৮০.
নার্সটি কোনরকম বাদ সাধলো না। এই গরমে বাইরে বসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সে উঠে চলে গেল। এবার প্রীয়তা কক্ষে থাকা সাহায্যকারীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “উনারা এই কাঠফাঁটা রোদে এসেছেন, একটু পানি-সরবত কিছু তো দিতে হবে! গিয়ে নিয়ে এসো নিচ থেকে। এগুলো কি বলে দিতে হবে?”
সাহায্যকারী আমতা আমতা করে বলল, “ম্যাডাম, গিন্নি মা বলেছেন এখানে থাকতে। তাই আর…”
“নিয়ে এসে পরে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি আছি ততক্ষণে।”
সাহায্যকারী দৌড়ে বেরিয়ে যেতেই। প্রীয়তা তাড়াতাড়ি বলল, “মেঘ বেশি সময় পাবে না এখনি ওরা চলে আসবে।”
মেঘ যেন কোন কিছুতেই মন নিবেশ করতে পারলো না। সে সোজা রুশার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর মুখটা ছুঁয়ে নিলো। এই মেয়েটাকে তো ওরা নিয়ে আসে নি! ওরা এমন তৈরি করেছে। মেঘের স্পর্শে রুশা চোখ খুলে নিল। প্রচন্ড মাথার যন্ত্রণায় তার তো ঘুম নেই। সে সব শব্দ স্পষ্ট শুনছিল। মাথা প্রচন্ড ব্যথায় ঠিক মনোনিবেশ করতে পারে নি। তবে তার মেঘ এসেছে এটা বুঝতে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। চোখ খুলতেই রুশা অস্পষ্ট গলায় বলে উঠলো, “মে…ঘ”
মেঘ মুহুর্তেই ঝুঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রুশাকে। রুশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের পানি বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। কাঁপতে কাঁপতে ফুঁপিয়ে উঠল। মেঘ চোখ বন্ধ করে ওকে বুকে চেপে রাখল কিছুক্ষণ। এক মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেল কোথায় আছে। ভুলে গেল বিপদ, রুপমহল, কক্ষের লোকজন সব। তার শুধু এই মেয়েটাকে এখান থেকে বের করতেই হবে। যে করেই হোক। ওরা মেঘের দূর্বলতা নিয়ে খেলছে। মেঘ এবার ওদের সব নিয়ে খেলবে। ওদেরকে জবাব দিতে হবে।
রুশা কান্নার জন্য কিছু বলে উঠতে পারলো না পরিষ্কার। মেঘ দু হাতে রুশার মাথার চুল গুলো সামলে আদর এঁকে নিলো রুশার কপালে। এই মানুষটাকে সে সারা দুনিয়ার থেকে রক্ষা করতে চায় তবে পারছে কোথায়? শশী রহমান হয়তো ঠিক এ কারণেই লুকিয়ে ফিরেছিলেন বারবার। মেঘ খুব ধীর আওয়াজে বলল, “আমি জানি, আমি জানি তোমার সাথে এ বাড়িতে ঠিক কি কি হচ্ছে। ট্রাস্ট মি আমি সব ঠিক করে দেবো।”
রুশা ডুকরে কেঁদে উঠলো, “মেঘ আমাকে নিয়ে চলো।”
“আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। খুব দ্রুত। ওয়াদা করছি।”
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…।”
মেঘ রুশার চোখের পানি হাতের উল্টো পিঠে মুছে পকেট থেকে একটা ট্যাবলেটের প্যাকেট বের করে বলল, “এই ওষুধটা এখনই নিতে হবে। মাথা ব্যথা করবে না তাহলে।”
প্রীয়তা এগিয়ে এসে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। মেঘ সাথে সাথেই রুশাকে একটা ওষুধ খাইয়ে দ্রুত হাতে পকেট থেকে ওষুধের কাঁচের শিশি প্রীয়তার হাতে দিয়ে বলল, “এটা তোর ওষুধ।
তুই ওষুধ ঠিক মতো নিচ্ছিস তো?”
“হ্যাঁ নিচ্ছি। আমি বাইরে দেখছি হ্যাঁ? তুমি এখানে সামলে নাও।”
মেঘ মাথা নাড়লো। এরপর নিজের হাতের ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বোতামের মত দেখতে সিসি ক্যামেরা বের করে ভালো করে কক্ষ জুড়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিল যে কোথায় লাগানো যায়, যেখানে চোখে পড়বে না।
প্রীয়তা অবাক চোখে বলল “এটা ক্যামেরা?”
“হ্যাঁ ক্যামেরা। ছোট তবে অনেক পাওয়ারফুল। শুনো তোমাদের আমাকে কিছু বলতে হলে এই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে। এটাতে অডিও সিস্টেম আছে। তোমাদের কথা আমি স্পষ্ট শুনতে পারব।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে তাকালো। মেঘ খুব নিখুঁত হাতে ক্যামেরাটা লাগাতে লাগলো। ঠিক এই দৃশ্যটা দেখেই প্রীয়তার সকালের দৃশ্যের কথা মনে পড়ে গেল। সে বলল, “মেঘ, সকালে না এরকম দুজন লোক বাড়িতে এসেছিল। ওরা কিছু করছিল স্টাডি রুমে। এরপর আরফি শেহতাজের ঘরেও কিছু একটা করেছে, আমি না দেখতে পাইনি কি করেছে।”
“কারা এসেছিল?”
“ইলেকট্রিশিয়ানদের মতোই লাগলো। এমন টুল বক্সও ছিল ওদের হাতেও।”
মেঘ একটু স্থির হয়ে ভাবলো, “সারা বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা। হয়তো কোন রুমে ক্যামেরা নেই। এ হিসেবে স্টাডি রুমের ভেতরেও কোন ক্যামেরা ছিল না। সেটা লাগাতে পারে। শেহতাজের ঘরেও ক্যামেরা লাগাতে পারে।”
“মানে??”
“এটা শুধু আমার ধারণা। তুই সাবধান থাকবি। আর ফোনটা কোথায়? তোর ঘরে লুকানোর কোন দরকার নেই। ফোনটা এ ঘরে লুকাবি কোথাও। আর সেটা আজই। নিজের ঘরে সব সময় সাবধানে থাকবি। শেহতাজ চতুর লোক, যে কোন সময় যে কিছু করতে পারে। সাবধানতার উপরে কিছু নেই। আর যদি সত্যিই ক্যামেরা লাগিয়ে থাকে, তবে শেহতাজ বুঝে গেছে যে তুই ওর স্টাডি রুমে গিয়েছিলি।”
“এখন? আমি তো সকালে লোকগুলো যাওয়ার পরেও ফোনটা বের করেছিলাম। তোমাকে মেসেজ করলাম। তবে তাড়াহুড়ায় ছিলাম বলে আলমারি থেকে বের করিনি ফোনটা।”
“ক্যামেরায় চোখে পড়বে?”
“ক্যামেরা কোথায় তাতো জানি না। তবে আলমারির কপাট থেকে বের করিনি। আর একটু আগে যে কল করলাম তখন তো কারেন্ট ছিল না।”
“ফোনটা বন্ধ করে রাখ। চালু করতে হবে না কিছু দিন। আর যেটা বললাম আজই ফোনটা অন্যকোথাও লুকিয়ে ফেল। যদি ক্যামেরায় ধরা পড়ে তবে শেহতাজ ধরলে তখন বলবি ওটা মহলের কারো ফোন তুই চুরি করেছিলি তোর বাবার সাথে একবার কথা বলার জন্য। আর যদি ধরা নাও পড়ে তাও আলমারিতে কিছু আছে অবশ্যই শেহতাজ সন্দেহ করবে। তাই আলমারি থেকে ফোনটা সরিয়ে অন্য কোথাও রাখ। এ ঘরে রাখ।
এখন থেকে আমাকে কিছু বলতে হলে ক্যামেরার সামনে এসে বললেই চলবে। আর হ্যাঁ। যদি শেহতাজ স্টাডি রুম নিয়ে সত্যিই কিছু জেনে যায়। তবে ও তোকে সিওর হয়েই জিজ্ঞেস করবে। ও যদি জিজ্ঞেস করে তবে স্বীকার করে নিবি। গল্পটা এমন ভাবে সাজাবি যে, তুই জাস্ট কৌতুহল বশত ঘরটা দেখতে গিয়েছিলি। তবে দেখতে পারিস নি। তার আগেই রুবাই তোকে ধমকে বের করে দিয়েছে।”
“রুবাইয়ের নাম নেবো?”
“রুবাইকে প্রেশার দিলে ও কথা চেপে রাখতে পারবে না। ও এ বাড়ির মেয়ে তাই ওর রিস্ক নেই, কিন্তু তোর আছে। যদি অস্বীকার করিস তাহলে সন্দেহ তোর উপর আরো বাড়বে। এটা বিপদ হবে। আমরা এখনো শেহতাজের উদ্দেশ্য জানি না। জাস্ট এমন প্রিটেন্ড করবি যে এটা খুব সাধারন একটা বিষয়। আর চাবির কথা বললে, বলবি তুই মাথার ক্লিপ দিয়ে খুলেছিস। শেহতাজ সব সহ্য করতে পারে কিন্তু মিথ্যা সহ্য করতে পারে না।”
“কিন্তু আমি তো ক্লিপ দিয়ে তালা খুলতে পারি না!”
মেঘ চুপচাপ প্রীয়তার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়ে আর তার সরলতা! মেঘ বলল, “তোকে পারতে হবে না। শুধু বুদ্ধিটা কাজে লাগা। প্রীয় তুই যথেষ্ট সাহসী এবং বুদ্ধিমতি একজন মেয়ে। শুধু এভাবেই মাথা কাজে লাগাতে থাক। যেখানে আটকাবি আমি আছি।”
প্রীয়তা মাথা নাড়লো। রুশা একটু সামলেছে। বীভৎস মাথা ব্যথা টা ওষুধটা খাওয়ার সাথে সাথেই একটু সামলে গেল। রুশা মেঘকে বলল, “ওরা কেন আমাকে মারতে চায়?”
মেঘ এগিয়ে এসে আবার বিছানায় বসে রুশার মাথায় হাত রেখে বলল, “ওরা কেউ তোমাকে মারতে চায় না। তুমি ওদের জন্য সোনার হরিণ। ওরা শুধু তোমাকে অসুস্থ করে রাখতে চায়। ওদের দেয়া কোন ওষুধ নেবে না এখন থেকে।”
প্রীয়তা বলল, “রুশা তোর ঘুমের নাটক চালিয়ে যেতে হবে। ইনজেকশন ভায়ালে আমি পানি রেখেছি। দরকার পড়লে ওষুধগুলো সব পরিবর্তন করে দেব। তোকে নাটক চালিয়ে যেতে হবে।”
ঠিক এই সময়েই একজন সাহায্যকারী হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে প্রবেশ করলেন। মেঘ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো।
প্রীয়তা সাহায্যকারীকে কাজ বোঝাতে খুব নাটক করে বলল, “লাইনে কি সমস্যা আছে?”
“তেমন কিছু নয় ম্যাডাম। মেইন লাইন এলে তারপর বোঝা যাবে। তাছাড়া কোন লিকেজ নেই।”
প্রীয়তা এগিয়ে শরবতের গ্লাসটা ট্রে থেকে হাতে নিয়ে বলল, “এটুকু একটু খেয়ে যাবেন।”
মেঘ গ্লাসটা নিলো না, “আমাকে ইমার্জেন্সি বের হতে হবে। নিচে আমার সাহায্য লাগবে।” এটুকু বলেই মেঘ বেরিয়ে পড়লো। প্রীয়তা গ্লাসটা ট্রেতে আবার রেখে মেঘের পিছু এগোলো।
মেঘ একবার শেষবারের মতো রুশার দিকে তাকাল। রুশাও তাকিয়ে রইল। তাদের চোখে হাজারটা অপ্রকাশিত কথা। হাজারটা প্রতিশ্রুতি। মেঘ খুব আস্তে মাথা নাড়ল, "আর বেশি দিন না। আমি সব ঠিক করে দেবো।" তবে কথাটা উচ্চারণ করল না। তবুও রুশা বুঝে গেল। তার চোখ বেয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল। মেঘ সোজা নিচে গিয়ে বলল, “লাইনে কোন তেমন সমস্যা খুঁজে পাইনি নি।”
ইলেকট্রিশিয়ান বলল, “মেইন লাইনের মাথায় গন্ডগোল হয়েছে ট্রান্সফরমার সারাতে সময় লাগবে। আমি আমার লোকদের কল করছি।” এটুকু বলেই লোকটা ইলেকট্রিক অফিসে কল লাগালো। এরপর বলল, “আমরা শুধু চেকিং করি। লোক আসছে ওরা দেখে নেবে।” রুবাইয়ের মামার সামান্য সন্দেহ হলো। বাংলাদেশে আবার এ নিয়ম কবে শুরু হলো যে চেকিং এর জন্য লোক পাঠাবে আলাদা। পরে আবার সারাতে আলাদা লোক আসবে! উনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রুবাই বলল, “আপনাদের লোকদের তাড়াতাড়ি আসতে বলুন। জেনারেটরও চলছে না। এ গরমে থাকা যায়!”
ইলেকট্রিশিয়ান বলল, “জ্বী ম্যাডাম আসছেন ওরা।” এটুকু বলে ওরা দুজন চুপচাপ বেরিয়ে পড়লো। ইলেকট্রিশিয়ানকে এসব শিক্ষা মেঘ অনেক আগেই দিয়ে এসেছে। টাকার কাছে দুনিয়ার সবাই কাবু। মেইন অফিস থেকে লোক এলেও তারা বলবে চেকিং এর লোক তাদেরই।
মেঘ আর ইলেকট্রিশিয়ান বেরিয়ে পড়লো। একজন সাধারণ মিস্ত্রির বেশে রুপমহলের সবচেয়ে কঠিন প্রাচীরে প্রথম ফাটল ধরিয়ে গেল মেঘ। মেঘ একবারও পেছনে তাকাল না। গেট থেকে খানিকটা দূরে এসে সে দ্রুত পা চালাল। সে সোজা রাস্তার পাশে একটু দূরে পার্ক করে রাখা গাড়িটার দিকে এগোল। তারপর… থেমে গেল। গাড়ির পাশে কেউ নেই। রাফি নেই। মেঘ ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল। খালি রাস্তা। গরমে কাঁপতে থাকা বাতাস। দূরে কয়েকটা রিকশা। কিন্তু রাফির কোনো চিহ্ন নেই।
“এই ছেলে আবার গেল কোথায়?”
মেঘ দ্রুত ফোন বের করল। কল দিল। একবার। দুইবার। কয়েকবার। রিসিভ হলো না। সে আবার কল দিল। এবারও না। এরপর হঠাৎ কলটা রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে শুধু খচ খচ আওয়াজ আর শ্বাসের শব্দ। মনে হচ্ছে ওপাশে দৌড়াতে দৌড়াতে মরার উপক্রম। মেঘের ভ্রু কুঁচকে গেল, “রাফি?”
“মেঘ...”
“তুই কোথায়?”
“ভাই... আমি বিপদে আছি...”
“কী বিপদ?”
“আমি... আমি...”
পেছন থেকে কয়েকজন লোকের চিৎকার শোনা গেল। “ধর! ধর! চোর! টুলবক্সটা নিয়ে পালাইছে! এই ব্যাটা থাম!”
মেঘ কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “তুই... কী... করেছিস?”
রাফির কণ্ঠে কান্না মিশে গেল, “মেঘ আমি তো ওদের আটকাতে পারছিলাম না!”
“কাদের?”
“আসল মেকানিকদের!”
“তারপর?”
“তাই... আমি...”
“তাই কী?”
“টুলবক্স নিয়ে দৌড় দিয়েছি! ওদের ব্যস্ত রাখার জন্য করেছিলাম।”
মেঘ কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেকানিক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রাফিকে একটা সমস্যা সমাধান করতে বলা হয়েছে আর সে সমাধান করেছে। এর থেকে বেশি মেঘ কি এক্সপেক্ট করছিল?
ওপাশে রাফি এখনো দৌড়াচ্ছে, “ভাই... ওরা আমার পেছনে… আমাকে চোর ভেবেছে!”
“কারণ তুই চুরি করেছিস!”
“কিন্তু ভালো উদ্দেশ্যে!”
“চুরি চুরি-ই হয় গাধা! আর ওরা কি জানে তুই কি জন্য চুরি করেছিস?”
“মেঘ তর্ক করার সময় না! আমাকে বাঁচা।”
পেছন থেকে আবার গর্জন ভেসে এলো, “ধর ব্যাটারে! আজকে হাত ভেঙে দিব!”
রাফি কেঁদে ফেলল প্রায়, “ভাই বাঁচাআআআআআআআ!”
মেঘ নিজের কপালে সজোরে হাত চাপড়াল, “লোকেশন পাঠা।”
“এখনি পাঠাচ্ছি!”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লোকেশন চলে এলো। মেঘ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
প্রায় সাত মিনিট পর। একটা সরু গলির সামনে গাড়ি ঢুকতেই দৃশ্যটা চোখের সামনে এলো। রাফি প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। হাতে বিশাল টুলবক্স। ঘামে পুরো ভিজে গেছে। পেছনে তিনজন মেকানিক। তাদের পেছনে আবার কয়েকজন কৌতূহলী পথচারী। আরও পেছনে দুইটা রাস্তার কুকুর পর্যন্ত দৌড়াচ্ছে।
পুরো দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো কমেডি সিনেমার শুটিং চলছে। দেখে মেঘের হাসি পেয়ে গেল। রাফি মেঘের গাড়িটা দেখে এমন মুখ করল যেন ফেরেশতা নেমে এসেছে তাকে বাঁচাতে।
“মেঘঘঘঘ…!”
মেঘ গাড়ির দরজা খুলে দিল, “উঠ!”
রাফি এক লাফে ভেতরে ঢুকে পড়ল। টুলবক্সটাও ছুঁড়ে দিল ভেতরে। পরের মুহূর্তেই মেঘ এক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়ি ছুটে গেল সামনে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেকানিকরা হতভম্ব।
তাদের একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “চোরও গাড়ি নিয়ে আসে নাকি! তোর গাড়ি আছে তাহলে তুই চুরি করলি কেন?”
গাড়িটা ছুটে তাদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। গাড়ির ভেতরে কয়েক মিনিট শুধু রাফির হাঁপানোর শব্দ ছাড়া বাকি সব নিশ্চুপ। মেঘ স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
রাফি সাবধানে বলল, “রাগ করেছিস?”
মেঘের কোনো উত্তর নেই। রাফি বলল, “আমি কিন্তু ভালো কাজের জন্যই করেছি।”
মেঘ এবার মাথা ঘুরাল, “তুই কি জানিস, আজকে যদি ধরা পড়তিস তাহলে কী হতো? ওরা তোকে মেরে আলুভর্তা বানিয়ে দিত। আর কি কোন উপায় ছিল না ওদেরকে আটকানোর!”
“আমাকে ওরা ধরতেই পারতো না। আমি খুব দ্রুত দৌড়াই।”
মেঘ আবার কপাল চাপড়াল। রাফি গর্বিত গলায় বলল, “স্কুলে একবার স্পোর্টসে সেকেন্ড হয়েছিলাম।”
“প্রথম কে হয়েছিল?”
“যার ফোনটা আমি চুরি করে দৌড়েছিলাম।”
মেঘ চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই ছেলেকে নিয়ে কোনোদিন স্বাভাবিক জীবন সম্ভব না। ইলেকট্রিশিয়ান খুব কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “স্যার আপনি কি প্রফেশনাল চোর?”
“আরে না ভাই। স্কুলে আমি ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন। ছোটবেলা থেকেই আমি খুব ভাল স্টুডেন্ট। তো একটা ছেলে ক্লাসে মোবাইল এনেছিল। সেটা হেড স্যারকে জমা দেব। কিন্তু সে কিছুতেই দেবে না। তখন স্কুলে স্পোর্টস চলছিল। আমি ওই মোবাইলটা নিয়ে দিলাম দৌড়। দৌড় প্রতিযোগিতায় ঢুকে গেলাম। ওই ছেলেও পিছু পিছু দৌড়াল। এরপর দেখলাম সবাই বাহবা দিতে শুরু করেছে। আমরা সব বাদ দিয়ে দুজনই দৌড় প্রতিযোগিতায় লেগে গেলাম। ওই ছেলেও ফোনের চিন্তা বাদ দৌড়াতে লাগলো। ছেলে দৌড়ে প্রথম হয়ে গেল। আর আমি দ্বিতীয়। দুজনেই পুরস্কার পেয়ে গেলাম।
…এসব যাক আপনি হয়তো জানেন না আমি একজন বিখ্যাত কবি-লেখক ও।”
ইলেকট্রিশিয়ান অবাক হয়ে বললেন, “আপনার তো অনেক গুন!”
“আসলে গুন তো আর লুকিয়ে রাখা যায় না! আজকের এই সুন্দর ঘটনার উপরে আপনাকে একটা কবিতা শোনাই?”
“জি স্যার।”
“কবিতা হচ্ছে, ‘ধরলো চোরে’–
ধরলো চোরে সমাগমে
পড়লো মাথায় হাত
চোর বলে পালাও বাবা
লোক জন দেখে ভয়েই সে কুপোকাত।”
ইলেকট্রিশিয়ান বেচারা জোর করেই হাতে তালি দিলো। রাফি আবার বলল, “খুব তাড়াতাড়ি আমার একটা কবিতার বইও বের হবে। পড়বেন কিন্তু আপনি।”
“জি স্যার অবশ্যই পড়বো।”
রাফি দাঁতগুলো বের করে হেসে বলল, “আগে থেকে একটু আকটু সেল্ফ প্রমোশন করছি আর কি!”
এদিকে রুপমহলে সব আবার শান্ত। যেন কিছুই ঘটেনি। প্রীয়তা নিজের ঘরে ফিরে এল। দরজা বন্ধ করল। তার প্রথম কাজ, আয়ুর্বেদিক ওষুধের শিশিটা গোপন করা। সে আলমারি খুলে অগোচরে নিয়ে শিশিটাকে ড্রেসিং টেবিলের নিচের অংশে জুয়েলারি বক্সের ভেতর লুকিয়ে রাখল। এমনভাবে যে কেউ খুঁজলেও সহজে পাবে না। এরপর সে আলমারির দিকে এগোলো আবার। ফোনটার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে হলো বের করে দেখতে। কিন্তু না। আজ আর কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। তবে এটাকে ঘরের কোথায় রাখা যায়? ক্যামেরা ঘরে লাগিয়েই থাকে তবে ফোনটা দেখেই নেবে শেহতাজ। প্রীয়তা গোপনে ফোনটা কোমরে লুকিয়ে নিলো। এটাকে সে সুযোগ বুঝে রুশার ঘরে রেখে আসবে। এরপর আলমারির দরজা বন্ধ করলো। এই বাড়িতে এখন এমন জিনিস খুব কম আছে যেটার উপর সে ভরসা করতে পারে। সে ঘরটাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করল। সকালে ওরা ক্যামেরা লাগাতেও আসতে পারে। মেঘের সন্দেহ ভুল হওয়ার কথা না। সে জানালার কাছে গেল। পর্দার ভাঁজ পরীক্ষা করল। ফুলদানি। দেয়ালের পেইন্টিং। বইয়ের তাক। টেবিল ল্যাম্প। আয়নার কোণা। ঘড়ি। এমনকি সিলিংয়ের দিকেও তাকাল। কোথাও কিছু? কোনো ছোট লেন্স? কোনো অস্বাভাবিক আলো? কোনো ডিভাইস? কিছুই নেই।
একদম কিছুই না। তবু তার অস্বস্তি কাটল না। কারণ সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিসগুলো চোখে দেখা যায় না। শেহতাজ শেখকে যত চিনছে, তত বুঝছে, এই মানুষটা কখনো সরাসরি চাল চালেন না। সে এমনভাবে ফাঁদ পাতেন, মানুষ ফাঁদে পড়ার পরও বুঝতে পারে না।
প্রীয়তা বিছানার উপরে গিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো। সে কি অদ্ভুত ভাবে এ বাড়ির প্রাচীরে আটকে গেছে। একের পর এক দিন কেটে যাচ্ছে নানান কাহিনীর ভাঁজে। সে যেন বন্দিত্বের মাঝে আরো ফেসে যাচ্ছে।
চলবে.... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই ♥️
(রিচেক দেই নি। মন ভালো নেই। আপলোড দেয়ার পর পড়বো আজ।)