#রুশ_রহস্য
#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি
গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা
(বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না। )
পর্ব- ২১
ঘুম ভেঙে ও ঘুম ভাঙতে না চাওয়ার মতো একটা সকাল। নিজেকে জোর করে ঘুমের রাজ্যে আটকে রাখার চেষ্টা আর মনে মনে উঠে যাওয়া, এই এখন আমার অবস্থা। ভাবনা গুলো আজগুবি হলেও এমন এক সকালের জন্য গ্রহণ যোগ্যতা এই ভাবনাকে দেয়াই যায়। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি এক ধূসর স্বপ্নরাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম, যেখানে ঘুম ভাঙতে চাওয়া আর না-চাওয়ার মাঝখানে এক অলস টানাপোড়েন চলছিল। মনে হচ্ছিল, যদি কিছুক্ষণ আরাম করে থাকি, পৃথিবীর কোনো নিয়ম ভঙ্গ হবে না। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম! রুবাই আর প্রীয়তার দয়াহীন চিৎকার সেই শান্তির সমাধি ঘটালো।
রুবাই এক ধাক্কায় যেন স্বপ্নরাজ্যের দরজাটা খুলে দিয়ে বললো, "রুশা আর কতো উঠছি উঠছি বলবি, এবার উঠে যা।"
আমি উল্টা দিকে ফিরে শুয়ে বললাম, "২ মিনিট।"
রুবাই আমার এমন অবস্থা দেখে রাগে তাঁবু থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে প্রীয়তাকে বললো, "প্রীয়! তুই রুশাকে উঠা। ২ মিনিট! ২ মিনিট! করে ২ ঘন্টা কটিয়ে দিয়েছে।"
প্রীয়তা তাঁবুর কাছে এগিয়ে এসে বললো, "ঘুমাতে দে ওকে। সারা রাতের ঘুম এতো তারাতাড়ি কি পুরবে।"
রুবাই প্রীয়তার কথা না বুঝে মানে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু আমি ঠিকই রুবায়ের কথার মানে বুঝতে পেরেছি। তারমানে অরুপ রুবাইকে সব বলে দিয়েছে। আমি এক লাফে উঠে বললাম, "উঠে গেছি আমি।"
প্রীয়তা রুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, "মানে রুশা উঠে গেছে।"
রুবাই সন্দেহের নজরে তাকিয়ে বললো, "আমি বাদে সবাই দেখি জ্ঞানী গুনি হয়ে গেছে। এমন দুই একটা লাইন আমাকে ও শিখিয়ে দিস, যাতে আমারো কিছু কাজে আসে।"
প্রীয়তা পেয়েছে সু্যোগ আর কি ছাড়ে! রুবাইকে রাগাতে বললো, "তুই সেকেলে ধারণার লোক। আমাদের মতো আধুনিক বাচ্চাদের কথা কি বুঝবি।"
"হ্যাঁ তোদের মতো বুড়ো বাচ্চা আর একটা ও নেই। রুশা, আমি বাইরে বসছি দয়াকরে বাইরে এসে আমাকে উদ্ধার করুন। স্যার ৮টার মাঝে সবাই কে তৈরি থাকতে বলেছে। দয়াকরে ভুলে যাবেন না।"
"এই তুই যা তো। আমি রুশাকে নিয়ে আসছি।"
রূবাই যেতেই আমি চোখ ডলতে ডলতে বললাম, "তোকে কে বললো আমি রাতে দেরিতে ঘুমিয়েছি? অরুপ?"
প্রীয়তা ঠোঁট বাঁকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, "হুম, অরুপ।"
আমি হতাশ গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, "হায় আল্লাহ্! সাধারণ মানুষ ঘুম থেকে উঠতে পারে না। আর তোদের সব কথা চালাচালি ও শেষ!"
প্রীয়তা আমার কথা শুনে ভেংচি কেটে বললো, "সাধারণ মানুষ সকাল ৬টায় উঠে যায়। তোর মতো পড়ে পড়ে ঘুমায় না।"
আমি প্রীয়তার কথায় আবার শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফিসফিস করলাম,, "আর ২মিনিট।"
প্রীয়তা উপহাস করে বললো, "হুম, এখন মাএ ৭:৪০ বাজে। স্যার ৮টার মাঝে সবাইকে তৈরি থাকতে বলেছেন। তুই ঘুমা, তোর যেতে হবে না। ও হ্যাঁ মেঘ তোকে খুঁজছিল।"
মেঘের নাম শুনতেই যেন সমস্ত নিদ্রা উধাও! এক লাফে উঠে বসে উত্তেজিত গলায় বললাম, "মেঘ! আমাকে! কখন,কেনো?"
প্রীয়তা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, "আমি জানি না, তুই ঘুমা।"
আমি তারাতাড়ি উঠেই গায়ের কাঁথাটা গোছাতে গোছাতে বললাম, "আরে আল্লাহ! আগে বলবি না যে মেঘ খুঁজছিল। উফ্ কত্তো দেরি হয়ে গেছে।"
প্রীয়তা একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বললো, "আমি যাচ্ছি তারাতাড়ি কর।"
"৫মিনিটে রেডি হয়ে আসছি।"বলেই আমি ঝড়ের বেগে তৈরি হতে লাগলাম।
বাইরে বেরিয়ে দেখি সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় একটা ঝিমধরা ভাব চারপাশে, কিন্তু ভেতরে উত্তেজনার ঢেউ বইছে। চারপাশের পাহাড়ি দৃশ্য তখনো ভালোভাবে চোখে বসেনি, তবে এই সকালের আবহ আমার ছোটবেলার প্রাইমারি স্কুলের পিটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ঘুমঘুম চোখে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকার বিরক্তিকর স্মৃতি। পার্থক্য শুধু এই, মাঠটা এখন স্কুলের নয়, প্রকৃতির বিশাল খোলা প্রান্তর, পাহাড়ের কোলে।
আমার এই ভাবনার মাঝে ছেদ ঘটলো জুয়েল স্যারের জোরে কথা বলায়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "সব শিক্ষার্থীরা পাহাড়ে উঠতে প্রস্তুত?"
সবার কণ্ঠ একসাথে প্রতিধ্বনিত হলো, “জ্বি স্যার!”
জুয়েল স্যার আবার বললেন, “সবার হাতে লাঠি আছে তো? পাহাড়ি পথে লাঠি ছাড়া চলতে সমস্যা হবে!”
“ঠিক আছে স্যার!” সবার জবাব একসঙ্গে গর্জে উঠল, যেন প্রকৃতির গভীর থেকে প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে আনল।
আমি অসহায় মানুষ, সব থেকে দেরিতে এসে এখানকার ঘটনা কিছুই বুঝতে না পেরে সবার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। আর তখনই প্রীয়তা এসে আমার হাতে একটা লম্বা লাঠি ধরিয়ে দিলো। আমি তাও না বুঝে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবো আর জুয়েল স্যার আবার বললেন, "আজ আমরা যেখানে এসেছি এটাই প্রকৃত নীল পাহাড় আর এই পাহাড়ের নাম অনুসারেই এই শহরের নাম নীল পাহাড়। এই পাহাড়ের মাটি যেমন নীল বর্ণের ঠিক এর পিছনে যে ঝর্ণা রয়েছে সেটিও নীল পানির। আজ আপনাদের সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখানো হবে আর কাল কিছু দলগত কাজ করানো হবে।"
স্যারের কথা শেষে কে যেন প্রশ্ন করলো, "কিন্তু স্যার এখানকার পাহাড়ের মাটি নীল কেনো?"
স্যার বললেন, "সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট খনিজ পদার্থ, যেমন কেওলিনাইট, হ্যালোসাইট, বা সিলিকেট সমৃদ্ধ কাদামাটি, নীলচে বা ধূসর রঙ ধারণ করতে পারে। তবে এই পাহাড়ে এমন কিছুই পায়নি আর তাই কোনো পরিক্ষার মাঝে গবেষকরা এখনও বের করতে পারেনি ঠিক কি কারণে এই পাহাড়ের মাটি নীল। তবে এখানের পাহাড়ি উপজাতিরা অনেক কিছু বিশ্বাস করে এই পাহাড় সম্পর্কে। এখানের উপজাতিরা প্রকৃতি পুজারী, ওরা নিজেদের ইয়ালিক ধর্মের লোক বলেই দাবি করে।
একজন প্রশ্ন করলো, "ইয়ালিক ধর্ম! এটা কেমন স্যার?"
স্যার বললেন, "ইয়ালিকরা কোনো মূর্তি পূজা করে না। এরা প্রকৃতি, গাছ, বিশেষ পাথর এই সবের উপাসনা করে। ওরা বিশ্বাস করে প্রকৃতি থেকে সব শুরু আর প্রকৃতিতেই শেষ। আর তাই দাতা বৃক্ষকে পূজা করে। দাতা বৃক্ষ হচ্ছে সবচেয়ে পুরনো বৃক্ষ। ওদের কাছে প্রকৃতিই হচ্ছে পূজার যোগ্য। ওরা এই নীল পাহাড়কে ও পূজো করে। এখানে নানা উপজাতিদের বাস আর সবাই ইয়ালিক ধর্মের। তবে সবার উপাস্য দেবতা আলাদা। নীল পাহাড়ের পিছেই লালমাই পাহাড়, ওরা শৈল্য দেবতার উপাসনা করে।"
রাফি জিজ্ঞেস করলো, "স্যার এই নীল পাহাড় নিয়ে কিছু গল্প প্রচলিত আছে শুনেছি। সেটা আসলে কি?"
স্যার হেসে বললেন, "সে তো অনেক ঘটনাই এখানে প্রচলিত আছে। তবে নীল পাহাড়ের নীল হওয়ার ঘটনা হচ্ছে, উপজাতিদের ভাষ্যমতে অনেক যুগ আগে ওদের এই উপজাতিদের সর্দারের ৭জন ছেলে ছিল আর তাদের মধ্যে সব থেকে ছোট ছেলে সূর্য গ্রহণে জন্ম নিয়েছিলো। এটা এখানে প্রচলিত যারা সূর্য গ্রহণে জন্ম নেয়, তারা ঈশ্বরিক ভাগ্য নিয়ে আসে। তাদের জন্মই হয় প্রকৃতি পূজা আর দেব দেবীর ধ্যানের জন্য। এদের গুরু পিতা বলা হয়। এদের জন্য শর্ত থাকে যে এরা কোনো দিন বিয়ে বা সাধারণ সংসার করতে পারবে না। অনেক যুগ যুগ পরে একজন গুরু পিতা জন্ম নেয় আর এর জন্ম মানে দেবতার সন্তুষ্টি ধরা হয়। এই নীল পাহাড়ের চূড়ায় অনাথ একা এক মেয়ে থাকতো একটা কুঠিরে। এই মেয়েকে গুরু পিতা ভালোবেসে ফেলে। আর সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করতে চায়। যখন সর্দার এই সব জানতে পারলো যে তার ছেলে এইসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তখন সে তার ছেলেকে ঘরে বন্ধ করে রাখে। আর ঐ মেয়ের খাবারে লোক দিয়ে বিষ মিশিয়ে মারার চেষ্টা করে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা যায়, ঐ পাহাড়ের চূড়ায় কোনো কুঠি নেই। এবং বিষক্রিয়ায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় সর্দারের ছেলেকে। যার সমগ্র শরীর ছিলো গাঢ় নীল। ঐ মেয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না আর কিভাবে খাবারের বিষক্রিয়াতে সর্দারের ছেলের মৃত্যু হলো তাও অমিমাংসিতই থেকে যায়। এরপর সর্দারের ছেলেকে এই পাহাড়ের গুহায় দাফন করা হয়। যেই দিন কবর দেয়া হয়, তার পরদিনই এই পাহাড়ের রঙ নীল হয়ে যায়। অনেকে বলে এই পাহাড় গুরু পিতার সব বিষ নিজে নিয়ে নীল হয়ে গেছে । আবার অনেকে বিশ্বাস করে ঐ মেয়ে প্রকৃতি দেবী ছিলো তাই তার বিষ সব সর্দারের ছেলের শরীরে আসে কারন তার জন্মই দেবদেবীর সেবার জন্য। আবার অনেকে ভাবে যে ঐ মেয়ে কোনো খারাপ শয়তানি শক্তি ছিল, যে চাইতো যাতে গুরু পিতা মারা যায় এতে এই উপজাতিরা দেবীর সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। এই আর কি ঘটনা।"
স্যারের ঘটনা, বাকি সবার রিয়েকশন যেন আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। স্যার কি বাজে ভাবে গল্প বলে! শুনে তো মনে হচ্ছে গল্পটা ও কাঁদছে আর বলছে, 'ছেড়ে দে আমাকে আর বলিস না, এই বাচ্চা ছেলে মেয়েদের সামনে আর আমার নাক কাটাস না’। আমার নাক সিঁটকানোর মাঝেই কে জানি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, -
"স্যার আদিবাসীরা এসব কুসংস্কার এখনো বিশ্বাস করে?"
স্যার বললো, "হুম করে। আর ওরা সাধারণ মানুষের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না ওদের যে কোনো কাজে।"
আমি সম্পূর্ণ বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি এদের বক বকে। মেঘ ও আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকেও দেখতে পারছি না। তার উপর এই সব ছাত্র ছাত্রীদের এতো প্রশ্ন।
আমার হতাশার দীর্ঘশ্বাস শেষ না হতেই প্রীয়তা স্যারকে জিজ্ঞেস করলো, "এই জন্য কি সবাই আদিবাসীদের এলাকায় যেতে ভয় পায়?"
স্যার বললেন, "হয়তো। কিন্তু এই দিকে সমস্যা নেই। তবে আমাদের সানন্দপুরের আদিবাসীরা সত্যিই ভয়ঙ্কর, বিশেষ করে লালমাইয়ের।"
প্রীয়তা বললো, "সেটা আমরাও শুনছি স্যার।"
স্যার এবার জিজ্ঞেস করলেন, "আর কোন প্রশ্ন কারো?"
রাগ, দুঃখ, হতাশা সব গিলে খেয়ে মনে হলো এটা জানা দরকার এখানে সবাই তাঁবুতে কেনো থাকে। তাই বিরক্তির মাঝেও জোর করে হাসি এনে স্যারকে বললাম,-"স্যার,আমার একটা প্রশ্ন ছিলো।"
স্যার বললেন, "হ্যাঁ রুশা বলো।"
আমি বললাম, "স্যার, এখানে বাকি ব্যবস্থাপনা, টয়লেট সব কিছু এতো ভালো করে বানিয়েছে, তাহলে তাঁবুতে কেনো থাকতে হয়? সরকার এখানে কোনো হোটেল কেনো বানায় না?"
স্যার আমার দিকে হালকা এগিয়ে এসে বললেন, "খুব ভালো প্রশ্ন। আসলে সবাই এখানে প্রকৃতির সাথে থাকতেই আসে। শহরের কোলাহল, ধুলোবালি সব কিছু থেকে দূরে, তাঁবুতে আকাশের নিচে থাকাটাই এই জায়গার বিশেষত্ব বলতে পারো। এখান থেকে সবাই প্রকৃত ভাবে বাঁচাতে শিখে যায়।"
স্যারের কথায় যেন বিরক্তির হাসি কোথায় হারিয়ে সত্যিকারের হাসি চলে এলো। এখান থেকে সবাই প্রকৃত ভাবে বাঁচাতে শিখে যায়। বাঁচতে শিখে কিনা জানিনা তবে গভীর ভাবে অনুভব করতে শিখে যায়। সব মিটিং আলাপ আলোচনা শেষে আমরা নীল পাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশ্যে। নিজেকে অনেকটা ট্রাভেলারদের মতো লাগছে। হাতে ডিটেকটিভ ঘড়ি, সাথে ব্যাকপ্যাক, হাতে লাঠি, পায়ে জুতা, সাথে সব ধরণের প্রটেকশন।
নীল পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতেই মনে হলো যেন এক অদৃশ্য দুয়ার পেরিয়ে অন্য কোনো জগতে এসে পড়েছি। এখানে আকাশ যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়, মেঘগুলোও এতটাই কাছাকাছি যে মনে হয়, হাতের তালুতে তুলে নিলে তুলোর মতো গলে যাবে। সবুজ প্রকৃতি যেন এক অলিখিত প্রতিজ্ঞায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে, বাতাস তার সমস্ত শৃঙ্খল ছিঁড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতি, আকাশ, আলো। সবাই যেন একসঙ্গে মিশে গেছে কোনো অপার্থিব সুরে, আর আমরাও একেকজন সেই সুরের অংশ হয়ে হারিয়ে গেছি তার ছন্দে।
আর বাকিরা! প্রিয়তা তখনো একটার পর একটা সেলফি তুলে যাচ্ছে, রুবাই ম্যাডাম আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে নিশ্চিত হচ্ছেন যে, সৌন্দর্যের কোনো ছন্দপতন হয়নি। রাফি লোকেশন খুঁজতে গিয়ে বুঝতেই পারছে না, এখানে নেটওয়ার্ক এক মুহূর্তে থাকলেও, পরমুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। মেঘকে দেখার সুযোগ নেই, সে, ইমরান, অরুপ সবাই আমাদের পিছনে, নিঃশব্দে এই বিস্ময়কর দৃশ্য আত্মস্থ করছে।
রাফি আমার সাথেই, বারবার শুধু লোকেশন দেখার ট্রাই করছে। তবে নেটওয়ার্ক তো এখানে উড়ন্ত প্রজাপতি, এখন এখানে তো আবার ওখানে।
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেই যেন হারিয়ে গেলাম। পাহাড়ের এতো উপর থেকে সব যে ঠিক কতোটা সুন্দর লাগে তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না। মনে হচ্ছে আকাশ যেন কয়েক আঙুল দূরে। মেঘ এখনই হাত ছুঁয়ে যাবে আমার। প্রকৃতি যেন সবুজে সেজে থমকে গেছে, হাওয়ারা মুক্ত। এই জায়গায় হয়তো আকাশ, মাটি, প্রকৃতি সবাই মিলে একাকার হয়ে যায়। এই পাহাড়ের গহিনে শুধু প্রকৃতি নিজেকে মিলায় নি, আমরা সবাই যেন নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছি। সবাই সবার ভাগের খুশিটা ছিনিয়ে নিচ্ছে। যে যার মতো পারছে স্মৃতি কুড়াচ্ছে। আর আমি মেঘ ছোঁয়ার চেষ্টা করছি, বোঝার চেষ্ঠায় আছি আকাশ কি ছুঁয়ে নিয়েছি!
তখনই কানে এলো মেঘের কন্ঠ। আমার অনুভব হচ্ছে ও আমার খুব কাছে। খুব ধীর কন্ঠে আমার কানের কাছে এসে বললো, "আকাশে কাকে খুঁজছো?"
আমি আকাশের থেকে চোখ না সরিয়েই বললাম, "আকাশকে গভীর ভাবে দেখেছো! কতো যে রঙ দেখায়। নিজেকে হারিয়ে আবার নিজেকে সাজায়।"
মেঘ মুচকি হেসে আমার দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে বললো, "তোমার বলার ভাষা গুলো হৃদ স্পন্দন ছোঁয়ার মতো।"
আমি মেঘের চোখে তাকিয়ে বললাম, "ভালোবাসি তাই বলার ভাষা ভালোবাসার হয় মেঘ। হয়তো তাই তোমার হৃদ স্পন্দন ছুঁয়ে ফেলে।"
মেঘ আমার থেকে এক পা পিছিয়ে নিজের দুই পকেটে হাত দিয়ে বললো, "এতো ভালোবাসো আকাশ!"
ওর মায়াবী হাসি দেখতেই আমার চোখ ওর গালের গাঢ় টোলটার দিকে গেলো। আমি কোনোরকম নিজের চোখ টোল থেকে সরিয়ে ওর চোখে তাকিয়ে বললাম, "মেঘের থেকে বেশি না।"
আমার উওরে মেঘ আমার চোখের দিকে তাকিয়েই তারাতাড়ি আমার সামনে থেকে চলে গেল। আমি অবাক দৃষ্টিতে মেঘের চলে যাওয়া দেখছি। সত্যি জানা নেই আমার, মানুষ ঠিক কখন নজর লুকায়। আর মেঘ কেনোই বা নজর লুকিয়ে চলে গেল। হয়তো ভালোবাসি শব্দটাই ভালো লাগেনি! বুঝতে পারছি না, কোনো ভুল করে ফেললাম? তবে এই মানুষটার নাম যেই দিয়েছে, একদম সঠিক নাম দিয়েছে ‘মেঘ’। নিজের ইচ্ছায় আচমকা আসে আবার চলে যায়।
মেঘের যাওয়ার রাস্তায় অপলক তাকিয়ে থাকতেই দূর থেকে সবটা দেখে প্রীয়তা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, "কি হলো? মেঘ এভাবে চলে গেলো কেনো?"
আমি মেঘের যাওয়ার রাস্তায় তাকিয়েই বললাম, "বুঝতে পারছি না ঠিক।"
প্রীয়তা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তুই এভাবে কি ভাবছিস?"
আমি আবার প্রকৃতি আর আকাশের দিকে একবার নজর বুলিয়ে বললাম, "এখানের যে উপজাতিরা আছে, ওরা আমাকে থাকতে দেবে?"
প্রীয়তা আমার কথা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, "মানে?"
আমি দৌড়ে পাহাড়ের একটা কোনায় দাঁড়িয়ে দু হাত ছড়িয়ে বললাম, "মানে আমি এখানেই থেকে যাবো ওদের সাথে। একটা মুক্ত পাখির মতো উড়বো, খুব নিশ্বাস নেবো।"
প্রীয়তা আমার কথায় হেসে আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো, "সব ছেড়ে এই ধান্দা আপনার মাথায় কিভাবে এলো একটু শুনি রুশা ম্যাডাম?"
আমি লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, "জানি না! তবে এই আকাশ, এই পাহাড় যেন আমাকে গভীর মায়ায় জড়াচ্ছে।"
প্রীয়তা আমার কথায় আবার হেসে আমার মাথায় গাট্টা মেরে বললো, "সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়, সৌন্দর্যের ঢ্রেউয়ে গা ভাসিয়ে দিতে নেই।"
আমি প্রীয়তার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললাম, "ক্ষতি কি, যদি কিছু সময় অবাস্তব কল্পনায় ভালো থাকা যায়।"
প্রীয়তা গভীর নজরে আমায় দেখছে । মনে হচ্ছে আমি কোনো সমীকরণ, যার সমাধানের চেষ্টা প্রীয়তার চোখ করছে। হয়তো এটাই ভাবছে মেয়েটা বড্ডো পাগল।
আমার নিজের খুশি যেন আমার নিজেরই সহ্য হয় না। সময় হারানোর ভয়ই খুশিকে জাপটে ধরে। সব থেমে যাক শুধু এই সময় না যাক। ভালো থাকতে চাওয়ার আশা করা কি লোভ?
চলবে....