ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য হৃদয়ের প্রণয় আসক্তি

৭ম পর্ব

লেখক: Aysha Siddiqui
#অবাধ্য_হৃদয়ের_প্রণয়াসক্তি
#পর্বঃ৭
#রওনোক_জাহান_হায়াত
[শুধু মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত। এবং অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ🚫।]
আরেকটি দিনের সূচনা। ব্যস্ত নগরের কোলাহল ছাড়িয়ে নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত চৌধুরী কুঞ্জ আধুনিকতার মোড়কে আবৃত হয়ে, আপন ঐশ্বর্য ও দাম্ভিকতার ভারে একযুগ ধরে দন্ডায়মান। অট্টালিকার বহিরাঙ্গন দেখতে যতটা নিগূঢ়, তার চেয়ে দ্বিগুণ নিগূঢ় এই অট্টালিকার অভ্যন্তরাঙ্গনে বসবাসরত মানুষগুলো। এদের প্রত্যেকের জীবনে কোনো না কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। যেটা তিতির চেয়েও উদঘাটন করতে পারছে না।
চৌধুরী কুঞ্জে আজ তিতিরের সপ্তম দিন। এই সাতদিনে তিতির বাড়ির প্রতিটি মানুষের আচার-আচরণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা গ্রহণ করেছে। হাবিব চৌধুরী  স্বল্পভাষী একজন ব্যক্তি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তিনি কথা বলা পছন্দ করেন না। তবে তার বড় ছেলে আর নাতনির ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যতিক্রম লক্ষ্য করেছে তিতির। 
অন্যদিকে তানজিলা বেগমের সাথে ওর সম্পর্কটা হয়ে উঠেছে সাপে-নেউলের মতন। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। আরেকদিন আরমান হলো তিতিরের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গম্ভীর ব্যক্তি। সেদিন কোহিনূর তিতিরকে বলেছিল জায়ান নাকি এই বাড়ির সবচেয়ে গম্ভীর ব্যক্তি। কিন্তু তিতির এই সত্য মানতে নারাজ। 
তবে তিনজন মানুষের সাথে তিতিরের ভীষণ ভাব হয়েছে। জায়ান, ঝিলিক আর কোহিনূর। ওরা চারজন মিলে যেন এখন একটা দল হয়ে উঠেছে। বিকালে অবসর সময়ে চারজন একসাথে মুভি দেখে, আবার কখনো-সখনো তিতির আর কোহিনূর নিজেদের সুখ-দুঃখের গল্প করে। কোহিনূর বয়সে তিতিরের চেয়ে ৭বছরের বড়। যারফলে তিতিরের প্রতি কোহিনূরের আচরণ বড় বোনের ন্যায়। দুজনের মধ্যে এত ভাব হওয়ার শর্তেও কোহিনূর একটা জায়গায় গিয়ে আটকে যায়। যখনই তিতির জিজ্ঞেস করে তিন বছর আগে কি ঘটেছিল? যার জন্য জায়ানের এমন অবস্থা! এবং অরিনই বা কে? আর এক বছর আগেই বা এমন কি হয়েছিল যার জন্য আরমান আর তার সম্পর্কের এমন বেহাল পরিণতি? কোহিনূর প্রশ্নগুলো শুনেই ইতস্তত হয়ে উঠে। বরাবরই সে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে চলে। 
. 
ব্রেকফাস্ট শেষ করে তিতির স্টাডি রুমের দিকে অগ্রসর হয়। স্টাডি রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে নক করতেই ভেতর থেকে হাবিব চৌধুরী তাকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। তিতির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় হাবিব চৌধুরী গভীর মনোযোগ দিয়ে একটি ডায়েরিতে কি যেন লিখছেন। তিতির কিয়ৎক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে হাবিব চৌধুরীকে অবলোকন করে। অতঃপর হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, 
–”আপনার সাথে একটু বলার ছিল, আঙ্কেল।”
তিতিরের ডাকে মনোযোগ ভঙ্গ হয় হাবিব চৌধুরীর। তিনি ডায়েরিটি বন্ধ করে তিতিরের পানে নির্বিকার দৃষ্টে তাকায়। মেয়েটা কেন এসেছে তা বুঝার চেষ্টা করে। অতঃপর শান্ত কন্ঠে বলে, 
–”হ্যাঁ, বলো। তবে তার আগে আমাকে আঙ্কেল বলা বন্ধ করো। সম্পর্কে এখন আমি তোমার শ্বশুর হই।”
–”আচ্ছা। চেষ্টা করবো।”
একটু থামল তিতির। আরেকবার তাকিয়ে হাবিব চৌধুরীর মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করল। তারপর স্বাভাবিকভাবেই বলল, 
–”আমি আজকে একটু আব্বুর বাসায় যাবো।”
কথাটুকু কর্ণগোচর হতেই হাবিব চৌধুরীর নির্বিকার মুখাবয়ব ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করলেন, 
–”কেন?”
–”এ বাড়িতে আসার পর থেকে আব্বুর সাথে একবারও কন্টাক্ট করতে পারিনি। তাই, যাবো।”
হাবিব চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে মেয়েটির বদন অবলোকন করলেন। উনি চান না তিতির ওই এপার্টমেন্টে যাক। ওর বাবা যে কেমন মানুষে পরিণত হয়েছে তা হাবিব চৌধুরী খুব ভালো করেই জানেন। 
ভদ্রলোক নিজের গলা ঝেড়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, 
–”যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওখানে না যাওয়াটা তোমার জন্যই ভালো, তিতির। আমি তোমাকে কিছুতেই যেতে দেব না।”
তরণীর মুখখানি মুহুর্তেই বিরক্তিতে শক্ত হয়ে উঠে। 
ও অকপট কন্ঠে বলে, 
–”আমি এখানে আপনার অনুমতি নিতে আসি নি। 
নেহাত আমাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছেন। তাই কেবল জানিয়ে দিলাম।”
কথাটা শেষ করে তিতির যেতে নেবে তার পূর্বেই 
হাবিব চৌধুরী পেছন থেকে ডাকলেন, 
–”তিতির। অ্যাট লিস্ট, আমার কথাটা শুনো, মা। আমি তোমার খারাপ চাই না।”
তিতির পেছন ঘুরে তাকালো। হাবিব চৌধুরী ওর দিকে এগিয়ে এসে ওর সম্মুখে দাঁড়ালেন। আর নির্লিপ্ত স্বরে বললেন, 
–”তোমার বাবা তোমাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল।”
মুহুর্তের জন্য তিতির স্তব্ধ হয়ে যায়। বিস্ফোরণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাবিব চৌধুরীর পানে। রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসল। ভীষণ রাগ হচ্ছে এখন হাবিব চৌধুরীর। লোকটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওর বাবা কেন ওকে বিক্রি করার কথা ভাবতে যাবে? 
–”আপনি কি আমার সাথে মশকরা করছেন? আমার বাবা আমাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল! আপনি বলবেন আর আমি এটা বিশ্বাস করে নেব? বলদ মনে করেন আমাকে?”
হাবিব চৌধুরীর মুখাবয়ে কোনরকম পরিবর্তন ঘটল না। ভদ্রলোক পূর্বের ন্যায় নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তিতিরের পানে। মেয়েটার গোসা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আচম্বিৎ কোনো সন্তান নিজের জন্মদাতা সম্পর্কে এমন কথা শুনলে, কখনোই তা সহজে মেনে নিতে পারবে না। তিতিরের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। হাবিব চৌধুরী সম্পূর্ণ শান্ত থেকেই বললেন, 
–” আমি যে মশকরা করার মতন মানুষ নই, সেটা তুমি এই ৭ দিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছো। তোমার বাবা সত্যিই তোমাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল।”
তিতির ঋজুভঙ্গিতে দাঁড়াল এবার। নিজের দু'হাত বুকের উপর ভাঁজ করে সরু দৃষ্টিতে হাবিব চৌধুরীর পানে তাকিয়ে, সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলল, 
–” আচ্ছা। তা আপনি কিভাবে জানলেন?”
হাবিব চৌধুরী অতিশয় শীতল স্বরে বললেন, 
–”গত একবছর ধরে তোমার আর তোমার বাবার উপর নজর রাখছি। সেই সূত্র ধরেই জানতে পেরেছি। 
তাই, তোমার বাবা কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই আমি তার কাছে তোমার আর জায়ানের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা না করে দিয়েছিল। যার জন্য পরবর্তীতে আমায় তাকে টাকার লোভ দেখাতে হয়েছে।”
বলেই থামলেন ভদ্রলোক। আবারো নির্লিপ্ত চাহনিতে মেয়েটার প্রতিক্রিয়া নীরিক্ষণ করলেন। মেয়েটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছাপ। যা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন হাবিব চৌধুরী। আর অবসাদে বললেন, 
–”ঠিক আছে। তুমি তোমার বাবার কাছে গিয়েই না হয় তাকে জিজ্ঞেস করো। যাও। তবে একটা কথা মাথায় রেখো, আর যাই করি আমি কখনো তোমার খারাপ চাই না। তুমি আমার কাছে আমার মেয়ের মতন।”
তিতির কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর 
নিজেকে ধাতস্থ করে মন্থর পদক্ষেপে স্টাডি রুমে ছেড়ে বেরিয়ে গেল। হাবিব চৌধুরী নিষ্ফল দৃষ্টিতে ওর যাওয়ার পানে চেয়ে রইলেন। তারপর একটা ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে আবারো ডায়েরি লিখতে বসে পড়লেন। 
. 
. 
বেলা বাজে ১০টা । তিতির তাদের এপার্টমেন্টের ভবনের সামনে এসে দাঁড়ায়। একা একাই এসেছে। কোহিনূর তাকে গাড়ি নিয়ে আসতে বললেও, তিতির একপ্রকার জেদ করেই গাড়ি নিয়ে আসে নি। ভবনের ভেতরে পা বাড়াতেই  তরণীর অন্তঃকরণ আচানক কেঁপে উঠে। হাবিব চৌধুরীর বলা কথাগুলো এলোমেলোভাবে তার মস্তিষ্কে রিনরিন করছে। লোকটার কথা বলার ধরণ দেখে বুঝাই যাচ্ছিল তিনি মিথ্যে বলেন নি। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আশহাদ রহমান যতই খারাপ হোক, তিতির তার নিজের মেয়ে। তার রক্ত, তার অস্তিত্ব। নিজের মেয়েকে বিক্রি করার কথা আদৌও কি কোনো বাবার পক্ষে ভাবা সম্ভব? এতোটা নিষ্ঠুরও বুঝি কোনো পিতা হতে পারে? 
মস্তিষ্কে একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে তিতির তাদের এপার্টমেন্টের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দ্বিধান্বিত হস্তে তিনবার ডোরবেল বাজায় তিতির। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ এসে দরজা খুলে না। তিতিরের ভ্রুদ্বয় কুঁচকে গেল। সে দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই তা খুলে যায়। এতে অবশ্য তিতির অবাক হয়না। কারণ আশহাদ রহমান প্রায়শই নেশা করে ফিরে ঘরে দরজা বন্ধ না করেই ঘুমাতে চলে যান। ভেবেই ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল তরুণী। ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় তার বাবা সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে  শুয়ে আছে। 
তিতির তার নিকট কিঞ্চিৎ অগ্রসর হয়ে মৃদু স্বরে ডাকল, 
–”আব্বু!”
কারো কন্ঠস্বর কর্ণাটকে পৌঁছাতেই আশহাদ রহমান
নিজের চোখ মেলে তাকালেন। তিতিরকে সামনে দেখে তিনি কপাল কুঁচকে তাকান। মেয়েকে দেখে যে তিনি খুশি হন নি ,তা স্পষ্টভাবে তার চেহারায় ফুঁটে উঠেছে। তিনি টলতে টলতে শোয়া থেকে উঠে বসেন। আধো’মাতাল গলায় বলেন, 
–”তিতির! তুই এখানে?”
তিতির একটা শুষ্ক ঢোক গিলে। অধরে বিষন্ন হাসি টেনে বলে, 
–”তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি, আব্বু। কেমন আছো?”
মেয়েটা কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে ওঠে। না চাইতেও অক্ষিপট অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। কিন্তু এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ ঘটল না আশহাদ রহমানের মাঝে। তিনি কর্কশ কন্ঠ বললেন, 
–”ভালো আছি। খুব ভালো আছি। আমার সব ঋণ পরিশোধ হয়েছে, রোজ দু'বেলা মাল খেতে পাচ্ছি। আর কি চাই জীবনে?”
–”আমার কথা মনে পড়ে না তোমার,আব্বু?”
আশহাদ রহমান দৃষ্টি তুলে তিতিরের মুখের দিকে তাকালেন। তার চাহনিতে স্নেহের লেশমাত্রও নেই। তিনি নিরাবেগ কন্ঠে জানান, 
–”তোকে মনে পড়বে কেন? বরং তুই যাওয়াতে এখন আমি আরো বেশি শান্তিতে আছি। আপদ বিদায় হয়েছে।”
কথাটা যেন ছুরির আঘাতের মতো বিধল তিতিরের বক্ষে। অক্ষিপট থেকে দু'ফোঁটা অশ্রু গলগল করে গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটা রুদ্ধ স্বরে আওড়ালো, 
–”আব্বু, হাবিব চৌধুরী বলল তুমি নাকি আমায় বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলে! আমি… আমি উনার কথায় বিশ্বাস করি নি, আব্বু। উনি মিথ্যে বলেছে, তাই না?”
তিতির ভীষণ প্রত্যাশা নিয়ে তাকাল তার বাবার পানে। 
তিতিরের কথা শুনে মিটমিট করে হেসে উঠেন আধো মাতাল লোকটি। আর বললেন, 
–”উনি সত্যি বলেছেন। আমি তোকে সত্যিই বিক্রি করে দিতাম। কিন্তু উনি নিজের পাগল ছেলের সাথে তোর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন। আমি প্রথমে না করে দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি বললেন যে উনি আমায় ৫০ লাখ টাকা দেবেন। তাই আর বিয়েতে না করতে পারি নি, বুঝলি?”
আশহাদ রহমানের স্বীকারোক্তি শুনে তিতির থমকে গেল। এক মুহুর্তের জন্য মনে হল তার পদতল থেকে মাটি সরে গেছে। বক্ষগহ্বরে অসহনীয় যন্ত্রণা শুরু হলো। যেন কেউ তার হৃৎপিণ্ড’কে তলোয়ারের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। বাবার প্রতি যেই শেষ সম্মানবোধ, ভালোবাসা অবশিষ্ট ছিল তার অন্তরে, তা মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল। বিষাদময় ঘৃণা তার হৃদয়কে রক্তাক্ত করল। তিতির আর্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে তরুণী, 
–”বিয়ে দিয়েছো? সেই তো একই হলো। টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছো আমায়? কেমন করে আমার সঙ্গে এতো বড় অন্যায়টা করতে পারলে তুমি? আমি তো তোমার রক্ত, তোমার অস্বিত্ব, আব্বু। কেন করলে এমন?”
আশহাদ রহমান টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন। তিতিরের সম্মুখে এগিয়ে এসে স্থির হলেন। তার চক্ষুদ্বয়ে ঘৃণা আর ক্রুদ্ধ ফুঁটে উঠল। যা তিতিরের দৃষ্টিগোচর হলো না। মেয়েটার অন্তর পুড়ে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তার বাবা তাকে এতোটা ঘৃণা করে! কিন্তু কেন? কোন ভুলের এমন নির্মম শাস্তি তাকে 
পেতে হচ্ছে? প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তিতিরের। আর তার প্রশ্নের উত্তরগুলো আশহাদ রহমান ক্ষুব্ধ কন্ঠে দিতে শুরু করেন, 
–”তুই… তুই একটা অপয়া। তোকে জন্ম দিতে গিয়ে তোর মা ম’রেছে। তোর জন্য আমি আমার জোৎস্নাকে হারিয়েছি। তবুও… তবুও তোকে একা একা বড় করেছি। কিন্তু ওইযে তুই তো অপয়া। তোর তেরোতম জন্মদিনে আমি আমার চাকরিটা হারাই । ইচ্ছে করেছিল সেদিনেই তোকে গলা টিপে মে’রে ফেলি। কিন্তু পারলাম না। কেন জানিস?”
তিতির কোনো জবাব দিতে পারলো না। কি জবাব দেবে সে? তার বাবা তো তাকে জন্মের পর থেকেই ঘৃণা করে। এতকিছু শোনার পর তার আর বলার মত কি বা থাকতে পারে! আশহাদ রহমান কিয়ৎক্ষণ তিতিরের কান্না মিশ্রিত মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবার বলতে লাগে, 
 – “তোর এই চোখ দুটো… একদম তোর মায়ের মতো। এই চোখগুলোর দিকে তাকালে তোকে মেরেও ফেলতে পারি নি। তাই তো আঠারোটা বছর অন্তরে ঘৃণা পুষে রেখে তোকে বড় করেছি। কিন্তু এই কয়েক বছরে অনেক ঋণ হয়ে গিয়েছিল। সম্পদ বলতে কেবল এই এপার্টমেন্টটাই আছে। এটাও যদি বিক্রি করে দিই, তাহলে গৃহহীন হয়ে যাব। এই জন্যই তোকে বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু তোর সৌভাগ্য যে, তা করার আগেই হাবিব চৌধুরী তোকে তাঁর ছেলের বউ করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এলেন। মেয়ে হয়েই তো জন্মেছিস। বিয়ে করে পরের ঘরেই যেতে হবে। তাই আমিও তোকে জায়ানের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলাম। তোর তো খুশি হওয়ার কথা! এত বড়লোক শ্বশুরবাড়ি পেয়েছিস। নাহলে তোকে বিক্রি করে দিলে এখন কোথায় থাকতি, কে জানে?”
তিক্ত সত্যগুলো শুনে তিতির আর সহ্য করতে পারল না। চোখমুখ খিঁচে নিজেদের লোচন জোড়া বন্ধ করে নিল। তার বাবা এতোটা ঘৃণা করে তাকে? এতোটা পাষাণ! তরুণীর হৃদয়দাহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একারণেই হাবিব চৌধুরী তাকে এখানে আসতে নিষেধ করে ছিলেন। আর তিতির তাকেই ভুল বুঝল। একটা রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো তিতির। নিজের চোখ দু'টো মেলে বাবার দিকে তাকালো। অশ্রুতে টইটম্বুর নয়ন জোড়া বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল। তবুও আশহাদ রহমানের পাষন্ড হৃদয় তাতে গললো না। তিনি নিস্পৃহ চাহনিতে তাকিয়ে আছেন তিতিরের দিকে। নেশার ঘোর এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। তবে হুঁশ আছে। কি বলছেন, কি করছেন; সব বুঝেও কোনো অনুতাপ বোধ হলো না তার অন্তরে। 
তিতির দু'কদম পিছিয়ে গেল। নিজের চোখের জল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নেয়। অধরে নিষ্প্রভ হাসি টেনে বলে, 
–”তুমি ঠিক বলেছ। আমি খুশি আছি, সুখে আছি। তবে শ্বশুরবাড়ির লোক বড়লোক বলে নয়; ভালো মানুষ বলে। ওরা খুব ভালো।”
আশহাদ রহমান নিরাবেগ কন্ঠে বললেন, 
–”তো যাহ। ওদের সাথে থাক। এখানে এসে আমাকে বিরক্ত করিস না। তোর মুখ দেখতেও আমার ইচ্ছে করে না। তুই আমার কাছে অপয়া। তোর জন্য আমি আমার সব হারিয়েছি।”
বলেই আবারো সোফায় লুটিয়ে পড়লেন। তিতির কয়েক মুহুর্ত এক ধ্যানে তার বাবাকে দেখলো। অন্তর জ্বলে খাঁ-খাঁ হয়ে যাচ্ছে। তবুও মুখ ফুঁটে আর বলল না কিছু। এতোদিন তিতির ভাবতো তার আব্বু হিরো। কিন্তু এখন মেয়েটা বুঝল তার আব্বু আসলে একজন অভিনেতা। যে এতোদিন তার স্নেহের অভিনয়ের আড়ালে তার অন্তরের ঘৃণা লুকিয়ে রেখেছিলেন। 
মেয়েটা নিজের ব্যাগ শক্ত করে ধরে। আর রুদ্ধ স্বরে বলল, 
–”আসি, আব্বু। ভালো থেকো, কেমন? আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করতে আসবো না।”
. 
. 
. 
বেলা গড়িয়ে মধ্যাহ্ন। জায়ান ঘুম থেকে উঠেছে। তিতির তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেছিল। নিজের চক্ষুদ্বয় মেলে একবার চতুর্দিকে চোখ বুলালো জায়ান। কোথাও তিতিরকে দেখতে ফেলো না। মুহুর্তেই চোখের ঘুম মিলিয়ে গেল তার। তার তিতির বউ কোথায়? জায়ান ধীরলয়ে উঠে বসে। দু'হাত চোখে বুলিয়ে বিছানা ছেড়ে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে। ঘুমের কারণে তার কন্ঠস্বর কর্কশ হয়ে উঠে, 
–”তিতির বউ! তিতির বউ, তুমি কি ভেতরে আছো?”
কিন্তু কোনো সারা’শব্দ এলো না ভেতর থেকে। জায়ান দরজা হালকা ধাক্কা দিতেই তা খুলে যায়। ভেতরে তিতির নেই। এবার  মনে কিঞ্চিৎ ভয়ের সঞ্চার হয়। জায়ান দ্রুত রুমে থেকে বেরিয়ে যায়। পুরো বাড়িতে তিতিরকে ডেকে খুঁজতে শুরু করে। সেই সময় করিডোরে তানজিলা বেগমের সাথে দেখা হয়। মহিলাকে দেখে জায়ান থমকে গেল। কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে শিশুসুলভ উদ্বেলিত কন্ঠে আওড়ায়, 
–”স্টেপ মাম্মা! তিতির বউ কোথায়?”
তানজিলা বেগম আপাদমস্তক অবলোকন করলেন জায়ানকে। ছেলেটার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, মুখাবয়বে ছড়িয়ে আছে চাপা আতঙ্কিত। এক নিমেষেই বুঝতে পারেন জায়ান জানে না তিতির যে তার বাবার বাসায় গেছে। ব্যস, সুযোগ পেয়ে তার অপব্যবহারই করলেন মহিলা। তার অধরে কোণে ফুঁটে উঠল একখান অশুভ হাসি। তিনি জানান, 
–”তিতির? ও তো চলেছে গেছে। বলেছে তোর মতো পাগলের সাথে থাকতে পারবে না।”
কথাগুলো শ্রবণ হতেই জায়ানের মস্তিষ্কে আঘাত আনবো। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো তার সমগ্র মুখাবয়বে। সে তানজিলা বেগমকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আবারো তিতিরকে ডাকতে লাগে। লিভিং এরিয়াতে এসেও বেশ অনেকবার ডাকে। কিন্তু প্রত্যুত্তরে কেবল পিনপতন নিরবতা ভেসে বেড়ায় কক্ষে। আতঙ্কে জায়ানের দীর্ঘদেহ কাঁপতে শুরু করে। তানজিলা বেগমের কথাগুলো তার মস্তিষ্কে বারংবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগে। তার তিতির বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে! এটা তার মন মানতে চাইছে না। নিজেকে সামলাতে না পেরে জায়ান এক এক করে লিভিং রুমের জিনিসপত্র আছাড় মে'রে এদিকে-সেদিক ছুঁড়তে শুরু করে। ভাঙচুরের শব্দে রান্না ঘর থেকে কোহিনূর ছুটে আসে। জায়ানকে উন্মাদের মতন ভাঙচুর করতে দেখে রমণী বিস্মিত হয়। জায়ানের কাছে গিয়ে তাকে থামবে কিনা তা ভেবে পাচ্ছে না। 
তখনই উপর থেকে হাবিব চৌধুরী আর আরমান একপ্রকার দৌড়ে আসেন। জায়ানকে পাগলের মতন জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে দেখে তারা দু'জনেই হতবিহ্বল হয়ে যায়। আরমান জায়ানের নিকট অগ্রসর হতে গেলে জায়ান তার দিকে একটা ফ্লাওযার ভেইস ছুঁড়ে মারে। তবে সৌভাগ্যবশত আরমান তড়িৎগতিতে সরে যায়। আর ফ্লাওয়ার ভেইসটি সিঁড়ির নিকট পড়ে ঝনঝন শব্দে ভেঙে যায়। হাবিব চৌধুরী ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে খপ করে জায়ানের হাত ধরে ফেলেন। আর শক্ত কন্ঠে আওড়ালেন,
–”কি হয়েছে, জায়ান? এমন ভাঙচুর করছ কেন?”
জায়ান তার বাবার দিকে তাকায়। মুহুর্তেই উন্মাদ পুরুষটির চক্ষুদ্বয় অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। কম্পিত কন্ঠে বিড়বিড় করে বলে, 
–”পাপা, আমার তিতির বউ…”
ছেলের কম্পিত কন্ঠস্বর শুনে হাবিব চৌধুরী নিজের দৃষ্টি নমনীয় করে তুললেন। কণ্ঠস্বর নরম করে আবারো আওড়ালেন, 
–”তিতির কি?”
জায়ান শব্দ করে কেঁদে উঠে। বাবার হাত খামচে ধরে। আরমান আর কোহিনূর স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে জায়ানের দিকে। ছেলেটা কেন এমন করছে কেউই বুঝতে পারছে না। এদিকে দোতলা থেকে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছেন তানজিলা বেগম। তার অধরে একটা তৃপ্তির হাসি ফুঁটে উঠে। জায়ানের কষ্টে তার অন্তরে প্রশান্তির ঢেউ বয়ে যায়। জায়ান তার বাবার পানে তাকিয়ে অস্থির স্বরে বলে, 
–”আমার তিতির বউকে এনে দাও। প্লিজ পাপা! ও... ও মাম্মা আর অরিনের মতন আমায় ছেড়ে চলে গেছে, পাপা। ওকে এনে দাও। নাহলে... নাহলে আমি সব ধ্বংস করে দেবো,পাপা। আমার তিতির বউকে চাই চাই চাই।”
কথাটা শোনা মাত্রই হাবিব চৌধুরী, আরমান আর কোহিনূর হতবাক হয়ে যায়। কি বলছে? তিতির চলে গেছে? তবে হাবিব চৌধুরী দ্রুতই বিষয়টি অনুবাধন করে ফেলেন। আর জায়ানকে শান্ত করার প্রয়াসে বলেন, 
–”তিতির কোথাও যায় নি। ও শুধু ওর বাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পর চলে আসবে। তুমি শান্ত হও।”
কিন্তু জায়ান মানতে নারাজ। তানজিলা বেগমের কথাগুলো ওর মস্তিষ্কে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। যা হাবিব চৌধুরীর কথায় কমার নয়। 
#চলবে… ?
[রিচেক দেওয়া হয় নি। পরে সময় করে ভুলগুলো সংশোধন করে দেবো। আর তোমাদের একটা কথা বলি। পেইজের রিচ ডাউন হয়ে গেছে। অনেকের কাছেই নোটিফিকেশন যাচ্ছে না। তাই তোমরা পোস্টে বেশি বেশি করে রেসপন্স করো আর শেয়ার করো। আর পোস্টে যেই ভিউজ আসে তাতে 2k রিয়েক্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তোমরা রিয়েক্ট দাও না অনেকেই। তাই প্লিজ অন্তত পেইজের রিচ ঠিক করার কথা ভেবে একটু ঠিকঠাকভাবে রেসপন্স করো।🥺💔।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন