ান দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। দেখল অন্দরমহলের ড্রয়িংরুমে দাদাজানের সেই পুরোনো শোপিসটা ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। আর ঠিক তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সৈয়দ আমিন। ওনার হাতে একটা পুরোনো মরচে ধরা লোহার বাক্স। ওনার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক।
"বাবা!... আপনি এটা কোথা থেকে পেলেন?.?..”
আরমান চিৎকার করে উঠল।
আমিন সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“আরমান... লিন্ডা যা বলেছে তা সত্যি। আমি তওবা করেছি ঠিকই, কিন্তু এই পাপের বীজ তো আমি নষ্ট করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম এটা কোনোদিন কেউ খুঁজে পাবে না।…”
পদ্ম আমানকে রাইমার কোলে দিয়ে এগিয়ে এল।
“আব্বা, এই বাক্সে কী আছে?.?.. আমানের জীবনের সুরক্ষা কেন এই বাক্সের সাথে জড়িত?.?...”
আমিন সাহেব কাঁপতে থাকা হাতে বাক্সটা খুললেন। ভেতরে কোনো বিষ নেই, বরং কিছু পুরোনো দলিল আর একটা ছোট্ট লকেট—হুবহু আরমান আজ পদ্মকে যেটা পরিয়ে দিয়েছে তার মতো!... কিন্তু এই লকেটের ভেতরে একটা নীল রঙের তরল নড়াচড়া করছে।
“এটা কী?.?...”
পদ্ম ফিসফিস করে বলল।
“এটা হলো লিন্ডার তৈরি সেই আসল ফরমূলা, যেটা ও আরমানের রক্তে মেশাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি সেটা চুরি করে বদলে দিয়েছিলাম।…”
আমিন সাহেব ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
“লিন্ডা ভেবেছিল ও আরমানকে বিষ
দিয়েছে, কিন্তু আমি জানতাম ওই নীল তরলটা আসলে একটা স্লো-পয়জন, যা বংশপরম্পরায় চলে। আরমান হয়তো বেঁচে গেছে, কিন্তু আমানের শরীরে…”
আরমানের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। ও দ্রুত আমানের দিকে তাকালো। আমান তখনো রাইমার কোলে ঘুমাচ্ছে। ওর গায়ের নীল জুব্বাটা যেন এখন এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“তার মানে আমানের বিপদ এখনো কাটেনি?.?..”
পদ্ম আর্তনাদ করে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো নিশিন্দীপুর ভিলা অন্ধকারে ডুবে গেল। আর অন্ধকারের মাঝেই শোনা গেল এক মহিলার খিলখিল হাসির শব্দ। শব্দটা কোনো জ্যান্ত মানুষের নয়, যেন কোনো রেকর্ড করা অডিও।
“পদ্ম... খেলা তো কেবল শুরু হলো!...”
শায়ান টর্চ জ্বালালো, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। শুধু জানলার কাঁচটা ভাঙা আর লিন্ডার পাঠানো সেই মেমোরি চিপটা পদ্মর হাত থেকে উধাও!
আরমান আমানকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরল।
“আমি কাউকে আমার ছেলেকে ছুঁতে দেব না!... শায়ান, পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলো!...”
পদ্ম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অনুভব করল ওর গলার সেই নতুন লকেটটা নেই। কেউ একজন অন্ধকারের সুযোগে ওটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।
সৈয়দ ভিলায় আবার কি সেই নীল বিষের দহন শুরু হতে যাচ্ছে? লিন্ডা কি সত্যিই জেল থেকে কলকাঠি নাড়ছে?.?..
— — —
নিশিন্দীপুরের সেই শান্ত ভিলা এখন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অন্ধকারের মাঝে আরমান তার বুকের ওপর আমানের হৃৎস্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করছে। শায়ানের টর্চের আলো এদিক-ওদিক বিচরণ করছে, কিন্তু সেই রহস্যময় চোর যেন বাতাসের সাথে মিশে গেছে।
অন্ধকারের সেই কয়েক সেকেন্ড যেন কয়েক যুগ মনে হলো। আরমান চিৎকার করে উঠল,
“পদ্ম!.. তুমি কোথায়?..?.. শায়ান, জেনারেটর চালু করতে বলো!...”
ঠিক তখনই জেনারেটর গর্জে উঠল। ড্রয়িংরুমের ঝাড়বাতিগুলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে সবাই স্তম্ভিত হয়ে দেখল—জানলার ভাঙা কাঁচের সামনে রক্তমাখা একটা হাতের ছাপ। আর মেঝেতে পড়ে আছে পদ্মর সেই ছেঁড়া লকেটের চেইনটা, কিন্তু হীরের সেই লকেটটা উধাও!...
“আরমান... আমার লকেট!... ওটা আমানের সুরক্ষার কথা বলছিল না?.?...”
পদ্ম কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওর গলাটা এখন খালি, যেখানে একটু আগেও ভালোবাসার স্মৃতি ছিল।
শায়ান দ্রুত জানলার কাছে গিয়ে দেখল বাইরে বাগানে কারো পায়ের ছাপ নেই।
“এটা অসম্ভব!... কোনো বাইরের লোক এত তাড়াতাড়ি গায়েব হতে পারে না। চোর বাড়ির ভেতরেই আছে!...”
ঠিক তখন সৈয়দ আমিন (আরমানের বাবা) সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। ওনার হাতে সেই মরচে ধরা বাক্সটা এখনো ধরা। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“আরমান, লিন্ডা একা নয়। ও জেলে থাকলেও ওর 'ব্লু-কোবরা' গ্রুপের কেউ এখনো সক্রিয়। আর তারা চায় এই নীল লকেটটা, কারণ ওটাই হলো সেই প্রতিষেধক বা 'অ্যান্টিডোট' যা এই বিষকে চিরতরে নষ্ট করতে পারে।…”
পদ্ম আমানকে আরমানের কোল থেকে নিজের বুকে টেনে নিল। ওর মাতৃত্ব এখন এক বাঘিনীর মতো সজাগ।
“তার মানে আমানের শরীরে কি সত্যিই বিষ আছে?.?.. আপনারা সবাই কি জানতেন?.?..”
আরমান মাথা নিচু করল। ওর ডাক্তারী জ্ঞান ওকে বলছিল যে আমানের মাঝে মাঝে নীল হয়ে যাওয়াটা সাধারণ কোনো শ্বাসকষ্ট ছিল না। ও শান্ত স্বরে বলল,
“আমি সন্দেহ করেছিলাম পদ্ম। লিন্ডা যখন ল্যাবে আমাকে ওই ইঞ্জেকশন দিয়েছিল, তখন ওটার প্রভাব আমার ডিএনএ-তে মিশে গিয়েছিল। আমান সেই বিষ নিয়েই জন্মেছে। আর ওই লকেটটা... ওটা ছিল লিন্ডার শেষ ল্যাবে তৈরি সেই ফর্মুলা যা এই বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।…”
পদ্ম চিৎকার করে উঠল,
“তাহলে কেন ওটা হাতছাড়া হতে দিলেন?.?.. আমার ছেলেকে আমি মরতে দেব না!...”
বাড়ির ভেতরে তখন এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। দাদাজান আর দাদী ওপর থেকে নেমে এলেন। ওনারা কিছুই বুঝতে পারছেন না। ঠিক তখনই রাইমা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওর হাতে এক গ্লাস পানি। কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন স্থির।
“পদ্ম, এই পানিটা খাও। তুমি খুব ঘাবড়ে গেছ।…”
রাইমা যান্ত্রিক স্বরে বলল।
শায়ান তীক্ষ্ণ চোখে রাইমার দিকে তাকালো।
“রাইমা, তুমি যখন চোর ঢুকেছিল তখন কোথায় ছিলে?.?...”
রাইমা একটু তোতলামি করল, “আমি... আমি তো রান্নাঘরে ছিলাম।…”
শায়ান হঠাত রাইমার হাতটা চেপে ধরল। রাইমার মুঠোর ভেতর থেকে ঝনঝন করে কিছু একটা মেঝেতে পড়ল। সবাই দেখল—ওটা সেই মেমোরি চিপ আর সেই নীল লকেট!
“রাইমা! তুই?..”
আরমান যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
রাইমা মাটিতে বসে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“আমাকে বাধ্য করেছে ভাইয়া! লিন্ডার লোকজন আমার কাছে খবর পাঠিয়েছে যে আমি যদি এই চিপটা না দিই, তবে ওরা সাফওয়ানকে ওরা মেরে ফেলবে। আমি... আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম!...”
পদ্ম দ্রুত লকেটটা কুড়িয়ে নিল। ওটা হাতে নিতেই দেখল লকেটের ভেতরের নীল তরলটা লাল হয়ে যাচ্ছে। লিন্ডার ডায়েরির কথা মনে পড়ল—
“যদি লকেটটা সঠিক সময়ে ব্যবহার না করা হয়, তবে ওটা নিজেই একটা মরণঘাতী বিষে পরিণত হবে।…”
“আরমান!.. সময় নেই!.. লকেটটার লিকুইড এখনই আমানকে খাওয়াতে হবে!...”
পদ্ম চিৎকার করল।
আরমান দ্রুত লকেটের মুখটা খুলল। ওটা থেকে এক কটু গন্ধ বেরোচ্ছে। ও আমানের ঠোঁটে এক ফোঁটা সেই তরল দিল। আমান ঘুমের ঘোরেই একটু নড়ে উঠল, তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শান্ত হয়ে গেল। ওর গায়ের সেই হালকা নীল ভাবটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে এক স্বাভাবিক গোলাপী আভা ফিরে এল।
শায়ান রাইমার কাঁধে হাত রাখল।
“রাইমা, তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। লিন্ডার নেটওয়ার্ক কতদূর বিস্তৃত তা আমাদের জানতে হবে।…”
সৈয়দ আমিন দাদাজানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
“আব্বা, এই পাপের শেষ আমিই করব। আমি লিন্ডার সব আস্তানা চিনি। আমি শায়ানকে সাহায্য করব।…”
নিশিন্দীপুরের আকাশে তখন মেঘ ডাকছে। ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আরমান পদ্মকে আর আমানকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল। বিষের সেই শেষ সূত্রটুকুও আজ ধ্বংস হলো, কিন্তু রাইমার এই বিশ্বাসঘাতকতা পরিবারের মনে এক গভীর ক্ষত রেখে গেল।
পদ্ম আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আরমান, আমরা কি কোনোদিন শান্তিতে থাকতে পারব না?.?...”
আরমান বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে বলল, “শান্তি আমাদের ভেতরেই আছে পদ্ম। আমান সুস্থ হয়েছে, এটাই আজ আমাদের বড় বিজয়। এখন আর কোনো নীল বিষ আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।…”
কিন্তু অন্ধকারের আড়ালে লিন্ডার সেই খিলখিল হাসি কি সত্যিই থেমেছে?.?.. নাকি লিন্ডা জেলের ভেতরে বসে এক নতুন দাবার চাল চালছে?.?..
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলার বাইরের মুষলধারে বৃষ্টি যেন ভেতরের সব পাপ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। রাইমার কান্নার শব্দে ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। আরমান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; যাকে সে আগলে রেখেছিল, সেই রাইমাই আজ নিজের সন্তানের জীবনের সাথে ছিনিমিনি খেলল?.?..
রাইমা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
“ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করো!.. সাফওয়ানকে ওরা তুলে নিয়ে গেছে। ওরা বলেছিল আমি যদি ওই চিপটা আর লকেটটা ওদের না দিই, তবে সাফওয়ানের লাশ পাঠাবে। আমি পদ্মর ক্ষতি করতে চাইনি, আমি শুধু আমার স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম!...”
শায়ান তীক্ষ্ণ চোখে রাইমার দিকে তাকিয়ে রেডিওতে তার টিমকে অ্যালার্ট করল।
“সাফওয়ানের লোকেশন ট্র্যাক করো দ্রুত!... আরমান, রাইমা যা বলছে তা যদি সত্যি হয়, তবে লিন্ডার লোকজন বাড়ির আশেপাশেই আছে।…”
পদ্ম আমানকে জড়িয়ে ধরে সোফার এক কোণে বসে পড়ল। ওর হৃদপিণ্ড এখনো ধকধক করছে। আরমান দ্রুত রাইমার কাছে গিয়ে ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
“রাইমা!... ওরা তোমায় কোথায় দেখা করতে বলেছিল?.?.. সাফওয়ানকে ওরা কোথায় রেখেছে?.?..”
রাইমা কাঁপতে কাঁপতে একটা চিরকুট বের করল।
“নিশিন্দীপুরের সেই পুরনো নীলকুঠির ধ্বংসস্তূপে। রাত বারোটার মধ্যে পৌঁছাতে বলেছে।…”
দাদাজান আশরাফুল আলম ওনার লাঠিটা সজোরে মেঝেতে ঠুকলেন। “আমার বংশের ওপর এত বড় আঘাত! আমিন, শায়ান—আজই এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হবে। আমি কোনো আপস করব না।…”
শায়ান আর আরমান দ্রুত পরিকল্পনা করল। শায়ান একা যাবে সিভিল ড্রেসে, আর আরমান আর আমিন সাহেব ব্যাকআপ হিসেবে থাকবেন। পদ্ম আর আমানের নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হলো।
“আরমান, সাবধানে যেও। আমানকে সুস্থ করে আমরা যেন আবার বিপদে না পড়ি।…”
পদ্ম আরমানের হাতটা শক্ত করে ধরল।
আরমান পদ্মর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“ভয় পেও না পদ্ম। আজ লিন্ডার শেষ চালটা আমিই নষ্ট করব। আমানের জীবনের কোনো ঝুঁকি আমি নেব না।…”
রাত এগারোটা ৪৫ মিনিট।
পুরনো নীলকুঠির ধ্বংসস্তূপটা চাঁদের আলোয় এক ভুতুড়ে রূপ নিয়েছে। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে শায়ান আর আরমান সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা টর্চের আলো ওদের চোখে পড়ল।
“দাঁড়ান ইন্সপেক্টর সাহেব!... বেশি এগোলে ব্যারিস্টার সাহেবের মাথাটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে।.." এক কর্কশ পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘদেহী লোক—ওর নাম জ্যাক, লিন্ডার সেই কুখ্যাত সহযোগী যে ল্যাব বিস্ফোরণের পর পালিয়ে গিয়েছিল। ওর হাতে একটা রিভলভার, আর সাফওয়ানকে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। সাফওয়ানের মুখ রক্তাক্ত।
“জ্যাক, লকেট আর চিপ আমার কাছে আছে। সাফওয়ানকে ছেড়ে দাও।….”
শায়ান একটা জাল প্যাকেট উঁচিয়ে ধরল।
জ্যাক খিলখিল করে হাসল।
“আপনি কি মনে করেন আমি বোকা?.?.. লকেট তো আরমান সাহেব অলরেডি ওনার ছেলেকে খাইয়ে দিয়েছেন। ওই নীল লকেট এখন আমানের রক্তে মিশে গেছে। আমার এখন চিপটা চাই না, আমার চাই ওই বাচ্চাটাকে!...”
আরমান ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
“খবরদার জ্যাক!... আমার ছেলের নাম মুখে আনবে না। তোদের তো লিন্ডার ফরমূলা চাই, তাই না?.?.. আমি নিজেই সেই ফরমূলা। আমার রক্তে লিন্ডা বিষ মিশিয়েছিল। আমাকে নিয়ে যা, কিন্তু সাফওয়ানকে ছেড়ে দে।…”
জ্যাক একটু থমকে গেল। ওর চোখে লোভের ঝিলিক।
“চমৎকার অফার!.. ডক্টর আরমান নিজেই যখন ধরা দিতে চাচ্ছেন, তখন আর কথা কী? কিন্তু…..”
হঠাৎ বনের ভেতর থেকে পুলিশের বাঁশির শব্দ শোনা গেল। শায়ানের টিম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। জ্যাক ঘাবড়ে গিয়ে সাফওয়ানের দিকে গুলি ছুড়তে গেল, ঠিক তখনই সৈয়দ আমিন (আরমানের বাবা) ঝাঁপিয়ে পড়লেন জ্যাকের ওপর।
“না! আর কোনো রক্ত নয়!...”
আমিন সাহেব জ্যাকের হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
এক ধস্তাধস্তির শব্দ, আর তারপর এক বিকট গুলির আওয়াজ!
আরমান চিৎকার করে উঠল,
“বাবা!...”
দেখা গেল জ্যাকের গুলি আমিন সাহেবের কাঁধে লেগেছে, কিন্তু আমিন সাহেব জ্যাককে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। শায়ান দ্রুত গিয়ে জ্যাককে হ্যান্ডকাফ পরাল। আরমান দৌড়ে গিয়ে সাফওয়ানের বাঁধন খুলে দিল।
সাফওয়ান কাঁদতে কাঁদতে আরমানকে জড়িয়ে ধরল।
“ভাইয়া, আমি জানতাম আপনি আসবেন!...”
হাসপাতালে আমিন সাহেবকে নিয়ে আসা হলো। গুলি ওনার হাড় স্পর্শ করেনি। কেবিনে শুয়ে আমিন সাহেব আরমানের হাত ধরলেন।
“আরমান, আজ মনে হচ্ছে আমি সত্যিই তওবা করতে পেরেছি। নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমি এই পরিবারকে বাঁচাতে চাই।…”
পদ্ম আমানকে নিয়ে কেবিনে ঢুকল। আমান এখন হাসছে, ওর সেই কালো চোখগুলো যেন আজ বেশি উজ্জ্বল। রাইমা দরজায় দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু পদ্ম ইশারায় ওকে ভেতরে ডাকল।
“রাইমা, ভুল মানুষই করে। কিন্তু তুমি আমাদের আমানকে বাঁচাতে চেয়েছ শেষে, এটাই বড় কথা। সাফওয়ান ঠিক আছে।…”
পদ্ম রাইমার হাত ধরল।
সৈয়দ ভিলায় ভোরের আলো ফুটল। নীলকুঠির সেই অভিশাপ আজ চিরতরে শেষ। লিন্ডার সব সহযোগী এখন পুলিশের খাঁচায়।
আরমান পদ্মর কাঁধে মাথা রেখে বারান্দায় দাঁড়ালো। আমান তখন দোলনায় শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে।
“পদ্ম, এবার কি আমরা শান্তিতে ফিরতে পারব?.?..”
আরমান হাসল।
পদ্ম আরমানের পকেটে হাত দিয়ে সেই ছোট্ট লকেটটা বের করল যেটা ও কুড়িয়ে পেয়েছিল। ওটা এখন একদম স্বচ্ছ।
“হ্যাঁ আরমান। বিষ নীল হয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসা সবসময় স্বচ্ছ থাকে।….”
—চলবে—
ইনশাআল্লাহ