ফন্ট সাইজ:
থিম:
পারমিতা (সিজন ২)

২৬তম পর্ব

লেখক: নাবিলা আহমেদ

#পারমিতা_২

#পর্ব_২৬

#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ (সেহরিশ)

গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে। আশপাশের আত্মীয়স্বজন যে যার বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। বাড়ির মুরুব্বিরা কেউ কেউ খাবার খাচ্ছেন। মহিলারা সবকিছু গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। সব গুছিয়ে তারপর তারা খাবার খেতে বসবেন। এরপর ফজরের নামাজ শেষ করে আবার বিয়ের কাজে লেগে পড়বেন।

রাহেলা বেগম বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র কুড়িয়ে নিচ্ছেন। খোলা উঠানে এই রাতের বেলা জিনিস রেখে গেলে সকালে আর পাওয়া যাবে না। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা চৌধুরী। মাঝে মাঝে তিনিও এটা-সেটা তুলে রাহেলা বেগমের হাতে দিচ্ছেন।

“তুমি, বুবু, ঘরে যাও। খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ো” রাহেলা বেগম বললেন।

“আমি থাকলে তোর কী সমস্যা, রাহেলা?” আনিকা চৌধুরী জবাব দিলেন।

“না, বুবু, তোমার তো এসবে অভ্যাস নেই, তাই” রাহেলা বেগম বললেন।

“তুইও না, কী সব আজগুবি কথা বলিস! চুপচাপ নিজের কাজ শেষ কর। এরপর দুই বোন একসঙ্গে খাবো” আনিকা চৌধুরীর কথায় রাহেলা বেগমের চোখ ভিজে এল। কারণটা ভিন্ন। মেয়ের বিদায়ের কষ্ট ভুলে থাকতে তিনি অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। আনিকা চৌধুরী তার কষ্ট বুঝে পাশে আছেন, তা তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করছেন। জিনিসপত্র কুড়াতে কুড়াতে কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন রাহেলা বেগম।

“নিজেকে সামলা। এভাবে ভেঙে পড়লে হবে? ও খুব ভালো থাকবে, দেখিস” আনিকা চৌধুরী রাহেলা বেগমের কাঁধে হাত রাখলেন। রাহেলা বেগমের চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। তবুও কোনো কুশব্দ বের হলো না। আনিকা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগামীকাল ঝড় যাবে সবার ওপর দিয়ে। একজন মা কীভাবে সামলাবেন? আল্লাহ তাকে মেয়ে সন্তান দেননি, তাই বলে কারও কষ্ট বুঝবে না, এমন অমানুষ তিনি নন।

❝ভালো থাকুক সব মায়েরা আর তাদের মেয়েরা❞ মনে মনে দোয়া করলেন আনিকা চৌধুরী।

----------

বাড়ির ছাদে আড্ডার আসর বসেছে। শীতল পাটি বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরো ছাদে দুটি ৬০ ওয়াটের লাইট জ্বলছে। তবে এই রাতের অন্ধকারে তা পুরোপুরি আলোকিত করতে পারেনি।

একপাশে মেয়েরা, অন্যপাশে ছেলেরা বসেছে। দূরের আত্মীয়রা যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে সমবয়সীরা সবাই এখানে উপস্থিত। কারও চোখে ঘুম নেই। ঠিক করেছে, রাতের বাকি দুই-তিন ঘণ্টা আড্ডা দিয়েই কাটাবে।

মাঝখানে কিছু ফল আর মিষ্টি রাখা হয়েছে। একটা স্টিলের জগ আর তিনটে গ্লাসও রাখা। অনেকে মাঝে মাঝে ফল মুখে দিচ্ছে।

সুমাইয়ার মুখের মেকআপ তুলে ফেলা হয়েছে, তবে চুল এখনো খোলা হয়নি। সুলতানা কিছুক্ষণ আগে গিয়ে নারকেল তেলের বোতল নিয়ে এসেছে। তেল দিয়ে চুলের জট খুলবে, নইলে সব চুল নষ্ট হয়ে যাবে। সুমাইয়ার পাশেই বসে আছে মিতা। অন্যরা গান গাইছে। নিয়ম হলো, একজনের গানের শেষ অক্ষর দিয়ে পরের জনকে গান গাইতে হবে। কেউ গান শুরু করলেই মিতা দ্রুত অনলাইনে সেই শেষ অক্ষর দিয়ে গানের কলি খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

তোমরা সবাই থাকো সুখে

আগুন জ্বলুক আমার বুকে

মনটা কে বলি তুমি কাঁদো না

প্রেমের নাম বেদনা।

আবরারের গান শুনে সবাই হাসছে। আবরার যে এই বিয়েতে খুব আনন্দ করছে, তা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। সবাই যেখানে আনন্দময় গান গাইছে, সে সেখানে ছ্যাঁকা খাওয়া গান গাইতে ব্যস্ত।

“আবরার ভাইজান কি ছ্যাঁকা খেয়েছেন নাকি? এরকম গান গাইছেন!”

“ওকে তো কোনো মেয়ে পাত্তাই দেয় না, ছ্যাঁকা খাবে কীভাবে?” আবরার কিছু বলার আগেই অরিয়ন উত্তর দেয়। সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।

“বলছে তোকে! আমাকে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো এখনো কেউ জন্মায়নি। আমি গানটা গাইলাম বোনজান... মানে সুমাইয়ার কষ্টে” আবরার বলল। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। সবাই অবাক হলেও মিতা একটুও অবাক হয়নি। উলটো মনে হচ্ছে সে রেগে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে খিঁচ করে বসে রইল। সুমাইয়ার মুখেও একই রকম ভাব ফুটে উঠেছে।

“মানে?” সুলতানা জিজ্ঞেস করল।

“আজ যে আছাড়টাই না খেয়েছে ও! সেটা দেখে যে কেউ কষ্টের গান গাইবে” কথাটা বলেই আবরার আবার শব্দ করে হাসতে শুরু করল। সবাই হাসছে। সুমাইয়া লজ্জায় মুখ নিচু করে রেখেছে। দু-একজন তো সুমাইয়াকে জিজ্ঞেস করল, ব্যথা পেয়েছে কি না।

“আচ্ছা, সে কথা বাদ। এবার ‘ন’ দিয়ে গান বলো” ব্যাপারটা থেকে মোড় ঘোরাতে মিতা বলে উঠল।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ‘ন’ দিয়ে গাও” বাকি ছেলেরাও সায় মিলাল।

নিশিতে যাইও ফুলবনে

নিশিতে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা

নিশিতে যাইও ফুলবনে

জ্বালাইয়া চাঁদেরও বাতি

মেয়েদের মধ্যে একজন গাইল। গানের সঙ্গে সবাই কণ্ঠ মেলাল। মিতা আর অরিয়নের চোখাচোখি হলো। মিতা ঠোঁটে মৃদু হাসি ফোটাল। অরিয়ন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এখানে এসবের মধ্যে থাকার একটুও ইচ্ছা তার নেই। তার সবটা জুড়ে শুধু মিতা। মিতার জন্যই সে এখানে বসে আছে।

একের পর এক গান গেয়ে যাচ্ছে দুই দল। কেউ কাউকে ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। তবে একটু একটু করে সবার গতি কমতে শুরু করেছে। যতগুলো গান মনে ছিল, একে একে গেয়ে ফেলেছে সবাই। পয়েন্ট এখনো শূন্য। সবাই সময় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। সহজে গান আর মনে আসছে না।

“‘ব’ দিয়ে বলো” আবরার বলল। মনে মনে নিজেও ‘ব’ দিয়ে গান মনে করার চেষ্টা করছে। যা মনে আসছে, তা কেউ না কেউ গেয়ে ফেলেছে।

মেয়েদেরও একই অবস্থা। কানাঘুষা করছে একেকজন, কিন্তু গান মনে করতে পারছে না। তার ওপর মোবাইলে সার্চ করা বারণ।

“কেউ একজন ‘ব’ দিয়ে বলো ভাই, নইলে হেরে যাব” সুলতানার কণ্ঠে দুশ্চিন্তা। এতদূর এসে সে হারতে চায় না। ছেলেদেরও অবস্থা টাইট। মনে হচ্ছে, তাদের কাছে ঘুরে এলে কী গাইবে, তাও বুঝতে পারছে না। সুমাইয়ার চুলের জট খোলা অনেক আগেই শেষ হয়েছে, তবু চিন্তায় সুলতানা শুধু তেল দিয়েই যাচ্ছে।

“মনেই তো আসছে না” একজন মেয়ে জবাব দিল।

“ধুর, এত কাছে এসে হেরে যাব?” সুলতানার রাগ লাগছে। মিতাও বারবার গান মনে করার চেষ্টা করছে। জিততে তো তাদের হবেই।

“৫...৪...৩...” ছেলেরা উলটো গণনা শুরু করল।

“কিরে ভাই, একটু সময় দে ভাবতে। এখুনি গুনছিস কেন?” সুলতানার কথায় ছেলেরা কান দিল না। আবরারের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুটতে শুরু করেছে।

“২...” উচ্চস্বরে বলল আবরার।

বুড়া আকিজ বিড়ি খাইয়া শেষে

খেকিয়া খেকিয়া কাশে

হায়রে কাশিতে কাশিতে যায় লুঙ্গি খুলিয়া

হঠাৎ গান গাওয়া শুরু করল মিতা। জেতার নেশায় এতটাই মগ্ন সে যে, ভুলে গেছে গানের প্রথম লাইন ‘ব’ দিয়ে শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সে মাঝখানের লাইন গাওয়া শুরু করেছে।

বুড়ায় কাশিতে কাশিতে যায় লুঙ্গি খুলিয়া

বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিছে বিয়া

আমি জুয়ান একটা মাইয়া

বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিছে বিয়া।

মিতার গানে ভুল ধরা তো দূরের কথা, সবাই উলটো মুচকি হাসছে। আড়চোখে বারবার অরিয়নের দিকে তাকাচ্ছে। আবরার মুখে হাত চেপে হাসি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। মিতার এই গান কাকে নিয়ে, তা সবারই জানা।

তব্দা খাওয়া অরিয়ন ভ্যাবাচেকা খেয়ে মিতার দিকে তাকিয়ে আছে। আদৌ সে ঠিক শুনছে কি না, তা বিশ্বাস হচ্ছে না। মিতা গানের সুর তুলতে পারছে না, তার নিজেরও যে ভীষণ হাসি পাচ্ছে। সবকিছু কেমন যেন অরিয়নের সঙ্গে মিলে গেছে।

অরিয়ন নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। মিতার চোখ অরিয়নের দিকে। এত মানুষের সামনে সে উলটাপালটা কিছু করবে না, তা মিতা ভালো করেই জানে। তার চেয়েও বড় কথা, অরিয়নকে জ্বালিয়ে মিতা অসম্ভব আনন্দ পায়। তাই থামার বদলে আনন্দ নিয়েই গাইছে সে।

অরিয়ন দুই কদমে মিতার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ মিতার কান টেনে ধরল।

হায়, দিলটা জ্বালালি

ভয়টা দেখালি

দিলটা জ্বালালি

ভয়টা দেখালি

হালকা করে শুনিয়ে দেবো রিমিক্স কাওয়ালি

রিমিক্স কাওয়ালি, প্রেমের রিমিক্স কাওয়ালি।

বেসুরো অরিয়ন গান গাইতে গাইতে মিতার কান ধরে টেনে দাঁড় করাল। মিতা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। দুজনের মুখেই দুষ্টমির হাসি।

ঠুমকা লাগালি, রূপের বিজলি গিরালি

তোকে দেখে গাইছে এ মন রিমিক্স কাওয়ালি।

অন্যরা সবাই হাতে তালি দিয়ে গানটা গাইতে শুরু করল। একে একে সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। সুমাইয়াকে ঘিরে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে গান গাইছে। মিতা আর অরিয়ন একপাশে দাঁড়িয়ে সবার এই আনন্দের মুহূর্ত উপভোগ করছে।

“আমার লুঙ্গি কখন খুলে গেছে?” ফিসফিস করে বলল অরিয়ন। মিতা জিভে কামড় দিল।

“আমি কি আপনাকে নিয়ে কিছু বলেছি?” কাঁচুমাচু করে বলল মিতা।

“আমাকে নিয়ে গাসনি?”

“তাহলে আপনি মানছেন আপনি বুড়া?”

“তোর বাপ বুড়া” অরিয়ন রেগে গেল।

“আমার বাপ, আপনার বাপ—সবাই বুড়া। কিন্তু তাদের বুড়া বললে তারা রাগে না। আপনি কেন রাগছেন?”

“তোকে তো আ...” দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল। সবাই গান গাওয়া বন্ধ করল।

“সবাই এখন রুমে যাও। আর গান গাইতে হবে না” অরিয়ন গম্ভীর মুখে বলল। সবাই এটা-সেটা নিয়ে ছাদ থেকে নামতে শুরু করল।

“ভাগ্যিস আমার বউ নেই, নইলে এভাবে লুঙ্গি আমারও খুলে দিত” আবরার হো হো করে হাসতে হাসতে ছাদ থেকে নেমে গেল। অরিয়ন রাগে ফুঁসছে। কিন্তু এই রাগ মিতার প্রতি। মিতাও মুচকি হাসছে।

“ফাজিল মেয়ে, আমার মান-ইজ্জত সব নষ্ট করে দিলি” অরিয়ন বলল।

“হাসবি না, বেয়াদব। হাসছিস বলে কিছু বলতেও পারছি না। এরকম হাসি দেখলে কেউ রাগ দেখাতে পারে?” মিতা হাসি বন্ধ করল। অবাক হয়ে অরিয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। অরিয়ন অপলক দৃষ্টিতে মিতার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে মিতার আরও কাছে আনতে এগিয়ে এল। পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজন এখন মুখোমুখি।

“তোর হাসিতে জাদু আছে, তা কি তুই জানিস? প্রতিবার তোর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসি যে কোনো পুরুষকে পাগল করে দিতে পারে। ভুলিয়ে দিতে পারে তার মধ্যে জমে থাকা হাজারো রাগ ও অভিমান” আলতো করে মিতার গাল স্পর্শ করল অরিয়ন। মিতা এখনো অরিয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে আদৌ সত্যি বলছে কি না, তা বুঝার চেষ্টা করছে।

“এই হাসি কখনো বিলীন হতে দিবি না। এই হাসিই তোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই হাসির জন্য যে কেউ তোর গোলাম হয়ে যাবে, সে যত বড় মাপের লোকই হোক” অরিয়নের কথাগুলো মিতার কাছে অদ্ভুত লাগছে। নেশার মতো ধরেছে তাকে। হঠাৎ গরম লাগতে শুরু করেছে। আশপাশের পরিবেশ যেন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। এত প্রশংসা সামনাসামনি কেউ হজম করতে পারে? লজ্জায় মিতার নাক-মুখ লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে।

“যা, একটু রেস্ট নিয়ে নে। সকালে আবার উঠতে হবে” কথাটা বলেই অরিয়ন মিতার গালে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করাল। আলতো করে একটা চুমু দিল। গালে অরিয়নের ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই মিতা নিজের জামা শক্ত করে মুঠো করে ধরল। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। হৃৎস্পন্দন অদ্ভুতভাবে চলছে।

কিছুক্ষণ পর অরিয়ন সরে এল। আজান শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। পুরো বাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও হাসি-তামাশায় মেতে ছিল ছাদটা, এখন সব নিশ্চুপ। মিতা কিছু বলল না। কী বলবে, তা জানে না। অরিয়নের এমন স্পর্শ সে চাইলেই বন্ধ করতে পারে, কিন্তু করেনি। বাস্তবতা তাকে গভীর রাতে আঁকড়ে ধরেছে। দিনশেষে সে এখন একজন স্ত্রী। ধীরে ধীরে সব মেনে নিতে হবে। ছাদের দরজার কাছে এসে থামল মিতা। অরিয়ন তার পিছনে। মিতা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ছাদ থেকে নেমে গেল।

---------------

সুমাইয়াকে পার্লার থেকে সাজিয়ে আনা হয়েছে। বিয়ে বাড়িতেই হচ্ছে। উঠানে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে খাবারের আয়োজন ও বর-কনের জন্য আলাদা স্টেজ সাজানো হয়েছে।

সুমাইয়ার পরনে লাল বেনারসি, তাতে পাথর বসানো। ভারী শাড়িতে তাকে একটু মোটা লাগছে, অথচ মেয়েটা খুবই হ্যাংলা। বিয়ের সাজে তাকে অপরূপ লাগছে। তাকে একটা খালি রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। দু-একজন মেয়ে ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। অন্যরা এলেও মেয়েরা আগে দেখতে দিচ্ছে না।

মিতা সেজে রুম থেকে বেরিয়েছে। বটল গ্রিন রঙের জর্জেট শাড়ি পরেছে সে, তাতে গোল্ডেন সুতার কারচুপির কাজ। চুল খোপা করা। খোপার একপাশে লাল গোলাপ গোঁজা। আজও এই ফুল এনে দিয়েছে অরিয়ন। হালকা মেকআপ আর নুড লিপস্টিক দিয়েছে মিতা। গায়ে ডায়মন্ডের সেট। ইদানীং মিতা খুব অবাক হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে সে অরিয়নকে অপছন্দ করে এসেছে, কিন্তু কেন? এখন মনে হয়, সেই কারণগুলো শুধুই একটা নাদান বাচ্চার ভুল ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। অরিয়নকে এত কাছ থেকে দেখার পর বুঝতে পারছে, নিজের মধ্যে কতটা ভুল ধারণা পুষে রেখেছিল।

সকাল থেকে অরিয়নের সঙ্গে মিতার একবারও দেখা হয়নি। বেড়াতে এসে পায়ের ওপর পা তুলে বসে নেই অরিয়ন। সুমাইয়ার বাবা আর ভাইদের সঙ্গে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। তাই হয়তো একে অপরকে দেখার সুযোগ হয়নি।

বিয়ে দুপুরে। সময় গড়িয়ে এখন বেলা দুটো। মিতা সুমাইয়ার পাশে বসে আছে। ছেলেপক্ষ ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে চলে আসবে বলে জানিয়েছে। মেয়েপক্ষের আত্মীয়স্বজনরা দলে দলে খেতে বসে গেছে।

কাজি সাহেব এসে অপেক্ষা করছেন। তার সামনে পানের বাটা আর একটা পিরিচে চারটে মিষ্টি দেওয়া হয়েছে। কাজি সাহেব এক কামড়ে একটা মিষ্টি খেয়ে নিলেন।

ছেলেপক্ষের আসার কথা ছিল ঘণ্টাখানেক আগে, কিন্তু এখনো তাদের কোনো নাম-গন্ধ নেই। দুপুর গড়িয়ে আসরের সময় হতে চলেছে। এতক্ষণ হাসিখুশি থাকা সবার মুখে চিন্তার ছাপ পড়েছে। কয়েকজন কানাঘুষা করছে। সুমাইয়ার ভাইরা একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না।

“দেখো দেখো, সুমাইয়া কীভাবে লজ্জা পাচ্ছে” মিতার কথায় সুলতানা ভালো করে সুমাইয়ার দিকে তাকাল। সুমাইয়া আরও লজ্জা পেল। মুখটা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে।

“যাও, তোমরাও না” লজ্জায় বলল সুমাইয়া।

“জামাইবাবু আজ তো তোমাকে দেখে পাগল হয়ে যাবে” মিতার সঙ্গে সুলতানাও দুষ্টুমি শুরু করল।

“ঠকঠক”

“ঠকঠক” দরজায় কড়া নাড়তেই সুলতানা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। অবশেষে বরযাত্রী চলে এসেছে। হাসিমুখে দরজা খুলে সুলতানা আবার সুমাইয়ার কাছে ফিরে এল।

“কে? বর চলে এসেছে? গেট ধরেছে?” কৌতূহলী মিতা লাফিয়ে উঠল। এখানে গেট ধরলে কী করে, তা দেখতে চায় সে।

“অরিয়ন ভাইজান এসেছে, তোমাকে ডাকছে” সুলতানা বলল। মিতা দ্রুত দরজার কাছে গেল।

অরিয়নকে দেখামাত্র মিতা আঁতকে উঠল।

“কী হয়েছে এসব?” মিতার কণ্ঠে ভয় প্রকাশ পেল। অরিয়নের পরনে গোল্ডেন পাঞ্জাবি রক্তে লাল হয়ে আছে। চুল এলোমেলো। মাথা থেকে ঘাম ঝরছে, যেন সে দৌড়ে এসেছে।

“আ... কী হয়েছে?” বাইরে থেকে চিৎকারের শব্দ আসতেই মিতা লাফিয়ে উঠল। তার হাত-পা কাঁপছে।

“নেই, কেউ বেঁচে নেই। পদ্মা ব্রিজে বরযাত্রীর গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। নদীতে গিয়ে পড়েছে বরের গাড়ি। সেখান থেকেই এলাম আমি” অরিয়ন বলল। মিতার মনে হলো, সে কি দুঃস্বপ্ন দেখছে? অরিয়নের কথাগুলো অবাস্তব লাগছে।

“কী হয়েছে, ভাবি? বাইরে এত চেঁচামেচি কেন?” সুমাইয়া দ্রুত এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। মিতা অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বধূবেশে নিষ্পাপ সুমাইয়াকে সে কী উত্তর দেবে, জানে না। অরিয়নকে দেখামাত্র সুমাইয়া মুখে হাত দিল। কিছু না ভেবে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ঘোর কাটতেই মিতাও তার পিছনে দৌড় দিল।

উঠানের মাঝে শ’খানেক লোক জড়ো হয়েছে। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাহেলা বেগম ও তার পুত্রবধূদের কণ্ঠ মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে মানুষের ভিড় ঠেলে মাঝখানে ঢুকল সুমাইয়া।

“আব্বা...” চিৎকার করে উঠল সে। তার প্রাণপ্রিয় বাবা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। মাথায় ও মুখে পানি দিচ্ছে পুত্রবধূরা। পাশে বসে কাঁদছেন রাহেলা বেগম। কিছুক্ষণ আগেও বিয়ের আমেজ ছিল, এখন যেন মৃত্যুবাড়িতে রূপ নিয়েছে।

------------

মাগরিবের সময় ঘনিয়ে এসেছে, কিন্তু কারও মুখ বন্ধ নেই। পুরো গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেছে। মাতবর বাড়ির ছোট মেয়ের বিয়ে হয়নি। সুমাইয়া অলক্ষ্মীতে পরিণত হয়েছে। নিজের কপাল নাকি সে নিজেই পুড়িয়েছে।

নুরুল মাতবরের জ্ঞান ফিরলেও তিনি নিশ্চুপ। মেয়ের বিয়ে না হওয়ার শোক তিনি মেনে নিতে পারছেন না, তা তার চেহারায় স্পষ্ট। রাহেলা বেগমের অবস্থা আরও খারাপ। কী করবেন, তার মাথা কাজ করছে না।

“কী করলি তুই, অপয়া? কী করলি? নিজের কপাল এভাবে কেন পুড়িয়ে দিলি? এখন আমরা কী করব? সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে? তোর মতো অপয়া নিয়ে সারাজীবন থাকতে হবে” রাহেলা বেগম হঠাৎ সুমাইয়ার গায়ে হাত তুললেন। শরীরে কয়েকটা চড় বসালেন। মাথা ঠিক নেই তার, কী করবেন, নিজেও জানেন না। সুমাইয়া চুপ করে বসে আছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

“রাহেলা, কী করছিস তুই?” আনিকা চৌধুরী দৌড়ে গিয়ে বাধা দিলেন।

“খালামনি, এমন করবেন না। ওর কী দোষ এসবে?” মিতাও রাহেলা বেগমকে বাধা দিল। আনিকা চৌধুরী ও মিতা মিলে তাকে ধরে রাখল।

“তুই ম'রতি, তুই কেন ম'রলি না? ওরা না ম'রে তুই ম'রতি” রাহেলা বেগমের প্রতিটি কথা মিতার কাছে বিষের মতো লাগছে। একজন নিরপরাধীকে দোষারোপ করে কী শান্তি পাওয়া যায়, তা সে বুঝতে পারছে না।

রাহেলা বেগমকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কেউ লক্ষ করেনি, সুমাইয়া খাট থেকে ধীরে নেমে নিজের রুমে চলে গেছে।

আবরার রুমের দিকে এগিয়ে আসছিল। সুমাইয়াকে দৌড়ে যেতে দেখতেই তার মন আনচান করে উঠল। কিছু না ভেবে সুমাইয়ার পিছু নিল।

সুমাইয়ার রুমের দরজা চাপানো, কিন্তু আটকানো নয়। ক্ষণিকের জন্য দ্বিধা করল আবরার। ভেতরে উঁকি দেওয়া ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছে না। একবার চলে যাওয়ার কথা ভাবল, পরক্ষণে আবার ফিরে এল। আস্তে করে দরজায় ধাক্কা দিতেই তা খুলে গেল। ভেতর থেকে কোনো শব্দ এল না। আবরার উঁকি দিল।

“মা...” চিৎকার করে উঠল আবরার। সামনেই ফ্যা'নের সঙ্গে ঝু'লছে সুমাইয়া। পরনের শাড়িটা এখনো গায়ে, কিন্তু ওড়না গ'লায় পেঁ'চানো। অস্বাভাবিকভাবে পা নড়ছে তার।

“মা...” আবার চিৎকার করল আবরার। দৌড়ে গিয়ে সুমাইয়ার পা জড়িয়ে ধরল। সুমাইয়া নিশ্বাস নেওয়া শুরু করে।

“আমাকে ছাড়ুন, ছা... ছাড়ুন আমাকে” আবরার থেকে সরে আসার জন্য পা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে লাগল সুমাইয়া।

“মা...” আরও জোরে চিৎকার করল আবরার। সুমাইয়া এত চাপ সইতে পারছে না। তার যখন দোষ, তখন সে নিজেকেই শেষ করে দেবে।

বাড়ির কয়েকজন যখন সুমাইয়ার রুমে এসে পৌঁছাল, ততক্ষণে সুমাইয়া জ্ঞান হারিয়েছে। সুমাইয়ার ভাই আর আবরার মিলে তাকে নামিয়ে আনল। অজ্ঞান সুমাইয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল। রাহেলা বেগম কী করবেন, বুঝতে পারছেন না। পাগলের মতো মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদছেন। আজ আবরার না থাকলে কী হতো, তা তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না। তার মেয়ের তো কোনো দোষ নেই, তবু তিনি তার গায়ে হাত তুলেছেন, তাকে দোষারোপ করেছেন।

“রাহেলা, শান্ত হ। এমন করিস না। মেয়েটা আজ কী করতে বসেছিল, তোর ভুলে” আনিকা চৌধুরী বললেন।

“ও নিজেও তো হাজারো স্বপ্ন দেখেছে। ওর সব ইচ্ছাও তো শেষ। এভাবে মেয়েটাকে আর দোষারোপ করিস না” তিনি যোগ করলেন।

“আমি... আমি বিয়ে করব সুমাইয়াকে” আবরারের কথায় সবাই হতবাক হয়ে গেল। বিস্ময়ের সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আবরার সত্যি বলছে, নাকি মিথ্যা, তা বোঝার চেষ্টা করছে সবাই।

আনিকা চৌধুরী, মিতা আর অরিয়ন বড় বড় চোখ করে আবরারের দিকে তাকিয়ে আছে। কী আবোলতাবোল বলছে আবরার, তাই ভাবছে।

“আজকেই করব” আবরারের কণ্ঠে দৃঢ়তা। কোনো ছলনা বা দ্বিধা নেই।

“বোনজান থেকে বউজান” আশপাশ থেকে কেউ ফাজলামি করে বলে উঠল। সবাই রাগান্বিত দৃষ্টিতে কে বলল, তাকে খুঁজতে লাগল। কেউ নজরে এল না।

আবরার সুমাইয়ার দিকে তাকাল। জ্ঞানহীন সুমাইয়ার গলায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ও'ড়না পেঁ'চানোর লাল, মোটা দাগ। এই দাগ কি আদৌ যাবে, তা তার জানা নেই।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন