৯১.
প্রীয়তা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। সে তার নিজের ঘরে ঢুকতেই আবার সেই শূন্য জায়গাটা চোখে পড়ল। ডিভান নেই। ফাঁকা। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। আজ শোবে কোথায়? এই বিছানাতেই? ভাবতেই তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু মাথার ভেতর ঝিমঝিম করছে। আজকের মতো শরীরও যেন প্রতিবাদ করছে। আর এই ব্যাপারটা বেড়েই চলেছে, সে ওয়াশরুমে ঢুকে বরফশীতল পানি দুহাতে তুলে মুখে ছিটাল কয়েকবার। তবুও মাথার ভার কমল না। বরং চোখের সামনে ঝাপসা ভাবটা একটু একটু করে বাড়ছে। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, "এমন তো কখনও হয় না..." নিজের কাছেই ফিসফিস করল সে।
ঠান্ডা-জ্বরের জন্যও এমন দুর্বল লাগে না। আজ শরীরটা অদ্ভুত লাগছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে এসে বিছানায় বসে পড়ল। তারপর প্রায় লুটিয়েই পড়লো।
ওদিকে রুশা গ্লাসটা নামিয়ে রাখতেই তারও কপালের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব হল। সে ভ্রু কুঁচকে চোখ বন্ধ করল। তারপর দুহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরল। না… এই অনুভূতিটা সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। আদিবা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল, "কী হয়েছে?"
রুশা খুব আস্তে বলল, "মাথাটা হুট করে ঝিম ঝিম করছে।" আরও কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ফিসফিস করল, "আমাকে আবার বোধহয় ওই ওষুধটা দেওয়া হয়েছে।"
আদিবা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। সে প্রায় চিৎকার করেই বলল, "কী…! কী বলছেন?? অসম্ভব! আমি তো সারাদিন আপনার সাথে। আপনাকে তো কেউ কোন ওষুধই দেয়নি।”
রুশা কষ্ট করে মাথা নাড়ল, “সিম্পটমটা আমি চিনি। এটাই, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা করবে। এরপর সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাবে। মনে হবে মাথায় কিচ্ছু নেই। ভুলভাল বকতে শুরু করব। মাথা ব্যথাটা ঠিক এভাবেই শুরু হয়...আমার জ্ঞান থাকার অবস্থায় মেঘকে কল দাও।"
আদিবার বুক কেঁপে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে মেঘকে কল করল। ওপাশে প্রথম রিংয়েই ফোন রিসিভ হলো। আদিবা স্পিকার অন করলো। মেঘ কিছু বলার আগেই ফোনটা রুশা বলতে শুরু করল, তার কণ্ঠ কাঁপছে, "মেঘ আমাকে আবার ওই ওষুধটা দেওয়া হয়েছে।"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা। অরূপও চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। মেঘের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল, "কী বলছ?"
রুশা চোখ বন্ধ করল, "আমি নিশ্চিত..."
মেঘ প্রায় চিৎকার করে উঠল, "কীভাবে? কে দিয়েছে?"
কেউ উত্তর জানে না। সারাদিন লাইভ ক্যামেরা চলেছে। কেউ ইনজেকশন দেয়নি। কেউ সন্দেহজনক কিছু করেনি। মেঘ দ্রুত বলল, "আদিবা! কিছু করো!"
আদিবার মাথায় এক মুহূর্তেই সম্ভাবনাগুলো ঘুরে গেল। ইনজেকশন নয়। সে নিজেও সারাদিনই এঘরে। তার সামনে কেউ এসে কিছু করেনি। না কোন ওষুধ খাইয়েছে, না কোন ইনজেকশন দিয়েছে। তাহলে ওষুধটা রুশার পেটে গেল কি করে? তবে কি কোন খাবারের সাথে মিলিয়ে খাইয়েছে? সে দ্রুত বলল, "যদি ওষুধ খাওয়ানো হয়ে থাকে, তাহলে যতটা সম্ভব শরীর থেকে বের করতে হবে। তেঁতুল পানি থাকলে ভালো হতো...। কিন্তু এটা তো জোগাড় করা সম্ভব নয়। তাহলে একটাই উপায়।” এটুকু বলেই আদিবা রুশার হাত ধরে বলল, "চলুন আমার সাথে, আমি ধরছি।"
আদিবা দ্রুত কদমে রুশাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। বেসিনের সামনে দাঁড় করিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ম্যাডাম... বমি করতে হবে।"
রুশার শরীর ঢলছে। আদিবা রুশার মতামত নেবার প্রয়োজন মনে করলো না। নিজেই গলায় আঙুল দিতেই বমি করানোর চেষ্টা করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র বমি শুরু হলো। এভাবে কয়েকবার চলল। আদিবা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। মুখ ধুইয়ে দিল। কিন্তু বমির পরেও রুশার চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে। আদিবা ঠোঁট কামড়ে ধরল। ওষুধ শরীরে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সবটা বের হয়নি।
এদিকে মেঘ ইতোমধ্যেই পুরো দিনের রেকর্ডিং টেনে দেখতে শুরু করেছে। ফাস্ট ফরোয়ার্ড, পজ, রিওয়াইন্ড, আবার প্লে। একজন সাহায্যকারী। তারপর রুবাই। তারপর আনজুম আরা বেগম। তারপর খাবার। অসংখ্য মানুষ। কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কিছু মেশায়নি। অরূপ নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘের চোখ একবারও পলক ফেলছে না। হঠাৎ সে থেমে গেল। খাবার। রাতের খাবার। কারণ যদি অন্য কোন সময় মেশানো হতো তাহলে রিয়েকশন এত দেরিতে হতো না। তার মানে এটা খুব রিসেন্ট দেয়া হয়েছে। রেকর্ডিং এ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে খাবার প্রীয়তাও খেয়েছে। মেঘের চোখ সরু হয়ে এল। প্রীয়তা মাত্র এক চামচ খেয়েছে। না না ঠিক খায় নি! নিয়েই আবার ফেলে দিয়েছে। রুশাও তো পুরো খাবার খায়নি, শুধু কয়েক চামচ খেয়েছে।
তবে কি পানি? তারমানে পানিতে কিছু মেশানো ছিল। একগ্লাস পানি দুজনেই খেয়েছে। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে আবার আদিবাকে কল দিল। রিসিভ করতেই মেঘ দ্রুত বলল, "প্রীয়তা কেমন আছে?"
আদিবা অবাক হয়ে গেল। ওর মাথা থেকে তো বেরিয়েই গিয়েছিল প্রীয়তার অসুস্থতা। "প্রীয়তা ম্যাডামেরও শরীর খারাপ লাগছিল। মাথা ঘুরছিল। তাই নিজের ঘরে চলে গেছেন।"
মেঘ আর অরূপ দুজনেই একসাথে একে অপরের দিকে তাকাল। মেঘ খুব ধীরে বলল, "মানে..."
অরূপ বাকিটা নিজেই ফিসফিস করে বলল, "রুশার খাবারেই কিছু মেশানো ছিল..."
“আমি কল করছি ২ মিনিট।” এটুকু বলেই মেঘ কলটা কেটে দিল।
মেঘ সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে কল করে বিস্তারিত জানালো। ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, "যেহেতু বমি করানো হয়েছে, তাহলে শরীরে পুরো ডোজ শোষিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। এখন খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।"
অরূপও নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। ডাক্তার আবার বললেন, “এই মুহূর্তে ওকে জোর করে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না। প্রচুর পানি খাওয়াবেন, শরীর যেন ডিহাইড্রেট না হয় সেটা দেখবেন।"
ডাক্তার এবার গলাটা একটু নরম করলেন। "আর একটা বিষয়। রুশাকে তো অনেক দিনই ওষুধ গুলো দেয়া হচ্ছে না এ হিসেবে আগের ওষুধগুলো শরীরে নেই, তাই এই ড্রাগটা আর সেই আগের মতো বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া করবে না। এটা মূলত ওর সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে কাজ করবে।"
“মানে?"
“ঘুম পাবে। প্রচণ্ড ঝিমুনি আসবে। কেউ কেউ আধা-জাগ্রত অবস্থায় অস্বাভাবিক কথা বলে, হাসে, বকবক করে... অনেকটা মাতাল মানুষের মতো আচরণ করতে পারে। তবে সেটা সাময়িক।"
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলল,"কতক্ষণ থাকবে?"
"বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা ঘুমাতে পারে। এরপর স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে শ্বাসপ্রশ্বাস, পালস নজরে রাখবেন। যদি শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা জ্ঞান পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে, তখনই হাসপাতালে আনবেন।"
মেঘ চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড বসে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “আর একজন সুস্থ মানুষের জন্য কি প্রতিক্রিয়া হবে?”
“একই প্রতিক্রিয়া। অসুস্থতা একটু কম হতে পারে। যেহেতু ড্রাগটা কোনটা সেটা জানিনা, তাই সঠিক প্রতিক্রিয়া বলা যাচ্ছে না। তবে অসুস্থ মানুষের থেকে অনেক কম প্রতিক্রিয়া হবে।”
“আমি ধারণা করছি ওষুধটা পানির সঙ্গে মেশানো হয়েছে। তারপর দেয়া হয়েছে। আর হ্যাঁ এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে দিয়েছে বোধহয়। যেটা অর্ধেক অর্ধেক করে দুজন খেয়েছে।”
“তাহলে এতটা চিন্তা করার কোন প্রয়োজন নেই। হাফ হাফ দুজনের শরীরে গিয়েছে। তার মানে খুব সামান্য অংশই গিয়েছে। ঝিমুনি, একটু মাতলামি, আর ঘুম। সাথে মাথায় ভার, ব্যথা কিংবা ঘুরতে পারে। এ ছাড়া তেমন কিছু হবার কথা না। রুশাকে তো বমি করানোই হলো। ওর জন্যও তেমন বিপদজনক হবে না আশা করছি।”
মেঘ একটু রিল্যাক্স হয়ে বলল, "ধন্যবাদ, ডাক্তার।"
কলটা কেটে যেতেই অরূপ তাকাল, "কী বলল?"
মেঘ প্রথমবারের মতো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, "বড় কিছু হবে না। রুশার শরীরে বেশি ইফেক্ট করতো। তবে আদিবা সময়মতো বমি করিয়েছে। এবার শুধু ঘুমাবে... হয়তো একটু উল্টোপাল্টা আচরণ করবে। আর প্রীয়তার জন্য বিপদজনক হবে না। দুজনেই সামান্য এমাউন্টে খেয়েছে।"
অরূপও বুক ভরে শ্বাস নিল। মেঘ ফোন উঠিয়ে আদিবাকে কল করলো, সে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো। মেঘ সরাসরি বলল, “আদিবা তুমি প্রীয়তাকে একবার দেখে এসো। ঘরে যদি শেহতাজ থাকে তাহলে এই ওষুধের ব্যাপারটা ওকে জানিয়ে এসো।”
“কিন্তু এতে আমাকে কিছু প্রশ্ন করে যদি।”
“শেহতাজ রুশার ব্যাপারে সেনসিটিভ। দায়িত্ব। এখানে যদি কিছু জিজ্ঞেস করে তবে তোমার আইডি কার্ডটা দেখিয়ে দেবে। এত বেশি বিস্তারিত কথোপকথনের দরকার নেই। তুমি ওকে জানিয়ে আসো। আর এই ওষুধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রীয়তা মাতলামি করতে পারে, কিংবা মাথা ব্যথা, যে কিছু হতে পারে কিন্তু ঘুমটা হবে। এই বিষয়ে জানিয়ে আসবে।”
আদিবা হাসলো, “মেঘ স্যার। আমি একজন নার্স। এসব আমি জানি। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি এখনই সবকিছু জানিয়ে আসছি। আর রুশা ম্যাডামকে নিয়েও ভাববেন না। আমি থাকতে আপনি এইসব কিছু ভাববেন কেন !”
মেঘ এই টুকু ভরসাই এই সময়ে চাইছিল বোধহয়, “ধন্যবাদ। আদিবা।”
ওদের কথোপকথন আর বাড়লো না। কল কেটে দিল মেঘ। কিন্তু মেঘ নিশ্চিন্ত থাকতে পারলো না। সে এত আয়োজন করল শুধুমাত্র এই দুটো মেয়েকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার সব প্লানিং এর মাঝখানে কেউ একজন নিজের খেলা ঠিকই খেলে যাচ্ছে। কিন্তু এই ওষুধটা কে দিয়েছে? কেউ কি বুঝে গেছে এই ঘরে ক্যামেরা আছে? তাই বাইরে থেকে মিশিয়ে এনেছে? এত দিন পর আজ কেন দিল আবার? কাকে সন্দেহ করবে মেঘ? মহল জুড়ে সব কালসাপে ভরা।
রাতটা বেড়েই চলেছে। রূপমহলের করিডোর একেবারেই নীরব। শেহতাজ নিজেকে সামলে ঘরে ফিরলো সে। সারাদিনের রাগ, বাবার সঙ্গে তর্ক, ইমরানের ঔদ্ধত্য সব মিলিয়ে মাথাটা এখনও ভার হয়ে আছে। নিজের ঘরের দরজা খুলেই সে থমকে গেল। ঘরের আলো জ্বলছে। আর বিছানার ওপর… প্রীয়তা একেবারে এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে। শরীরের শাড়িটা অগোছালো, চাদর অর্ধেক মেঝেতে পড়ে গেছে। খোলা চুল ছড়িয়ে আছে বালিশের ওপর। এক হাত বিছানার বাইরে ঝুলছে। শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। যেই মেয়েটা নিজের আঁচলের একটা সুক্ষ্ম ভাঁজ পর্যন্ত গুছিয়ে চলে। পোশাকের শালিনতা নিয়ে কোন তুলনা দেয়া দায়, আর আজ এভাবে শুয়ে আছে? শেহতাজের ভ্রু কুঁচকে গেল। এগিয়ে এল সে। বিছানার পাশে বসে খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে প্রীয়তার কপালে স্পর্শ করল। জ্বর বেড়েছে? স্পর্শ করতেই প্রীয়তার পুরো শরীর হালকা কেঁপে উঠল। প্রীয়তা চোখ না খুলেই খুব অস্পষ্ট গলায় বলল, "ছুঁবেন... না..." একটু থেমে আবার বিড়বিড় করল, "অ্যানাকোন্ডা..."
শেহতাজের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল। অ্যানাকোন্ডা? শেহতাজ হাত সরিয়ে নিল না। বরং আরও মন দিয়ে তাকাল। প্রীয়তার নিঃশ্বাস ভারী। গাল দুটো লালচে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। সে আবার কী যেন বিড়বিড় করছে। কিন্তু এত আস্তে… কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শেহতাজ অবচেতনেই আরও ঝুঁকে এল। মুখটা প্রীয়তার মুখের কাছাকাছি এনে কান পাতল। প্রীয়তার আধখোলা চোখ যেন কিছুই দেখছে না। সে হঠাৎ করেই দুহাত তুলে শেহতাজের শার্টের কলার চেপে ধরল। এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। শেহতাজ পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে ওর গায়ের উপর পড়তে গিয়েও পুরোপুরি পড়লো না। কোনরকমে দুই হাত বিছানায় ঠেকিয়ে কোনোমতে ভারসাম্য সামলালো। তবে সে এত কাছে এসে থেমেছে যে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে নিচ্ছে। প্রীয়তা এখনও নিজের জগতে। অস্পষ্ট গলায় বলেই চলেছে, "একদম কথা শুনি না আমি…। অ্যানাকোন্ডা, সবসময় হুকুম করে।"
শেহতাজ কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে… তার আর উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না। এই প্রথম সে এত কাছে থেকে প্রীয়তাকে দেখছে। মেয়েটার চোখ বন্ধ। লম্বা পাপড়ি তাকে ছুঁয়ে আছে। অগোছালো চুলের ফাঁক দিয়ে কপালটা দেখা যাচ্ছে। গাড় লাল ঠোটটা একেবারে শুকনো। তবে কোন রকম প্রসাধনী ছাড়া ঠোঁট এমন রঙিন হবে কেন? শেহতাজ শুধু অপলক তাকিয়েই রইলো। মেয়েটার গোলগাল মুখটা অত্যাধিক মায়াবী। তার শরীরে অদ্ভুত নেশাক্ত এক মাদকতা আছে। একটা অদ্ভুত মৃদু মাদকতা মেশানো গন্ধ। যেটা শেহতাজকে অগোছালো করে তুলছে। এটা কোনো দামি পারফিউম নয়। কোনো তীব্র সুগন্ধিও নয়। একেবারে হালকা, অদ্ভুত কোমল একটা গন্ধ। যেন ভেজা ফুলের পাপড়ির সঙ্গে সকালের বাতাসের মিশে থাকা একটা গন্ধ। শেহতাজ অজান্তেই গভীর শ্বাস টেনে নিল। সে আগে কখনও এই গন্ধটা টের পায়নি? তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল। সে নিজের অজান্তেই আরও একটু ঝুঁকে এল। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল প্রীয়তার গালের ওপর। তার ভেতর অদ্ভুত এক টান কাজ করছে। তার মাথায় কিছু নেই। শুধু মন টানছে একটু ঠোঁট ছোঁয়াতে। পৃথিবীর সব আসক্তি তার কাছে ঠুনকো লাগছে এই চাহিদার সামনে। সে নিজের মনের কাছে বাধ্য হয়ে এগোলো আরেকটু, ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। শেহতাজের সব ভ্রম কেটে উঠলো। সে যেন এক ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে এল। দ্রুত সোজা হয়ে বসল। আরো একবার কড়া নাড়ার শব্দ এল। শেহতাজ ধীর কদমে এগিয়ে দরজা খুলল। দরজায় আদিবা। শেহতাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আদিবা কোন ভনিতা ছাড়াই পুরোপুরি বিস্তারিত ঘটনা জানালো শেহতাজকে। শেহতাজ স্থির চোখে তাকাল। আবার একই ঘটনা! সে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “নীলিমা ঠিক আছে?”
“জ্বি স্যার ঠিক আছে। প্রীয় ম্যাডাম?”
“শুয়ে আছে। বিড়বিড় করে কিছু বলে চলছে।”
"সম্ভবত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মাথা ঘোরা, মাতলামি, প্রচণ্ড ঝিমুনি। এসব হতে পারে। ১২-১৪ ঘন্টা টানা ঘুম হলেই ঠিক হয়ে যাবে।"
শেহতাজ আর কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু মাথা নাড়ল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, "তুমি রুশার কাছেই থাকো। ওর এখন তোমাকে বেশি প্রয়োজন। কিছু দরকার পড়লে সময় দেখার প্রয়োজন নেই, আমাকে সরাসরি কল করবে, নাহলে ডাটবে।"
“আপনার নম্বর নেই আমার কাছে।”
শেহতাজ নিজের নম্বর দিয়ে দিল আদিবাকে। আদিবা একটু ইতস্তত করে বলল, "প্রীয় ম্যাডাম..."
"প্রীয়তাকে আমি দেখছি।"
আদিবা আর কিছু বলল না। মাথা নত করে রুশার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। শেহতাজ দরজা বন্ধ করে দিল। শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির প্রীয়তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেরই ওপর প্রবল বিরক্তি জন্মাল। সে দু'পা পিছিয়ে গেল। মুঠো করে ফেলল দুই হাত। নিজেকেই খুব নিচু স্বরে বলল, "আমি কী করতে যাচ্ছিলাম…?"
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। মেয়েটা তার বৈধ স্ত্রী এই সত্যটা যতই থাকুক, এই অবস্থায় তার অজ্ঞানতার সুযোগ নেওয়ার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবা উচিত ছিল না। সে মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়াল। রাত আরও গভীর হচ্ছে।
রূপমহলের বাইরে পুরোনো অশ্বত্থ গাছের পাতায় বাতাস লেগে মৃদু শব্দ তুলছে। দূরে কোথাও নিশাচর পাখির ডাক ভেসে এসে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। অথচ ঘরের ভেতরের সময় যেন থমকে আছে। প্রীয়তা বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু সে স্বাভাবিক নয়। চোখের পাতাগুলো বন্ধ, তবু ভ্রুগুলো মাঝেমধ্যেই কুঁচকে উঠছে। ঠোঁট দুটো অস্থিরভাবে নড়ছে। মনে হচ্ছে, সে কোনো অদৃশ্য জগতের সঙ্গে কথা বলে চলেছে। শেহতাজ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিল, চাদর টেনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে। এ ঘরে আর এক মুহূর্তও থাকবে না। নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে আর সুযোগ দেবে না। শেহতাজ আবারো বিছানার কাছে এগিয়ে খুব সাবধানে প্রীয়তাকে সোজাসুজি শুইয়ে দিলো। এলোমেলো শাড়িটা টেনে ঠিক করে চাদরটা টেনে দিল। চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিল। প্রীয়তা বিড়বিড় করছে। সে ঘুমন্ত নয় তবে বেহুঁশ বোঝা যাচ্ছে। শেহতাজ উঠে যেতে লাগল বিছানা থেকে, কিন্তু ঠিক তখনই প্রীয়তা খুব আস্তে বিড়বিড় করে উঠল, "যেও... না..."
শেহতাজ থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল। মেয়েটা চোখ খোলেনি। নিঃশ্বাস ভারী। কথাগুলোও স্পষ্ট নয়। খুব নিচু স্বরে বলল, "ছেড়ো না আমাকে… ওরা আমাকে ছাড়বে না।"
শেহতাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে না, প্রীয়তা কাকে উদ্দেশ্য করে এসব বলছে। তাকে? নাকি নিজের অবচেতন মনে অন্য কাউকে? পরক্ষণেই প্রীয়তার ডান হাতটা বিছানার ওপর অস্থিরভাবে নড়ে উঠল। যেন শূন্যে কাউকে খুঁজছে। একবার বালিশ ছুঁল, তারপর চাদর মুঠো করল। আবার হাতটা শূন্যে ভেসে রইল। ঠিক যেন... কারও উপস্থিতি চাইছে। শেহতাজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল। সে খুব ধীরে বিছানার পাশে গিয়ে বসে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। তারপর নিজের ডান হাতটা এগিয়ে প্রীয়তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলোর ওপর আলতো করে রাখল। স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রীয়তার আঙুলগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে নড়ে উঠল। কোনো সচেতনতা নেই, কোনো হিসেব নেই। তবু সে হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। শেহতাজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম মেয়েটা তাকে স্বইচ্ছায় আঁকড়ে নিল। হাতের স্পর্শ পেয়েই তার মুখের অস্থিরতাটা কমতে লাগল। সে আবার খুব আস্তে বিড়বিড় করল, "এত হুকুম কোরো না..." একটু থেমে আবার, "অ্যানাকোন্ডা আমি তোমাকে ছাড়বো না..."
শেহতাজের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না, এই অ্যানাকন্ডা নামে সম্বোধন তাকেই করা হচ্ছে। এত অসুস্থ অবস্থাতেও মেয়েটা তাকে এই নামেই বকছে! যদিও প্রীয়তা লাইনটা হুমকি স্বরূপ ব্যবহার করেছে। কিন্তু তার এই দূর্বল মুহুর্তে খুব আদুরে প্রেমম মনে হলো বাক্যটা। তারপর আবার কিছু অস্পষ্ট শব্দ। এবার আর বোঝা গেল না। কয়েক মিনিট কেটে গেল। প্রীয়তার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করল। কপালের টান কমে এল। হাতের চাপটাও আলগা হয়ে গেল। শরীরের অস্থিরতা মিলিয়ে গিয়ে গভীর ঝিমুনির দিকে ঢলে পড়ল সে। ওষুধের প্রভাব অবশেষে তাকে সম্পূর্ণ ঘুমের ভেতর টেনে নিল। শেহতাজ তবুও হাত সরাল না। একই বাবে বসে রইলো। প্রীয়তাকে নিয়ে একটা ছোট গবেষণা চালিয়ে ফেলল। একে একে খুটিয়ে মেয়েটাকে দেখে নিলো। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল প্রীয়তার হাতে। একেবারে খালি। না কোনো চুড়ি। না কোনো আংটি। না কোনো রঙের অলংকার। সাদা, সরু আঙুলগুলো নিঃশব্দে তার হাতের ওপর পড়ে আছে। তারপর চোখ গেল কানের দিকে। ছোট্ট একজোড়া দুল। গলায় খুব সাধারণ একটা চিকন চেইন। তাতে ছোট্ট একটা লকেট। ব্যস। এইটুকুই। শেহতাজের কপাল কুঁচকে গেল। নিজের অজান্তেই মনে মনে বলল, “বিবাহিত মেয়ের হাতে রিং অন্তত থাকা উচিত! এ কেমন কথা। কে বলবে তুমি শেহতাজ শেখের বউ!!”
মেয়েটা কি ইচ্ছে করেই কিছু পরে না? প্রশ্নটা মাথায় এসেই আবার মিলিয়ে গেল। সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার অনামিকায় ভারী প্লাটিনামের কালো রিংটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। শেহতাজ নিজের হাতের রিংটা খুলে প্রীয়তার আঙুলে পড়ালো। না সাইজে হবে না। এই ছোট্ট ছোট্ট মুরগির ঠ্যাং এর মত নখে এই বড় আংটি হয় নাকি! শেহতাজ খুব নিখুঁত ভাবে প্রীয়তার আঙুলের মাপ নিয়ে নিজের আংটি নিজের হাতে পড়ে নিলো।
দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল। শেহতাজ বিছানার হেডবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে বসল। হাত এখনও প্রীয়তার হাতের মধ্যেই রয়ে গেছে। চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে। সবকিছু যেন একে একে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। প্রীয়তার একেবারে পাশেই কখন যেন তার নিজের চোখও বন্ধ হয়ে এল, সে নিজেও টের পেল না।
শহরের অন্য প্রান্তে মেঘের ঘরে এখনও আলো জ্বলছে। রাত অনেক পেরিয়ে গেছে। অরূপ সোফার ওপর আধশোয়া অবস্থায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না। টেবিলের পাশে রাখা কফির মগে কফি অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। শুধু মেঘের চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। মনিটরের নীল আলো তার মুখটাকে আরও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সে পরপর একই ভিডিও বারবার চালাচ্ছে। Pause, Rewind, Play, Fast Forward, আবার Pause একই দৃশ্য। একই মানুষ। একই খাবার। একই গ্লাস। একই সময়। কিন্তু উত্তর নেই। মেঘ দুহাতে মুখ ঢেকে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর খুব ধীরে মাথাটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। ক্লান্তিতে নয়। অসহায়তায়। এই প্রথম সে অনুভব করছে, তথ্য থাকার পরও কিছু করা যাচ্ছে না।
রুশাকে কেউ ওষুধ দিয়েছে। প্রীয়তাও তার সামান্য অংশ খেয়েছে। রুপমহল ভরা মুখোশ, এত দিন কেন দেয় নি এই ওষুধটা? আজই কেন? সবকিছু যেন আলাদা। একটার সঙ্গে আরেকটার সেতু খুঁজে পাচ্ছে না সে। মেঘ ধীরে চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতরে একটার পর একটা টুকরো ছবি ভেসে উঠতে লাগল। প্রত্যেকটা সূত্র যেন একে অপরকে ছুঁয়ে আছে। কিন্তু কোথায়? কোন বিন্দুতে? কোন মানুষটা মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরো খেলাটা চালাচ্ছে? মেঘ খুব আস্তে নিজের কপালে হাত রাখল, "না। একটা কিছু বাদ পড়েছে। একটা ছোট্ট জিনিস। যেটা চোখের সামনেই আছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে না..."
মেঘ আবার মনিটরের দিকে তাকাল।
চলবে…?
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই}
নোট: তাড়াতাড়ি রিয়েক্ট কমেন্ট করোওওওও আলসের দল। ২০০+ রিয়েক্ট না আসলে কিন্তু 🔪🔪