ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৮ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৮.

পরিবেশ শুনশান। ভাইস চ্যান্সেলরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে তাদের কারোর মাঝেই বেশ লম্বা সময় কোন প্রতিক্রিয়া দেয়া গেল না। সকলেই এক প্রকার স্তব্ধ। মানুষের চাহিদা কিংবা কল্পনার উদ্ধের প্রাপ্তি গুলো হয়তো মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। এই পিনপতন নীরবতা ভেঙে অরুপ প্রশ্ন করে উঠলো, "আমাদেরও কি এবার থেকে গবেষণায় ইনস্টিটিউটে গবেষণা করার অনুমতি দেবে?"

ঠিক এমন সময় অরুপের এমন প্রশ্ন সকলের কাছে অদ্ভুত লাগলেও, তার জন্য জন্য উপযোগী মনে হলো। সে তো সব গুরুতর মুহুর্তে অদ্ভুত প্রশ্নের মাধ্যমে আবহ হাস্যকর করতে ওস্তাদ। ইমরান বেশ কৌতুক করে বলল, "আমাদের কাউকে গবেষণার সুযোগ দিক বা না দিক। তোকে ঠিকই দেবে। তুই চিন্তা করিস না।"

ইমরানের কথা সম্পন্ন না করতে দিয়েই প্রীয়তা বেশ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আমাকে একটা সত্যি কথা বলো তো, তুমি আসলে কি নিয়ে গবেষণা করবে?"

অরূপ কিছু বলতে যাবে তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ইমরান বলল, "তোমাকে নিয়ে গবেষণা করবে। তুমি ছাড়া অরুপের তো গবেষণা করার আর কোন বিষয় নেই। সারা দিন ও শুধু এটাই ভাবতে থাকে প্রীয়তা এটা, প্রীয়তা ওটা এসব। "

রুবাই ইমরানের কথায় এক প্রকার জ্বলে পুড়ে উঠে বলল, "তাও তো অরুপ প্রীয়কে নিয়ে গবেষণাটা করে। তুমি একটু আমাকে নিয়েও ভাবো। তোমার মনে আছে শেষ কবে তুমি আমার সঙ্গে দুটো রোমান্টিক কথা বলে ছিলে?"

ইমরান যেন ইচ্ছে করে নিজের বিপদ নিজেই ঘাড়ে নিয়ে এলো। ইমরানের এমন পরিস্থিতি দেখে অরূপ হেসে বলল, "যাক আমার তো তাও গবেষণা করার মত প্রীয়তা আছে। মানুষ জন তো এতো আনরোমান্টিক সুন্দরী প্রেমিকা থাকতে ও ফিরে তাকায় না।"

ইমরান দাঁত কিড়মিড় করে শুধু অরুপের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রুবাইয়ের মেজাজের গরম আগুনে এটুকু ঘী ঢালাই তো যথেষ্ট! তবে ওদের কথোপকথন আর বাড়ার আগেই ক্লাস থেকে দৌঁড়ে রাফি এসে ওদের ছয়জনের কোলাহলে যুক্ত হল। খুব কৌতুহল নিয়ে অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল, “কী হইছে? তোদের এত জরুরি ডাকা হলো কেন?”

রাফির প্রশ্নে উপস্থিত আবহ বদলে গেল। সকলেই কিছুক্ষণ নাটকীয় ভঙ্গিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর একে একে সবাই মিলে ঘটনাটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমনভাবে বর্ণনা করল, যেন ওরা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের আবিষ্কারক, এবং এই আবিষ্কারের ফলে তাদের এখন স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হচ্ছে।

রাফি সবটা শুনে, খুশি হবার পরিবর্তে এক রকম ছোটমোটো ডিপ্রেশনে পড়ে গেল। তার চোখ জ্বলে উঠল, সে মুহুর্তেই বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে নেকা কান্না কেঁদে বলল, “তোরা খুব খারাপ! খুব খারাপ! আমাকে তোরা এই গুপ্তধন খোঁজার যাত্রায় নিস নাই কেন? তোরা আমাকে নিলেই পারতি। তাহলে আমিও এরকম সম্মাননা পেতাম। এখন আমার কি হবে আমার!! হিংসে হিংসে তোরা আমাকে হিংসে করিস।"

রাফির এমন জল ছাড়া নাক টেনে হাউকাউ করে কান্নাকাটি দেখে অনেকেই এগিয়ে এলো। কয়েকজন তো হাসি চাপতে গিয়ে কাশতে লাগল। অরুপ রাফির ঘাড়ে হাত রেখে বলল, "থাক রাফি কাদিস না। চোখে জল আসছে না। শুধু অডিও শুনে মজা নেই।"

প্রীয়তা মুখে উড়না চেপে হাসতে হাসতে বলল, "আহারে! এই ছেলের সাথে অন্যায় হয়েছে। আমরা পাপি আমাদের শাস্তি দাও।"

মেঘ বলল, "রাফি, প্লিজ চোখ দিয়ে পানি আসতে দিস না। অডিওই চলতে থাক। নাহলে তোর কান্নায় করিডরের দেয়াল ভিজে গেলে আবার কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের উপরে বন্যায় ভাসিয়ে দেয়ার মামলা দিবে। এরপর উকিল ম্যানেজ করা অনেক ঝামেলা।"

ইমরান মেঘের কথায় সায় দিয়ে বলল, “হ্যা কোর্ট কাচারির খুব ঝামেলা।”

রুবাই এসবের মাঝেই নিজের ফোন বের করে বলল, "এক মিনিট দাঁড়া, তুই যতক্ষণ কাঁদবি আমি ভিডিও করি। একটা দুঃখের গানের সাথে ছাড়লেই ভাইরাল। ক্যাপশন হবে, দেখুন কি দুঃখে কাঁদল রাফি। "

সকলের মশকরার মাঝেই রুশা রাফির নরম স্বরে বলল, "রাফি, তোমাকে ছাড়া কখনোই আমাদের কোন পরিকল্পনা পরিপূর্ণ নয়। এটা ঠিক তেমন কোন সাজানো অনুসন্ধান ছিল না। এটা অগোছালো, যেখানে আমরা শুধু একটা স্রোতের টানে ভাসতে ছিলাম। সীমানা বিহীন গন্তব্যে হেঁটেছি আমরা। তবে তোমাকে ছাড়া আমরা টিকে থাকতাম কিভাবে বলো? একটাও ক্লাস করা, পড়া, নোট এসব তো তুমি দিয়েছো। তাই তো আমরা টিকে আছি এখনো।”

রুশার এই কথা রুবাই মাথা চুলকে ফিসফিসিয়ে বলল, “হ্যা আর আমি এই বান্দার নোটে ডাহা ফেল করে রিটেক গুনছি এখনো।”

প্রীয়তাও রুবাইয়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আমিও।”

রুশা বলতে থাকলো, “আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি এরপর থেকে সকল অনুসন্ধানে তোমার অংশিদারিত্ব সবথেকে বেশি থাকবে। তুমি আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু। তুমি যদি এরকম রিয়াক্ট করো তবে কি আমার ভালো লাগবে।?"

রাফি রুশার কথায় নাক মুছে একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, "সত্যিই?"

রুশা হেসে বলল, "তিন সত্যি।"

রাফির সমস্ত ন্যাকামির নাটক যেন রুশার এইটুকু কথার জন্যই ছিল। সে মুহূর্তে অভিনয় ছেড়ে বলে উঠলো, "আমি তোমাদের জন্য খুব খুশি। তোমরা এমন একটা অসাধ্য সাধন করেছো এটাতে আমার গর্ববোধ হচ্ছে। তবে হ্যাঁ আমি কিন্তু এই প্রোগ্রামে কবিতা আবৃত্তি করবো। আমার নিজের লেখা কবিতা। আমি স্পেশাল তোমাদের এই জয়ের জন্য নতুন কবিতা লিখব।"

ইমরান নিরাশ মুখে বলল, "আবার কবিতা!"

রাফি হেসে বলল, "আজ থেকেই লিখতে শুরু করবো।"

রাফি ঝড়ের বেগের এই মুড পরিবর্তনের সাথে এরা সবাই অবশ্য পরিচিত। এসব নতুন না। এটা রাফির এক প্রকার বাচ্চাদের মতো মনোযোগ নেবার পায়তারা। যেখানেই সবাই তাকে ইগনোর করে কিংবা অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানেই রাফি এভাবে মনযোগ কেড়ে নেয়। এখানে তার নাটকের সমাপ্তির পর তাদের কথপোকথন আর এখানে বাড়লো না। তারা ক্যান্টিনের পথে এগোলো। সেখানেই আড্ডা চলল লম্বা সময়। সবাই দীর্ঘ দিন পর এভাবে একসাথে। সবাই যেন বহুদিন পর আবার বাঁচছে তাদের প্রকৃত জীবনে। সব যেন থমকে গিয়েছিল সময়ের বেড়াজালে। এই বহুদিন পর সকলের সাথে রুশা হাসছে, তার মনের ভার কমছে। এটাই যেন আড্ডার সার্থকতা বাড়িয়ে দিল। সকলের চাহিদার তুঙ্গে এটাও ছিল যে। হঠাৎই অরুপ বলল, "এখানে তেমন মজা লাগছে না। চল, রেড মুনে যাই। কতোদিন যাই না ওখানে।"

রুবাই মুখ দুঃখ প্রকাশ করল, " আরে বাবা, এখন আর সেই দিন নাই। রুশাকে পাহারা দিতে আব্বু এক দেহরক্ষীকে সাথে পাঠিয়েছে। নিজ বাড়িতে স্বাধীনতা খর্ব চলছে।"

ইমরান অবাক চোখে জিজ্ঞেস করল, "এমনটা কেন? রুশার আবার কি এমন ভয়ংকর হবে?"

রুবাই হতাশ কন্ঠে বলল, "আমি কি জানি! আব্বুর মাথায় কি চলছে কে জানে।”

সবাই কৌতুহল নিয়ে নানা প্রশ্ন ছুড়তে শুরু করলো। এই দেহরক্ষী পাঠানোর কারন নিয়েও এক ঝাঁক গবেষণা চলল তাদের। সবাই যেন এখানেও নতুন নতুন রহস্য খুঁজতে ব্যস্ত। শুধু মেঘ ব্যস্ত রুশার চোখের পলক সংখ্যা গুনতে। তবে এ মুহূর্তে যে সে নিজও কিছু করতে পারবে না। এখন তো আর এখানে শুধু তারা দুজন নয়। দুটো পরিবার যুক্ত হয়ে গেছে। মেঘ সব দেখলো, বুঝলো, চুপ করে হিসেব কষে বুঝে নিলো শুধু।

দুপুরের আলো নিভে আসতে আসতেই সবাই যে যার মতো ঘরে ফিরল। দীর্ঘ দিন শেষে আজ আবার সেই পরিপূর্ণতা নিয়ে ঘরে ফেরা। কিন্তু বাড়ি ফিরেই এক অচেনা অস্বস্তি আবারো রুশার বুকের ভেতর ধাক্কা দিতে লাগল। এই রুপমহলের বিলাসবহুল সব রুশার কাছে তিক্ত হয়ে উঠছে। হয়তো এখনো সে টিকে আছে শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। অবশ্য এখানে অবদান রুবাইয়েরও কম নয়। রুবাই না থাকলে এই ইটপাথরের মহলে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যেত রুশার।

বিকেলের বেলা বাড়তেই প্রীয়তার নামে বাহানা বানিয়ে রুবাই ছুটলো ইমরানের সাথে কয়েক প্রহর সময় কাটাতে। এসব অবশ্য সব সময় হয় না। আজ কলেজে অরুপের ঠোকা ঠুকির আর রুবাইয়ের কড়া রাগ সামলাতেই এমন আয়োজন ইমরানের। তবে এটা অবশ্য এখন বেশ প্রয়োজন। এই কয়েকদিনের ঘটনা চক্সে প্রত্যেকটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনটাও তো তোল্লায় উঠেছে। তবে সবাই কি আদৌতেও নিয়মে চলে? ঠিক তেমনি নিয়মের বাইরে গিয়ে অরুপ প্রীয়তার জীবনে বসন্ত চলছে। তারা সব প্রয়োজন অপ্রয়োজনে নিজেদের নিজেরাই সামলে দাঁড়িয়েছে নিয়মের উদ্ধে, সমাজের উদ্ধে।

রুশা নিজের ঘরে বেশ বিরক্ত হয়েই তার বাবার কক্ষের দিকে এগোলো। রুবাই ছাড়া মহলটা যেন কারাগার হয়ে উঠেছে তার কাছে। রুশা তার বাবার কক্ষের সামনে এসেই খানিকটা থমকে গেল। দরজার কপাটে ঝুলছে ভারী একটা তালা। কেউ যেন রুশার অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই তালাটা ঝুলিয়েছে। রুশা একপ্রকার চেঁচিয়ে জেবাকে তলব করলো। জেবা দৌড়ে এগিয়ে আসতেই রুশা জিজ্ঞেস করলো, "এই কক্ষে কে তালা দিয়েছে?"

জেবা একচিলতে দ্বিধা, ভয় নিয়ে বলল, "বড় গিন্নি মা বলেছেন তালা দিতে।"

রুশা চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কোনো বাড়তি কথা না বলে সোজা নেমে এল নিচে। নিচতলায় পৌঁছে হল ঘরে বসা রূপমণি বেগমের সামনে এসে দাঁড়ালো রুশা। ভদ্র, শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আমি আমার বাবার ঘরের চাবিটা চাই। আমি আশা করছি এবাড়িতে অন্ততঃ আমার বাবার ঘরে যাবার অধিকার আমার আছে।"

রূপমণি বেগম বিস্ময়ে ভ্রুঁ তুললেন, রুশার এই তেজ তাকে বড্ড আকৃষ্ট করলো। তিনি মৃদু হেসে বললেন, "আমি তো সেখানে তালা দিতে বলি নি। তুমি আসবে বলে আমি সে ঘর খুলতে বলেছিলাম।"

রুশা একই দৃঢ়তা নিয়ে বলল, "তবে যে জেবা বলছে, বড় গিন্নিমা তালা দেবার আদেশ করেছেন।"

রূপমনি বেগম আর একটু হাসলেন তারপর বললেন, "বড় গিন্নি মা বলা হয় তোমার বড়মাকে।"

রুশা শুধু চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো রূপমণি বেগমের সামনে। রূপমনি বেগম একজন সাহায্যকারীকে বলে দ্রুত তলব করালেন আনজুম আরা বেগমকে। আনজুম আরা বেগম ও খুব দ্রুত সাথে সাথে এসে হাজির হলেন। রুপমনি বেগম তাকে প্রশ্ন করতেই আনজুম আরা বেগম ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, "আমি তালা দিতে বলেছি। বড়খোকা পছন্দ করে না যে ওই ঘর খোলা থাকুক। নানা বাহানায় ঝামেলা করবে, তাই…"

রুপমনি বেগম একপ্রকার হাত তুলে থামিয়ে দিলেন আনজুম আরা বেগমকে। কোন শব্দ উচ্চারণ ছাড়াই শান্তভাবে তাঁর হাত বাড়িয়ে আনজুম আরা বেগমের আঁচলের চাবির গোছা থেকে ওঘরের চাবিটা খুলে নিয়ে রুশার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "আজ থেকে শাহজিনের ঘরে কে যাবে, কে যাবে না তার সম্পূর্ণ দায়ভার তোমার। এখানে কেউ আর হস্তক্ষেপ করবে না।"

রুশার চোখ চকচক করে উঠল আনন্দে। সে গভীর কৃতজ্ঞতায় চাবিটা নিজ হাতে নিয়ে নিলো। রুশা নিজেই নিজের সাথে লড়াই করে, নিজেকে বদলাচ্ছে। নিজের অধিকার বুঝে নিচ্ছে নিজের দমে। চাবিটা যেন তার প্রথম অর্জন। সে এক অজানা টিকে থাকার লড়াইতে লড়ছে প্রতি নিয়তো। রুশা একবার আনজুম আরা বেগমের মুখের দিকে তাকালো। সে যদি চাবিটা নিয়ে জিতে যায় তবে এখানে হেরেছে কে? আনজুম আরা বেগম নাকি তার ছেলে! কিন্তু এ ঘরে তাদের আধিপত্য এতো কেন? এ বিষয়টা কি এই রুপমহলের সাধারণ কয়েকটা বিষয়ের মতো নাকি অন্য কিছু? আনজুম আরা বেগমের মুখের প্রতিক্রিয়া অত্যাধিক স্বাভাবিক। রুশা তার ভাবনা আর না বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে হল ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তেই, রূপমণি বেগম কোমল কণ্ঠে পিছু ডাকলেন, "নীলিমা!"

রুশা ফিরে তাকাতেই তিনি স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে বললেন, "আমি তোমার দাদি আম্মা হই। আমাকে যদি দাদি আম্মা বলে সম্বোধন করো, আমি খুব খুশি হব।"

রুশা সামান্য থমকালো। এই বৃদ্ধ নারীর এরকম কোমলতা ভরা কন্ঠ সে এই প্রথম শুনলো। এই প্রথম হয়তো তিনি রুশাকে তার নামে সম্বোধন করলো। রুশা একটু মৃদু হাসি দিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, “আপনি আমার দাদিআম্মা হন। আপনাকে দাদিআম্মা ছাড়া আর কোন নামে সম্বোধন যে, করার নেই আমার। তবে আপনার কাছে অনুরোধ, আমাকে এসব ছোটবিবি ছোট রাজকন্যা বলে না ডেকে এভাবেই আমার নামে ডাকবেন।”

রূপমনি বেগম শুধু রুশার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি দিনকে দিন এই মেয়েটার প্রতি আরো বেশি অভিভূত হয়ে উঠছেন। রুশা আর কোন কথা না বলে, কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। এরপর সোজা নিজের বাবার কক্ষে গিয়ে আবারো সেই একই বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলো।

বিকেল পেরোতেই শহরের কোণে কোণে নতুন আয়োজন ছড়িয়ে পড়লো। ব্রিটিশ ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ থেকে একে একে ডাকপিয়ন এসে হাজির হলেন শহরের নামিদামি ব্যক্তিবর্গ সহ কলেজের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি পরিবারের দরজায়। হাতে একখানা বিশেষ খাম, সোনালি অক্ষরে খোদাই করা আমন্ত্রণপত্র। খামগুলো পৌঁছাতেই সকলের বাড়ির আবহ যেন একেবারেই বদলে গেল।

ইমরানের বাড়িতে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছাতেই আমিনুল হক একরকম নেচেই উঠলেন। একজন বাবার কাছে তার নিজের সন্তানের বিজয়ের থেকে বেশি খুশির আর কি হতে পারে! তাছাড়া তার জীবনের এত বছরের পরিশ্রম আর কর্তব্যপরায়ণতা যেন হঠাৎ করে পুরস্কৃত হচ্ছে এই একটি দিনে। ছেলের অনুসন্ধান তাঁকে শুধু সম্মানিত করছে না, বরং গর্ববোধ জাগাচ্ছে। তিনি বুক ফুলিয়ে এলাকাবাসী থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধবসহ বংশের প্রত্যেকটা মানুষকে ছেলের এই কীর্তির কথা গর্ব করে জানাতে ব্যস্ত।

অরুপের বাড়ির দৃশ্য সামান্য ভিন্ন। অরুপের বাবা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তার নিকাম্মা, ভন্ড, ধান্দাবাজ সারাদিন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ছেলে এমন কীর্তি ঘটিয়েছে। এটা তাঁর কাছে একেবারেই অকল্পনীয়! কাগজের আমন্ত্রণপত্রে বড় বড় অক্ষরে ছাপানো অরুপের নাম দেখে তিনি চশমা মুছে আবার পড়লেন, যেন চোখকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন জোর জবরদস্তি। আমন্ত্রণপত্রের মাঝে এমন কি আছে যেটা অরুপের বাবা জগদীশ ঘোষ দেখছেন, সেটার চিন্তায়ই অরূপের মা, বোন, ঠাকু’মা সকলেই একরকম ডিপ্রেশন থেকে ঘুরে আসলেন। বেশ লম্বা সময় সকলকে ভাবিয়ে তারপর জগদীশ ঘোষের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি একপ্রকার গর্ব করেই পরিবারের সকলকে ডেকে ডেকে বললেন ছেলের কীর্তি। এই আমন্ত্রণ পত্রের গোছানো পত্রটা দেখেই মুহূর্তেই যেন ছেলের প্রতি জমানো সকল ধারনা এক্কেবারে পাল্টে গেল জগদীশ ঘোষের।

প্রীয়তার বাড়িতেও একই ঘটনা, প্রীয়তার বাবা ডিআইজি পারভেজ সওদাগর কিছুতেই হিসেব কষতেই পারছিলেন না। তাঁর উড়ে বেড়ানো, অবাধ্য মেয়ে যার পড়াশোনা ছাড়া সারা দুনিয়ার সব কিছুতে মন। সে আবার কীভাবে এমন অসাধ্য সাধন করল? অঙ্ক মিলছে না কিছুতেই। তবু সেই আমন্ত্রণপত্রের ঝলমলে কাগজটিই ছিল প্রমাণ, আর সেটা হাতে নিয়ে তিনি শুধু অবিশ্বাসের ভাঁজে ভরা মুখে একরকম গর্বের হাসি লুকিয়ে ফেললেন। আর এই গর্ব আরো বাড়িয়ে দিল তারই ছেলে প্রীতম। প্রীতম তো নিজের বোনের এই কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সম্পূর্ণই অবগত। অবশ্য তার নিজেরও একাংশের হাত আছে এই সফলতার পেছনে। তবে সেসবের দাবীদার সে নয়।

এদিকে মেঘের বাড়িতে একেবারেই ভিন্ন আবহ। তাঁর বাবা-মা যেন সীমাহীন প্রশান্তি নিয়ে আবেগ ঢালছেন। এত বড় কিছু প্রত্যাশা মেঘের তরফ থেকে তারা কখনোই রাখেননি। কিন্তু তারপরেও মেঘ যেই অসাধ্য সাধন করেছে সেটা তো তাদের জীবনের একটা বড় প্রাপ্তি, একটা বড় ব্যর্থতা মুছে মেঘ যেন এক নতুন সূর্য উঠিয়েছে। খুঁজে এনেছে রুশাকে। গুপ্তধনের থেকেও অধিক মূল্যবান তো শাফিন আহমেদের বোনের একমাত্র মেয়ে রুশা। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু আব্দুল্লাহ্ আল হামজা রুশার দায়ভার তো তার উপরেই দিয়ে গিয়েছিল!

রুপমহলের চিত্র আরো খানিকটা ভিন্ন। শাহরিয়ার শেখ আমন্ত্রণপত্র হাতে নিয়ে চোখ ভিজিয়ে উঠলেন আবেগে। নিজের ভাইকে দেশরত্ন উপাধি দেয়া, এ যেন তাঁর কাছে রূপকথার মতো। তিনি একেবারে গর্বে ভেসে উঠলেন। অবশ্য তিনি আরো বেশি খুশি তার নিজের মেয়ে রুবাই তার নিজের ভাইয়ের অনুসন্ধানের পূর্ণতা দিয়ে আজ সম্মাননা পাচ্ছে। বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ হল ঘরে এক হয়ে বসে পড়ল। শাহজিনের স্মৃতির ভাস্কর্য, তাঁর সম্মাননা আর এই আমন্ত্রণপত্র মিলিয়ে যেন রুপমহলটা এক অন্য জগতে পরিণত হলো। শাহরিয়ার শেখ আনন্দে আমন্ত্রণপত্রটা বুকে চেপে ধরলেন। পরিচিত অপরিচিত সকলকে ফোন করে করে এই খুশির সংবাদ টা জানালেন। সাহায্যকারী থেকে শুরু করে বাড়িতে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষকে ডেকে ডেকে জানালেন। নানা পদের মিষ্টির জন্য বায়নাও দিলেন। মহল্লার প্রতিটি ঘরে এই খুশির সংবাদ পাঠানোর জন্য যেন তার এই আয়োজন। বুকভরা উল্লাসে তিনি বড় ছেলেকে ফোন করার জন্য ফোনটা আবার স্ক্রল করতেই হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে এ বাড়ির ছোট কর্তার নাম।

তিনি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ছেলের স্বাভাবিক কণ্ঠে ভেসে এল, "ফেরার সময় হয়েছে। আগামিকাল রাতেই আমার ফ্লাইট।”

শাহরিয়ার শেখের খুশিটা এবার দ্বিগুন বেড়ে গেল। তিনি খুশির সাথে বললেন, “তোমার জন্য আমার কাছেও একটা খুশির সংবাদ আছে। তোমার ছোট আব্বুকে দেশরত্ন উপাধি দেয়া হচ্ছে। আগামীকালই তাঁর ভাস্কর্যের উদ্বোধন অনুষ্ঠান। আর শুধু তাই নয়। তোমার ছোট আব্বুর রুশ অনুসন্ধানের পূর্ণতার স্বীকৃতি দেবে সবাই। রুবাই, নীলিমা, আর তাদের পুরো টিমকে সম্মানিত করা হবে। ভাবতে পারছো, আমার শাহফিনের স্বপ্ন, পরিশ্রমের কদর কি করে মানুষজন করছে!!”

ওপাশ থেকে ভারী কন্ঠস্বর ভেসে এলো, “আব্বু এটা ঈশ্বরেরই বিচার। যোগ্য মানুষকে অবশেষে যোগ্য সম্মানটাই দেওয়া হচ্ছে। কত বছর পর এই সুবিচার! আফসোস একটাই, আমি সেই মহোৎসবের অংশ হতে পারব না। আগামীকাল সকালে আমার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। মিটিং শেষ করেই আমি রওনা দেব দেশের পথে।”

শাহরিয়ার শেখ গর্বে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, “সব সামলে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আমার সিংহ। তোমার এখানে আসাটাই হবে সবচেয়ে বড় উৎসব। তুমি দেশে পা রাখলেই আমার আনন্দ পূর্ণ হবে।"

ওপাশ থেকে আর তেমন কোন কথা শোনা গেল না আস্তে ধীরে ফোনটা কেটে দিলেন শাহরিয়ার শেখ।

চলবে.... 💝

#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ

#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)

#সাদিয়া_তিন্তি

বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক অনুমতি ছাড়া কপি করবেন না।

{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন