ফন্ট সাইজ:
থিম:
পারমিতা (সিজন ২)

৯ম পর্ব

লেখক: নাবিলা আহমেদ

#পারমিতা ২

#পর্ব_৯

#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ

“দিন-তারিখ ঠিক করার ব্যাপারটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু সবাইকে কী বলব? আফরিনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হলো, কিন্তু বিয়ে হচ্ছে মিতার সঙ্গে। এই ব্যাপারটা সবাইকে কীভাবে বোঝাব?” হাবিব চৌধুরীর কণ্ঠে উদ্বেগ।

“আমিও তাই ভাবছি” সায় মেলান ওয়াহিদ চৌধুরী।

“একটা কাজ করলে কেমন হয়?” হঠাৎ বলে ওঠেন আনিকা চৌধুরী। সবাই আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকায়।

“নতুন করে কার্ড ছাপিয়ে সবাইকে আবার নিমন্ত্রণ পাঠাই। বলব, আগের কার্ডে নামটা ভুল ছিল।”

“কথাটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়, ভাবি” বলেন মায়া চৌধুরী। তার কণ্ঠ মলিন। এসব কিছুতে তার যেন কোনো উচ্ছ্বাস বা কৌতূহল নেই। থাকবেই বা কীভাবে? মিতা যে এই বিয়েতে খুশি নয়, তা তিনি ভালো করেই জানেন। হঠাৎ নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে তার।

“বিশ্বাসযোগ্য না হলেও আমাদের আর কিছু করার নেই, মায়া” উত্তর দেন আনিকা চৌধুরী।

“আমার মনে হয় ভাবি ঠিক বলছেন। যারা জেনে গেছে, তারা তো জেনেই গেছে। কিন্তু যারা এখনো অজানা, তাদের তো জানাতে হবে” বলেন ওয়াহিদ চৌধুরী।

“আর দিন-তারিখ? সেটা কি আগেরটাই থাকবে?” সবার মতামত জানতে চান হাবিব চৌধুরী।

“না, অন্য তারিখ দেখুন” হতাশ কণ্ঠে বলেন মায়া চৌধুরী।

“আমার মেয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিনে যেন অন্য কারো অতীতের ছায়া না থাকে” তার চোখ ভিজে আসে। চোখের পানি টলমল করছে। আনিকা চৌধুরী মায়া চৌধুরীর কষ্ট বুঝতে পেরে তার কাঁধে হাত রাখেন। মায়া চৌধুরী ঠোঁটে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

“

আগামী পরশু কেমন হবে? আমার মনে হয়, যত দ্রুত বিয়েটা হয়ে যাবে, তত দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে। যত দেরি করব, আফরিনের জন্যও ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হবে” নিজের মতামত জানান হাবিব চৌধুরী।

“আপনার যা ভালো মনে হয়, তাই করুন” কাঁপা কণ্ঠে কথাটা বলেই উঠে চলে যান মায়া চৌধুরী।

“কী থেকে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না” কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেন ওয়াহিদ চৌধুরী। ক্ষণে ক্ষণে নিজের ওপর রাগ হচ্ছে তার। কী হতো যদি সেদিন পার্টিতে ম'দ না থাকত? নিজের ভুলের জন্য নিজের মেয়েদের জীবন নষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।

“সবটাই ভাগ্য” বলেন আনিকা চৌধুরী।

দোতলার করিডরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে আর শুনছে অরিয়ন। বিয়ের তারিখ ঠিক হতেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে হয়, মাথা থেকে বিশাল একটা বোঝা নেমে গেছে। তার ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। কী করেছে সে? এত খুশির কী আছে? তবু মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়াটা পেতে চলেছে সে।

আমায় দিও একটুখানি ছুঁয়ে

আমায় দিও একটুখানি মন

এই জনমের জন্ম-মৃত্যু জানে

তুমি ছাড়া শূন্য এ জীবন

পকেটে হাত ঢুকিয়ে গানের লাইনগুলো গাইতে গাইতে হাঁটা শুরু করে অরিয়ন। একটু পরেই চলে যাবে চৌধুরী মেনশনে।

-------------

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মিতা। ভ্যাপসা গরম ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আকাশ মেঘে কালো হয়ে আছে, সন্ধ্যা না হলেও সন্ধ্যার মতো মনে হচ্ছে। নীল আকাশে জমে থাকা এই কালো মেঘগুলো মিতার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। কেন মুষলধারে গর্জে পড়ছে না এই বৃষ্টি? কেন নিজেকে আর মিতাকে হালকা করে দিচ্ছে না এই পবিত্র বৃষ্টি?

মিতার মুখ মলিন, চেহারায় প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। রোবটের মতো একদিকে তাকিয়ে থাকে সারাক্ষণ। একটা মানুষ কতটা অপরাধ করলে তাকে এমন জীবন দেওয়া হয়? ঠিকই তো, অপরাধ তো মিতা করেছেই। ভীষণ অপরাধ করেছে। নিজের বোনের সংসার না হওয়ার অপরাধ, অপছন্দের মানুষকে নিজের কাছে আসার সুযোগ দেওয়ার অপরাধ, একজন সহজ-সরল মানুষকে ঠকানোর অপরাধ। সাকিবকে ঠকানোর মতো অপরাধ করেছে মিতা।

সাকিবের সঙ্গে মিতার পরিচয় দুই বছর আগে। যদিও মিতার সাকিবের প্রতি ভালোবাসা রূপ নেয় ছয় মাস আগে। এরপর সাকিবকে ইনিয়ে-বিনিয়ে রাজি করিয়েছে সে। যেখানে ছেলেরা মেয়েদের স্বপ্ন দেখায়, সেখানে সাকিবকে স্বপ্ন দেখিয়েছে মিতা। অর্থ-সম্পদের এই ব্যবধান কখনো তাদের মধ্যে বাধা হতে পারবে না, এমন স্বপ্ন দেখিয়েছিল মিতা। কিন্তু কী হলো? অপবিত্র নিজেকে সাকিবের সামনে দাঁড় করানোর শক্তিও তার নেই।

❝আকাশ আর পাতালের এই মধ্যকার পার্থক্য তুমি কখনো ঘোচাতে পারবে না, পারমিতা। এই সমাজ আমাদের কখনো এক হতে দেবে না❞ সাকিবের কথাগুলো সূচের মতো মিতার বুকে বিঁধছে। না, এই সমাজ তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারেনি, করেছে মিতা নিজেই। মিতার একটি ভুল মিতার থেকে সাকিবকে কেড়ে নিয়েছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে মিতার।

“কী করেছি আমি, কী করেছি!” নিজের গালে আঘাত করে মিতা। রাগে ইচ্ছে করছে বেলকনি থেকে লা'ফ দিতে। নাকি গ'লায় দ'ড়ি দেবে সে? তিনটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে সে। তার ওপর মায়া চৌধুরীকেও হতাশ করেছে মিতা। বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। ক্ষণিকেই সব ভিজে যায়। বৃষ্টির ঠান্ডা পানি ছুঁয়ে যায় মিতাকে। আকাশের দিকে তাকায় মিতা। মনে পড়ে যায় তেরো বছর আগের কথা।

হাবিব চৌধুরীরা তিন ভাই। কোনো বোন নেই। ওয়াসিম চৌধুরী ছিলেন সবার ছোট। ভাইদের কারোরই টাকা-পয়সার কমতি ছিল না। কিন্তু নৈতিক শিক্ষার অভাব ছিল ওয়াসিম চৌধুরীর। বিয়ের পরও পরনারীর নেশা তিনি ছাড়তে পারেননি। অপরদিকে, ওয়াসিমকে ভালোবেসে সব ছেড়ে এসেছিলেন সুমাইয়া। মিতার তখন পাঁচ বছর। হঠাৎ একদিন ধরা পড়ে যান সুমাইয়ার কাছে। সংসারে শুরু হয় ঝামেলা।

একদিন কী হলো, মিতা জানে না। শুধু জানে, সেদিন মা-বাবার ঘর থেকে প্রচুর চিৎকারের শব্দ আসছিল। ছোট্ট মিতা ভয়ে দরজার পাশে লুকিয়ে দেখছিল কী হচ্ছে। মুখে মুখে ঝগড়া তখন হাতাহাতিতে রূপ নিয়েছে। এক লাথিতে দূরে গিয়ে পড়েন সুমাইয়া। সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও প্রহার করেন ওয়াসিম চৌধুরী। মিতা গিয়ে জড়িয়ে ধরে সুমাইয়াকে। কাঁদছে সে। যখন ওয়াসিম চৌধুরীর হুশ ফিরল, ততক্ষণে সুমাইয়ার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে কল করেন হাবিব চৌধুরীকে।

সেদিন বাড়িতে সব চাচ্চুরাই এসেছিলেন। মায়া চৌধুরী কোলে তুলে নেন কাঁদতে থাকা মিতাকে। কিছুক্ষণ পর গাড়িতে করে কিছু মানুষ আসে। নিয়ে যায় ওয়াসিম চৌধুরীকে। এরপর আর কোনোদিন নিজের বাবাকে চোখে দেখেনি মিতা। সেই থেকে কোলেপিঠে মিতাকে বড় করেছেন মায়া চৌধুরী। সেই মাকে কষ্ট দিয়েছে মিতা, সেই মাকে হতাশ করেছে মিতা।

❝বোন হিসেবে কলঙ্ক❞

❝প্রেয়সী হিসেবে কলঙ্ক❞

❝সন্তান হিসেবে কুলাঙ্গার❞

❝স্ত্রী হিসেবেও তাই হবি❞

কথাগুলো বারবার মিতার মাথায় ঘুরছে। সে কি কোনোভাবেই ভালো মানুষ হতে পারবে না? যাকে সে সহ্যই করতে পারে না, তার প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করবে কীভাবে? ভালোবাসা না হয় বাদই দিল। ভালোবাসার ইচ্ছে নেই তার। রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে যায় মিতা। শরীর ভিজতে শুরু করেছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের পানি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

“আই অ্যাম সরি” বিরবির করে বলে মিতা।

-------------

দুই বাড়িই ধীরে ধীরে সেজে উঠছে। উৎসবের আমেজে ঢেকে যাচ্ছে বাড়িঘর। দূরের মেহমানরা সকাল থেকেই আসা শুরু করেছে। কিন্তু এত আমোদ-আহ্লাদের মধ্যেও মিতার মুখে হাসি নেই, আফরিনসহ অন্যদেরও একই অবস্থা।

মিতার ঘর চুপচাপ। সবসময় ঘর মাথায় তুলে নেওয়া মেয়েটা যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। পাশে বসে আছে আফরিন। চৌধুরী বাড়ি থেকে মিতার জন্য কাপড় পাঠানো হয়েছে। যেভাবে পাঠানো হয়েছে, সবকিছু সেভাবেই রয়েছে। আফরিন জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরেছে সে। ডালায় থাকা প্রতিটি জিনিস গোলাপি রঙের—মিতার পছন্দের রঙ। এসব কার কাজ, তাও বুঝতে পারে আফরিন।

আচ্ছা, মিতাকে কি সবকিছু বলে দেবে আফরিন? বলা কি ঠিক হবে? কিন্তু কী বলবে?

❝অরিয়নের নজর প্রথম থেকেই তোর ওপর ছিল। অরিয়ন তোকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। অরিয়ন যা করেছে, ইচ্ছে করেই করেছে।❞ কথাগুলো আফরিনের ঠোঁটে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু এসব বলে কি কোনো লাভ আছে? অরিয়নের প্রতি মিতার অপছন্দ তখন ঘৃণায় রূপ নেবে। যা হয়ে গেছে, তাতে মিতাকে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। জীবন তো এখনো বাকি মিতার। ছোট বয়সে মা-বাবাকে হারিয়েছে। আর কী সহ্য করবে? না, ভালো লাগছে না তার। ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে।

“মন খারাপ করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে” মিতা মুখ তুলে আফরিনের দিকে তাকায়। দেঁতো হাসির চেষ্টা করে।

“অরিয়ন ভালো ছে…” গলা আটকে যায় আফরিনের। না চাইতেও মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে।

“ভালো ছেলে। তার সঙ্গে ভালো থাকবি তুই। আর একটা কথা মনে রাখবি, আমাদের তাদের সঙ্গেই থাকা উচিত যারা আমাদের ভালোবাসে, আমরা যাকে ভালোবাসি তাদের সঙ্গে নয়।”

“সে আমাকে ভালোবাসে না। সবটাই বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে” মলিন সুরে বলে মিতা।

“হুঁ। কিন্তু তোকে স্নেহ করে, সেটা সত্যি।” মিতা সে কথায় কান দেয় না। কতটা স্নেহ করে, তা সে ভালো করেই জানে।

“সময় দিলে সব ঠিক…”

“আপু…” মিতা আফরিনকে থামিয়ে দেয়। এগিয়ে আসে আফরিনের দিকে।

“আমাকে ক্ষমা করো, আমি তোমার কাছে অপরাধী। তোমার আর তার মধ্যে বাধা হয়ে এসেছি” অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলে মিতা।

“এভাবে বলিস না। আমাদের মধ্যে তেমন কিছুই ছিল না, মিতা। ও ওর মতো আর আমি আমার মতো থাকতাম” মিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে আফরিন।

“তবু, বিয়ে নিয়ে একটা মেয়ের হাজারো স্বপ্ন থাকে। তোমার স্বপ্ন সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি আমি।” আফরিন চুপ করে থাকে। কী বলবে, বুঝতে পারছে না। মিতার হাতের ওপর শুধু নিজের হাত রাখে। সময় নিজের মতো অতিক্রম করে। নীরবতা ভাঙে আফরিন।

“ফ্রেশ হয়ে নে। মেহেদি দিতে মানুষ আসবে।” উঠে দাঁড়ায় আফরিন। দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

“আপু…” আফরিন ফিরে তাকায় মিতার দিকে।

“তুমি বলেছিলে, আমাদের এমন কারো সঙ্গে থাকা উচিত যারা আমাদের ভালোবাসে, যাদের আমরা ভালোবাসি তাদের সঙ্গে নয়” মিতার কথায় মাথা নাড়ে আফরিন।

“আমি তো অরিয়ন ভাইয়াকে ভালোবাসি না। তাহলে তার কি উচিত নয়, এমন কারো সঙ্গে থাকা যে তাকে ভালোবাসবে?” মিতার কথার কোনো উত্তর নেই আফরিনের। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

“মা মনে হয় ডাকছে,” কথাটা বলেই দ্রুত বেরিয়ে যায় আফরিন। ঘর থেকে বের হতেই তার চোখ ভিজে যায় তার।

মিতা ডালাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই সেগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন