ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৪৬তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৪৬.

রুশা চলে গেল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তার ছায়াটা ধীরে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ি বাতাস ছুঁয়ে গেল সমগ্র, কিন্তু মেঘের ভেতর কিছুই নড়ল না। সে ঠিক ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দুটো সামনে স্থির, যেন দৃষ্টি নামের জিনিসটা আজ তার আর প্রয়োজন নেই। ইমরানও নড়ল না। বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে। কোনো সান্ত্বনার বাক্য নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। কিছু ক্ষত এমন থাকে, যেখানে হাত রাখলেই ব্যথা বেড়ে যায়। এই মুহূর্তে শব্দ মানেই নিষ্ঠুরতা।

মেঘের ভেতরে যেন একটার পর একটা স্তম্ভ ভেঙে পড়ছে। বিশ্বাস, ভরসা, স্বপ্ন সব গুঁড়িয়ে ধুলো আজ। সে ভাবেনি এমন পরিণতি। সে শুধু নিজের ভালোবাসায় বিশ্বাসী ছিল। এ বিশ্বাস কি তবে অন্ধবিশ্বাস? সে কি প্রেমে বিক্ষত প্রেমিকদের মত ভাবছে? নাকি প্রেমে ধোকা খাওয়া কোন বিধ্বস্ত পুরুষ হয়ে দাঁড়িয়েছে? মেঘ বিধ্বস্ত। তবে কোনো এক ভিতের উপর এখনো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভিতটা ভেঙে পড়লে হয়তো সেও ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়বে মাটিতে। এই নিরবতা গলায় কাটাল মতো বাঁধছে। ইমরান এগিয়ে এসে বলল, “মেঘ, কিছু বল অন্ততঃ।”

মেঘ আকাশে দূরের উঁচু পাহাড় চূড়ায় চোখ রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “ঠিক কতটা ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া যায় ইমরান?”

ইমরান একেবারেই চুপসে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর যে তার কাছে নেই। সে যে নিজেই সমীকরণের ভুল উত্তর। আর কোন কথা বাড়লো না তাদের।

সময় কেটে গেল। ঠিক কতক্ষণ, কেউ জানে না। পাহাড়ের উপর রাত নামতে শুরু করলো। আলো-আঁধারির মধ্যে মেঘের মুখটা আরও কঠিন হয়ে উঠলো। চোখের জল শুকিয়ে গেল, কিন্তু ভেতরের ক্ষরণ থামেনি। অনেকক্ষণ পর আবারো ইমরান সাহস করে ধীরে হাত রাখল মেঘের ঘাড়ে। খুব সাবধানে, যেন ভেঙে যাওয়া কিছুতে হাত দিচ্ছে। গলা নামানো, প্রায় ফিসফিস করে বলল, “চল… বাড়ি ফিরি, মামনি চিন্তা করছেন। অনেক বার কল করেছেন। এখনো যদি বাড়ি না ফিরি তবে এখানেই চলে আসবেন।”

মেঘ কোনো জবাব দিল না। মাথা নাড়ল না, তাকাল না। শুধু ধীরে পাহাড় থেকে নামল। গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। ইমরান সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি ড্রাইভ করি? তুই সামলাতে পারবি না।”

মেঘ এবারও কিছু বলল না। শুধু চাবিটা তুলে নিল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। ইমরান আর কিছু না বলে দৌড়ে পাশের সিটে বসে পড়লো। এই মুহূর্তে মেঘের হাত থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া মানেই শেষ নিয়ন্ত্রণটুকুও কেড়ে নেওয়া। গাড়ি চলতে শুরু করল। হেডলাইটের আলো রাস্তাকে কেটে এগিয়ে চলল। এই এলাকা, পাহাড়, আলো সব পেছনে ছুটছে। ভেতরে শুধু ভারী নীরবতা। মেঘ স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে থাকলো। চোখ দুটো সামনে, কিন্তু সে কিছু দেখছে না। তার সামনে শুধু রুশার মুখ শেষবারের মতো, কান্নায় ভাঙা, নিষ্ঠুরভাবে দৃঢ়। “আমি শেহতাজকে বিয়ে করছি” এই কথাটা বারবার আছড়ে পড়ছে তার ভেতরে।

একটা মানুষের জীবন এমনই, একটা বাক্যে শেষ হয়ে যেতে পারে সেটা যেন আজ দৃশ্যমান। ইমরান জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলো। তার যে বলার কিছুই নেই। গাড়ি এগিয়ে চলল। মেঘও এমন এক শূন্যতার দিকে এগোলো, যার কোনো নাম নেই।

এদিকে রুশা রুপমহলে ফিরেই নিজেকে চারদেয়ালে আটকে নিলো। সে যেন আর আগের রুশা নেই। সে যেন তার নিজের কফিনে আজ শেষ পেরেকটা মেরে এসেছে। আজ সে নিজেকেই হত্যা করে এসেছে। মহলের দরজাগুলো পার হয়ে, মানুষের কোলাহল দেখেছে তবু কিছুই ছুঁয়েছে না তাকে।

বিছানার পাশে বসে সে অসহায়ের মতো নেতিয়ে পড়লো। এক সদ্য সব হারা শিশুর মতো কাঁদতে লাগল। কোনো শব্দ নেই, কোনো আর্তনাদ নেই, শুধু দম বন্ধ করা কান্না। বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। চোখের পানি বালিশে গড়িয়ে পড়ছে, চুল ভিজে যাচ্ছে, শ্বাস ভাঙছে। তার জীবনের সবটুকু সুখ সে যে নিজে পায়ে মাড়িয়ে এসেছে। এক পৃথিবী দৌলতও যে তার মেঘের কাছে ঠুকনো।

সময় আজ তার কাছে অর্থহীন। রাতটা এগোতেই হঠাৎ তার ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ দিক বদলালো। তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে উঠল, “মা কেন চলে গেলে তুমি… কেন?” শশী রহমানের মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। সেই মায়া, সেই আশ্বাস, সেই শক্ত হাত। রুশা হঠাৎ বালিশে মুখ গুঁজে বলল, “তুমি থাকলে আমার জীবন এমন হতো না। তুমি থাকলে কেউ আমাকে এভাবে কোণঠাসা করতে পারতো না। তুমি থাকলে সব অন্য হতো। আমি ভুল করতাম তাও তুমি সামলে নিতে।”

এই প্রথম সে মাকে দোষ দিল। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও খুব নিষ্ঠুরভাবে। কারণ এই জীবন্ত লা শ টা দোষ দেয়ার মতো কাউকে খুঁজে পেলো না বোধহয়। কিছুক্ষণ পর সেই দোষও বদলে গেল। এবার আর্তনাদ হলো, তার বাবা মায়ের নামে। সবাই যেন তাকে এভাবে কাঁদতেই ফেলে গেছে। চোখ মুখ এক প্রকার ফুলে উঠেছে তার। সে এবার আবার নিজেকেই থামালো। এই দোষারোপে কোনো মুক্তি নেই। এই যুদ্ধ সে জিতবে না। সে জানে, শেষমেশ তাকে মেনে নিতেই হবে। মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ নেই। রুশা ধীরে উঠে দাঁড়াল। শরীরটা ভারী, কিন্তু চলতে হচ্ছে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল। তারপর ড্রয়ার খুলতে লাগল। একটার পর একটা। আঙুল কাঁপছে। যেন ভেতরে এমন কিছু খুঁজছে, যা তাকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে দেবে। শেষ ড্রয়ারটায় হাত দিতেই সে থমকে গেল। সেখানেই ছিল শেহতাজের দেওয়া সেই উপহার। ছোট্ট বাক্স। সেটা তো ঠিক মতো খুলে দেখা হয়নি। আজ খুলতেই হলো। ঢাকনাটা খুলতেই রুপালি আলোয় ঝিলমিল করে উঠল সেই পেনডেন্ট। ঠান্ডা ধাতু, নির্লিপ্ত সৌন্দর্য। রুশা তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল। গলায় পরার সময় হাত দুটো কেঁপে উঠল আরও বেশি। চেইনটা ঠিকমতো ধরতে পারছিল না। দু’বার চেষ্টা করে শেষমেশ গলায় পড়লো। একেবারে জোরজবরদস্তি করে পড়লো। ভালোবাসার নয়, সমঝোতায়। নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এক নির্মম চেষ্টা।

আয়নায় এবার সে তাকাল। গলায় ঝুলছে এক ভবিষ্যৎ, যেটা সে চায়না। চোখ দুটো শূন্য, মুখটা ফ্যাকাসে। এই মেয়েটাকে সে চেনে না। এই রুশাকে সে ঘৃণা করে। এই রুশা আজ রুপমহলের দেয়ালের ভেতর হারিয়ে যাওয়া আরেকটা নাম। সে চোখ বন্ধ করল। একফোঁটা পানি আবার গড়িয়ে পড়ল। সে ফিসফিস করে বলল, “এইটাই বুঝি আমার শাস্তি।”

সে ঘরের কোনায় এগিয়ে সোফাটার উপর বসে পড়লো। কান্না নেই, শব্দ নেই, কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। চোখ দুটো সামনে স্থির, কিন্তু সে দেখছে না। এই বসে থাকাটা বিশ্রাম নয়, এসবই এখন তার জন্য শাস্তি। শরীরটা আছে, কিন্তু ভেতরের রুশা যেন পাহাড়ের চূড়াতেই থেকে গেছে। গলায় ঝুলে থাকা পেনডেন্টটা বুকের সাথে ঠেকে ঠেকে উঠছে, প্রতিটা স্পর্শে মনে করিয়ে দিচ্ছে এটাই এখন তার ভবিষ্যৎ, এটাই তার দায়। সে নড়ে না। নড়লে ভেঙে পড়বে জানে বলেই সে নড়ছে না। পাথর হয়ে থাকাই এখন তার একমাত্র বাঁচার উপায়।

ওদিকে, মেঘ বাড়ি ফিরেও একই রকম নিস্তেজ। সে কোনো কথা বলল না। গাড়ি থেকে নেমে সে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। যেন এই বাড়িটাও আজ তার কাছে অপরিচিত। বসার ঘরে শাফিন আহমেদ আর কাঁকন সুলতানা মেঘের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। মেঘ কোন দিকেই তাকালো না। কোন অপেক্ষার সামনে দাঁড়ানোর শক্তি যেন তার নেই। সে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা খুব করে কানে লাগলো নিচে উপস্থিত সকলের। ঠিক তখনই ইমরান ঢুকে পড়লো সদর দরজা দিয়ে। মেঘের এভাবে চলে যাওয়া আর ইমরানের শুকনো মুখ দেখেই কাঁকন সুলতানা বুঝে গেলেন সব। তিনি কণ্ঠটা শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন। তবে দুশ্চিন্তা লুকাতে পারলেন না। তিনি বললেন, “একেবারে বিস্তারিত বলো আমাকে। একটা শব্দও বাদ দেবে না।”

ইমরান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করলো। পাহাড়, রুশা, সেই কথাগুলো যেগুলো বলা যায় না, তবু বলতে হল। বলতে বলতে তার গলাও কেঁপে উঠলো। শেষ পর্যন্ত আর কিছু থাকলো না বলার। ঘরে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসল। কাঁকন সুলতানার চোখ ভিজে উঠলো। তিনি কিছু বললেন না, শুধু হাতের আঙুল শক্ত করে চেপে ধরলেন শাড়ির আঁচল। একজন মা ঠিকই বুঝে যান, তার ছেলের বুকের ভেতর আজ কী ভেঙেছে। শাফিন আহমেদ ধীরে নিঃশ্বাস নেন। এই মানুষটাকে সাধারণত কেউ ভাঙতে দেখে না। ব্যবসার সাম্রাজ্য, সিদ্ধান্ত, দৃঢ়তা সবকিছুর ভেতর তিনি অভ্যস্ত। কিন্তু আজ তার কণ্ঠেও ভার, “মেঘকে এভাবে ভেঙে যেতে দেওয়া যায় না।” তারপর কাঁকন সুলতানার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন বুঝছো তো, কেন আমি ইউএসএর ভিসা রেডি করতে বলেছিলাম?”

কাঁকন সুলতানা কিছু বললেন না। শুধু চোখ নামিয়ে নেন। শাফিন আহমেদ আবার বলেন, “ও সহ্য করতে পারবে না। মেঘের মতো ছেলে এই কষ্ট নিয়ে বাঁচতে পারবে না।”

ইমরান শুধু তাকিয়ে থাকলো। তার বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠলো। এই কথাগুলো যেন তাকে আরেকবার ধাক্কা দিল। মেঘ শুধু তার বন্ধু নয়। মেঘ তার ভাই। তার পরিবার। এই সময়টা যে সবচেয়ে ভয়ংকর। মেঘ সত্যি মেনে নিতে পারবে না।

কাঁকন সুলতানা আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে মেঘের কক্ষের দিকে যান। দরজাটা লক করা নয়, শুধু ঠেলে রাখা। তিনি ঠেলে ভেতরে গেলেই দেখলেন মেঘ বিছানায় হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে। এক পা সামনে ছড়িয়ে রাখা, অন্য পা ভাজ করে রাখা তার উপর তার হাতটা ঝুলছে। মাথাটা বিছানায় হেলিয়ে দেয়া। তিনি খুব সন্তোর্পনে মেঘের পাশে গিয়ে বসলেন। মেঘ মায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুললো‌। কাঁকন সুলতানা বললেন, “তোমাকে যে সামলে নিতে হবে।”

মেঘ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, “ কি করে সামলাতে হয় মা? ও যে আমাকে জিবন্ত দাফন করে গেছে।

আমি তো অপরাধ করি নি, তবে মৃ ত্যু দ ন্ডে র শান্তি কেন?”

চলবে.... 💝

#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ

#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)

#সাদিয়া_তিন্তি

বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন