#রুশ_রহস্য
#সাদিয়া_তিন্তি
গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা
বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কেউ কপি করবেন না।
পর্ব: ৪৩
বাইক থামলো একটা কাঠের দরজার সামনে। ভেতরে যতোদূর নজর যাচ্ছে এটা হয়তো কোন জঙ্গল। আমার বেশ অবাক লাগলো। মেঘ আমাকে জঙ্গল দেখাতে এনেছে!
মেঘ ধীর পায়ে বাইক পার্ক করল, টিকিট সংগ্রহ করল, তারপর আমার হাত ধরে ভেতরে প্রবেশ করল। চারপাশে এক অভূতপূর্ব নীরবতা। শুধু বৃক্ষরাজির গুঞ্জন, বাতাসের মৃদু শিস, আর পাখিদের কোলাহল। যেন প্রকৃতি তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে। নানা বয়সী মানুষ নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছে, কেউ গাছের ছায়ায় বসে, কেউ পথ ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। আমি কেবল চারপাশের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ মেঘ আমার হাতটি নিজের হাতে দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল। আমি চুপ করে রইলাম। মেঘ গভীর এক মোলায়েম স্বরে বলল, “অভিমানের পাল্লা কি বেশি ভারী?”
জানি না কেন, কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না! কেবল নীরবতা নিয়ে হাঁটতে থাকলাম। মেঘ মৃদু হাসল, তারপর বলল, “মহারানী, আপনি যদি এভাবে চুপ থাকেন, তাহলে আমার নিঃশ্বাস ঠিকমতো আসছে না। ঝগড়া করুন, অভিযোগ করুন, রাগ দেখান। তবে কিছু বলুন! যাতে অন্তত অক্সিজেন ঠিকভাবে পৌঁছায়।”
আমি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলাম। “আমার কথা বলায় কি আসে যায়! আমার বলায় কারো নিঃশ্বাস চলে না মেঘ। এসব শুধুমাত্র কথার কথা। জীবন এসব কাব্যিক লাইন দিয়ে চলে না। বাস্তবতা এর থেকে অনেক বেশি জঘন্য।“
মেঘ এবার খুব কোমল এক হাসি দিল। যেন সে আমার উত্তর আগেই জানত। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার চোখের গভীরে চোখ রেখে সে বলল, “রুশা, আমি তোমাকে প্রচন্ড পরিমাণ ভালোবাসি। এর থেকে আর কোন বড় সত্য আমার কাছে জানা নেই।
কিছু দূরত্ব প্রেম বাড়ায় ম্যাডাম। সব দূরত্ব ভালোবাসার শত্রু নয়।“
আমি খুব শান্তভাবে বললাম, “তুমি আজকাল আমার সাথে কিছুই শেয়ার করো না। কি করছো, না করছো! তুমি তুমি শুধু তোমার হয়ে রয়ে গেছো”
মেঘ আমার দুই হাত শক্ত করে ধরে পাশে বেঞ্চে বসাল। নিজেও আমার বিপরীতে পা ভাঁজ করে বসে বলল, “বিশ্বাস কর, যা করছি, যতটা করছি শুধুমাত্র তোমার জন্য। তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে, তবে সঠিক সময়ে। আজ যেটা বলতে চাই সেটা মন দিয়ে শোনো।“
আমার ভেতরে যেন কোনো অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। আমি সামান্য নড়েচড়ে বসলাম, “হ্যাঁ, বলো।”
মেঘ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, “মনে আছে, রুবাই একদিন বলেছিল ওর কাকা চাঁদপুরে থাকত?”
আমি দ্রুত মাথা নাড়লাম। “হ্যাঁ, ওর সৎ কাকা। তুমি তার ছবি আনতে বলেছিলে।”
মেঘ বললো, "হুম আর রুবাই এনেছিল।"
আমি অবাক হলাম। "ছবি এনেছিলো! কবে? আমায় তো দেখায়নি।"
মেঘ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,"আমি তোমায় দেখাতে মানা করেছিলাম। "
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু কেনো?"
মেঘ কিছুক্ষণ নীরব রইল, তারপর মৃদু স্বরে বলল, “কারণ, ও যার ছবি এনেছিল, তিনি তোমার বাবা।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। দৃষ্টিতে বিস্ময়ের ছায়া।
মেঘ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু রুবাই ওদের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে ছবিটা এনেছিল।”
এ যেন এক নতুন রহস্যের দ্বার উন্মোচন! কিছুই বুঝে ওঠার আগেই নতুন এক গোলকধাঁধায় জড়িয়ে পড়লাম। রুবাইয়ের কাকা আমার বাবা! এটা কেমন অদ্ভুত সংযোগ!
আমি থেমে গিয়ে অবাক কণ্ঠে বললাম, “রুবাই জানে?”
মেঘ মাথা নাড়ল। "না, আমি ওকে বলি নি। শুধু ইমরান জানে, আমি তোমাকে আরো আগেই জানাতে চাইছিলাম, তবে কিছু খোঁজ খবর নিয়ে বিষয়টা মজবুতির সাথে জেনেই জানাতে চেয়েছিলাম। আর এই জন্য আমি রুবাইয়ের থেকে ঠিকানা নিয়ে চাঁদপুরের গিয়েছিলাম এবং রুবাইদের এলাকা থেকে ও কিছু খবর জোগাড় করেছি।"
আমি দ্রুত বললাম, “তারপর?”
মেঘ বললো, "এটা জানতে পারলাম যে রুবাইয়ের দাদি,- তোমার দাদি আর বাবাকে একদমই পছন্দ করতেন না। যখন তোমার দাদি মারা যান, তারপর তোমার দাদা তোমার বাবাকে সানন্দপুর নিয়ে আসেন। এই বিষয়টা রুবাইয়ের দাদি একদম পছন্দ করেন নি। এই নিয়ে রোজ বাড়িতে নানা সমস্যা। তোমার বাবাকে অনেক অবহেলা আর অযত্ন সহ্য করতে হয়েছে।
এই অনুসূচনার জন্য তোমার দাদা মারা যাওয়ার সময় কিছু এক্সট্রা সম্পত্তি তোমার বাবার নামে লিখে দিয়ে যান। এই সম্পত্তির জন্যও পারিবারিক সমস্যা আরো দৃঢ় ভাবে বেড়ে যায়। এর কিছু দিনের মাঝেই তোমার বাবা তোমার মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান।“
আমি বিস্ময়ের শীর্ষে পৌঁছে গেলাম। “তাহলে এটাই আসল ঘটনা?”
মেঘ মাথা নাড়ল। “এখানে শাহরিয়ার, মানে রুবাইয়ের বাবার যথেষ্ট কারণ ছিল তোমার বাবাকে সরিয়ে দেওয়ার।“
আমি ধীরে বললাম, "তুমি কি সকলের মোটিভ খুঁজছো?"
মেঘ হাসল, তবে হাসির আড়ালে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ় সংকল্প। “হুম, মোটিভ খুঁজছি। তোমার মা তো বলেছেনই আমার বাবার মোটিভ কি মোটিভ ছিল।
আর শাহরিয়ারের মোটিভ হতে পারে সম্পত্তি। কিন্তু যদি আমিনুল আংকেলের কোনো কারণ থাকে, তাহলে সেটার যোগসূত্র হতে পারে শশী ফুপু।”
আমি বিস্ময়ে বললাম, “শশী?”
মেঘ মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, শশী ফুপু, যিনি আমিনুল আংকেলকে ছেড়ে তোমার বাবাকে বিয়ে করেছিলেন। এ সত্য মেনে নিতে পারেননি আমিনুল আংকেল। ফলে তিনিও তোমার বাবাকে হত্যা করতে চাইতে পারেন।
তবে ছবির সেই রহস্যময় মানুষটি কে, সেটাই এখন জানতে হবে!”
সম্পূর্ণ ঘটনাটি যেন কোনো রুদ্ধশ্বাস রহস্য-রোমাঞ্চ সিনেমার চিত্রনাট্য। যেখানে আমি ভাবছিলাম, রুবাইয়ের কাকা একটি অস্পষ্ট চরিত্র, সেখানে বাস্তবতা যেন উল্টো স্রোতে বইছে। রুবাইয়ের কাকা-ই আমার বাবা!
মা বলেছিলো বাবার মৃত্যুতে জড়িত তিনজন ছিল। শাফিনের সাথে তার আরও ২বন্ধু। তার মানে এই তিনজনের কেউ একজন আমাদের ফলো করছে।
আমার চিন্তাগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মেঘ আস্তে বলল, “কি ভাবছো?”
খুব ধীরে বললাম, “এটাই ভাবছি, আমাদের ফলো করছে কে?”
মেঘ বললো,“আমি নিজেও নিশ্চিত নই, তবে কেউ যে করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তুমি সাবধান থেকো, রুশা।”
আমি একটু গভীর ভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কাউকে সন্দেহ করছো?”
মেঘ বললো, “বুঝতে পারছি না।”
আমি একটু হিসাব মিলানোর চেষ্টা করলাম। “আমাদের এই অনুসন্ধানের ব্যাপারে ঠিক কারা কারা জানে?”
মেঘ একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, "সত্যি বলতে অনেকেই জানে। ইমরান জানে, আমিনুল আংকেলকে আমি রুশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কিছুই বলেননি। উনার প্রতিক্রিয়া এমন ছিল যেন তিনি এই নাম কখনো শুনেনইনি। আর আমি বাবাকে হামজা আংকেল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনিও সেই একই পুরনো গল্প শুনিয়ে দিয়েছেন, যা ছোট থেকে শুনে আসছি।”
আমি বেশ অবাক হলাম। “তাহলে আমিনুল স্যার আর তোমার বাবা এই ব্যাপারটা জানে।”
মেঘ একটু তিক্ত হাসি দিয়ে বলল, "রুশা হাওয়া বইলে গাছের একটা পাতা কখনোই নরে না, সমগ্র গাছটাই নরে।"
আমি মেঘের দিকে তাকালাম, “মানে?”
“মানে, হামজা আংকেল কিংবা রুশ। এসব নিয়ে যে কিছু একটা ঘটছে, তার আভাস সবাই পেয়েছে।"
মেঘের কথায় আমি নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম।
মেঘ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো, “আবার লালমাইতে গিয়েছিলাম গতদিন।“
আমি একটু থামলাম। এরপর মৃদু স্বরে বললাম, “নতুন কি কি জানতে পারলে?”
মেঘ একটা শ্বাস ছেড়ে বললো, "সবই বলা আছে তোমার বাবার বইয়ে আর তার রেফারেন্সে। লালমাইতে মোট ১২ রকমের আদিবাসীদের বাস। তার মাঝে রুয়ানাইরা সব থেকে বেশি প্রতাপশালী এবং এক বিশাল অংশ জুড়ে থাকে।"
আমি মৃদু স্বরে বললাম, ““বইয়ের সূত্র কি বলছে, রুশ তাদের কাছেই আছে?”
মেঘ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। "হ্যাঁ।"
আমি একটু ভেবে বললাম, "রুয়ানাইদের কাছে থাকলে এটা উদ্ধার কঠিন ও না।"
মেঘ একটু মজা নিয়ে বললো, "কেন! রুয়ানাইরা তোমার আত্মীয়?"
আমি হাসলাম, "উফ্ সেটা না। লালমাই পাহাড়ের ঐদিকে নদী রয়েছে। ঐ নদীর পাড়ের যে অংশটায় রুয়ানাইরা থাকে, ঐ জায়গায় যেকোন মন্দিরের আশেপাশেই আছে রুশ।"
মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কিভাবে এতো নিশ্চিত হচ্ছো?"
আমি শান্ত স্বরে বললাম, “খুব সহজ। মনে আছে ইমাম ফারুকীর লেখা ‘আমি মানে রহস্য’ বইয়ে কী বলা ছিল?
শুভেচ্ছাপুরের লালমাই পাহাড়ের উপজাতিক অঞ্চলে। যেখানে মাটির সাথে মাটির স্রষ্টা সেখানে খুজেঁ পেয়েছিল ১৪০০ বছর আগের ব্যবহৃত কোষ্টি পাথরের ১৪ কেজি ওজনের একটি মূর্তি। মাটির সাথে মাটির স্রষ্টা মানে মাটি আর যে এই মাটি বানিয়েছে। তার মানে স্পষ্ট মন্দিরকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে।"
মেঘ মাথা নাড়ল, “তাহলে নদী কোথায় পাচ্ছো?"
আমি মৃদু হেসে বললাম, “রবীন্দ্র দেব গুহ্-র ‘মাটির নিচে ভারতবর্ষ’ বইতে লেখা আছে, রাশিয়ানরা একসময় তাদের মূল্যবান সম্পদ পূর্ব বাংলার পদ্মার পাড়ে, দোঁয়াশ মাটির গ্রাম ‘রুয়ানাই শৈল্য নগর’-এর কোথাও মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। অনেক বছর পর তারা সেই সম্পদ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এখানে তুমি দেখো, ‘রুয়ানাই শৈল্য নগর’ নামে কোনো গ্রাম তো নেই। তবে বোঝাই যাচ্ছে, এটি সেই নদী-সংলগ্ন রুয়ানাইদের বসবাসের এলাকাকে নির্দেশ করছে।”
মেঘ গভীর মনোযোগে আমার কথা শুনছিল, যেন এক অসম্পূর্ণ ধাঁধার প্রতিটি অংশ একে একে মিলে যাচ্ছে। হঠাৎ চোখে একরকম দীপ্তি নিয়ে সে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো, “আছে! শৈল্য নগর আছে! যেখানে ওরা কালো শীল পাথরের পূজা করে, যেটাকে বলে ‘জীবন্ত ঠাকুর’!
বুঝতে পারছো রুশা? ঐ পাথরটাই আসলে রুশ!”
আমি হতবাক। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মেঘের কণ্ঠস্বর পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে কোনো গুপ্ত সত্য ঘোষণা করছে।
“কি বলছো! কোন পাথর?”
মেঘের দৃষ্টি যেন দূরের কোনো অদৃশ্য বিন্দুর দিকে নিবদ্ধ, সময়ের সঙ্গে যেন তার প্রতিযোগিতা চলছে। “রুশা, আমাদের এক্ষুনি ফিরতে হবে! দেরি করা যাবে না! তুমি তাড়াতাড়ি হিজাব পরে নাও!”
তার তাড়াহুড়োর মধ্যে এক অজানা শঙ্কা, একরকম শিহরণ কাজ করছিল।
আমি হতবাক হয়ে বললাম, “কিন্তু কী হয়েছে, অন্তত বলো তো!”
মেঘ তখনই হাত ধরে টানলো, চোখে একরকম উজ্জ্বলতা আর উত্তেজনার মিশেল, “যেতে যেতে সব বলবো। এখন শুধু আমার ওপর ভরসা রাখো!”
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, দুপুরের তপ্ত বাতাসে এক অজানা রহস্যের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
চলবে........