#পর্ব_১৮
গল্প:#টক_ঝাল_নাকি_মিষ্টি?
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"স্যার, ভেতরে আসবো?"
"আয় "
জাহিদ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো,
"আমরা অফিসে আছি ভাইয়া,একটু তো সম্মান দাও"
"কিসের জন্য এসেছিস সেটা বল"
"পরশুদিন একটা কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে হবে"
মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল জয়,
"আব্বু এতগুলো জায়গায় ডোনেশন কেন দিয়ে রেখেছে?সে তো এখন আমার হাতে সব দিয়ে বাসায় বসে টিভি দেখে"
"আরে তেমন কিছু করতে হবে না।গিয়ে শুধু একটা ছোটখাটো স্পিচ দিতে হবে। তারপর বাকিটা আমি দেখে নিব"
"জি ম্যানেজার সাহেব"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া চলছে।নিরবতা ভেঙে ইমরান সাহেব ছেলেকে বললেন,
"জয়,অফিসে সব ঠিক চলছে?"
জয় খাবারের প্লেটে নজর রেখেই বলল,
"আব্বু তুমি ও ব্যাপারে তো আর কথাই বলিও না। সব আমার ঘাড়ে দিয়ে চুপ করে আছো"
রীতি বেগম স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"তোমার কারনে আমার ছেলেটা শান্তি মতো একটু প্রেমও করতে পারছে না"
হকচকিয়ে গেল জয়।সাথেসাথে মাথা তুলল,
"কি বললে তুমি?"
জয় জাহিদের দিকে ঘুরে।জাহিদ মুখ টিপে হাসছে।তার দিকে দেখে দাঁত চিবিয়ে বলল জয়,
"জাহিদ তুই মাকে কি বলেছিস?"
রীতি বেগম বললেন,
"ও আবার কি বলবে?তুমি আমার সাথে কথা বলো।মেয়েটা দেখতে কেমন রে?"
"মা প্লিজ,আমি এই টপিকে কথা বলতে চাচ্ছি না"
"কেন কি হবে বললে?কয় বছরের রিলেশন তোমাদের?"
জয় ভড়কালো,
"কয় বছর?!আরে ওর সাথে তো দেখাই হয়েছে দুইবার! "
"আচ্ছা হোক দেখা দুইবার।ভালোবাসা প্রথম দেখাতেই হয়ে যায়।তোমার আব্বুকে দেখো।আমাকে প্রথম দেখাতেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল"
"মা।আব্বু তোমাকে চারবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।তুমি চতুর্থবারে এসে হ্যাঁ বলেছিলা"
"আমাদের কথা বাদ দাও।তুমি নাফিসাকে বাসায় কবে আনছো? আমরা একটু পরিচিত হবো না?"
"ওহো মা!আমাকেই আগে ওর সাথে পরিচিত তো হতে দাও!খাবারটা খেতে বসেও শান্তি নেই!"
জয় জাহিদের পাশে চোয়াল শক্ত করে দেখলো,
"জাহিদ খাওয়া শেষে রুমে চল। তোর সাথে অফিসের কিছু কাজ আছে"
বুঝলো জাহিদ।তার আজ রক্ষা নেই।ভারী ঢোক গিললো সে।
ইমরান সাহেব এতক্ষণ ধরে সামনের তিনজনের কাণ্ড দেখছিলেন।এবার একটু কেশে উঠলেন তিনি,
"জয়।তুমি চাইলে প্রেম করার জন্য ছুটি নিতে পারো"
জয় বিরক্তির সুরে বলল,
"আব্বু তুমি আবার এখন শুরু হইও না তো!"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
গাড়ি থেকে নেমে সামনের জনের থেকে এক গোছা ফুল নিয়ে জয় অডিটরিয়ামের ভেতরে ঢুকে।প্রিন্সিপালের সাথে সামনের দিকে বসে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অপেক্ষা করছে।অনুষ্ঠান শুরু হয়েই কিছুক্ষণ পরে প্রধান অতিথি হিসেবে জয়কে মঞ্চে ডাকা হলো। মঞ্চে উঠে স্পিচ স্ট্যান্ড এর উপরে রাখা কাগজটা থেকে দুই-তিনটা লাইন পড়ে দর্শকদের পাশে দেখে কথা বন্ধ হয়ে গেল জয়ের।নাফিসা নিজের পাশের জনের দিকে ঘুরে মুখে হাসি নিয়ে কথা বলছে।নাফিসা এখানে কি করে!তার মানে জয় যে কলেজে এসেছে নাফিসা সেই কলেজেই পড়ে?জয় কোনো কথা বলছে না।চোখ বড় বড় করে নাফিসার পাশে দেখে আছে।
নাফিসার সেই দিকে নজর নেই।নাফিসার পাশের মেয়েটা নাফিসাকে টোকা দিয়ে বলল,
"নাফিসা,উনি মনে হয় তোর পাশে দেখছে"
"কে?"
নাফিসা সামনে ঘুরতেই চমকে উঠল।জয়কে দেখে ভড়কেছে সে অনেক।নাফিসা কি করবে বুঝতে পারছে না।ভাবলেশহীন একটা হাসি দিয়ে জয়ের দিকে হাত নাড়ালো।
জয়ের শ্বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই কতক্ষণ।নাফিসার থেকে জয়ের চোখ জাহিদের দিকে গেল।মঞ্চের সামনের সাড়িতে বসে জয়ের পাশে হাত নাড়াচ্ছে সে।ইশারা করে বলছে,'ভাইয়া কি করছো তুমি?'
জয় একটু কেশে উঠে গলা পরিষ্কার করল,
"আই এম ভেরি ভেরি সরি।আসলে এত ভালো কলেজের ব্যাপারে আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।এখানকার স্টুডেন্টরা এতই ট্যালেন্টে,সেটা তাদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে,......"
জয়ের বাকি স্পিচটা আর ভালো করে দেওয়া হলো না।। বারবার তার চোখ নাফিসার দিকে যাচ্ছে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্পিচটা শেষ করে সিটে এসে বসলো সে।
জাহিদ জয়ের পাশে ঘুরলো,
"সমস্যা কি ছিল?তুমি আগে কোনো স্পিচে এমন আটকাওনি"
জয় এক হাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে আছে,
"নাফিসা পেছনে বসে আছে"
"কি!!"
"আসতে ভাই,চিল্লাস না "
জাহিদ মুচকি হেসে উঠলো,
"ভাবীকে দেখে বলতি বান্দ হো গেয়ি?"
"চুপ করবি তুই?"
"আজ তো আমি ভাবির সাথে দেখা করবোই"
"খবরদার ওর সামনে ভাবি বলে ডাকবি না!"
অনুষ্ঠানে জয় আর থাকলো না।জাহিদ প্রিন্সিপালকে বলল তারা একটু কলেজটা ঘুরে দেখবে।একাই। প্রিন্সিপালের না বলার তো কোনো সাহস নেই। তাই হ্যাঁ বলে দিল।অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে জয় আর জাহিদ মাথায় হাত দিয়ে বসেছে।নাফিসাকে যেখানে দেখেছিল সে ওখানে নেই।এত বড় কলেজে নাফিসাকে কিভাবে খুঁজবে এখন?
"জাহিদ!"
হঠাৎ জয়ের ডাকে চকমে উঠল জাহিদ,
"কি! "
"ওর সাথে দেখা হলে আমি কি বলবো?"
"ওহো ভাইয়া চিল্লাচ্ছো কেন?আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছি।কি বলবে মানে?নরমাল কথা"
"কেমন করে? "
"অফিসে তো খুব মেয়ে ডিলারদের সাথে কথা বলো"
"আমি কি ওর সাথে এখন ডিলের কথা বলব?! "
জাহিদ ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটালো,
"হ্যাঁ হ্যাঁ,বিয়ের ডিলের কথাটাই বলিও না হয়"
"তুই একটু সিরিয়াস হবি!?কি বলব,কিছু তো আইডিয়া দে!"
জাহিদ একটু চিন্তা করলো,
"যেমন ধরো বলবা,'শুনেছি তোমাদের ক্যান্টিনের চা টা অনেক ভালো',এরকম কিছু।আরে ভাইয়া কেন এত টেনশন নিচ্ছো?কিছু হবে না"
জয় ভারী শ্বাস ছাড়ে।একটা মেয়ের সাথে কথা বলতে সে এত নার্ভাস কেন ফিল করছে?পেছনে কারো গলা পরিষ্কার করার আওয়াজে জয় ও জাহিদ পেছনে ঘুরে।নাফিসা জয়ের পাশে দেখে আছে।
জয় অপ্রস্তুতভাবে বলল,
"আরে নাফিসা!তুমি এখানে!এগেইন ওয়াট আ কয়েনসিডেন্স!"
জাহিদ একবার নাফিসার পাশে আর একবার জয়ের পাশে দেখছে।
"হ্যালো নাফিসা ভা্--।আমার মানে ভালো আছো?"
নাফিসা জাহিদের দিকে ঘুরে।জাহিদকে সে চিনতে পারেনি।
জয় বলল,
"ও আমার ছোট ভাই,জাহিদ।যার বিড়ালের কথা বলেছিলাম"
নাফিসা মুখে হাসি আনল,
"ওহ, হ্যাঁ আমি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?আপনার বিড়াল ভালো আছে?"
জাহিদ বলল,
"হ্যাঁ,আমরা দুজনই ভালো আছি "
নাফিসা জয়ের দিকে ঘুরলো,
"আপনার কোম্পানিটা তো অনেক ছোট দেখতে"
ভড়কালো জয়।হেসে উঠে বলল,
"আরে কেন অমন করে বলছ?কই আবার কত বড়?"
নাফিসা একটু হেসে উঠে।
জাহিদ বলল,
"ভাইয়া তোমরা কথা বলো।আমি ফোনে একটা আর্জেন্ট কল করে আসছি"
যাওয়ার আগে জাহিদ জয়ের কানে ফিসফিসিয়ে গেল,
"ক্যান্টিন,ক্যান্টিন"
জয় নাফিসার দিকে নজর দেয়।জাহিদের বুদ্ধিটা একবার ট্রাই করা যায়।
"তো নাফিসা,শুনলাম তোমাদের ক্যান্টিনের চা টা নাকি অনেক ভালো।আমাকে একটু ট্রাই করাবা না?"
চোখ-মুখ খিচে নিল নাফিসা,
"আপনাকে কে বলেছে আমাদের ক্যান্টিনের চা ভালো? বিদঘুটে একটা ফ্লেভার"
পর মুহুর্তেই জয়ের মুখে আর হাসিটা থাকলো না।এই জাহিদের বাচ্চার খবর আছে!
নাফিসা আবার বললো,
"কিন্তু কফিটা অনেক ভালো। ওটা ট্রাই করতে পারেন"
জয় একটা ভাবলেশহীন হাসি দেয়,
"হ্যাঁ হ্যাঁ,আমি ওটাই বলছিলাম।মনে হয় ভুলে চা শুনেছি"
নাফিসা আর জয় ক্যান্টিনের দিকে আগাতে লাগে।
"তো নাফিসা,তোমার কলেজের পর কোথায় পড়ার ইচ্ছা আছে?"
"আমি চিন্তা করেছি ল্ নিয়ে পড়বো।আমার ল্ একটু পছন্দ তো"
"দ্যাটস গ্রেট!"
জয়ের মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হচ্ছে না।সে কি বলবে বুঝতে পারছে না।সে জীবনে কখনো এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। দুজনে গিয়ে ক্যান্টিনের বাইরে একটা ব্রেঞ্চে বসে।
জয় বললো,
"তো তুমি সেদিনের পর আর বিড়ালটিকে দেখতে যাওনি কেন?"
"আমি যাইনি আপনি কেমন করে জানলেন? "
জয় নিজের জিহ্বার মাথায় কামড় বসায়,
"ওই,মানে,জাহিদ!জাহিদের বিড়ালকে নিয়ে কয়েকবার চেকআপ করাতে গিয়েছিলাম তো,তাই বিড়ালটাকেও দেখে এসেছি। তোমাকে ওই দিনগুলোতে দেখিনি তো, তাই আরকি বললাম"
নাফিসা অন্য পাশে ঘুরে একটা মুচকি হাসি দেয়।অতঃপর বলে উঠে,
"ওহো দেখেছেন,আমার কফির কথা তো মনেই নেই।আপনি বসেন আমি কফি নিয়ে আসি"
"আরে না,আমি নিয়ে আসছি"
"এটার পেমেন্টটা অন্তত আমাকে করতে দিন"
জয় হেসে উঠল হালকা।নাফিসা মুখে হাসি নিয়ে ক্যান্টিনের দিকে গেল।নাফিসার বুকটা এতক্ষন ধকধক কেন করছিল?লোকটার সাথে তো শুধু তিনবারই দেখা হলো।ভাবা বন্ধ কর নাফিসা! তুই যেরকম ভাবছিস ওরকম কিছুই নয়!
কফির কাপ দুটো হাতে নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে দূরে ব্রেঞ্চে বসে থাকা জয়ের উপর নাফিসার চোখ আটকে যায়।
কালো কোট-প্যান্ট এর ভিতর ব্লু চারকোল রংয়ের শার্টটা হালকা রোদে ফুটে উঠেছে।জয় বেঞ্চের দুই পাশে হাত চড়িয়ে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।এই শ্যামলা ছেলেটার কাছে আমেরিকার নামিদামি সাদা কাপড়ও হার মানবে যেন।ছয় ফুট এক ইঞ্চির ছেলেটা সি.ই.ও. না হয়ে মডেল হলে এতদিনে নাফিসাসহ দেশের প্রত্যেক মেয়ের ক্রাশ হতো।
কফির কাপের গরম হাতে লাগতেই নাফিসা চমকে উঠে।বেঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে।জয়ের গলার অ্যাপেলস এডামটা জয়ের ঢোক গিলার সাথে কেমন নড়ে উঠলো।সেদিকে নজর রেখেই নাফিসা ঢোক গিলল ভারী।একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কফির কাপটা জয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়,
"আপনার কফি "
জয় চোখ খুলে ভালো হয়ে বসে,
"হ্যাঁ দাও"
নাফিসা বেঞ্চে বসে মাথা নিচু করে কফি ফুকাতে লাগলো।তার পাশে দেখে কফি মুখে দিতেই জয়ের জিহ্বার মাথাটা পোড়া গেল।চোখ-মুখ বন্ধ করে দুই সেকেন্ড পর আবার স্বাভাবিক হলো সে।
দুজনের কেউই আর কথা বলছে না।শুধু কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে।কিছুক্ষণ পর জয়ই মুখ খুলল।
"তুমি যে অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে এখানে আছো,অনুষ্ঠান দেখবা না?"
"ওইসব অনুষ্ঠানে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।আশেপাশে শান্ত থাকলেই আমার বেশি ভালো লাগে"
জয় আবার কোমল দৃষ্টিতে নাফিসার পাশে দেখে আছে।এই মেয়েটা যেটাই বলে না কেন জয়ের সবই শুনতে এত ভালো লাগে কেন?জয়ের ফোন বেজে উঠল।জাহিদ কল দিয়েছে।এই জাহিদের বাচ্চাটা সবসময় ভুল সময় কল দেয়।
"হ্যাঁ,বল"
"তোমার প্রেম-পিরিতি এখনো হয়নি?অনুষ্ঠান তো শেষ। যেতে হবে এখন"
নাফিসা সামনে না থাকলে জয় ফোনেই জাহিদের বারোটা বাজাতো।জয় নাকি প্রেম করছে?এই জাহিদটা কথা বলতে দিলে না!
"হ্যাঁ যাচ্ছি"
জয় কলটা কেটে দেয়,
"নাফিসা,আজকেও আর বেশি কথা বলা হচ্ছে না"
"না না,কোনো সমস্যা নেই।আশা করছি আবার দেখা হবে"
"হ্যাঁ।সেটা অবশ্যই"
জয় বেঞ্চ থেকে উঠে গেল।
নাফিসা কফিতে ফু দিচ্ছে আর জয়ের পাশে দেখছে। ছেলেটা হাটেও মডেলের মতো।
✿এই পর্বের নৈতিক বাক্য:
ছোট ভাইকে বিশ্বাস করতে নেই।
#চলবে