১৬.
রুশা নিঃশব্দে তার বাবার কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষের ভেতরটা অত্যাধিক ঠান্ডা। সে কক্ষের পাশে রাখা আরামকেদারায় বসলো। চেয়ারটা যেন এখনো তার বাবার উষ্ণতা বহন করছে, নিঃশব্দ স্নেহে তাকে জড়িয়ে ধরছে। অনেকক্ষণ সে চুপচাপ বসে রইল। ঘরের দেয়ালে অসংখ্য ছবি। তার বাবা মায়ের খুনসুটি ভরা মুহূর্ত গুলো স্তব্ধ হয়ে আছে। এই ছবিগুলো যেন জীবন্ত প্রমাণ তার বাবা তার মাকে ঠিক কতটা আগলে রাখত। রুশা একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো। সে এই ঘরটায় শান্তির আশ্রয় খুঁজছে। কিন্তু তার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তি কিছুতেই কমছে না। রুশা হঠাৎ উঠে গিয়ে বেলকনির দরজাটা ঠেলে দিল। বাইরে রাত তখন নিস্তব্ধ, আকাশে চাঁদ আধো মুখ লুকিয়ে রেখেছে। মহলের বাগান অন্ধকারে ঢেকে আছে, শুধু ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকির আলো ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলছে নিভছে। গভীর শ্বাস নিয়ে রুশা যেন বুকের ভেতরের সব ক্লান্তি নামিয়ে রাখল। ঠাণ্ডা বাতাসে কপাল ভিজে উঠল, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই মুছে গেল না। সে ফিরে এসে টেবিলের সামনে বসল। টেবিলের ওপরে পড়ে আছে সেই পুরনো বই “রূপনগরের ইতিহাস”। সে আলতো করে মলাটে হাত বুলিয়ে বই খুলল। পৃষ্ঠাগুলো জীর্ণ, কালি হালকা ম্লান, অথচ অক্ষরের ভেতরে অদ্ভুত দৃঢ়তা। তার বাবার হাতের কলমের দাগ স্পষ্ট, কোথাও লাল দাগ, কোথাও আন্ডারলাইন, কোথাও আবার ছোট্ট লেখা, যেন নিঃশব্দে নিজের ব্যাখ্যা টেনে গেছে। রুশা আঙুল দিয়ে দাগানো শব্দগুলিকে ছুঁয়ে দেখল, যেন বাবার হাতের স্পর্শ হাতে লেপ্টে নিচ্ছে। প্রতিটি দাগ যেন তার বাবার গভীর কোনো অজানা অনুসন্ধান। পৃষ্ঠাগুলো একের পর এক উল্টাতে উল্টাতে থাকলো। এ কক্ষে কিংবা এবাড়ির আনাচে কানাচে রুশা এক অদ্ভুত নিয়মে তার বাবাকে খুব গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। কিন্তু মায়ের অনুভবটা সম্পূর্ণ শুন্য। মায়ের বেলায় বরাবরই তার চোখে ভেসে ওঠে শশী রহমানের মুখটা। এটা হয়তো তার মনের দোষ। তাছাড়া সে তো তার মায়ের ব্যাপারে ঠিক কিছুই জানে না। যা জানতো সব তো ভুল, মিথ্যে। বছর বছর পেরিয়ে এখন সে নতুন করে জানছে সব।
রুশা বইয়ের পাতায় মনোযোগী হলো। ইতিহাস বরাবরই রুশাকে আকর্ষিত করতে স্বার্থক। রুশা বইয়ের উপর ঝুঁকে থাকতে থাকতে প্রায় রাত শেষের দিকটায় অদ্ভুত এক ক্লান্তিতে আড়ষ্ট হলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো আর মাথা ভারী। সে আর নিজের ঘরে ফেরার শক্তি পেল না। অবশ্য মন টানছেও না। রুশা নিঃশব্দে উঠে বাবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। অনেক দীর্ঘ, অস্থির দিনের পর যেন ঘুম হঠাৎ এসে তাকে ছুঁয়ে দিল। খুব গভীর নয়, তবে শান্তির ঘুম যেন বহুদিন পর দুঃশ্চিন্তার বোঝা তার মাথা থেকে সরিয়ে তাকে আদরে আগলালো। বেশ লম্বা ঘুম, কোন স্বপ্ন তাকে জ্বালাতে এলো না বহু দিন পর। এভাবেই রাতটা কখন কেটে গেল রুশা জানে না।
সকালের আলোর প্রখরতার চেয়েও বেশি অনুভব হলো কারো উপস্থিতি। ঘুমের ঘোরেই যেন স্পষ্ট টের পেতে থাকলো তার ঘরে কেউ হাঁটছে। তাকে কেউ অপলক দেখছে। রুশা এই অনুভূতি থেকেই জোর জবরদস্তি করে নিজের চোখ খুলতেই চমকে উঠল। সকালের আলো হালকা সোনালি আভা ছড়াচ্ছে পর্দার ফাঁক গলে। আর সেই আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল শেহতাজের অবয়ব। শেহতাজ টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ স্থির তার উপর। তার চোখে মুখে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নেই। বড্ড শান্ত, শরীর হিম করা তার দৃষ্টি। রুশা এক ঝটকায় উঠে বসলো। চোখে মুখে ঘুমের ছাপ, তবে ঠোঁটে বিস্ময়। রুশার মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ বের হলো না। আর এই নীরবতা ভাঙল শেহতাজই। ঠোঁটে কুটিল এক রেখা টেনে বলল, “ঘুম ভালো হয়েছে?”
রুশার মনে একরাশ বিরক্তি জমল। গলা খানিকটা কড়া হয়ে উঠল, “একটা মেয়ের ঘরে প্রবেশের আগে নক করতে হয়, আপনার জানা আছে হয়তো?”
শেহতাজ ভ্রু উঁচু করে হালকা হেসে বলল, “ঘরটা যদি সত্যিই কোনো মেয়ের হতো, তবে নিশ্চয়ই সব ফর্মালিটিজ মানা যেত।”
রুশা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমাকে কি আপনার মেয়ে মনে হয় না?”
শেহতাজ চোখ সরাল না, বরং কুটিল হাসিটা আরও গাঢ় হলো। ঠাণ্ডা স্বরে বলল, “এই ঘরটা কোনো মেয়ের মনে হয় না।”
রুশা এদিক-ওদিক তাকাল। সত্যিই তো, সে তার বাবার ঘরে আছে। হঠাৎ মনে পড়ল, গতরাতে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল। সে তো ঘুমাতে আসে নি এই ঘরে! শুধু সময় কাটাতে এসেছিল। পরে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রুশার বুকের ভেতর অস্বস্তি আরও গাঢ় হয়ে উঠল। শেহতাজকে উদ্দেশ্য করে একটা শব্দও বলতে ইচ্ছে করলো না। লোকটার চোখ মুখের ভঙ্গি স্পষ্ট বলছে, লোকটা অত্যাধিক বেপরোয়া। যেকোনো কথার উল্টোপাল্টা জবাব মুখের সামনে ছুঁড়ে মারবে। তাছাড়া শেহতাজকে দেখলেই কেমন একটা ভয় ভয় অনুভব হতে শুরু হয় রুশার। রুশা আর এ ঘরে থাকতে পারল না। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে নিজের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়ালো। শেহতাজ সেই একই দৃষ্টি রেখে তাকিয়ে রইলো রুশার দিকে। রুশার এমন অস্বস্তি, তাকে এড়িয়ে যাওয়া, গুরুত্বহীন করে রাখাটাই যেন শেহতাজকে রুশার প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট করছে। রুশা দরজার কাছে গিয়ে একবার পিছু ফিরে তাকালো। শেহতাজ যেন জানতো সে ফিরে তাকাবে। তাই রুশা তাকাতেই তার হাসিটা চওড়া হলো। এই সামান্য হাসিটায় রুশার বুকের ভেতর কেমন এক ঠাণ্ডা আবহ জমে উঠলো। সে এক প্রকার তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।
শেহতাজ ওই ঘরেই রয়ে গেল লম্বা সময়। দেশে এলে অবশ্য যতোক্ষণ সে বাড়িতে থাকে ততোক্ষণ এই ঘরটাই তার একমাত্র আস্তানা। শাহজিন শেখ কিংবা আব্দুল্লাহ আল হামজা, সে যে নামেই ডাকা হোক। লোকটা শেহতাজের ছোট আব্বু। শেহতাজের এক মাত্র আদর্শ। সে ছোট থেকেই এই মানুষটার মতো হবার স্বপ্ন দেখেছে। তার স্টাইল থেকে শুরু করে, পছন্দ অপছন্দ সবটাই অক্ষরে অক্ষরে কপি করা তার নেশার মতো ছিল শেহতাজের। হয়তো এই নেশা নিজেই ধরিয়ে গিয়েছিলেন, তার ছোট আব্বু। অত্যাধিক স্নেহ, মমতায় আগলে রেখেছিলেন তিনিই শেহতাজকে। শেহতাজের ছোট্ট মস্তিষ্ক ওই স্নেহের সাথে সকলকে তুলনা করেও তার উর্ধ্বে কাউকে তুলতে পারেনি। তার মৃত্যুটাও শেহতাজের জন্য ছিল ভয়ংকর। শেহতাজের বয়স তখন কতই বা? ৯ কিংবা ১০! সময় গড়িয়ে গেছে। সে সব পুরোনো হয়েছে, তবে পুরোনো সব কি আদৌতেও পুরোনো হয়?
এদিকে রুশা নিজের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে ওয়াশরুমে ছুট লাগালো। বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখল, চোখের কোণে অদ্ভুত ক্লান্তি, ঠোঁটে চাপা বিরক্তি। তার শুভ্র মুখটা অত্যাধিক শুভ্র হয়ে আছে। যেন মনে হচ্ছে রক্তশূন্যতার রোগি সে। রুশা সাথে সাথে কলের পানি ছিটিয়ে মুখটা ভিজিয়ে নিলো। কয়েকবার লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে আয়নায় নিজের চোখে চোখ রেখে বলল, “এই মানুষটার ব্যবহার আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এভাবে তাকিয়ে থাকা, এভাবে ঘরে ঢুকে পড়া, কোনো মানেই হয় না। ম্যানার লেস লোক একটা। আমার ঠিক কি করা উচিত?”
রুশার প্রশ্নের জবাব এলো না। সে নিজের ঘরে প্রবেশ করে মুখটা মুছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ফোনটা হাতে নিতেই চমকে উঠল। একের পর এক মিসড কল, সব মেঘের। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। দ্বিধা না করে কল ব্যাক করল সে। ওপাশ থেকে মেঘের স্পষ্ট শান্ত কন্ঠস্বর, “ঘুম ভেঙেছে মহারানী?”
রুশা একটু থেমে নরম স্বরে বলল, “আজ বাবার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম … ভালো লাগছিল না। ফোনটা আমার ঘরে ছিল তাই কল গুলো দেখিনি।”
“যাক। অবশেষে ঘুম তোমার চোখ ছুঁলো।”
রুশা মৃদু হেসে বলল, “একদম ঠিক বলেছো। অবশেষে সত্যিই ঘুম আমাকে আপন করলো।”
মেঘও হেসে বলল , “এখন ফ্রেশ হও। আজ কলেজে আসবে না?”
"হ্যাঁ। তৈরি হয়ে গিয়েছি।"
"ঠিক আছে। এসো। কিছু একটা আছে তোমার জন্য।"
রুলা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “কিছু একটা!! সেটা কি?”
মেঘ তার ঠান্ডা আওয়াজে বলল, “আগে এসো। তারপর।”
রুশা আর কথা বাড়ালো না। “ঠিক আছে।” বলেই কলটা শেষ হয়ে গেল। মেঘের সাথে খুব সামান্য সময় কথা হলেও রুশা একদম চনমনে হয়ে উঠলো। এটা বোধহয় তার মস্তিষ্কের খেলা, মেঘ মানেই তার মনের সব অস্বস্তিদের তাড়িয়ে সে একাই জায়গা করে নেয়।
রুশা বেশি না ভেবে দ্রুত রেডি হলো। সাদা কুর্তা আর হালকা নীল ওড়না গায়ে জড়িয়ে আয়নায় শেষবার তাকাল। চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল। তারপর বেরিয়ে গেল রুবাইয়ের ঘরের দিকে। রুবাই তখনো দুচোখ বন্ধ করে ব্রাশ করছে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে, ঘুমে ঝিমিয়ে। রুশা গিয়ে তাড়া দিতেই। রুবাই তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে এলো। এই মেয়ের এই এক সমস্যা, রাতে তার ঘুম আসে না, আর সকালে ঘুম ভাঙে না। রুশা তাড়া দিতেই রুবাই তাড়াতাড়ি জামা পড়ে তৈরি হয়ে নিলো। আজ বড্ডো দেরি করে ফেলেছে তারা। খুব দ্রুতই নিচে নেমে এলো দু'জন। এই বাড়ির নিয়ম অনুসারে সকাল ৮টা মানে খাবারের সময়। সকলে একসাথে ডায়নিং-এ বসেই খেতে হবে। দুপুরে যেহেতু বাড়ির ছেলেরা বাড়িতে থাকে না তাই সকাল আর রাত এই দু’বেলার খাবার সকলে একসাথে ডায়নিং এ বসবে এটাই নিয়ম।
রুশা আর রুবাই নেমে আসতেই দেখলো, হলঘর মেহমানদের গুঞ্জনে ভরাট। মেহমানেরাও এখনো বিদায় নেননি। খাবার টেবিলে বসে আছেন সকলে। তাদের খাবার অবশ্য শেষের দিকে। শেহতাজ সহ সকলেই খাবার টেবিলে উপস্থিত। এতো মেহমানের মাঝে রুশা আর রুবাইয়ের এই দেরি নিয়ে কোন কথা শোনালেন না রুপমনি বেগম। তবে তাদের কলেজে যাবার প্রস্তুতি দেখে
রুপমনি বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “আজ কলেজে যাওয়া কি খুব বেশি প্রয়োজন? বাড়ি ভত্তি মেহমান।”
টেবিলে উপস্থিত সবাই চোখ তুলে না তাকালেও কান পেতে রইলো যেন এই কথপোকথনের দিকে। রুশা চোখ তুলে একবার উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে রুপমনি বেগমের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, “আজ আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আছে। যেতেই হবে। এই মার্ক ফাইনালের সাথে যুক্ত হবে, না হলে যেতাম না।”
রুপমনি বেগম শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন শুধু। রুবাই নিজের মাথা চুলকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার জানামতে কোন পরীক্ষা নেই। তবে মিনিট দুয়েক পর তার মস্তিষ্ক সচল হলো। সে বুঝে গেল এটা কলেজে যাবার বাহানা। সে তাড়াতাড়ি নির্দ্বিধায় নাটকের অংশ হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, “হ্যাঁ, পরীক্ষা আছে। দেরি করা যাবে না। খুব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।”
রুপমনি বেগম শুধু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আর কোনো আপত্তি তুললেন না। অবশ্য এই দুজন আপত্তি তোলার জায়গা রাখেও নি।
খাবার টেবিলের চারপাশটা আবার শান্ত হয়ে উঠলো। তেমন কথা নেই, শুধু চামচ-কাঁটাচামচের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে মেহমানদের গুঞ্জনে, তবু রুশা কেবল টের পাচ্ছে এক জোড়া চোখের ভারী দৃষ্টি তার দিকেই। দৃষ্টিটা এমনভাবে তার দিকে আটকে আছে, যেন মুহূর্তের জন্যও চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। রুশা একবারোও ও দৃষ্টিতে না তাকিয়েই বলতে পারে এই নজর শেহতাজের। রুবাই খেতে খেতেই সবটা লক্ষ্য করলো। তার নজর এড়ালো না রুশার এই অস্বস্তিও। তবে রুবাই কিছুই বলল না, কি বা বলতে পারে সে! ঠিক তখনই আরফি রুশা আর রুবাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল, “প্রিন্সেস, তোমরা আমাকেও নিয়ে চলো না তোমাদের কলেজে?”
রুবাই ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় জবাব দিল, “আপনি আমাদের কলেজে গিয়ে করবেন কী?”
আরফি তার মুখের হাসিটা চওড়া করে বলল, “তোমার বন্ধুদের সাথে দেখা হবে, আড্ডা দেওয়া যাবে। আর তাছাড়া আমি তো সানন্দাপুর দেখিইনি। একসাথে শহরটাও একটু ঘুরে দেখা হবে।”
রুবাই এবার খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, “আমরা কি কলেজে আড্ডা দিতে যাই? আজ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আছে, ক্লাস আছে। সব শেষ করে বাড়ি ফিরলেই না হয় বন্ধুদের ডেকে আনা যাবে। তাছাড়া আপনাকে ভাইয়া শহরের সুন্দর জায়গাগুলো দেখাতেই পারবেন। এসবের জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে না।”
আরফি অভিমানের অসহায় চোখে রুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই কারান তার গলা ভারী অথচ শান্ত গলায় বলল, “প্রিন্সেস, আমার মনে হয় সকলে একসাথে ঘোরার মজাই আলাদা। তাছাড়া আপনারা থাকলে আমাদেরও ভালো লাগবে।”
সকলে অবাক হয়ে কারানের দিকে তাকাল। কারান স্বল্পভাষী, একদমই মিশুক প্রকৃতির নয়। এই কয়েকদিনে একটাবারও এবাড়ির কারোর সাথে প্রয়োজনের অধিক একটা শব্দ ব্যায় করেনি। তার মুখে এমন অপ্রত্যাশিত কথা বড়ই অদ্ভুত শোনালো। রুবাই খানিকটা থমকে গিয়ে এক মুহূর্ত রুশার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, “ঠিক আছে, দেখি তবে…, আগে কলেজ যাই।”
উপস্থিত সবাই চুপ, রুশাও কোনো জবাব দিল না। রুশা গভীর মনোযোগে চোখ নাক বন্ধ করে শুধু নাস্তা গিলে যাচ্ছে। এসব আলোচনা অবশ্য শেহতাজের মনোযোগও কাড়তে পারলো না। রুবাই এসবও লক্ষ্য করলো। এই টেবিলে যতোক্ষণ থাকবে ততক্ষণই যেন বিপদ। রুবাই নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রুশাকে তাড়া দিয়ে বলল, “রুশা অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চল।" এটুকু বলেই উঠে দাঁড়ালো।
রুশাও কোন শব্দ ব্যয় না করে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। ওড়নার প্রান্ত ঠিক করতে করতে এক ঝলক শেহতাজের দিকে তাকাল, সে তখনো অচল ভাস্কর্যের মতো তাকিয়ে আছে কেবল তার দিকেই। রুশা এই নজরকে একপ্রকার পদতলে পিশেই এগিয়ে গেল রুবাইয়ের পিছু।
কলেজের উদ্দেশ্যে তাদের গাড়ি ছুটে চলল। তবে তাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে কলেজের প্রথম ক্লাস প্রায় শেষের পথে। রুবাই আর রুশা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্তি মিশ্রিত হাসি দিল। এত দেরিতে ঢুকে আবার বেরোনোর ঝামেলা না করেই তারা সোজা ক্যান্টিনে গিয়ে বসল। ক্যান্টিন তখনও সকালবেলার ভিড় সামলাচ্ছে। জানালার পাশে একটা টেবিলে বসে পড়তেই দু’জনের ক্লান্তি যেন হালকা হয়ে এলো। তারা গ্রুপে তাদের উপস্থিতির বার্তা পাঠাতেই। অল্পক্ষণের মধ্যে একে একে সবাই হাজির হতে লাগল ক্যান্টিনে। প্রথমে প্রীয়তা, তার পরেই মেঘ, সাথে অরূপ আর ইমরান। সকলেই একেকটা অযৌক্তিক বাহানা দিয়ে ক্লাস ছেড়ে এসে ভিড়লো। মুহূর্তেই তাদের আড্ডা জমে উঠল। কথা, হাসাহাসি, ঠাট্টা সব মিলিয়ে ক্যান্টিনটা যেন তাদের দখলেই চলে গেল। ইমরান মজা করে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিরে, আমার সম্মোন্দিকে কেমন দেখলি?”
মেঘ চুপচাপ কফির কাপটা ঠোঁটে তুলল। এরপর খুব ধীরে বলল, “যা দেখেছি তুই দেখলে আরো ধামাকা হতো।”
ইমরান না বুঝতে পেরে বলল, “মানে?”
মেঘ কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “তোর মনে আছে, আব্বুর সঙ্গে আমি আর তুই একবার একটা জমিদার বংশের পুরোনো হীরের অকশনে গিয়েছিলাম?”
ইমরান কপাল কুঁচকে একটু ভেবে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, মনে আছে। মামাই তো হীরেটা জিতেছিল পরে। কিন্তু সে তো অনেক আগের কথা!”
মেঘ হালকা হেসে বলল, “তোর মনে আছে ওই অকশনে একটা লোক ছিল, খুব বস টাইপ? হাতে সাপের একটা ট্যাটু ছিল। তোর ওই লোকটার অ্যাটিটিউড ভীষণ ভালো লেগেছিল।”
ইমরান চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “হ্যাঁ স্পষ্ট মনে আছে। ভীষণ ভালো লাগা ভুল বললি। ইউনিক ছিল লোকটাকে।"
মেঘ স্থির নজরে তাকিয়ে বলল, "ওটাই শেহতাজ শেখ। রুবাইয়ের ভাই।"
ইমরান অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে বলল, "আসলেই???? এটাই হবার ছিল!”
মেঘ ঠোঁটে একটুখানি তিক্ততা নিয়ে বলল, “আসলেই ব্যাপারটা প্যাথেটিক।”
রুবাই অবাক হয়ে বলল, “আমার না ব্যাপারটা ভীষণ অদ্ভুত লাগছে। তোমরা আমার ভাইকে আগে থেকেই চিনো?”
অরুপ হেসে বলল, “চিনবে না কেন? সে ওদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে এসব অন্য বিষয়। তাছাড়া তোমার ভাই যে দেশে এসেছে, সেই খবর অন্তত চারটা ম্যাগাজিনে, দুটো বড় নিউজপেপারে ছবিসহ ছাপা হয়েছে। প্রিন্স বলে কথা!"
ইমরান সায় দিয়ে বলল, "মেগাজিনে দেখে আমি তো আইডেন্টিফাই করতে পারছিলাম না যে কোথায় দেখেছি, এখন সব পরিষ্কার।”
পুরো আলোচনার ভেতরেও রুশা একেবারেই নিঃশব্দ। যেন কোথাও মন নেই তার। আজকাল পরিস্থিতি তাকে অত্যাধিক শান্ত করে তুলেছে।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক অনুমতি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}