ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৮৯তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৮৯. 

ঘরে আবার নীরবতা। প্রীয়তা চুপ করে বসে রয়েছে। তার বুকের ভেতর যুদ্ধ চলছে। যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে, তার কাছেই তাকে অভিনয় করতে হবে? তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে? এ যেন নিজের আত্মসম্মানের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে বলল, "যদি এটাই একমাত্র রাস্তা হয়...তবে আমি রাজি। মুক্তি ছাড়া আর কিচ্ছু চাই না আমার।"
রুশা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ঘরে উপস্থিত কেউ আর কোনো কথা বলল না। মেঘের শেষ কথাগুলো প্রতিটি মাথার ভেতর একসাথে প্রতিধ্বনি তুলছে। প্রত্যেকে একই খেলার অংশ, অথচ প্রত্যেকের পথ আলাদা। প্রীয়তা উঠে দাঁড়াল। রুশা তার দিকে তাকাল, "চলে যাচ্ছিস?"
প্রীয়তা জোর করে ঠোঁটে একফোঁটা হাসি আনল, "হ্যাঁ। একটু রেস্ট করি।"
রুশা আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল প্রীয়তা।
করিডোরে তখন গভীর সন্ধ্যা। রূপমহলের বিশাল ঝাড়বাতিগুলো সম্পূর্ণ জ্বলে উঠেছে। সাদা মার্বেলের মেঝেতে আলো পড়ে চিকচিক করছে। দূরে কোথাও ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রীয়তার কানে কিছুই ঢুকছে না। সে নিজের কক্ষের দিকে হাঁটছে। প্রতিটা পদক্ষেপের সঙ্গে যেন মাথার ভেতর আরও জট পাকাচ্ছে।
ঘরে ঢুকে দরজাটা ঠেলে দিল। একবার চারপাশে তাকাল। বিশাল কক্ষটা নানান দামি, সৌখিন আসবাবপত্রে বোঝাই। ডিভান থাকার জায়গাটা শুধু ফাঁকা। প্রীয়তা চুপচাপ বিছানার কিনারায় বসলো। দুই হাত জোড় করে হাঁটুর ওপর রাখল। অনেকক্ষণ শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের সাথেই ফিসফিস করে বলল, "অভিনয়..." 
শব্দটা উচ্চারণ করতেই গা ঘিনঘিন করে উঠল। যে মানুষটার মুখ দেখলেই তার রাগে শরীর কেঁপে ওঠে, যে মানুষটা তাকে বন্দি করে রেখেছে, যার কারণে তার জীবনটা নরকে পরিণত হয়েছে। সেই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে?
প্রীয়তা চোখ বন্ধ করল। না… স্বাভাবিক নয়। বিশ্বাসের অভিনয়। হঠাৎ করে বদলে গেলে শেহতাজ প্রথমেই সন্দেহ করবে। লোকটা বোকা নয়। বরং বিপজ্জনক রকমের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আছে তার। শেহতাজ মানুষের নিঃশ্বাস পর্যন্ত পড়তে পারে। একদিনে ঘৃণা থেকে ভালো ব্যবহার? অসম্ভব। তাকে খুব হিসেব করে এগোতে হবে। প্রথমে শুধু রাগ কমাতে হবে। তারপর … না না...‌এতদূর এখনই ভাবা যাবে না। 
প্রীয়তা উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। 
 একবার নিজেকে ভালো করে দেখে নিজেকে প্রশ্ন করলো, “মেঘ যা বলেছে তা কি সত্যি? শেহতাজ কি সত্যিই তবে আমার উপর দূর্বল? তার ব্যবহারে তো মনে হয় না।”
প্রীয়তা বিরক্ত হয়ে মাথায় হাত দিল। সে নিজেকেই ধমকাল। "ধুর…লোকটাকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?"
কিন্তু তাকে ভাবতেই হবে। এমন প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুতি তো প্রয়োজন! যদি ভুলেও প্রীয়তা ধরা পড়ে যায় তবে সব শেষ। শাস্তি স্বরুপ জীবন নিয়ে নেবে শেহতাজ। প্রীয়তার কোন ভুল করলে চলবে না। যুদ্ধ শুধু অ/স্ত্র দিয়ে হয় না।
প্রীয়তার মনের মত টানাপোড়েন অবশ্যই রুশার মনেও চলছে। তবে সেসবের অনুভূতি সামান্য ভিন্ন। তার অন্যরকম নীরবতা। আদিবা অনেক আগেই চুপ করে গেছে।‌ রুশা বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রয়েছে দীর্ঘক্ষণ। তার চোখে কিছুই যেন ধরা পড়ছে না। মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে, "জাস্ট চব্বিশ ঘণ্টা।"
শেহতাজ কথাটা বলেছিল কেন? সে কী করতে যাচ্ছে? তাকে অসুস্থ করে রাখার মত জঘন্য কাজ যেই করুক, সে কি করে ধরবে? শেহতাজ কি তার বাবার বিপক্ষে যেতে পারে? রুশাকে কেন রক্ষা করতে চায় সে। কিসের দায়িত্ব? রুশা চোখ বন্ধ করলো। শাহরিয়ার শেখের ভাষ্য অনুযায়ী ওর বাবা শেহতাজের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে গিয়েছিল। তবে কি ওর বাবা কোন দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল? কিন্তু তখন তো শেহতাজ নিজেই ছোট! দশ কি বারো বছর বয়স! তখন কে ওর উপর দায়িত্ব চাপাবে? আর ওই দশ বছরের বাচ্চা কিভাবে রক্ষা করতে পারে মাত্র ৪ বছরের আরেকটা বাচ্চাকে? তবে কি যা দেখা যাচ্ছে তা সব সত্য নয়? এমন কিছু আছে যা দেখা যাচ্ছে না? রুশার হিসেব মিলছে না। সে অস্থির হয়ে উঠলো। ঠিক কি করতে পারে সে?
রুশা শুধু মাথা নিচু করে খুব আস্তে বলল, "আল্লাহ… এবার আর ভুল করতে দিও না। আমাকে শান্ত করো। অস্থিরতা দূর করো। সমাধান দাও।"
      ঘড়ির কাঁটা রাতের দিকে এগোচ্ছে। মনিটরের আলোই পুরো ঘরটাকে নীলচে করে রেখেছে। অরূপ কফির মগ হাতে বসে আছে। মেঘ এখনও একইভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে। 
প্রথমবারের মতো সে নিজেকে আটকে ফেলেছে। তার সামনে অসংখ্য তথ্য। অসংখ্য ঘটনা। অসংখ্য প্রশ্ন। কিন্তু কোনোটারই উত্তর নেই। সে এখন চাইলে শেহতাজ সম্পর্কে আরও খোঁজ নিতে পারে না। অনুসরণ করতে পারে না। তার হাত অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। একটা ভুল পদক্ষেপ… একটা মাত্র বাড়তি অনুসন্ধান… আর শেহতাজ বুঝে যাবে, কেউ তাকে ঘিরে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে পুরো খেলাটাই শেষ। মেঘ চোখ বন্ধ করল। টেবিলের ওপর আঙুলের ছন্দ আবার শুরু হলো।
অরূপ মগে চুমুক দিতে দিতে বলল, "কিছু মাথায় আসছে?"
মেঘ খুব ধীরে মাথা নাড়ল, "টুকরো টুকরো অনেক কিছু আছে।"
"কিন্তু?"
"জোড়া লাগানোর আঠা নেই।"
অরূপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই অবস্থাটা সবচেয়ে খারাপ। যখন উত্তর সামনে আছে… কিন্তু হাত বাড়িয়েও ছোঁয়া যায় না। ঠিক তখনই মেঘের মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠল। দুজনেই একসাথে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আমিনুল আংকেল কলিং। মেঘ এক মুহূর্ত থেমে কলটা রিসিভ করল, "আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।"
ওপাশ থেকে দ্রুত কণ্ঠ ভেসে এল, "ওয়ালাইকুমুস সালাম, বাবা। কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ্, আঙ্কেল আপনি ভালো আছেন?”
“আল্লাহ রেখেছে বাবা। শোনো, ইমরান কি তোমার সাথে আছে?"
মেঘ এক সেকেন্ডের জন্যও থামল না। স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল, "না, আঙ্কেল। সকালের দিকে একবার এসেছিল। এরপর বলল, ওর নাকি একটা জরুরি কাজ আছে। সেখানেই চলে গেছে। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি।"
"আমার ফোন ধরছে না। তাই ভাবলাম হয়তো তোমার সাথে আছে।"
"না, আঙ্কেল। আমি দেখছি ওকে পাই কিনা। আমার এখানে এলেও অবশ্যই আপনাকে জানাব।"
“ঠিক আছে, বাবা।"
কল কেটে গেল। ফোনটা ধীরে টেবিলের ওপর রেখে দিল মেঘ। অরূপ ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "ইমরান আবার কোথায় গেল?"
মেঘ কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল অন্ধকার হয়ে আসা জানালার ওপারে। ইমরানের জরুরি কাজ কি এখনো শেষ হয়নি? 
ইমরান এই খেলার কোন অংশ নয়। সেক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত বিষয়ে তার কোন বিপদ হওয়া অসম্ভব। তবে হতেও তো পারে! প্রতিপক্ষ কি আর জানে, এই খেলার পিছে আসলে কে কে আছে? আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। মেঘ তাই আর বেশি একটা ঘাটালো না।
রাত পুরোপুরি নামার আগেই রুপমহলের পেছনের ভাঙাচোরা এক মহলে ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা। এখানেই শেহতাজ তার সকল অপকর্ম আরামে সম্পূর্ন করে। প্রীয়তাও তার ভাগের শাস্তিটা এ কক্ষেই পেয়েছিল। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে জায়গাটা।
ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ার। ইমরানের দুই হাত চেয়ারের হাতলের সঙ্গে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা। পায়েও মোটা রশির প্যাঁচ। মুখ বাঁধা হয়নি। কারণ তারা জানে, এই ছেলেটা চিৎকার করবে না। ইমরানের কপালে শুকিয়ে যাওয়া ঘামের রেখা। চুল এলোমেলো। চোখে স্পষ্ট ক্লান্তি। ইমরান লাগাতার ছুটতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তার হাতের দড়ি এত শক্ত যে চুল মাত্র নড়াচড়া করার জায়গা নেই। ঠিক তখনই দরজার বাহিরে ভারী জুতোর শব্দ শোনা গেল। একটা ধীর, নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ। ইমরান মাথা তুলে তাকাল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল শেহতাজ। তার পেছনে আরও দুজন লোক।
শেহতাজ আজও আগের মতোই পরিপাটি। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। মুখে কোনো রাগ নেই। যেন অফিসের কোনো মিটিংয়ে এসেছে। সে এগিয়ে এসে ইমরানের সামনে রাখা কাঠের চেয়ারটায় বসল। দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। শেষ পর্যন্ত শেহতাজই নীরবতা ভাঙল, “কিরে ইঁদুরের বাচ্চা রুপমহলের আশেপাশে শুধু ঘুরে বেড়াতে খুব মন চায় তাই না। শকুনের নজরটা কার জন্য?”
ইমরান কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি একটুও সরল না। শেহতাজ ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে বলল, “আমার বিশ্বাসঘাতক পছন্দ না। আমি চাইলে মুহূর্তে তোর গলাটা নামিয়ে দিতে পারি। কিন্তু ছুঁচো মেরে হাতগন্ধ শেহতাজ করে না।”
ইমরান একেবারে সাথে সাথেই বলে উঠলো, “আমি ছুঁচো নাকি কালকেউটে সেটা আপনার এতদিনে বুঝে যাওয়া উচিত।”
“আমার বুঝ আমার কাছে থাক। আমি শুধু ভাবছি তোর সাথে কি করা উচিত।”
ইমরান হেসে বলল, “মেরে ফেলুন…কিন্তু আপনি আমাকে মারবেন না। আমাকে মারার হলে অনেক আগেই মেরে দিতেন আপনি। রুবাইকে আমি ভালোবাসি। আর রুবাই আমাকে ঠিক এতটাই ভালবাসে আমার একটা ডাকে আপনার এই মহল পেছনে ফেলে আমার সঙ্গে হাঁটবে।”
শেহতাজ হাসলো। “ক্রিমিনাল মাইন্ড। ছোটবেলায় দাদী আম্মার কাছে গল্প শুনতাম। ডাইনি নাকি সাত ঘর ছেড়ে এরপর শিকার করে। আর তুই তো তার থেকেও খারাপ, নিজের ঘরেই…!”
ইমরান এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। “আপনি কি আমাকে এসব রুপকথা শোনানোর জন্য বেঁধে রেখেছেন?”
“আমার বাবার সাথে তোর কাজ কি? … শাহরিয়ার শেখের সাথে তোর কাজ কি?”
ইমরান খুব ব্যাঙ্গ করে বলল, “উফস্!! দ্যা গ্রেট শেহতাজ শেখ…। মাফিয়া ব্লা ব্লা ব্লা। একটা বাচ্চা ছেলেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে জিজ্ঞেস করছে, আমার বাবার সঙ্গে তোমার কাজ কি! নিজের অসহায়ত্ব আমার সামনে প্রকাশ করছেন? ভয় পাবেন না আমি কাউকে বলবো না।”
শেহতাজ রাগে বন্দুক ঠেকিয়ে নিলো ইমরানের কপালে। আরফি ওকে আটকে নিলো। কিন্তু ইমরানের মাঝে বিন্দুমাত্র ভয় নেই। ওর সামনে যা হচ্ছে সব যেন খুব স্বাভাবিক। ও যেন নিশ্চিত শেহতাজ ওর কোন ক্ষতি করবে না কিংবা করতে পারবে না। ইমরানের এমন নিশ্চিত মুখোভঙ্গি শেহতাজকে আরো রাগিয়ে তুলল। শেহতাজ পা দিয়ে ইমরানের বুকে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারটা উল্টে পড়ে গেল। শেহতাজের সাথে থাকা লোক গুলো দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে আবার চেয়ার সমেত ইমরানকে উঠিয়ে তুলল। কিন্তু এতেও ইমরানের কোন ব্যথাতুর কিংবা ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া নেই। সে একই রকম মুখে হাসি নিয়ে শেহতাজের দিকে তাকিয়ে রইল। শেহতাজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই কক্ষে শাহরিয়ার শেখ এসে হাজির হলেন। তার গম্ভীর গলায় বললেন, “ইমরানকে ছেড়ে দাও।”
শেহতাজ অবাক হয়ে তার বাবার দিকে ঘুরে তাকালো। শাহরিয়ার শেখ একেবারে শেহতাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন, “ছেড়ে দাও ওকে। আমি যেমন তোমার কাজে নাক গলাই না। তেমন তুমিও আমার কোন কাজে চোখ তুলে তাকাবে না।”
শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড শুধু তার চোখে তাকিয়ে রইল, “কি করতে চাইছেন আপনি? কি খেলা খেলছেন?”
“কোন খেলা নয়। রুবাই ইমরানকে ভালোবাসে। এত বছর চেষ্টা করেও রুবাইয়ের মন থেকে আমি ইমরানকে সরাতে পারিনি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি ওদের ভালোবাসা মেনে নেব। ব্যাস এটুকুই।”
শেহতাজের ঠিক বিশ্বাস হলো না শাহরিয়ার শেখের কথা। ও শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো, “কি সওদা করেছেন ইমরানের সাথে?”
“কোন সওদা নয়। আমি শুধু রুবায়ের কথা রেখেছি। দিনশেষে আমিও তো বাবা। ছেড়ে দাও ওকে।”
শেহতাজ ঠিক বুঝেও বুঝতে পারলো না ঘটনা। তবুও বাইরের একটা লোকের সামনে সে যুক্তি তর্কে যেতে চাইলো না। শেহতাজ তার পেছনে দাঁড়ানো লোকদের উদ্দেশে বলল, "ওকে খুলে দাও।"
লোক দুজন মুহূর্তেই দড়িগুলো খুলে দিল। অনেকক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে ইমরানের কবজিতে লাল দাগ পড়ে গেছে। সে হাত ঘষল। শেহতাজের আঘাতে তার বুকেও লেগেছে। তবে এসব সহনীয়। শেহতাজ রাগি চোখে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখে নেব আমি তোকে।”
শাহরিয়ার শেখ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আহ্ যাও এখান থেকে।”
শেহতাজ রাগি কদমে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। একবারও পেছনে তাকাল না। ইমরানের সাথে শাহরিয়ার শেখ কয়েক মিনিট কিছু একটা নিয়ে আলোচনা সারলেন। তারপর ইমরানও রুপমহল থেকে বেরিয়ে গেল। সে সোজা নিজের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালো। তবে বাড়ির সামনে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। গেটের ওপাশে আলো জ্বলছে। নিশ্চয়ই তার বাবা এখনও অপেক্ষা করছেন। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল সে।
না… এ অবস্থায় ভেতরে গেলে অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। হাতের লাল দাগ, মুখের ক্লান্তি। সবকিছুই ধরা পড়ে যাবে। ইমরান পরনের শার্টের হাতাটা নামিয়ে নিলো। চুল গুলো ঠিক করে নিজেকে একটু সামলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো। আমিনুল সাহেব কোন প্রশ্ন করার আগেই সে বলল, “সরি আব্বু। ফোনে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। একদমই খেয়াল করি নি।”
আমিনুল সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন, “আমি কত চিন্তায় ছিলাম তোমার ধারনা আছে?”
“সরি আব্বু, মেঘের ওখানে গিয়েছিলাম। পরে রাফির থেকে কিছু নোট কালেক্ট করলাম। এরপর হুট করে এক পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল। আর সময় টের পাই নি।”
আমিনুল সাহেব আর কিছু বলতে পারলেন না। একটু খানি বকা বকি শেষে সব মেনে নিলেন। ইমরান ইচ্ছে করেই সবটা লুকিয়ে গেল। সে কোনভাবেই চায় না তার বাবা আবার এসব জিনিস নিয়ে চিন্তা করুক। 
ইমরান ঘরে গিয়ে মোবাইল বের করে অন করতেই দেখলো তার বাবার ফোন কলের সাথে অরুপ আর মেঘেরও একাধিক মিস কল। ইমরান ডিরেক্ট মেঘকে কল লাগালো। মেঘ ফোনটা রিসিভ করেই বলল, “কোথায় ছিলি। কতগুলা কল করেছি!”
ইমরান এবারও ইচ্ছে করেই মেঘের থেকেও লুকিয়ে গেল পুরো বিষয়টি। সে কোনভাবেই জানতে দিতে চায় না আজকের ঘটনা। সে বলল, “আমি বেরিয়েছিলাম একটু। ফোনে চার্জ ছিল না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
“আঙ্কেল কল করেছিল তুই এখানে আছিস কিনা। আমিও একটু চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।”
ইমরান এসব কথা এড়িয়ে বলল, “ওদিকে সব ঠিক আছে? একটা কথা বলতো তুই রুশার ঘরে ক্যামেরাটা কি করে লাগালি?”
“লম্বা কাহিনী পরে সময় করে করব। তুই তাহলে রেস্ট নে পরে কথা হচ্ছে।”
“আসলেই আমি অনেক ক্লান্ত। কাল সকালে আসছি তখন কথা হবে।”
“ঠিক আছে।”
এটুকু বলেই মেঘ কলটা রেখে দিল। ইমরান ফোনটা ধরেই বসে রইলো। ও চায় না মেঘ এসবে জড়াক। মেঘ যেভাবে চায়নি ইমরান এগুলোতে জড়াক। মেঘ একা অনেক কিছু করে ফেলেছে এবার ওর পালা। মেঘের সামান্যতম ক্ষতিও ইমরান হতে দেবে না। ইমরানের যা দরকার ও সব করবে। 
রুপমহলে কারো কাছে ফোন নেই। রুবাইয়ের কাছে যদি ফোন থাকত তবে ওর সাথে অন্ততঃ যোগাযোগ করা যেত। এভাবে ওকে যেতে হত না স্বশরীরে। তবে লাভ কি হলো! দেখা তো করতে পারলো না। কিন্তু অন্য জায়গায় লাভ তো হয়েছে।
চলবে…? 
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন