৬৩.
মেঘ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। দ্রুত নিজের পকেটে হাত চালালো। সে তাড়াহুড়ো করে খুঁজতে লাগল, “কোথায় রেখেছি… কোথায়…”
সে পিতলের বোতলটা আরফিকে দিয়ে দিয়েছে। তসবিহ আর কাগজটুকু তো আড়াল করেছিল। ওটা ঠিক কাগজ বললে ভুল হবে, চামড়ার তৈরি একটা আদিম পৃষ্ঠা। মেঘ তার পরা প্যান্টের পকেট থেকেই বের করল জিনিস দুটো। এরপর সেগুলো বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিল। এরপর নিজেই বলতে লাগলো, “হামজা আংকেল… আপনি কি বলতে চেয়েছিলেন? এগুলোর তাৎপর্য কি!”
সে প্রথমেই কাগজটা হাতে নিলো। কিন্তু এটা ফাকা পুরো সাদা। সময়ের কশাঘাতে হলদেটে হয়ে পড়েছে। তবে এটায় কিছু নেই। কোন রকম কিছু লেখা নেই। আজব! এতো যত্নে রাখা একটা কাগজে কেন কিছু লেখা থাকবে না? সে কাগজটা ফেলে তসবিহটা হাতে নিল। কালো পাথরের চকচকে পুঁথি গুলো সামনে তুলে ধরলো। “এগুলো কি শুধু জপের জন্য? নাকি এটা সংখ্যা…”
মেঘের কাছে সব অচেনা লাগছে। এ যেন সরল অংকের সব থেকে কঠিন সূত্র। বিগত ভুল সুধরে তাও অংক মেলানো যাবে। কিন্তু এখন ভুল হলে আর শুধরানোর জায়গা নেই।
সানন্দাপুরের রাত গুলো খুব হিসেব করে এগোচ্ছে। কেমন এক গুমর আবহাওয়া। ছুঁয়েও ছোঁয়া যায় না এমন। এদিকে নতুন এক সমীকরনের হিসেব কষতে ব্যস্ত শেহতাজ। শাহরিয়ার শেখ কি করে ফার্ম হাউজের ঠিকানা পেল সেটা নিয়েই তার যতো যুদ্ধ।
রুপমহলের নিচ তলার পেছনের দিকে, পুরনো অংশের বন্ধ ঘরটায় সে সমাধান খুঁজছে। দরজা ভারী, জানালা বন্ধ। ঘরটা ভাঙাচোরা। এটা বহু আগে গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার হলেও এখন আর এর কাজ নেই। ভেতরে ম্লান হলুদ বাল্বের ঝিম ধরা আলো জ্বলছে। ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে আছে শেহতাজ। তার শরীরটা হেলানো, এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে রাখা। হাতে একটা গ্লাসে অর্ধেক ভর্তি কালো পানীয়। তার চোখ দুটো বরাবরের মতই অন্ধকার, রহস্যময়, ঠান্ডা… কিন্তু ভেতরে যেন জ্বলে যাচ্ছে। তার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে দশ-পনেরো জন ছেলে। সবাই মাথা নিচু করে আছে। কারো কপালে ঘাম, কারো ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। আরফি পেছনেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের বাতাস এতোটাই গুমোট। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় যেন। একটা শুনশান নীরবতা ভাঙতেই যেন শেহতাজ তার হাতের গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলল। মুহুর্তেই ভেঙে গ্লাসের টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়লো সম্পূর্ণ মেঝেতে। শেহতাজ খুব শান্ত গলায় বলল, “একটা প্রশ্ন করবো… শুধু একটা।”
কেউ উত্তর দিল না। সে সামান্য ঝুঁকল সামনে। চোখ সরু করে তাকাল একে একে সবার দিকে।
“আমার বাবা ফার্মহাউজের ঠিকানা পেল কীভাবে?”
উপস্থিত কেউ কোন জবাব দিল না। শুনশান এক নীরবতা। আরও ভারী… আরও চাপা। একটা ছেলের কাঁধ কেঁপে উঠল। কিন্তু মুখ খুলল না।
শেহতাজের ঠোঁটের কোণে একফোঁটা ভয়ংকর নিঃশব্দ হাসি ফুটল। সে বলল, “মানে… তোমাদের কেউ জানে না? অথবা… বলতে চাও না?”
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা পেছনে ঠেলে একটা ভয়ংকর শব্দ হলো। সে এক পা, দুই পা… এগিয়ে গেল ছেলেগুলোর সামনে। হঠাৎ করেই এক ছেলের চুল মুঠো করে ধরে মাথাটা টেনে তুলল, “বল।”
“স-স্যার… আমরা… আমরা কিছু জানি না…”
শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথাটা ছেড়ে দিল। এক ধাপ পেছনে সরে গিয়ে গর্জে উঠল, “আমি কি এতটাই বোকা?! এই পুরো অপারেশন। আমার চোখের সামনে থেকে কেউ তথ্য বের করে নিল। আর তোমরা কেউ জানো না?! আমার দলে, আমার লোকের ভেতরেই কেউ আছে। যে আমার বিরুদ্ধে খেলছে…”
ঠিক তখনই আরফি এগিয়ে এসে বলল, “তাজ… এভাবে কিছু বের হবে না। ওরা সবাই বিশ্বস্ত। ওরা জানে বেইমানি মানে মৃ/ত্যু। কাজটা এমন কেউ করেছে যাকে আমরা কল্পনা করতে পারছি না। আর যে করেছে… সে এত সহজে স্বীকারও করবে না। এখন ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে।”
“খুঁজে বের করবো আমি। কোন বিশ্বাসঘাতকের জায়গা নেই আমার জীবনে।”
এটুকু বলেই শেহতাজ দ্রুত কদমে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না। সে সোজা গিয়ে দোতলায় হামজার কক্ষে প্রবেশ করলো। একা অন্ধকারে।
এদিকে এই রাতের অন্ধকারেই রুপমহলের বিশাল গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো অরূপ।
তার চোখ লাল। চুল এলোমেলো। শার্ট কুঁচকে গেছে। সে যেন দৌড়ে এসেছে শ্বাস এখনো ভারী।
গেটের সামনে দুইজন সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে। তাদের একেবারে অগ্রাহ্য করেই সে মহলের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলো। চেঁচিয়ে বলল, “আমি ভেতরে যাবো। আমি শেহতাজ আর প্রীয়তার সাথে দেখা করতে চাই।”
সিকিউরিটি মাথা নাড়ল, “আজ কারো প্রবেশের অনুমতি নেই।”
তবে অরূপ এক প্রকার জোর করতে লাগলো, তার চোখে এখন আর অনুরোধ নেই, একরকম উন্মাদনা, “আমি বলেছি আমাকে যেতে দিন! প্রীয়তার সাথে দেখা করতে হবে। এখনই!”
“স্যার, প্লিজ… ফিরে যান। বিশেষ বারন আছে আজ। কোন রকম প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাছাড়া রাত ১০ টার পর মহলে প্রবেশ নিষেধ। আপনি দিনে আসুন।”
অরূপ দাঁত চেপে ধরল। হাত দুটো মুঠো হয়ে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে জোর করে ঢুকে পড়বে। কিন্তু… হঠাৎ করেই সে থেমে গেল। চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য।
তারপর ধীরে পিছিয়ে গেল। একটা শব্দও না বলে। সে দিকহারা। চুপচাপ ঘুরে দাঁড়াল। অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল।
সানন্দাপুর স্বপ্ন নগরিতে যেন এখন শুধু আতঙ্ক। কোন সুখ নেই, কোন রঙ নেই। নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে আছে মেঘ। লাইট অফ। শুধু জানালা দিয়ে আসা ফিকে আলো। তার সামনে বিছানায় ছড়িয়ে আছে চামড়ার সেই ফাঁকা পৃষ্ঠা… আর কালো তসবিহ। মেঘ দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল, “কোথায় ভুল করছি আমি…?”
হিসেব, চাল, সমীকরণ সবকিছু মাথার ভেতর ঘুরছে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। তার আর ভুল করার জায়গা নেই। সে থেমে গেল। ধীরে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিন অন করল। রুশার ছবি। একটা সাধারণ ছবি হাসছে। এটাই তার গন্তব্য। সীমারেখা। রুশা নেই তো কিছুই নেই। মেঘ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখের কঠিন রেখাটা একেবারে নরম হয়ে এলো। আঙুল দিয়ে ছবিটার উপর ছুঁয়ে দিল সে। মেঘ স্ক্রল করতে থাকল। একটা ছবি… আরেকটা… আরেকটা… কখনো কলেজের আঙিনা, কখনো বৃষ্টিভেজা বিকেল, কখনো বন্ধুরা একসাথে, আর তারপর হঠাৎই সমুদ্র। নীল অসীম ঢেউয়ের পর ঢেউ ভেঙে পড়ছে বালুর বুকে। সূর্য ডুবছে দিগন্তে। রুশা দাঁড়িয়ে আছে পানির ধারে, তার কালো ওড়না উড়ছে বাতাসে। মেঘের আঙুল থেমে গেল। তার চোখ স্থির হয়ে রইল সেই ছবিটার ওপর। কয়েক সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। “সমুদ্র…!!!!?”
একেবারে হঠাৎ করেই মাথার ভেতর কিছু একটা জোড়া লাগতে শুরু করল। তার ভ্রু কুঁচকে উঠলো, “হামজা আংকেল! উনার জীবনের শেষ সময়ে তো!!!!! উ…নি কোথায় ছিলেন?”
মেঘের চোখ বড় হয়ে গেল, “সমুদ্রের পাশের বাংলোতে! তার গবেষণা… তার কাজ… সবকিছু। ওই বাড়িতেই তো! অন্তত শেষ বছর খানেক তো উনি ওই বাংলাতেই ছিলেন!”
মেঘ একেবারে আচমকা উঠে দাঁড়ালো। তার দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল। তার কণ্ঠে হতাশা, রাগ, নিজের ওপর ক্ষোভ একসাথে। সে নিজেকেই ঝেড়ে উঠলো, “আমি এত বড় একটা জিনিস… এতদিন মিস করলাম কীভাবে…! তার শেষ দিকের সব গবেষণা তো তাহলে ও-বাড়িতেই হবার কথা!”
মেঘ দ্রুত নিজেকে আরো ভাবতে বাধ্য করলো। এক মুহূর্তও আর নষ্ট না করে চামড়ার পৃষ্ঠা আর তসবিহটা হাতে তুলে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল, “কিন্তু চাবি? ওই বাংলোর চাবি তো আব্বু রুশাকে দিয়েছিলেন। তবে আব্বুর কাছেও তো চাবির একটা কপি থাকার কথা!” এটুকু বলেই সাথে সাথে মেঘের দৃষ্টি ঘুরে গেল ঘড়ির দিকে। রাত ১২:৪০ বাজছে। রাত বেশ গভীর। তাছাড়া আজ সারাদিন যেসব ঘটনা হলো এসবের পর বাড়িতে তার প্রতি কড়া পাহারা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সে কোনভাবেই এই রাতে চাবি যোগাড় করতে পারবে না। তবে তার তো যেতেই হবে। এখন করনীয় কি?
সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়েই রইল। এরপর দ্রুত আলমারির ড্রয়ার খুলে কিছু খুঁজল। বাড়ির এক্সট্রা চাবির একটা ছড়া আছে। যেখানে সব গুরুত্বপূর্ণ চাবির একটা কপি তার ঘরে রাখা। যদি এটার ভিতরের কোন চাবি দিয়ে কাজ হয় তবে তো হলোই। মেঘ এবার নিজের গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বাড়ির প্রতিটা মানুষ ঘুমে। খুব সন্তর্পনে সে বেড়িয়ে পড়লো বাসা থেকে। এইবার আর ভুল নয়। জীবন মানুষকে বার বার সুযোগ দেয় না, সে পেয়েছে সুযোগ। এবার সে সবটা দিয়ে লড়বে। তার যে শুধু রুশাকে বাঁচাতে হবে এমনটা নয়। প্রীয়তাকেও তার ওই কাল কুঠুরি থেকে বাঁচাতে হবে। মেঘ খুব সতর্কতার সাথে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা চিরে বেরিয়ে গেল।
এদিকে শেহতাজ তার রাগকে কোনভাবেই শান্ত করে উঠতে পারছে না। হামজার অন্ধকার কক্ষে দীর্ঘ সময় শান্তি খুঁজলেও সুখ যেন আয়ত্তের বাইরে। তার হার পছন্দ না। হেরে যাওয়া থেকে মৃ/ত্যু বেশি গ্রহণযোগ্য। এবার সে তার বাবার কাছে হারছে। তবে তার বাবা কি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে? কিন্তু তিনি যেভাবে ঠান্ডা মাথায় চাল দিয়েছেন এটা প্রশংসিত। এক্কেবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলেছেন পারভেজ সওদাগরকে। শেহতাজ জানে তার বাবা তার জন্যই সব করছে। তবে সে কার জন্য করছে? প্রশ্ন আর প্রশ্ন।
শেহতাজ এ কক্ষ থেকে বেরিয়ে একবার রুশার কক্ষের দিকে গেল। সেখানে এখন রুবাই, আনজুম আরা বেগম সহ আরো দুজন সাহায্যকারী উপস্থিত। এখনো অচেতন রুশা। একটা সম্পূর্ণ দিন চলে গেল তাও মেয়েটার হুস এলো না। শেহতাজ বেশি সময় দাঁড়ালো না। নিজের কক্ষে ফিরে গেল। প্রীয়তা মাত্রই রুশার কক্ষ থেকে ফিরেছে। আজ ঘরটাকে তার স্বাভাবিক লাগছে। অহেতুক বাসর সাজানো ফুল গুলো সব সরিয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছে। কক্ষের ভেতরে বসে আছে প্রীয়তা। ডিভানের উপর ঠিক এমন ভাবে বসে আছে যেন সে অপেক্ষা করছিল শেহতাজের। শেহতাজ ভেতরে ঢুকে প্রীয়তার দিকে কোন মন নিবেশ করলো না। যেন কেউ কক্ষেই নেই, ঠিক এভাবেই এড়িয়ে গেল সে।
প্রীয়তার চোখ শেহতাজের মুখেই নিবদ্ধ। এবার সে মুখ খুলল, “আমাকে কেন বিয়ে করেছেন?”
প্রীয়তার এমন কথায়ও শেহতাজ থামল না। সে সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে নিজের কাপড় বের করতে লাগল। প্রীয়তা এবার উঠে দাঁড়াল, “আমি আপনার সাথে কথা বলছি।”
শেহতাজ এবার একবার তাকাল। মাত্র এক সেকেন্ড। তারপর আবার নিজের কাজে মন দিল। শেহতাজ যে তাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাবার বাহানা খুঁজছে এটা বুঝতে আর সময় লাগলো না। প্রীয়তার গলার আওয়াজ এবার আরো বাড়লো, “কথা বলুন। আমাকে কেন বিয়ে করেছেন? কি লাভ এতে? আপনি কি চান? আমার জীবনটা নষ্ট করে কি পাবেন?”
শেহতাজের মুখভঙ্গিতে কোন পরিবর্তন নেই। সে যেন শুনছে না কিছুই। প্রীয়তা এবার এগিয়ে গিয়ে একেবারে শেহতাজের কাছে গিয়ে দাড়ালো, “রুশাকে নিয়ে কি করতে চান আপনারা? কেন সবার জীবন নিয়ে খেলছেন? কি আনন্দ পান এতে? মেয়েটার বাবা মা কেউ নেই। ওকে অন্তত মুক্তি দিন। সারাটা জীবন কি শুধু কষ্টই পাবে?”
শেহতাজ এবার থামল। আলমারির দরজাটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু এক ধরনের ঠান্ডা, হিসেবি দৃষ্টি। সে কয়েক পা এগিয়ে প্রীয়তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। এতোই কাছে যে প্রীয়তার অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। শেহতাজ খুব ধীর আওয়াজে বলল, “তুমি খুব বেশি প্রশ্ন করো।”
প্রীয়তা এক কদমও নড়লো না। নিজের এই দৃঢ়তার নাটকটা ধরে রেখে বলল, “উত্তর পাওয়ার অধিকার আমার আছে।”
“অধিকার?” শেহতাজ এই শব্দে অবাক হলো। তবে ঠোঁটে ক্ষীণ শয়তানী হাসি ফুটিয়ে বলল, “তুমি স্ত্রী হবার অধিকার চাইছো? মানে আমাকে চাইছো? আই মিন…!”
প্রীয়তা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। সে তার নিজের কথায় যেন নিজেই জড়িয়ে গেছে। সে দ্রুত মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে বলল, “আ…মি এরকম কিছু বোঝাইনি।”
প্রীয়তার চেহারায় ফুটে ওঠা ভয়টাকে শেহতাজ আরো বাড়াতে তার এক হাতে প্রীয়তার কোমর জড়িয়ে ধরে একেবারে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “এই খেলায় কারো কোনো অধিকার থাকে না মাই ডিয়ার বাটারফ্লাই। শুধু ভূমিকা থাকে। আর তুমি যে অধিকারের কথা বলছো, আমি যদি সে অধিকার ফলাই তবে তুমি নিতে পারবে না।”
প্রীয়তা একেবারে চুপসে গেল। সে তো ওসব অধিকারের কথা বলে নি। শেহতাজ এবার আরো একটু ঝুঁকে এল। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু কাঁটার মতো ধারালো, “এ বাড়িতে আমাকে কেউ প্রশ্ন করেনা। আমি কাউকে প্রশ্ন করার অধিকার দেই না। আমাকে চিনে নাও। তোমার জন্য সহজ হবে। তুমি যদি ভেবে থাকো তোমার প্রতি আমার কোন আগ্রহ আছে তবে তুমি ভুল।”
প্রীয়তা কোন প্রতি উত্তর না করেই শেহতাজকে হাত দিয়ে দূরে সরাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু একচুলও নড়লো না শেহতাজ। প্রীয়তা তার চেষ্টা জারি রেখে বলল, “আপনি আমার থেকে দূরে থাকুন। আমার প্রতি আপনার আগ্রহ নেই তাহলে এভাবে ধরে রেখেছেন কেন। আর আমাকে এটাও জানিয়ে দিন এই নাটকটা ঠিক কতদিন চলবে। আপনার সাথে ঠিক কত দিনে এই সংসার সংসার খেলায় মেতে থাকতে হবে আমাকে। এসব তো আর পার্মানেন্ট নয়।”
“তোমাকে কে বলেছে এসব পার্মানেন্ট নয়? আর এটা কোন নাটক কিংবা যাত্রা পালা চলছে না। আমাকে কোন প্রশ্ন করবে না। এ ঘরের বাইরে আমার বউ নাম নিয়ে যত ফ্লেক্স খাওয়ার দরকার খেয়ে নাও। কিন্তু ঘরের ভেতরে আমার থেকে দূরে থাকবে। আর তাছাড়া আমি যদি কাছে আসি তবে তুমি মেনে নিতে পারবে না।”
প্রীয়তা এবার আর কোন কথা না বলে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো। শেহতাজ প্রীয়তার হাতটা এই প্রথম লক্ষ্য করলো। শুভ্র হাতটায় কালো কালো দাগ পড়ে আছে। ক্ষত সব শুকিয়ে গেছে কিন্তু হাত ভর্তি তার নিশানা। শেহতাজ প্রীয়তাকে ছেড়ে তার হাতটা ধরে বসলো। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো হাতের দাগ গুলো। প্রীয়তা হাতটা ছাড়াতে চেয়েও পারলো না। শেহতাজ প্রশ্ন করলো, “এগুলো কিসের দাগ?”
“এলার্জিক রিঅ্যাকশন।”
“কিসের জন্য রিঅ্যাকশন হয়েছে?”
“আপনি কি ডাক্তার? এসব প্রশ্ন কেন করছেন?”
“যেটুকু জানতে চেয়েছি শুধু ওটুকুই উত্তর করো।”
“আমি জানিনা। পুরো হাত ভরে হয়েছিল, ডাক্তার বলেছে কিছু একটা থেকে পয়জনিং রিঅ্যাকশন হয়েছে। অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। হসপিটালেও থাকতে হয়েছিল। এখন অনেকটা সুস্থ।”
শেহতাজ খুবই মনোযোগ দিয়ে হাতটা দেখলো। দাগগুলো শুধু বাম হাতে। ডানহাতে তেমন একটা দাগ নেই। শেহতাজ আবার প্রশ্ন করল, “বিষক্রিয়াকে শরীরেও হয়েছিল? মানে শারীরিক কোন সমস্যা?”
“হ্যাঁ হয়েছিল। সে কারণেই তো হসপিটালে থাকতে হয়েছিল।”
“লাস্ট কবে চেকআপ করিয়েছো?”
“তিন দিন আগে। এখনো অ্যান্টিবায়োটিক চলছে।”
“তুমি ডায়মন্ড পছন্দ কর?”
শেহতাজের এই প্রশ্নে প্রীয়তার ভ্রু কুঁচকে উঠলো, “ডায়মন্ডের কিছু কখনো পরা হয়নি।”
“ডায়মন্ড বাদ দাও। যেকোনো পাথর কিংবা এমন কোন গয়না কি পড়েছো রিসেন্ট?”
“আপনি এসব জেনে কি করবেন?”
শেহতাজ এবার দাঁতের দাঁত চেপে নিজের রাগকে সংযত করল, “যেটুকু জানতে চাইছি তার বাইরে একটা শব্দ শুনতে পছন্দ করব না।”
শেহতাজের চোখে মুখে এমন রাগ দেখে প্রীয়তা শান্ত স্বরে বলল, “পড়েছি তো অনেক কিছুই। তবে স্পেসিফিক বলতে পারছি না। আংটি, জুয়েলারি অনেক কিছুই পড়া হয়েছে। মার্কেটে গিয়ে ট্রায়ালও দেওয়া হয়েছে। ও হ্যাঁ একটা আংটি আমার হাতে ছিল কালো পাথরের…” প্রীয়তা এটুকু বলেই থেমে গেল। এখনি সে অরুপের নাম নিতে চাইছিল। কিন্তু সে নেবে না। প্রীয়তা আবার বলল, “আংটিটা হারিয়ে গেছে।”
শেহতাজ সব যেন পরিষ্কার বুঝে উঠলো। সে কিছু সময় প্রীয়তার চোখে তাকিয়ে তার হাত ছেড়ে আলমারির দিকে গেল। চাবি দিয়ে লকার খুলে একটা সাদা ঔষধের কৌটা বের করে সেখান থেকে একটা টেবলেট হাতে নিলো। এরপর খাটের পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ঔষধ আর টেবলেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা খেয়ে নাও।”
প্রীয়তা আবাক চোখে তাকিয়ে থাকলো। এই লোকটাকে সে একটুও বিশ্বাস করে না। এসব ঔষধ খাইয়ে কি মারতে চাইছে নাকি! শেহতাজ আরেক কদম এগিয়ে বলল, “জোর করে খাওয়াবো?”
প্রীয়তা ঘাবড়ে বলল, “না না। এটা কিসের ঔষধ?”
“তোমাকে বলেছি না আমার প্রশ্ন করা পছন্দ নয়। চুপচাপ ঔষধটা খেয়ে নাও।”
প্রীয়তা শেহতাজের এই ঠান্ডা কথায়ও ঔষধটা হাতে নিল না। তার কেন যেন ভয় লাগলো। এটা যদি অজ্ঞানের ঔষধ হয়। তাকে এসব খাইয়ে যদি কিছু করে বসে। সে নিজের ভাবনাতেই ঘাবড়ে উঠলো। শেহতাজ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না। একেবারে প্রীয়তার কাছে এসে জোর করে ঔষধটা মুখে পুরে দিলো। ঠিক এমন ভাবেই আচমকা জোর করে ঠেসে ধরলো যে না খাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকল না। শেহতাজ জানত এমনটাই করতে হবে। তাই সে পুরো ঔষধের কৌটা প্রীয়তাকে দেয় নি।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}