ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (প্রথম পরিচ্ছেদ)

৪৭তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

#রুশ_রহস্য

#সাদিয়া_তিন্তি

গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা

বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কেউ কপি করবেন না।

পর্ব- ৪৮

একদল লোক যেন অন্ধকার চিরে চলে এসেছে, তাদের চোখে মুখে এক ধরনের অমানবিক নির্লিপ্ততা,

পোশাকে অদ্ভুত ধাতব ঝিকিমিকি, যেন ভিনগ্রহ থেকে নেমে এসেছে কোনো সেনাদল। এখানে যা কিছু চলছিল তার ২% ছেড়ে সবই নাটকিয়। এখন ভিলেন ছাড়া সব কাহিনীই অসমাপ্ত। তাই আল্লাহ্ ভিলেনের চরিত্রও প্রবেশ করিয়ে দিলেন তাও আবার দলবল সহ।

আর তাদের ঠিক মাঝে একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ, চিবুক ছুঁয়ে থাকা ফ্রান্স কাট দাঁড়ি, ঠোঁটে বাঁকা হাসি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। যার পেছনে যেন লুকিয়ে আছে এক বিষাক্ত সাপের বিষাদৃষ্টি। পরনে অভিজাত অথচ শীতলতা ছড়ানো কালো স্যুট, আর তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মাটির নিচের সীসা গলে ফেলতে সক্ষম।

সে দাঁড়িয়ে পড়লো আমাদের সামনে। এক পলক আমাদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, “স্বাগতম, বাচ্চারা…”

তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক ব্যঙ্গ আর ভয় মিশ্রিত মাধুর্য, যা শোনামাত্রই শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। “তোমাদের বুদ্ধি, জ্ঞান আর সাহসের জন্য বাহবা দিতে হয়। হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা রুশের দরজা তোমরাই তা খুলে দিলে। সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু ও হো! কী ভদ্রতার অভাব আমার! নিজেকে তো এখনও পরিচয় করালাম না!”

সে সামান্য ঝুঁকে মাথা নিচু করে, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল— “আমি মিকাইল ফারুকী।

নিশ্চয়ই তোমাদের বাবা-মা আমার সম্পর্কে তোমাদেরকে কিছুই বলেনি। বলার কথা না কারন সবার চোখের একমাত্র শত্রু তো আমি ছিলাম। তবে আমি তোমাদের সবাইকে খুব ভালো করে চিনি…”

বিশেষ করে তার চোখ ছুরির মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ছুটে এলো ইমরান আর আমার দিকে, “ইমরান আর রুশা।“

আমার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। ইমরান সামান্য সামনে এসে দাঁড়ালেও তার চোখে চিন্তার ছায়া।

ঠিক তখনই ঘটে গেল চরম ধাক্কাটা।

মিকাইলের দলের সদস্যরা আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। দড়ি, চেইন, রাবারের বেল্ট সবকিছু যেন মুহূর্তেই প্রস্তুত ছিল।

আমরা বাধা দিতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাদের সংখ্যা আর শক্তির সামনে তা ছিল এক শিশুর হাত নেড়েই সমান।

রুবাই, অরূপ, ইমরান সবাই ধরা পড়ে গেল। আমার হাতও শক্তভাবে বেঁধে ফেলা হলো।

সেই সময়, মিকাইল হেসে বলল, “আহা! আস্তে বেঁধো, বাচ্চারা ব্যথা পাবে তো! আমরা তো অতিথি পেয়েছি, অতিথিকে কষ্ট দিলে দেবতা রুষ্ট হন। তোমাদের এই অভিযান দেখে সত্যিই আমি মুগ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় তোমরা জানো না, যে রাজ্যের দরজা তোমরা খুলেছো, তার রাজা আমি…

আর তোমরা হলে আমার পথপ্রদর্শক আহূত অতিথি।“

তার সেই ভয়ঙ্কর হাসি গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। আর আমরা বুঝে গেলাম, রহস্যের এই খেলায় ভিলেন এখন মঞ্চে। আর গল্প মাত্রই এক নতুন বাঁক নিল।

আমার মনে হচ্ছিল, আমি কোনো সিনেমার সেটে এসে পড়েছি গুপ্তধনের সন্ধানে এক অজানা গুহায়, চারপাশে শত্রু, বন্ধুরা সবাই বন্দি, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবের চেয়ে ভয়ংকর এক খলনায়ক।

তবে এটাকে সিনেমা ভাবার ভুল আর করলাম না। এটা কোন সিনেমা নয় যে যেভাবেই হোক বেঁচে যাব। এটা বাস্তবতা চলছে আর বাস্তব জীবনে না নায়ক মারামারি জানে আর না এমন কোন ম্যাজিকের আশা করা যায়, যার জন্য এক চান্সে সব গুন্ডা কুপোকাত। কারণ এটা বাস্তবতা।

এখানে কেউ সুপারহিরো না।

আমাদের হাত-পা শক্ত রশিতে বাঁধা, সামনে দাঁড়িয়ে মিকাইল ফারুকী। তাঁর সঙ্গে পনেরো-বিশজন দানবের মতো দেখতে লোক, যাদের চোখে মুখে করুণা নেই, শুধুই আদেশ মানার নীরব নিষ্ঠুরতা।

মেঘ, রুবাই, ইমরান, অরূপ সবাই আমার মতোই অবাক, আতঙ্কিত, কিন্তু সবার দৃষ্টি বারবার থমকে যাচ্ছে লোকটার কথায়।

মিকাইল আমার দিকে এগিয়ে এলো ধীর পায়ে। প্রতিটি পা যেন মাটি চিরে আসছে, তার চোখে এমন এক ছায়া, যা অন্ধকারকেও কাঁপিয়ে দিতে পারে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “রুশা… একদম শিশিরের মুখ।

তোমার মায়ের মতোই সুন্দরী হয়েছো তুমি। আজ যদি তার মাথায় সামান্য বুদ্ধিও থাকতো… তাহলে এভাবে স্বামীর সঙ্গে অপঘাতে মরতে হতো না।“

তাঁর কথাগুলো আমার কানে এসে যেন বজ্রের মতো আঘাত করলো।

আমি বিস্ময়ে বলে উঠলাম, “আমার মা!”

একটা অদৃশ্য দেয়াল যেন হঠাৎ ভেঙে পড়ল আমার ভেতর।

লোকটা হালকা এক শয়তানি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল, “ওহ হো তুমি তো আবার তোমার মা কে, তাই জানো না। মিথ্যে জীবনে বাঁচছো।“

আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, “একদম উল্টো-পাল্টা কথা বলে আমাকে গোমরাহ করার চেষ্টা করবেন না। আমার মা কে আমি জানি। আপনি না জানলে সেটা আপনার দুর্ভাগ্য।“

লোকটা এবার চোখ কুঁচকে শয়তানি তৃপ্তি নিয়ে বলল— “আহা! আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম!

তোমার এই তেজটাই ভালো লাগছে। তবে শোনো,

শশী… হ্যাঁ, যাকে তুমি মা বলে জানো, সে আজ সকালে আমাকে ফোন করে কাঁদছিল বলল, তুমি নাকি তোমার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছো!

কী নাটক!”

আমার ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। আমি বলতে যাচ্ছিলাম কিছু, তখনই সে কথা থামিয়ে বলল,

“আর জানো, শশীর মতো ঠান্ডা মাথার মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। নিজের বোন আর অপ্রাপ্ত প্রেমিককে খুন করে নিজেই হয়ে গেছে তার ভাগ্নির মা। অভিনয় করেছে নিখুঁতভাবে একটা বাচ্চাকে নিয়ে নাটক সাজিয়েছে বছর বছর ধরে!”

তার কথা শুনে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল। মাথা ঘুরতে লাগল। চারপাশে গুহার দেওয়াল, বন্ধুবান্ধব, সেই গুঞ্জন ধ্বনি সব যেন কেমন ঝাপসা হয়ে এলো।

“থাক, আর রাগে লাল হওয়ার দরকার নেই। তোমার সেই নকল মা-ও তো আসছে এখানে।

আরও কিছু না জেনে, তুমি যাবে না, রুশা। আজ সব পর্দা উঠবে সব রক্তের সম্পর্ক উন্মোচিত হবে।“

একটা গা ছমছমে নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। আমাদের দৃষ্টি মিলল একে অপরের সঙ্গে কেউ আর জানত না, কী অপেক্ষা করছে সামনে।

এই লোকটার কথা শুনে আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। ওর প্রতিটি শব্দ যেন ছুরি হয়ে গেঁথে যাচ্ছে আমার অহংকারে, আমার অস্তিত্বে। কে এই লোক, যে আমার অতীতের উপর এমন নির্দয়ভাবে হাঁটতে পারে?

আমি দাঁতে দাঁত চেপে রাগ চেপে রাখলাম। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে উঠছে, তবুও জবাব দিলাম না। কারণ আমি জানি, এ লোক নাটক করছে, আমার স্নায়ু খরচ করে আমাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে।

না, আমি ভাঙবো না। এখন না। এই রঙ্গমঞ্চে ওর খেলা আমি দেখবো। সত্যিই এই জন্যই বলে সিনেমা আসল জীবনের ঘটনা থেকেই নেয়া। এই লোকটা সবার সাথে যেন এক নাটক জমিয়ে নিয়েছে।

আমি মনে মনে ভাবলাম, “আসুক দেখি, মা নামে যে চরিত্রকে এতদিন জেনেছি, তিনি আদৌ মা ছিলেন, না আরেকটা মুখোশধারী গল্পকার?”

ঠিক তখনই লোকটা সবার সামনে আবার ছড়িয়ে দিল বিষাক্ত ছোবল। সে এবার ইমরানের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, যেন বহু বছর ধরে জমে থাকা কথার খঞ্জর ছুঁড়তে প্রস্তুত।

“ইমরান! আমি সম্পর্কে তোমার বাবা হই।

আসলে তুমি আমার ছেলে… হ্যাঁ, না না, পুরো ছেলে না, সৎ ছেলে।”

শয়তানি এক হাসি ফুটল ওর ঠোঁটে। “তোমার মা আমার সাথেই পালিয়েছিল একদিন। কিন্তু সে ছিল লোভী, আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল সোনার খোঁজে। তবে কি করার, এমন লোভি মেয়েকে নিয়ে কি সংসার করা যায়!

হা! সে নিজেই ছিল এক বিষাক্ত ধোঁয়া।“

ইমরান থমকে গেল, ঠোঁট কাঁপছিল তার, আমরা সবাই তাকিয়ে আছি ওর দিকে, কারণ ওর চোখে এখন যুদ্ধ বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের, রক্ত আর আত্মার।

ঠিক তখনই মিকাইল ফারুকী হাত দুটো ছড়িয়ে এক মঞ্চসঞ্চালকের মতো বলল, “তবে যাই বলো, তোমাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। হাজারো লাশ পড়েছে এই ‘রুশের’ জন্য, তবে রহস্য ষষ্ঠপাণ্ডবই খুঁললো।

ষষ্ঠপাণ্ডব! পাঁচ জন কেন? আর একজন কোথায়?”

আমরা থমকে গেলাম।

“ষষ্ঠপাণ্ডব!”

শব্দটা যেন দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে।

আমরা তো ছয়জন এসেছিলাম। আমরা এখন আছি পাঁচজন। তাহলে… প্রীয়তা কোথায়?

আমি চারপাশে তাকালাম, দৃষ্টি ঘুরছে গুহার প্রতিটি কোণে, ছায়ার ভেতরে, অন্ধকার গলিপথে।

প্রীয়তার কোনো চিহ্ন নেই।

ঠিক তখনই মিকাইল কপাল কুঁচকে, তীক্ষ্ণ গলায় আদেশ করল, “সাবু! যা, দেখ তো, আরেকজন কোথায় গেল! আমরা নাটক জমাচ্ছি আর ও মঞ্চ ছেড়ে কোথায় গা ঢাকা দিল!”

একটা গর্জন যেন ছড়িয়ে পড়ল গুহার ভেতরে। সাবু নামে চেহারায় পশুর ছাপওয়ালা সেই গুন্ডাটা এগিয়ে গেল, তার হাতে একটা টর্চ, আর কোমরে পিস্তল।

আমরা বাকিরা রশিতে বাঁধা, কিন্তু চোখগুলো খোলা। সবার ভেতর আতঙ্ক, উদ্বেগ, আর… প্রশ্ন।

প্রীয়তা কোথায়?

মিকাইল ফারুকীর চোখে এক অদ্ভুত জ্বলজ্বলে উন্মাদনা। তার কণ্ঠ যেন গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে একটা কোলাহলের মতো, যেখানে মিশে আছে শয়তানি আর ঠাণ্ডা নিষ্ঠুরতা। সে সামনে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “তবে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে।

এই গুহার দরজা খুলতে হবে এখনই। তোমাদের দলের নাটের গুরু তো মেঘ, তাই না? মেঘ! এবার ভালো ছেলের মতো বলে দাও, এই দরজার রহস্য কী?”

চারপাশটা থমথমে, সবাই নিঃশ্বাস চেপে আছে।

মেঘ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে ক্ষোভ, ঠোঁট আঁটা। অবশেষে গলা শক্ত করে বলল, “আমি জানি না।”

মিকাইল হালকা হেসে এগিয়ে এলো এক পা, চোখে অগ্নিশর্মা চাউনি, “আমি জানি, তুমি জানো।

তুমি কি চাও, আমি তোমার ভেতরের সেই দূর্বলতাটায় হাত দেই? একটুখানি ঘাঁটলেই তোমার মুখ ফাঁস হয়ে যাবে।”

মেঘ এবার রেগে উঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি যা খুশি বলুন, কিন্তু আমি সত্যিই জানি না।

এই দরজার রহস্য আমার অজানা।”

একটা গর্জন উঠলো বাতাসে কারোর না বলা চিৎকার, আতঙ্ক, অবিশ্বাস, উত্তেজনা সব মিলেমিশে এক রহস্যময় বাতাবরণ তৈরি করলো। মিকাইল এবার মুখ ঘুরিয়ে রুবাইয়ের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল কাঁচা মধুর মতো নরম স্বর, কিন্তু সেই স্বরের নিচে লুকানো ছিল বিষ।

“ঠিক আছে। মেঘ তো বড় সাহসী। রুবাই, তুমি তো জানো তুমি বলো। তোমার কণ্ঠে এমন কিছু লুকোনো আছে, যা খুলে দিতে পারে এই গুহার পাথুরে হৃদয়।”

রুবাই কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি… আমি কি করে জানবো? আমি তো এসবের কিছুই বুঝি না। আমরা এসেছিলাম শুধু পুরনো ইতিহাস খুঁজতে, not this!”

মিকাইল হো হো করে হেসে উঠল, যেন এক রাক্ষস আনন্দে দুলছে। তার হাসি চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলে ফিরল গুহার পাথর দেওয়ালে। “আচ্ছা! তাহলে তো সবাই নিষ্পাপ পাখি! কেউ কিছু জানে না!

আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম রক্তের বন্যা ছাড়া কি আর গুপ্তধন হাসিল করা যায়। আমাকে এটা বলো তাহলে রুশের জন্য আমি কাকে বলি দেবো? রুশাকে?

সে এক ঝটকায় ফিরে তাকালো আমার দিকে। চোখের পাতা ছুঁয়েও গেল না যেন, “রুশা…! আমার সংসার না করা সেই নারীর পালিত মেয়ে।

তুমি যে বেঁচে আছো, সেটাই আশ্চর্য।

না না। আমি এতো সহজে কি তোমাকে মারতে পারি। হাজার হোক আমার সংসার না করা বউয়ের পালিত মেয়ে। ”

এরপর সে হঠাৎ ইমরানের দিকে ফিরল, চোখে যেন হাজার বছরের অন্ধকার জমে আছে “ইমরান! ছোটবেলায় রাক্ষসের গল্প শুনেছো? সৎ বাবা-মা তাদের সৎ সন্তানদের খেয়ে ফেলে!

এবারে আমি সেই কাহিনির বাস্তব রূপ। আজ আমি তোমাকে খেয়ে ফেলবো।”

রুবাই হঠাৎ ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “না! ইমরানকে মেরে কোনো লাভ নেই! ওর কাছে কিছুই নেই! কিছুই না!”

মিকাইল এবার ধীরে ধীরে রুবাইয়ের দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে এক অজানা উল্লাস, একটা খেলনার সামনে দাঁড়ানো রাক্ষুসে নিষ্ঠুর কৌতূহল। “আচ্ছা রুবাই! তাহলে তুমি বলো কাকে মারলে লাভ হবে? একটা সুন্দর সাজেশন দাও না!

রুশা?

ওরে এত সুন্দরী মেয়ে… ওকে মারি? হুম?”

ইমরান এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে গর্জে উঠল, “রুশাকে মারলে… রুশ ভুলে যান। আপনি যদি আমাকে মারেন, তবুও রুশের কাছে পৌঁছাতে পারেন একদিন। কিন্তু রুশাকে যদি মেরে ফেলেন…

এই দরজা কোনো দিন খুলবে না।আপনার জীবনেও না, মৃত্যুতেও না।”

চারদিক নিস্তব্ধ। সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইমরানের দিকে। মিকাইল তার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে থেমে গেল। এক মুহূর্ত তার চোখে এক ঝলক শ্রদ্ধার মতো কিছু ফুটে উঠল। তারপর আবার শয়তানি সেই হাসি ফিরে এল ঠোঁটে, “ওহ্! ভাইবোনের ভালোবাসা দেখছি! এটাই তো আমার পছন্দ।

এই অনুভূতি থেকেই বের হবে উত্তর। তোমরা সবাই জানো, এই দরজা কীভাবে খোলে তোমরা শুধু আমাকে ঘোরাচ্ছো।

মিকাইল ফারুকী এক অদ্ভুত, ভয়ংকর চরিত্র, যার চোখে থাকত এক নিষ্ঠুর, অন্ধকার দৃষ্টি। তার এক ইশারাতেই গুহার প্রতিটি কোণ যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। তার গুন্ডারা, একে একে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো, যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক সাঁজানো মৃত্যুর খেলা। আর তাদের মধ্যে প্রথমে লক্ষ্যবস্তু হল অরুপ। একে একে তারা তাকে ঘিরে ফেলল। গা ছমছমে পরিবেশ, সকলের একটা শ্বাসরুদ্ধকর স্থিরতা, মনে হচ্ছিল এখানে আর কিছুই বাকি নেই। জোমদূতের মতো লোকগুলো অরুপকে আঘাত করে বসলো।

ইমরান অবিশ্বাসে চিৎকার করে উঠল, “অরুপকে কেনো মারছেন!”

তার গলা যেন এক চিৎকার, কিন্তু সেই চিৎকারও যেন গুহার গাঢ় আঁধারে ম্লান হয়ে গেল।

একের পর এক আঘাত অরুপকে আহত করে তুলছিল আমাদের চোখের সামনে। ইমরান, মেঘ কঠিন বাঁধন থেকে ছুটতে প্রানপণ বৃথা চেষ্টা করছে। ওকে করা প্রতিটি আঘাত যেন আমাদেরকে ক্ষত করে তুলছিল। অরুপের কাছে প্রতিরক্ষার সামান্যতম রাস্তা এরা রাখে নি‌।

মিকাইল ফারুকী এমন এক সাইকো, যার মধ্যে এক বিচ্ছিন্ন মনোবৈকল্য গেড়ে বসেছে। তার চোখে এক অদৃশ্য শিকারীর দৃষ্টি, আর লক্ষ্যবস্তু হয়ে গিয়েছে অরুপ। আমার বুকের মধ্যে এক ভয়ানক শিহরণ, কিন্তু আমি জানি, আমি কিছু করতে পারবো না। আমি কিছুতেই ভাবতে পারছি না, কীভাবে এর সমাধান হবে।

কিন্তু, এক মুহূর্তের জন্য থেমে, আমার দৃঢ়তা হয়তো আমাকে শক্তি দিলো, এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে আমি কি চুপ করে বসে থাকবো? না!

আমি তো জানি, আমার একটুখানি শব্দই হয়তো আমার বন্ধুদের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না।

চেঁচিয়ে বললাম, “ছেড়ে দিন অরুপকে,” আমার কণ্ঠে এক কঠোরতা, “আমি বলছি কিভাবে খুঁলবে এই দরজা।"

মেঘ, যার মুখে অপ্রকাশিত রহস্য, এক অদ্ভুত দৃঢ়তা সোভা পায়, এবার সে এক অন্য মানুষ হয়ে মুখ খুললো, কিন্তু তার গলার স্বর ভয়ে কাঁপা। “রুশা, না!”

সে একদম উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, চোখে রাগ কিন্তু কন্ঠে কাঁপন। “তুমি তোমার বাবা মায়ের খুনিকে তাদের পরিশ্রমের ফর্মুলা দিতে পারো না।“

কিন্তু আমি জানি, এখন পরিস্থিতি মেঘের কথা মেনে নেয়ার নয়। এখানে উপস্থিত সবার জীবনের উপর আমার দায়িত্ব। কিছু মৃত মানুষের পরিশ্রম কখনো জীবন্ত মানুষের জীবনের সাথে তুলনা করা যায় না। আমি বললাম, “কিছু মৃত মানুষের পরিশ্রমের থেকে কিছু জীবন্ত মানুষের জীবন আমার কাছে অনেক বেশি দামি।“

আমি জানি, আমার কোনো ভয় নেই। যে কাজ আমি করব, তার ফল বয়ে আনবে আমাদের জন্য রেহাই আর ওই দরজা যেভাবে খুলবে, সে রহস্য আমি খুঁজে বের করবো।

আজ চারপাশে যেন নিঃশব্দে বিষ ছড়ানো বাতাস। মিকাইল ফারুকী এবং তার নিষ্ঠুর বিষাক্ত চোখের অনুসারীরা তারা দাঁড়িয়ে আছে এমনভাবে, যেন কোনো করুণা নেই ওদের শিরায়। তারা আজ আমাকে, আমাদের ভয় দেখাতে এসেছে। অথচ আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, শেষ বলে কিছু নেই। প্রত্যেক শেষের পরেই এক নতুন শুরু অপেক্ষা করে।

ঠিক তখনই, মিকাইল ফারুকী সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক বিদ্রূপের হাসি।

"ইমপ্রেসিভ! বাবার গুন পেয়েছো। শশীর কাছে থেকেও ওর মতো স্বার্থপর হও নি, এটা দেখে ভালো লাগলো।"

আমি ঠোঁট চেপে বললাম, “জানি না, তবে একটা জিনিস জানি, আপনি সবাইকে ছেড়ে দেবেন। আর আমি.... আমি আপনাকে এই দরজাটা খুলে দেবো।“

সে মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বললো, “নিশ্চয়ই। তোমার বন্ধুদের নিয়ে আমি কী করবো? আমার শুধু দরজাটা খোলা দরকার।“

আমি ধীর কণ্ঠে বললাম, “তাহলে আমার হাত খুলুন। এই দরজা হিউম্যান ইলেক্ট্রোপ্যারাসাইট ফর্মুলায় লক করা। এর বাম পাশে যে চরকির মতো কাঠামোটা আছে, সেখানে দিতে হবে সেই ব্যক্তির রক্ত যিনি একদিন নিজের রক্ত দিয়ে এই দরজা বন্ধ করেছিলেন। ভিতরে সেট করা রয়েছে বায়োইলেক্ট্ররাল প্রসেস যা সেই রক্ত থেকে ডিএনএ আলাদা করে মিলিয়ে নেবে লক করা ব্যক্তির ডিএনএর সঙ্গে। মিল হলে দরজাটা খুলবে। না হলে, “

“ব্রিলিয়ান্ট!” মিকাইল ফারুকীর চোখ চকচক করে উঠল। “সত্যি হামজা অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিল।“

সে তখনই ইশারা করল। আমার হাতের দড়ি খুলে দেওয়া হলো। সে পকেট থেকে একটি সূচালো ছুরি বের করে এগিয়ে দিল আমার দিকে।

“রুশা,” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি নিজে নিজের রক্ত বের করতে পারবে? নাকি আমার সাহায্য লাগবে?”

তার চোখে ছিল হিংস্রতা, খোঁচা, এবং অপমানের এক অদ্ভুত মিশেল। মুহূর্তটিতে যেন সময় থেমে গিয়েছিল। আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছিল, কিন্তু আমি মাথা উঁচু করে তাকালাম তার চোখে।

রাগে, ঘৃণায়, আর অভিমানে গলা কাঁপিয়ে বললাম,

“আমি নিজেই পারবো। নিজেকে ব্যথা দিতে পারার সাহস যাদের আছে, তারাই পারে সবচেয়ে বড় লড়াইটা জিততে।“

ছুরির হাতল শক্ত করে চেপে ধরলাম। আজ ভয় নয়। আমার শরীরেই বয়ে চলেছে মুক্তির চাবিকাঠি।

মায়ের বিষয়টা বারবার শুনেও যেন না শোনার ভান করছি। সত্যি বলতে আমি আমার জীবনের সব থেকে ভয়ংকর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, এটা বুঝতে পারছি। একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছি নিজের চারপাশে, যেন কিছুই স্পর্শ করতে না পারে। হয়তো ইচ্ছে করেই করছি। কারণ এখন যেটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সেটার ভয় এতটাই বাস্তব, এতটাই ছায়া-ছায়া কুয়াশায় মোড়া, যে অতীতের সব কষ্টই তুচ্ছ মনে হচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে যে আমি নতুন কোন সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছি।

আমি জানি, আজ আমি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তের মুখোমুখি। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কিন্তু যেন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে আতঙ্কের শব্দ হৃদয়ের ভেতর ঢুকে পড়া দমবন্ধ করা এক শীতল আর্তনাদ।

যে আমি কোনো দিন মশার কামড়ের ভয়ে, কয়েলের থেকে দূরে থাকি নি। সেই আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি এক হাতে সূচালো ছুরি নিয়ে নিজের হাত কেটে রক্ত দিতে হবে সেই দরজার জন্য, যে দরজা খুললেই হয়তো আমাদের মুক্তি, না খুললে নিশ্চিত মৃত্যু।

ইনজেকশনের নাম শুনলেই আমি দৌড়ে বাথরুমে লুকিয়ে পড়তাম, হাজার অসুখ হলেও যার ডাক্তার দেখানো হত না ভয়ে সেই আমি আজ নিজের মাংস ছুঁয়ে দেখতে চলেছি ছুরির ধার কতটা গভীর।

গলার ভেতর যেন পাথর চেপে বসেছে, হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। কিন্তু তবু আমি দাঁড়িয়ে আছি। এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই যুদ্ধ। নিজেকে টেনে ধরে রাখা, ভেঙে না পড়া, সেই শক্তিটাই আজ আমার অস্ত্র।

ঠিক তখনই, লোকটা মিকাইল ফারুকী, ঠান্ডা গলায় বলল, “রুশা, দেরি করছ কেন? তারাতারি করো।“

তার গলায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো সহানুভূতি নেই। শুধু এক ধরণের ঠান্ডা হুকুম, যেন আমি কোনো যন্ত্র, কোনো অস্ত্র যার কাজ শুধু একটা দরজাটা খোলা।

ছুরিটা শক্ত করে ধরে বসলাম হাত বরাবর। ব্যথা তো সবাই পায়, কিন্তু নিজের রক্ত দিয়ে এতো গুলো মানুষকে বাঁচাতে পারে ক’জন?”

মুহূর্তেই আমার চারপাশ যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। কেবল আমি আর আমার হাতে ধরা ছুরিটা স্পষ্ট। দরজার পাশে সেই চরকির মতো যন্ত্রটা আমার দিকে ডেকে যাচ্ছে, চুপিসারে, ধৈর্যের সঙ্গে। আজ যে রক্ত ঝরবে, তা আর শুধুই শরীরের নয়। এ এক ইতিহাসের প্রতিশ্রুতি, এক সাহসিকতার শুরু।

আমি এই পরিস্থিতিতে এটাও বুঝতে পারছি না যে, মেঘ ঠিক কি ইশারা করছে।

আমি একবার মেঘের চোখে তাকালাম। কিছু শব্দ মেঘের চোখ চিৎকার করে বলছে বোধহয়। তবে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তার চোখের গভীরে যেন ঝড় উঠে আছে, অথচ ঠোঁটে কোন শব্দ নেই। মেঘের মুখটা বারবার আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু যেন সে বোঝাতে পারছে না। এই মুহূর্তে এমন এক অজানা সংকেত ছড়িয়ে আছে চারপাশে, যেটা বুঝতে পারছি, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারছি না।

ঠিক তখন, আমার হাতের কাঁপুনি আর চোখের দৃষ্টি দেখে মিকাইল ফারুকী বিরক্তি মেশানো ঠান্ডা কণ্ঠে বললো, “তোমাকে দিয়ে হবে না। এই কাজ সাহসের, নিখুঁত হ্যান্ডেলিং-এর। কিভাবে কাটতে হয়, আমি দেখাচ্ছি।“

আমি কিছু বলতে পারলাম না। শরীর যেন পাথর হয়ে গেছে। লোকটা আমার হাত থেকে ছুরিটা একঝটকায় কেড়ে নিল। তারপর কোনো রকম পূর্বাবাস না দিয়েই, হঠাৎই এক নিখুঁত ছাঁটে কেটে দিল আমার হাতের উপরের চামড়া। ছুরির ধারে চামড়া ছিঁড়ে গেলে যে ব্যথা হয়, তার চেয়েও বেশি কাঁপছিল হৃদয় কারণ সেটার সঙ্গে মিশে ছিল ভয়, আর ভেতর থেকে গর্জে ওঠা এক শ্বাসরুদ্ধ আঘাত।

রক্ত ঝরতে লাগলো, গরম লাল রক্ত। জীবনে এই প্রথমবার, নিজের এতটা রক্ত দেখলাম। স্রোতের মতো বেয়ে পড়ছে, যেন শরীর থেকে সব শক্তি, দৃঢ়তা বেড়িয়ে যাচ্ছে। ছুরির ধার ভেদ করে শুধু চামড়া নয়, কেটে যাচ্ছে আমার নরম মনটা।

মেঘ দাঁড়িয়ে ছিল আমার পাশে। আমি তার চোখে তাকাতেই, দেখলাম ওর চোখ জ্বলজ্বল করছে রাগে। যেন কেউ তার নিজের শরীর কেটেছে। মেঘের দৃষ্টি তখন জ্বলন্ত আগুন চোখের সাদা অংশও যেন রক্তিম হয়ে উঠেছে। সে বলল না কিছু, কিন্তু তার নিঃশ্বাসের শব্দেই বোঝা যাচ্ছিল, ওর ভিতরটা কেমন ফেটে যাচ্ছে।

রক্ত পড়ল দরজার চরকির মতো যন্ত্রে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময় থেমে রইল। সবাই তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম সেই প্রতীক্ষিত ক্লিক শব্দটার জন্য, যেটা আমাদের বাঁচিয়ে দেবে।

কিন্তু… কিছুই হলো না।

দরজা একটুও নড়ল না। যেন ব্যর্থতা আমাদের মুখের ওপর চড় মেরে বলছে তোমরা কিছুই পারো না।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন