#রুশ_রহস্য
#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি
গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা
বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না।
পর্ব-২৬
রাতের সব ঘটনার শেষে বাসায় ফিরতে ৩:৫৬ বেজে গেছে। আজ আমার জন্মদিন! আর শুরুটাই এমন! নিজের কেনো যেন এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। এমন আচমকিত কিছু, কে না পছন্দ করে?
তবে আজকের রাত কি ছিল? আমি সত্যিই জানিনা মানুষের ভাবনা শক্তি ঠিক কখন দূর্বল হয়ে যায়। আমি কিছু ভাবতে পারছি না, তবে বারবার মনে এই প্রশ্ন আসছে মেঘ কি আমাকে ভালোবাসে?
পুরো আয়োজনের মূল কারিগর নাকি মেঘ! সারাদিন জার্নি, ক্লান্ত শরীর, তারপরও আমার জন্মদিন মনে রেখে এত কিছু করা! কে ছিল এই পরিকল্পনার পেছনে? সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল যখন মেঘ আমাকে বইটি দিলো। তার কথাগুলো, তার চোখের সেই ভাষা... বিশ্বাস, ভরসা, নাকি ভালোবাসা?
আমি সত্যিই নিজেকে লোভ দিতে চাই না। আর আমার ভালোবাসা কোন প্রাপ্তির লোভে বাধ্য নয়।
এতো খুশি কি সত্যিই আমার নামে ছিল?
এসব ভাবতে ভাবতেই মাথায় এলো, মেঘ আমায় একটা নির্দিষ্ট পেজ নম্বর বলেছিলো। কতো পৃষ্ঠা যেন দেখতে বলেছিলো?
উফ্, পৃষ্ঠাই ভুলে গেছি আমি।
সব ভাবনা বাদ দিয়ে, বইটা হাতে নিয়ে দেখতেই চোখে পড়লো বড় বড় অক্ষরে লেখা “ডাইরি রহস্য”। মনে হচ্ছে কোন রহস্য টাইপের বই হবে হয়তো। লিখেছেন গভেষক আব্দুল্লাহ্ আল হামজা।
নামটার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে আবার তাকিয়ে দেখি, স্পষ্ট লেখা গভেষক আব্দুল্লাহ্ আল হামজা। নামটায় আমার বুকের মাঝে কিছু এটা বিঁধে উঠলো।
বাবা! আমার বাবার বই?
আব্দুল্লাহ্ আল হামজা তো আমার বাবার নাম। পরক্ষনেই মাথায় এলো আমি সত্যিই পাগল। আব্দুল্লাহ্ আল হামজা নামের কি সারা পৃথিবীতে আমার বাবা ছাড়া কি আর কেউ নেই?
নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে ও ব্যর্থ হলাম। মনের মাঝে কেমন একটা করছে। এটাকি সত্যিই বাবা? কি ভাবনা ভাবছি এসব। ভাবনাকে সামলানোর জন্য মাথায় এলো, বইয়ের ভেতরে অবশ্যই লেখক পরিচিতি আছে।
বইয়ের মাঝে গিয়ে লেখক পরিচিতি দেখতে গিয়ে আবারও একটা শক খেলাম। গভেষক এবং অধ্যাপক ব্রিটিশ ভুতত্ত্ব বিজ্ঞান কলেজ।
আমার কলেজ! আর বইটার উৎসর্গতে লেখা রয়েছে, নরপিশাচের থেকে রুশাকে বাঁচাতে রুশকে উৎসর্গ!
"রুশ! রুশা? আমার নাম!"
এসব দেখে আমার যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সত্যিই কি বাবার লেখা বই? বাবা এই শহরের ছিলেন? আমার কলেজেরই? মা আমায় বলে নি কেনো?
মা কি আমায় মিথ্যা বলেছে? এতো মিথ্যে?
আমি ভুল নই তো? মাকে কি জিজ্ঞেস করবো? হয়তো মা আমাকে কষ্ট দিতে চান নি তাই বলেন নি, ভুলেও যেতে পারে।
"না না না। এটা ঠিক হবে না। কিন্তু এক পিসের বই বাবা কেনো লিখবেন? আর এক পিসই কেনো! আর যদি এটা বাবা না হবেন তো আমার নামে উৎসর্গ কেনো? এই পৃথিবীতে সব হামজার জীবনে একটা করে রুশা থাকবে না অবশ্যই!
মেঘ কে কি কিছু জিজ্ঞেস করবো?"
না থাক। পুরো বইটা পড়তেই হবে, অনেক অনেক প্রশ্ন কিন্তু জবাব কিছু নেই। মার কাছে উওর আছে কিন্তু মাকে জিজ্ঞেস করে আমি আবার সেই কষ্ট মনে করাতে চাই না।
মেঘ কি আমায় সাহায্য করতে পারে?
ও ছাড়া হয়তো কেউ পারবে না সাহায্য করতে। মেঘ অবশ্যই জানবে বইয়ের লেখক সম্পর্কে আর ওর বাবা তো জানবেই। ওর বাবা যেহেতু এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার মানে এটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে এটা আমার বাবার লেখা বই কিনা?
আগে থেকে মেঘ কে কিছু বলা যাবে না, আগে আব্দুল্লাহ্ আল হামজা সম্পর্কে জানতে হবে। এখন কি মেঘকে কল করা ঠিক হবে?
সকাল সাড়ে ৪টা বাজে, গতকাল সারাদিন এতো জার্নি আর তারপর আবার রাতে আমার জন্মদিনের এতো কিছু, হয়তো ঘুমাচ্ছে।
যেহেতু আব্দুল্লাহ্ আল হামজা নাম দেয়া আছে আর আমাদের কলেজেরই তার মানে আমি কলেজ থেকেই সাহায্য পাবো।
"ইমরান!!
ওর বাবা তো আমাদের কলেজেরই প্রফেসর অবশ্যই আমার বাবা সম্পর্কে কিছু তো জানবেন সে। তার মানে মেঘ আর ইমরান ওরাই আমাকে সাহায্য করতে পারবে। "
বার বার মাথায় আসছে এটা যদি সত্যিই বাবা হয় তাহলে! বইটা কি আমার জন্য! মেঘের বাবার বন্ধু তাহলে অবশ্যই উনি সব জানবেন। আমাকেও চিনবেন? আমার ছোট বেলার কিছু মনে নেই কেনো! বাবাকে তো শুধু ছবিতে চিনেছি আমি।
" ছবি!
বাবার ছবি!
যদি বাবার ছবি মেঘকে দেই আর ও ওর বাবাকে দেখায় তাহলে তো কলেজ পর্যন্ত ও আমার যেতে হবে না। কিন্তু বাবার ছবিটা যেন আমার কোন বইয়ের মাঝে লুকিয়ে ছিলাম? ওটাকে এখনই খুঁজতে হবে।"
প্রায় আধা ঘণ্টা খুঁজে বইয়ের ভাঁজে লুকানো বাবার ছবি পেলাম। বাবার ছবিটা খোঁজার শেষে বইটা পড়তে বসে ছিলাম। সম্পূর্ণ বইটা শেষ করতে গিয়ে সকাল ৮:৩৫ বেজে গেছে। বইটি একটা অনুসন্ধান মূলক বই, একটা রহস্যজনক কাহিনী। মাটির নিচে নবাবের গুপ্তধনের অনুসন্ধানের সুন্দর একটা ঘটনা নিয়ে বইটি লেখা। তবে একটা বইয়ের একটা কপিই কেনো বানিয়েছিলেন? আর এমন উৎসর্গের মানেই বা কি? সারা বইতেও রুশ বা রুশার কোনো উল্লেখ নেই। আছে শুধু রুশান যে গল্পের নায়ক। তবে উৎসর্গ রুশা? কাকতালীয়ভাবেও এটা হতে পারে না।
"এখন কি মেঘকে কল করবো? কলে বললে গুরুত্ব বোঝাতে পারবোনা, দেখা করতে চাই?
মা তো অফিসে চলে যাবে ৯টার মাঝেই আর এরপরই সম্ভব দেখা করা। একটু রিস্ক নিতে হবে কিন্তু মাথায় যেই পোকাটা ঢুকেছে এটাকে না বের করা পর্যন্ত আমি শান্তি পাবো না। আমি জানি এটা বাবার লেখা হওয়া সম্ভব না, তবে অসম্ভব ও তো নয়। যারই লেখা হোক একবার এটা সিওর হলেই হবে।"
ঘড়িতে ৯:২০। এখন মেঘকে কল করাই যায়। বেশ অনেকটা সাহস জুগিয়ে ফোন থেকে মেঘের নম্বরটা খুঁজে বের করে ওকে কল দিয়েই দিলাম। আল্লাহকে শুধু এটাই বলছি, প্লিজ আল্লাহ্, মেঘ যেন আবার আমাকে পাগল না ভাবে। দ্বিতীয়বার রিং বাজতে মেঘ কল রিসিভ করলো। আমি মেঘকে কিছু বলতে না দিয়ে চঞ্চল কন্ঠে বললাম, " আসসালামু আলাইকুম, হ্যালো, মেঘ শুভ সকাল।"
আমার কথা শুনে সদ্য ঘুম ভাঙা কন্ঠে মেঘ বললো, "শুভ সকাল। এতো সকালে তুমি! সব ঠিক আছে তো?"
আমি নরম কন্ঠে বললাম, "হ্যাঁ,সব ঠিক আছে। আমি সত্যিই দুঃখিত তোমাকে এই সময়ে জ্বালাতন করছি।"
মেঘ অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "না, ঠিক আছে। বলো, কিছু বলবে?"
আমি বোকার মত জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি ঘুমিয়ে আছ?"
মেঘ আমার কথায় হেসে বললো, "ছিলাম, এখন উঠে গেছি আর ঘুমিয়ে থাকলে আপনার সাথে কথা কিভাবে বলছি শুনি।"
আমি কিছু সময় চুপ করে থেকে সাহস জোগাড় করলাম। তারপর ধীরে ধীরে বললাম,
“তুমি কি আজ আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?”
মেঘ আমার কথায় অবাক হলো নাকি খুশি হলো ঠিক বুঝতে পারলাম না। মেঘ খুব দ্রুত বললো, “আজ! আমি! কখন বলো? জায়গা আর সময় বলো আমি হাজির হয়ে যাবো।“
আমি দেয়াল ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বললাম, “আজ সকাল ১০টায়। রেড মুন ক্যাফেতে।“
মেঘ বিন্দুমাত্র দেরি না করে বললো, “ঠিক আছে, আমি আসবো।”
আমি আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, “আচ্ছা, দেখা হবে। আল্লাহ হাফেজ।”
মেঘও সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে দিলো।
আমি শুধু বইটাকে শক্ত করে ধরে রাখলাম।
এই সানন্দপুর বড় অদ্ভুত এক জায়গা। আমি আমার সম্পূর্ণ জীবনে যা যা করিনি এই একবছরে তার থেকে অনেক বেশি কিছু করে ফেলেছি। যেই আমি কোনো দিন মায়ের অনুমতি ছাড়া বাসার ছাঁদে পর্যন্ত যাই নি, সেই আমি মা অফিসে যাওয়ার পর বাড়ি থেকে লুকিয়ে একটা ছেলের সাথে একা একটা ক্যাফেতে বসে আছি। শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ নির্ঘুম রাতে এই ছেলেটার দেয়া ২২০ পৃষ্ঠার বই একটানা শেষ করে এখন তার দিকেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছি, এই বইয়ের লেখক সম্পর্কে জানতে। তবে কেনো যেন মেঘের দিকে তাকিয়েও জিজ্ঞেস করতে পারছি না যা জানতে চাই। মেঘের আমার দিকে তাকানোর ভঙ্গিতে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, মেঘ খুব ভালো করে বুঝতে পারছে আমি এমন কিছু বলতে এসেছি যা বলতে পারছি না।
মেঘ অনেকক্ষন চুপ থেকে বললো, "তুমি কি নার্ভাস?"
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়েই বললাম, "না আমি ঠিক আছি।"
মেঘ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কি বইটি খুলে দেখেছিলে? মানে ১০৮ নম্বর পেজটি দেখেছিলে?"
আমি কিছু সময় চুপ থেকে একটু প্রস্তুত হয়ে বললাম, "মেঘ আমি বইটি নিয়েই কথা বলতে এখানে এসেছি। গতকাল রাতে আমি সম্পূর্ণ বইটি পড়েছি। আমি আসলে তোমার থেকে কিছু জানতে চাই।"
মেঘ আমার দিকে স্বাভাবিক ভাবেই বললো, "হ্যাঁ বলো।"
আমি জড়তা ছেড়ে বললাম, "এই বইটার লেখক কে?"
মেঘ যেন এই প্রশ্ন একেবারেই আশা করেনি। কিছুটা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে সে বলল, “কেনো? বইয়ের উপর লেখকের নাম নেই?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, "সেটা নয়, আমি ওনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানতে চাইছি।"
মেঘ এবার কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “কিন্তু কেনো? একজন লেখকের জীবন জানার এতো প্রয়োজন কী?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “আমি তোমাকে সব বলব, কিন্তু এখন নয়। দয়া করে, তুমি শুধু যতোটুকু জানো, আব্দুল্লাহ্ বিন হামজা সম্পর্কে বলো।“
মেঘ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি খুব বেশি কিছু জানি না। শুধু আব্বুর কাছ থেকে যতোটুকু শুনেছি, তা-ই বলতে পারি।“
আমি একটু এগিয়ে ঝুঁকে পড়ে বললাম, “যতোটুকুই জানো, সেটাই বলো। আমার জানাটা খুব দরকার।“
মেঘ আমার এমন আকুতি ভরা চেহারা দেখে আর কোনো প্রশ্ন না করে বললো, “আব্বুর একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। শুনেছি, আমাদের কলেজের ছাত্র ছিলেন, আর সেই সময় ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সৎ, বুদ্ধিমান এবং নিঃস্বার্থ ছিলেন। আব্বু তো তার প্রশংসায় কখনো শেষ করতে পারেন না। ছোটবেলা থেকে আমাকে বলতেন, যদি সত্যিকারের ভালো মানুষ হতে চাও, তাহলে হামজাকে আদর্শ মানতে শেখো।“
মেঘকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, "আর উনার পরিবার?"
মেঘ মৃদু স্বরে বলল, "একটা দূর্ঘটনায় শুনেছি সকলে মারা যান।"
আমার বুকের মাঝে হঠাৎ যেন কেমন একটা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “দুঃখজনক… আর এই বইটির ব্যাপারটা কী?”
মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি পড়ে কিছুই বোঝোনি?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, "”সেটা নয়। কিন্তু উনি মাত্র এক কপি কেনো ছাপিয়েছিলেন? এতো অসাধারণভাবে লেখা একটা বই! কেউ কি এতটা পরিশ্রম করে একটি বই লিখে, সেটাকে কেবল নিজের কাছেই রাখে?”
মেঘ একটু হাসল, “সেটা তো লেখকই ভালো জানেন। হয়তো তিনি চাননি, কেউ বইটি পড়ুক।“
আমি মেঘের কথা উপেক্ষা করেই বললাম, “তোমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন?”
মেঘ বললো, "না কলেজের। আমার আব্বু আর ফুপিও আমাদের কলেজেই পড়তেন।"
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, "তাহলে তোমার আব্বু আর ফুপি এখন কোথায়?"
মেঘ নরম গলায় বলল, "ফুপি তো আমি ছোট থাকতেই এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। আর আব্বু কলেজ শেষ করতে পারেননি, দাদার অসুস্থতার কারণে পারিবারিক ব্যবসা সামলাতে হয়েছিল।"
আমার মনে কেমন একটা অজানা শূন্যতা জমে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললাম, “এই যে হামজা, উনার কোনো ছবি আছে?”
মেঘ মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, অনেক আছে। আব্বু তার স্টাডি রুমে উনার অনেক স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কিন্তু তুমি এত কিছু জানতে চাইছো কেনো, সেটাই বুঝতে পারছি না!”
আমি মৃদু হাসলাম, কিন্তু মনের ভেতর একধরনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক কথা আছে, যা এখনই বলা সম্ভব নয়। তাই শুধু বললাম, “বইটি পড়ার পর জানার ইচ্ছে হলো।“
সানন্দপুরের সকাল: এক রহস্যময় জন্মদিন
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, "ইমরান তোমার কেমন ভাই হয়?"
মেঘ একটু অবাক হয়ে তাকালো, চোখে বিস্ময়ের ছায়া। "তুমি কিভাবে জানলে?"
আমি ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি টেনে বললাম, "অরূপ কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিল।"
মেঘ এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো, "ইমরান আমার ফুপির ছেলে।"
আমি একটু থেমে ভাবলাম। ইমরান সম্পর্কে আমি যতটুকু শুনেছি, তার মা নাকি পালিয়ে গিয়েছিল। তাই একটু দ্বিধা নিয়ে বললাম, "ফুপির ছেলে? যে ফুপি মারা গেছেন?"
মেঘের মুখের রেখাগুলো কঠিন হয়ে এলো, কথার সুরেও যেন একটা অনিচ্ছা জড়িয়ে রইলো। "না। আরেক ফুপি।"
আমি একটু কৌতূহলী হয়ে বললাম, "উনি এখন কোথায়?"
মেঘ এবার স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। "রুশা, তুমি কি আমার পরিবারের বায়োডাটা নিতে আমাকে এখানে ডেকেছো?"
ওর কণ্ঠের কঠোরতা শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। "না, আসলে প্রসঙ্গে আসলো তাই জিজ্ঞাসা করলাম," বলেই মাথা নিচু করলাম।
কিছুক্ষণ নীরবতা। মনে হচ্ছিল মেঘ নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তারপর নরম স্বরে বলল, "আমার পরিবারের গল্পটা খুব জটিল, অনেক গভীর। অন্য কোনোদিন বলব।"
আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম যে, একটু বেশিই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছি। তাই সঙ্কোচের সঙ্গে বললাম, "আই অ্যাম সরি, মেঘ। আমি এমনভাবে জিজ্ঞেস করতে চাইনি।"
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "না, আমিও আসলে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি। আই এ্যাম সরি।
এসব বাদ দাও। আজকের প্ল্যান কী? জন্মদিনে কি করছো? আর বাসা থেকে বের হলে কীভাবে? তোমার মা কি জানেন?"
আমি একটু হাসলাম, যেন মেঘের বদলে যাওয়া মেজাজটা উপভোগ করছি। "মা অফিসে, ৪টার আগে ফিরবেন না। আর আমি লুকিয়ে এসেছি। মা আসার পর হয়তো কোথাও নিয়ে যাবেন ঘুরতে।"
মেঘ কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বলল, "ওহ্!"
আমি হালকা উদাসীন হাসি দিয়ে বললাম, "আমার জন্মদিন এমনই হয়, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া। সাধারণ দিনের মতোই কাটে।"
মেঘ একবার ঘড়ির দিকে তাকালো, তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, "১১টা বাজে। তার মানে আমার হাতে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় আছে।"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "মানে? কিসের সময়?"
মেঘ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, চোখে এক অদ্ভুত ঝলক। "আমরা এখন উড়তে যাচ্ছি, তারাতাড়ি চলো। বসে ভাবার সময় নেই!"
আমি হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেঘের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি, চোখে যেন এক অপরিচিত উচ্ছ্বাস। এই ছেলেটা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে?
আমি কথা না বাড়িয়েই মেঘের পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। মেঘ আমাকে ক্যাফের গেটে দাঁড়াতে বলল, আর নিজে পার্কিং সাইডে গিয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করল। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি।
আজ এখানে এসেছিলাম এক লেখকের নামের রহস্য উন্মোচন করতে, অথচ মেঘ যেন আমাকে এক নতুন গল্পের পথে নিয়ে চলেছে। আমি ওর ব্যক্তিগত বিষয়ে হয়তো একটু বেশিই প্রশ্ন করে ফেলেছি, যা মেঘের মোটেও পছন্দ হয়নি। ওর প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক, তবে এই ছেলেটার মেজাজ যেন সেকেন্ডে বদলে যায়—এক মুহূর্ত আগেও রাগে কঠিন, পর মুহূর্তেই হাসিতে নরম।
ভাবনার মধ্যে হঠাৎ আমার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মেঘ বাইক নিয়ে এসেছে!
আমি অবাক হয়ে বললাম, “বাইক?!”
মেঘ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ, অবাক হওয়ার কি আছে? এটা বাইক।“
আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি গাড়ি আনোনি?"
মেঘ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "বাইকে কি সমস্যা?"
আমি একটু দ্বিধান্বিত হয়ে বললাম, “সমস্যা নেই ঠিক, কিন্তু আমি কখনো বাইকে উঠিনি। ভয় লাগে।“
মেঘ হাসল। ওর হাসিতে গালের গভীর টোলটা আরও স্পষ্ট হলো। আমার চোখ যেন সেখানেই আটকে গেল। মেঘ বললো, "যতোক্ষণ আমি আছি, ভয়ের তোমাকে ভয় পাওয়া উচিত।"
আমি কিভাবে যেন মেঘের কথার গভীরতায় বারবার ডুবে যাই। জানি না ঠিক কতোটা গভীরতা বুঝতে পারি, তবে ডুবতে ইচ্ছে করে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘ একটু ইতঃস্তত বোধ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এভাবে কি দেখছো? খুব সহজ, তুমি শুধু আমাকে শক্ত করে ধরে রাখবে বুঝলে। "
আমি বাইকের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, "চেষ্টা করছি।"
আল্লাহর নাম নিয়ে বাইকে উঠে গেলাম। আজ অন্য কোনো অপশন থাকলে হয়তো কোনদিনও বাইকে উঠতাম না। তবে বাইকে উঠার পর মনে হচ্ছে, না উঠলে আমার গল্পের ছুঁয়ে দেখা অংশ বাদ পড়ে যেত। যদি এখন মেঘকে নিয়ে বলতে হয়, তাহলে মেঘ আমার নিশ্বাসের প্রতিটি স্পন্দনের নাম। এখন নিজেকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, একটা মানুষ কল্পনার উর্ধ্বে কি করে হয়? আমি জীবনে প্রথম বাইকে উঠলাম, সত্যি বলতে এখন সামান্য ভয়ও কাজ করছে না। লুকিং গ্লাসে ওর উড়ন্ত চুল দেখছি। যাকে ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন ছিল তাকেই ছুঁয়ে আছি। ওর পারফিউমের গন্ধটাও আজকাল আমার খুব আপন। এই গন্ধটা আজকাল আমাকে স্বপ্নেও তাড়া করে। মেঘের জন্য বলতে ইচ্ছে করছে তাকে যতটা না দেখি খোলা চোখে তার বেশি দেখি চোখ বন্ধ চোখে।
চলবে.....