ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৫৩তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৫৩.

রাত খুব ধীরে নেমে এলো শহরের উপর। রুপমহলের আলো তখনও নিভে যায়নি, সাউন্ড সিস্টেমে গান তখনো বাজছে। কিন্তু উৎসবের কোলাহল স্তিমিত হয়ে আসছে। তবুও রাতটা যেন কারও জন্য স্বস্তির না। বরং রাতটা অদ্ভুত ভারী, অস্বস্তিকর এক অদৃশ্য আশঙ্কায় ভরা। রুপমহলের নিজের ঘরের এক কোণে বসে আছে রুশা। হলুদের সাজ অনেক আগেই খুলে ফেলেছে। ভারী গয়না, ফুল, সব ছড়িয়ে রাখা টেবিলের ওপর। মুখ ধুয়ে ফেললেও হলুদের মৃদু হলুদাভ আভা এখনও রয়ে গেছে তার ত্বকে।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দ নীরবতা। দূরে কোথাও কর্মচারী- সাহায্যকারীদের পায়ের শব্দ, মাঝেমধ্যে হাসির ভাঙা টুকরো ভেসে আসছে। কিন্তু সেই শব্দগুলো এই ঘরে ঢুকতে পারছে না। রুশা বিছানার এক কোণে বসে আছে‌। চোখ দুটো লাল। অনেকক্ষণ ধরে কান্না করলে যেমন হয়। নিজের ফোনটা তার হাতে শক্ত করে ধরা। স্ক্রিনে ভেসে আছে মেঘের হাসি মুখের একটা স্থিরচিত্র। সে নিজেকে খুব সামলেছে তবে আর কত? আজকের পর থেকে আর না। সে আর ফিরেও তাকাবে না এই মুখটায়। তার বিষাক্ত উপস্থিতি সব জায়গা থেকে তুলে নেবে। সে এই কয়েকদিন দিন যে শক্ত হবার নাটক চালিয়ে গেছে তা সে সারা জীবন পারবে তো? হাজারটা প্রশ্নে রুশা জড়জড়িত। এই ইটপাথরের চারদেয়ালে এখন আর তার শক্ত থাকার ভানটুকু নেই। চোখের জল থামছেই না। একসময় সে মুখ দু’হাতে ঢেকে ফেলল। শব্দহীন কান্না ফুঁপিয়ে উঠল।
এই বাড়ির দেয়ালগুলো তার কাছে কারাগারের মতো। কাল তার বিয়ে। এই একটি বাক্য যেন বুকের ভেতর বারবার ধাক্কা পাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার কাছে সময় যেন থেমে আছে। সারা রাত সে আর ঠিকমতো ঘুমোতে পারল না। কখনও জানালার পাশে দাঁড়াল, কখনও বিছানায় ফিরে এল, আবার কখনও নীরবে কেঁদে উঠল। এটাই তো তার একান্ত নিজের জীবনের শেষ দিন। এরপর থেকে হয়তো কান্নার জন্যও অনুমতির প্রয়োজন হবে।
রুশার এই অনুভুতি একা রুশা নয়, জানে আরো অনেকে। রুবাই তার পাশের কক্ষে কোন যুদ্ধ করছে না। বেলকনিতে অসহারের মতো বসে চাঁদ দেখছে। তার জীবনের সব থেকে বড় আফসোস সে এই বাড়ির মেয়ে। আভিজাত্য আসলেই কি সবাইকে সুখ দেয়? কোথায়? তাকে তো শুধু দমবন্ধ করা জীবন দিচ্ছে। শুধু একা সে নয়। রুশাও তো ফেসে গেছে এই গোলক ধাঁধায়। মরিচিকায় কেন হারিয়ে পড়ছে তারা? এটা কি তবে ভালোবাসার শাস্তি?
এই অনুভুতি গুলো যেন রুপমহল থেকে মুক্তি পেল না। বন্ধ রইল এই মহলের চাকচিক্যে। শহরের অন্য প্রান্তে ইমরান এক মুহূর্তের জন্যও স্থির নেই। ইমরান ছুটে চলেছে এক নতুন রুপে। কখনও কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে, কখনও আবার দ্রুত মেসেজ পাঠাচ্ছে। ঠিক ঠাক করছে অনেক কিছু। দায়িত্বের ভার যেন তার কাঁধে জমে উঠেছে। মাঝে মাঝে সে থেমে যায়। একটা গভীর শ্বাস নেয়। তারপর আবার কাজে ডুবে যায়। এই খেলায় ভুলের সুযোগ নেই। তার দায়িত্বটা অনেক। 
ওদিকে ‘সুখনীড় প্যালেসে’ মেঘ আর অরুপের রাতটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। স্টাডি রুমে আলো জ্বলছে গভীর রাত পর্যন্ত। টেবিলের উপর ছড়ানো কাগজ, ম্যাপ, কিছু নোট, ল্যাপটপের স্ক্রিনে খোলা কয়েকটা ফাইল। অরুপ একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, হাতে কলম। মেঘ সামনে দাঁড়িয়ে সব হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছে। কখনও দেয়ালে ঝোলানো ম্যাপের দিকে তাকাচ্ছে, কখনও আবার টেবিলের কাগজে কিছু লিখছে। দুজনের কথোপকথন খুব সংক্ষিপ্ত। মেঘ বলল, “এই রাস্তাটা ক্লিয়ার থাকবে?”
“থাকার কথা।”
“আর এখানে?”
“সিকিউরিটি কম থাকবে। আজকের তথ্য তাই বলছে।”
কথাগুলো খুব সাধারণ শোনালেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা বড় ঝুঁকি। একসময় অরুপ মেঘের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “কাল যদি কিছু ভুল হয়?”
মেঘ থামল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “তাহলে আমরা হারব। ধরে নেবো এটাই ভবিতব্য। সব ভবিতব্য তো আর বদলানো যায় না।”
এই কথাটুকুতে অরুপের বুকের ভেতর কেমন যেন টান লাগল। ঘড়ির কাঁটা তখন গভীর রাত পেরিয়ে ভোরের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু তাদের দুজনের চোখে ঘুম নেই। আগামীকাল হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় জয়, অথবা সবচেয়ে ভয়ংকর হার।
ওদিকে শহরের অন্য এক প্রান্তে এসব ছুয়ে উঠছে প্রীয়তাকেও। তার বন্ধুদের সব পরিকল্পনার খুঁটিনাটি তার জানা নেই। কিন্তু কিছুটা আন্দাজ তার আছে। তার বিশ্বাস আছে বন্ধুদের উপর। সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। মনে মনে শুধু একটা কথাই বলল, “সব ঠিক হোক।”
লম্বা, ভারী রাতটা অবশেষে ফুরোল। ভোরের আলো খুব ধীরে শহরের উপর নেমে এল। রুপমহলের ভেতরে নতুন দিনের শুরু। রাতের ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই সরিয়ে ফেলে বাড়ির লোকজন আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। কারণ আজ কোনো সাধারণ দিন নয়। আজ এ বাড়ির নতুন প্রজন্মের প্রথম বিয়ে। জমিদার বংশের পুরনো পরম্পরা অনুযায়ী সকাল থেকেই শুরু হলো আয়োজন। রুপমহলের বড় বাগানে আবার নতুন করে সাজসজ্জা করা হল। কর্মচারীরা দৌড়ে বেড়াতে লাগল এদিক-ওদিক। কেউ ফুলের মালা সাজাচ্ছে, কেউ আবার অতিথিদের বসার জায়গা ঠিক করছে। বড় বারান্দায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা রকমের পিতলের থালা। সবকিছুই নিখুঁতভাবে সাজানো। পুরনো দিনের সেই জমিদার বাড়ির গাম্ভীর্য যেন আবার ফিরে এসেছে। বাড়ির বয়স্ক নারীরা আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে নিল।
রুশার কাছে অবশ্য এই সকালটা ভয়ংকর স্বপ্নের মতো। রাতের কান্নায় তার চোখ দুটো ফুলে উঠেছে। তবু তাকে আবার সাজানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। রুপমনি বেগম নিজ হাতে নতুন ভারী স্বর্ন খচিত গাঢ় খয়েরী রঙের শাড়ি, নানান গয়না এ ঘরে রেখে গেছেন। এগুলো দিয়েই আজ তাকে সাজানো হবে। শাড়ির রঙটা অবশ্য শেহতাজের পছন্দ। 
সকাল একটু বাড়তেই রুপমহলের বড় ফটকের সামনে এসে থামল প্রীয়তার গাড়ি। আজ সে খুব সকালেই চলে এসেছে। গত রাতের কারান সংক্রান্ত ঘটনাগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরছিল, এখানে রুশার জায়গায় অন্য কেউ হলে সে কোনদিনও আসতো না। তবে আজ সে দেরি করতে চায়নি। ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখাচোখি হল শেহতাজের সাথে। প্রীয়তা আজ আর চোখ সরালো না। থমথমে মুখে শেহতাজকে ভালো করে দেখে নিল। তাকে সাদা পাঞ্জাবিতে অদ্ভুত রকমের মায়াবী লাগছে। প্রীয়তা নিজের মনেই আউড়ে উঠলো, “লোকটার এই মাসুম চেহারা দেখে আদৌতেও কেউ বলবে, এই লোক আস্ত একটা শয়তান?” 
প্রীয়তা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ সরিয়ে নিল। এগোতে আরও কয়েক কদম বাড়াতেই চেনা কন্ঠস্বর পিছু ডাকল। প্রীয়তা ফিরে দেখলো। রাফি এসে হাজির। একটা মস্ত হাসি প্রীয়তার চোখে মুখে খেলে গেল। এই রাক্ষস পুরিতে তার যে সঙ্গি এসে জুটল। প্রীয়তা জানে না আজ তাকে ঠিক কী করতে হবে। সবকিছু যেন এক অদৃশ্য পরিকল্পনার অংশ, আর সে সেই পরিকল্পনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তবু তার ভেতরে একটা শান্ত বিশ্বাস আছে। মেঘদের উপর। রাফিকে গতকাল অনেকবার বলা হয়েছিল হলুদের অনুষ্ঠানে আসতে, কিন্তু সে আসেনি। আজ অবশ্য আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তারা দুজনেই রুশার ঘরের দিকে এগোলো। বাড়িটা আজ আরও বেশি জমকালো লাগছে।
এই সময় শহরের অন্য প্রান্তে আরেকটা যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই মেঘ আর অরুপ বেরিয়ে পড়েছে।
মেঘের গাড়ি দ্রুত গতিতে শহর ছেড়ে এগিয়ে চলেছে চাঁদপুরের দিকে। গন্তব্য, চন্দ্রমহল। তবে তার আগে অনেক কাজ। আজকের দিনটা তাদের জন্য খুব কঠিন। কারণ আজকের খেলাটা বড়। একটা ভুল মানেই সব শেষ। তবু তারা থামছে না। আজ হয়তো তারা জিতবে অথবা হারবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।
প্রীয়তা আর রাফি ধীর কদমে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। রুপমহলের ভেতরের করিডোরগুলো আজ আরও আলোকিত। দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ঝাড়বাতিগুলো সকালেও জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। বড় বড় জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো আর সেই ঝাড়বাতির হলদেটে আলো মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। রুশার ঘরের সামনে এসে দুজনেই থামল। ভেতর থেকে ভেসে আসছে নারীদের ব্যস্ত কণ্ঠস্বর। প্রীয়তা দরজায় হালকা নক করতেই ভেতর থেকে কেউ বলল,
“আসুন।”
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো। ঘরের মাঝখানে বড় আয়নার সামনে বসে আছে রুশা। তাকে ঘিরে দুইজন বিউটিশিয়ান ব্যস্ত হাতে কাজ করছে। কারও হাতে মেকআপ ব্রাশ, কেউ আবার তার চুলে গুঁজে দিচ্ছে ক্লিপ। আলাদা সরিয়ে রাখা সাদা জুঁই আর গোলাপের ছোট ফুল। ভারী স্বর্ণখচিত গাঢ় খয়েরী শাড়িটা ইতিমধ্যেই পড়ানো হয়েছে তাকে। টেবিলে ছড়িয়ে আছে টিকলি, কানের ভারী ঝুমকা, গলার অনেক গুলো সোনার হার, চুড়ি আরো অনেক ভারি গয়না। আজকের ভারি মেকআপ এখনো শেষ হয়নি তাও কি অদ্ভুত অন্য রকম লাগছে রুশাকে। যে কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না। রুশা একবার চোখ মেলে তাকালো ওদের দিকে। রাফিকে দেখে তার গলায় হঠাৎ সত্যিকারের আনন্দ ফুটে উঠল।
রাফি অবশ্য কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। রুশার প্রতি খোবটুকুই তাকে এমন শক্ত করে রেখেছে। কিছু কথপকথন চলল প্রীয়তার সাথে। এর মাঝেই বিউটিশিয়ানদের একজন হুঁসিয়ারি দিয়ে বলল, “আচ্ছা, আপনারা একটু কনের সাজ শেষ করতে দিন। পরে কথা বলুন।”
রাফি আর প্রীয়তা কক্ষ থেকে বেরিয়ে রুবাইকে খুঁজতে লাগল। ঘরের ভেতর আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। রুপমহলের বাইরে একে একে গাড়ি এসে থামতে শুরু করল। বিয়েতে নিয়ন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। বড় বড় কালো গাড়ি, কিছু বিলাসবহুল এসইউভি। ফটকের সামনে কর্মচারীরা দাঁড়িয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা করছে। বাগানে জমে উঠছে মানুষের ভিড়।
কেউ গল্প করছে, কেউ চা খাচ্ছে, কেউ আবার কনের সাজ দেখার জন্য আগ্রহ নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। 
ঠিক এই সময় মেঘ আর অরুপ দীর্ঘ রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছাল চাঁদপুরের নদীর কাছাকাছি সেই পুরনো জনপদে। চাঁদপুরের বাতাসে অবশ্য একটা আলাদা গন্ধ আছে।
নদীর সোঁদা গন্ধ। গাড়িটা ধীরে এসে থামল একটা নির্জন ঘাটের কাছে। ওখানেই একজন লোক দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় মেঘদের। উনি ওবাইদুল ইসলাম। মেঘের পূর্ব পরিচিত নয়। তবে এরকম পরিস্থিতির জন্য বিশ্বাসযোগ্য। লোকটা মাঝবয়সী, গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। এটা অবশ্য ছদ্মবেশ। মেঘ গাড়ি থেকে নেমেই তাকে দেখে এগিয়ে গেল। ওবাইদুল ইসলাম নিচু গলায় বলল, “আপনিই মেঘ?”
মেঘ শুধু মাথা নাড়ল। লোকটা চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, “সব খবর ঠিক আছে। তবে আজ পাহারা একটু কম। কিন্তু তাও আছে।”
অরুপ ভ্রু কুঁচকালো, “কতটা?”
“কম না। তবে ঢোকা অসম্ভবও না।”
মেঘ শান্ত গলায় বলল, “কোনো ব্যপার না। আপনার ফোর্স রেডি তো?”
“জি স্যার। যখনই লাগবে শুধু একটা ইশারাই যথেষ্ট।”
আর কথা বাড়লো না। লোকটাও আর কিছু না বলে সামনে হাঁটা শুরু করল। চন্দ্রমহল দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে। পুরনো শ্বেত পাথরের জমিদার বাড়ি। উঁচু দেয়াল, বড় লোহার ফটক, আর চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায় জায়গাটা সাধারণ নয়। এটা অবশ্য মহলের দক্ষিণ দিকের অংশ। হিসেব মতে পেছনের ফটকের অংশ। এখানেও কয়েকজন সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে, তবে সংখ্যায় অতি সামান্য। সামনের দরজার তুলনায় এই প্রহরা নাই বললেই চলে। ওবাইদুল ইসলাম দুটো সিকিউরিটি গার্ডদের মত কালো পোশাক মেঘের হাতে দিয়ে বললেন, “এটা পড়ে নেবেন। এতে ধরা পরলেও গুছিয়ে নেবার সময় পাবেন।”
মেঘ আর অরুপ একে অপরের দিকে তাকাল। এরপর পোশাক দুটো নিয়ে একে একে নিজেদের গাড়ির ভেতরেই তৈরি হয়ে নিল। এবার তারা ভেতরে যাবার জন্য একেবারেই প্রস্তুত। মেঘ ওবাইদুল ইসলামকে খুব শক্ত আওয়াজে বলল, “ঘন্টা খানেকের আগে যেন কোন ভাবেই মহলে বিদ্যুৎ না আসে। আর সিসিটিভিগুলোকে আলাদাভাবে অকেজো করুন। যেন কোন ফুটেজই না থাকে।“
“ওসব আমি সামলে নেবো। আমার হ্যাকিং টিমের আশে‌পাশেই আছে। ওরা নেটওয়ার্ক অব্দি ডাউন করে দেবে।”
মেঘ এবার দূর থেকেই একটু হিসেব কষে নিল, “পেছনের ফটক দিয়ে প্রবেশটা রিস্ক। এখানে ভেতরে প্রহরী।”
আরেকটু এগিয়ে নজর এলো। চন্দ্রমহলের পূর্ব দিকটা মূল প্রাসাদের তুলনায় অনেকটাই নির্জন। অর্ধেক অংশে নদী বাকি টুকে স্থল। উঁচু দেয়াল ঘিরে রেখেছে পুরো এলাকা। পুরনো ইটের দেয়ালের গায়ে লতাগুল্ম উঠে গেছে অনেকটা। কোথাও কোথাও শ্যাওলা জমে গাঢ় সবুজ হয়ে আছে। এদিকে নদীর বাতাস এসে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। মেঘ কিছুক্ষণ সেই দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “এখান দিয়েই যেতে হবে।”
অরুপও দেয়ালটা দেখে নিল। খুব উঁচু না হলেও সহজও নয়। ওবাইদুল ইসলাম নিচু গলায় বললেন, “ওপাশে একটা পুরনো আমগাছ আছে। দেয়ালের কাছে। ওটার ডাল দিয়ে ওঠা যায়।”
মেঘ মাথা নাড়ল, “আপনি আপনার লোকগুলো প্রস্তুত রাখুন। আমরা এগোই।”
ওবাইদুল শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। এরপর একটু দূরে সরে দাঁড়ালেন। মেঘ আর অরুপ দেয়ালের দিকে এগোল। তাদের পায়ের শব্দ যেন মাটিতে মিশে যাচ্ছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন গার্ড নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। তাদের নজর পেছনের ফটকের দিকে বেশি। এই দিকটা যেন তাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। অরুপ ফিসফিস করে বলল, “টাইমিং ঠিক আছে।”
মেঘ দেয়ালের পাশে এসে থামল। পুরনো আমগাছটার মোটা ডাল সত্যিই দেয়ালের গায়ে ঝুঁকে পড়েছে। প্রথমে ডালটা ধরে টেনে দেখল। মজবুত। তবু সে সাবধানে এগোল। অরুপও ঠিক তার পেছনেই উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা দুজনেই খুবই সন্তর্পণে দেয়াল টপকে চন্দ্রমহলের সীমায় প্রবেশ করলো। 
মাটিতে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। দূরে একটা বারান্দার কাছে একজন গার্ড দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার দৃষ্টি অন্যদিকে। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোনো শব্দ হলো কি না, কেউ টের পেল কি না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। সব শান্ত। শুধু বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ। অরুপ ফিসফিস করে বলল, “ফার্স্ট স্টেজ ক্লিয়ার।”
মেঘ কিছু বলল না। তার চোখ চারপাশে ঘুরছে।
চন্দ্রমহলের এই অংশটা যেন অবহেলিত।
ভাঙা মূর্তি, শুকনো ফোয়ারা, আগাছায় ভরা পথ।
সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত পরিত্যক্ত সৌন্দর্য।
তারা নিচু হয়ে দ্রুত বাগানের ভেতর দিয়ে এগোতে লাগল। হঠাৎ সামনে একজন গার্ড হাঁটতে হাঁটতে এই দিকেই আসছে দেখে দুজনেই দ্রুত পাশের একটা বড় পাথরের ভাঙা স্তম্ভের আড়ালে সরে গেল। গার্ডটা কিছু না বুঝেই হাঁটতে হাঁটতে অন্যদিকে চলে গেল।
তারা আবার এগোতে শুরু করল। এবার সামনে পড়ল একটা লম্বা করিডোর। এই করিডোরটাই চন্দ্রমহলের ভেতরের মূল অংশে যাওয়ার পথ। তবে তাদের সরাসরি উপরের তলায় যেতে হবে। নিচ তলায় হীরের সব কারবার হয়। কড়া সিকিউরিটি, ম্যাশিনসহ গার্ডও অনেক। বিদ্যুৎ ছাড়া অবশ্য ওগুলো কাজ করবে না তাও আগে যে কাজে এসেছে সেটা সামলাতে হবে। 
কিন্তু সেখানে দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে। সরাসরি যাওয়া অসম্ভব। অরুপ নিচু গলায় বলল, “প্ল্যান বি?”
মেঘ করিডোরের ওপরে তাকাল। পুরনো প্রাসাদের ছাদের কার্নিশ অনেক নিচু। একপাশে একটা ভাঙা সিঁড়িও আছে। মেঘ ইশারা করল, “ওপরে।”
দুজনেই দ্রুত সেই ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। সিঁড়ির ধাপগুলো পুরনো, কোথাও কোথাও ভাঙা। তবু সাবধানে পা ফেলে তারা ওপরে উঠল। ছাদের ওপর এসে চারপাশটা আরও স্পষ্ট দেখা গেল। ছাদে উঠলেই দ্বিতীয় তলায় নামা সহজ। 
চন্দ্রমহল বিশাল। অসংখ্য ঘর, করিডোর, বারান্দা। মেঘ নিচের করিডোরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওদের চোখের সামনে দিয়েই যাব।”
অরুপ অবাক হয়ে তাকাল, “কীভাবে?”
মেঘ ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টানল।‌ তারপর ছাদের কার্নিশ ধরে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল। নিচে দাঁড়ানো গার্ডরা কিছুই বুঝতে পারছে না। তাদের মাথার ওপর দিয়েই দুজন মানুষ নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে। হাওয়ার শব্দ আর দূরের পাখির ডাক ছাড়া আর কিছু নেই। কয়েক মিনিটের সেই বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অবশেষে তারা পৌঁছে গেল মহলের ভেতরের অংশের ঠিক ওপরে।
মেঘ থামল। 
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন