#রুশ_রহস্য
#সাদিয়া_তিন্তি
গল্পের ধরন: বন্ধুত্ব, প্রেম, রহস্য, গুপ্তধন, পারিবারিক ড্রামা
বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে কেউ কপি করবেন না।
শেষ পর্ব: পর্ব- ৫১ (শেষাংশ)
শাহরিয়ার শেখ কিছু বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই শাফিন আহমেদ এগিয়ে আসে। চোখে সেই পুরোনো ঝড়টা নেই, আছে অবিশ্বাস্য রকমের শান্তি। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে বলে, “ঠিক আছে, তবে যদি ফিরে যেতে চাও ফিরো নিজের বাড়ি।” তার কণ্ঠটা যেন কাচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু ব্যথায় ভারী।
“শিশির আর হামজার বাড়ি যেটা তোমার বাবার ভিটা। তোমার বাবা মা তোমার জন্যই রেখে গেছে। এতদিন সেটা ছিল আমার কাছে, কেবল তোমার জন্যই… একরকম আমানত।”
সে পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করে, হালকা ঝঙ্কারে সামনে ধরে রাখে। “এটা এখন তোমার।”
রুশা তাকিয়ে থাকে চাবিটার দিকে, যেন সেই ছোট্ট ধাতব বস্তুটা আসলে এক মহাবিশ্বের দরজা খুলে দিচ্ছে স্মৃতি, কান্না, ঘৃণা, ভয়—সব একসাথে।
শাফিন আহমেদ ধীরে এগিয়ে এসে চাবিটা ওর হাতে গুঁজে দেয়, তারপর মাথা নিচু করে বলে, “চলো, আমি নিজেই নিয়ে যাব তোমায়। এই যাত্রাটা তোমার একার নয়।”
রুশার ঠোঁট কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে কিছু বলে না। তার চোখে একটা অদ্ভুত বিষাদ খেলে যায়, যেন এক যুগের ভার নামছে ধীরে ধীরে।
মেঘ, শাহরিয়ার শেখ, ইমরান, ডাক্তার সবাই যেন হঠাৎ মৌনতার কোনো মহা-উৎসবে বন্দী। একটা মেয়ে মূর্তির মতো নিঃশব্দ, যার চোখে যুদ্ধের ছায়া, ঠোঁটে নতুন জীবনের স্বাদ। সে হাঁটছে। কেউ কিছু বলে না, কেউ বাধাও দেয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে। যেন ঈশ্বর এক নতুন অধ্যায়ের পৃষ্ঠা উল্টে দিচ্ছেন তাদের সামনে।
মেঘ ছুটে যায় বাবার পেছনে। রুবাই এগোতেই ইমরান ধরা গলায় বলে ওঠে,“ওদের যেতে দাও…
রুশাকে নিজের পরিচয় নিজ হাতে ছুঁতে দাও। আর কত লুকোচুরি?”
শান্ত বাতাসে তার কথাগুলো মিশে যায়, আর সবার চোখে শুধু বিস্ময় আরো এক জন্ম, আরো এক জন্মান্তর।
সেই বাড়িটা…
সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরনো বাঙলো দোতলা, তবু রাজপ্রাসাদের মতো নীরব।
ছাদের কোনা ধরা, জানালায় লোনা হাওয়ার ছাপ, কিছু পুরনো ঘাস। তবুও এমন নয় যে জরাজীর্ণ বরং একধরনের গর্ব আছে এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে।
শাফিন আহমেদ গাড়ি থেকে নামার পর নিঃশব্দে বলেন, “এই বাড়ি তোমার বাবার, রুশা।
তোমার নিজেরও। আমি প্রতি বছর একবার এসে পরিষ্কার করাই। জানি না কেন… হয়তো মনে হত একদিন তুমি ঠিক ফিরে আসবে। আর আমি চাবিটা তুলে দেবো। ঠিক আজকের মতো।”
দরজা খুলতেই একটা কুহকিনির মতো শীতল গন্ধ নাকে লাগে। ধুলো জড়ানো চারপাশ ঘরের দেয়ালে শিশির আর হামজার ছবি। দুটো ছোট খেলনা এখনও বিছানার কোণে পড়ে আছে একটা কাঠের ঘোড়া, আর একটা প্লাস্টিকের লাল গাড়ি।
রুশা চুপচাপ ছুঁয়ে দেখে সব। স্মৃতির দুঃসহ খাতায় এ বাড়ির নাম নেই তবু যেন দেয়ালের প্রত্যেক ইট ওকে ডাকছে, “তুই এখানে ছিলি, রুশা…।”
সে একা একা হাঁটে, মেঝেতে নরম ধুলো জমে আছে, তবু সবকিছুতে ছুঁয়ে থাকে এক পুরনো আদর। দোতলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকায়। লোনা বাতাস তার কপাল ছুঁয়ে যায়।
নিস্তব্ধ সাগরও যেন বলে, “তুই ফিরেছিস, আমি এখন শান্ত।”
চোখ বিস্ফোরিত হয়। এটাই তো সেই বাড়ি! শেষ যেবার সমুদ্রের এসেছিল সবাই মিলে কি আফসোস হয়েছিল তার এই বাড়িটি দেখে। কি সুখি ভেবেছিল এই বাড়ির মানুষদের সে।
পেছনে এসে দাঁড়ায় শাফিন আহমেদ, “শিশিরের সমুদ্র খুব প্রিয় ছিল। এটা ওর খুব যত্নের বাড়ি।“
রুশা কিছু বলে না। চোখ শুধু ঢেউয়ের দিকে।
“আমি তোমাকে একা এখানে থাকতে দেবো না। তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ না, রুশা।
এই বাড়িতে তুমি একা থাকবে কিন্তু সেটা তখনই, যখন আমি নিশ্চিত হবো তুমি এই দেয়ালগুলোর মতোই দৃঢ়। তার আগে না। আমি তোমাকে থাকতে দিবো না।”
তার চোখে ছিল না কোনো নিষেধ, ছিল কেবল সুরক্ষার ছায়া।
শাফিন আহমেদ ঘরের ভেতরে ফিরে গিয়ে মেঘকে বলে, “রুশা এখানে থাকুক কিছুসময়। একা নিজের সঙ্গে থাকুক। এই বাড়িটা, এই বাতাসটা, এই স্মৃতিগুলো সবই তো ওর প্রাপ্য।কিছু সময় পর ওকে বাড়ি নিয়ে যাবো।”
মেঘ মাথা নাড়ে। চোখে উজ্জ্বল।
তারপর দুজনেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়, পেছনে রেখে এক নীরব বিস্ময়।
রুশা দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। বেলকনির রেলিংয়ে হাত রেখে সমুদ্রের গভীরে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, এই ঢেউগুলো বুঝি কোনো অজানা ভাষায় ওকে ডাকছে।
পেছনের ঘর নিস্তব্ধ, দেওয়ালের ছায়া দীর্ঘ, বাতাসে পুরনো কোলাহলের স্পন্দন।
এখানে রুশার কোনও শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাস আছে। আর আছে প্রশ্ন,
এই কি তবে ঘর? এই কি তবে নিজেকে ফিরে পাওয়ার শুরু?
ঘরের ভেতরটা এখন নিঃশব্দ। রুশা ধীরে ধীরে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হাঁটে প্রতিটা কোণে যেন কোনো এক মায়াবী শিল্পীর হাতছোঁয়া। দেয়ালে জলরঙে আঁকা নারিকেল গাছের পাশে একটা কাঠের ফ্রেমে মায়ের মুখ মৃদু হাসি, আঁচলে সূর্য পড়েছে। একটা পুরনো বুকশেলফ যেখানে সারি সারি কবিতার বই, পেছনে নাম লেখা, “শবনম আরা”।
টেবিলের ওপর ছোট কাঁচের ফুলদানিতে শুকনো ল্যাভেন্ডার এখনো সুবাস ছড়ায়।
সব কিছু যেন বলছে, “আমাদের আজন্ম অপেক্ষা শেষ হলো বোধহয়।“
একটা ঘরের জানালায় নীল রঙের পর্দা দুলছে হালকা বাতাসে। কাঠের খাটে সাদা চাদর, একটা ছোট্ট টেডিবিয়ার যেটার গায়ে অক্ষর কাটা: R for Rusha।
রুশা জানে না, এগুলো কতটুকু তার নিজের স্মৃতি, আর কতটুকু মায়ার তৈরি। তবু তার চোখে এক বিন্দু জল আসে, হাসি আসে না।
তারপর হঠাৎ দরজার পাশ থেকে সে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ি পেরিয়ে একদম নিচে। তারপর খোলা ফটক। চপচপে সবুজ ঘাসে পা পড়তেই মনে হয়, পায়ের নিচে সময় থেমে গেছে।
সমুদ্রটা সামনে।
নাম না-জানা সেই পুরনো চেনা ঢেউয়ের শব্দ আবার কানে বাজে মাঝেমধ্যে হাওয়ার টানে চুল এলোমেলো, কাঁধে খসে পড়ে গায়ের সাদা ওড়না।
সে হাঁটতে থাকে। পা জলে ভিজে, নোনা গন্ধে বুক ভরে ওঠে। হঠাৎ একটা ঢেউ এসে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে। সে নিচু হয়ে জলে হাত রাখে। ঠান্ডা। কাঁপুনি লাগে।
তার চোখে জল চলে আসে কিন্তু এ কান্না কোনো দুর্বলতার না। এ যেন এক প্রতীক্ষার কান্না।
একটা ফেরা।
একটা নীরব অঙ্গীকার, “আমি আবার এসেছি…।”
আকাশ তখন গোধূলির আলোয় রাঙানো, সূর্য ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দিগন্তের ওপারে। আমি দাঁড়িয়ে আছি নিঃসঙ্গ, পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে যাচ্ছে নরম বালু আর সমুদ্রের নোনতা জল। চারপাশে কেউ নেই শুধু বাতাসের নরম স্পর্শ, ঢেউয়ের অনন্ত সুর, আর সেই পুরনো নিঃশব্দতা, যা শৈশবের মতো হারিয়ে গিয়েও কখনো ফুরায় না।
কাঁধের ওপর হালকা হাত রাখে সময়, তবে পিছনে ফিরে দেখার কিছু নেই। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে…
কারণ, কখনো কখনো নিজের শিকড়ে ফেরার শব্দ শুধু নীরবতায় বাজে।
ঠিক তখনই একটা অচেনা, নারীমধুর কণ্ঠস্বর বাতাসে ধাক্কা খেয়ে আসে পিছন থেকে। “তুমি ফিরে এসেছো, ছোট্ট রাজকন্যা?”
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার সামনে সেই নারী বয়স চল্লিশের ঘরে, কিন্তু রূপ যেন কোনো পুরনো শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে আঁকা। একটা নীলাভ শাড়ি পরনে, সিল্কের মতো মসৃণ, কিন্তু চোখের ভেতর এক অদ্ভুত গভীরতা যেখানে আলো কম, প্রশ্ন বেশি। তার ঠোঁটের কোণে এক চেনা-অচেনা হাসি, যা ঠিক স্পর্শ করে না। শুধু বাতাসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে যায়। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত কোমলতা, যা স্পর্শে মায়ের মতো, কিন্তু… কেন যেন একটু অতিরিক্ত সাবধানে উচ্চারিত।
আমি নিস্তব্ধ। চেনা মনে হয় মুখটা, তবুও… মনে পড়ে না কিছুই।
নারীটি কাছে আসে তার প্রতিটি পা যেন হিসেব করে ফেলা।
“কখনো কখনো আমাদের সমুদ্র হতে হয়। সমুদ্রের ঢেউ এর মত গা ভাসিয়ে দিতে হয়। কিছু সময় জীবনটা টিকে থাকার লড়াই হয় রুশা। সব থেমে যাওয়া মানে শেষ নয়। যদি কেউ শেষ না করে তাহলে নতুন শুরু কি করে হবে?”
শেষ কথাটা একটু থেমে বলে সে আমার কণ্ঠ শুকিয়ে আসে।
ঠোঁট বলে ওঠে, “আপনি কে?”
কিন্তু শব্দ আটকে যায় গলায়।
নারীটি এবার সামান্য ঝুঁকে আসে, চোখে এক অদ্ভুত স্নেহের আবরণ। তবে তার পেছনে যেন কোনো গোপন গল্প লুকিয়ে।
“ছোট রাজকন্যা, তুমি একদিনে অনেক বড় হয়ে গেছো। আমি জানিনা জীবন কেন তোমার সাথে এমন খেলা খেললো। কিন্তু তুমি জয়ী। তুমি কারো অপরাধী নও। ভাগ্য তোমার অপরাধী। আর তোমাকে এসব কাটিয়ে উঠে বাঁচাতে হবে।“
তিনি অবিরত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখ যেন আটকে আছে সমুদ্রের ঢেউয়ে। আমিও তার চোখ অনুসরণ করে আবার ঢেউয়ের দিকে তাকালাম। তিনি আবার বললেন, “শিশির কখনোই কারো অপরাধী হতে পারে না রুশা। শিশির খুব শান্ত, মিষ্টি স্বভাবের একটা মানুষ ছিল। আমি বলবো না শশী খুব খারাপ কিংবা অগ্রহণযোগ্য মানুষ ছিল। তবে ভাগ্যের সব অপূর্ণতা কেন যেন শশীর জন্য বরাদ্দ ছিল। আর শিশিরের নামে ছিল ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তি। এই গল্পে কার কতোটা ভুলছিল তা আমার জানা নেই। তবে রুশা ভাগ্য নিষ্ঠুর ছিল।“
আবার চোখ ভরে এলো। বুকের ভেতর কেমন এক চাপা শব্দ বাজে, এ কি ভয়? না পুরনো নিষিদ্ধ আগুন?
…সমুদ্র তখন আরো একটু উত্তাল। হাওয়াটা ভারী হয়ে উঠেছে। আকাশের রঙ গাঢ় নীল থেকে ধীরে ধীরে ধূসর ছুঁই ছুঁই করছে। ঢেউ যেন কথা বলছে, কিছু বলতে চায়, আবার কিছু লুকোতে চায়।
তিনি শুধু বললেন, “অপেক্ষা করছি তোমার।“ এরপর নারীটি ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে।
প্রতিটি পা যেন সময়ের উপর চেপে চলে, কোনো অদেখা স্মৃতির সুরে বাজে তার নরম চরণধ্বনি।
“আপনি কে?” এইবার গলা পেরিয়ে আসে প্রশ্নটা। কিন্তু সে থামে না। তার নীল শাড়ি বাতাসে উড়তে থাকে
একটা ছবি হয়ে মিলিয়ে যায় সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মধ্যে।
কোনো শব্দ নেই, পদচিহ্নও না। শুধু বুকের ভেতর রয়ে যায় এক অদ্ভুত কান্না আর নিঃশব্দ কৌতূহল।
ইচ্ছেরা এবার বেপরোয়া হয়ে উঠলো। নিজের জীবনের জটিলতা আর বাড়াতে ইচ্ছে করল না তার পরিচয় নিয়ে। সমুদ্র তখন ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করেছে।
আমি পরম যত্নে শশী রহমানের শেষ চিঠিটা ভাসিয়ে দেই স্রোতে। যেন এ এক সুখ। হারিয়ে ফেলা আবার কেমন সুখ? গলা স্পষ্ট হয়, “আপনিও আমার মা শশী রহমান। আপনাকে ঘৃণা করতে পারছি না।“ আর্তনাদ এবার কান্না হয়ে চিৎকার হয়ে বের হয়।
অনুভূতি কান্না যন্ত্রণা সবাই যেন পিছে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি দিনের সাথে লড়াই করে, হাজারটা অন্ধকার টপকে আজ আবার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার তাগিদে রাস্তায় নেমেছি।
এই সমুদ্রের কাছে এসে, মনে হয় আমি আর এই ঢেউগুলোর মাঝে কোনও পার্থক্য নেই। আমি যেমন প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ি আর উঠি, তেমনি সমুদ্রও বারবার নিজের পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে যায়।
এই তীরে দাঁড়িয়ে, আমি দেখছি এক ডুবন্ত আধা-সূর্য যার ক্লান্ত আলোয় আমার ছায়াও বড় বিবর্ণ লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ভরে আসে, আর ফিরে যায়। কেউ জানে না সে কোথা থেকে আসে, কোথায় চলে যায়।
পৃথিবী?
সে তো নিজের ছন্দে, নিজের নিয়মে এগিয়ে চলে কারও জন্য থামে না।
আর আমি?
আমি সেই পথহারা যাত্রী, যে একদিন সব হারিয়ে আজ আবার পথ খুঁজতে নেমেছে বুকভরা শূন্যতা নিয়ে, চোখে লুকানো হাজারটা প্রশ্ন।
সময়...
এই সময়ই আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষক। যে কোনো প্রিয় মুখ এক পলকে অচেনা করে দেয়। যে ভুলকে শাস্তি বানায়।
আর ভালোবাসাকে স্মৃতি। আজ যদি আমি একখানা খাতা খুলে বসি হিসেব কষতে,
কি পেয়েছি আর কি হারিয়েছি। তাহলে পাতার পর পাতা জুড়ে থাকবে ফাঁকা ঘর, একেকটা শূন্যতা, যার কোনো মানে নেই। শুধু কিছু নামহীন বেদনা, অজানা আর্তি, আর একরাশ অভিমান।
কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেও... আমি পেয়েছি একটা অমূল্য সম্পদ নিজেকে।
হ্যাঁ, আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছি। ছোটবেলার সেই নিঃশব্দ চোখ, হারিয়ে যাওয়া চিঠির ভাঁজে থাকা প্রশ্ন, রাতের বেলায় বালিশে মুখ লুকিয়ে ফেলা কান্না সব কিছুর উৎস যে মেয়ে, আজ সে-ই দাঁড়িয়ে আছে একা, অথচ শক্ত।
সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে আমি বলি, আমি ফিরেছি। ভাঙা হোক, জোড়া হোক, আমি আজও আছি। আর এই থাকা, এই নিঃশব্দ অস্তিত্বই আমার প্রাপ্তি।
আজ আমি আবার দাঁড়িয়ে আছি সেই চিরপরিচিত বালির গালিচায় যেখানে পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে শত হেরে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস, আর কয়েকটি নিঃশব্দ জয় যেগুলো কখনো বলা হয়নি, শুধু অনুভবের মতো রয়ে গেছে।
এই জায়গাটা…
এখানে অগণিত পদচিহ্ন এসে মিলিয়ে গেছে জোয়ারের ঢেউয়ে, তেমনি আমার ভাঙাচোরা দিনগুলোও হয়তো মিশে গেছে অতীতের নোনা জলে। তবু আজ, আমি যখন এখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তখন আমার ভিতরে আর সেই হাহাকার নেই বরং একটা গভীর নিঃশ্বাস আছে, একটা মাটির মতো স্থিরতা, যা বলে, “আমি টিকে গেছি।“
আজ আমি আর কোনো হারানো গল্প শোনাতে আসিনি, বরং এসেছি জানাতে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। নিজেকে অনেকবার ভেঙে আবার গড়েছি, আর আজ, যখন দাঁড়িয়েছি নিজের দু’পায়ের উপর তখন এই গল্পের হাওয়া বদল যেন নতুন এক ঋতুর আগমনী বার্তা।
এই সমুদ্র, এই উড়ে যাওয়া চিল, শহরের অলিগলি, আমার কলেজের করিডোর, ঘরের নিঃসঙ্গ বারান্দা, বিকেলের একঝাঁক উদাস মেঘ, রাতের নিস্তব্ধ শহর, আর দিনের ব্যস্ত কোলাহল সবাই, প্রত্যেকে আমার নিঃশব্দ সাক্ষী। আমার হাসি-কান্নার, আশা-ভাঙনের, আর নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার অমলিন যাত্রার।
তারা জানে, আমি কতোবার নিজেকে হারিয়ে আবার খুঁজে পেয়েছি একটা নাম, একটা চেহারা, একটা আত্মা হয়ে। আজ সেই আমি, দাঁড়িয়ে আছি নিজের গল্প নিয়ে, কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। কারণ যাত্রার শুরুটাই তো ছিল একটা নিরব অভ্যুত্থান।
তবে দিন শেষে এই ছোট জীবনে বাকি রয়ে গেছে অনেক কিছু। বাবা মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখা বাকি আছে, মায়ের মুখে গল্প শুনে একটা রাত ঘুমানো বাকি আছে, সারাদিনের হাজার অভিমান মুখ ফুলিয়ে বাবাকে বলা বাকি আছে, একটা ছুটির দিন বাবা-মা আমি সবাই একসাথে একটা হাসি মুখে আড্ডার বাকি আছে, হাজার বাহানায় বাবার কাছে আবদার করা বাকি আছে, বাবা-মায়ের হাত ধরে অনেকটা পথ চলা বাকি আছে, আমার শৈশব বাকি আছে। বাকি তো আপনিও রয়ে গেলেন শশী রহমান।
আর এগুলো আজীবন বাকি থাকবে …….…. ।
___________________________________
মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় কিন্তু গল্প কিন্তু কখনোই শেষ হয় না যেখান থেকে কেউ একজন গল্পের সমাপ্তি করে। কিংবা রহস্যের সমাপ্তি ঘটায়। সেখান থেকে নতুন ঘটনা কিংবা নতুন রহস্য শুরু হয়।
যারা এই গল্পটা প্রথম থেকে সম্পূর্ণভাবে শেষ অব্দি পড়ে আসছেন, তাদের সবাইকে আমার তরফ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এটা আমার লেখা প্রথম কোন গল্প যেটা আমি সম্পূর্ণ করেছি।
আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন আমি এই গল্পটা প্রথম লেখি। গল্পের সকল ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর অবশ্যই আমাকে অনেক অনেক সাজেশন দিয়ে যাবেন যাতে আমি পরবর্তীতে আরো সুন্দর করে লিখতে পারি।
সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ ♥️
_________________________________
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
https://www.facebook.com/share/p/16uzuY9dEF/
📚 আমার লেখা অন্যান্য গল্প পড়ার আমন্ত্রণ রইলো- https://www.facebook.com/share/p/12JtWpMZZVK/