২৪.
রাত ঘনাতেই মেঘদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন শাহরিয়ার শেখ এবং তার পরিবারের প্রতিটা মানুষ। তবে শেহতাজ আসেনি। বিষয়টাকে শাহরিয়ার শেখ স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, ঠিক স্বাভাবিক নিতে পারলেন না কাঁকন সুলতানা। কাঁকন সুলতানা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, স্বাভাবিকের তুলনায় সব কিছু অত্যাধিক সহজে বুঝে নেয়া মানুষ। বাড়ির সূক্ষ্ম থেকে অতি সূক্ষ্ম জিনিসও তার চোখের আড়ালে যায় না। আর সেই একই জায়গায় শেহতাজের সকালের সন্দেহভাজন ব্যবহার কি করে অগোচরে যাবে! তবে যতোই সন্দেহের শেকল বাঁধা হোক তিনি সেসব এড়িয়ে বড্ডো হাসিমুখে সবাইকে বরণ করলেন। শেহতাজের এই অনুপস্থিতি স্বস্তির রেখা টানলো রুশার মনে। সে যেন এটাই চাইছিল। কোন এক অজানা কারণেই রুশা চায় না শেহতাজের এমন ব্যবহার সম্পর্কে মেঘ সামান্য আঁচও পাক। তবে হাজার কাজের বাহানা দিয়ে শেহতাজ না এলেও আরফি ঠিকই এসেছে। রুশার আরফির মুখের দিকে তাকালেই আফসোস হয়। ওই এনাকোন্ডা শেহতাজ, রুবাইয়ের ভাই না হয়ে আরফি রুবাইয়ের ভাই হলে সব কিছু কতো সুন্দর হতো! কিন্তু সবকিছু তো আর ভাবনা মতো হয় না। এটাই যেন এখন সবচেয়ে বড় হতাশা।
রোদ্দুর, অরূপ, মেঘ সকলেই যথারীতি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানালো। আরফি এসেই তার মেতে ওঠা স্বভাবে সকলের সঙ্গে মিশে উঠলো। অরুপের সাথে তার আজ প্রথম দেখা, তবে তা বোঝার উপায় নেই। পারিবারিক আলোচনা থেকে শুরু করে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব নিয়েই আলোচনায় মেতে উঠলো সকলেই এই বাড়িতে।
শাহরিয়ার শেখ বড্ড আফসোস করে বললেন, “এখন বুঝতে পারছি কন্যা সন্তান কেন আল্লাহর সবথেকে বড় নেয়ামত। এই একদিনের জন্য বাড়িতে নেই, আমার পুরো রুপমহল অন্ধকার হয়ে গেছে।”
শাফিন আহমেদ চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে হেসে উঠলেন, “তা তো হবেই ভাই। ঘরে যদি মানুষ না থাকে, সে ঘর কেমন করে ঘর হয় বলুন? তবে একটা কথা বলে রাখি, আমার ভাগ্নিকে কিন্তু আমি এত সহজে ছাড়ব না। অন্তত কয়েকদিন থাকুক এখানে, একটু প্রাণ ফিরে আসুক এই বাড়িটাতে।”
কাঁকন সুলতানা সায় দিয়ে বললেন, “একদম ঠিক। ছোট্ট মেয়েটা কতো দিন পর ঘরে ফিরলো বলুন তো!”
শাহরিয়ার শেখ মৃদু হাসলেন, “সে ওরা থাকতে চাইলে থাকুক।”
কথোপকথন থামলো না। বিষয়বস্তু বদলালো, জায়গা বদলালো, তবে আড্ডা চললো লম্বা সময়। রাতের আকাশ আরও গভীর হতেই শাহরিয়ার শেখ পরিবার সমেত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। অরুপও ছুটলো নিজের বাড়ির পথে। সুখনীড় প্যালেস আবারো শান্ত হয়ে উঠলো। সব অগোছালো ব্যস্ততা পড়ে রইলো রান্নাঘর আর খাবার ঘরে। সে সব সামলে উঠে বাড়িটা গভীর ঘুমে তলিয়ে উঠলো। রুশা আর রুবাইও তাদের জন্য বরাদ্দ কামরায় বিশ্রামের সন্ধানে ভিড়লো।
চন্দনকাঠের হালকা গন্ধ ভাসছে ঘরে, এটা রুম ফ্রেশনারের গন্ধ অবশ্য। জানালার ওপারে চাঁদের আলো এসে পড়েছে বিছানার একপাশে। রুবাই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু রুশার চোখে তখনও ঘুম নামেনি। এটা এক মস্ত সমস্যা, নতুন জায়গায় ঠিক ঘুম আসে না রুশার। ঠিক তখনই রুশার ফোনের স্ক্রিনে হালকা আলো জ্বলে উঠল। মেঘের মেসেজ, “চাঁদটাকে দেখেছো? খুব দেমাগ দেখাচ্ছে। ভাবছে সব রুপ, সৌন্দর্য আর পূর্ণতা নিয়ে বসে আছে। ছাদে আসবে একটু? আমি চাঁদের এই অহংকার ভাঙতে চাই।”
রুশা মেসেজটা পড়েই লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। সে একবার জানালা দিয়ে চাঁদটাকে দেখে নিলো। আজ পূর্ণ চন্দ্র, সমগ্র আকাশ জোৎস্নায় আলোকিত। তার অতি আকাঙ্ক্ষিত মানুষটা তার অপেক্ষায় ছাদে জোৎস্না মাখছে। রুশার বুকের ভেতর যেন হালকা কম্পন বয়ে গেল। সে নিঃশব্দে ওড়নাটা জড়িয়ে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। খুব ধীর কদমে এগিয়ে চললো ছাদের দিকে। এবাড়িতে চলতে তার ভয় লাগছে না। মনে সামান্য সংকোচ অব্দি নেই। ছাদের দরজাটা ঠেলে খুলতেই রুশার চোখে ঝলসে উঠল রুপালি আলোয়। পুরো ছাদ জোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে, যেন আকাশ মাটিতে নেমে এসে নিজের আলো মেলে ধরেছে।
আর সেই জোৎস্নার ভেতর, এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে তার আকাঙ্ক্ষিত মানুষটা। মেঘ ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে উল্টো ফিরে। তার হালকা ধূসর শার্ট কালো রঙের দেখাচ্ছে। চুলগুলো বাতাসের স্পর্শে অগোছালো হচ্ছে বারবার। রুশা চুপচাপ হেটে গিয়ে মেঘের পাশে দাঁড়ালো। মেঘ রুশার দিকে ফিরে তাকাল। চাঁদের আলোয় রুশার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার চোখ দুটো দীর্ঘ দিন পর একেবারেই শান্ত। যেন কোন কাটাকুটি দুশ্চিন্তা নেই। তার চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে বাতাসে দুলছে, যেন জোৎস্নার সঙ্গে তাদেরও কোনো গোপন সংলাপ চলছে। মেঘ কিছুক্ষণ নিরব তাকিয়ে রইল। হাল্কা হাতে রুশার উড়ন্ত চুল গুলোকে ছুঁয়ে নিলো। রুশা মৃদু হেসে প্রশ্ন করল, “অপেক্ষায় ছিলে?”
মেঘ রুশার চুল থেকে হাত সরিয়ে বলল, “এটা কে ঠিক অপেক্ষা বলে না। মনে হল, চাঁদের অহংকার ভাঙা জরুরি।”
রুশা হেসে পড়লো। সেই সাথে মেঘও হেসে উঠলো। সাথে সাথেই মেঘের মুখের টোল গাড় হলো। দুপাশের দুটো গজ দাত দৃশ্যমান হলো। রুশা অপলক তাকিয়ে বলল, “তোমার এই হাসিটা সবকিছু কেমন ঠান্ডা করে দেয়। সে তুমি আমাকে যা ইচ্ছে বলতে পারো, কিন্তু এক আকাশ বিষন্নতা কাটাতে তোমার এই হাসিটার থেকে বড় মহা ঔষধি আর কিছুই হতে পারে না।”
এক দীর্ঘ সময়ের সাথে যুদ্ধ পেরিয়ে এই সময়টা এলো যেন। অনেক দিন দুজনের কথা হয় না, দেখা হয় না, ঠিক নিজেদের মতো করে। তারা ছাদের রেলিং এ হেলান দিয়ে পাশাপাশি বসে পরলো। ছাদের পাথরের মেঝেতে জোৎস্না খেলা করছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো নিশাচর পাখির ডানার শব্দ, হয়তো পাহাড়ি কোন বন্য পাখি, রাতের নিস্তব্ধতায় শহর দেখতে এসেছে। তবে এই প্রহরে সবকিছুই যেন থেমে আছে তাদের জন্য। রুশা ধীরে মেঘের দিকে হেলে পড়লো। মেঘের কাঁধে মাথা রাখতেই মেঘ সামান্য নড়ে উঠলো। এটা কি সুখ! নাকি দায়িত্ব? এই মেয়েটা তাকে যতোটা ভরসা করে, সে সেটা টিকিয়ে রাখতে পারবে তো?
মেঘ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর খুব নিঃশব্দে তার হাত বাড়িয়ে রুশার হাতটা ধরল। দৃঢ়ভাবে। যেন পুরো পৃথিবী থেকে রুশাকে আড়াল করে রাখবে এই এক মুঠোয়। রুশা একটু বিস্মিত হয়ে তাকালো মেঘের দিকে। মেঘের চোখে এক অদ্ভুত আলো, যা ঠিক চাঁদের মতো শান্ত, অথচ গভীর। মেঘ ধীরে বলে উঠল, “রুশা, আমার খুব লোভ হচ্ছে।”
রুশা মাথা তুলে মৃদু বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো, “কিসের লোভ?”
মেঘ তার সেই গভীর চোখে তাকিয়ে বলল, “এই বাড়িতে তোমাকে আটকে রাখার লোভ।”
রুশা মুখ নামিয়ে হেসে ফেলল। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি সিরিয়াস। মজা করছি না। ভাবছি কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।”
রুশা কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই মেঘ একটু কাছে টেনে নিল রুশাকে। দু’জনের মাঝে কেবল জোৎস্নার নরম স্তর পড়ে রইলো। মেঘ ফিসফিস করে বলল, “মেঘের শুধু রুশাকে লাগবে।”
রুশা চোখ তুলে তাকালো মেঘের চোখে। এই সমস্ত পৃথিবীতে এই একটা মানুষই তো তার অধিকারের। কিন্তু তবুও তার মনে এতো কেন ভয় এই মানুষটাকে হারানোর? সে কি তার ভাগ্যকে ভয় পাচ্ছে?
রাত আরো গভীর হলো। চাঁদ তখনও ঠিক মাথার ওপরে, অথচ তার আলো যেন আরও কোমল, আরও নরম। মেঘ আর রুশা ছাদের এক কোণে বসে রইলো চুপচাপ, শব্দহীন। তবু যেন তাদের মাঝে হাজার কথার আদান-প্রদান চলতে রইলো নিঃশব্দে। জোৎস্নার সাদা আলোর নিচে তাদের ছায়া লেপ্টে রইলো একে অপরের মাঝে, ঠিক যেমন মেঘ লেপ্টে থাকে আকাশের বুকে।
রুশা ফিসফিসিয়ে বলল, “যেদিন চলে যায়, সেদিন সত্যিই ভালোই যায়। এরপর আর ভালো বলতে কিছুই থাকেনা। এখনকার দিনগুলো সব কেমন যেন রুক্ষ হয়ে গেছে।”
মেঘ পাশ ফিরল, “সবকিছু আবার ভালো হবে রুশা। সময়, সবসময় একরকম চলে না। ভালো খারাপ মিলিয়ে চলে। ধরে নাও, খারাপ যেটুকু ছিল সেটুকু শেষ হচ্ছে, এরপর যা আসবে সবটুকু ভালো।”
রুশা হালকা করে হাসল। রাত শেষ প্রহরে এসে ঠেকলো। জোৎস্না ফিকে হয়ে উঠতে লাগলো। তারা তাদের কথোপকথনের ইতি টেনে নিচে নেমে এল ধীর কদমে। কিন্তু ঘুম, সে যেন আসতেই চাইল না এই দুটো মানুষের চোখে। একই বাড়ির ভিন্ন দুটো কোনে তারা জেগে রইলো নিজেদের মাঝে।
শহরের অন্যকোনায় এই জোৎস্নার পূর্ণচন্দ্রকে ঠিক সঠিক ভাবে গ্রহন করতে পারছে না রুপমহলের ছোট কর্তা। বাইরের আলো যেন তার কক্ষে প্রবেশ নিষেধ। অবশ্য সে সাধারণ মানুষদেরকেও তার কক্ষে প্রবেশ অধিকার সহজে দেয় না। এটা তার অভ্যাস কিংবা বদঅভ্যাস সেটা যাই হোক, তার পছন্দ নয় তার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতিতে তার নির্ধারিত ব্যক্তি ছাড়া তার কক্ষে কেউ পা অব্দি রাখুক। আর বছর খানেক ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। দেশে ফেরার পর থেকেই ব্যস্ততা কম নেই শেহতাজের। তবে এই ব্যস্ততার বাইরেও কিছু একটা যেন তার নিয়ন্ত্রণে থেকেও নেই। এই কিছু একটার মাঝে মূখ্য বোধহয় রুশা।
শেহতাজের আচরণের রুক্ষতা কিংবা এই অমীমাংসিততা সকলের চোখে বাঁধলেও, শাহরিয়ার শেখ এগুলোকে তোয়াক্কা করেন না। যা কিছু ভয়ঙ্কর হবার তা যদি মানুষজন তোয়াক্কা না করে, তবে কি তা থেমে যায়? কখনোই না। যা কিছু ঘটার থাকে, বা যা কিছু হবার থাকে তা সবকিছু ভবিতব্য অনুসারে সম্পন্ন হয়েই থাকে।
সকালে সূর্য উঠতেই শহর আবার জেগে উঠলো। নাস্তার টেবিলে সবাই জড়ো হলো। নাস্তা শেষ হতেই মেঘ, রুশা আর রুবাই তিনজন রওনা হলো কলেজের উদ্দেশ্যে। কলেজে যাবার পথেই ইমরান আর অরুপের বাসা পেচে। মেঘ বরাবরই তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়। খুব অল্প কয়েকদিন কিছু বিশেষ কারন ছাড়া এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। আজও হলো না। সকলে একসাথে কলেজে পৌঁছালো। তবে ২য় ক্লাস শেষ হতেই ঘটলো আরেক আপত্তি। রুপমহল থেকে জরুরি তলব এলো রুশা আর রুবাইয়ের। রুপমনি বেগম হুট করে বড্ডো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ক্লাস করা বাদ দিয়েই রুশা আর রুবাই ছুটলো রুপমহলে। মেঘসহ সকলেই আসতে চেয়েছে তবে রুবাই কাউকে আনতে চায়নি। প্রীয়তা একপ্রকার জোর করেই রুশা আর রুবাইয়ের সঙ্গ নিয়েছে।
রুপমহলের গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই বাড়িতে একরকম অস্থিরতা দৃশ্যমান হলো। তবে সে অস্থিরতাও তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। রুবাই কোথাও এক দন্ড না দাঁড়িয়ে সোজা রুপমনি বেগমের কক্ষে প্রবেশ করলো। রুশা আর প্রীয়তাও রুবাইয়ের পিছু এগোলো। রুপমনি বেগমের কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, বাড়ির প্রায় একাংশ মানুষ এ কক্ষে। একজন মধ্যবয়সী ডাক্তার মনোযোগ দিয়ে রুপমনি বেগমের প্রেশার চেক করছেন। রুপমনি বেগমের পায়ের কাছে বসে আছেন শাহরিয়ার শেখ। কক্ষের এক কোনায় দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেহতাজ। আনজুম আরা বেগম খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে রূপমণি বেগমের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।
রুপমনি বেগমের মুখের রঙ কিছুটা ফ্যাকাসে, তবে চোখ দুটো আগের মতোই তীক্ষ্ণ। রুবাই দরজার কাছে পৌঁছাতেই তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “তোরা?”
রুবাই দৌড়ে গিয়ে তার কোলে মুখ গুঁজে পড়লো,
“আপনার কী হয়েছে দাদি আম্মা! আমি তো বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
রুপমনি বেগমের কুঁচকে থাকা মুখমণ্ডল খানিকটা কোমল হলো। তিনি ধীরে রুবাইয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, “ভয় পেয়েছিস কেন? আমি তো একদম ভালো আছি, কেবল একটু মাথা ঘুরেছিল।”
ঠিক তখনই শাহরিয়ার শেখ প্রশ্ন করলেন, “তোমাদেরকে খবর কে দিল?”
রুবাই মাথা তুলে বলল, “ভাইয়া মেসেজ করেছিল। ভাইয়া তো আসতে মানা করছিল। তোমরা এতো খারাপ! একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না যে, দাদি আম্মা অসুস্থ!”
রুশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু অবস্থা বুঝে ওঠার চেষ্টা করলো। তবে তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শেহতাজের রহস্যময় চোখের দিকে। তার মুখে একটুখানি বাঁকা হাসি যেন অদ্ভুত তৃপ্তির ছাপ। রুশার চোখে চোখ পড়তেই শেহতাজের ঠোঁটে হাসিটা আরও চওড়া হলো। রুশা এক মুহূর্তের জন্যও মুখের ভাব পাল্টাল না। তার শান্ত, স্থির চোখে শুধু একরাশ অনুধাবন ভেসে উঠল। এই অসুখের খবর মিথ্যা নয়, তবে অর্ধেক সত্যের মধ্যে লুকানো আছে সম্পূর্ণ অন্য কিছু, যা বোঝার মতো বুদ্ধি রুশার আছে। তাহলে কি শেহতাজ রুশা আর রুবাইকে এ বাড়িতে আনানোর জন্য এই ছকটা খেললো? কিন্তু কি করে!
প্রীয়তা রুশার পিছে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। ডাক্তার প্রেসার মেশিন গুটিয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। রুপমনি বেগম ধীরে বললেন,
“তোমরা খুব সামান্য তে অনেক বেশি ভয় পেয়ে যাও। এ বয়সে সবারই একটু প্রেসার উঠা নামা করে। এসব নিয়ে চিন্তা করো না।”
শাহারিয়ার শেখ বলে উঠলেন, “মা আপনি আপনার খেয়াল রাখেন না। এ বয়সে কেন প্রেসার ওঠানামা করবে যদি ঠিক মতো যত্ন নেওয়া যায়! এখন থেকে আপনার সব খেয়াল আমি রাখবো। আপনি এখন বিশ্রাম করুন। রুবাই, নীলিমা যাও তোমরা নিজেদের কক্ষে যাও। বিশ্রাম করো।”
রুবাই উঠে দাঁড়াল, তবুও হাত ছাড়ল না রুপমনি বেগমের। রুশা সামান্য এগিয়ে রুপমনি বেগমকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি ভালো আছেন এখন?”
রুপমনি বেগম সন্তুষ্টির হাসি হেসে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছি এখন। এত চিন্তা করো না তো। তোমরা দুজন ছিলে না বাড়িটা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এখন তোমরা এসে গেছো আমি একদম ঠিক হয়ে যাব।”
রুশা শুধু মৃদু এক টুকরো হাসি মুখে একে নিলো। এরপর একবার শেহতাজের মুখের দিকে তাকিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। প্রীয়তাও নিঃশব্দে তার পিছু নিলো। ঘরে ঢুকে রুশা চুপচাপ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো এসে তার মুখে পড়ছে, অথচ তার মুখে কোনো আলো নেই। প্রীয়তা খেয়াল করলো রুশার চোখে একরাশ অন্যমনস্কতা, যেন সে কোথাও নেই, অথচ ভাবনায় খুব গভীরে ডুবে আছে।
প্রীয়তা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুই কি দাদি আম্মাকে নিয়ে ভাবছিস? কিছু হয়নি উনার, ডাক্তার তো বলল, প্রেসার সামান্যই উঠেছিল। ওমনটা বয়সকালে সবার হয়।”
রুশা মাথা নাড়ল ধীরে, তারপর জানালা থেকে মুখ ঘুরিয়ে প্রীয়তার দিকে তাকালো। চোখে একরাশ দ্বিধা নিয়ে বলল, “তোর সাথে কিছু একটা শেয়ার করি? কিন্তু কথাটা তোর আর আমার মাঝেই থাকবে।”
প্রীয়তা একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “কি হয়েছে? সিরিয়াস কিছু?”
রুশা জানালা ছেড়ে সোফায় এসে প্রীয়তার মুখোমুখি বসলো, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তুই রুবাইয়ের ভাইকে দেখেছিস? তোর কাছে কি তাকে স্বাভাবিক মনে হয়?”
প্রীয়তা মাথা চুলকে বলল, “স্বাভাবিক!! অস্বাভাবিক মনে করার মত তো কিছু নেই!”
রুশা খুব অস্থির একটা শ্বাস ফেলে বলল, “আমি প্রথম দিন থেকে লক্ষ্য করছি লোকটা অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকায়। শুধু তাকায় বললে ভুল হবে, অপলক তাকিয়ে থাকে। আমার কাছে লোকটাকে খুব রহস্যময় মনে হয়।”
প্রীয়তা একটু নড়েচড়ে বসে বলল, “ওহ্ এই ব্যপার। এটা তো আমি প্রথম দিনই লক্ষ্য করেছি। সত্যি বলতে আমার কেন জানি মনে হয়, রুবাইয়ের ভাই তোর উপর ইন্টারেস্টেড। বিশেষ করে বাড়িতে যেদিন অনুষ্ঠান ছিল, তোর হাতটাকে কি শক্ত করে ধরে রেখেছিল! এগুলো আমার নজরে পড়েছে, তবে আমি আসলে বলতে চাইনি।”
রুশা মাথা নেড়ে বলল, “প্রিয় শুধুই একদিনের বিষয় নয়। এ বাড়িতে যতদিন আছি, আমার প্রত্যেকটা সময় মনে হয়েছে এই মানুষটা অদ্ভুত। আমার কেন জানি তার আজকের বিহেবিয়ারও সুবিধার লাগলো না।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজ! আজ আবার কি করলো?”
রুশা নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, “কি যে করেছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তবে, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে উনি ইচ্ছে করে রুবাইকে ভয় দিয়েছেন। যাতে রুবাই অত্যাধিক টেনশনে দৌড়ে দৌড়ে বাড়িতে ফিরে আসে। উনি প্রথম দিন থেকেই চায়নি যে আমি মামার বাড়িতে যাই।”
প্রীয়তা একটু বিষ্ময় নিয়ে বলল, “উনি কি তোর আর মেঘের ব্যাপারটা জানে?”
“সেটা আমি কি করে বলবো! কিন্তু আমার মনে হয়েছে উনি প্রথম থেকেই চায়নি যে আমি মামার বাড়িতে যাই। এমনকি গতদিন রাতে মামারা ওনাকে ইনভাইট অবধি করেছিল। বাড়ির সবগুলো মানুষ গিয়েছে কিন্তু উনি একমাত্র যে যাননি।”
প্রীয়তা সোফায় হেলে বসে বলল, “নিশ্চিত রাগে যায়নি। কিন্তু দাদি আম্মার প্রেসার হাই কি করে হলো? অত্যাধিক কিছু একটা খাইয়ে দিয়েছে যাতে প্রেসার হাই হয়ে অসুস্থ হয়ে যায়? আর তোরা বাড়িতে ফিরে আসিস! এরকম কাজও কি করবে?!!!”
রুশা একটু ভেবে বলল, “আমার মনে হয় না এমন কিছু করেছেন। হয়তো প্রেসার বেড়ে গেছে ওটাকেই বাড়িয়ে বলে, নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে নিয়েছেন।”
প্রীয়তার কপালে ভাঁজ পড়লো। দুশ্চিন্তারা মাথা চেড়ে উঠে দাঁড়ালো যেন, “লোকটাকে ভয়ংকর লাগে। হাতের সাপের ট্যাটুটা দেখলেই কেমন যেন গা শিউরে ওঠে আমার। কিন্তু রুশা তুই এবাড়িতে ওনার সঙ্গে থাকবে কি করে?”
রুশা তাচ্ছিল্য হেসে বলল, “এতদিন তো আছি।”
প্রীয়তা উঠে এসে রুশার পাশে বসে বলল, “বিশ্বাস কর, এখন আমার তোর জন্য টেনশন হচ্ছে।”
রুশা মৃদু হেসে বলল, “তোকে টেনশন করানোর জন্য বলিনি কথাগুলো। শুধু শেয়ার করলাম। বিষয়গুলোর জন্য দমবন্ধ লাগছে আমার। আর আমার মনে হচ্ছে, এই সমস্যা গুলো বেশি হবার কারন, আমি সব অতীত ভুলে গেছি। আমি কাউকে ঠিক সঠিক ভাবে গ্রহন করতে পারছি না। কিন্তু বিশ্বাস কর প্রিয়, ছোটবেলার একটা সামান্যতম স্মৃতি পর্যন্ত আমার মনে নেই। যদি একাংশ স্মৃতিও আমার মস্তিস্কে থাকতো তবে বোধহয় সবকিছু সহজ হয়ে যেত।”
প্রীয়তা রুশার ঘাড়ে হাত রেখে বলল, “রুশা আমি শুনেছি মানুষের চার বছর বয়সের আগ অব্দি কোন স্মৃতি মনে থাকে না। আর তোর তো চার বছর বয়স হবার আগেই জীবনটাই বদলে গেছে। কি করে মনে রাখবি বলতো? এত বাচ্চা মেয়ের কোন কিছু মনে না রাখাটাই তো অস্বাভাবিক।”
প্রীয়তার কথা শুনে রুশা খানিকটা সময় চুপ করেই বসে রইলো, এরপর বলল, “ওহ হ্যাঁ, দাঁড়া তোকে একটা জিনিস দেখাই।” এটুকু বলেই রুশা উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে শেহতাজের দেয়া পেনডেন্টটা নিয়ে এলো, “এই দেখ, রুবাইয়ের ভাই আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে এটা।”
প্রীয়তা পেন্ডেন্টটা হাতে নিয়ে ভালো করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলল, “এটাতো কাস্টমাইজ মনে হচ্ছে। জিনিসটা ইউনিক, এরকম শোপিস হয় দেখেছি।”
রুশা আবার সোফায় বসে বলল, “তোকে বললে বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা। কিন্তু যেদিন এই পেনন্ডেন্ট আমাকে দেয়, আমি ওই দিন রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। আমি বুঝতে পারছি না ওটা স্বপ্ন নাকি আমার মস্তিষ্কের থেকে ছুটে যাওয়া মেমোরি।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কি দেখেছিস?”
রুশা খুব ধীর গতিতে বলল, “পেনন্ডেন্টটা দেখছিস, ঠিক একই রকমের একটা শোপিস একটা ১২ কিংবা ১৩ বছরের বাচ্চা ছেলে একটা তিন বা চার বছরের মেয়েকে উপহার হিসেবে দিচ্ছে। আর মেয়েটা খুশিতে লাফাচ্ছে।”
প্রীয়তা ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “তোর কি কোন রকম ভাবে মনে হচ্ছে, ওটা রুবাইয়ের ভাই আর তুই? মানে সে ছোটবেলায় তোকে একটা শোপিস দিয়েছিল আর বড় হয়ে সেই শোপিজের আকৃতির একটা লকেট?”
রুশা মাথা নেড়ে বলল, “না প্রীয়। আমি আসলে কিছুই মনে করছি না। আমার মস্তিষ্কের সবকিছু এত ঘেঁটে যাচ্ছে, আমি ঠিক কুল কিনারা বুঝতে পারছি না। এত এত প্রশ্ন জড়ো হচ্ছে রোজ রোজ যেগুলোর উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।”
“এগুলো আসলেই ভাবনার বিষয়। আমার নিজের মস্তিষ্কই ঘেঁটে উঠছে।”
রুশা আর প্রীয়তা দুজনেই চুপচাপ লম্বা সময় বসে রইলো। প্রীয়তা রুশার অস্থিরতা দমাতে না পারলেও তা সাময়িক কমাতে সক্ষম হলো। কিছু সময়ের মাঝেই রুবাই এসে উপস্থিত হলো রুশার কক্ষে।
রুবাই খুব দুঃখ করে বলল, “পুরো বেড়াতে যাওয়ার মজাটাই শেষ। তুই মন খারাপ করিস না। দাদি আম্মা একটু সুস্থ হলেই আবার যাব আমরা।”
রুশা শুধু হাসলো। সে যেন নিজের অজান্তেই কারো হাতের পুতুল হয়ে উঠেছে। সে যেভাবে নাচাচ্ছে, ঠিক ওভাবেই নেচে উঠছে। রুশা মেঘকে একটা মেসেজ দিয়ে রুপমনি বেগমের ব্যপারে জানিয়ে দিলো।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক অনুমতি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}