৬৯.
বাইরের পৃথিবীও থেমে নেই। পারভেজ সওদাগরের বিরুদ্ধে পুলিশি অনুসন্ধান দিন দিন জোরদার হচ্ছে। বাড়িতে, অফিসে সব জায়গায় প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা, রুশা। সে-ই একমাত্র মানুষ, যার বয়ান সবকিছু পরিষ্কার করে দিতে পারত। কিন্তু সে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। পুলিশ আসে, দাঁড়ায়, দেখে… আবার চলে যায়। কেউ কিছু ধরে রাখতে পারছে না। অদ্ভুত এক জালে সব যেন আটকে পড়েছে। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই একদম বিপরীত এক চিত্র প্রীয়তার চলনে বলনে। সেই ভাঙা মেয়েটা আর নেই। সে এখন শান্ত। অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। বেশি আঘাত পেলে মানুষের মাঝে আঘাতের ভয়টা আর থাকে না। প্রীয়তারও এখন সয়ে উঠেছে। আসলে সে চাইছে সয়ে উঠতে। এ মহলে প্রতি নিঃশ্বাসে সে বুঝতে পারছে এত আভিজাত্যের মাঝেও কেন রুশা বার বার সুখের অভাবে ছটফট করতো।
প্রীয়তার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। নিজের গাঢ় বাদামী চোখের মনিগুলোতে নিজেই আটকে রইল। সে জানে সে সরল, সহজ। তবে লেজে পা দিলে তো নির্বিষ ঘরকুনো সাপও তো ছোবল দেয়, আর সে তো আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। প্রীয়তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা হিসেব সাজতে লাগল। মুক্তি, এই শব্দটাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। প্রীয়তা খুব নিচু গলায় বলল, “আপনার মুখোশ আমি ছিঁড়ে ফেলব শেহতাজ…।” এটুকু বলেই ঘরের এদিকে ওদিকে একবার তাকালো। রুবাইয়ের ভাষ্য মতে শেহতাজের স্টাডি রুমের চাবি খাটের পাশের টেবিলটার প্রথম ড্রয়ারে। সে সরাসরি এগিয়ে গেল খাটের পাশে ছোট টেবিলটার দিকে।
ড্রয়ার। এই ড্রয়ারেই চাবি থাকার কথা। প্রীয়তার আঙুল থামল না। সে হাত বাড়িয়ে টান দিল। কিন্তু ড্রয়ার খুলল না। লক। সে নিচু হয়ে ড্রয়ারটা খুঁটিয়ে দেখল। লকটা সাধারণ না। শক্ত, মজবুত।
এর মানে এই স্টাডি ঘরে এমন কিছু আছে যা শেহতাজ কাউকে দেখাতে চায় না। প্রীয়তা ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মাথার ভেতর নতুন হিসেব শুরু হলো। সে মনে করার চেষ্টা করল, কোথাও কি সে কখনো কোন ফাইল, চিঠি বা কাজ রাখতে দেখেছে শেহতাজকে? কিন্তু না। কিছু মনে এল না। শেহতাজ খুব সাবধানী।
একেবারে হুট করেই প্রীয়তার মাথায় আরেকটা প্রশ্ন উঠল, “শেহতাজ এত সময় কোথায় থাকে?”
দিনে তো শেহতাজ বাড়িতে খুব কম সময় থাকে। তখন নাহয় চন্দ্রমহলে থাকে। কিন্তু বাসায় ফেরে সন্ধ্যায় কিন্তু নিজের ঘরে ঢোকে না। গভীর রাত পর্যন্ত স্টাডি রুমে থাকে? কেন? কী আছে ওই ঘরে? প্রশ্ন হাজার তবে উত্তর নেই। তাকে সব বের করতে হবে।
এদিকে হাসপাতালের দমবন্ধ করা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে রাতের রাস্তায় নামতেই যেন পৃথিবীটা বদলে গেল। শহরের আলো ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো পাহাড়ি অন্ধকারে। গাড়ির এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের দিকে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু মাঝে মাঝে দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর চাকার নিচে কাঁকরের শব্দ।
মেঘ স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে। তার চোখে ক্লান্তি থাকলেও ভেতরে এক ধরনের তাড়াহুড়ো কাজ করছে। রাফি পুরো রাস্তা একদম চুপ। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। লোকেশন অনুসারে জামশেদ সাহেবের আশ্রম রাশ পাহাড়ের দিকে। রুপমহল পেরিয়ে যেতে হয়। এই পাহাড়ি বাতাস বড্ডো শীতল, আর্দ্র, মাটির গন্ধে ভরা।
দূরে পাহাড়ের কালো ছায়া রাতের আকাশের সাথে মিশে গেছে। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ প্রান্তে চলে এসেছে তারা।
শুনশান নীরবতা দেখে রাফি ধীরে বলল, “এই পাশটায় মানুষ খুব কম আসে। এটা রাশ পাহাড়ের পেছনের অংশ।”
মেঘ কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা সরু কাঁচা রাস্তার সামনে থামল। সামনে আর রাস্তা নেই। বাঁশের তৈরি ছোট একটা ফটক। তার ওপরে কাঠের বোর্ডে হাতে লেখা– “আয়ুবেদ আশ্রম।”
ফটকের দুই পাশে ছোট ছোট প্রদীপ জ্বলছে। বিদ্যুতের তীব্র আলো নেই এই পুরো এলাকায়, প্রদিপের নরম হলদে আলো জ্বলছে টিমটিমে। যেন ইচ্ছে করেই অন্ধকার পুরোপুরি দূর করতে চাইছে না এই প্রকৃতি।
আশ্রমের ভেতরে পা দিতেই মেঘ থমকে গেল। এটা কোনো সাধারণ আশ্রম না। এ যেন পাহাড়ের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটা আলাদা পৃথিবী। চারপাশে ছোট ছোট কাঠের ঘর। কোথাও আগুন জ্বলছে। কোথাও কয়েকজন পাহাড়ি নারী বসে জড়িবুটি নিয়ে কিছু একটা করছে। দূরে কিছু বাচ্চা মাটিতে বসে পড়াশোনা করছে। আবার কয়েকজন তরুণ বড় বড় মাটির পাত্রে কিছু মিশ্রণ তৈরি করছে। এখানে বিদ্যুৎ নেই। বড় বড় মশাল, প্রদিপ, কুপি এগুলোই ভরসা। অদ্ভুত শান্ত একটা জায়গা। এখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো অহংকার নেই। কোনো আভিজাত্যের মুখোশ নেই। শুধু প্রকৃতি আর মানুষ।
মেঘ আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে আয়ত্ত করে নেয়ার মাঝেই একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। রাফিকে দেখেই হালকা হেসে বললেন, “রাফি দাদুভাই তুমি?”
রাফি দ্রুত মাথা নাড়ল। “জামশেদ দাদার সাথে দেখা করতে এসেছি।”
বৃদ্ধ কিছু না বলে ভেতরের দিকে ইশারা করলেন। ওরা হাঁটতে লাগল সরু পাথরের পথ ধরে।
পাহাড়ি গাছের পাতায় রাতের শিশির জমে আছে। কোথাও কোথাও ধোঁয়া উঠছে। ভেষজ গন্ধে পুরো পরিবেশ ভারী। অবশেষে একটা বড় কাঠের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা।
ঘরের দরজা আধখোলা। ভেতরে মৃদু প্রদীপের আলো। আর সেই আলোয় বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। দীর্ঘ সাদা দাড়ি। পাতলা শরীর। পরনে একটা সাদা ফিনফিনে পাতলা ফতুয়া আর ভারী লুঙ্গি। লোকটির বয়স আশির ওপরে হবেই। কিন্তু বাধ্যকের কোন দূর্বলতা নেই।
তিনি তার কক্ষে বসে কিছু শুকনো গাছের শিকড় কাটছিলেন। ওদের উপস্থিতি টের পেয়েও মাথা তুললেন না। একজন এসে ইতিমধ্যে তাকে খোঁজ দিয়ে গেছে এদের উপস্থিতির। জামশেদ সাহেব বললেন, “রাফি… এত রাতে? তোর মায়ের শরীর ঠিক আছে?”
রাফি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলল, “মা ভালো আছেন। খুব একটা ইমার্জেন্সির জন্যই ছুটে এসেছি দাদা।” এটুকু বলেই রাফি সব খুলে বলতে শুরু করল। রুশ, বিষক্রিয়া, এন্টিডোজ, প্রীয়তা…
মেঘ ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে জামশেদ সাহেবের সামনে রাখল। বৃদ্ধ এবার ধীরে কাগজটা হাতে নিলেন। কয়েকবার খুব মন দিয়ে প্রতিটা উপাদান পড়লেন। এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, “কড়া প্রতিষেধক। বিষটা তাহলে মা/রা/ত্মক বি/ষা/ক্ত।”
মেঘ দ্রুত বলল, “আপনি কি বি/ষ/টা চিনতে পেরেছেন? ঔষধটা বানাতে পারবেন তো?”
জামশেদ সাহেব মাথা নাড়লেন, “এভাবে বি/ষ পুরোপুরি চেনা যায় না। তবে এই ধরনের প্রতিষেধক পাহাড়ি কিছু গোপন খনিজের বি/ষ/ক্রি/য়ায় দেয়া হয়। পুরোপুরি এমন নয়। অনেকাংশে এমন।”
রাফি হাঁসফাঁস করে বলল, “প্রতিষেধকটা বানাতে পারবেন তো?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “পারবো পারবো কিন্তু যাকে ওষুধটা দেবে, একদম দেরি করা যাবে না। এসব ধীর বি/ষে/র ওষুধ।” এটুকু বলেই জামশেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে গিয়ে একের পর এক কাঠের বাক্স খুলতে লাগলেন। কোথাও শুকনো পাতা। কোথাও কালচে শিকড়। কোথাও লালচে গুঁড়ো। প্রতিটা জিনিস হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকলেন। আলোয় ধরে দেখলেন। তারপর আলাদা করতে লাগলেন। তাও যেন কিছু একটা পেলেন না। অনেকক্ষণ খুঁজে আওয়াজ লাগালেন ফজলু নামের এক লোককে। বার দুই ডাকতেই ফজলু এসে হাজির হল। জামশেদ সাহেব বললেন, “পাহাড়ের উত্তর থেকে এখনি গিয়ে কালকেশরের পাতা নিয়ে আসো। জরুরী দরকার।”
লোকটা কোন কথা না বলে দ্রুত কদমে ছুটে গেলেন আনতে। জামশেদ সাহেব এবার আবারো মাটিতে বসলেন সব জড়িবুটি নিয়ে। একটা কালচে শুকনো লতা তুলে বললেন, “এটা বি/ষের বিস্তার কমাবে।”
তারপর আরেকটা ছোট সাদা শিকড় হাতে নিলেন। “এটা র/ক্ত পরিষ্কার করবে।”
তারপর খুব ছোট কাচের পাত্রে একটার পর একটা ভেষজ মেশাতে লাগলেন। ঘরের ভেতর কেমন সব বন্য গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠল। তেতো। ঝাঁঝালো। আর কেমন কেমন বর্ননা করা যায় না এমন সব গন্ধ। ফজলু নামের লোকটাও কি এক অদ্ভুত দেখতে পাতা এনে হাজির হলেন। জামশেদ সাহেব একটা পাথরের পাত্রে সবকিছু বেটে তরলের মতো বানালেন। অদ্ভুত রঙের একটা মিশ্রণ তৈরি হলো। পুরোটা দেখতে অনেকটা গাঢ় সবুজ আর কালোর মাঝামাঝি। শেষে ছোট কাচের শিশিতে ভরে সেটা মেঘের হাতে দিয়ে বললেন, “এটা খুব সাবধানে রাখবে। সুস্থ মানুষ যেন না খায়। এটা কিন্তু খুব শক্তিশালী ওষুধ। আর হ্যাঁ এর মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭ দিন। ৭ দিনের বেশি এটা ভালো থাকেবে না। এরপর আবার নতুন ওষুধ বানাতে হবে।”
মেঘ শিশিটার দিকে তাকিয়ে রইল। এত ছোট একটা জিনিস, তবুও হয়তো একটা জীবন বাঁচাতে পারে।
জামশেদ সাহেব এবার খুব ধীরে বললেন, “এটা মারাত্মক বি/ষ/ক্রি/য়ায় ব্যবহার হয়। শরীরের বড় ক্ষতির আগেই দিতে হবে। যাকে দিবে… তাড়াতাড়ি দিবে।”
মেঘ এবার মুখ খুলল, “এই ওষুধ কতদিন খেতে হবে আর খাবারের নিয়ম?”
“টানা ২ মাস খেতেই হবে। না হলে পরিপূর্ণ বি/ষের প্রভাব কাটবে না। দিনে দু’বার ১২ ঘন্টা পর পর খেতে হবে। চা চামচের এক চামচ করে।”
মেঘ শিশিটা নিজের কাছে রেখে বলল, “এই দুমাস নিয়ম করে আমি প্রতি সপ্তাহে একবার এসে ওষুধটা নিয়ে যাব। এই একই দিনে। আপনি তৈরি করে রাখবেন।”
জামশেদ সাহেব সম্মতি জানালেন। রাফি নিঃশব্দে শুধু মেঘের মুখে তাকালো। এই ছেলেটার সবার কথা কেন এত ভাবতে হয়? ও কি কখনো স্বার্থপর হতে পারে না? হয়ত পারে না বলেই এত ভালোবাসে সবাইকে।
ওরা আর সময় অপচয় না করে আশ্রম থেকে বের হয়ে যায়। দূরের পাহাড় কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে। রাফি এবার আর নিজের আগ্রহ চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, “ওষুধ তো আছে। কিন্তু এটা প্রীয়তাকে দিবি কিভাবে?”
“এসব আমার উপর ছেড়ে দে। সব বিষয়ে ভাবতে নেই।”
রাফি আর কোন প্রশ্ন করল না। ওরা সোজা হাসপাতালেই আবার ফিরলো। অরূপকে ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। র/ক্ত/ক্ষ/রণে শরীর ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি। এখন সে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে। বুকটা ধীরে উঠছে নামছে। হাতের শিরায় স্যালাইনের সূচ ঢুকে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে। যেন কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই মানুষটা কয়েক বছর বয়স হারিয়ে ফেলেছে।
ইমরান চুপচাপ বসে আছে জানালার পাশে। সারারাত একফোঁটা ঘুম নেই তার চোখে। মেঘকে ফিরতে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, “কাজ হয়েছে?”
“হুম।” এটুকুই শেষ আর কথা বাড়লো না। রাফি সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ক্লান্তিতে। কিন্তু মেঘের চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। তার মাথার ভেতর শুধু সময়ের হিসেব চলছে। তার যে সব গোছাতে হবে। রুশাকে ওই মহল থেকে বের করেই আনতে হবে। প্রীয়তাকেও। সে ওই মহলটাকে কারো জীবন নিয়ে খেলতে দেবে না।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মেঘ উঠে দাঁড়াল। ইমরান তাকাতেই সে ধীরে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি। একটা কাজ আছে।”
“আর ওষুধটা?”
“সব ঠিকঠাক হলে আজই ওষুধটা প্রীয়তার কাছে পৌঁছে যাবে।”
ইমরান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে জানে মেঘ যখন বলেছে পৌঁছে যাবে এর মানে পৌঁছাবেই।
সকাল পুরোপুরি নামতে না নামতেই মেঘ বাড়ি পৌঁছাল। বাড়িতে সকালের ব্যস্ততা চলছে। রান্নাঘর থেকে চায়ের গন্ধ আসছে। কাঁকন সুলতানা ডাইনিং টেবিল গোছাচ্ছেন।
মেঘকে দেখে তার চোখ সরু হয়ে এলো, “অরুপ কেমন আছে এখন? কবে ছাড়বে ডাক্তার? আমি হাসপাতালে নাস্তা পাঠানোর আয়োজনই করছিলাম।”
মেঘ কোনো উত্তর দিল না। ধীরে এগিয়ে এসে চেয়ারে বসে খুব শান্ত গলায় বলল, “মা, তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।”
কাঁকন সুলতানা শান্ত হয়ে বসলেন। মেঘ এবার শুরু থেকে সব বলল। একে একে সব। রুশ, প্রীয়তা, বি/ষ/ক্রি/য়া, আংটি, প্রীয়তার হাতের ক্ষ/ত, এন্টিডোজ। সব। একটাও তথ্য বাদ দিল না।
কাঁকন সুলতানা একেবারে অবাক হয়ে পড়লেন, “মানে, প্রীয়তা মেয়েটা এতদিন ধরে এই বি/ষের জন্য এত কষ্ট পাচ্ছে?”
“হ্যাঁ।”
“আর ওরা কিছু জানে না?”
“কিভাবে জানবে! সবটাই এখনো গোপন। রুশ যে বি/ষা/ক্ত এটাই তো এখনও কেউ জানে না।”
মেঘ টেবিলের ওপর ছোট কাচের শিশিটা রাখল। এরপর এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা কাগজ আর কলম এগিয়ে এনে একটা চিঠির মত করে লিখতে লাগল। সেখানে এই ওষুধ কিভাবে খেতে হবে তা সহ। সব বিস্তারিতভাবে লিখলো প্রীয়তার উদ্দেশ্যে। এরপর সেটা ভাজ করলো। সাথে মেঘের পকেট থেকে একটা নতুন মোবাইল ফোন বের করে সেটাও এগিয়ে দিয়ে বলল, “মা, তোমাদের আজ রুপমহলে যেতে হবে।”
কাঁকন সুলতানা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “আমাদের?”
“হ্যাঁ। তুমি আর আব্বু।”
শাফিন আহমেদ মাত্রই জগিং শেষ করে বাড়িতে ফিরলেন। মেঘের শেষ কথাগুলো শুনে থেমে গেলেন।
মেঘ এবার বাবার দিকেও তাকাল, “তোমরা রুশাকে দেখতে যাবে। তোমরা ওর মামা-মামী। পুরো অধিকার আছে। রুশা অসুস্থ এই অজুহাতেই যাবে। রুশার এই অসুস্থতার বিস্তারিত জানাটাও জরুরি হয়ে উঠেছে।”
শাফিন আহমেদ অবাক হলেন, “রুশা অসুস্থ?”
“হ্যাঁ আব্বু অসুস্থ। হয়তো অসুস্থ আর নয়তো ওকে অসুস্থ সাজানোর নাটক হচ্ছে। মামলায় পুলিশরা এখনো ক্লিয়ারেন্স পায়নি কারন রুশা কোন বয়ান দেয় নি। তাকে বার বার অসুস্থ বলা হচ্ছে।”
শাফিন আহমেদ এগিয়ে এসে বললেন, “তাহলে তো আমাকে যেতে হবে!”
মেঘ এবার শিশিটার দিকে তাকিয়ে বলল “তোমরা গিয়ে সুযোগ বুঝে এটা প্রীয়তার হাতে দিতে হবে।”
কাঁকন সুলতানা শিশিটা হাতে নিলেন। কাচের ভেতর কালচে সবুজ তরলটা আলোয় অদ্ভুত লাগছিল।
“এটা কীভাবে কি করতে হবে?”
“চিঠিতে সব লিখে দিয়েছি।”
“আর ফোন?”
“রুশার সাথে যোগাযোগ করার জন্য। এটা রুশাকে দেবে। ও এখন একা। পুরোপুরি একা। ওর ওই মহলে থেকে কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারবে না।”
শাফিন আহমেদ বললেন, “শাহরিয়ার ভাই যদি কিছু সন্দেহ করে?”
“তোমরা কিছুতেই বুঝতে দেবে না। স্বাভাবিক থাকবে। ফল-মিষ্টি নিয়ে যাবে। আত্মীয়ের মতো আচরণ করবে। বাকিটা মা সামলে নিতে পারবে।”
কাঁকন সুলতানার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললেন, “আমি সব সামলে নেবো। এটা জরুরী।”
মেঘ জানে তার মা ছাড়া এ কাজ আর কেউ করতে পারবে না। সে ক্লান্ত। বিগত কয়েকদিন, খাওয়া ঘুম কিছু নেই। ছুটে চলেছে একের পর এক কাহিনির পিছে। তার শরীর আর চলল না। সে নিজের ঘরে গিয়ে হেলে পড়ল বিছানায়।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (রুশ এবং রহস্য)
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️}