৪৮.
ভোর এলো। কিন্তু সকালটা স্বাভাবিক হলো না। রুপমহলে এক অদ্ভুত তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। কেউ হাঁটছে দ্রুত পায়ে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ অকারণে হাসছে। আয়োজন চলছে, একটা কৃত্রিম উৎসবের গন্ধ। এই বাড়ির দেয়ালগুলো আবার নতুন এক ইতিহাস লিখতে বসেছে।
সময়টা হঠাৎ করেই যেন ছুটতে শুরু করল।
যেন কেউ অদৃশ্য হাতে ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে একটার পর একটা দিন, একটা রাত। রুপমহলে আর থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে মানেই বাস্তবায়ন শুরু। বাড়িটার ভেতর শব্দ বেড়ে গেল। সবটাই ব্যস্ততার শব্দ। কাপড়ের ঘর্ষণ, ফোনকলের ফিসফাস, লোকজনের আসা-যাওয়া। ঘরের কোণে কোণে সাজের প্রস্তুতি। পুরোনো দেয়ালগুলো নীরবে তাকিয়ে দেখছে আবারও তারা এক জীবনের মোড় ঘোরাতে চলেছে।
রুশা এই সব কিছুর মাঝেই অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ।
সে কারো সামনে আসছে না। কারো সাথে কথা বলছে না। তার পৃথিবীটা যেন নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে নিয়েছে। ফোনটা বন্ধ। সব যোগাযোগের রাস্তা ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে ফেলা। যেন কেউ তাকে আর থামাতে না পারে। কিংবা যেন নিজেই আর পিছু হটতে না পারে। ঠিক তখনই সুখনীড় প্যালেসে পৌঁছায় বিয়ের কার্ড। রুশা আর শেহতাজের বিয়ের কার্ড। সংবাদটা ছোট্ট, বিয়ের তারিখ পড়ে গেছে।
তবে এই এক লাইনের ভেতরেই যেন মেঘের সমস্ত পৃথিবী ভেঙে পড়ল। সে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। তবে পরে ঠিকই হাসলো, একদম অপ্রাসঙ্গিক, ভাঙা হাসি। তারপর বুকের ভেতর কোথাও একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। সব কিছু এত দ্রুত কেন? এত তাড়াহুড়ো কেন?
মেঘ আবারো ফোন তুলল। একবার। দু’বার। দশবার। প্রতিবারই সেই পরিচিত যান্ত্রিক শব্দ, সুইচড অফ। রুশা একেবারেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। যেটুকু আশা নিয়ে সে টিকে ছিল সেটুকুও যেন ক্ষয়ে পড়ছে।
মেঘ বসে পড়লো। চেয়ারে নয়, মাটিতে। যেন শরীর আর ভর বহন করতে পারছে না। চোখের সামনে অন্ধকার নামলো। রুশা… আর এই যুদ্ধের অংশ নয়। এই পরিস্থিতির ভয়টাই পাচ্ছিলেন শাফিন আহমেদ। বরাবরের মতোই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, “যা ঘটার তাই ঘটছে। এবার তোমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তোমার ভিসা চলে এসেছে। তোমাকে ইউএসএ যেতে হবে। তোমার সামনে সারা জীবন পড়ে আছে।”
মেঘ এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে বলে উঠল, “না, আমি কোথাও যাবো না। অন্ততঃ এই অধ্যায়ের শেষ না করে কিছুতেই যাবো না।”
শাফিন আহমেদ বিস্মিত হন। এই ছেলেটাকে তিনি এমন দেখেননি। চোখে বিদ্রোহ নেই, কান্নাও নেই, আছে শুধু শূন্যতা। তিনি বললেন, “এই অধ্যায়টা এখানে সমাপ্ত মেঘ।”
“তবে শেষটা পুরো দমে হোক আব্বু। কথা দিচ্ছি, আমি চলে যাবো। শুধু শেষটা শেষ হোক।”
শাফিন আহমেদ আর কথা বাড়ালেন না। সিন্ধান্ত হলো শাফিন আহমেদ কিংবা কাঁকন সুলতানা কেউই বিয়েতে যাবেন না। কারো পক্ষে এই উৎসবের মুখোশ পরা সম্ভব না। আনন্দের ভান করা সম্ভব না।
তবে এই সব কিছুর বাইরে ছিল প্রীয়তা। অসুস্থতা তাকে আলাদা করে রেখেছিল। হাতের এলার্জি, ডাক্তার, ওষুধ এই ছোট্ট বৃত্তেই আটকে ছিল তার দিনগুলো। রুশার সাথে যোগাযোগও কমে গিয়েছিল। কিছুই সে জানত না। কিছুই আন্দাজ করতে পারেনি। তবে তার বাড়িতে বিয়ের কার্ড পৌঁছালেই ওর পৃথিবী একেবারে থমকে যায়। কার্ডটা হাতে নিয়েই সে বুঝে গেল সে, কোথাও কিছু ভয়ংকর ভুল হয়েছে। সে প্রশ্ন করল না। অপেক্ষা করল না। সোজা রুপমহলের দিকে ছুটে গেল। রুপমহলে আয়োজন চলছে, আলো জ্বলছে, মানুষের মুখে ব্যস্ততা। কিন্তু এই আলোর ভেতরে কোথাও একটা গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে, যেটা শুধু সে দেখতে পাচ্ছে।
প্রীয়তা রুপমহলে ঢুকেই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। রুবাইকে দেখেই তার গলা চড়ে উঠল, “এত বড় একটা সিদ্ধান্ত, এত বড় একটা ঘটনা আমাকে জানানো হয়নি কেন?”
তারপর রুশার দিকে ঘুরে, “তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না রুশা? আমি কি তোর কেউ না?”
রুশা প্রথমে কিছু বলল না। চোখ নামিয়ে রাখল। যেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার শক্তি তার বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে। রুবাই চেষ্টা করল পরিস্থিতি সামলাতে, কিন্তু প্রীয়তা থামার মানুষ না। সে আবার বলল, “আমি অসুস্থ ছিলাম বলে কি আমাকে অদৃশ্য করে দিয়েছিস? নাকি ধরে নিয়েছিস আমি কিছুই বুঝবো না?”
এই কথাগুলো বলতেই হঠাৎ করেই প্রীয়তার গলা ভেঙে গেল। রাগটা কান্নায় বদলে যেতে একটুও সময় নিল না। সে বসে পড়ল। মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল শিশুর মতো। এতদিন জমে থাকা ক্ষোভ, দুঃখ, ভয় সব একসাথে বেরিয়ে এলো। রুশা তখনই এগিয়ে এলো। যে রুশা নিজেই ভেঙে পড়ার কিনারায় দাঁড়িয়ে, সেই রুশাই প্রীয়তাকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, “চুপ কর, এখন কাঁদিস না। তুই কাঁদলে আমি আর পারবো না।”
রুবাই নিশ্চুপ বসে দেখলো শুধু। এ এক উল্টো দৃশ্য, যাকে সামলানোর কথা ছিল, সেই সামলাচ্ছে। রুশা প্রীয়তার হাতটা ভালো করে দেখল। ক্ষতগুলো অনেকটাই শুকিয়েছে, লালচে দাগ রয়ে গেছে এখনো। রুশা জিজ্ঞেস করল, “এখনো ব্যথা আছে?”
প্রীয়তা মাথা নাড়ল, “ব্যথা তো থাকবেই। তবে সহ্য করা যায়।”
পরিবেশ শান্ত হলো। এরপর সমস্ত ঘটনা একেবারেই বিস্তারিত রুশা নিজ মুখে বলল। প্রীয়তা একেবারেই থমকে গেল। তার ঠিক কি বলা উচিত বুঝে পেল না। তবে তার যে কিছু করতেই হবে। তাছাড়া এই বাড়ির ভেতরে বসে কিছু হবে না। প্রীয়তা যেভাবে ঝড়ের গতিতে গতিতে এসেছিল ঠিক সেভাবেই রুপমহল থেকে বেরিয়ে এসে কল করলো মেঘকে। কোন কথা না বাড়িয়ে একেবারেই গুরুতর তলফ করলো। ইমরানও মেঘের সাথেই ছিল। ইমরান প্রীয়তাকে ওখানেই মহলের পিছের রাস পাহাড়ে অপেক্ষা করতে বলল। প্রীয়তা সেখানেই অধৈর্যের মত বসে রইলো। বেশ লম্বা সময় পর মেঘ আর ইমরান এসে পৌঁছাল। কোন রকম বার্তি কথা ছাড়াই প্রীয়তা কথা শুরু করল। একদম গোছানোভাবে। একদম নির্দয় সত্যে। সে তার বাবার কথা স্পষ্ট রুপে আবারো বলল। তার বাবা যে শেহতাজকে পছন্দ করে না এসব তো নতুন নয়। তাছাড়া ডিআইজি পারভেজ সওদাগরের সততা এই সানন্দাপুরে প্রসিদ্ধ। মেঘ এই শেহতাজকে অপছন্দের বিষয়টা আংশিক রুপে জানে। এরই সাথে রুশা এর আগে প্রীয়তা যা যা শেয়ার করেছিল, শেহতাজের দৃষ্টি, তার কথা বলার ভঙ্গি, তার উপস্থিতিতে রুশার অস্বস্তি এ সব কিছুই বিস্তারিত জানালো।
মেঘ আশ্চর্য হলো। এই সব কথা সে জানত না। একটাও না। রুশা কখনো বলেনি। কখনো ইঙ্গিতও দেয়নি। ইমরান নিজের রাগ আর লুকাতে পারলো না, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “রুবাই, একবারও বলেনি এসব।”
প্রীয়তা বলল, “রুশা ওর সব মনের কথা আমাকে শেয়ার করে। আমি কিছুতেই চাই না শেহতাজের সাথে ওর বিয়ে হোক, প্লিজ মেঘ কিছু তো করো। রুশা একটা ওয়াদার জন্য নিজের জীবন এভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে না।”
মেঘ শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রীয়তাকে বলল, “একবার কথা বলিয়ে দাও ওর সাথে। আমি কিছুতেই ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। শেষবার।”
ইমরান খুব অবাক হয়ে বলল, “রুবাই যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে না?”
“আমি কল করেছিলাম। লাভ হয় নি। রুশা কথা বলে নি।”
ইমরান শুধু দাঁতে দাঁত চেপে রইল। প্রীয়তা রুবাইয়ের নম্বরে কল দিতেই রিসিভ হলো। প্রীয়তা কোন কথা না বাড়িয়ে বলল, “রুশাকে ফোনটা দে তো। ইমারজেন্সি কথা আছে।”
রুবাই কিছু না বলেই ফোনটা রুশার হাতে দিয়ে দিল। এদিকে প্রীয়তাও ফোনটা মেঘের হাতে দিল। মেঘ হ্যালো বলা মাত্রই ওপাশে কোন আওয়াজ এলো না। যেন রুশা জমে গেছে। কিছু সময় নিরবতা কাটিয়ে, মেঘ কিছু বলার আগেই রুশা বলে উঠল, “মেঘ। তোমার সাথে আমার শেষ কথা হয়ে গেছে। এবার আমাকে মুক্তি দাও। আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না। তুমি আমাকে ভেঙ্গে দিচ্ছো বারবার। আমি তোমার সম্মুখীন হতে চাই না। যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করো।”
মেঘ থমকে গেল। রুশার প্রতিটা শব্দ ছুরি হয়ে নামল। সে আবার বলল, “আমি তোমাকে চাই না মেঘ, তোমার ভালোবাসা তোমার আবেগ সব প্রত্যাখ্যান করছি আমি। আমি চাই আমার বাবার সিদ্ধান্ত স্থায়ী হোক। এইটাই আমার পথ। আমি শেহতাজকে হাসি মুখে বিয়ে করছি। মেনে নাও।
আমাকে অসীম ভালোবাসার দাবি করো না তুমি? তবে মেনে নাও। আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না।”
রুশা এটুকু বলেই কলটা কেটে দিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ঘরের ভেতর নিঃশব্দে ডুকরে কেঁদে উঠল। এমন কান্না, যেখানে শুধু আর্তনাদ। বুকের ভেতর জমে থাকা সব সংযম, সব শক্ত হয়ে থাকা সিদ্ধান্ত এক নিমেষে ভেঙে পড়ল। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল, যেন নিজের কান্নাটাকেও লুকাতে চায়। সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে থাকা যে কতটা অসম্ভব, এই মুহূর্তে সেটা সে টের পাচ্ছে।
অন্যদিকে, পাহাড়ের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘ ফোনটা নামিয়ে প্রীয়তার হাতে দিয়ে দিল। তার মুখ বিবর্ণ। চোখে কোনো অশ্রু নেই, অথচ চোখ দুটো যেন রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। সে হালকা গলায় বলল, “কার জন্য লড়বো আমি প্রীয়তা? যাকে ভালোবাসি, সেই যদি নিজেই শত্রু পক্ষ হয় তাহলে আর যুদ্ধের মানে কী?”
মেঘের শব্দে কোনো নাটকীয়তা নেই। আছে শুধু চূড়ান্ত পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। সে একটু থেমে আবার বলল, “সব শেষ। সত্যিই সব শেষ। আর কিছু করার নেই।”
প্রীয়তা চোখের জল মুছল। মেঘ গাড়ির দরজা খুলতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে ধীর পায়ের শব্দ থামলো। চেনা কণ্ঠের একটার ঠান্ডা ডাক ভেসে এলো, “মেঘ।”
মেঘ ঘুরে দাঁড়াল। শেহতাজ আর কারান দাঁড়িয়ে। এতটাই অপ্রত্যাশিত যে এক মুহূর্ত বাস্তবতা অবিশ্বাস্য ঠেকল। শেহতাজের মুখে সেই পরিচিত, পরিমিত হাসি। সে একটু এগিয়ে এসে তার চিরচেনা ঠান্ডা ভঙ্গিতে বলল, “আমি আশা করিনি তোমার সাথে এখানে এভাবে দেখা হবে।
ভেবেছিলাম… একটু অন্যভাবে, অন্য কোথাও দেখা হবে। পরিস্থিতিটা হয়তো ভিন্ন হবে।”
মেঘ কিছু বলল না। তার দৃষ্টি স্থির। শান্ত। শেহতাজ চারপাশে একবার তাকাল। ইমরান আর প্রীয়তার উপস্থিতি দেখে পরিবেশটা পড়ে নিতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। সে আবারো বলল, “যাই হোক, দেখা তো হয়ে গেল। মহলের এতো কাছে থেকে মহলে না যাওয়াটা কিন্তু অন্যায়। তাছাড়া তুমি সম্পর্কে আমার শালা হচ্ছো।”
শেহতাজ সুক্ষ্ম খোঁচাটা দিয়েই পরিবেশটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। মেঘ এবার একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “সবটা তো আপনার থেকে ভালো কেউ জানে না মিস্টার শেহতাজ। তাও এতো কিছু?”
“সব জানার পরও, সব কিছু জানতে নেই। আর কিছু জিনিস চোখ বন্ধ করে যেতে দেয়াই ভালো। তাই আমিও দিচ্ছি।” এটুকু বলেই শেহতাজ আরো কয়েক কদম এগিয়ে বলল, “রানী সব সময় রাজারই হয়। আর যেটা আমার নিজের, সেটা ছিনিয়ে নিতে আমি শেহতাজ দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে পারি।”
শেহতাজের এক কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল পরিবেশটাকে বদলে দিতে। গল্পটা এখন আর শুধু ভালোবাসার নয়। এটা ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত আর নিয়ন্ত্রণের। মেঘ আরো কয়েক কদম এগিয়ে শেহতাজের চোখে চোখ রেখে বলল, “এদিকেই তো আপনার সাথে আমার সব থেকে বেশি অমিল। মেঘ তার ভালোবাসার জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তাছাড়া জোর করে মানুষ পাওয়া যায়। তবে সে মানুষটা আদোতেও তার থাকে তো?
আর আপনার আমার এই ভদ্রতা না পোষালে জানাবেন। বয়স আর অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে যেতে পারি তবে হেরে যাবো না।”
শেহতাজ একটা রহস্যময় হাসি টেনে বলল, “আই জাস্ট লাভ ইউর এটিটিউড। এখন তো সম্পর্ক আরো মজবুত হচ্ছে শালা বাবু। তাছাড়া মানুষ আমার হয়ে এলে বাকি সব রেজিস্ট্রি করে এনে নেবো। তুমি ওসব ভেবো না। তুমি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবো।”
“শুভ কামনা আপনার জন্য। সম্পর্ক বদলাতে এক মুহূর্তও প্রয়োজন হয় না মাথায় রাখবেন। আর হ্যাঁ, সময় ফিরে ফিরে আসে।”
এটুকু বলে মেঘ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। গাড়ির দরজাটা খুলে ভেতরে উঠে পড়ল। ইমরান আর প্রীয়তাও তার পেছন পেছন গিয়ে বসলো। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই পাহাড়ের রাস্তার নীরবতা ভেঙে গেল। পেছনে শেহতাজ দাঁড়িয়ে রইল। একই জায়গায়। একই ভঙ্গিতে। ঠোঁটের কোণে সেই চতুরতার হাসিটা ফিকে হলো সামান্য।
গাড়িটা অনেকক্ষণ চলল। পাহাড়ি পথ পার হলো। ভেতরে কেউ কথা বলল না। ইঞ্জিনের একটানা শব্দে জমে থাকা নীরবতাটা ভারী হলো। প্রীয়তাই সেই নীরবতা ভাঙল। সে নিচু গলায় বলল, “লোকটা একেবারেই সুবিধার না। সব জানে। সব বুঝেও এমন আচরণ করছে। যেন রুশাকেই বিয়ে করা ওর একমাত্র মিশন। মানুষটা প্রেমে না, ক্ষমতায় আসক্ত।”
ইমরান মাথা নাড়ল, “আমারও তাই লাগছে। কেমন একটা রেষারেষি ভাব আছে। ঠিক যেন মেঘের সাথে অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কথার আড়ালে হুমকি ছিল। কিন্তু শত্রুতা কি থাকতে পারে?”
প্রীয়তা প্রতি উত্তর করল, “শত্রুতা নাকি সবই সম্পত্তি?”
মেঘ কিছু বলল না। স্টিয়ারিংয়ের ওপর তার হাতটা আরো শক্ত হয়ে এলো। চোখ সামনে রাস্তার দিকে স্থির, কিন্তু মন অনেক দূরে। তবে তার কানে কথাটা কয়েকবার বাজলো। “শত্রুতা নাকি সম্পত্তি?” সে শুনছিল সব কথা। একটাও এড়াচ্ছিল না। তবু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তার হাতে যে আর কিছুই নেই। যেখানে রুশাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেখানে লড়াই করার মানে নেই। ভালোবাসা যদি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সাহস দেখিয়ে পিছিয়ে আসাটাই শেষ সম্মান। গাড়িটা এগিয়ে যেতে থাকল।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া৪৮.
ভোর এলো। কিন্তু সকালটা স্বাভাবিক হলো না। রুপমহলে এক অদ্ভুত তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। কেউ হাঁটছে দ্রুত পায়ে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ অকারণে হাসছে। আয়োজন চলছে, একটা কৃত্রিম উৎসবের গন্ধ। এই বাড়ির দেয়ালগুলো আবার নতুন এক ইতিহাস লিখতে বসেছে।
সময়টা হঠাৎ করেই যেন ছুটতে শুরু করল।
যেন কেউ অদৃশ্য হাতে ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে একটার পর একটা দিন, একটা রাত। রুপমহলে আর থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে মানেই বাস্তবায়ন শুরু। বাড়িটার ভেতর শব্দ বেড়ে গেল। সবটাই ব্যস্ততার শব্দ। কাপড়ের ঘর্ষণ, ফোনকলের ফিসফাস, লোকজনের আসা-যাওয়া। ঘরের কোণে কোণে সাজের প্রস্তুতি। পুরোনো দেয়ালগুলো নীরবে তাকিয়ে দেখছে আবারও তারা এক জীবনের মোড় ঘোরাতে চলেছে।
রুশা এই সব কিছুর মাঝেই অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ।
সে কারো সামনে আসছে না। কারো সাথে কথা বলছে না। তার পৃথিবীটা যেন নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে নিয়েছে। ফোনটা বন্ধ। সব যোগাযোগের রাস্তা ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে ফেলা। যেন কেউ তাকে আর থামাতে না পারে। কিংবা যেন নিজেই আর পিছু হটতে না পারে। ঠিক তখনই সুখনীড় প্যালেসে পৌঁছায় বিয়ের কার্ড। রুশা আর শেহতাজের বিয়ের কার্ড। সংবাদটা ছোট্ট, বিয়ের তারিখ পড়ে গেছে।
তবে এই এক লাইনের ভেতরেই যেন মেঘের সমস্ত পৃথিবী ভেঙে পড়ল। সে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। তবে পরে ঠিকই হাসলো, একদম অপ্রাসঙ্গিক, ভাঙা হাসি। তারপর বুকের ভেতর কোথাও একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। সব কিছু এত দ্রুত কেন? এত তাড়াহুড়ো কেন?
মেঘ আবারো ফোন তুলল। একবার। দু’বার। দশবার। প্রতিবারই সেই পরিচিত যান্ত্রিক শব্দ, সুইচড অফ। রুশা একেবারেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। যেটুকু আশা নিয়ে সে টিকে ছিল সেটুকুও যেন ক্ষয়ে পড়ছে।
মেঘ বসে পড়লো। চেয়ারে নয়, মাটিতে। যেন শরীর আর ভর বহন করতে পারছে না। চোখের সামনে অন্ধকার নামলো। রুশা… আর এই যুদ্ধের অংশ নয়। এই পরিস্থিতির ভয়টাই পাচ্ছিলেন শাফিন আহমেদ। বরাবরের মতোই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, “যা ঘটার তাই ঘটছে। এবার তোমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তোমার ভিসা চলে এসেছে। তোমাকে ইউএসএ যেতে হবে। তোমার সামনে সারা জীবন পড়ে আছে।”
মেঘ এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে বলে উঠল, “না, আমি কোথাও যাবো না। অন্ততঃ এই অধ্যায়ের শেষ না করে কিছুতেই যাবো না।”
শাফিন আহমেদ বিস্মিত হন। এই ছেলেটাকে তিনি এমন দেখেননি। চোখে বিদ্রোহ নেই, কান্নাও নেই, আছে শুধু শূন্যতা। তিনি বললেন, “এই অধ্যায়টা এখানে সমাপ্ত মেঘ।”
“তবে শেষটা পুরো দমে হোক আব্বু। কথা দিচ্ছি, আমি চলে যাবো। শুধু শেষটা শেষ হোক।”
শাফিন আহমেদ আর কথা বাড়ালেন না। সিন্ধান্ত হলো শাফিন আহমেদ কিংবা কাঁকন সুলতানা কেউই বিয়েতে যাবেন না। কারো পক্ষে এই উৎসবের মুখোশ পরা সম্ভব না। আনন্দের ভান করা সম্ভব না।
তবে এই সব কিছুর বাইরে ছিল প্রীয়তা। অসুস্থতা তাকে আলাদা করে রেখেছিল। হাতের এলার্জি, ডাক্তার, ওষুধ এই ছোট্ট বৃত্তেই আটকে ছিল তার দিনগুলো। রুশার সাথে যোগাযোগও কমে গিয়েছিল। কিছুই সে জানত না। কিছুই আন্দাজ করতে পারেনি। তবে তার বাড়িতে বিয়ের কার্ড পৌঁছালেই ওর পৃথিবী একেবারে থমকে যায়। কার্ডটা হাতে নিয়েই সে বুঝে গেল সে, কোথাও কিছু ভয়ংকর ভুল হয়েছে। সে প্রশ্ন করল না। অপেক্ষা করল না। সোজা রুপমহলের দিকে ছুটে গেল। রুপমহলে আয়োজন চলছে, আলো জ্বলছে, মানুষের মুখে ব্যস্ততা। কিন্তু এই আলোর ভেতরে কোথাও একটা গভীর অন্ধকার লুকিয়ে আছে, যেটা শুধু সে দেখতে পাচ্ছে।
প্রীয়তা রুপমহলে ঢুকেই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। রুবাইকে দেখেই তার গলা চড়ে উঠল, “এত বড় একটা সিদ্ধান্ত, এত বড় একটা ঘটনা আমাকে জানানো হয়নি কেন?”
তারপর রুশার দিকে ঘুরে, “তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না রুশা? আমি কি তোর কেউ না?”
রুশা প্রথমে কিছু বলল না। চোখ নামিয়ে রাখল। যেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার শক্তি তার বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে। রুবাই চেষ্টা করল পরিস্থিতি সামলাতে, কিন্তু প্রীয়তা থামার মানুষ না। সে আবার বলল, “আমি অসুস্থ ছিলাম বলে কি আমাকে অদৃশ্য করে দিয়েছিস? নাকি ধরে নিয়েছিস আমি কিছুই বুঝবো না?”
এই কথাগুলো বলতেই হঠাৎ করেই প্রীয়তার গলা ভেঙে গেল। রাগটা কান্নায় বদলে যেতে একটুও সময় নিল না। সে বসে পড়ল। মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল শিশুর মতো। এতদিন জমে থাকা ক্ষোভ, দুঃখ, ভয় সব একসাথে বেরিয়ে এলো। রুশা তখনই এগিয়ে এলো। যে রুশা নিজেই ভেঙে পড়ার কিনারায় দাঁড়িয়ে, সেই রুশাই প্রীয়তাকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, “চুপ কর, এখন কাঁদিস না। তুই কাঁদলে আমি আর পারবো না।”
রুবাই নিশ্চুপ বসে দেখলো শুধু। এ এক উল্টো দৃশ্য, যাকে সামলানোর কথা ছিল, সেই সামলাচ্ছে। রুশা প্রীয়তার হাতটা ভালো করে দেখল। ক্ষতগুলো অনেকটাই শুকিয়েছে, লালচে দাগ রয়ে গেছে এখনো। রুশা জিজ্ঞেস করল, “এখনো ব্যথা আছে?”
প্রীয়তা মাথা নাড়ল, “ব্যথা তো থাকবেই। তবে সহ্য করা যায়।”
পরিবেশ শান্ত হলো। এরপর সমস্ত ঘটনা একেবারেই বিস্তারিত রুশা নিজ মুখে বলল। প্রীয়তা একেবারেই থমকে গেল। তার ঠিক কি বলা উচিত বুঝে পেল না। তবে তার যে কিছু করতেই হবে। তাছাড়া এই বাড়ির ভেতরে বসে কিছু হবে না। প্রীয়তা যেভাবে ঝড়ের গতিতে গতিতে এসেছিল ঠিক সেভাবেই রুপমহল থেকে বেরিয়ে এসে কল করলো মেঘকে। কোন কথা না বাড়িয়ে একেবারেই গুরুতর তলফ করলো। ইমরানও মেঘের সাথেই ছিল। ইমরান প্রীয়তাকে ওখানেই মহলের পিছের রাস পাহাড়ে অপেক্ষা করতে বলল। প্রীয়তা সেখানেই অধৈর্যের মত বসে রইলো। বেশ লম্বা সময় পর মেঘ আর ইমরান এসে পৌঁছাল। কোন রকম বার্তি কথা ছাড়াই প্রীয়তা কথা শুরু করল। একদম গোছানোভাবে। একদম নির্দয় সত্যে। সে তার বাবার কথা স্পষ্ট রুপে আবারো বলল। তার বাবা যে শেহতাজকে পছন্দ করে না এসব তো নতুন নয়। তাছাড়া ডিআইজি পারভেজ সওদাগরের সততা এই সানন্দাপুরে প্রসিদ্ধ। মেঘ এই শেহতাজকে অপছন্দের বিষয়টা আংশিক রুপে জানে। এরই সাথে রুশা এর আগে প্রীয়তা যা যা শেয়ার করেছিল, শেহতাজের দৃষ্টি, তার কথা বলার ভঙ্গি, তার উপস্থিতিতে রুশার অস্বস্তি এ সব কিছুই বিস্তারিত জানালো।
মেঘ আশ্চর্য হলো। এই সব কথা সে জানত না। একটাও না। রুশা কখনো বলেনি। কখনো ইঙ্গিতও দেয়নি। ইমরান নিজের রাগ আর লুকাতে পারলো না, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “রুবাই, একবারও বলেনি এসব।”
প্রীয়তা বলল, “রুশা ওর সব মনের কথা আমাকে শেয়ার করে। আমি কিছুতেই চাই না শেহতাজের সাথে ওর বিয়ে হোক, প্লিজ মেঘ কিছু তো করো। রুশা একটা ওয়াদার জন্য নিজের জীবন এভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে না।”
মেঘ শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রীয়তাকে বলল, “একবার কথা বলিয়ে দাও ওর সাথে। আমি কিছুতেই ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। শেষবার।”
ইমরান খুব অবাক হয়ে বলল, “রুবাই যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে না?”
“আমি কল করেছিলাম। লাভ হয় নি। রুশা কথা বলে নি।”
ইমরান শুধু দাঁতে দাঁত চেপে রইল। প্রীয়তা রুবাইয়ের নম্বরে কল দিতেই রিসিভ হলো। প্রীয়তা কোন কথা না বাড়িয়ে বলল, “রুশাকে ফোনটা দে তো। ইমারজেন্সি কথা আছে।”
রুবাই কিছু না বলেই ফোনটা রুশার হাতে দিয়ে দিল। এদিকে প্রীয়তাও ফোনটা মেঘের হাতে দিল। মেঘ হ্যালো বলা মাত্রই ওপাশে কোন আওয়াজ এলো না। যেন রুশা জমে গেছে। কিছু সময় নিরবতা কাটিয়ে, মেঘ কিছু বলার আগেই রুশা বলে উঠল, “মেঘ। তোমার সাথে আমার শেষ কথা হয়ে গেছে। এবার আমাকে মুক্তি দাও। আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না। তুমি আমাকে ভেঙ্গে দিচ্ছো বারবার। আমি তোমার সম্মুখীন হতে চাই না। যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করো।”
মেঘ থমকে গেল। রুশার প্রতিটা শব্দ ছুরি হয়ে নামল। সে আবার বলল, “আমি তোমাকে চাই না মেঘ, তোমার ভালোবাসা তোমার আবেগ সব প্রত্যাখ্যান করছি আমি। আমি চাই আমার বাবার সিদ্ধান্ত স্থায়ী হোক। এইটাই আমার পথ। আমি শেহতাজকে হাসি মুখে বিয়ে করছি। মেনে নাও।
আমাকে অসীম ভালোবাসার দাবি করো না তুমি? তবে মেনে নাও। আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না।”
রুশা এটুকু বলেই কলটা কেটে দিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ঘরের ভেতর নিঃশব্দে ডুকরে কেঁদে উঠল। এমন কান্না, যেখানে শুধু আর্তনাদ। বুকের ভেতর জমে থাকা সব সংযম, সব শক্ত হয়ে থাকা সিদ্ধান্ত এক নিমেষে ভেঙে পড়ল। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল, যেন নিজের কান্নাটাকেও লুকাতে চায়। সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে থাকা যে কতটা অসম্ভব, এই মুহূর্তে সেটা সে টের পাচ্ছে।
অন্যদিকে, পাহাড়ের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘ ফোনটা নামিয়ে প্রীয়তার হাতে দিয়ে দিল। তার মুখ বিবর্ণ। চোখে কোনো অশ্রু নেই, অথচ চোখ দুটো যেন রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। সে হালকা গলায় বলল, “কার জন্য লড়বো আমি প্রীয়তা? যাকে ভালোবাসি, সেই যদি নিজেই শত্রু পক্ষ হয় তাহলে আর যুদ্ধের মানে কী?”
মেঘের শব্দে কোনো নাটকীয়তা নেই। আছে শুধু চূড়ান্ত পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। সে একটু থেমে আবার বলল, “সব শেষ। সত্যিই সব শেষ। আর কিছু করার নেই।”
প্রীয়তা চোখের জল মুছল। মেঘ গাড়ির দরজা খুলতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে ধীর পায়ের শব্দ থামলো। চেনা কণ্ঠের একটার ঠান্ডা ডাক ভেসে এলো, “মেঘ।”
মেঘ ঘুরে দাঁড়াল। শেহতাজ আর কারান দাঁড়িয়ে। এতটাই অপ্রত্যাশিত যে এক মুহূর্ত বাস্তবতা অবিশ্বাস্য ঠেকল। শেহতাজের মুখে সেই পরিচিত, পরিমিত হাসি। সে একটু এগিয়ে এসে তার চিরচেনা ঠান্ডা ভঙ্গিতে বলল, “আমি আশা করিনি তোমার সাথে এখানে এভাবে দেখা হবে।
ভেবেছিলাম… একটু অন্যভাবে, অন্য কোথাও দেখা হবে। পরিস্থিতিটা হয়তো ভিন্ন হবে।”
মেঘ কিছু বলল না। তার দৃষ্টি স্থির। শান্ত। শেহতাজ চারপাশে একবার তাকাল। ইমরান আর প্রীয়তার উপস্থিতি দেখে পরিবেশটা পড়ে নিতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। সে আবারো বলল, “যাই হোক, দেখা তো হয়ে গেল। মহলের এতো কাছে থেকে মহলে না যাওয়াটা কিন্তু অন্যায়। তাছাড়া তুমি সম্পর্কে আমার শালা হচ্ছো।”
শেহতাজ সুক্ষ্ম খোঁচাটা দিয়েই পরিবেশটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। মেঘ এবার একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “সবটা তো আপনার থেকে ভালো কেউ জানে না মিস্টার শেহতাজ। তাও এতো কিছু?”
“সব জানার পরও, সব কিছু জানতে নেই। আর কিছু জিনিস চোখ বন্ধ করে যেতে দেয়াই ভালো। তাই আমিও দিচ্ছি।” এটুকু বলেই শেহতাজ আরো কয়েক কদম এগিয়ে বলল, “রানী সব সময় রাজারই হয়। আর যেটা আমার নিজের, সেটা ছিনিয়ে নিতে আমি শেহতাজ দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে পারি।”
শেহতাজের এক কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল পরিবেশটাকে বদলে দিতে। গল্পটা এখন আর শুধু ভালোবাসার নয়। এটা ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত আর নিয়ন্ত্রণের। মেঘ আরো কয়েক কদম এগিয়ে শেহতাজের চোখে চোখ রেখে বলল, “এদিকেই তো আপনার সাথে আমার সব থেকে বেশি অমিল। মেঘ তার ভালোবাসার জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তাছাড়া জোর করে মানুষ পাওয়া যায়। তবে সে মানুষটা আদোতেও তার থাকে তো?
আর আপনার আমার এই ভদ্রতা না পোষালে জানাবেন। বয়স আর অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে যেতে পারি তবে হেরে যাবো না।”
শেহতাজ একটা রহস্যময় হাসি টেনে বলল, “আই জাস্ট লাভ ইউর এটিটিউড। এখন তো সম্পর্ক আরো মজবুত হচ্ছে শালা বাবু। তাছাড়া মানুষ আমার হয়ে এলে বাকি সব রেজিস্ট্রি করে এনে নেবো। তুমি ওসব ভেবো না। তুমি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবো।”
“শুভ কামনা আপনার জন্য। সম্পর্ক বদলাতে এক মুহূর্তও প্রয়োজন হয় না মাথায় রাখবেন। আর হ্যাঁ, সময় ফিরে ফিরে আসে।”
এটুকু বলে মেঘ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। গাড়ির দরজাটা খুলে ভেতরে উঠে পড়ল। ইমরান আর প্রীয়তাও তার পেছন পেছন গিয়ে বসলো। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই পাহাড়ের রাস্তার নীরবতা ভেঙে গেল। পেছনে শেহতাজ দাঁড়িয়ে রইল। একই জায়গায়। একই ভঙ্গিতে। ঠোঁটের কোণে সেই চতুরতার হাসিটা ফিকে হলো সামান্য।
গাড়িটা অনেকক্ষণ চলল। পাহাড়ি পথ পার হলো। ভেতরে কেউ কথা বলল না। ইঞ্জিনের একটানা শব্দে জমে থাকা নীরবতাটা ভারী হলো। প্রীয়তাই সেই নীরবতা ভাঙল। সে নিচু গলায় বলল, “লোকটা একেবারেই সুবিধার না। সব জানে। সব বুঝেও এমন আচরণ করছে। যেন রুশাকেই বিয়ে করা ওর একমাত্র মিশন। মানুষটা প্রেমে না, ক্ষমতায় আসক্ত।”
ইমরান মাথা নাড়ল, “আমারও তাই লাগছে। কেমন একটা রেষারেষি ভাব আছে। ঠিক যেন মেঘের সাথে অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কথার আড়ালে হুমকি ছিল। কিন্তু শত্রুতা কি থাকতে পারে?”
প্রীয়তা প্রতি উত্তর করল, “শত্রুতা নাকি সবই সম্পত্তি?”
মেঘ কিছু বলল না। স্টিয়ারিংয়ের ওপর তার হাতটা আরো শক্ত হয়ে এলো। চোখ সামনে রাস্তার দিকে স্থির, কিন্তু মন অনেক দূরে। তবে তার কানে কথাটা কয়েকবার বাজলো। “শত্রুতা নাকি সম্পত্তি?” সে শুনছিল সব কথা। একটাও এড়াচ্ছিল না। তবু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তার হাতে যে আর কিছুই নেই। যেখানে রুশাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেখানে লড়াই করার মানে নেই। ভালোবাসা যদি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সাহস দেখিয়ে পিছিয়ে আসাটাই শেষ সম্মান। গাড়িটা এগিয়ে যেতে থাকল।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️} কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}