ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৪০তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#কলমে_সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কেউ কপি করবেন না।

পর্ব: ৪১

নীল আকাশের নিচে, অপার সমুদ্রের বুকে ছুটে চলছে ছোট্ট ট্রলারটি। ঢেউয়ের ছন্দে ভেসে আসছিল সব খুশির গন্ধ, নোনা বাতাসে মিশে থাকা হাসি, রৌদ্রের ঝিলিক। আচ্ছা সুখ তো মরিচিকা তবে এটা কি সুখ না?

হয়তো দুঃখ আসছে।

কিন্তু এবার ফেরার পালা।

চাঁদ ফিরে এলো শহরে। সমুদ্রের মুক্ত বাতাস পেছনে ফেলে আবারো চেনা পথে, চেনা জীবনের ব্যস্ততায়।

আজ যেন বিপদ নাকের ডগা থেকে কেটে গেল। আমি বাড়ি ফিরেছি তখন ঘন্টার কাটা সাতের ঘরে। আর মা আমি আসার ঠিক ৫ মিনিটের মাথায় এলেন। আমার কেমন শরীর কাঁপছে ভয়ে। যদি আর পাঁচ মিনিট দেরি হতো আমার তাহলে ঠিক কি হতো, এটাই ভাবতে পারছি না। তবে হয়তো অভিনয়ে এখন বেশ পারদর্শী আমি। মিথ্যে বলতেও তো শিখে গেছি। এই সাময়িক পাপই হয়তো সাময়িক শান্তি দিচ্ছে!

কি ভয়ংকর বিষয়। হয়তো এভাবেই মানুষ সুখে থাকতে পাপের পথ বেছে নেয়?

তাহলে কি আমার বাবাও........?

না.. না.. এসব বাজে চিন্তা!

আসলেও কি?..

নিজের মন কেন এতো অস্থির হয় এখনো বাবার নাম আসলে?

বাবার বইটা মেঘের হেফাজতে বর্তমান নাহলে আবার ছুঁয়ে দেখা যেতো‌।

আমার এই ভাবনা গুলো কেন যেন এই রাত সহ্য করতে পারলো না। অবশ্য আজকের রাতটা খুব ছোট। ক্লান্তি, অবসাদ সব যেন পাকড়াও করে আমার সাথে জোর জবরদস্তি করেই আমাকে ঘুম রাজ্যে নিয়ে গেলো।

এই ক্লান্তি নিধনকারি রাতটা যেতেই যে সকাল এলো‌, সে বেশ দেরি করে এসেছে। এখন আমি তো আর সকালকে জেরা করতে পারি না যে সে কেন দেরি করে এসেছে। তবে দুপুর দুয়ারে দাঁড়ানো তা রোদের প্রখরতা জানান দিচ্ছে।

কিন্তু আজকাল কোনো এক অজানা কারণেই ছুটির দিন গুলো খুব বাজে যায়। কেন যেন আর লুকিয়ে মায়ের শাড়ি পড়তে মন চায় না। অন্য কোন গল্প বা উপন্যাসে মন বসে না। বার বার বাবার বইয়ের রহস্য নিয়েই পড়ে থাকতে মন চায়।

আচ্ছা আমার মেঘও কি আকাশের গুঁড়ো মেঘের মতো ভেসে বেড়ায়?

একটা সম্পুর্ন ছুটির দিনে ব্যক্তি গায়েব। কোন খোঁজ নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় মেঘ খুব কাছে আবার মনে হয় আকাশ সমান দূরে।

আচ্ছা মেঘকে ভালোবেসে যদি ঠকে যাই তাহলে কোথায় গিয়ে ঠেকবো?

শাফিন আহমেদের হাতেই তো আমার বাবার রক্ত জ্বল জ্বল করছে। তার ছেলে যে মেঘ এটা তো অস্বীকার করার কিছু নেই।

না না এসব খুব বাজে, ভয়ংকর, জঘন্য ভাবনা। এদের প্রশ্রয় দেয়া বোকামি।

তবে আমি কি আমার বাবার খুনির ছেলের সাথে সংসারের স্বপ্ন দেখছি?

আর ভাবনা আসছে না। এমন ভাবনা আমার অলস মস্তিষ্কে এসে প্রায় প্রতিদিনই আমাকে বিরক্ত করে। এদের আমি পাত্তা দেই না। তবে এরা বেশ নির্লজ্জ। বার বার চলে আসে।

বেশ অলসতা আর নিজের সাথে যুদ্ধ করেই দিন দুই গায়েব হলো। মেঘ যে এখন আকাশের উড়ন্ত পাখি! তার খোঁজ এই দু'দিন মেলে নি। জানি না কোথায় ছুটছে। তবে আজ কলেজ না এসে কোথায় যাবে? আজ তো সেই ভয়ংকর দিন। যেদিন কলেজ আমাদের আমল নামা খুলবে।

সকাল থেকেই স্নায়ুচাপে ভুগছি। আর কলেজে এসে দেখি সবার অবস্থাই শোচনীয়। কারো হাত কাঁপছে, কারো বুক ধকধক করছে, আবার কেউ বাইরে ঠান্ডা মুখে থাকলেও ভেতরে ঝড় বইছে।

প্রীয়তা হয়তো অরুপের কথা বেশিই সিরিয়াস নিয়ে নিয়েছে। খাতা ভর্তি বেশ কিছু দোয়া দুরুদ লিখে সেগুলোই বার বার পড়ছে। অরুপ আজ বেশ ঠান্ডা। ভয় বোধহয় ওকে আজ ছুঁতে পারছে না। রুবাই বসে রিটেক নিতে কতো টাকা এক্সট্রা লাগবে সে হিসাব করছে। মানে মেয়ে সম্পূর্ন নিশ্চিত যে সে ফেলই করবে। ইমরান যে একটু চিন্তায় তা ওর মাথার ঘাম বলছে। তবে আমার পর্যবেক্ষণ বলছে এখানে সব থেকে ভয়ে আছে রাফি। সবার থেকে ভালো পরীক্ষা দিয়েও যদি এমন টেনশনে বার বার ওয়াশ রুমে দৌড়াতে হয়। তাহলে আমার মনে হয়, না পড়েই পরীক্ষা দেয়াই ভালো।

পরীক্ষার ফলাফল নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দিয়েছে আরো ঘন্টাখানেক আগে। তবে সেখানে যে ভীড় তা ঠেলে যাওয়ার যতো যুদ্ধ করার আত্মবিশ্বাস কেউই পাচ্ছিনা। তাই দূরে দাঁড়িয়ে সবার রেজাল্ট নিয়ে মারামারি দেখছি।

আজ সব থেকে দেরিতে পৌছেছে মেঘ।

কিন্তু মেঘ? সে নিরব, শান্ত। ওর চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো অস্থিরতাও নেই। সে শুধু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নোটিশ বোর্ডের সামনে। মেঘের যাওয়া দেখে ইমরান আর অরুপও এগোলো। আমরা সবাইও ওদের পিছু এগোলাম।

আমরা সবাই একদম নিচ থেকে দেখা শুরু করলাম। নিচের দুজন আগেই প্রীয়তার সিরিয়াল। নিশ্চিত ফেল যেটা জানা ছিল সেটা থেকে ফলাফল আর বদলায়নি। বেচারা সম্পূর্ণ আটটা সাবজেক্টে ফেল। তার আইডির পাশে বোল্ড করে লিখে দিয়েছে (contract the office room) । সব বিষয়ে ফেল করে যে রেকর্ড প্রীয়তা ম্যাডাম করেছেন তাও হয়তো এতো ভয়ংকর নয় যা এই একটা বাক্যে লেখা।

প্রীয়তার আইডি ছেড়ে আরো চার আইডি উপরেই মিললো রুবাইয়ের আইডি। চার বিষয়ে ফেল। তবে বাকি তিনটায় পাশ কিভাবে এলো এই দুশ্চিন্তা যেনো এই মেয়ের বেশি হচ্ছে। আর তার আইডির পাশেও লেখা (contract the office room)। তবে এটা আসলেও চিন্তার বিষয়। ফেল তো অনেকেই করছে তাদের সবার পাশে তো এমন অফিসে যোগাযোগ করার কথা লেখা নেই, এই ওরা দুজন সহ আরো দু একজন আছে যাদের এভাবে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

যাক মাথা না ঘেটে, আমি আরো মনোযোগী হলাম নিজের আইডি খুঁজতে। আমার আইডি মিললো রুবাই থেকে ২ জন উপরে। তিন বিষয়ে ফেল। এখন কি আমার খুশি হয়া উচিত নাকি কষ্ট পাওয়া আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। যেখানে প্রতিটা বিষয়ে ফেল হবার অবাধ সম্ভাবনা ছিল সেখানে মাত্র তিনটে।

তবে আমি এসব না ঘেটে মেঘের রেজাল্ট খুঁজতে মনোযোগী হলাম। যদিও সবাই একসাথে সবারটা খুঁজছে। আমি মেঘেরটাই খুঁজছি। মেঘ আর ইমরানই বোধহয় ছক্কা দিয়েছে। সব বিষয়ে সমান সমান মার্কে পাশ। এটা কি কাকতালীয় নাকি এদের মস্তিষ্ক একরকম চলে?

সে যাই চলুক! এসবের মাঝে অরুপের রেজাল্ট কেন নেই? সবাই বার বার খুঁজেও অরুপের রেজাল্ট পেলো না। আমরা খুঁজছিলাম শেষ দিক থেকে। তবে রাফি চেঁচিয়ে উঠায় আমরা সবাই তাকালাম। রাফি যে প্রথম হবে এতে কোন অনিশ্চয়তা নেই। তবে রাফি হয়েছে দ্বিতীয়। প্রথমের ছক্কা খেলেছেন আরেক মেয়ে যার কারনে রাফি বোধহয় মিনি হার্ট অ্যাটাকই করলো। তবে এর থেকেও বড় দুঃখ যার জন্য রাফি চেঁচিয়েছে সেটা হল অরুপের রেজাল্ট। অরুপ তৃতীয় হয়েছে। আমরা সবাই আরো বার কয়েক ওর রেজাল্ট দেখে অবাক হলাম। ঐ যে কথায় আছে না ওস্তাদের মার শেষ রাতে। অরুপ ঠিক সেই খেলটাই দেখিয়েছে।

আমার অনুভূতি ঠিক তেমন হচ্ছে, ঐ যে একটা কথা আছে। নিজের বন্ধুর সফলতাও কষ্ট দেয় আবার ব্যর্থতাও। অরুপ কিভাবে তৃতীয় হলো এই প্রশ্ন যেন সবার মস্তিষ্কে গেঁথে গেলো। তবে এ পার্ট চুকিয়ে আমরা এগোলাম অফিস রুমের দিকে। প্রীয়তা আর রুবাইকে তলব করা হয়েছে। ওরা ভয়ে চুপসে আছে। তাই আমরা বাইরে দাঁড়াবো ওরা যাবে ভিতরে।

আমরা বেশ লম্বা সময় দাঁড়ালাম। তবে মূল ঘটনা যে ভয়ঙ্কর ভয়াবহ তা বুঝতে বেশ দেরি হলো। যেখানে আমরা সবাই ভাবছিলাম প্রীয়তা হয়তো অরুপের থেকে প্রভাবিত হয়ে দোয়া দূরুদ পড়ছে। কিন্তু এদিকে রুবাই ম্যাডাম তার খাতা ভরে দোয়া দূরূদ সহ ভারী ভারী অভিশাপ লিখে এসেছে। সে নাকি তার খাতায় লিখেছে, তাকে পাশ না করালে তার অভিশাপে ঐ শিক্ষক ধংস হয়ে যাবে। আমরা সবাই শুধু থমকে রইলাম। আর এখানেই শেষ না। সে আবার মিনতি করেও এসেছে। তাকে পাশ করালে সে ভরে ভরে দোয়া দিবে। তার দোয়া আর বদ দোয়া নাকি খুবই কার্যকর। এগুলো মানা যায়??

যে যে পরীক্ষায় সে কিছুই পারে নি সেই খাতা গুলোর অবস্থা ঠিক এমন।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে বাকি যে তিন সাবজেক্টে ও পাশ করেছে এগুলোতে কি স্যাররা ওর অভিশাপের ভয়ে পাশ করিয়ে দিয়েছেন?

আমি আর ভাবতেই পারলাম না। এদিকে ইমরান হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে এমন হাল। কিন্তু এই দিকটা থেকে মনোযোগ সরিয়ে আমরা সবাই আরো মনোযোগী হলাম প্রীয়তার দিকে। তিনি সারা খাতা ভরে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি যতো গান পারতেন সব লিখে এসেছেন। আচ্ছা ঠিক আছে। এটাও নাহয় ওর পাগলামী কিন্তু প্রীয়তা যে পাগলামীর চরমে পৌঁছে গেছে এটা বুঝলাম তখন। যখন জানলাম সে সব খাতার শেষে লিখে এসেছে। স্যার পাশ করতে টাকা দিতে রাজি আছি। অনুগ্রহ পাশ করিয়ে দেন। আমাকে পাশ করালে আপনি জান্নাত বাসী হবেন। আমার টাকা ঘুষ ভাববেন না। গুরু দক্ষিণা।

মানে স্যারকে সে ঘুষ অফার করেছে পাশ করতে!

আমরা সবাই আসলেও কনফিউজড, আমরা হাসবো নাকি ওর বোকামিতে কাঁদবো!

কি আর যা হবার তাই হলো। কলেজ থেকে বাড়ির লোক ডেকেছে ওদের। বলেছে আগে বাবা মা নিয়ে আসতে হবে এরপর ক্লাস করতে পারবে। ।

এখন এই বয়সে এগুলো কি মানা যায়? স্কুলে হলে তাও মানা যেতো। কিন্তু এই বুড়ো বাচ্চার নামে এমন কমপ্লেন!

এখানে ওদের এই অবস্থা দেখে আমার ভয়টা যেন উবে গেলো। আমার যে তিন বিষয়ে ফেল এসেছে, সেটা আসলেও সঠিক এসেছে। আমি কিছুই লিখিনি খাতায়। আর যেগুলো পাশ সেটাও অদ্ভুত ভাবে সব গুলোতে মার্ক ৩৩ করে। আসলেই তো পাশ করাই বড় বিষয়। এক নম্বর এক্সট্রা মানে নম্বরের অপচয় ছাড়া আর কিছুই না।

ঠিক তখনই পরিস্থিতি সামলাতেই বোধহয় সবাই অরুপকে চেপে ধরলো। অরুপ রেজাল্ট ভালো হয়ার বিষয়টা কোন ভাবেই হজম যোগ্য নয়। সবার চাপে অরুপ বেচারাও মুখ খুললো, “আরে বলছি বলছি। সবই ভগবানের কৃপা! তোরাও ধর্মে কর্মে মন দে।”

ইমরান আর রাফি এবার চটে গিয়ে ওকে আরো জোর জুলুমে পাকড়াও করলো। প্রীয়তা আর রুবাইও এবার চুপ না থেকে অরুপকে জোর করলো। সবার দিকে তাকি অরুপ এবার অসহায়ের মতো বললো, “বলছি বলছি। তোরা পরীক্ষার সময় আমার গায়ে একটা কমলা রঙের চাদর দেখেছিলি? যেটাতে সংস্কৃততে অনেক কিছু লেখা ছিল? পুরোহিতদের চাদর?”

ইমরান বললো, “হ্যা তো কি হয়েছে? ওটা তো তোর মামার থেকে চুরি করা না?”

অরুপ রেগে বললো, “এই তোকে বলতে বলেছি কোথা থেকে চুরি করেছি?” সবাই হেসে উঠল। এরপর অরুপ আবার বললো, “ওই চাদরটার মাঝে মাঝে সবগুলো সাবজেক্টের নকল লিখে এনেছিলাম। যেহেতু চাদরটাতে একগাদা জিনিসপত্র লেখা ছিল তাই কোন কিছুই কারো চোখে পড়ে নি। আর আমার পূজো ভক্তি দেখে টিচাররাও চাদর নিয়ে প্রশ্ন করেনি।“

আমরা সবাই ভাষাহীন হয়ে গেলাম। এটাকেই বোধ হয় বলে ঘোমটার নিচে খেমটা নাচ! আমার শুধু সবাই সবার মুখে একবার করে তাকালাম।

আমি এদের নিয়ে আর কিছুই ভাবতে পারছি না। এরা আসলেও মাস্টারপিস একেক জন।

কিন্তু মেঘ কি করছে না করছে সব যেনো ধোঁয়াশা হয়ে যাচ্ছে। অরুপের এই স্বীকারোক্তির পর আর এক মূহুর্ত দাড়ায়নি খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে অরুপকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।

আমার সাথেও কেমন এক দূরত্ব!

এটা কি খুব স্বাভাবিক?

এরপর ধীরে ধীরে সবাই কলেজ থেকে বেরিয়ে গেল। আজ আর বন্ধুদের সঙ্গে বেশি কথা হলো না।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন