ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৩৪তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কপি করবেন না।

পর্ব-৩৪

সকালবেলা কলেজের নিস্তব্ধ আঙিনায় আমি একাই এসে দাঁড়াই, যেন এক নীরব প্রহরী। বাতাসে এখনো গত রাতের ঘুমন্ত প্রশান্তি, আর আমি সবার অপেক্ষায় দু'হাত মুখে ঠেকিয়ে বসে থাকি। প্রতিদিনের মতো আজও মনে হচ্ছে, আমি যেন কোনো অদৃশ্য দায়িত্ব পালন করছি। যেখানে বিকেল ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এক প্রকার নিভৃত পাহারাদারি আর সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সাময়িক মুক্তি, এই সয়য়টাই তো কলেজে থাকি। সময়ের নির্দিষ্ট বেড়াজালে আবদ্ধ একটা জীবন, কিন্তু আজ যেন একটু স্বস্তি লাগছে। মা আজ অফিসের কাজে ব্যস্ত, তাই ফেরার পথে একাই যেতে হবে। বিকেলটা আজ নিজের মতো করে কাটানো যাবে, এই ভেবেই মনে একরকম প্রশান্তির ঢেউ খেলে যাচ্ছে।

নিজের সঙ্গে নিজের এই নিরব সংলাপের মাঝেই প্রীয়তা এসে দাঁড়ালো, সঙ্গে তার বড় ভাই প্রীতম। তাকে দেখেই বোঝা যায় শক্তপোক্ত শরীর, আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি, এক দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব। ডিফেন্সের মানুষদের মধ্যে এই অদ্ভুত আকর্ষণীয় শৃঙ্খলাবোধ কোথা থেকে আসে! অথচ আমি একদম উল্টো। একটু সংকোচ, খানিক অস্বস্তি নিয়ে বসে আছি। হয়তো ভিতরে কোথাও মন সঙ্গ চাচ্ছে ,কিন্তু তা প্রকাশ করার অবস্থা নেই।

প্রীয়তা এসে বলল, "রুশা, কখন এসেছিস? একা কেন? বাকিরা কেউ এখনো আসেনি?"

নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললাম, "এখনও না!"

সে হেসে বলল, "আচ্ছা, আসুক। তার আগে তুই পরিচিত হয়ে নে। এটাই আমার বড় ভাই, প্রীতম। সেনাবাহিনীতে আছেন।"

আমি বিনয়ের সাথে একটু হাসলাম, "আস্সালামু আলাইকুম, ভাইয়া। আপনার কথা অনেক শুনেছি, দেখা হয়ে ভালো লাগলো।"

প্রীতম ভাই সৌজন্যপূর্ণ হাসিতে বললেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমারও ভালো লাগলো পরিচিত হয়ে।"

কিন্তু এই সৌজন্যের পর কী বলা উচিত? আমি বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি এক দায়িত্বহীন উপস্থাপক, যার হাতে কোনো প্রস্তুত করা সংলাপ নেই! তাই কিছু একটা বলতে হবে ভেবে বললাম, "ভাইয়া, অসংখ্য ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য।"

প্রীতম ভাই হেসে বললেন, "এত আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। আসলে, যখন প্রীয়তা তোমার কথা বললো, তখন থেকেই তোমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল। আমি অ্যাডভেঞ্চার গল্প পড়তে ভালোবাসি, আর বাস্তব জীবনেও যদি তেমন কিছু পাই, তবে নিশ্চয়ই সাহায্য করবো।"

আমি এক মুহূর্তে একটু স্বস্তি পেলাম। এই মানুষটা সত্যিই আগ্রহী। বললাম, "অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাইয়া।"

প্রীতম ভাই ভাবলেশহীন চোখে বললেন, "প্রীয়তা আমাকে তোমাদের এই অনুসন্ধানের বিষয়ে সামান্য কিছু বলেছে, তবে লালমাইয়ের কোথায় সন্দেহ করছো?"

আমি গুছিয়ে বললাম, "ঠিক জায়গা পরিষ্কার জানা নেই, তবে লালমাইয়ের মধ্যেই কোথাও আছে।"

প্রীতম ভাই গভীর চিন্তায় মাথা ঝাঁকালেন, "ঠিক আছে।"

আমার মনে আরও একটি প্রশ্ন ছিল। দ্বিধা কাটিয়ে বললাম, "ভাইয়া, রুয়ানাই উপজাতিরা লালমাইয়ের কোন অংশে থাকে?"

তিনি চিন্তা করে বললেন, "রুয়ানাই? ওরা তো পাহাড়ের একদম শেষে, পদ্মার পাড়ে থাকে।"

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, "ভাইয়া, আমরা ওখান থেকেই খোঁজ শুরু করতে চাই।"

প্রীতম ভাই এবার খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন, "ঠিক আছে, অনুমতির ব্যবস্থা করা যাবে। ওটা আমাদের ক্যাম্পের কাছেই পড়ে।"

প্রীতম ভাইয়ের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করার দায়িত্ব ছিল মেঘ আর ইমরানের। তবে তাদের কারো খোঁজ না পেয়ে আমিই এক প্রশ্নে বারবার প্রীতম ভাইকে ঘুরাচ্ছিলাম। আর প্রীয়তা অসহায় দৃষ্টিতে আমার অসহায়ত্ব দেখছিল।

আমার এই অসহায়ত্বের ভাগ নিতে রুবাই আর অরুপ এসে হাজির হলো।

রুবাই এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “অনেক দুঃখিত! অনেক দেরি করে ফেলেছি।“

প্রীয়তা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এই তোদের আসার সময়! বাকিরা কোথায়?”

রুবাই পরিস্থিতির সামান্য বুঝতে পেরে অসহায় ভঙ্গিতে মাথা চুলকিয়ে বলল, “আমার স্কুটির টায়ার মাঝপথে পাংচার হয়ে গিয়েছিল, তাই দেরি হয়ে গেল।“

অরুপ কি বলবে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, "মেঘ এখনও আসেনি? ও তো ৮টায় বের হয়েছে। কি কাজ আছে বললো, ইমরান আর ও সোজা এখানে আসবে।"

প্রীয়তা চোখ সরু করে বলল, “ঠিক আছে, ওরা এলে দেখা যাবে। তার আগে তোমরা আমার ভাইয়ার সাথে পরিচিত হয়ে নাও।“

প্রীতম ভাই সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম। তোমরা কেমন আছো?”

রুবাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “ওয়ালাইকুম আসসালাম, ভালো আছি ভাইয়া।“

অরুপ একটু সংকোচ নিয়ে হাসল, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনি ভালো?"

প্রীতম ভাই ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ।

তবে আজ আমাকে যেতে হবে, কিছু অফিসের কাজ আছে। তোমাদের জন্য পারমিশন নেওয়ার ব্যবস্থা করব, চিন্তা কোরো না। আর আমার নম্বর রেখে দিও, যেকোনো দরকারে যোগাযোগ করতে পারবে।“

যেভাবেই হোক সামলে নিয়েছি এই প্রাপ্তির হাসি নিয়ে বললাম, “অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া। মেঘ আর ইমরানের সাথেও দেখা হলে ভালো হতো।“

প্রীতম ভাই স্নিগ্ধ হাসিতে বললেন, “ওদের নম্বর দিও, আমি কথা বলে নেব। আর এই প্রজেক্টে আমার যা সহায়তা লাগবে, আমি আছি।“

অরুপ বললো, "ধন্যবাদ ভাইয়া। চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।"

প্রীতম ভাই বেশ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো, "প্রয়োজন নেই অরুপ, আমি চলে যাবো, ধন্যবাদ।"

প্রীতম ভাই চলে যেতেই রুবাই দুষ্টুমি করে বলল, “আহারে, ছেলেটা তো তোর ভাইকে পটানোর জন্য কী কষ্টই না করলো!”

প্রীয়তা চোখ কুঁচকে বলল, “আমি নিজেও তাই দেখলাম!”

অরুপ রাগ নিয়ে বললো, "হাসো এখন, আমার কষ্ট তো কেউ দেখলো না।"

রুবাই হেসে বলল "আরে তোমার কষ্ট দেখেই তো বললাম যে কত কষ্ট-ই না করেছো।"

অরুপ অসহায় মুখ করে বললো, "একটু অভার মাখন দিতে গিয়ে আমি নিজেই ভয়ে ছিলাম যে, ফেসে না যাই।"

সবাই নিজেদের মাঝে হাসছে, কথা বলছে তবে আমি কিছুতেই মন দিতে পারছি না। আমার বুকের মাঝে খুব ভয় অনুভব হচ্ছে। বার বার মেঘকে কলের পর কল দিয়েও পাচ্ছি না। এটা নতুন নয়, মেঘ মাঝে মাঝেই ফোন বাসায় ভুলে বেরিয়ে যায়, তখন তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকের ঘটনাও হয়তো তেমনই! তবে মেঘ দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন একজন মানুষ। এভাবে একজনের সাথে দেখা করতে চেয়ে আসবে না, এটা মেনে নিতেই সমস্যা হচ্ছে। আর ফোন বাজতে বাজতে বন্ধ পাওয়ার পর চিন্তা যেন ভয়ের রুপ নিয়ে নিয়েছে। বারবার মনে হচ্ছে কিছু তো খারাপ হয়েছে। কেমন চিৎকার করে কান্না পাচ্ছে।

রুবাই চিন্তিত মুখ দেখে বললো,"সবাই আড্ডা দিচ্ছে আর তুই টেনশন করছিস! হয়তো ব্যস্ত তাই কল ধরতে পারছে না।

প্রীয়তা রুবাইকে বললো, "তুই তো ইমরানকে একটা কল দিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারিস যে, ওরা কোথায় আছে।"

আমিও ওর কথায় সায় দিয়ে বললাম, "হ্যাঁ রুবাই ইমরানকে কল কর তো। সেই ১০টা থেকে চেষ্টা করছি মেঘের নম্বর বন্ধ দেখাচ্ছে।"

রুবাই একবার, দুইবার, তিনবার চেষ্টা করল। তারপর হতাশ স্বরে বলল, “ইমরানের ফোনও বন্ধ!”

আমার বুক ধড়ফড় করে উঠল। হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে গেল।

অরুপ আমাদের চিন্তা দেখে নিজেই চিন্তিত হয়ে বললো, "রুবাই তুমি বাদ দাও। আমি কল করে দেখছি।"

রুবাই ততোক্ষনে ইমরানকে আরো দুই তিনবার কল করলো । কিন্তু বন্ধ। --"বুঝলাম না, দুইজন একসাথে ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন!"

আমার টেনশনে হাত-পা অবশ প্রায় অবস্থা, আমি একটু ভাঙা গলায় বললাম, "আমি জানি না, কিন্তু আমার অস্থির লাগছে। কিছু তো খারাপ হয়েছে।"

প্রীয়তা শান্ত গলায় বললো, "কি খারাপ হবে! তুই অকারণে ভয় পাচ্ছিস।"

রুবাই যেন নিজের সাথে আমাকেও শান্তনা দিতে বললো, "হতে পারে ওরা এমন জায়গায় যেখানে নেটওয়ার্ক নেই। অরুপ তুমি আবার কল দাও তো।"

অরুপ এবার সিরিয়াস হয়ে বলল, “আমি রৌদ্দুরকে কল দিচ্ছি, দেখি ও বাসায় ফিরেছে কি না।“

কিছুক্ষণ পর ও ফোন কেটে আমাদের জানাল, “না, ওদের কেউই বাসায় ফেরেনি!”

কেনো যেন মেঘকে হারানোর ভয় আমাকে ভয়ংকর ভাবে ভীত করে ফেলছে। আমার সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। আমি যতই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করি, চোখের পানি যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।

আমি চোখের পানি লুকাতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম রুবাইয়ের কাছে। রুবাই আমার মুখে হাত দিয়ে বললো, “এই বোকা মেয়ে কাঁদছিস কেনো? আরে!

প্রীয়তা অবাক হয়ে বলল, “ফোন বন্ধ, তাই কাঁদছিস? আল্লাহ্!”

চোখের পানি লুকিয়ে বললাম, “আমার খুব খারাপ অনুভূতি হচ্ছে। কিছু তো সমস্যা হয়েছে।“

অরুপ এখানের পরিস্থিতি দেখে নিজেই বেশ আশংকায় পড়ে গেলো। তাও সসামলাতে বললো, "এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে! মেঘ হয়তো ব্যস্ত। আমি দেখছি বিষয়টা।"

অরূপ কোথায় গেল, জানি না। ওর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই রুবাই চেয়ারে টেনে বসে বললো,, "কি হয়েছে বল! ইমরান ও তো কল ধরছে না, তো আমি কি কাঁদছি?"

প্রীয়তা রুবাইকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "রুশা এটা বল, তোদের কোনো ঝামেলা হয়েছে?"

ওদের সব প্রশ্ন, কথা শুনতে পেয়েও যেন শুনতে চাইছি‌না। মেঘের ফোন বন্ধ এই জন্য কাঁদছি এমন নয়। আমার কাঁদার নিদিষ্ট কারণ হয়তো ভয় আর মেঘের প্রতি আমার ভালোবাসা। মন থেকে একটা খুব খারাপ ইঙ্গিত পাচ্ছি। আমি কোথাও তো পড়েছিলাম যার সাথে যার রুহে্র টান থাকে, একজনের যেকোন খারাপ অবস্থা অন্যজন অনুভব করতে পারে। মিনিংলেস কিংবা অহেতুক লাগতে পারে বিষয়টা। তবে পরিস্থিতি আর সময় ভেদে অহেতুক অনেক বিষয় কেমন জানি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আমার যে অবস্থা এখন চলছে, যে কেউ আসুক আমার কিছু আসবে যাবে না। মা এখন এলে হয়তো মাকে ধরে কাঁদতে শুরু করবো। তবে এই ক্লাস টাইমে ক্যান্টিনে এলেন আমিনুল স্যার। উনার দরজা দিয়ে আসা নিজের চোখে দেখেও কোন অনুভূতি নেই আমার।

রুবাই স্যারকে দেখেই বলে উঠলো, "রুশা কান্না বন্ধ কর। আমিনুল স্যার এখানেই আসছে। নিশ্চিত ক্লাস করি না তাই বকবে, আর আমাকে তো একদম পছন্দ করে না। তোরা থাক আমি পালাই।"

সবাই বারবার নিজেকে সামলাতে বলছিল। ওদের কথা কান পর্যন্তও যাচ্ছিল, স্যারকে আসতেও দেখছিলাম, তবে কেন যেন নিজেকে সামলাতে পারি নি। মনে হচ্ছিল আমার শরীর আর আমার মন দুইজন দুই রাস্তায় ছুটছে। এমন অনুভূতি চলছে যে, আমার কিছু যায় আসে না শুধু মেঘকে এনে দাও।

স্যারকে অনেক দূর্বল, অসহায় লাগছিল তারপরও তিনি আমার ভেজা চোখ দেখে তার সব সমস্যা বাদ দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "রুশা তুমি কি কাঁদছো?"

আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কোন রকম চোখ মুছে বললাম, "না স্যার, মাথা ব্যথা হচ্ছিল।

স্যার আপনাকে এমন কেনো লাগছে? আপনি ঠিক আছেন?"

স্যার আমার সব কথা অগ্রাহ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমারা মেঘ আর অরুপকে দেখছো?"

প্রীয়তা বললো, "না স্যার, সকাল থেকে রুশা মেঘকে কল করে পাচ্ছে না।"

স্যারের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। একটু থেমে বললেন, "আমার একবার হাসপাতালে যেতে হবে। ইমরানের নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে।"

শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, রক্ত শূন্য মনে হলো শরীর। আমি প্রায় চিৎকার করেই জিজ্ঞেস করলাম, “এক্সিডেন্ট! কখন? কোথায়? ইমরান ভাই কেমন আছে এখন?”

স্যার যেন হঠাৎ আরও ভেঙে পড়লেন, ধীরে বললেন, "আমি জানি না, সিটি হাসপাতালে আছে। এখনই যেতে হবে তাই ওদের খুঁজছিলাম। আমার শরীরটা খারাপ লাগছে, চোখে ঝাপসা লাগছে।"

কোনো কিছু চিন্তা না করেই স্যারকে বললাম, "স্যার আপনি আমার সাথে চলুন। আমি যাচ্ছি।"

প্রীয়তা পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি ও যাব।"

স্যার কোন কিছুই না ভেবে সম্মতি দিলেন।

হাসপাতালে পৌঁছেই দেখি, দূর থেকে মেঘ বসে আছে। ওকে দেখেই আমার হৃদপিণ্ড এক লাফে গলার কাছে উঠে এলো। কে আমায় দেখছিল, কোন চোখ তাকিয়ে ছিল, সাথে স্যার ছিলেন সে কি ভাববেন, এই সব ধারণা আমার মাথায় আসার অনেক আগেই মেঘকে জোরে জাপটে ধরেছিলাম। আমার অঝোরে চোখের ঝরা পানির দিকে নজর দেয়ার সময় পাইনি। এমন পাগলামির অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম এটা পাবলিক প্লেস।

কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরতেই দেখলাম, মেঘের বাঁ হাতে ব্যান্ডেজ। আমি তৎক্ষণাৎ ওর হাতটা ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, "ব্যান্ডিস! তোমার হাতে কি হয়েছে?"

মেঘ হাসল, যেন সবটাই তুচ্ছ।

“এটা সামান্য একটা ফ্র্যাকচার।“

ওর কথার শেষ হওয়ার আগেই আমার চোখে জল নেমে এলো। এই সামান্য ফ্র্যাকচারের জন্য ওর পুরো হাত ব্যান্ডেজে মোড়া! আমি হেঁচকি তুলে বললাম,

“সামান্য? তোমার জন্য আমি কতক্ষণ দুশ্চিন্তায় পাগল হয়ে ছিলাম, জানো?”

মেঘ আমার কপালের সামনে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিয়ে বলল,

“তুমি এভাবে কাঁদলে, আমার সত্যি অসুস্থ মনে হবে, রুশা। আমি ভালো আছি।“

হাসপাতালের করিডোরজুড়ে একটা থমথমে নীরবতা। আশেপাশে যারা যাচ্ছিল, তারা আমাদের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল, যেন এই নিঃশব্দ দৃশ্যের মধ্যে কোনো গল্প লুকিয়ে আছে। নার্সরাও কৌতূহলী দৃষ্টিতে একবার মেঘ, একবার আমায় দেখছিল। আমি ওদের দৃষ্টি উপেক্ষা করেই মেঘের হাত শক্ত করে ধরে আছি। মেঘের ব্যান্ডেজ-জড়ানো হাতটা দেখে মনে হচ্ছে, যেন আমার নিজের শরীরের কোথাও গভীর ক্ষত লেগেছে।

ঠিক তখনই আমিনুল স্যার এগিয়ে এলেন, ক্লান্ত চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ঠিক আছো বাবা?”

মেঘ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ আংকেল। ইমরান জেগেছে?”

স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। মাথায় চোট লেগেছে, তাই অবজারভেশনে রাখবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তোমার হাত? খুব বেশি লেগেছে?”

মেঘ হালকা হাসির ছাপ রেখে বলল, “না, ঠিক আছি। গাড়ির কাঁচ ভেঙে এসে লেগেছে, ব্যস।“

স্যার চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, “আল্লাহ অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন।“

“হ্যাঁ, আংকেল,” মেঘ গভীর স্বরে বলল, যেন নিজের ভাগ্যকেই নতুন করে অনুভব করছে।

স্যার তখন চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এক্সিডেন্টটা কীভাবে হলো?”

মেঘ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “গাড়িটা আমি চালাচ্ছিলাম। হাইওয়েতে ঠিক বুঝতে পারিনি কখন পিছন থেকে একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিল। ব্রেক ঠিকঠাক রাখতে পারিনি, সোজা গিয়ে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।“

স্যার কপালে হাত রেখে বললেন, “আল্লাহ্! অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছো। বাবাকে জানিয়েছো?”

মেঘ ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “না আংকেল, নানু অসুস্থ, আব্বু-আম্মু সেখানে গেছেন। তাই আর তাঁদের চিন্তায় ফেলতে চাইনি।“

স্যার কপাল কুঁচকে বললেন, “নানুর কী হয়েছে?”

“প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, বয়স তো হয়েছে।“

স্যার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “অনেক গোছানো একজন ভালো মানুষ ছিলেন তোমার নানু। আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা দান করুন।“

মেঘ ধীর কণ্ঠে বলল, “আমীন।“

তাদের কথোপকথনের পুরোটা না শুনেই আমি ইমরানকে দেখতে চলে গেলাম। কেবিনে ঢুকে ওর নিথর, অচেতন মুখ দেখে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ইমরানকে আমি শুধু ভাই বলে ডাকিনি, মন থেকে ভাই মেনেছি। ওর মুখের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এই হাসপাতালের বাতাসও কেমন ভারী হয়ে আছে।

হাসপাতালের ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা। আমিনুল স্যার আর মেঘ চুপচাপ এক পাশে বসে আছেন, অরূপ আর প্রীয়তা এখানে-ওখানে ছুটোছুটি করছে, স্যার আর মেঘের যত্ন নিচ্ছে। আজ প্রীয়তা না থাকলে হয়তো এত কিছু সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ত। স্যারের শরীর খারাপ, তাঁকে গাড়িতে বসানো থেকে শুরু করে পুরোটা সময় সামলে নিয়েছে প্রীয়তা।

হঠাৎ মনে হলো, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে!

রুবাইকে কিছু জানানো হয়নি!

আমার ফোন সকালে চার্জ না দেওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু ওকে জানানো দরকার। প্রীয়তা পাশেই ছিল, একে-অন্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেন একটা যুদ্ধ জয়ের মতো লাগল। আমি দ্রুত ওর হাত চেপে ধরে বললাম, “তুই রুবাইকে জানালি?”

প্রীয়তা চোখ বড় করে বলল, “না! তুই জানাসনি?”

“আমার ফোন বন্ধ, কাল চার্জ দিতেই পারিনি।“

প্রীয়তা দ্রুত ব্যাগ থেকে ফোন বের করতেই দু’জনেই অবাক হয়ে গেলাম। রুবাইয়ের ৫৮টা মিসকল!

আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “তুই শুনিসনি?”

প্রীয়তা অপরাধির মতো করে বললো, “ফোন মিউট হয়ে গিয়েছিল!”

আমি আতঙ্কিত স্বরে বললাম, “এখনই কল কর! টেনশনে রুবাই তো শেষ হয়ে গেছে!”

প্রীয়তা দ্রুত নম্বর ডায়াল করল। আমি ভাবতে থাকলাম রুবাই এমনিতেই পাগলাটে, এই ঘটনা শুনে ওর প্রতিক্রিয়া কী হবে, শুধু আল্লাহই জানেন!

প্রীয়তা তখনো রুবাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিল, ওর গলার স্বর থমথমে, যেন একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার চাপ এখনো মনের ভেতর বসে আছে। আমি ভাবছিলাম, রুবাই এতক্ষণ ধরে কতটা না উদ্বিগ্ন ছিল! ঠিক তখনই আমিনুল স্যার আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, গলায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

“তোমরা মা, এখন বাসায় চলে যাও। তিনটা বাজে, অনেক বেলা হলো। ডাক্তার বলেছেন, সন্ধ্যা সাত-আটটার দিকে ইমরানকে বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে,” স্যারের কণ্ঠে নির্দেশের সুর।

প্রীয়তার মতো নিঃস্বার্থ মানুষকে দেখে সবসময়ই এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করি। ওর মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি আছে, অন্যের কষ্ট নিজের মতো করে অনুভব করার শক্তি। ও যেভাবে স্যারকে ভরসা আর সাহস যুগিয়েছে, আমিও পারতাম না। তবে এখন তো ওর সাথে থাকতেই পারি!

আমিও বললাম, "প্রীয়তার সাথে আমিও থাকছি। স্যার আপনি মেঘকে নিয়ে যান। ফ্রেশ হয়ে, দুপুরে খেয়ে, একটু বিশ্রাম করে চলে আসবেন।"

প্রীয়তা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রুশা, তোর বাসায় সমস্যা হবে না? তুই চলে যা, আমার কোনো সমস্যা হবে না।“

আমি হেসে বললাম, “তুই একা কী করবি? আমি থাকলে তোর সুবিধা হবে।“

“অরূপ আছে তো,” প্রীয়তা সহজ স্বরে বলল।

অরুপ পাশেই মেঘের সাথে কথা বলছিল, আমাদের কথার উওরে বেশ জোর দিয়ে বললো, "হ্যাঁ আমি তো আছি, রুশা তুমি চলে যাও।"

আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, "আমার মা আসতে আজ ৭টা বাজবে। সমস্যা হবে না আমার।"

অরুপ এবার দৃঢ় ভাবে বললো, "তাহলে আংকেল, মানে স্যার আপনি আর মেঘ চলে যান। মেঘ তুই সোজা আমার বাসায় যা, খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নে।"

মেঘ নরম সুরে বললো, "না ঠিক আছি আমি, সমস্যা নেই।"

এদের কথা শুনে স্যারও বোধহয় কনফিউজড‌ হয়ে গেলেন, এরপর বললেন, "মেঘ তুমি আমার সাথে চলো বাবা, দুজন একসাথে খেয়ে একটু রেস্ট করে ইমরানকে নিয়ে যাবো।"

স্যারের কথায় মেঘ সহজেই রাজি হয়ে গেল, হয়তো স্যারকে একা ছাড়তে চাইল না।

ঠিক তখনই প্রীয়তা বলল, “স্যার, রুশাকে নিয়ে যান আপনাদের সঙ্গে। ও আপনাদের সাহায্য করে দেবে।“

স্যার একটু মিষ্টি হেসে বললেন, “না না, প্রয়োজন নেই। মেয়েটা সকাল থেকে আমার সঙ্গে আছে। ও এখানে থাক, কিংবা বাসায় চলে যাক।“

কিন্তু প্রীয়তা হাল ছাড়ার মেয়ে না। বেশ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “না স্যার, ওর সমস্যা হবে না।“

আমি নির্বাক হয়ে একবার প্রীয়তার দিকে, একবার স্যারের দিকে তাকালাম। প্রীয়তা যে এই হাসপাতালের পরিবেশেও নিজের জাদু দেখাবে, সেটা বুঝিনি। অথচ ওর এই কথায় একটা সত্য লুকিয়ে ছিল। স্যারের সঙ্গে গেলে মেঘের সঙ্গেও তো অনেকটা সময় কাটানো যাবে!

স্যারের চুপ করে যাওয়া দেখে আমি দ্রুত বললাম, “স্যার, আমার কোনো সমস্যা হবে না। আমি সাতটার আগে বাসায় গেলেই হবে। আমি গেলে আপনাদের একটু সাহায্য করতে পারব। মেঘের হাত তো দেখেছেনই, আর আপনার শরীরটাও তো ভালো নেই।“

স্যার আমাদের সবার জোরাজুরিতে শেষমেশ রাজি হলেন। আমি জানতাম, প্রীয়তা এটা ইচ্ছা করেই করেছে আমার জন্য। একটা অদৃশ্য হাসির রেখা ওর ঠোঁটের কোণে খেলছিল, আর আমি, আমার ভেতরের উত্তেজনা লুকিয়ে, স্যার আর মেঘের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন