ফন্ট সাইজ:
থিম:
পাগলের মতো ভালোবাসি

১ম পর্ব

লেখক: স্পর্শীয়া খান হিয়া

#পাগলের_মতো_ভালোবাসি

Writer: স্পর্শিয়া খাঁন হিয়া 
#Part: 1
[ ❌কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ❌]
পরিচয় — ১৯ বছর পর
খুলনা, রূপসা। রাত ১১টা।
জানালার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে শেহজাদ খান শুভ্র।
ছয় ফুট লম্বা, সুদর্শন, গম্ভীর ব্যক্তিত্বের এক যুবক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র। পাশাপাশি বাবার ব্যবসার কিছু দায়িত্বও সামলায়। ভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই সে পরিচিত নাম। মেয়েদের ক্রাশ হলেও শুভ্র কারও দিকে ফিরেও তাকায় না।
তার ঠান্ডা দৃষ্টি আর রাগী স্বভাবের জন্য সবাই তাকে একটু ভয়ই পায়।
টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরি।
ডায়েরির ভাঁজে যত্ন করে রাখা একটি নীল চুড়ি এবং একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—পাঁচ বছরের একটি ছেলে কোলে করে আছে আট মাসের একটি ছোট্ট মেয়েকে। চারপাশে ঝড়-বৃষ্টির রাত।
শুভ্রের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ছবিটার ওপর।
হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দ।
আদিব দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
— "কিরে দোস্ত? আবার ওই ছবি দেখছিস? ১৯ বছর ধরে একই ছবি দেখে যাচ্ছিস! মেয়েটা আসলে কে?"
শুভ্র ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করল।
তার গলা বরফের মতো ঠান্ডা।
— "কেউ না।"
আদিব হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
— "তুই যখন 'কেউ না' বলিস, তখন বুঝি ওই মানুষটাই তোর পুরো দুনিয়া।"
শুভ্র আর কোনো উত্তর দিল না।
জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের দিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। সকাল ১০টা।
নবীনবরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাস নতুন শিক্ষার্থীদের ভিড়ে মুখর।
স্পর্শিয়া খান হিয়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে ক্লাসরুম খুঁজছে।
প্রথম বর্ষের ছাত্রী।
গভীর নীল চোখ, মুখভরা হাসি আর চঞ্চল স্বভাবের জন্য যে কাউকে সহজেই আপন করে নিতে পারে।
তার পাশে হাঁটছে বান্ধবী মেঘলা।
— "হিয়া, আস্তে হাঁট! পড়ে যাবি কিন্তু!"
— "আগে ক্লাসরুমটা খুঁজে পাই, তারপর আস্তে হাঁটব!"
বলেই সামনে এগিয়ে গেল হিয়া।
ঠিক তখনই...
ধাক্কা!
তার হাত থেকে ফাইল, কলম, কাগজপত্র সব মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল।
চারপাশের কোলাহল যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
কারণ যার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে, সে আর কেউ নয়—
শেহজাদ খান শুভ্র।
সাদা পাঞ্জাবি পরা শুভ্র স্থির দৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ফিসফিস করে উঠল—
— "শেষ! মেয়েটা তো আজকে বাঁচবে না!"
— "শুভ্র ভাই কাউকে সহ্য করে না!"
হিয়া তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে বলল,
— "সরি ভাইয়া। আমি খেয়াল করি নাই। প্লিজ রাগ করবেন না।"
কথা বলতে বলতে তার চোখে পানি চলে এল।
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল হিয়ার মুখে।
বিশেষ করে...
নীল চোখ দুটোতে।
এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের তারা কেঁপে উঠল।
তারপর নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা কলমটা তুলে নিয়ে বলল,
— "উঠো, স্পর্শিয়া খান হিয়া।"
হিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— "আপনি আমার পুরো নাম জানলেন কীভাবে?"
শুভ্র একবার তার আইডি কার্ডের দিকে তাকাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "চোখ আছে। পড়তে পারি।"
কিন্তু মনে মনে বলল—
"যে নামটা ১৯ বছরেও ভুলতে পারিনি, সেটা আবার নতুন করে জানার প্রয়োজন হয় না।"
হিয়া উঠে দাঁড়াতে গেলে শুভ্র তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
সেই মুহূর্তে খুব আস্তে করে ফিসফিস করে বলল—
— "হিয়া পাখি..."
হিয়ার বুকটা ধক করে উঠল।
এই ডাক!
কোথায় যেন শুনেছে।
অনেকবার।
স্বপ্নে...
অথচ মনে করতে পারছে না।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
শুভ্র কাউকে পাত্তা দিল না।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— "ক্লাসরুম ৩০১ খুঁজছো?"
— "জি।"
— "চলো।"
এই প্রথমবার পুরো ক্যাম্পাস দেখল—
শেহজাদ খান শুভ্র নিজে একজন নতুন শিক্ষার্থীকে ক্লাসরুম দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
দূরে দাঁড়িয়ে আদিব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
— "দোস্ত! তোর তো ক্লাস এই বিল্ডিংয়েও না!"
শুভ্র শুধু একবার তার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টি দেখেই আদিব চুপ।
ক্লাসরুম ৩০১-এর সামনে এসে শুভ্র থামল।
হিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল,
— "যাও। ক্লাস করো। আর ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় একটু সাবধানে চলবে।"
কথা শেষ করে সে চলে গেল।
দীর্ঘ ছায়া ফেলে।
হিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার পথের দিকে।
মেঘলা দৌড়ে এসে বলল,
— "হিয়া! তুই ঠিক আছিস? শুভ্র ভাই তো কারও সঙ্গে কথা বলে না! উনি তোকে সাহায্য করল কীভাবে?"
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
শুধু মনে মনে ভাবল—
"লোকটা এত গম্ভীর কেন? আর আমাকে 'হিয়া পাখি' বলে ডাকল কেন? মনে হচ্ছে তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি..."
রাত ৮টা
শুভ্রর রুম
আদিব বিছানায় বসে আছে।
— "এখন বলবি? মেয়েটা কে?"
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না।
পকেট থেকে ধীরে ধীরে সেই নীল চুড়িটা বের করল।
চুড়িটার ওপর আঙুল বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— "কেউ না... শুধু একটা জুনিয়র।"
কথাগুলো বললেও তার হাত কাঁপছিল।
আদিব কিছু বলল না।
সে বুঝতে পারল—
শুভ্র মিথ্যা বলছে।
আদিব বেরিয়ে যেতেই শুভ্র চুড়িটা কপালে ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করল।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
— "পেয়ে গেছি তোমাকে, হিয়া পাখি..."
— "১৯ বছর পর আবার খুঁজে পেয়েছি।"
— "কিন্তু তুমি কখনো জানতে পারবে না..."
— "আমি শুধু তোমার ছায়া হয়েই থাকব।"
জানালার বাইরে রাতের আকাশে মেঘ জমছে।
আর অদৃষ্টের খেলায় ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসছে দুইটি জীবন...
যারা এখনো জানে না—
১৯ বছর আগে শুরু হওয়া গল্পটা আবার নতুন করে শুরু হতে চলেছে!
খুলনা, রূপসা। সকাল ৮টা।
খান ভিলার ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে নাস্তা করছে।
টেবিলের একপাশে বসে আছে শেহজাদ খান শুভ্র। হাতে কফির মগ, চোখ ফোনের স্ক্রিনে।
ঠিক তখনই পাশের চেয়ার টেনে বসল মিম খান।
— "ভাইয়া, আজকে আমাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিবা?"
— "ড্রাইভার আছে।"
— "আমি ড্রাইভার চাই না, আমি আমার ভাইকে চাই।"
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই মিম মুখ বাঁকাল।
— "আচ্ছা আচ্ছা! এমন তাকানোর দরকার নাই।"
ডাইনিং টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেল।
নাজিয়া খান হেসে বললেন,
— "মিম, তোর ভাইকে দিয়ে আদর আশা করিস না। ও জন্ম থেকেই গম্ভীর।"
মিম ফিসফিস করে বলল,
— "আমার মনে হয় ভাইয়া হাসতে ভুলে গেছে।"
শুভ্র কিছু না বলে কফিতে চুমুক দিল।
কিন্তু তার মাথায় ঘুরছে অন্য একটা মুখ...
নীল চোখের এক চঞ্চল মেয়ে।
অন্যদিকে...
খান মঞ্জিল। সকাল ৯টা।
হিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
হঠাৎ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল তিশা।
— "আপু! আমার চকলেট কে খাইছে?"
— "আমি জানি না।"
— "তুমি খাইছো!"
— "প্রমাণ দে।"
— "আমার মন বলতেছে!"
হিয়া হো হো করে হেসে উঠল।
ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল নাহিয়ান খান হিয়ান।
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু ছোট দুই বোনের কাছে সে একজন ফুলটাইম বডিগার্ড।
— "সকাল সকাল আবার কী নিয়ে যুদ্ধ লাগছে?"
— "ভাইয়া! আপু আমার চকলেট খাইছে!"
— "মিথ্যা অপবাদ!"
নাহিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
— "তোমাদের দুইজনকে নিয়ে একদিন পাগল হয়ে যাব।"
সবাই হেসে উঠল।
দূর থেকে ফারহানা খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হিয়ার নীল চোখ দুটো দেখলেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কষ্ট জেগে ওঠে।
১৯ বছরের পুরোনো একটা সত্য...
যেটা এখনো কেউ জানে না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
হিয়া ক্লাসে ঢুকতেই একটা মেয়ে এসে হাসিমুখে বলল,
— "হাই! আমি মিম।"
— "আমি হিয়া।"
— "জানি।"
— "জানো?"
— "হুম। কালকে তো পুরো ক্যাম্পাস তোমাকে নিয়ে আলোচনা করছে।"
হিয়া অবাক।
— "আমাকে নিয়ে কেন?"
মিম নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— "কারণ তুমি আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলেছো।"
— "তোমার ভাই?"
— "শেহজাদ খান শুভ্র।"
হিয়ার বুক ধক করে উঠল।
— "ওহ..."
মিম হাসল।
— "ভয় পেয়ো না। ভাইয়া বাইরে থেকে রাগী, ভেতরে এতটাও খারাপ না।"
হিয়া মনে মনে বলল,
"এতটাও খারাপ না? মানুষটা তো রহস্যের বাক্স!"
কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুজনের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
দুপুর
ক্লাস শেষ করে বের হচ্ছে হিয়া।
হঠাৎ করিডোরে কয়েকজন সিনিয়র ছেলে তার পথ আটকে দাঁড়াল।
— "নতুন নাকি?"
— "জি..."
— "নাম কী?"
হিয়া অস্বস্তি বোধ করল।
ঠিক তখনই করিডোরের পরিবেশ বদলে গেল।
সবাই চুপ।
একটা ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
— "কোনো সমস্যা?"
ছেলেগুলো ঘুরে তাকাতেই মুখের রং পাল্টে গেল।
শেহজাদ খান শুভ্র।
দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখে সেই পরিচিত ঠান্ডা দৃষ্টি।
একজন সিনিয়র তোতলাতে লাগল,
— "না... না ভাই।"
— "তাহলে রাস্তা ছাড়ো।"
এক সেকেন্ডও দেরি করল না কেউ।
সবাই সরে গেল।
হিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শুভ্র তার দিকে না তাকিয়েই বলল,
— "একলা চলাফেরা কম করবে।"
— "কেন?"
— "কারণ আমি বলছি।"
বলেই হেঁটে চলে গেল।
হিয়া হতভম্ব।
লোকটা কি সবসময় এমন?
সন্ধ্যা
শুভ্র নিজের রুমে বসে আছে।
হাতে সেই পুরোনো ছবি।
ছবির ছোট্ট মেয়েটার নীল চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
— "একটুও বদলাওনি..."
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
দাদি কলিং...
শুভ্র ফোন রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে রওশন আরা খান বললেন,
— "শুভ্র, আগামী শুক্রবার সবাইকে নিয়ে বাড়িতে আসবি।"
— "হঠাৎ?"
— "পারিবারিক মিলনমেলা। অনেকদিন সবাই একসাথে হই না।"
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত অশনি সংকেত বাজল।
সে জানে না—
এই মিলনমেলাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের দরজা খুলে দিতে চলেছে।
আর সেই সত্যের কেন্দ্রবিন্দু...
স্পর্শিয়া খান হিয়া।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন