৮২.
মেঘ চুপচাপ শুধু দেখে গেল রুশাকে। রুশা কিছু সময় ক্যামেরার সামনে তার লাগাম ছাড়া কথা বলে চলল। এরপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে এক নজর দেখেই আঁতকে উঠলো। এটা কে? তার রুপে শুধু অসুস্থতা। চোখের নিচে কালি, চুল এলোমেলো, ওজন কমতে কমতে এখন কত আছে কে জানে! সে চিরুনি নিয়ে চুলটায় একটা আঁচড় টানতেই কারো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সে লাফিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। মেঘ সব কিছু অপলক দেখে গেল। এবার এ যুদ্ধে তাকে জিততেই হবেই। সে জানে প্রতিপক্ষ ভয়ংকর, তবুও। রুশাকে আর লুকিয়ে নয়, ছিনিয়ে আনবে। সে ভালো হয়ে দেখেছে, তবে তার ভালো রুপ নয় খারাপই এরা চায়।
ঠিক তখনই মেঘের ফোনটা বেজে উঠল। আরফান ভাই। মেঘ নামটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল। ওপাশ থেকে আরফানের গলা একটু চাপা তবে তীক্ষ্ণ, “তোর জন্য কিছু পাঠালাম।”
“কি?”
“শেহতাজ শেখের বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন।”
মেঘের চোখ একটু সরু হলো। ল্যাপটপ এক হাতে, ফোন কানে। স্ক্রিনে ডকুমেন্ট ওপেন করলো। আরফান বলতে লাগল, “এখানে লেখা আছে জন্ম তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ১৯৯৭। মায়ের নাম আনজুম আরা বেগম। ফরাসি রেকর্ডের সাথে এটা পুরো এক বছর গ্যাপ। শুধু তাই না জন্মদিনও আলাদা।”
মেঘ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল, “এ কেমন গোলক ধাঁধা? শেহতাজ কি নিজের আইডেন্টিটি ডাবল করে রেখেছে…? এটা কি অপরাধী মস্তিষ্কের কাজ? আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য এমন?”
“এখনো সঠিক জানি না। হতেই পারে। তবে তুই শুধু এটা জেনে রাখ দুটো জন্ম নিবন্ধনই আসল। আর একটা জিনিস, শেহতাজ ‘সেভেন সিক্রেট গ্রুপ’-এর সাথে জড়িত এটা নিশ্চিত।”
“কিং কোবরা?”
“হ্যাঁ, এই গ্রুপটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সাতজন মানুষ। কেউ জানে না কারা তারা। পরিচয় চিহ্ন সবার কাছে কিং কোবরার ট্যাটু। এরা সরাসরি গ্যাংস্টার না। এরা বড় বড় ডিল নিয়ন্ত্রণ করে যেমন: হীরা, অস্ত্র, অফশোর বিজনেস। ওদের হাত সব জায়গায়। ওরা মেইনলি অর্থের জন্য সম্পদকে প্রাধান্য দেয়। শেহতাজের হাতের ট্যাটুর মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় ও ওদের অংশ। তাছাড়া ওদের পরিচয় পাওয়া অসম্ভব।
আর শেহতাজের একটা জিনিস নিয়ে আলাদা আগ্রহ আছে।”
“কি, হীরা?”
“হীরা আর ম/দ ছাড়া তেমন কোনো নেশা নেই শেহতাজের। শেহতাজ “সেভেন সিক্রেট” নামে একটা বারও চালায় আমেরিকাতে। মালিকের আইডেনটিটি গায়েব করে রেখেছে। তাই এটার চর্চা নেই। তবে গোপন সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য। কিন্তু জিনিসটা খুব সিক্রেট। বড় বড় অপরাধ জগতের মাথাদের আড্ডার জায়গা ওটা।”
মেঘের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। আরফান এবার শেষ আঘাতটা দিল, “আর একটা ইনফো। ডিআইজি পারভেজ সওদাগরের মেয়েকে বিয়ে করার পেছনে ব্যক্তিগত কারণ কম, রাজনৈতিক কারণ হয়তো বেশি।
পারভেজ সওদাগরের ছোট ভাই ফারাজ সওদাগর মাফিয়া চক্রের সাথে কোন ভাবে জড়িত ছিল। রিপোর্ট বলে ক্র/স/ফা/য়া/রে মারা গেছে সে। আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশন ছিল তবে তা প্রকাশে আসতে দেয় নি হয়তো পারভেজ সওদাগর।”
“ওয়াট দ্যা…” মেঘের গলা আটকে এলো। সে নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে প্রীয়তা?”
“এইটাই মেইন, প্রীয়তা ফারাজ সওদাগরের কাছেই বড় হয়েছে। এমন কি তিনি প্রীয়তাকে নিজের মেয়ে হিসেবেই পরিচয় দিতেন। ফারাজ সওদাগরের এক মেয়ে ছিল, যে কার এক্সিডেন্টে মারা যায়। এরপর থেকে তার ওয়াইফ আলেয়া বেগম মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মেয়েটা প্রীয়তার সমবয়সী ছিল। তখন থেকেই তিনি প্রীয়তাকে নিজের মেয়ে মনে করতেন। পারভেজ সওদাগরও প্রীয়তাকেই উনাদের কাছে বেশি সময় রাখতেন। এরপর ফারাজ সওদাগর মারা যাবার পর পারভেজ সওদাগর প্রীয়তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। শুধু আনেন এমনটা নয়, প্রীয়তাকে নিয়ে বিশেষ ভয় পেতে থাকেন। তাই প্রীয়তাকে সানন্দাপুরে পাঠিয়ে দেন ফর সেফটি। প্রীয়তা ফারাজ সওদাগরকে নিজের বাবার থেকেও বেশি ভালোবাসতো।”
মেঘ এক মুহূর্ত থামলো। সে প্রীয়তাকে এতদিন মোবাইল ফোনটা দিয়েছে। তাও একবারও প্রীয়তা তার বাবাকে ফোন দেয় নি। তাছাড়া প্রীয়তা কখনো ওর চাচার ব্যপারে তো কিছু বলে নি! অবশ্য এটা বলার কখনোই প্রয়োজন ছিল না।
মেঘের ভাবনার মাঝেই আরফান আরো বলল, “সব থেকে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, পারভেজ সওদাগরের ভাই এই সেভেন সিক্রেটের একজনকে খু/ন করে খুব গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে পালিয়ে আসে এ দেশে। তাকে ক্র/স/ফা/য়া/রে খু/ন করা হলেও সে নথি কিন্তু এখনো গায়েব।”
মেঘের হাত মুঠো হয়ে গেল। আরফান শেষ করল, “মানে এই পুরো কাহিনি একটা পাওয়ার ওয়ার।”
মেঘ মাথায় হাত দিয়ে বসলো। পারভেজ সওদাগরও ওকে সবটুকু সত্য বলেন নি। তবে শেহতাজ কি প্রীয়তাকে ওই নথি ফেরত নিতে বিয়ে করেছে? তবে মুখোশ আসলে কার মুখে!
মেঘ আসলে কোন দিকে দৌড়াবে? কোন রহস্য ভেদ করা সহজ হবে? কোন দিকে ছুটলে ও এই অতল সাগরের কিনারা খুঁজে পাবে? মেঘ নিজেকে একটু ধাতস্থ করে উঠে দাঁড়ালো। তার আরেকটা ল্যাপটপ চাই। রুশার কক্ষ থেকে চোখ সরানো যাবে না। তাকে কাজও করতে হবে। মেঘ গিয়ে রৌদ্দুরের ল্যাপটপ নিয়ে এলো। সেখানে ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ সেট করে নিজের ল্যাপটপে কাজ শুরু করলো। খুঁজতে লাগল ফারাজ সওদাগরকে নিয়ে সব ডিটেইলস। কিন্তু… উনি তো…!!!
মেঘ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সরাসরি পারভেজ সওদাগরকে কল দিল। কয়েকবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো।
“আসসালামু আলাইকুম আংকেল।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম মেঘ?”
মেঘ কোন ভনিতা ছাড়াই সরাসরি বলল, “আঙ্কেল, কিছু প্রশ্ন করতে এত রাতে কল করছি।”
“হ্যাঁ বলো।”
“আপনি আপনার ভাইয়ের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেননি কেন?”
ওপাশে নিস্তব্ধতা। মেঘ স্পষ্ট শুনতে পেল পারভেজ সওদাগরের শ্বাসের গতি বদলে গেছে, “কে... কি বলছো তুমি?”
“ফারাজ সওদাগর। আপনার ছোট ভাই।” আর কিছু বলার দরকার হলো না। শব্দটা শুনেই যেন মানুষটা জমে গেলেন। অনেকক্ষণ পর খুব ধীরে বললেন, “তুমি... কোথা থেকে জেনেছো?”
“সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি জানতেন আমি প্রীয়তাকে সাহায্য করছি। জানতেন আমি শেহতাজকে নিয়ে তদন্ত করছি। তারপরও আপনার ভাইয়ের কথা একবারও বললেন না কেন?”
ওপাশে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। ভারী, ক্লান্ত। তিনি বললেন, “কারণ আমি চাইনি এটা প্রকাশ্যে আসুক।”
মেঘ চুপ করে রইল। পারভেজ সাহেব বলতে শুরু করলেন, “সবাই যেটা জানে, সেটা সত্যি না মেঘ।”
“তাহলে সত্যিটা কি?”
“ফারাজ কোনো মাফিয়া ছিল না। ফারাজ ছিল আন্ডারকভার অফিসার। অনেক বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র নিয়ে কাজ করছিল সে। সরকারিভাবে তার পরিচয় ছিল অন্য। কিন্তু বাস্তবে সে একটা বিশাল মাফিয়া নেটওয়ার্কের ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করছিল। ঐসব খুব সিক্রেট মিশন হয়। আমি নিজেও বিস্তারিত জানতাম না। শুধু জানতাম খুব বড় কিছু।
প্রথমদিকে সব ঠিক ছিল। কিন্তু পরে ফারাজ ধরা পড়ে যায়। সম্পূর্ণ না। আংশিক। সন্দেহের তালিকায় চলে যায়। ওর সামনে তখন মাত্র দুইটা রাস্তা ছিল। হয় নিজে মরবে। নয়তো আগে আঘাত করবে। ও কোন এক বড় গ্যাংস্টারকে খুন করে সব গোপন নথি নিয়ে দেশে পালিয়ে আসে।”
“তারপর?”
“তারপর গা ঢাকা দেয়। কিন্তু এত বড় অপরাধ চক্রের সাথে শত্রুতা ছোট বিষয় তো না। ওকে বাজে ভাবে ফাঁসানো হয়। মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সে অপরাধী। অ/স্ত্র ব্যবসায়ী। মাফিয়া। আন্তর্জাতিক স/ন্ত্রা/সী। তারপর ক্র/স/ফা/য়া/র। আমি জানি ও নির্দোষ। ।”
“আপনি প্রমাণ করতে পারেননি?”
“প্রমাণ ছিল না।”
“আর প্রীয়তা?”
“প্রীয়তা তখন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। ও আমার ভাইয়ের কাছেই বড় হয়েছে। ওর চাচি নিজের মেয়েকে হারানোর পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। ছোট্ট প্রীয়তাকে নিজের মেয়ে ভেবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাই প্রীয়তা ওখানেই থাকত। ফারাজ ওর জন্য চাচা ছিল না। বাবা ছিল। প্রীয়তা ওকে ভীষণ ভালোবাসত। ফারাজ মারা যাওয়ার পর ফারাজের বাড়িতে হামলা হয়। ওর স্ত্রী আলেয়া খু/ন হয়। প্রীয়তাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে নেন। তবে ও খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। আমি প্রীয়তাকে আর নিজের থেকে দূরে রাখার সাহস পাই নি। আস্তে ধীরে প্রীয়তা ওই ট্রমা থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরে। তবে ওকে নিয়ে আমার খুব ভয় হতো। আমি তাই ওকে সানন্দা পুরে পাঠিয়ে দিই।”
মেঘ চেয়ারে হেলান দিল। মাথার ভেতরে একটা নতুন ছবি তৈরি হচ্ছে। আর সেই ছবির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে প্রীয়তা। হয়তো সে নিজেও জানে না। হয়তো সে অজান্তেই কিছু বহন করছে। কিছু একটা। যেটার জন্য এত সব ঘটনা। মেঘ জিজ্ঞেস করলো, “আপনার ভাই ওদের কাছ যে নথি নিয়ে এসেছিল। এ সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?”
“শুনেছিলাম।”
“সেগুলো কোথায়?”
“এ বিষয়ে কিছু জানি না আমি।”
“সত্যি?”
“সত্যি। ফারাজের মৃত্যুর পর ওর কোনো জিনিসই আমার হাতে আসেনি। বাড়ি তছনছ করা হয়েছিল। অনেক কিছু উধাও হয়ে যায়। আমি শুধু প্রীয়তাকে ছাড়া আর কিছুই সরাইনি ওর বাড়ি থেকে।”
“তাহলে? ওগুলো কি ওরাই নিয়েছে নাকি অন্য কেউ! প্রীয়তার কাছে? কিছু আছে কি?”
পারভেজ সাহেব থেমে গেলেন, “এ ঘটনার ছয় বছর হয়ে গেছে মেঘ।”
“তবুও?”
“আমি কিছু জানি না বিশ্বাস করো।” মেঘ থামলো। এই প্রথমবার মনে হলো মানুষটা সত্যিই জানেন না। মেঘ ধীরে বলল, “আপনি জানেন আপনার ভাই কাকে খু/ন করেছিল?”
“না।”
মেঘ এবার সরাসরি বলল, “আপনার ভাই যাকে খু/ন করেছিল সে সেভেন সিক্রেট গ্রুপের একজন। মানে কিং কোবরার সদস্য।”
পারভেজ সওদাগর যেন কথাই হারিয়ে ফেললেন, “কি বললে? অসম্ভব...”
“এটাই সম্ভব হয়েছে।”
পারভেজ সাহেব একটু ভয়ই পেলেন। তার গলায় আতঙ্ক স্পষ্ট, “প্রীয়তার লাইফ রিস্কে?”
মেঘ শান্ত গলায় বলল, “এখন অব্দি তাই মনে হচ্ছে। সব ষড়যন্ত্র। যা আমাদের কল্পনারও বাহিরে। এই তথ্য গুলো সত্য হলে শেহতাজ প্রীয়তাকে বিয়ে করেছে পরিকল্পনা করে।”
“তুমি কি বলতে চাইছো?”
“আমি বলতে চাইছি, এই বিয়ে কোনো আকস্মিক ঘটনা না। আর না ওই সামান্য হীরের চোরাচালানের সংবাদ ডাবাতে। সবকিছু হয়তো আগেই সাজানো ছিল।”
“কিন্তু কেন?”
“কারণটাই তো এখনো স্পষ্ট নয়…।”
পারভেজ কিছু বললেন না। মেঘও না। দুজনেই সব তথ্য বের করার পরও একই জায়গায় আটকে আছে। একই বিন্দুতে দড়ি ফেলে বৃত্তের মাঝে দৌড়াচ্ছে তারা।
আর কথা বাড়লো না ওদের। কলটা কেটে যেতেই মেঘ সাথে সাথেই প্রীয়তাকে মেসেজ করলো, “ইমার্জেন্সি কথা আছে। ফোনটা অন করেই আমাকে কল করবি।”
মেঘ কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার কোটি রহস্যের ভাঁজে সে পিষে উঠছে। সে কোন দিকে দৌড়াবে? তার সামনে দুইটা স্ক্রিন। একটাতে রুশার লাইভ ফিড। আরেকটাতে অসংখ্য ডকুমেন্ট।
কিন্তু তার মনে অস্বস্তি। একটা একটা করে সমাধান করতে হবে সব। মেঘের চোখ স্ক্রিনে ভেসে থাকা নার্সটার দিকে আটকালো। মহিলাটা রুশার বিছানার পাশে বসে মোবাইল দেখছে। মেঘ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে জুম করল। এনাকে সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন সবার আগে। নার্সের একটা স্ক্রিনশট নিয়ে নিল সে। তারপর শুরু হলো অনুসন্ধান। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়া। তারপর মেডিকেল রেজিস্ট্রেশন ডাটাবেজ। এরপর পরিচিত কয়েকজন হাসপাতাল প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর উত্তর খোঁজ মিলল।
নার্সের নাম: সাবিহা রহমান।
কর্মস্থল: ইউনাইটেড হাসপাতাল।
মেঘ চেয়ারে হেলান দিল। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। এবার আরো বড় যুদ্ধ। মেঘের জীবনে সব থেকে অপছন্দনীয় বিষয় হচ্ছে ক্ষমতা খাটানো। সে ক্ষমতা বাবার হোক কিংবা নিজের। সে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত। কিন্তু জীবন তাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড়া করিয়েছে যেখানে তাকে পদে পদে বাবার নাম ভাঙিয়ে চলতে হচ্ছে।
মেঘ বাজে ভাবে অনুভব করলো নিজের নামের কদর। তার এবার নিজের নাম চাই। তার বারবার নিজের বাবার নামের ক্ষমতা খাটিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে আর ভালো লাগছে না। তবুও করতে হবে।
পরের এক ঘণ্টা জুড়ে কয়েকটা ফোনকল হলো। কিছু প্রভাব, কিছু অনুরোধ, কিছু কৃতজ্ঞতা আর কিছু মোটা অঙ্কের টাকা। সব বিছিয়ে সমাধান টানলো এই নার্সের।
মেঘের কাজ থামলেও তার চোখ থামলো না। সে এখন নিরব পাহারাদার। নার্স ঘুমাচ্ছে। তবে রুশা ঘুমাচ্ছে না। এটাই তো স্বাভাবিক। দিনের পর দিন ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় ঘুমিয়েছে। এখন ওকে বেশ কয়েকদিন ভুগতে হবে এসবের জন্য। মেঘ মৃদু হাসলো। স্ক্রিনে একবার ছুঁয়ে নিলো।
ভোরের শেষ দিকটায় মেঘের চোখ লেগে এলো। সে ঘুমের ঝিমটি দিয়ে উঠতেই বেলা মাথার উপর। রুশা কক্ষে বেশ অনেক মানুষ। রুশা আধশোয়া হয়ে আছে। তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন আনজুম আরা বেগম। প্রীয়তা এক কোনে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের এখন বের হওয়া জরুরি। সে ল্যাপটপ অফ করে ফোন ক্যামেরার একসেস অন করে বেরিয়ে পড়লো। রেকর্ড থাকবে যদিও। তাও সে কোন এক মুহুর্ত একা ছাড়তে চায় না।
সকালটা পেরোতেই হাসপাতালের প্রশাসন থেকে নার্স সাবিহা রহমানকে জানানো হলো অন্য এক ভিআইপি কেসের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন নার্স সাবিহা রহমানকেই। সাবিহা আর বাদ সাধলো না। তার প্রয়োজন অর্থ। এখন যেখানে ভালো পাবে সেটাই তার কাজ। কাগজপত্রও তৈরি হয়ে গেল। দুপুরের মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে আনা হলো হাসপাতালে। শাহরিয়ার শেখ একটু বাঁধ সেধেছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টাকে অফিসিয়ালি সামলে নিয়েছে।
তবে শুধু সরিয়ে দিলেই হবে না। তার জায়গায় নিজের লোক লাগাতে হবে। মেঘ সে ব্যবস্থাও করে নিয়েছে। এ বিষয়ে অবশ্য সাহায্য করেছে কাঁকন সুলতানা। তার নিজের পরিচিতি এক বিশ্বস্ত নার্সকে সেট করে দিয়েছেন রুশার খেয়াল রাখার জন্য। নার্স আদিবা আনসারী। বুদ্ধিমতী, বিশ্বস্ত, এবং দক্ষ একজন সেবিকা। নতুন নার্স নিয়ে রুপমহলের কেউই কোন আগ্রহ প্রকাশ করলো না। তার মানে নার্স এখানে বিষয় না। যা করছে সব তারাই করছে। নার্স তো শুধু সেবা করার জন্য পুতুলের মতো সাজিয়ে রেখেছে।
রুপমহল ধীরে ব্যস্ত হয়ে উঠল। নার্স পরিবর্তন বড় কোন ঘটনা নয়। আনজুম আরা বেগম নিজে সব বুঝিয়ে দিলেন। প্রীয়তার অবশ্য আদিবাকে এক নজর দেখেই সন্দেহ হলো। বেশ হাস্যোজ্জ্বল মেয়ে। এসেই এটা সেটা নিজেই বুঝে নিলো।
রুশাকে বিশেষ কিছু বলতে হল না। সে যে গত রাতেই মেঘের কাছে নার্স বদলের আবদার করেছিল। মেঘ তার আবদার রাখবে না এমনটা কি কখনো হয়েছে? আদিবা একটু ফাঁকা পেতেই রুশা আর প্রীয়তাকে বলল, “আমি আদিবা আনসারী। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি নার্স।”
রুশা হাসলো সামান্য। প্রীয়তা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদিবা বলল, “আপনি প্রীয়তা ম্যাডাম নিশ্চয়ই। মেঘ স্যার আমাকে ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে চিনিয়েছেন।”
আদিবা এবার রুশার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে রুশা ম্যাডাম বলব নাকি ভাবি বলে ডাকবো?”
রুশা আর প্রীয়তা দুজনই দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ল। আদিবা শুধু বাঁচাল স্বভাবের মেয়ে নয়, বরং বড্ড বেশি হাসিখুশি মেয়ে। ওই যে থাকে না কিছু মানুষ, খুবই পজেটিভ পাওয়ারের? মেয়েটা একেবারে সেরকম।
মহলের সব কিছু আজ অত্যাধিক স্বাভাবিক। প্রীয়তা গত রাতেই লুকিয়ে ফোন রুশার ঘরের আলমারিতে রেখে গেছে। আপতত কয়েকদিন রিস্ক দরকার নেই। আদিবা এবার নিজের ফোনটা প্রীয়তাকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “প্রীয় ম্যাডাম আপনার সাথে মেঘ স্যার কথা বলতে চান। আমাকে বলে দিয়েছেন আপনাকে যেন জানাই। আপনি আমার এই ফোনটাই ব্যবহার করতে পারেন।”
রুশা আর প্রীয়তা আবারো দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়লো। প্রীয়তা বলল, “আমার কাছে ফোন আছে।”
“মেঘ স্যার সব জানিয়েছেন। আপনি আমার ফোনটা নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে পারেন। শুধু আমার বাবু যদি ফোন দেয় তো ফোনটা ধরবেন না।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে বলল, “বাবু মানে তোমার বাচ্চা?”
রুশা একটু বিস্ময়ে বলল, “তুমি বিবাহিত?”
আদিবা মাথা নেড়ে বলল, “কি যে বলেন আপনারা। বাবু মানে আমার বয়ফ্রেন্ড। আমি ওকে নাম ধরে ডাকি না। সবসময় বাবু বলি। ভালোবাসার নামে ডাকলে ভালোবাসা বাড়ে আপনারা জানেন না?
রুশা ম্যাডাম আপনি মেঘ স্যারকে কি বলে ডাকেন?”
রুশার বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। সে এ জন্মে মেঘকে মেঘ ছাড়া আর কিছুই সম্মোধন করেনি। তার কি সত্যিই কোন আদুরে নাম দেয়া উচিত? প্রীয়তা আর আদিবার মুখের ভরসা করলো না। যে কোন সময় যা কিছু ঠুস ঠাস বলে ফেলবে। প্রীয়তা ফোনটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল চুপচাপ। একবার পিছে আদিবার মুখের দিকে তাকাতেই আদিবা ৩২টা দাঁত দেখিয়ে বলল, “কিছু ভাববেন না। কেউ এলেই আমি জোরে জোরে গান গাওয়া শুরু করব।”
নোট: ৩০০ রিয়্যাক্ট উঠলেই পরের পর্ব আসবে ধন্যবাদ। 🫶🏻
চলবে কি না আপনারা বলেন .... 💝
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই} ♥️