ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

১৩তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

১৩.

একে একে তিনটে গাড়ি এয়ারপোর্টের সামনে এসে থামলো। রুশা এই কয়েকদিনে একটা বিষয় বুঝে গেছে যে, এই রুপমহলবাসির প্রয়োজনের তুলনায় লোক দেখানো ব্যপারটা অত্যাধিক বেশি। সকলেই গাড়ি থেকে নেমে এয়ারপোর্টের ভেতরের ওয়েটিং জোন অব্দি গিয়ে দাঁড়ালো। এর বেশি প্রবেশাধিকার জনসাধারণের নেই বলা চলে। জায়গাটা ভীষণ ব্যস্ত, মানুষের কোলাহল, শত শত মানুষের প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা, আরো কতো কি! সাথে আবার ট্রলি ঠেলার শব্দ, ঘোষণা মাইকে ভেসে আসছে আগমন প্রস্থানের খবর, সব মিলিয়ে যেন এক উত্তেজিত মহল।

পরিবারের সবাই এই ভিড়ের মাঝে অপেক্ষা করতে করতেই মিনিটগুলো দীর্ঘ হতে লাগলো। প্রত্যেকের চোখ প্রধান গেটে নিবদ্ধ। রুশার হিসেব মেলে না এই একটা মানুষকে নিতে বাড়ি ভর্তি মানুষ গুলো কেন এসেছে! যে কোন এক কিংবা দু’জন এলেই হতো!! তা না গুনে গুনে মোট ১৪ জন! বাড়াবাড়ি মানে অত্যাধিক বাড়াবাড়ি।

হঠাৎ সকলের অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলো একজন। উপস্থিত সবার উত্তেজনায় রুশার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, উনিই সকলের চির প্রত্যাশিত ব্যক্তি। বাকি দশটা মানুষের মতো রুশার চোখও সামান্য থমকালো এই মানুষটাকে দেখে। মানুষটা অত্যাধিক সুদর্শন, অথচ ব্যক্তিত্বে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। এটাকে ঠিক দৃঢ়তা নয়, রহস্যময়ীতা বলে বোধহয়। লোকটার উচ্চতা এবং অত্যাধিক পরিপাট্য তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে রাখছে। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে রাখা ব্লাক স্যুটটা অবহেলায় ঝুলছে। তার সাদা শার্টের কলারের কর্নারে এক ধাতব কিছু লাগানো, হাতা কুনুই অব্দি গোটানো। গোটানো হাতার ফাঁক তলে কিছু একটা আঁকিবুঁকি বেরিয়ে আছে। বোধহয় সাপের মাথা জাতীয় কোন ট্যাটু করা। লোকটার বাম কানে ছোট্ট একটা কালো টপ। চোখদুটো গভীর, কালো, যেন গহ্বর, যেখানে একবার তাকালে আর ফেরার পথ নেই। নিয়মতান্ত্রিক চুলগুলো কপালে আলতো গড়িয়েছে। গালের ধার ঘেঁষে হালকা দাঁড়ি বড্ড শৃঙ্খলায় কাটা। সব মিলিয়ে লোকটাকে বাংলার প্রথাগত পুরুষদের ভিড় থেকে আলাদা করা যায়। একে বাঙালি না বলে, যে কোন দেশের অধিবাসী বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যাবে। লোকটার পিছে আরো দুজন খুবই গোছানো পরিপাটি ব্যক্তি সাথে সাথেই এগিয়ে আসছে। এরা বেশি সম্ভব, এই লোকের ডান হাত বাম হাত টাইপ কিছু হবে। জিনিসটা দেখতে ড্রামাটিক হতে পারে তবে বাস্তবে দেখে অত্যাধিক গম্ভীর লাগছে।

রুশা মুহূর্তে উপলব্ধি করলো এই মানুষকে নিছক সুদর্শন বলা অন্যায় হবে না। তবে লোকটার উপস্থিতিতে কেমন একটা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হলো যেন। রুবাই ছুটে গিয়ে লোকটাকে জড়িয়ে ধরলো, চারদিকে পরিবারের সকলে লোকটাকে ঘিরে ধরলো। শাহরিয়ার শেখ সহ সকলেই বারি বারি করে গলা মেলালো। আরো কতো আদর! হাজার হোক রুপমহলের একমাত্র উত্তরসূরী। উনিই রুবাইয়ের বড় ভাই, রূপমহলের গৌরব, আর বংশের সবচেয়ে প্রতাপশালী একমাত্র উত্তরসূরী শেহতাজ শেখ। রক্তে জমিদারি ঐতিহ্যের অহংকার ও হিংস্রতার স্রোত এমনভাবে বইছে যে, তাকে মহলের সবাই বংশের বাঘ বলে সম্বোধন করে। তাকে জন্ম থেকেই আলাদা করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিদেশে পাঠানো হয়েছিল পড়াশোনার জন্য, কিন্তু পড়াশোনার পাতার চেয়ে তার দৃষ্টি বরাবরই পড়ে থাকত পারিবারিক ব্যবসার দিকে। বিশেষ করে হীরের প্রতি তার অদ্ভুত এক অনুরাগ যেন শিরায় রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। শেহতাজের কাছে হীরা নিছক ব্যবসা নয়; বরং এক শিল্প, এক আবেগ এবং এক চিরন্তন শাসনক্ষমতার প্রতীক।

পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখেই সে নেমে পড়েছিল পারিবারিক হীরের সাম্রাজ্যে। অদ্ভুত বুদ্ধি, ঠান্ডা হিসাব, আর ঝুঁকি নেওয়ার দুর্ধর্ষ ক্ষমতায় অল্প সময়েই ব্যবসাকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিল, যেখানে তার সমকক্ষ কেউ দাঁড়াতে সাহস পায় না। শেহতাজের চেহারার গাম্ভীর্য, কণ্ঠের দৃঢ়তা, প্রতিটি চলাফেরায় এমন এক রাজকীয় দাপট, যা দেখে মনে হয় হাসিটাই বোধহয় তার কাছে ট্যাক্স সাপেক্ষ কোনো বিলাসিতা।

রুশার কাছে শেহতাজ নিছক এক বিদেশফেরত উত্তরসূরী নয় বরং কোন অশান্তির উৎস বলে অনুভব হলো। রুশা দাঁড়িয়ে রইল কিছুটা দূরে। ওর নিজেকে এ পরিবেশে বড্ড বেমানান লাগছে। এরা সবাই ওর আপন। এই অপরিচিত লোকটাও ওর আপন। কিন্তু ওর দূর্ভাগ্য ও কাউকে চেনে না। সবাই অত্যাধিক অপরিচিত। এসব পারিবারিক মিলনমেলা চলার মাঝেই, শেহতাজ সকলের কথাকে উপেক্ষা করেই রুশার দিকে তাকালো। তার নজরে রুশা একটু বেশি চুপসে গেল। শেহতাজ লোক ভিড় ছেড়ে এগিয়ে এসে রুশাকে বলল, “ছোট রাজকুমারী!!”

শাহরিয়ার শেখ হেসে এগিয়ে এসে বললেন, “বল এবার কে জিতলো?”

শেহতাজ গাম্ভীর্য রেখেই বলল, “আপনি ছাড়া আর কে জিততে পারে এসব বাজিতে!”

রুশাসহ উপস্থিত সবাই অবাক চোখেই শেহতাজের দিকে তাকিয়ে রইলো। শেহতাজ রুশার দিকে একটু ঝুঁকে বলল, “আমাকে তোর মনে নেই তাই না!”

রুশা একেবারে প্রতিক্রিয়া শূন্য হয়ে পড়লো। তার ঠিক কি বলা উচিৎ? নিজের পরিচয় দেয়া উচিত, নাকি চুপ করে থাকা উচিত? রুশা শুধু কুঁকড়ে মুখে সম্মোধনী হাসি টেনে দাঁড়িয়ে রইলো। শেহতাজ গভীর চোখে কিছুক্ষণ রুশাকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। সে হয়তো আর কিছু বলতেও যাচ্ছিল, কিন্তু শাহরিয়ার শেখ তার বলার আগেই বলে উঠলেন, “তোমার দাদিআম্মা মহলে অপেক্ষা করছেন। বাড়িতে গিয়ে নীলিমার সাথে যতো ইচ্ছে পরিচয় হয়ে নিও।”

শেহতাজ বাবার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। চোখেমুখের সেই রহস্যময় ভাব এক নিমিষে ঢেকে গেল। আর কিছু না বলে স্রেফ মাথা নাড়লো। এরপর মুহূর্তে সকলে মিলে এয়ারপোর্টের পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকেই রওনা হলো রূপমহলের উদ্দেশ্যে।

কালো গাড়ির বহর রূপমহলের আঙিনায় ঢুকতেই চারপাশে এক ধরনের চাপা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। শ্বেতপাথরের বারান্দা, লাল ইটের উঁচু প্রাচীর আর ঝাড়বাতির আলোতে ঝলমল করে উঠল মহলের রাত। যেন বাড়িটাও অপেক্ষা করছিল শেহতাজের জন্য।

গাড়ি গুলো থামতেই প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলেন রূপমণি বেগম। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে শেহতাজকে দু’হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন। চারপাশে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি যেন আরো উৎসবমুখর করে তুলল পরিবেশকে। এই সব কোলাহলের মাঝেই রুশা গাড়ি থেকে নেমে নিঃশব্দে ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে নিজের কক্ষে গেল। সে ঘরে ঢুকে জানালার পাশে দাঁড়ালো একটুক্ষন, বাইরের রঙিন আলো, মানুষের হট্টগোল সব যেন তার কাছে অচেনা এক নাটকের মতো লাগছে। আর এই নাটকে সব থেকে বেশি জঘন্য অভিনয় সে করছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করতে করতে ক্লান্ত, কেন এসব সহজে গ্রহণ করতে পারছে না সে!! তার ঠিক কি করা উচিৎ? তার ভাবনার সাথে সে একা পড়ে রইলো নিজের কক্ষে। নিচে অবশ্য আয়োজন থেমে থাকলো না এক মুহূর্তের জন্যও। রুবাই একেবারে ভাইয়ের ছায়া হয়ে বসে রইলো।

সব আনুষ্ঠানিকতার ভিড় শেষে শেহতাজ ধীরপায়ে নিজের কক্ষের দিকে এগোলো। শেহতাজ এবার একা আসেনি। প্রতিবার অবশ্য একাই আসে। এবার তার ছায়াসঙ্গী কারান আর আরফিকেও দেশ ভ্রমণে এনেছে।

কারানকে দেখলে অবশ্য এলাকার লোকাল গুন্ডা ভাইব পাওয়া যায়। তার নাম অবশ্য কামরুল ছিল কোন এক যুগে। তবে অস্ট্রেলিয়ার হাওয়া লাগতেই সেই কামরুল কারানে পরিনত হয়েছে। ২৮/২৯ বছরের ছেলেটাকে দেখলে একেবারেই বেকার কিংবা অকাজের অনুভব হবে। তবে কারান বড্ডো কাজের। শেষ ৮ বছর ধরে শেহতাজের ছায়াসঙ্গী হয়ে আছে এই ছেলেটা। ছোট জুয়ার ক্যাসিনোতে ফেসে গিয়ে জেলে বন্দী অবস্থায় শেহতাজ ওকে মুক্তি দিয়েছিল। সাথে অর্থ, সম্মান আর নির্ভরতা। সেই থেকে শেহতাজ ওর গুরু।

আর আরফি! সে এক ভিন্ন জগতের মানুষ। তার রক্তে বাঙালিত্ব থাকলেও বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। বাবা খাঁটি বাঙ্গালী আর মা অস্ট্রেলিয়ান। সে হিসেবে, চেহারায় সামান্য বাঙালির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে সেই বিদেশি ছোঁয়া স্পষ্ট। ভীষণ ঠান্ডা মেজাজের, হিসেবি আর প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। আরফির সাথে শেহতাজের বন্ধুত্ব অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার খাতিরে। একে সহকর্মী থেকে বন্ধু বেশি বলা যায়। আরফির বাবা মা এক এক্সিডেন্টে মারা গেলে আরফির পাশে যে একমাত্র ছিল সে হচ্ছে শেহতাজ। আর এরপর থেকে আরফিও আর এই মানুষটা থেকে নিজেকে সরাতে পারে নি। শেহতাজ অবশ্য নিজেও এই দুটো মানুষকে অন্ধবিশ্বাস করে। এরা দুজন শেহতাজের দুই অংশ। তাদের আপ্যায়নের কোন কমতি রইলো না। উপরতলার শেহতাজের পাশের ঘরটাই তাদের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে। এই সমগ্র দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন শেহতাজের মামা আশরাফ আলী। এই মামা ভাগ্নের সম্পর্ক অবশ্য ছোট বেলা থেকেই সব থেকে আলাদা। আশরাফ আলীকে এক প্রকার যৌতুক হিসেবেও ধরা যায়। শাহরিয়ার শেখ যখন আনজুম আরা বেগমকে বিয়ে করে এই মহলে আনেন তখন তিনি বউয়ের সাথে শালা ফ্রি পেয়েছিলেন। সেই থেকে আশরাফ আলীর ঘর বাড়ি সংসার সবটাই রুপমহলে। শেহতাজ জন্মানোর পর অবশ্য তার বেকার দিন গুলোতে আলো এসেছেছিল। শেহতাজের করা সব গুলো অন্যায় কিংবা পাপ সব মাটি চাপা দেবার দায়িত্ব তিনি নিজ মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। তার প্রধান কাজই ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের মতো। যতো বড় ঝাই ঝামেলাই হোক শাহরিয়ার শেখের কাছে তথ্য প্রকাশ করতেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে। তার গিন্নি সালমা খাতুনের অবশ্য কোথাও কোন অংশগ্রহণ নেই। তিনি নিজেকে নিয়ে এতো ব্যস্ত যে তার পৃথিবী তিনিময়। তার জীবনের একমাত্র চাহিদা সৌন্দর্য আর প্রশংসা।

বড় হলঘর, বারান্দা সব জায়গায় মানুষের ভরপুর। কোলাহলে রূপমহলটা যেন নতুন রুপ পেয়েছে বহু বছর পর। তবুও সব কোলহলে কি মানুষের জীবনটাতেও কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠে? মনের সুখ যদি আমাদের ব্যক্তিগত না হয়, তবে বাইরের আনন্দ ঠিক কতটা আমাদের ছুঁতে পারে? এই ভিড়ের মাঝেই রুশা যেন সব থেকে একা। বাড়ি ভত্তি প্রত্যেকটা মানুষ মেতে উঠেছে শেহতাজকে নিয়ে। তাকে নিয়ে অবশ্য টানাহেঁচড়া কম হচ্ছে না! তারপরও বিষন্নতা তাকে আপন করে নিয়েছে যেন।এক বিভীষিকাময় একাকিত্ব বুকে নিয়ে রুশা তার কক্ষের বিদ্যুতের নরম আলোয় বসে রইল। ঠিক তখন প্রীয়তার নাম স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করল, পার্সোনাল ভিডিও কল। সাধারণত ওরা গ্রুপ কলই করে, তবে আজ প্রীয়তার পার্সোনাল কল দেখে রুশা খানিকটা অবাক হয়ে রিসিভ করলো। রুশার কণ্ঠটা বেশ ভার করে বলল, “প্রীয়, তুই?”

প্রীয়তার মুখটা স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কৌতূহল নিয়ে, “কী খবর? রুবাইয়ের ড্রাকুলা ভাই এসেছে?”

রুশা অল্প হাসার চেষ্টা করে বলল, “অনেকক্ষণ আগে এসেছে। কালকে প্লিজ সকাল সকাল চলে আসিস। এত ভিড়ের মাঝে আমার ভালো লাগছে না।"

প্রীয়তা রুশার চোখে মুখের বিষণ্ণতা দেখে জিজ্ঞেস করল, "কিছু হয়েছে? তোর চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?"

রুশা মাথা নাড়িয়ে বলল, "কিছু হয়নি। আমি… আমি এই বাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি প্রীয়। কিন্তু মাঝে মাঝে অপরিচিতদের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি।"

প্রীয়তা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "রুশা, আমি তোকে শুধু একটা কথাই বলব, মেনে নে। তুই যদি মেনে না নিতে পারিস তবে এই পরিবেশ তোর গলার কাটার মত আটকে থাকবে। কিছু সময় মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে যে আর কোন উপায় থাকে না।"

রুশা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল, "আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি রোজ নিজেকে বলি, আমি মেনে নিয়েছি, আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু দিনশেষে আমি ঠিক একই জায়গায় নিজেকে পাই। আমার বারবার মনে হয় এসব আমার কিছুই নয়। আমার কাউকে মনে পড়ে না, একটা কারো একজনেরও চেহারা আমার মনে পরেনা। সামান্য যদি অস্তিত্ব থাকতো মস্তিষ্কে তবুও হয়তো মেনে নেওয়াটা সহজ হয়ে যেত। আজ যখন রুবাইয়ের ভাই এসে অবাক চোখে তাকিয়ে ছোট্ট রাজকুমারী বলছিল। বিশ্বাস কর প্রীয়তা, আমার ভয় লাগছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি তো সে নই। আমি এই মানুষটাকে চিনি না।"

প্রীয়তা শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, “রুশা এসব তোর ট্রমার কারণে হচ্ছে। বিশ্বাস কর সব ঠিক হয়ে যাবে। আর আমি কাল সকাল সকাল চলে আসবো। তোকে একদমই একা থাকতে হবে না। তাছাড়া রুবাইয়ের বাচ্চা কোথায়?”

"কি জানি! বাড়িতে ফেরার পর থেকে তার দর্শন পাইনি।"

"ঠিক জানতাম, ভাই এসেছে তাই খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা ওর ভাই কি আসলেও খুব ভয়ংকর দেখতে? তুইও যে ভয় পাচ্ছিস?"

রুশা হেসে বলল, "ভয় পাচ্ছি না। আমি সম্পর্কের ওজনটা নিতে পারছি না। আমার নিজেকে বেমানান, অপরিচিত মনে হচ্ছে। এ বাড়িতে শুধু একটা ঘরই আমার নিজের আপন মনে হয় জানিস। সেটা আমার বাবার ঘর। আর এই ঘরটাই আমি মানিয়ে নিচ্ছি। এখনো আপন পর কিছুই মনে হয় না। কিন্তু বাবার ঘরটা আমার ব্যক্তিগত মনে হয়।"

প্রীয়তা হেসে বলল, "তবে তো তোর নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা আছে এখন ওই বাড়িতে। যেহেতু তোর বাবার ঘর ওই বাড়িতে আছে ওই বাড়িটা তোর রুশা। এভাবে মানিয়ে নে।"

আর সামান্য কিছুটা কথোপকথন বাড়ার পরেই তাদের কথা শেষ হলো। রুশা দীর্ঘ দিন ঘুমায় না। রাত তার জন্য দিনকে দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। শুলেই যেন তার বাস্তবতা স্বপ্ন হয়ে ভয় দেখায়। রুশা আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করেই নিজেকে ঘুমের কাছে সমর্পণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু মন তো আর সহজে দমে যায় না। ভাবনাগুলো ভোরের শিশিরের মত জানালার কাঁচে জমে রইল। তবুও অবশেষে এক ধরনের ক্লান্ত আধো আধো ঘুম তাকে গ্রাস করল।

রাত সামান্য বাড়তে রুবাই তার বড় ভাইয়ের সাথে সময় কাটিয়ে ফিরলো। নিজের ঘরে ফিরার পথে অবশ্য একবার থমকে দাঁড়ালো রুশার ঘরের দরজায়। তবে নিস্তব্ধতা এতো বেশি যে সে নিজের ঘরে ফিরে গেলো।

রাতটা ধীরে ধীরে পার হলো যেন অলস কচ্ছপের পদক্ষেপে। অন্ধকার গলে প্রথম আলোর রেখা ফুটতেই রুশার আধোঘুম ভেঙে গেল। ঘড়িতে তখনো ফজরের আযানের কিছুটা আগের সময়। রুশা দেরি না করে ওযু করে সোজা নামাজ কক্ষে ছুটলো। দীর্ঘ সময় নামাজ শেষে নামাজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে হলঘরে এসে দেখল, আরফি একা একা পায়চারি করছে। চুল এলোমেলো, মুখে বিরক্তির ছাপ। এই লোকটাকে কাল শুধু সে শেহতাজ আসার সময় একবার দেখেছে। আর জেনেছে এ তার বন্ধু। তাছাড়া কোন কথপোকথন তো দূরে থাক পরিচয় অব্দি হয় নি তারা। লোকটাকে দেখতে খারাপ নয়। সব থেকে আকর্ষণীয় আরফির চোখের রঙ। যেটা সামান্য ধূসর। রুশা লোকটার দিকে একবার না ফিরে তাকিয়েই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

আরফি রুশার উপস্থিতিতে যেন সামান্য সস্তি পেলো। সে পিছু ডেকে বলল, “এই, শুনছো? নীলিমা.. সরি সরি.. প্রিন্সেস।” পেছন থেকে আরফির ডাকে থমকে দাঁড়াল রুশা। না এই লোকটার সঙ্গে তো কাল তার পরিচয় হয়নি। সে তবে তার নাম কি করে জানে! রুশা ফিরে তাকাল। চোখেমুখে বিস্ময়, “জ্বি!”

আরফি ভীষণ অসহায় গলায় বলল, “আই এ্যাম সো সরি।‌ আই নো আই এ্যাম ডিস্টার্বিং ইউ বাট... আই নিড ইউর হেল্প।"

রুশা সিঁড়িতে না উঠে সিঁড়ি থেকে আরও দু'কদম এগিয়ে আরফির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "কি সাহায্য চাই আপনার?"

আরফি পেট চেপে ধরে মুখে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলল, “আমার পেটের ভিতরে ট্রাকের হর্ন বাজছে, কিন্তু রাস্তা নেই। বুঝতে পারছেন অবস্থাটা?”

রুশা অসহায় দৃষ্টিতে আরফির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই নমুনাটা রাফির ভাই ব্রাদার নাকি!! পেটের ভেতরে ট্রাকের হন। আরফি আবার বলল, "একচুয়ালি, আমি অনেক বছর পর বাঙালি খাবার খেয়েছি। আমার সহ্য হয়নি।"

রুশা প্রথমে গম্ভীর থাকলেও আরফির মুখভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল, “পেট খারাপ ?”

আরফি চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এই! এত জোরে বলবেন না! আমার ইজ্জতই শেষ!”

রুশা মাথা নেড়ে বলল, “আমি জানি না এসব ঔষধ কোথায় আছে। আপনি একটু দাঁড়ান আমি দাদিআম্মাকে জিজ্ঞেস করে আসছি।”

রুশা আবার নামাজ ঘরে প্রবেশ করলো। রুপমনি বেগম তখন কোরআন পড়ছেন। আরো বেশ অনেক মানুষ নামাজ ঘরে নামাজে মনোযোগী তখন। রুশা সকলকে এড়িয়ে রুপমনি বেগমকে গিয়ে সমগ্র ঘটনা বিস্তারিত জানালো। তিনি তার একজন সাহায্যকারীকে পাঠিয়ে ওষুধ আনিয়ে দিলেন। ঔষধ হাতে নিয়ে রুশা আবার হলঘরে ফিরল। আরফি তখনও পেট চেপে রেখেছে এক হাতে আর অন্য হাতে ভর দিয়ে সোফায় বসার চেষ্টা করছে। রুশা এগিয়ে গিয়ে খাবার ঘর থেকে এক গ্লাস পানি এনে পানি সমেত ঔষধটা দিয়ে চুপচাপ নিজের কক্ষে ফিরলো। আরফিকে সামান্য শুকরিয়া জানানোর সময় কিংবা সুযোগটাও দিলো না।

চলবে.... 💝

#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ

#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)

#সাদিয়া_তিন্তি

বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক অনুমতি ছাড়া কপি করবেন না।

{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন