ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

১ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা।

(বিঃদ্রঃ অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ)

পর্ব -১

সকালের মিষ্টি রৌদ্রে দিনের সার্থকতা খুজেঁ বেড়ানোটা পাগলামি না হলেও এটাকে ছেলেমানুষি বলাই যায়। কিন্তু এটা যদি নিজেকে ভালো রাখার উপায় হয় তবে বলবো এটা সত্যিই সার্থকতা।

আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা মা, এই মস্তো আকাশটা থেকে কি লাভ যদি ইচ্ছা মতো এই নীলে উড়া না যায়?"

মা হেসে বললো, "রুশা, মানুষ পাখি নয় যে উড়ে বেড়াবে। আর কিছু জিনিস দূর থেকেই উপভোগ করতে হয়, সব জিনিস ভোগের নয়।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম, "ইস্! যদি পাখি হতাম কত্তো ভালো হতো অন্ততঃ পালিয়ে বেড়াতে তো হতো না।"

মা হাতের কাজ ফেলে আমার কাছে এসে বললো, "রুশা, এভাবে কেনো বলছো।"

আমি আকাশের দিকে তাকিয়েই বললাম, "আমি ক্লান্ত মা, আর কতো পালাবো বলতে পারো?"

মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, "আচ্ছা ঠিক আছে। যাও তুমি তৈরি হয়ে নাও, কলেজ আছে তো।"

"হ্যাঁ, তাও আবার কলেজের প্রথম দিন; যাচ্ছি।"

আমার কাছে আমার জীবনটা ঐ আকাশের উড়ন্ত মেঘেদের মতো, যাদের কোন গন্তব্য নেই। নিজের বলতে কিছু নেই, না আছে আছে একটা সুন্দর পরিবার, আপনজন, বন্ধু আর না আছে কোন ভরসার জায়গা। আমার দুনিয়া মানে মা। আর বাবা! সে তো শুধু গল্প আর কল্পনায়।

যাই হোক, এই মুহূর্তে আমার আল্লাহর কাছে কি চাওয়া উচিত জানি না, তবে আমার কাছে কিছুই নেই। ছোট থেকে এখন পর্যন্ত ৬টা স্কুল আর ২টা কলেজ পরিবর্তন করে আজ আমি সানন্দপুর। এখানে কতোদিন ঠাই হবে জানি না। গতকালই এই শহরে এসেছি।

এখানের ব্রিটিশ ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান কলেজে যে আমার চান্স হবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। শুনেছি বাংলাদেশের সব থেকে বড় ভূতত্ত্বের কলেজ এটা আর এই কলেজের ভিতরেই এশিয়ার সব থেকে বড় গবেষণাগার, যেখানে ঢোকার অনুমতি কারোরই নেই। এখানে পড়াটা অনেকের স্বপ্ন, তবে আল্লাহ আমাকে কিভাবে চান্স পাইয়ে দিলেন এটা আল্লাহই জানেন। আজ একটা হালকা রকমের ভয় কাজ করছে, নতুন কলেজ তাই হয়তো।

মা দরজায় নক করে বললো, "রুশা! রুশা! এই মেয়ে ৯টায় তোর ক্লাস, তৈরি হয়েছিস? "

"হ্যাঁ মা, এই আসছি দাঁড়াও।"

মা আমার দেরি দেখে রেগে বললো, "উফ্ তারাতাড়ি কর, আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"

মা কতো সহজেই সব সামলে নেয়। নতুন জায়গা হোক বা পুরাতন, মার কাছে সব যেন পরিচিত। মার চাকরিও বেশ ভূমি অধিদপ্তরের, বার বার বদলি, অফিস কতৃপক্ষ মনে হয় পন করেছে যে মা আর আমাকে সারা বাংলাদেশ ঘুরিয়েই ছাড়বে।

সানন্দপুরের যান-বাহন গুলো কেমন জানি! সব বিষয়ে একটা গভীর রাজকীয়তা আছে। কেনো যেন মনে হয় কোনো এক সৌখিন রাজার খুব যত্নের রাজ্য ছিল। প্রতিটি রাস্তা খুব আপন মনে হয়। মনে হয় কতো এসেছি। কোনো এক গোপন অভিমানে হয়তো অনেক দূর ছুটে ছিলাম আর সেই অভিযোগ প্রতিটি রাস্তা আমাকে দিচ্ছে।

আমায় অবাক দৃষ্টিতে রাস্তায় তাকিয়ে থাকতে দেখে। মা জিজ্ঞেস করলো, "এই মেয়ে হা করে রাস্তায় কি দেখছিস?"

আমি অবাক হয়ে রাস্তায় দেখতে দেখতেই বললাম, "এতো সুন্দর শহর দেখে আমার তো কবি হতে ইচ্ছে করছে মা।"

মা আমার সব কথা এড়িয়ে গিয়ে বললো, "হ্যাঁ এটাই বাকি, সব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দাও এখন। কলেজ যাচ্ছ, বন্ধু দরকার নেই আর বাবার নাম ও নিতে হবে না।"

আমার সৌন্দর্যের উপভোগের সব মজা বাবার নামে অতিতের বিষন্নতায় মিলিয়ে গেল। তারপর ও মুখ টিপে হেসে মাকে বললাম, "মা আমি জানি, ঐ লোকটার পরিচয় আমি কখনো কাউকে দিতে চাই না, সব বাদ দাও কখন ফিরবে? "

"তোকে ২টায় কলেজ থেকে নিয়েই ফিরবো।" "ঠিক আছে।"

আমি চলে যেতে গেলে মা পিছু ডেকে বললো, "আর শোন আবার বলছি, কলেজে এতো বন্ধু বানাতে হবে না। অতো বেশি পাত্তা দিবি না কেউকেই। "

"ঠিক আছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে। সব মনে থাকবে। এখন যাই? আমার ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে।"

মা আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই এক আজব ভয় আমাকে আবার আঁকড়ে ধরলো। আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম, আমি আবারও হাজার অচেনার ভিড়ে একা দাঁড়িয়ে। এমন রোজ রোজ নতুনত্ব আমার অভ্যেস হয়ে যাওয়ার কথা। তবে কি জানি, অভ্যেসটাও বড্ডো বেপরোয়া, বারবার আমাকে একই সংকোচের দুনিয়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। বর্তমানে দু’এক পা হেঁটে, কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে আমি থমকে গেছি আর দুনিয়া তার গতিতে চলছে।

তবে থমকে যাওয়ার সময়ের মিনিট দুই শেষে একটা নতুন চরিত্রের কন্ঠস্বর। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর, ফর্সা গায়ের রং, টানা টানা চোখ আর চঞ্চল প্রকৃতির। আমাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, -"তুমি কি ১ম বর্ষে ভর্তি হয়েছো?"

আমি সম্মতি দিয়ে বললাম, "হ্যাঁ, তুমি?"

মেয়েটা যেন খুশিতে গদগদ হয়ে বললো, "আমি ও। কোন ডিপার্টমেন্ট তোমার?"

আমি বললাম, "ভূতত্ত্ব, তোমার?"

মেয়েটা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বললো, "আরে আমার ও তো! আমার নাম প্রীয়তা।"

আমি একটু হেসে বললাম, "আমি রুশা।"

আমি যে তার ২ মিনিটের পরিচিত একজন তাতে যেন কিছুই আসে যায় না মেয়েটার। সে নিজ থেকেই বলতে শুরু করলো, "আসলে এই শহরে নতুন আর নতুন কলেজ। কাউকেই চিনি না, আর তুমি যেভাবে নার্ভাস হয়ে কলেজের দিকে তাকিয়ে ছিলে, আমার মনে হচ্ছিল তুমিও নতুন তাই এগিয়ে কথা বললাম।"

আমি সৌজন্য হেসে বললাম, "আমিও এই শহরে নতুন আর সত্যিই নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু এখন তোমার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে।"

হয় না মাঝে মাঝে! অতি গরমের পর একটা ঠান্ডা হাওয়া, সব শীতল করে দেয়। প্রীয়তার সাথে কথা বলে আমার অনুভূতিটাও ঠিক এরকম। যেন একটা জীবন্ত মানুষ, একদম মন থেকে জীবন্ত। কিভাবে যেন এই চলমান সবাইকে ছেড়ে, থমকে যাওয়া আমার সাথেই কথা বলেই যাচ্ছে, বলেই যাচ্ছে।

আমি তার কথার গতি দেখে বললাম, "চলো ক্লাসে যাওয়া যাক; না হলে দেখা যাবে প্রথম দিনই দেরি হয়ে যাবে।"

প্রীয়তা আমার কথায় যেন অকারণেই একটু মুচকি হেসে বললো, "তা ঠিক বলেছো।"

আমি খুব সহজে মানুষকে আপন করি না, তবে প্রীয়তার সাথে দেখা হওয়ার পর ভালো লাগছে। একটা খোলা মনের মেয়ে, খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে। ওর মতো হাসি খুশি মানুষ খুব কম দেখেছি আমি।

আমার অপরিচিত যাত্রায় এক নতুন সাথীর সঙ্গ; উদ্দেশ্য ক্লাসরুম। কলেজের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে এই প্রশ্নই জাগছে যে, এই হাজার অপরিচিতের মাঝে মানাতে পারবো তো? ক্লাসটা কেমন হবে ধারণা নেই, আর না আছে ভবিষ্যতের এক মূহুর্তের ধারণা।

ক্লাস রুমের দরজা পর্যন্ত গিয়েই চোখ যেন কপালে উঠলো। প্রীয়তা অবাক হয়ে বললো, "বাবারে! এতো বড় ক্লাস!"

আমিও বেশ কিছু সময় থমকে গিয়ে বললাম, "এতো ছাত্র ছাত্রী!"

প্রীয়তা বললো, "আমার মনে হচ্ছে পালিয়ে যাই।"

যদি কোন বিষয়, নিজেরই ধারণার সব দেয়াল টপকে এক নতুন রাজমহল তৈরি করে তখন চেহারার প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন হওয়া উচিত? আমি আমার সারা জীবন কাটিয়েছি মফস্বলে, ভাগ্যক্রমে এক দুই বার, দুই তিন দিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছি। তবে এই সব বড়লোকের কলেজ দেখার সৌভাগ্য কখনো হয় নি। এখানে কলেজের বাইরে যা ছিল তাও ঠিক হজম হয়ে যেতো তবে ক্লাস! এতো রাজকীয় অবস্থা। আমি নিজের এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে দেখি প্রীয়তা আমার থেকেও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আর তার থেকেও লক্ষ্যনীয় বিষয় ক্লাসের সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি বেশ লজ্জা পেয়ে ইতস্ততঃ ভাবে প্রীয়তাকে বললাম, "প্রীয়তা,ক্লাসের ভেতরে চলো, সবাই তাকিয়ে আছে।"

প্রীয়তা সব অগ্রাহ্য করে বললো,"-আমার তো এখন ভয় লাগছে।"

আমি ফিসফিসিয়ে বললাম, "আগে ভেতরে চলো, একটা ডেস্কে বসে তারপর বাকি ভয়টুকু পেয়।"

ও আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "রুশা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে তারপর চলো।"

আমি একটু হেসে বললাম, "আচ্ছা চলো।"

আজ মনে হচ্ছে এক অন্য জীবনের মাঝে প্রবেশ করলাম। অপরিচিত হাজার মুখে ভরা একটা রং ছেটানো জীবন, যেটা আমার কখনোই ছিল না, আর না আমি এটাকে কখনো কল্পনা করেছি। সব কিছু একটু বেশিই অদ্ভুত।

ক্লাসে সবাই অচেনা তারপর ও নিজের কাছে সব আপন অনুভব হচ্ছে। সব দিকে তাকিয়ে কেনো যেন সবার কাছে নতুন কিছু মনে হচ্ছে। সবাই সবার থেকে একদম আলাদা। তবে আমার নজর আটকে গেছে ৪ নম্বর সারিতে বসা মাঝের ড্রেস্কের ছেলেটার দিকে। চোখ সরিয়েও কেনো যেন আবার চোখ ঐ দিকেই চলে যাচ্ছে। সারা ক্লাসে সবাই আলাদা হলেও ঐ অচেনা মুখটা কেনো যেন বেহায়ার মত তার দিকে আমাকে তাকাতে বাধ্য করছে। তার অবাধ চাহনি, হাসি যেন চাঁদের জোছনার মতো ঝরছে, তার এই হাসির সময়ের ছোট হয়ে আসা চোখ আর তার গালের গাঢ় টোল। বারবার তার চোখের উপরে এসে চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে কিছু ছন্নছাড়া চুল। সব যেন কোনো জীবন্ত ছবি। জীবনে প্রথম কাউকে দেখে থমকে গেছি, সময় ধিরে চলছে, সবাই ঝাপসা শুধু তার মুখটা ছাড়া।

প্রীয়তা ডাকছে আমাকে। ওর কথা কান পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছাচ্ছে তবে জবাব দেয়ার ইচ্ছে শক্তি বিশ্রামে চলে গিয়েছে।

আমার সাড়া না পেয়ে প্রীয়তা কানের কাছে চিৎকার করে বললো, "রুশা, এই রুশা!"

প্রীয়তার জোরে চিৎকার শুনে চমকে উঠে বললাম, "হ্যাঁ, কি .... কি হয়েছে?"

প্রীয়তা আমার চমকানো অবস্থা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তোমার কি হয়েছে এতো গভীর কি ভাবনায় ছিলে যে তোতলাচ্ছো।"

আমি সব এড়িয়ে বললাম, "কোথায় এমনিতেই।"

প্রীয়তা বেশ সন্দেহ নিয়ে বললো, "কি আছে দেখি ঐ দিকে, পরিচিত কেউ? এতো মনোযোগ।"

আমি লোকদেখানো হাসি হেসে বললাম, "কেউ না আর কিছুই না। কিছু হয়েছে?"

আমার হাসি দেখে আরো গভীর ভাবে বললো, "না তবে আমার মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।"

আমি আবারও হেসে বললাম, "মনের ডাক্তার দেখাও, ভুল ভাল মনে হয় তোমার মনের।"

প্রীয়তা কিছু সময় চুপ থেকে আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বললো,"এই প্রথম দিনেই প্রেম-ভালোবাসার কিছু না তো? নাকি ক্রাস? দেখো এমন কিছু হলে সবার আগে আমায় বলবে, না বললেও আমি ঠিক বের করে নেবো। অবশ্য আমি একজন ভালো গোয়েন্দা।"

আমি হাসি কন্ট্রোল করে বললাম, "আমি সব বুঝে গেছি গোয়েন্দা ম্যাডাম।"

আমার কথা মেনে নিয়ে প্রীয়তা বললো, "ঠিক আছে, বুঝলেই ভালো। কিছু হলেই বলবি না হলে সত্যিই দেখাবো আমি কত বড় গোয়েন্দা। আচ্ছা শোন আমার তুমি বলার অভ্যেস নেই, আমি কি তুই করে বলতে পারি?"

আমি বললাম, "এভাবে বলছো কেনো, বন্ধুত্বে তুই ই মানায়, তুমিটা কেমন দূরের লাগে। তুমি তুই করেই বলো, আমার ভালো লাগবে।"

প্রীয়তা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বললো, "অনেক অনেক অনেক গুলো ধন্যবাদ। আমি তুমি বলে বলে ক্লান্ত।"

আমি হেসে বললাম, "তোমাকে দেখে ই বোঝা যাচ্ছে।"

"তুমিও তুই করে বলো, না হলে আমার একা তুই বলতে অস্বস্তি লাগবে।"

আমি বললাম, "আস্তে আস্তে হয়ে যাবে, তুই বলার অভ্যেস নেই আমার।"

প্রীয়তা এক অদ্ভুত চরিত্র। এক দিনে যেন এক বছরের জীবন বাঁচে । ওর সব কিছু যেন সিক্স জি স্পিডে চলে।

হাসি, মজা, নতুন বন্ধু আর প্রথম দিনের ক্লাস, সব মিলিয়ে প্রথম দিনটি ভালো দিনের খাতায়। স্যারদের কথা শুনে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল। এই কলেজে ভর্তির জন্য নাকি ৫০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল আর চান্স পেয়েছে মাএ ৮০০জন! তাও আবার এতো বড় কলেজে মাএ চারটা ডিপার্টমেন্ট! আমিও যে মেধাবী তা আজ জানলাম।

তা যাইহোক প্রীয়তার বকবকের স্বভাব যে এতো কাজের, আমি বুঝতেই পারিনি। ওর জন্য আজ আরো বন্ধু হয়ে গেল। শুধু বন্ধু নয় বেশ কয়েকজনের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে।

সে যাই হয়েছে, এই সব মাকে বলাই যাবে না, যদি রাগ করে! না হয় আবার কলেজ যাওয়াই বন্ধ করে দেবে। মা কেনো যে সবাইকে একই ভাবে আল্লাহ জানে। তার কোন বন্ধু কবে তাকে ধোঁকা দিয়েছে সেই রাগ এখনো যত্নে মনের মাঝে আগলে রেখেছে। আর কাউকে তো পায় না, আমায় দিয়ে জিদ পূরন করে। তাই সারাদিন বন্ধু বিরোধী জ্ঞান। যেন একবার মাছ খেয়ে গলায় কাটা বেঁধেছে তো বাড়িতে মাছ খাওয়াই বন্ধ, আর পরিবারের সবার জন্য বয়কট মাছ। তবে দোষতো শুধু মায়ের ঐ বন্ধুর ছিল না, আমার বাবারও ছিল।

ধুর! কে বাবা! ঐ লোকটা আমার কেউ না। আমি সত্যিই পাগল, কি সব ভাবছি।

তবে সত্যিই আজকের দিনটা ভালো ছিল। আমার মনে হয় জীবনে সবারই একজন ভালো বন্ধু থাকা দরকার আর যদি প্রীয়তার মতো কেউ হয় তাহলে প্রতি দিনই ঈদ। একদম সহজ একটা মানুষ। কলেজের কয়েক ঘণ্টার পরিচয় যেন কিছুই না, মনে হয় কতো পুরানো পরিচয়।

আর আজকের দিনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অপরিচিত ঐ মুখটা। ঐ ছেলেটার হাসি কেনো যেন চোখে আটকে আছে। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, যে ছেলেটা কেমন দেখতে ছিল? সত্যিই বলতে পারবো না, তবে ওর মতো মায়াবী চোখ আমি কোনো দিন দেখিনি। আর ঐ হাসি! ক্ষমতা নেই ভাষায় প্রকাশ করার। জীবনানন্দ যেমন লিখেছিলেন ‘‘এক বিন্দু শান্তি দিয়েছিলেন নাটোরের বনলতা সেন’’। আজ আমার বলতে ইচ্ছে করছে “এক সমুদ্র জীবন দিয়েছে আমায়, কয়েক মুহূর্তের ঐ হাসি”। জীবনে প্রথম কেউ আমার ভাবনার এতোটা অংশে নিজের অধিপত্য চালাচ্ছে। তাও এমন কেউ যার পরিচয় আমার কাছে, চলতে চলতে থেমে যাওয়া একটা নিঃপাপ হাসি।

ভাবনার এই লম্বা সময়ের ইতি মায়ের বকা শুনেই টানার ছিল। মা যে এর আগে ঠিক কতবার খেতে ডেকে গেছে জানিনা, তবে অনেকবার ডেকে গেছে তার প্রমাণ তার রাগান্বিত কন্ঠস্বর জানাচ্ছে। আমার সারা না পেয়ে মা আমার দরজায় নক করে চিৎকার করে বললো, "রূশা,এই মেয়ে। খাবার ঠান্ডা হচ্ছে আসতে কত সময় লাগে?

উফ্! মেয়েটাও না, কোনও কথা কানে যায় না।

রূশা খেয়ে নাও আগে তারপর পড়।"

আমি তার এতো চিৎকারের উওরে, খুব নরম ভাবে বললাম, "এই আসি।"

আমি খাবার ঘরে যেতেই মা আমার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে বললো, "কি হয়েছে? এতো সময় লাগে আসতে! কখন থেকে ডাকছি? খাওয়া শেষ করেও তো পড়া যায়।"

আমি ভিতু কন্ঠে বললাম, "আসছিলাম-ই।"

মা ভাবছিল আমি পড়ছিলাম! এই রে, বইয়ের এক লাইন ও তো পড়িনি। আমি যে ফেসে গেছি বুঝতে পারছিলাম।

মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, "কি পড়ছিলে?"

আমি ভয় পেয়ে বললাম, "পড়ছিলাম .... বই পড়ছিলাম।"

মা জেরা করার মতো করে বললো, "হ্যাঁ, বইয়ে কি পড়ছিলে এতো মন দিয়ে? ৩০মিনিট ধরে ডাকছি।"

আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম, "মা, বনলতা ঐ একটা পড়া আর কি।"

মা সন্দেহের চোখে বললো, "বনলতা!"

আমি তেমন কিছু বলিনি! তারপরও কথায় আছে না, চোরের মন পুলিশ পুলিশ। খুব সহজ একটা কথা, বললেই হতো আমার ক্লাসের বই পড়ছিলাম। তবে না, আমার তো ঘাবড়ে উল্টো পাল্টা কিছুই বলার ছিল! তাই মা ও তার ভয়ংকর নজর দিয়ে আমাকে নিশানা বানাচ্ছিল। মোট কথা এখন প্রধান কথাকে সামলাতেই হবে।

মাকে আদুরে গলায় বললাম, "মা, খেতে দাও না, কি নিয়ে এখন প্রশ্ন করছো, আমার পড়তেও হবে।"

মা আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বললো, "বসো, আমারো কাল অফিস আছে।

রূশা কলেজ কেমন কাটলো?"

আমি বললাম, "ভালোই।"

মা বললো, "কারো সাথে মেশার কোনো প্রয়োজন নেই, ক্লাসমেট হিসেবে যতটা কথা বলার দরকার অতোটাই বলবে। কেউ বেশি ফ্রি হতে চাইলে আমায় এসে বলবে, তার ব্যবস্থা আমি নেবো।"

আমি ও ভালো মানুষের মতো বললাম, "না মা, আমি কারো সাথে কথাই বলিনি।"

মায়ের বড় বড় প্রশ্নের দুই এক লাইনের উওর দিচ্ছি আর আল্লাহকে ডাকছি। খেতে বসে এতো মিথ্যা কোনো দিনও বলিনি। মায়ের প্রতি প্রশ্নের উত্তর ও নিজের থেকে বানিয়ে দিচ্ছি। তবে আমার এই কথা বলার অরুচি দেখেও মায়ের প্রশ্ন থামলো না।

সে আবার জিজ্ঞেস করলো, "কলেজের স্যাররা কেমন? পরিচিত হয়েছ?"

আমি ও সম্মতি দিয়ে বললাম, "হ্যাঁ মা।"

কিন্তু প্রধান ঘটনা! কিসের পরিচয়! স্যার ম্যামরা এসেছেন, টানা কয়েক ঘন্টা বকবক করেছেন আর চলে গেছেন। ক্লাসে কোনো কিছুতে তো মনই দিতে পারিনি।

মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কেউ বাবাকে নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে নি তো?" "না।"

বাবাকে নিয়ে কে কি বলবে? আমার বাবা কি এদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যে সবাই চিনবে আর তার নাম নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করবে। আর এসব হলেও কোনো দিন ভুলেও তার নাম নেবো না আমি।

মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "ঠিক আছে, কলেজে কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবে।"

আমি একটু জোর করে হেসে বললাম, "ঠিক আছে মা।"

মা আমার এই উওরের অনিহা দেখে আমার দিকে চিলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, "হ্যাঁ সব ঠিক থাকলেই ভালো। তুমি কি কিছু নিয়ে ভাবছো?"

আমি হকচকিয়ে বললাম, "কোথায় না .. তো।"

"তোতলাচ্ছ কেনো তাহলে?"

আমি তারাতাড়ি পানির গ্লাসটা নিয়ে একটু পানি খেয়ে বললাম, "মা, তরকারিটা অনেক ঝাল হয়েছে তাই আর কি।"

মা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "এতো ঝাল তো হয়নি, তাও ঠিক আছে পানি খাও।"

জীবনে প্রথমবার মাকে টিভি সিরিয়ালের ভয়ংকর মায়েদের মতো লাগছিল। কেমন একটা টান টান পরিস্থিতি। মনে হচ্ছিল বিদ্যূৎ চমকাচ্ছে আর সিরিয়ালের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সেই ভয়ংকর ‘‘ধূম তা না না” বাজছিল চারপাশে। জীবনের প্রথম সব কিছু নাকি বেশ সুন্দর হয়, তবে প্রথম মিথ্যে যে আমাকে এতো ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ফেলবে আমি ভাবতেও পারিনি।

বর্তমানে খাবারের থালার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই আমার মাথায় আসছে না।

আমি মিথ্যেবাদী না, তবে জোড়ালো দাবি করে বলতে পারি সারা জীবন মাকে এই একটি বিষয়েই খুব মিথ্যে বলেছি। স্কুল, কলেজ আর এখন বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় মাকে লুকিয়েই বন্ধু বানিয়েছি। আর মিথ্যে বলে বারবার ভয় পেয়েছি, তবে ধরা খাইনি। সত্যি বলতে এই একটা মিথ্যে নিজের মতো ভালো থাকার জন্য। আজকের মিথ্যেটাও ভালোর জন্য। পৃথিবীতে কি পাপির অভাব পড়ছে, যে আল্লাহ আমার এই ছোট ছোট মিথ্যেতে পাপি বানাবেন আমাকে!

রাতের শহরটা কত নিঃতেজ! কতটা সতেজ। মন চায় যেন ছুঁয়ে থাকি এই স্তব্ধতাকে। আমার উড়ার গন্ডিটা খুব সামান্য, তাই জানালায় দাঁড়িয়েই রাতের শহরের গন্ধ নিচ্ছি। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা, তবে সব ভালো লাগার মাঝেও ঐ অপরিচিত মুখটা ভেসে আসছে। ক্ষনিকের আটকে যাওয়া ভালোলাগা। মন কেনো যেন ঐ মূখটাকেই ভাবতে বাধ্য করছে। তবে আজ রাতে আমার কাছে আছে, কাল সকালের অপেক্ষা।

চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন