#পারমিতা_২
#পর্ব_৩৫
#লেখিকা_নাবিলা_আহমেদ(সেহরিশ)
৪ মাস পর।
রুমের মধ্যে পায়চারি করছে মিতা। নখ কামড়িয়ে যাচ্ছে অনবরত। মনে হচ্ছে খুব বেশি চিন্তিত কিছু নিয়ে।
“হলো?” মিতা এগিয়ে এলো বিছানায় বসে থাকা অরিয়নের দিকে। ল্যাপটপের দিক থেকে চোখ সরায় অরিয়ন। মাথা তুলে মিতার দিকে তাকায়। অধীর আগ্রহ নিয়ে মিতা অরিয়নের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে একটু হলেই হার্টফেল করবে সে।
অরিয়ন মাথা নেড়ে না বোঝায়। ফ্যাকাশে হয় মিতার মুখটা। পরক্ষণেই বড় করে নিশ্বাস ত্যাগ করে।
“আমি বুঝি না এদের সমস্যা কী। রেজাল্ট যখন সময়মতো ছাড়বেই না, তাহলে আগে থেকে কেন বলে?” মিতার কণ্ঠে রাগ স্পষ্ট।
আজ মিতার ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার কথা। সকাল থেকেই খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে বসে আছে মিতা, মনে হচ্ছে হাত-পা বরফ হয়ে যাচ্ছে ঠান্ডায়।
“এখনো ১২টা বাজেনি।” অরিয়নের উত্তরে মিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়।
“২ মিনিটই তো বাকি।” গম্ভীর কণ্ঠে আওড়ানোর বৃথা চেষ্টা করল মিতা।
“দুই মিনিট অনেক সময়।” ল্যাপটপ পাশে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় অরিয়ন। স্তম্ভিত হয় মিতা, হাঁ করে অরিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“শুয়ে পড়লেন কেন, উঠুন।” মিতা এগিয়ে গিয়ে অরিয়নের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“পাগল হয়ে যাবি নাকি? এখনো সময় আছে। সার্ভারে ঢুকতেও সমস্যা হবে। ওয়েট কর।” অরিয়নের কণ্ঠ শান্ত।
“না না।” মিতা মাথা নেড়ে যায়। ঘড়িতে তাকাতেই স্থির হয়। ১২টা বেজে গেছে। কোনো কিছু না ভেবেই অরিয়নের ডান হাত ধরে টানাটানি শুরু করে।
“তাড়াতাড়ি উঠুন, ১২টা বেজে গেছে। তাড়াতাড়ি চেক করুন। উঠুন।”
“তোর জ্বালায়...” কথা শেষ করল না অরিয়ন। শোয়া থেকে উঠে বসে। ল্যাপটপ তুলে নেয় আবারও।
“রোল বল।”
“৫১০*****।” ভয়ে ভয়ে বলে মিতা।
“রেজি?”
“১১১********।” মিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে অরিয়নের মুখের দিকে। তার চাহনি দেখে কিছুটা আন্দাজ করতে চাইছে।
চাইলে মিতা নিজেই নিজের ফলাফল চেক করতে পারত, কিন্তু ভয়ে তার সাহস হচ্ছে না। যদিও সে পরীক্ষা ভালো দিয়েছে, তাও মন মানছে না। মাঝে মাঝে তো মনে হতো, হয়তো রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ভুল দিয়ে এসেছে। কী হবে যদি বিষয় কোড লিখতে ভুলে যায়? অতিরিক্ত খাতার নম্বরটা কী ঠিকমতো লিখেছিল? নাহ, এই ভয় তাকে শেষ কয়েকদিন ভালো করে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
গতকাল রাতেও তাকে এতটা দুশ্চিন্তায় দেখে ফেলে অরিয়ন। ভরসা দেয় কিছু হবে না বলে। শেষমেশ অরিয়ন ফলাফল দেখে দেবে বলেছে। সকাল হতেই তার জন্যই বসে আছে দুজনে।
অরিয়ন ধীরে ধীরে মিতার দিকে তাকায়। গম্ভীর তার চাহনি। মিতার চোখ ভিজে আসছে।
“গোল্ডেন।” কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই বলে অরিয়ন। পরক্ষণেই মনোমুগ্ধকর হাসি ফুটায় ঠোঁটে।
মিতা ক্ষণিকের জন্য যেন কিছুই শুনল না। ভ্রু কুঁচকায় অরিয়নের রিঅ্যাকশন দেখে। হাসতে দেখেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এতক্ষণ যেন সে নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে রেখেছিল।
“থ্যাংক ইউ সো মাচ অরিয়ন ভাইয়া, থ্যাংক ইউ সো মাচ।” হুট করেই অরিয়নের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মিতা। জড়িয়ে ধরে অরিয়নকে। মিতার খুশির ঠিকানা নেই। অরিয়ন অবাক হয়, পরক্ষণেই জড়িয়ে ধরে মিতাকে। মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে। ঠোঁটের কোণে তার স্নিগ্ধ হাসি।
“তোমার জন্য। তুমি না থাকলে আমি হায়ার ম্যাথে ভালো করতাম নাকি জানি না। থ্যাংক ইউ সো মাচ।” প্রতি মুহূর্তে স্তম্ভিত হচ্ছে অরিয়ন। ল্যাপটপ রাখারও সুযোগ পায়নি সে।
মিতার মুখ অরিয়নের গলায়। প্রতিটা মুহূর্তে শক্ত হচ্ছে মিতার বাঁধন। অরিয়ন তার গলায় যে নিজের মুখ গুঁজে দিয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই তার।
অরিয়ন ধীরে ধীরে নিশ্বাস নেয়। জোরে নিশ্বাস নিতেই যদি মিতা টের পেয়ে যায় তাই। মিতার শরীর থেকে আসা ঘ্রাণ নিজের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করল সে। মিতার এভাবে জড়িয়ে ধরা, তাকে তুমি করে কথা বলা সবটা যেন অরিয়নের মধ্যে ভালোলাগা তৈরি করে দিচ্ছে হাজারগুণে।
“ইউ আর ওয়েলকাম, লাভ।” নিম্নস্বরে কথাটা বলেই মিতার গলায় নিজের ঠোঁট স্পর্শ করায় অরিয়ন। চুমু খায় আলতো করে। থমকে যায় মিতা। এতক্ষণে ঘোর কাটে তার। ধীরে ধীরে সরে আসে অরিয়ন থেকে।
দুজনের চোখাচোখি হয়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দুজনে। অরিয়ন আলতো করে মিতার মুখের সামনে আসা চুল সরিয়ে দেয়। অন্য হাত এখনো মিতার কোমরে।
“কংগ্র্যাচুলেশন।” মিতা কিছু বলল না। আলতো করে হেসে ঠিক আছে বুঝিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়। অরিয়ন যে তার দিকে তাকিয়ে আছে তা সে বুঝতে পারছে। তার উপর অরিয়নের উষ্ণ নিশ্বাস, অনুভব করতে পারছে সে। অরিয়নের হাত শক্ত করে ধরে মিতার কোমর।
মিতা চোখ তুলে, অরিয়ন তার দিকে এখনো তাকিয়ে আছে। তার চোখের উজ্জ্বলতা বলে দিচ্ছে সে আসলেই মিতার জন্য খুশি। নিজের অজান্তেই মৃদু হাসি ফিরিয়ে দেয় মিতা।
অরিয়ন আলতো করে দুই হাত দিয়ে মিতার গাল ধরে। অরিয়নের বড় বড় হাত দুটোর মধ্যে মিলিয়ে গেল মিতার মুখটা। হেসে দেয় অরিয়ন। বেরিয়ে আসে তার দাঁতগুলো, টোল পড়ে দুই গালের মাঝখানে।
অপরূপ লাগল মিতার কাছে। ইচ্ছে করছে অরিয়নের মতো করে তারও অরিয়নের গাল ছুঁয়ে দেখার। পুরুষ মানুষের শুষ্ক ঠোঁটগুলোও যেন এক অন্যরকম নেশা ছড়ায়।
অরিয়ন নিজের মুখ এগিয়ে নেয়। মিতা স্থির হয়ে রইল। দুজনের নাক স্পর্শ হতেই চোখ বন্ধ করে ফেলে দুজনে।
অরিয়ন গাল থেকে হাত সরায়, মিতার কোমর আবারও জড়িয়ে ধরে। নিজের কোলে বসায়। ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে দুজনেই।
মিতার ঠোঁটে চুমু খাওয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায় অরিয়ন। আর একটু এগোলেই দুজনের ঠোঁট স্পর্শ করবে। এগিয়ে যায় অরিয়ন।
অরিয়নের ঠোঁট গিয়ে স্পর্শ করে মিতার গালকে। মুখ সরিয়ে নিয়েছে মিতা। অরিয়ন সরল না, চোখ খুলে।
“পাজি।” অরিয়ন গালে ঠোঁট চেপে আওড়ায়। মিতা হাসে। অরিয়ন নিজের ঠোঁট চেপে ধরে মিতার গালে। দীর্ঘ চুমু আঁকে।
অরিয়ন সরে আসে ক্ষণিক পরেই। আবারও দুজন দুজনের দিকে তাকায়।
“আই এম প্রাউড অফ ইউ।” অরিয়নের কণ্ঠে কথাটা অসম্ভব ভালো লাগছে মিতার। যেন এতদিন পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করে আজ সার্থক সে।
“ধন্যবাদ অরিয়ন ভাইয়া।” মিতার কণ্ঠে দুষ্টুমি নেই। যা আছে তা হলো অরিয়নের জন্য অফুরন্ত সম্মান আর শ্রদ্ধা। অরিয়ন মৃদু হাসে। কোল থেকে নেমে আসে মিতা।
“সবাইকে বলে আসি।” প্রফুল্ল মিতা আর অপেক্ষা না করেই দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অরিয়ন ল্যাপটপের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে মিতার রেজাল্ট দেখা যাচ্ছে। প্রতিটা বিষয়ে তার A+ রয়েছে। মিতা একধাপ এগিয়ে গেল তার স্বপ্নের দিকে। ডাক্তার হওয়ার দিকে। তবে এই ডাক্তারের আগে উচিত অরিয়নের রোগটা ধরতে পারা, তার চিকিৎসা করা।
“খুব শীঘ্রই।” বিড়বিড়ায় অরিয়ন।
----------------
১.৫ মাস পর।
চৌধুরী বাড়ি আজ সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। মিতা একটু আগেই তার মেডিকেলের কোচিং শেষ করে বাড়িতে এসেছে।
আজ অরিয়নের জন্মদিন। তার অরিয়ন ভাইয়ার জন্মদিন। এই দিনে সে এতটা আনন্দ অনুভব করবে তা আগে কখনো ভাবেনি সে। ৬ মাস আগ থেকে যেন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে তাদের মধ্যে।
উচ্চমাধ্যমিকে তার এত ভালো ফলাফল করার পেছনে যে অরিয়নেরও হাত রয়েছে। উচ্চতর গণিতে এত ভালো করতে পেরেছে শুধুমাত্র অরিয়নের জন্য। পরীক্ষার কয়েকটা দিন অরিয়ন প্রতিটা ম্যাথ তাকে হাতে ধরিয়ে ধরিয়ে করেছিল, তাই তো পরীক্ষার হলে তার একটুও কষ্ট হয়নি।
তার উপর অরিয়নের তার প্রতি যত্নশীল আচরণ তাকে বাধ্য করেছে কোমল হতে। বাধ্য করেছে বুড়ো ব্যাটা থেকে অরিয়ন ভাইয়ায় পরিণত করতে। আর তাতে সে খুব খুশি। এমন একটা মানুষকে সে ছোট থেকে কীভাবে অপছন্দ করে এসেছে তাই বুঝতে পারছে না। এতটা অন্ধ সে কীভাবে ছিল? নাকি মায়া চৌধুরী ঠিকই বলেন, সে এখনো অবুঝই রয়ে গেছে।
--------------
চৌধুরী বাড়িতে মেহমান আসতে শুরু করেছে একটু আগে থেকেই। সকালেই হাজির হয়ে গেছে। ওয়াহিদ চৌধুরী, মায়া চৌধুরী ও আফরিন।
মিতার সেদিন অনুরোধ করার পর মায়া চৌধুরী আবারও ইমরানের সাথে দেখা করেছিল। ইমরান একজন আর্মি অফিসার। ছুটিতে এসেছিল বাড়িতে, তাই বেশি কিছু বলা হয়নি। আফরিনের পরিবার এই সম্পর্কে রাজি তাই বলা হয়েছে। আবারও ছুটিতে আসলেই বিয়ের কথা হবে দু’পরিবারের মধ্যে।
“জন্মদিন কী অরিয়নের নাকি তোর?” আফরিনের কথায় অবাক হল মিতা। তৎক্ষণাৎ তার দিকে ফিরে তাকায়।
“এরকম কেন বললে?”
“কারণ তোকে দেখে তাই মনে হচ্ছে। নিজের জন্মদিনেও তো এত খুশি হস না।” মিতা মৃদু হাসে। পরক্ষণেই আফরিনের পাশে গিয়ে বসে।
“তেমন কিছু নয়। আসলে অরিয়ন ভাইয়া আমাকে এতটা হেল্প করেছে। এখন যখন তার জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছি তখন তা নষ্ট করতে চাইছি না।”
“অরিয়ন ভাইয়া?” ভ্রু উঁচু করল আফরিন। ঠোঁটের কোণে তার দুষ্টুমিষ্টি হাসি।
“অরিয়ন আবার ভাইয়া কবে থেকে হয়ে গেল? এতটা ইমপ্রুভমেন্ট?”
“তুমিও না আপু।” মিতা উঠে দাঁড়ায়। সরাসরি চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। নিজের চুল বাঁধতে শুরু করে।
মিতা আয়নায় আফরিনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। আফরিন এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তরের অপেক্ষায় সে। মিতা হাল ছেড়ে, ফিরে তাকায়।
“মানুষটা খারাপ না। চিনতে ভুল করেছিলাম।” নিচের দিকে তাকিয়ে বলে মিতা। আফরিন তাকিয়ে রইল মিতার দিকে। মিতার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ছেয়ে গেছে অরিয়নের কথা বলতেই। একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে সম্মান আর শ্রদ্ধা। কী হবে যদি সবটা জানতে পারে মিতা? অরিয়ন যা করেছে তা? মুখটা ফ্যাকাশে হয় আফরিনের।
আচ্ছা অরিয়ন যা করেছে তা তো ভালোবেসেই করেছে। ভালোবাসায় তো সব জায়েজ, তাহলে অরিয়নের এই ভুলটা কী মিতা ক্ষমা করে দিতে পারবে? মিতাকে পাওয়ার জন্য অরিয়নের এই পাগলামি কী মিতার মনে অরিয়নের জন্য আরও ভালোবাসা বাড়িয়ে দেবে? এতটা কী কেউ কাউকে ভালোবাসতে পারে?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আফরিন। মিতার মধ্যে যে পরিবর্তন দেখতে পারছে তা নষ্ট করতে চায় না সে। যাই হোক, অরিয়ন সবটা মিতাকে পাওয়ার জন্যই করেছে। মিতাকে কেউ এতটা ভালোবাসে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট।
“হ্যাঁ।” মিতার কথায় সায় মেলায় আফরিন। স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠে দু’বোনের ঠোঁটে। সাজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মিতা।
চলবে...