#পদ্মপাতা~🪷
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ৬০
🚫⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
সৈয়দ ভিলার গেটে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল। আরমান নিজে এগিয়ে গেল গাড়িটার কাছে। গাড়ি থেকে নামলেন পদ্মর বাবা করিম রহমান আর মা ময়না বেগম। দাদাজানের মৃত্যুর খবর শুনে ওনারা গ্ৰাম থেকে সশরীরে হাজির হয়েছেন এই শোকের দিনে সাথী হতে।
“বাবা! মা!....”
পদ্ম দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এতক্ষণ সবার সামনে নিজেকে সামলে রাখলেও বাবা-মাকে দেখে ওর চোখের বাঁধ ভেঙে গেল।
ময়না বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“কাঁদিস না মা। আশরাফুল সাহেব তো কেবল তোর দাদাশ্বশুর ছিলেন না, এই গ্ৰামেরও অভিভাবক ছিলেন। ওনার মতো মানুষ যুগে যুগে জন্মায় না।…”
করিম রহমান আরমানের কাঁধে হাত রাখলেন।
“বাবা আরমান, মন শক্ত করো। এখন পুরো বংশের ভার তোমার ওপর। আমরা তো আছিই তোমার পাশে।…”
আমান ছুটে এল নানা-নানিকে দেখে। আমান তো নানার পকেট হাতড়াতে শুরু করল।
“নানাভাই!.. আমার জন্য সেই লাল চকলেট এনেছ?.?..”
করিম রহমান আমানকে কোলে তুলে নিয়ে হাসলেন।
“আরে আমার দাদুর জন্য কি আর খালি হাতে আসি?.?.. গাড়িতে এক গাদা খেলনা আর মিষ্টি আছে। আর এই যে আমার লক্ষ্মী নানিভাই আনায়া!...”
আনায়া লজ্জিত মুখে নানার জুব্বা খামচে ধরল।
“নানাভাই, দাদাজান চলে গেছে, এখন তুমি আমাদের সাথে থাকবে তো?.?..”
এই ছোট শিশুর প্রশ্নে করিম সাহেবের চোখ ভিজে এল।
“হ্যাঁ দিদিভাই আমি কদিন থাকব তোদের সাথে।…”
বিকালে ড্রয়িংরুমে এক বিশাল আড্ডা বসল। পদ্মর মা ময়না বেগম আর দাদী আলেয়া বেগম পাশাপাশি বসে পুরনো দিনের গল্প করছেন। আরমান, ইয়াসিন আর করিম সাহেব বসেছেন নীলকুঠি ভাঙার পরিকল্পনা নিয়ে।
করিম সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন,
“আরমান, লিন্ডার ওই ল্যাবটা ভাঙার সময় খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। ওটা শুধু একটা দালান নয়, ওটা বিষের গুদাম ছিল। কোনো কেমিক্যাল যেন মাটিতে না মিশে যায়।…”
আরমান সায় দিল।
“ঠিক বলেছেন বাবা। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে ওটা সরাব। ওখানে আমি মাদ্রাসা আর এতিমখানার কাজ শুরু করতে চাই।…”
ঠিক তখনই ইয়াসিন একটা পুরনো ট্রাঙ্ক নিয়ে এল।
“আরমান ভাই, দাদাজানের ঘরের এক কোণে এই ট্রাঙ্কটা পাওয়া গেছে। মনে হয় এটা পদ্ম ভাবির বাবার বাড়ির কোনো আমানত।…”
করিম সাহেব চমকে উঠলেন। ওটা খুলে দেখলেন ভেতরে পুরনো কিছু দলিল আর একটা রূপোর চাবি। “আরে!... এটা তো আমার বাবার দেওয়া সেই দলিল, যা আমি চাচাজানের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলাম বিশ বছর আগে!...উনি এত যত্ন করে রেখেছেন!...”
সবাই অবাক হয়ে দেখল দাদাজান কতটা বিশ্বস্ত ছিলেন। পদ্ম ওর বাবার পাশে বসে বলল,
“বাবা, দাদাজান সবসময় বলতেন—সম্পত্তি নয়, বিশ্বাসই মানুষের আসল পরিচয়।…”
রাতের বেলা ছাদে এক সুন্দর দৃশ্য। আরমান আর পদ্ম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দূরে নীলকুঠির ধ্বংসস্তূপ দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। আরমান পদ্মর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“পদ্ম, তোমার বাবা-মা আসাতে বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। আমার নিজের শ্বশুরবাড়ি যে আমার এত বড় শক্তি, তা আজ আবার বুঝলাম।…”
আরমান আবেগ নিয়ে বলল।
পদ্ম মৃদু হাসল।
“আরমান, আপনি তো শুধু আমার স্বামী নন, আপনি আমার বাবার বড় ছেলেও। বাবা সবসময় আপনার গল্প করেন সবার কাছে।…”
হঠাৎ নিচে থেকে চিৎকার শোনা গেল। আমান আর আনায়ার মধ্যে আবার যুদ্ধ লেগেছে!... আমান নানার আনা রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটা দিচ্ছে না, আর আনায়া সেটা কেড়ে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
“ভাইয়া! গাড়ি দাও, নয়তো আমি পুকুরে দেব!...”
আনায়ার দাপুটে চিৎকার।
আরমান আর পদ্ম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। এই হাসিখুশি, ঝগড়া আর ভালোবাসাই তো জীবন। লিন্ডার বিষের নীল ছায়া আজ সত্যিই বিলীন হয়ে গেছে পদ্মর বাবার বাড়ির এই আত্মীয়তার বন্ধনে।
সৈয়দ ভিলা এখন এক পরিপূর্ণ নীড়। যেখানে বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন আর এক ঝাক শিশু মিলে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখছে।
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলার উঠোনে এখন উৎসব আর রহস্যের এক অদ্ভুত মিশেল। পদ্মর বাবা-মা আসাতে বাড়িটা যেন পূর্ণতা পেয়েছে। কিন্তু সবার নজর এখন সেই অভিশপ্ত নীলকুঠির দিকে, যা আজ থেকে ভাঙা শুরু হবে। আরমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লিন্ডার সেই বিষাক্ত স্মৃতি মুছে ফেলতে চায়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নীলকুঠির সামনে বুলডোজার আর শ্রমিকদের ভিড় জমেছে। আরমান আর পদ্ম দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। পদ্মর বাবা মকবুল হোসেন আর ইয়াসিন বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। লিন্ডার সেই ল্যাবরেটরিটা আজ ইতিহাসের ধুলোয় মিশে যাবে।
“আরমান, সাবধানে!... এই দেয়ালগুলোর ভেতরে লিন্ডা অনেক গ্যাস পাইপ বসিয়েছিল।…”
করিম সাহেব সতর্ক করলেন।
বুলডোজারের প্রথম ধাক্কাটা যখন দেয়ালের ওপর পড়ল, তখন এক বিকট শব্দে পুরনো ইটগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করল। ধুলোর আস্তরণ সরে যেতেই সবাই অবাক হয়ে দেখল—ল্যাবের ঠিক মাঝখানের মেঝের নিচে একটা লোহার মজবুত দরজা!
“আরমান ভাই!.. এটা তো সেই সিক্রেট চেম্বার, যার কথা লিন্ডা কখনও কাউকে বলেনি!...”
ইয়াসিন চিৎকার করে উঠল।
শ্রমিকরা শাবল দিয়ে সেই লোহার দরজাটা সরাতেই দেখা গেল নিচে অন্ধকার একটা সুড়ঙ্গ। আরমান টর্চ নিয়ে ভেতরে ঢুকল, পেছনে ইয়াসিন আর মকবুল সাহেব। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা ছোট ঘর, যেখানে কাঁচের জারে এখনো কিছু নীল রঙের তরল জমা হয়ে আছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, সেখানে একটা পুরনো কাঠের সিন্দুক রাখা।
আরমান সিন্দুকটা খুলতেই দেখল ভেতরে সোনা-দানা নয়, বরং কিছু ডায়েরি আর একটা ম্যাপ। ডায়েরির পাতায় লিন্ডার হাতের লেখা—
“সৈয়দ বংশের রক্ত দিয়ে আমি অমর হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার সেই নীল ফর্মুলা আজ এই সুড়ঙ্গেই সমাধিস্থ রইল।..”
আরমান ডায়েরিটা বন্ধ করল।
“সব পুড়িয়ে ফেলো ইয়াসিন। এই বিষাক্ত জ্ঞান দুনিয়ার কারো কাজে লাগবে না। আমরা এখানে শুধু মাদ্রাসাই গড়ব না, এখানে একটা বড় বাগান হবে যেখানে মানুষ শ্বাস নিতে পারবে।…”
ওদিকে বাড়িতে তখন এক বিশাল এলাহি কাণ্ড। পদ্মর মা ময়না বেগম আর দাদী আলেয়া বেগম মিলে বিশাল হাঁড়িতে রান্না চড়িয়েছেন। আজ গ্রামের সব এতিম শিশুদের খাওয়ানো হবে।
আমান আর আনায়ার তখন মেলায় যাওয়ার ধুম। নানার হাত ধরে ওরা দুজনেই তৈরি। আমান পরেছে নীল পাঞ্জাবি আর আনায়া লাল টুকটুকে ফ্রক।
“নানাভাই!... চলো না!.. মেলায় নাকি নাগরদোলা এসেছে!...”
আমানের তর সইছে না।
করিম সাহেব হাসলেন।
“চলো নানাভাই! আজ তোমাদের যা ইচ্ছা তাই কিনে দেব।…”
গ্রামের মেলাটা আজ যেন রঙের মেলা। আমান একটা কাঠের ঘোড়া কিনল আর আনায়া কিনল মাটির হাড়ি-পাতিল। হঠাৎ ভিড়ের মাঝে আমান দেখল একটা পুরনো পিতলের লকেট পড়ে আছে মাটিতে। ওটা তুলে নিয়ে ও নানাকে দেখাল।
“নানাভাই, এটা দেখো! এতে কার ছবি?.?...”
করিম সাহেব লকেটটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলেন।
“আরে!... এটা তো পদ্মর দাদীর লকেট!... যেটা বিশ বছর আগে মেলায় হারিয়ে গিয়েছিল। আমান, তুই তো আজ এক অসাধ্য সাধন করলি রে নানাভাই!...”
বিকালে সবাই যখন বাড়িতে ফিরল, মেলা থেকে আনা জিলাপি আর মিষ্টির গন্ধে বাড়ি ম ম করছে। আরমান আর ইয়াসিন ফিরল সুড়ঙ্গের সেই রহস্যময় ডায়েরিগুলো ধ্বংস করে।
খাওয়াদাওয়ার পর রাতে সবাই যখন ছাদে বসল, রাইমা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। ওর হাতে একটা ছোট প্যাকেট। ও সেটা সাফওয়ানের হাতে দিল।
“সাফওয়ান, দাদাজান চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি বোধহয় আমাদের জন্য এক নতুন উপহার পাঠিয়ে দিয়েছেন।…”
রাইমা লজ্জায় লাল হয়ে নিচু স্বরে বলল।
সাফওয়ান প্যাকেটটা খুলতেই দেখল ভেতরে একটা ছোট আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট। ও খুশিতে রাইমাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও আরমান আর ইয়াসিনের সামনে থেমে গেল।
“বড় ভাই! মেজ ভাই! আমি আবার বাবা হতে চলেছি!....”
সাফওয়ানের চিৎকার শুনে পুরো ভিলা আনন্দে কেঁপে উঠল।
পদ্ম রাইমাকে জড়িয়ে ধরল।
“সাবাস রাইমা আপা… আমাদের পরিবারটা তো এখন ছোটখাটো একটা স্কুল হয়ে যাবে!...”
আমান আর আনায়া তখন এক কোণে বসে মেলা থেকে আনা বাশি বাজাচ্ছে। ওরা বুঝছে না বড়দের এত আনন্দ কিসের, কিন্তু ওরা জানে—সৈয়দ ভিলা আজ খুশির বন্যায় ভাসছে।
আরমান পদ্মর কানে কানে বলল, “পদ্ম, নীলকুঠির সেই সুড়ঙ্গটা এখন চিরতরে বন্ধ। এখন থেকে শুধু নতুন প্রাণের জয়গান শোনা যাবে এই বাড়িতে।…”
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল। আকাশের চাঁদটা আজ অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। সৈয়দ ভিলার প্রতিটি কোণে এখন আশীর্বাদের বৃষ্টি পড়ছে। মকবুল সাহেব আর রাহেলা বেগম ও হাসিমুখে দেখছেন তাঁদের মেয়ের সাজানো সংসার।
নীলকুঠির সেই ভাঙা স্তূপের ওপর আজ সাদা চুনের প্রলেপ পড়ছে।
আরমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে 'আশরাফুল আলম স্মৃতি মাদ্রাসা ও এতিমখানা'র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল। দাদাজানের উইল অনুযায়ী আজ সেখানে প্রথম আজান ধ্বনিত হলো। গ্রামের শত শত মানুষ সেই আজান শুনে দুহাত তুলে দোয়া করল।
“বড় ভাই, আজ মনে হচ্ছে আমাদের বুক থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেল।…”
ইয়াসিন আরমানের পাশে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির সাথে বলল।
আরমান ইয়াসিনের কাঁধে হাত রাখল। “হ্যাঁ ইয়াসিন। বিষের ওপর যখন বিশ্বাসের জয় হয়, তখন পৃথিবীটা এমনই সুন্দর লাগে। দেখ, ওই সুড়ঙ্গটা যেখানে ছিল, সেখানে আমি বকুল ফুলের বাগান করছি।..”
এদিকে বাড়িতে তখন এক এলাহি কাণ্ড। পদ্ম সকাল থেকে রান্নাঘরে শাশুড়ি আর মায়ের সাথে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু হঠাৎ ওর মাথাটা ঘুরে উঠল। ও সিংকের ধারটা খামচে ধরল।
পদ্মর মা দ্রুত মেয়ের কাছে ছুটে এলেন।
“কী হয়েছে রে পদ্ম?.?.. শরীর কি খারাপ লাগছে?.?..”
পদ্ম ফ্যাকাশে মুখে হাসল।
“না মা, মনে হয় রোদে বেশি কাজ করেছি তাই। একটু পানি দাও।…”
কিন্তু পদ্মর চোখমুখ দেখে রাহেলা বেগমের অভিজ্ঞ চোখ অন্য কিছু ভাবল। তিনি চুপিচুপি দাদী জোহরা বেগমকে ইশারা করলেন। দাদীও মুচকি হাসলেন।
দুপুরে খাবারের টেবিলে সবাই বসেছে। আমান আর আনায়ার মধ্যে চলছে লেগ পিস নিয়ে কাড়াকাড়ি।
“আম্মু!... ভাইয়া আমার চিকেনটা নিয়ে নিয়েছে!...”
আনায়ার নালিশ।
আমান গম্ভীর মুখে বলল,
“আমি তোকে আলু দিয়েছি তো!.. তুই আলু ভালোবাসিস না?.?..”
করিম সাহেব হাসতে হাসতে দুই নাতনি-নাতিকে থামালেন।
“আরে!... নানার থালা থেকে নিয়ে খাও তোরা। এই দেখ বড় বড় দুটো পিস!...”
খাওয়ার মাঝেই আরমান লক্ষ্য করল পদ্ম কিছুই খাচ্ছে না, কেবল ভাতের থালা নিয়ে বসে আছে। ওর মুখটা কেমন যেন শুকনো। আরমান ডাক্তার মানুষ, ও তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল কিছু একটা ব্যাপার আছে।
“পদ্ম?.?. তুমি কি অসুস্থ?.?..”
আরমান উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।
পদ্ম কিছু বলার আগেই দাদী আলেয়া বেগম মুখ খুললেন।
“আরমান, তুই তো বড় ডাক্তার, কিন্তু ঘরের খবর তো রাখিস না!... মনে হচ্ছে তোর আরমান জুনিয়র বা পদ্ম জুনিয়র আসার সময় হয়েছে।…”
পুরো ডাইনিং টেবিল মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরই সাফওয়ান আর ইয়াসিন মিলে হইহই করে উঠল।
“বড় ভাই!.. এটা তো ডাবল ধামাকা!... রাইমার পর এবার আপনার ঘরেও নতুন অতিথি?.?..” ইয়াসিন খুশিতে আটখানা।
আরমান পদ্মর দিকে তাকালো। পদ্ম লজ্জায় মাথা নিচু করে টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। আরমান ওর পিছু পিছু ঘরে ঢুকল। ও দেখল পদ্ম জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
“পদ্ম?.?.. দাদী যা বললেন তা কি সত্যি?.?..”
আরমান পদ্মর কাঁধে হাত রাখল।
পদ্ম ঘুরে দাঁড়িয়ে আরমানের হাত দুটো ধরল। ওর চোখে জল।
“আরমান, আমি ভাবিনি আমানের এত বছর পর আবার...। লিন্ডার সেই বিষ আমার শরীরটা শেষ করে দিয়েছিল ভেবেছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আবার রহমত পাঠিয়েছেন।…”
আরমান পদ্মকে জড়িয়ে ধরল।
“পদ্ম, আমাদের এই 'পদ্মপাতা'র গল্পে এটা সবচাইতে সুন্দর টুইস্ট। আমান আর আনায়া তো এখন খেলনা পাওয়ার মতো খুশি হবে।…”
বিকালে বাগানবাড়িতে এক উৎসবের আমেজ। আমানকে যখন বলা হলো ওর আরেকটা ভাই বা বোন আসছে, ও তো খুশিতে নাগরদোলার মতো ঘুরতে শুরু করল।
“আব্বু!.. এবার আমি ওকে আমার সব কমিকস বই দেব!... আনায়ার মতো ও পচা হবে না!...”
আনায়া রেগে গিয়ে আমানের পা কামড়ে দেওয়ার ভান করল।
“আমি পচা নই! আমি বুনুকে আমার পুতুল দেব!...”
করিম সাহেব আর আমেনা বেগম আজ মহাখুশি। জামাইয়ের বাড়িতে এসে এমন এক সুসংবাদ পাবেন তা ভাবেননি। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন আরও মাসখানেক এখানে থেকে যাবেন পদ্মর দেখাশোনা করতে।
সৈয়দ ভিলা এখন আক্ষরিক অর্থেই 'প্রাণের মেলা'। দাদাজানের মৃত্যুশোক কাটিয়ে নতুন প্রাণের স্পন্দনে বাড়িটা জেগে উঠেছে। নীলকুঠির জায়গায় মাদ্রাসার ছোট ছোট ছাত্রদের কোরআন তেলাওয়াত আর সৈয়দ ভিলার বারান্দায় শিশুদের হাসাহাসি—সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।
— — —
নিশিন্দীপুর ভিলার বারান্দায় এখন শরতের নরম রোদ। লিন্ডার সেই অভিশপ্ত সুড়ঙ্গ ভরাট করে সেখানে এখন বকুল ফুলের সুবাস। রাইমা আর পদ্ম—বাড়ির দুই লক্ষ্মীই এখন বিশেষ দিন গুনছে। দাদাজানের কবরের পাশে লাগানো মেহেদি গাছটা বেশ বড় হয়েছে, যেন ওপর থেকে তিনি এখনো নাতি-পুতিদের আশীর্বাদ করছেন।
সৈয়দ ভিলার অন্দরমহল আজ মৌমাছির চাকের মতো সরগরম। পদ্ম আর রাইমা দুজনেই এখন বিশ্রামে, আর বাড়ির পুরুষদের নাজেহাল অবস্থা। আরমান নিজে ডাক্তার হয়েও আজ বড্ড অস্থির। ও বারবার পদ্মর ঘরে যাচ্ছে আর জিজ্ঞেস করছে,
“পদ্ম, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?.?.. একটু পানি দেব?.?..”
পদ্ম হেসে কুটিপাটি।
“আরমান!.. শান্ত হন। আপনি তো বড় সার্জন, কত অপারেশন করেছেন!... আর নিজের বেলাতেই এত ভয়?.?..”
ওদিকে সাফওয়ান রাইমার জন্য ভিনদেশি ফল কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে বসে আছে। ইয়াসিন হাসতে হাসতে বলল,
“সাফওয়ান, তুই তো দেখছি রাইমার সেবা করার বদলে উল্টো সেবা নিবি!.. সরে বোস, আমি ফল কেটে দিচ্ছি।..”
আমান আর আনায়ার তখন নতুন মিশন। ওরা দুজনে মিলে দাদাজানের সেই খালি রুমটাকে 'বেবি রুম' বানাচ্ছে। আমান ওর পুরনো খেলনাগুলো মুছে সারিবদ্ধ করে রাখছে।
“বুনু, এই দেখ!... এই গাড়িটা আমি ছোট ভাইকে দেব। ও তো ছোট, ও চালাতে পারবে না, আমি ওকে শিখিয়ে দেব।…”
আমান গম্ভীর মুখে বলল।
আনায়া ওর একটা পুতুল নিয়ে এসে মাঝখানে বসালো।
“আর আমি এই পুতুলটা দেব!.. ও এটা নিয়ে ঘুমাবে।…”
হঠাৎ বিকেলের দিকে বাড়িতে ধুম পড়ে গেল। রাইমা আর পদ্ম—দুজনকেই একসাথে হাসপাতালে নিতে হলো। আরমান নিজে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভ করে নিয়ে গেল। আরমানের নিজের গড়া সেই 'আমান চিলড্রেন হসপিটাল' আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে।
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে করিম রহমান (পদ্মর বাবা) আর সৈয়দ আমিন সাহেব (আরমানের বাবা) পাশাপাশি বসে তসবিহ পড়ছেন। দাদী আলেয়া বেগম আর ময়না বেগম ভেতরে নার্সদের সাথে ব্যস্ত।
এক ঘণ্টা পর।
প্রথমে ভেসে এল এক নবজাতকের কান্না। কিছুক্ষণ পর আরেকটা! নার্স বেরিয়ে এসে হাসিমুখে খবর দিল— “সাফওয়ান সাহেব, আপনার কোল আলো করে এক রাজপুত্র এসেছে!... আর আরমান সাহেব, আপনারও এক রাজকন্যা হয়েছে!...”
সাফওয়ান তো খুশিতে হাসপাতালের করিডোরেই নাচতে শুরু করল। আরমান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন লিন্ডার বিষে ও মৃতপ্রায় ছিল। আজ সেই আরমান দুই সন্তানের জনক!...
আমান আর আনায়া দৌড়ে এল। “আব্বু!.. আমাদের ছোট ভাই-বোন কোথায়?.?..”
আরমান ওদের দুই হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল। একদিকে রাইমার পাশে ছোট বাবুটা হাত-পা ছুড়ছে, অন্যদিকে পদ্মর পাশে এক টুকরো চাঁদের মতো মেয়ে শুয়ে আছে।
আনায়া ওর ছোট বোনকে দেখে অবাক হয়ে বলল,
“আব্বু!.. এটা তো একদম আমার মতো দেখতে!... আমি কি এখন বড় হয়ে গেছি?.?..”
আরমান হাসল।
“হ্যাঁ মা, তুমি এখন বড় আপু।…”
এক মাস পর।
নিশিন্দীপুর ভিলায় আজ বড় এক উৎসব। নতুন দুই অতিথির আকিকা। পুরো গ্রামকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। আরমান ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দাদাজানের সেই আরামকেদারায় বসল। ও ডায়েরির শেষ পাতায় বড় করে লিখল:
“বিষের নীল দহন আমাদের পুড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই আগুনেই আমরা খাঁটি সোনা হয়েছি। লিন্ডা চেয়েছিল আমাদের শেষ করতে, কিন্তু আল্লাহ আমাদের ঘরকে চারটে চাঁদে ভরে দিলেন। আমান, আনায়া, আরিয়ান আর আমাদের এই ছোট্ট আয়রা—এরাই হলো সৈয়দ বংশের আগামী দিনের স্বপ্ন।…”
পদ্ম এসে আরমানের পাশে দাঁড়াল। ওর কোলে ছোট্ট আয়রা। আরমান আয়রার কপালে চুমু খেয়ে পদ্মর হাত ধরল।
“পদ্ম, আমাদের 'পদ্মপাতা'র গল্পটা আজ থেকে এক নতুন মোড় নিল। বিষের দিন শেষ, এখন কেবলই বসন্তের গান।…”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
পদ্ম আরমানের কাঁধে মাথা রাখল। মকবুল সাহেব আর রাহেলা বেগম দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে জামাই-মেয়ের এই সুখ দেখে চোখের জল মুছলেন।
নিশিন্দীপুরের নীল দিঘিতে এখন আর অন্ধকার ছায়া নেই। সেখানে শত শত সাদা আর লাল পদ্ম ফুটে আছে। সৈয়দ ভিলা এখন আক্ষরিক অর্থেই এক জান্নাতের টুকরো। লিন্ডার নাম মুছে গেছে, রয়ে গেছে শুধু আরমান-পদ্মর অবিনশ্বর ভালোবাসার মহাকাব্য।
নিশিন্দীপুর ভিলার এই দীর্ঘ সফরের আজ এক পূর্ণ রঙিন সমাপ্তি। যে নীল বিষ দিয়ে গল্পের শুরু হয়েছিল, আজ সেখানে হাজারো লাল-সাদা পদ্ম ফুটেছে। সময়ের চাকা ঘুরে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেখানে স্মৃতিরা কথা বলে আর ভবিষ্যৎ হাসে।
দশ বছর পর।
নিশিন্দীপুর ভিলার বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছেন আরমান। তাঁর চুলে এখন রূপোলি আভা, কিন্তু ব্যক্তিত্বে সেই আগের মতোই গাম্ভীর্য আর আভিজাত্য। তাঁর কোলে ছোট্ট আয়রা, যে এখন সাত বছরের চঞ্চল এক বালিকা। আয়রা বায়না ধরেছে,
“আব্বু, তুমি নাকি সেই লিন্ডা ডাইনীকে হারিয়ে আম্মুকে উদ্ধার করেছিলে?.?.. সেই গল্পটা বলো না!..”
আরমান হাসল। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বিষাক্ত ল্যাব, লিন্ডার চক্রান্ত আর পদ্মর সেই অশ্রুসজল মুখ। তিনি আয়রার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“মা, সে এক অন্ধকার রাত ছিল। কিন্তু তোমার আম্মুর ভালোবাসা ছিল আমার টর্চলাইট। সেই আলোতেই আমি পথ চিনে ফিরে এসেছি।…”
ঠিক তখন বাগান থেকে শোরগোল শোনা গেল। আমান এখন পনেরো বছরের এক কিশোর। লম্বা চওড়া গড়ন, অবিকল আরমানের মতো দেখতে। ও এখন ক্যাডেট কলেজে পড়ে, ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। ওর পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে তেরো বছরের আনায়া।
“ভাইয়া!... আমার সায়েন্স প্রজেক্টটা ঠিক করে দাও, নয়তো আমি আব্বুকে বলে দেব তুমি লুকিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আম্মুর ডায়েরি পড়ছিলে!...”
আনায়ার সেই পুরনো দাপট এখনো কমেনি।
আমান হাসতে হাসতে থমকে দাঁড়াল। “আরে!.. ওটা তো আমাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি!.. ওটা না পড়লে আমি বড় হয়ে লিন্ডাদের চিনব কী করে?.?..”
বাগানের এক কোণে ইয়াসিন আর মেহরিন বসে আছে। ওদের ছেলে আরিয়ান আর রাইমার ছেলে ইভান মিলে ফুটবল খেলছে। ইয়াসিন এখন নিশিন্দীপুরের সবচাইতে বড় সমাজসেবক। দাদাজানের সেই মাদ্রাসা আর এতিমখানা এখন এক বিশাল কমপ্লেক্স। ইয়াসিন মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখলে মেহরিন?.?.. বড় ভাই যদি সেদিন আমার ফাইলটা পুড়িয়ে না দিতেন, তবে আজ আমি এই সুখের মুখ দেখতাম না।…”
মেহরিন ইয়াসিনের হাত ছুঁয়ে বলল, “অতীত তো ছাই হয়ে গেছে ইয়াসিন। এখন শুধু সামনের দিকে তাকানোর সময়।..”
রাইমা আর সাফওয়ান দোলনায় বসে দুলছে। সাফওয়ান এখন এক সফল ব্যবসায়ী, আর রাইমা শিশুদের জন্য একটা আর্ট স্কুল চালাচ্ছে। ওরা দুজনেই আজ খুব তৃপ্ত।
বিকেলের নাস্তা নিয়ে বারান্দায় এল পদ্ম। দশ বছর আগের সেই চঞ্চল পদ্ম আজ এক শান্ত, মমতাময়ী জননী। ওর পরনে নীল বেনারসি, কপালে একটা ছোট্ট টিপ। আরমান পদ্মর দিকে তাকাতেই দুজনার চোখাচুখি হলো। সেই পুরনো বিদ্যুৎ খেলে গেল দুজনের মনে।
“পদ্ম, দেখছো?.?.. আমাদের ছোট চারাগাছগুলো আজ কত বড় মহীরুহ হয়ে গেছে!...”
আরমান আবেগ নিয়ে বললেন।
পদ্ম চায়ের কাপটা আরমানের হাতে দিয়ে পাশে বসল।
“হ্যাঁ আরমান। লিন্ডা চেয়েছিল আমাদের বংশের রক্ত নীল করে দিতে, কিন্তু আপনার সাহস আর আমাদের সবার একতা সেই রক্তকে আজ বিজয়ের লালে রাঙিয়ে দিয়েছে।…”
নিশিন্দীপুর ভিলার গেটে এখন নতুন করে লেখা— 'সৈয়দ প্যালেস: ভালোবাসার বাগান'।
সন্ধ্যা নামল। মগবাজারের সেই অন্ধকার গলি থেকে শুরু করে নিশিন্দীপুরের এই শান্ত সবুজ পর্যন্ত আরমান-পদ্মর যে সফর, তার সাক্ষী আজ এই নীল দিঘি আর বকুল ফুলের ঘ্রাণ।
আরমান তাঁর সেই পুরনো ডায়েরির শেষ লাইনে লিখলো:
“গল্পটা বিষ দিয়ে শুরু হলেও শেষ হলো অমৃতে। ভালোবাসা যখন ঢাল হয়, তখন কোনো বিষই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আমাদের এই 'পদ্মপাতা'র গল্প চিরকাল বেঁচে থাকবে আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে, এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে।..”
পুরো পরিবার আজ একসাথে ডিনার টেবিলে। হাসাহাসি, খুনসুটি আর ভালোবাসার এক মহোৎসব। নিশিন্দীপুর ভিলার ওপর দিয়ে এক শীতল হাওয়া বয়ে গেল। কাল সকালে এক নতুন সূর্য উঠবে, যেখানে কোনো ভয় নেই, শুধু আছে এক বুক শান্তি।
🪷🪷—সমাপ্ত—🪷🪷