ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৩১তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, ভার্সিটি প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না।

পর্ব ৩১

শেষ কয়েকদিন ধরে মেঘের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। কলেজে আসা যেন তার কাছে এখন এক বোঝা। এলেও দু-একটা ক্লাস করেই গায়েব হয়ে যায়। ফোন করলে দু-এক মিনিটের বেশি কথা বলে না, শুধু ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেয়। কলেজ শেষে কোথাও দেখা নেই, আড্ডাতেও নেই। ইমরান আর অরূপও বিরক্ত, তারা যখনই কল করে, মেঘ ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে যায়। প্রথমে ভেবেছিলাম ফাইনাল পরীক্ষার চাপে হয়তো এমন হচ্ছে, কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও তার এই দূরত্বের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আল্লাহই জানেন, মেঘের কী হয়েছে!

ওর এই চুপসে যাওয়া আমাকে অস্থির করে তুলছে। ওর এমন আচরণ, দূরে থাকা, এড়িয়ে চলা আমার জন্য যেন এক নিঃশব্দ শাস্তি। বুকের মধ্যে একটা ভারী পাথর চেপে বসেছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে… নিজেকে যেন মৃত অনুভব করছি।

অরূপ আর ইমরানকে মেঘ মেঘ করে পাগল বানিয়ে ফেলেছি!

আমার মনের মেঘটা সবাই দেখতে পায়, শুধু মেঘই পারে না।

এই কয়দিনে আমি যেন বাংলা সিনেমার ছেকা খাওয়া নায়িকা হয়ে গেছি। যে প্রেমিকের অভাবে দিন-রাত বালিশ ভিজিয়ে রাখে, যার ফোনের ওয়ালে লুকিয়ে রাখা ছবিটাই একমাত্র সান্ত্বনা।

এই তারা-ভরা আকাশের এক টুকরো মেঘকে আজ বড় মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, আমি এক নির্জন পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু যতই বাঁচার চেষ্টা করি, ততই যেন গভীর একাকিত্বের মাঝে আটকে যাচ্ছি।

দিনগুলো ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে।

এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে ফোন, মেসেজ, ই-মেইল সব আছে, তবু নিজেকে মনে হয় নকশিকাঁথার মাঠের সাজুর মতো। আমি যেন আমার রূপাইয়ের জন্য এক অন্তহীন অপেক্ষায়।

বিকেলগুলো এখন আর আগের মতো রঙিন লাগে না। না আকাশের দিকে মন থাকে, না প্রকৃতির চলমান আবহাওয়ায়। দৃষ্টি আটকে থাকে রাস্তায়, যদি মেঘ আসে!

মেঘকে এক নজর দেখার ক্ষুধাটা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রতিদিনের অপেক্ষা শেষে রয়ে যায় একরাশ বিষণ্নতা। আর এই বিষণ্নতা আমাকে ভয় দেখায়। আমার শেষ পরিণতি যেন সাজুর গল্পের মতো না হয়…

আজ ১৮ নম্বর দিন।

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষার পর কলেজ ছুটির ৮ নম্বর দিন।

আর একটানা ৮ দিন ধরে মেঘকে দেখিনি।

চারপাশের সবকিছু ঠিক আগের মতোই চলছে, কেবল আমার ভেতরের দুনিয়াটাই থমকে গেছে। মনে হচ্ছে, একটা শূন্যতা আমাকে গ্রাস করছে, একটা ভয় আমাকে ক্রমশ তাড়া করে ফিরছে, মেঘকে হারিয়ে ফেলবো না তো?

হয়তো এখনো বেঁচে আছি কিছু জীবন্ত অনুভূতির জন্য সেই অনুভূতি, যা স্মৃতির রঙে মিশে আমাকে একটু ভালো রাখার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঘুম যেন আমার থেকে দূরে সরে গেছে।

রাতগুলো কাটে একের পর এক উপন্যাস পড়ে। রুবাই আর প্রীয়তা মাঝে মাঝে এসে দুষ্টুমি করে, আমাকে নিয়ে মজা করে। কিন্তু ওরাও এখন বুঝে গেছে আমার মনে মেঘ জমেছে, খুব।

আজ পড়ার টেবিলে প্রেয়সী উপন্যাস খুলে শক্ত হয়ে বসে ছিলাম। কিন্তু মন উপন্যাসের পাতায় নেই, মন জুড়ে শুধুই মেঘ।

ঠিক তখনই, ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে উঠল এক পরিচিত নাম।

মেঘ কল করছে!

১৫ দিন পর মেঘ নিজ থেকে কল দিল!

আমি ধীর কণ্ঠে ফোন রিসিভ করলাম, “হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।“

ওপাশ থেকে মেঘের গম্ভীর কণ্ঠ, “ওয়ালাইকুম আসসালাম, রুশা... বারান্দায় আমি, দরজা খোলো।“

আমি অবাক হয়ে গেলাম।

তবু স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম, “দাঁড়াও, আসছি।“

দরজা খুলে মেঘকে দেখে নিজের চোখের পানি কষ্টে সামলে বললাম,

“কি হয়েছে তোমার? সব ঠিক আছে তো?”

মেঘ যেন জানে, আমার অভিমানের বোঝা অনেক। তাই সব এড়িয়ে গিয়ে বললো, "সব বাদ দাও। তোমার মা বলেছিলেন না যে, তোমার বাবা রূশের সন্ধান পেয়েছিলেন আর তার ফর্মুলা শুধু তার কাছেই ছিল আর তোমার বাবার মৃত্যুর পর তা কোথায় আছে কেউ জানে না।"

"হ্যাঁ। বলেছিলেন তো, তাতে কি হয়েছে?"

মেঘ খুব দৃঢ় কন্ঠে বললো, "রুশা তোমার বাবার লেখা 'ডাইরি রহস্য' কোনো বই না।"

আমি ঠিক না বুঝে বললাম, "মানে?"

মেঘ আরো দৃঢ়তার সাথে বললো, "মানে এটাই সেই ফর্মুলা!"

আমি একটু অবাক হলাম, "আমি বুঝতে পারলাম না কি বলতে চাইছো?"

মেঘ এবার খুব সাজিয়ে বললো, "আমি এই কয়দিন এই বইটি পড়েছি খুব ভালো ভাবে। আর প্রতিটি শব্দ বোঝার চেষ্টা করেছি। এখানে যে ঘটনা ইঙ্গিত করা হয়েছে আর তোমার বাবার যে ঘটনা সবটাই এক। দেখো এখানে যে অপুর চরিত্র সে আসলে তোমার বাবা আর যে রুশান সে আসলে রুশা তুমি নিজে।"

আমার যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। আমি অবাক নজরে তাকিয়ে বললাম, "ফর্মুলা!! আমি রুশান!"

"হ্যাঁ তোমার বাবা সব নাম পাল্টে দিয়েছে।"

আমি আমার খাটের উপর বসে বললাম, "আগে আমাকে বুঝতে দাও বিষয়টা। একটা বই কিভাবে একটা ফর্মুলা হতে পারে! আর যদি এটা ফর্মুলাই হয় তবে এটা তোমার বাবার কাছে কি করছে?"

মেঘ আমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আমার দু হাত ধরে আমাকে বললো, "রুশা, চুপ। আমার দিকে তাকাও। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?"

আমি মেঘের এই কাজে অবাকের শীর্ষে পৌঁছে গেলাম। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "নিজের থেকেও অনেক বেশি বিশ্বাস করি।"

মেঘ আমার চোখের দিকে এক গভীর মায়া নিয়ে বললো, "তাহলে আমার উপরে একটু ভরসা রাখো, আমি সব ঠিক করে দেবো। তোমার জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠা বিগড়ানো, আর তোমার জীবনের এই পৃষ্ঠা গুলোর অধ্যায়ের সাথে আমার জীবনের অমিমাংসিত অধ্যায় আটকে রয়েছে। আমি চাইলেও আলাদা করতে পারবো না।"

বুঝতে পারছি না মেঘকে কি উওর দেবো! ওর ছলছলে চোখে হাজারটা প্রশ্ন চিৎকার করছে। মেঘ সব যেন মনে ডাবিয়ে রেখেছে। আমি জানি মেঘ আর এক মিনিটের মাঝে চলে যেতে চাইবে। আজকাল মেঘ যে শুধু পালাচ্ছে, নিজের থেকেও।

আমার ভাবনার সাথে সাথেই বললো, "রুশা, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল কলেজে দেখা হচ্ছে।"

জানতাম আমি, কিছু তো লুকাচ্ছে! ১৮ দিন পর মানুষটাকে এতো কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি, তাও সে পালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেঘ উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমি একটু দ্বিধায় পড়লাম, হাত ধরবো? নাকি শুধু পিছু ডাকবো?

অনেক সাহস করে মেঘের হাত টেনে ধরে বললাম, "মেঘ! তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো?"

মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এই প্রশ্ন!!"

আমি একটা ভরসার হাসি দিয়ে বললাম, "মনের মধ্যে যে পাহাড় নিয়ে ঘুরছো। তোমার চোখ যেটা চিৎকার করে বলতে চাইছে আর তোমার মুখ আটকে দিচ্ছে সেটা আমায় বলতে পারো, যদি তোমার মন সম্মতি দেয়।"

কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মেঘ এক ছুটে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, "আমি হাপিয়ে উঠেছি রুশা।"

আমি পাথর হয়ে শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি যে, মেঘ আমাকে জড়িয়ে ধরবে। হয়তো মেঘ কাঁদছে, না ঠিক কাঁদছে না নিজেকে কঠোর ভাবে শাসন করছে। মেঘের এমন অবস্থায় এক মুহূর্তে আমার সব প্রশ্ন যেন ভয়ে পরিনত হলো। এই সেই মানুষ যে আমাকে শক্তি জোগায়, ভরসা দেয়, সব পরিস্থিতিতে সামলে নেয় আর এই মানুষটাই আজ এতো অগোছালো! আমার বুকের মাঝে কাঁপতে শুরু করেছে।

আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "মেঘ! কি হয়েছে?"

মেঘ অস্পষ্ট গলায় বললো, "রুশা আমি কাউকে বলিনি। আমি এই কয়দিন পাগলের মতো উওর খুঁজেছি। আমি উওর পাইনি।"

আমি কাঁপা গলায় বললাম, "আগে শান্ত হও, চুপ একদম। তোমার রক্তাক্ত চোখ আমায় ভিত করছে।"

মেঘের এই অসহায়ত্ব আমাকে ভাঙতে শুরু করেছে। পৃথিবীতে সব সহ্য হবে তবে এই মানুষটার চোখে এই কষ্টটা নয়।

মেঘ বললো, "রুশা তুমি জানো আমার বাবার নাম কি?"

আমি অবাক হলাম, "না, আমি জানি না ।"

মেঘ স্পষ্ট গলায় বললো, "শাফিন আহ্সান।"

নামটা শুনে আমার বুকের মাঝে একটা তীব্র ক্ষততে জ্বালা করতে শুরু করলো। মনের অবস্থা মুখের থেকে গোপন করে খুব সাধারণ ভাবে বললাম, "আচ্ছা।"

আমার এই রিয়েকশনের জন্য হয়তো মেঘ একদম প্রস্তুত ছিলো না। আমার দিকে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?"

মেঘ আরো দৃঢ়তার সাথে বললো, "আমার বাবার নাম শাফিন আহ্সান। আমার বাবাও আমাদের কলেজের ১৯৯৪ এর ছাএ ছিলেন। আর তোমার বাবার লেখা এই বইটি আমার বাবার কাছেই ছিল। যেটা সবাই একটা বই ভেবেই ভুল করবে। এটা তোমার বাবা এমন ভাবে লিখেছেন যে, এটা একটা ফর্মুলা তা বোঝা কষ্টকর সাধারণের জন্য। "

আমি মেঘের দিকে একনজরে তাকিয়ে ওর কথা শুনতে ব্যস্ত। আসলে মেঘ ঠিক কি বোঝাতে চাইছে তা বোঝার পর ও যেন আমি বুঝতে চাইছি না। আমার মনে হচ্ছে আমি কিছু শুনছি না, আসলে আমি শুনতেই চাইনা। এক নামের অনেকে হতে পারে আবার এক সময়ও থাকতে পারে।

মেঘ আমার নিরবতা দেখে বললো, "কিছু বলবে না?"

আমি কোনো রকম রিয়েক্ট না করে খুব সাধারণ ভাবে বললাম, "তোমার বাবার নাম শাফিন আহ্সান তো কি হয়েছে? একজনের সাথে অন্যজনের নাম মিলে যাওয়া স্বাভাবিক। তুমি ভুল করছো মেঘ।"

মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "আমার ফুপির নাম শশী রহমান। মনে আছে তোমার? তুমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলে ইমরান আমার কেমন ভাই। আমি বলেছিলাম আমার ফুপাতো ভাই হয়। ইমরান আমার শশী ফুপুর ছেলে, আর ফুপু আর আমার বাবা একই সাথে আমাাদের কলেজেই পড়তো।"

আমার কি সত্যিই এখানে কিছু বলার আছে? শুধু মাত্র আমার ঠোঁট উচ্চারণ করলো, "শশী রহমান!"

মেঘের সম্মতি, "হুম।"

আমি অবাক স্বরে বললাম, "ইমরানের মা!"

মেঘ বললো, "হুম, ইমরানের বাবার সাথে ওনার বিয়েটা ওনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হয়েছিলো আর ইমরানের জন্মের কিছু দিন পরেই উনি ওনার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যান। এরপর আমি আর কিছু জানি না, আর না ইমরান জানে। তবে ইমরানের বাবা আর আমার বাবার ঝামেলাটা আমি ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি। আজ যদি এই গোল চক্র হিসেব করতে বসি তবে আমার বাবা সব জানেন, শশী ফুপু যে মারা গেছেন এটাও জানেন।"

সত্যি বলতে নিজেকে এখন আর সামলানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি মেঘের চোখে তাকিয়ে বললাম, "পৃথিবীটা গোল তাইনা মেঘ! কিভাবে যেনো চক্রে চক্রে ঘুরে আমরা একে অন্যের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাই।

যখন এক বছর আগে এই শহরে নতুন আসি, শহরটাকে আপন মনে হতো। না তোমায় চিন্তাম, না অন্য কাউকে। আজ তাকিয়ে দেখো, গত বছরের আপন মনে হওয়া শহরটা আমার সম্পূর্ণ জন্মের রহস্য ডাবিয়ে বসে আছে।"

মেঘ শুধু শুনলো। কোন উত্তর হয়তো ওর জানা নেই।

জানিনা, মানুষের দুনিয়াই যখন উল্টে পাল্টে যায় তখন কি করা উচিৎ! আমার ঘরের ফ্লোরে আমি আর মেঘ একদম চুপ করে বসা। ঠিক কতক্ষণ এভাবেই আছি জানিনা।

আচ্ছা গল্পটা অন্য হতে পারতো না?

মেঘ, যার স্পন্দনে এই রুশার নিঃশ্বাস চলে, তার বাবার হাতেই আমার বাবার রক্ত লেগে আছে!

এখন কি করা উচিৎ আমার?

কয়দিন আগে যার উপর এতো ঘৃণা, এতো ঘৃণা যে তাকে খুন করতে ইচ্ছে করছিল। আজ যখন আমি সবটা জানি তখন আমি নিস্তব্ধে নিজের ভাগ্যের তামাশা দেখছি। এটা কি হাস্যকর নয়?

রাতের নিরবতা ভেঙ্গে মেঘ আমায় জিজ্ঞেস করলো, "রুশা, আমার কি করা উচিৎ? আমার বাবা যদি সত্যিই এটা করে থাকে।"

আমি হাসলাম, নিজেকে পরিহাসের হাসি, "এই গল্পের ডাবানো অধ্যায় উন্মোচন আমাকে দিয়ে হলেও এই স্রোতে অনেকে ভাসবে।"

মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "কি বলতে চাইছো?"

আমি মেঘের দিকে তাকিয়ে বললাম, "এই লড়াইয়ে আরো চরিত্র আছে মেঘ। আমি আমার বাবার হত্যায় যে যে জড়িত তাদের কাউকে ছাড়বো না। তবে আগে আমার গুরু দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হবে।"

মেঘ আমার কথার গভীরতা বুঝলো না, বললো, "মানে?"

আমি আমার রক্তাক্ত চোখে হাসলাম, "মানে এই ফর্মুলা। তুমিই তো বললে, এই বইটি বাবা আমার জন্যই রেখে গেছেন। এবার তাহলে রুশা থেকে রুশান হবার পালা। আগে রুশকে খুঁজতে হবে। আর তার জন্য আমাদের কাছে মহা অস্ত্র এই বইটি।"

"তারপর?"

"জানতে হবে আমার বাবার মৃত্যুর সম্পূর্ণ ঘটনা আর তার পরের কাহিনী।"

মেঘ আবারো শান্ত হয়ে গেলো। আমি ওর চোখে তাকিয়ে বললাম, "মেঘ তোমার কালকের প্রথম কাজ ইমরান, অরুপ, রুবাই, প্রীয়তা সবাইকে এই বই আর রুশ সম্পর্কে সব বলা।"

মেঘ বললো, "ঠিক আছে, বলবো।"

আমি এবার দৃঢ় ভাবে বললাম, "মেঘ বাসায় এমন কোনো আচরণ করবে না যাতে তোমার বাবা সন্দেহ করেন। যতোটা পারো বাবার থেকে জানতে চেষ্টা করবে আমার বাবার সম্পর্কে। আর আমি মাকে কিছু বলবো না এই সম্পর্কে। বাবার গবেষণা স্বার্থক করা হবে আমার তরফ থেকে মাকে দেয়া উপহার।“

মেঘ এবার হাসলো। “রুশা তুমি একদম আমার মতো কথা বলছো।“

রুশা মেঘের চোখে তাকিয়ে বললো, “তোমার থেকেই শিখেছি মেঘ। বলতে পারো তোমার শক্তি শুষে নিয়েছি।

আর শোনো, ইমরানকে বলবে যে তুমি খুনির নাম জানো না।"

মেঘ অসহায় নজরে তাকিয়ে বললো, -"কেনো? ওর ও জানার অধিকার আছে যে ওর মাকে কে মেরেছে।"

আমি বললাম, "সেটা নয় মেঘ। সত্য গল্পের প্রতি মোড়ে বদলায়। আগে এই ফর্মুলাটা কাজে লাগাই। কোনো অপরাধিকেই ছাড়বো না।"

মেঘ যেন আবারও কথা হারিয়ে ফেললো। শুধু একবার আউড়ে নিলো, ‘সত্য গল্পের প্রতি মোড়ে বদলায়।‘ একটা লম্বা সময় চুপ থেকে মেঘ বললো, "রুশা।"

"হ্যাঁ বলো।"

"আমাকে আজকের পরে বিশ্বাস করতে পারবে তো? আমি তোমার বাবার খুনির ছেলে।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললো, "মেঘ, আমার মনে হয় বিশ্বাস অর্জনের বিষয়। আর তুমি তোমার ভাগের বিশ্বাস টুকু অর্জন করে নিয়েছো। এতোদিন যতটা বিশ্বাস ছিল তোমার উপর তা আজ আরো অনেক বেড়ে গেছে। এটা বুঝতে পারছি না যে, তোমার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম। তবে নিজের বাবার সম্পর্কে এটা মেনে নিতে পারতাম না হয়তো, আর না এভাবে শক্ত হয়ে সত্যি স্বীকার করতে পারতাম।"

মেঘ লোক দেখানো হাসি হেসে বললো, "কিছু জিনিস মেনে নেয়া এতো সহজ হয় না। তবে তুমি চিন্তা করো না। না কোনো নির্দোষ শাস্তি পারে আর না কোনো দোষী ছাড়া পাবে। আল্লাহর বিচার সব থেকে মজবুত হয়।"

"এখন সব আল্লাহর হাতেই।"

মেঘ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, "হুম, কাল থেকেই কাজে লেগে পড়তে হবে। প্রায় ৪টা বাজে, একটু পরই ফজরের আজান দিয়ে দেবে, তুমি নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যাও। কাল কলেজে অবশ্যই আসবে, সবাই মিলে আলোচনা করতে হবে।"

আমি হেসে বললাম, "ঠিক আছে।"

মেঘ চলে গেল। ওর চলে যাওয়া কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখেই যাচ্ছি। মেঘের সামনে অনুভূতি প্রকাশ করি নি। কিন্তু ওর বাবার নাম শোনার পর আমার ভিতরে কি যে ভাঙচুর হচ্ছিলো, তা শুধু আমিই জানি। তবে নাটকীয় চরিত্রের মতো সব সামলে নিয়েছি।

আমার ভাগ্যটাও কতো অদ্ভুত তাই না! যেই মানুষটার চেহারাকে কল্পনায় কতো কিছু ভেবেছি এখন দেখি সে আমার বাবা-ই না। যেই মানুষটাকে পাগলের মতো ভালোবাসি, দিন শেষে জানতে পারি সে আমার বাবার খুনির ছেলে। আজ নিজেকে একদম খালি হাত অনুভব করছি। যেন কিছুই নেই আমার। বুকের মাঝে একটা তোলপাড় চলছে, যেটাকে থামাতে ব্যর্থ আমি।

আমি জানি না কখন রাত থেকে সকাল আর সকাল থেকে দুপুর হয়ে গেছে। কলেজের সময় ও শেষ, তবে সারা কলেজে শুধু মায়ের বলা সেই লাইনটা মনে পড়ছিলো, ‘তোমার মা কতটা অক্ষম, তোমার বাবার খুনিরা সামনে ছিল কিন্তু সে কিছু করতে পারেনি’ আর ঠিক তেমন অক্ষম আমি আজ। আমার বাবার খুনির নামও আমি জানি, তবে এখন চুপ থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। সব গুলো খুনিকে খুঁজতে হবে, রুশ খুঁজতে হবে। বইটা যদি বাবার বানানো ফর্মুলা হয় তার মানে বাবা রুশ খোঁজার দায়িত্ব আমায় দিয়ে গেছে আর আমায় খুঁজতে হবে। সব কেমন নাটকিয় লাগছে আমার।

গতরাতে মেঘ বললো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবে সবার সাথে । কোনো রকম একটু বসেই ছেলে গায়েব। মেঘ হয়তো নিজের বাবার নামই লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। সবার সাথে রুশ নিয়ে কথা হলো, বাবাকে নিয়ে কথা হলো আর ইমরানের সাথে ওর মাকে নিয়েও। নিজের মায়ের খুনের কথা শুনেও ইমরানের যেন কোনো রিয়েকশন নেই। জীবন হয়তো সব শিখিয়ে দেয়। সব পরিস্থিতি মেনে নেয়া ও।

আজকের দিনটা কেমন ঝিমিয়ে গেল। কলেজ শেষে বাসায় ফিরেও কোনো কাজে মন বসছে না। মাথায় শুধু মেঘ আর ঐ বইটাই ঘুরছে। মেঘ যে আজ কলেজ থেকে গায়েব হলো, সারাদিন তার খোঁজ নেই। না কোনো কল বা মেসেজ। কি আর করার আজ আমি বারান্দার দরজা ভালো করে বন্ধ করে বসে আছি। খোলা পেলে এসেই বলবে যে চোর ডাকাতদের জন্য খুলে রেখেছি। আমি শুধু আল্লাহ্কে এটাই বলি চোর ডাকাত বা মেঘ যেই আসুক মায়ের কাছে ধরা না পরলেই হবে।

ফোনে মেঘের নামটা উঠলেই খুশি হয়ে যাই অদ্ভুত নিয়মে। মেঘের কল, এর মানে মেঘ হয়তো বারান্দায়। কল রিসিভ না করে ছুটে বারান্দার দরজা খুলতেই, মেঘ ওর ফোনটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে হেসে বললো, "বাহ্ মহারানী কল না ধরেই সোজা দরজা খুলে দিলেন।"

আমি হেসে বললাম, "জ্বি, আপনি আসবেন জানতাম। আপনাকে তো আবার কলেজে ডিটেকটিভ দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যায় না। আর যদি কল করি আপনি তাহলে রিসিভ করে, ২ মিনিট হ্যালো হায় বলে বায় বায় বলে দেন।"

আমার এই হাস্যকর কথায়ও যেন মেঘ কোনো হাসি খুঁজে পেলো না। মেঘ একটু সিরিয়াস ভাবেই প্রশ্ন করলো, "রুশা একটা প্রশ্ন করি?"

"হুম বলো।"

মেঘ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, "তোমার ভয় লাগে না আমাকে? মানে এই রাতে, আমি!

আমি এমন একজন মানুষ যে তোমার বাবার খুনির ছেলে। "

আমি ওর সিরিয়াস কথা গুলো এড়িয়ে, একটা ভরসার হাসি দিয়ে বললাম, "মেঘ, তুমি আমার বিশ্বাস।"

মেঘ আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বললো, "অন্ধবিশ্বাস ক্ষতিকারক।"

আমি মেঘের কথাকে কোনো ভয়ংকর ইস্যুতে নিতেই চাইছি না। তাই একটু মজার ছলেই বললাম, "এতো সুন্দর ক্ষতি রোজ হতে থাক।"

কিছু কিছু সময় আমাদের মাঝে এমন কোনো একটা কষ্ট বা অনুভূতি আটকে থাকে যা আমরা প্রকাশ করতে চাই না বা পারি না। আর ঐ অনুভূতিগুলো আমাদেরকে ভেতর থেকে আস্তে আস্তে ভাঙতে থাকে। মেঘকে দেখে আমার ঠিক তেমন মনে হচ্ছে। নিজেকে লুকানোর চেষ্টায় ব্যস্ত মানুষটা।

মেঘ আমার চোখে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে বললো, "বাকি কথা বাদ দেই। আজ কলেজ শেষে আড্ডার পর তোমার সাথে কথা বলাই হয়নি। তোমার সাথে কথা বলা দরকার বলেই চলে এলাম।"

আমি বললাম, "এটা ভাল করেছো। আমার ও তোমাকে অনেক কিছু বলার ছিল। কিছু বিষয় আলোচনা করার আছে।"

মেঘ একটুখানি বিরতি নিয়ে বলল, "হুম, বলো।"

আমি বললাম, "”আজ যখন সবাই একসঙ্গে বসেছিলাম আড্ডায়, কত কিছু জানা হলো! তুমি তখন ছিলে না। জানো, আমার জীবনটা যেন একটা জটিল পাজল হয়ে গেছে। একটার পর একটা টুকরো সাজিয়ে শেষমেশ আসল সত্যটা খুঁজে বের করতে হবে।

ইমরানের বাবা আমিনুল স্যারও আমাদের কলেজের বাবার ব্যাচের সিনিয়র ছিলেন। রুবাইয়ের আব্বু মোঃ শাহরিয়ার ফারুক শেখ ১৯৯৪ সালের এর ছাত্র মানে আমার বাবার সময়ের। তবে সব থেকে আশ্চর্যজনক বিষয় এদের কারো না কারো সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তবে এখন সবাই সবার শত্রু। যদি হিসেবে যাই তবে বাবা মানে হামজা, শশী, শিশির আর শাফিন ছিল সবচেয়ে ভাল বন্ধু। আবার তোমার বাবা আর আমিনুল স্যার ভাল বন্ধু ছিল। অন্যদিকে আমিনুল স্যার আর শাহরিয়ার ভাল বন্ধু ছিল। মানে বুঝছো?

তবে সবার আগে এটা খোঁজ লাগাতে হবে এদের বন্ধুত্ব ভাঙার আসল কারন কি।“

মেঘ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যতটা জানি, বাবা আর আমিনুল ফুপার সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়েছিল সেদিন থেকে, যেদিন শশী ফুপি আমিনুল ফুপাকে ছেড়ে চলে যান। ফুপা এখনো মনে করেন, আমার বাবা তাকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। ছোটবেলায় এই নিয়ে কত ঝামেলা দেখেছি!”

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, “কিন্তু এমন ভাবার কারণ কী?”

মেঘ মাথা নাড়ল, "সেটা জানি না, তবে আমিনুল ফুপা বাবাকেই দোষ দেন যে বাবার হাত আছে। কিন্তু আব্বু তো ফুপির নাম নিতে ও নারাজ।"

"আচ্ছা, মা বলেছিল ঐ রুশের জন্য বাবার দিকে শশীকে .. মানে।" আমি আমার কথার সম্পূর্ণ লাইন বলার আগেই থেমে গেলাম। মেঘের সামনে কিভাবে বলবো ওর বাবাকে নিয়ে। সে আমার সাথে যাই করুক ওর তো বাবা।

আমি ওর বাবাকে নিয়ে বলতে গিয়ে যেন বিপদে পড়ে গেলাম। আমার বিষয়টা হয়তো মেঘ খুব পরিষ্কার বুঝতে পারলো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, "তোমার বলতে বলতে থামার প্রয়োজন নেই। যেমন যার কর্ম তেমনই শুনতে হবে।"

মেঘের কথায় আমি আরো থমকে গেলাম। মেঘের সামনে ওর বাবাকে নিয়ে বললে ওর খারাপ লাগা স্বাভাবিক। মেঘের বাবার কর্মের জন্য মেঘ এভাবে মানসিক শাস্তি পাক আমি কখনোই চাই না।

আমি খুব ধীর কন্ঠে বললাম, "আমি অনেক দুঃখিত মেঘ। আমি এভাবে বলতে চাই নি"

মেঘ লোক দেখানো হাসি হেসে বললো, "রুশা, এরকম ভাবে ফরমালিটি করতে হবে না তোমার। সত্যি সবসময় সত্যিই হয়। তুমি যেটা বলছিলে ওটা হতেই পারে। "

আমি কিছু সময় চুপ থেকে আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, "তবে এটা কি ঘটনা! আমিনুল আর শাহরিয়ারয়ের বন্ধুত্ব কেনো ভাঙলো?"

মেঘ চোখ গুলো ছোট করে বললো, "এই সবাই এক সময়ের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। আমি আমার বাবার ঘরে এদের সবার গ্রুপ ছবি দেখেছি।"

মেঘের মুখে ছবির কথা শুনে বাবাকে দেখার গভীর ইচ্ছে জেগে উঠলো। তাই মেঘকে বললাম, "আমাকে একটা বাবার ছবি এনে দিবে প্লিজ।"

মেঘ হেসে বললো, "অবশ্যই এনে দেবো।"

মেঘ সম্মতি দিতেই বুকের ভেতর যেন এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। বাবাকে দেখতে পাব—এ এক অদ্ভুত অনুভূতি! অতীতের কোনো এক ফ্রেমে, ধুলো জমা স্মৃতির গভীরে, হয়তো আমি তাকে খুঁজে পাব।

কিছুক্ষণ পর, আমি মেঘের দিকে তাকিয়ে বললাম, "তোমার বাবা তোমাকে কী কী বলেছেন তাদের কলেজ জীবন নিয়ে? আমার বাবা আর বাকিদের ব্যাপারে?"

মেঘ একটু ভেবে বলল, "বাবা তো তার কলেজের নানা গল্প বলে। তবে তোমার বাবাকে নিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ছিলেন এক নিখাদ বইপ্রেমী। সব ধরনের বই পড়তেন, পড়াশোনায়ও ছিলেন অসম্ভব ভালো। চিন্তাধারা ছিল অনেক দূরদর্শী, আর প্রকৃতিকে খুব ভালোবাসতেন। হামজা আংকেলের স্বভাব, চরিত্র, পছন্দের ব্যাপারে অনেক কিছু বলেছিলেন। কিন্তু তোমার বাবা আর শশী ফুপির প্রসঙ্গে কখনো কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, তিনি তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, আর এক ভয়ংকর গাড়ি দুর্ঘটনায় তার পুরো পরিবার হারিয়ে যায়…"

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সত্যিই, কাহিনির স্রোত কখনও কখনও বাঁক নেয়, বদলে যায় এক নতুন রূপে।

"আচ্ছা মেঘ, তুমি কি খুঁজে বের করতে পারবে বাবার সম্পূর্ণ ফ্রেন্ড সার্কেলে ঠিক কয়জন ছিল? কে কে ছিল তাদের মধ্যে?"

মেঘ এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন আমার মনের গোপন ইচ্ছাটা পড়ে ফেলছে। তারপর হাসল। "জানা যাবে। কিন্তু তুমি কেন জানতে চাইছ?"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "কিছু হিসেব মেলাতে চাই।"

মেঘ যেন আমার ভাবনাগুলো আগেভাগেই বুঝে গিয়েছিল। মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলল, "তবে হিসেবটা এত সহজ হবে না, রুশা।"

আমি গভীর চোখে তাকালাম, "জানি।"

মেঘ একটু থেমে বলল, "তবে আমি তোমার বাবার বন্ধুমহলের আরেকটা চরিত্রের কথা জানি, যার কথা তুমি জানো না। বাবার গ্রুপ ছবিতে আমি তাকে দেখেছি, কিন্তু…"

আমি কপাল কুঁচকে বললাম, "কিন্তু কী?"

মেঘের কণ্ঠে এক রহস্যের ছোঁয়া, "সবার চেহারা ছবিতে স্পষ্ট, কিন্তু ওই লোকটার চেহারা ঝাপসা। আর আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানো? আব্বু কলেজের সবার গল্প বললেও তার কথা কখনোই বলেননি। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখন বলেছিলেন, একটা বড় ঝামেলার পর রাগের মাথায় তিনি ওই লোকটার চেহারা ঝাপসা করে দিয়েছিলেন।"

আমি নিঃশব্দে শুনলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল এই ঘটনাগুলো আমার সামনে এক অজানা জটিল ধাঁধার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

কেন এক বন্ধুর চেহারা ইচ্ছা করে ঝাপসা করে দেওয়া হবে? কেন তিনি এত রহস্যময়?

এই রহস্যের পেছনে কী লুকিয়ে আছে, আমি জানি না। তবু মেঘকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। মনে হলো, এই কচ্ছপগতির সত্য উদ্ঘাটনটাই হয়তো সবচেয়ে সঠিক পথ।

আজকাল মেঘের সামনে নিজেকে বড় অসহায় লাগে। আমি ওকে কখনোই বিচার করি না, ওর বাবা আমার বাবার খুনি হলেও। কিন্তু ওর চোখে আমি বারবার এক নিখুঁত অসহায়ত্ব দেখি। মেঘ যেন নিজের মধ্যে এক শেকল পরিয়ে নিয়েছে। কেন জানি মনে হয়, সে আমাকে দেখে এক সর্বহারা মেয়ে হিসেবে, আর নিজেকে দেখে অপরাধীর মতো।

আমি জানি না, ভবিষ্যতে কী আছে আমার জন্য। পাপ-পুণ্যের বিচার আমার হাতে নেই। কিন্তু আমি যেন সেই নীড়হারা পাখি, যে ঝড়ের ডাক শুনেও মেঘের টানে উড়ে যেতে চায়, মৃত্যু জানলেও…

কীসব দার্শনিকের মতো ভাবছি!

তবে একটা ভয় রয়েই গেছে। মেঘের এইভাবে এখানে আসা যদি কেউ জেনে যায়, তাহলে বড় বিপদ হবে।

কিন্তু আমি কি ভালো থাকা বাদ দিয়ে দেব?

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন