ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৯৫তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৯৫. 

শেহতাজ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, "প্রীয়তা আমার বিয়ে করা বউ, রুপমহলের পুত্রবধূ। কিন্তু নীলিমা রুপমহলে বন্দি। তোমাকে এসব জানানো শুধু এই জন্যই যে, তোমার গুরুত্ব শুধু নীলিমা। প্রীয়তা নয়।”
মেঘ স্তব্ধ। সে ঠিক কি বলবে! মেঘ বেশ কিছুক্ষণ কোনো জবাব দিল না।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষটার মুখে কোনো আবেগ নেই। যেন সে খুব সাধারণ একটা কথা বলেছে। অথচ মেঘের কাছে কথাটা সাধারণ নয়। একেবারেই নয়। তবে হিসেব মতে প্রীয়তা মুক্ত আর রুশা বন্দি? এই কথাটার মধ্যেই যেন কতগুলো অদৃশ্য দরজা খুলে গেল। আবার কতগুলো দরজা আগের চেয়েও শক্ত করে বন্ধ হয়ে গেল।
মেঘের মাথার ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরছে। শেহতাজ সত্যিই কি প্রীয়তাকে রক্ষা করছে? নাকি এই সমস্ত গল্পের আড়ালে আরও বড় কোনো সত্য লুকিয়ে আছে?
শেহতাজ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, “বড্ড ভাবো তুমি।”
“আপনি ইচ্ছে করেই অস্পষ্ট ধোঁয়াশা রাখলেন অনেক কিছু। সেসবই জ্বালাতন করছে।”
শেহতাজের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল। “তোমার এর থেকে বেশি কিছু জানার প্রয়োজন নেই, মেঘ।”
শেহতাজ উঠে দাঁড়াল। তারপর জামার হাতাটা সামান্য ঠিক করতে করতে বলল, “রেডি থেকো। নীলিমার জ্ঞান ফিরলেই আমি ওকে মহল থেকে নিয়ে আসবো।”
মেঘ কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেহতাজ ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা এগিয়ে আবার থামল। পেছন ফিরে না তাকিয়েই বলল, “আর একটা কথা। আজ যা শুনেছো, সেটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো। মনে রাখার প্রয়োজন হলে শুধু এটুকু মনে রেখো, নীলিমা তোমার দায়িত্ব। ওর শরীরে সামান্য আঁচড় লাগলেও আমি তোমার নিশানা নিখোঁজ করে দেবো। ভালো রুপ দেখালাম মানে ভালো ভেবে নিও না।” 
মেঘ মৃদু হাসলো। শেহতাজ আর থামল না। দূরে সরে যেতে লাগল তার দীর্ঘ অবয়ব। মেঘ দীর্ঘক্ষণ একা বসে রইল সমুদ্রের ধারে। সব অদ্ভুত, আচমকা সবকিছু একটু অন্যরকম হয়ে গেল না? শেহতাজ কি তবে নিজের রহস্য ভেঙে গেল? রুশা কি তার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ? 
সে চোখ বন্ধ করল। শেহতাজের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। কিন্তু হয়তো শেহতাজ সত্য বলেছে। মিথ্যা বলার কারণ নেই। তবে পুরো সত্য বলেনি। প্রতিটা উত্তরের শেষে সে একটা করে প্রশ্ন রেখে গেছে। যেন ইচ্ছে করেই একটা ধোঁয়াশার ভেতর মেঘকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে যাই বলুক, এসব সবাইকে জানানো যাবে না। শেহতাজ চাইছে না তবে থাক না গোপনে। ক্ষতি কি?
মেঘ চোখ খুলল। উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো গাড়ির দিকে। অরুপ কথা রেখেছে। বিন্দু মাত্র গাড়ি থেকে বাহিরে পা রাখেনি সে। মেঘকে দেখেই অস্থির হয়ে বলল, “আমি টেনশনে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। তোকে দেখে জানে জান ফিরলো।”
“তুই বেশি চিন্তা করা শুরু করেছিস।”
“এসব ছেড়ে আগে বল শেহতাজ কি বলল।”
“বিয়ে করতে বলল।”
“কাকে?”
“রুশাকে।”
অরুপ চেঁচিয়ে উঠলো, “কি?”
মেঘ একে একে সব বলতে শুরু করলো। তবে প্রীয়তাকে বিয়ে করার বিষয়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেল। অরুপ যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলো না। এসব কি সত্যি। 
অরুপ নিজেকে চিমটি কেটে বলল, “মেঘ, তুই সিরিয়াস?”
“খুব।”
অরূপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “অনেক কাজ। আগে বিয়ে এরপর বাকি সব ভাববো। আমি বাকিদের ডাকছি।” অরুপ এত বেশি এক্সাইটেড হয়ে পড়লো যে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সে একে একে রাফি আর ইমরানকে কল দিয়ে জরুরি তলব করলো। 
মেঘ সরাসরি প্রথম ফোনটা করল নিজের মাকে। কাঁকন সুলতানা ফোন ধরতেই মেঘ বলল, “মা।”
“হ্যাঁ বাবা কোথায় তুমি?”
“নীলাচলে আছি। মা আমি শেহতাজের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। আমি যদি এখন রুশাকে বিয়ে করতে চাই তুমি কি বাঁধা দেবে?”
ওপাশে নিস্তব্ধতা। কাঁকন সুলতানা চুপ করে গেলেন। মেঘ তার মায়ের আর্দশে বড় হয়েছে। কাঁকন সুলতানা ছেলেকে মুক্ত পাখির মত মানুষ করেছেন। মেঘ কখনো তার এই অবাধ স্বাধীনতার অবৈধ সুযোগ নেয় নি। আজ যদি সে রুশাকে বিয়ে করে দরজায় এসে দাঁড়াতো তাও কাঁকন সুলতানা কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। আদরে ছেলে ছেলের বউকে গ্রহণ করতেন। এসব জানে মেঘ। তবুও সে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করছে। 
কাঁকন সুলতানা হেসে বললেন, “রুশা রাজি?”
“হ্যাঁ।”
কাঁকন সুলতানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আগে কোর্ট ম্যারেজ করো। আইনিভাবে তোমাদের বিয়েটা হওয়া দরকার। নাহলে শাহরিয়ার ভাই খুব ঝামেলা করবেন। এমনিতেও ঝামেলা তো আর এড়াতে পারবো না। তুমি বিয়ে করে বউ ঘরে তোলো আগে। আমি তোমার বাবাকে জানাচ্ছি।” 
“তুমি আসবে?”
“না না… আমার ঘরে বউ আসবে, প্রস্তুতির ব্যপার আছে না একটা। অরুপ ইমরান আছে না তোমার সাথে?”
“আছে।”
“আমি রৌদ্দুরকে পাঠাচ্ছি।”
মেঘ হেসে ফেলল, “ঠিক আছে মা।”
কলটা কেটে মেঘ গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। অরুপ বলল, “এই বসে ঝিমাচ্ছিস কেন। চল চল অনেক কাজ আছে।”
মেঘ স্টিয়ারিংয় ঘুরালো। সত্যিই তাদের অনেক কাজ।
ওদিকে রূপমহলে প্রীয়তা দীর্ঘ সময় নিজের ঘর বন্দি। সে শেহতাজকে বুঝে উঠছে না কেন? এই শক্তপোক্ত মানুষ ভয়াবহ। কিন্তু তার একেক জনের সাথে একেক রকম ব্যবহার। আজ তাকে সাজতে বলেছে। কিন্তু কেন? প্রীয়তার মাথায় প্রশ্নের পাহাড়। অস্থির হয়ে উঠছে সে বার বার প্রশ্নের চাপে। সে আবারো রুশার কক্ষে গেল। মাত্রই জ্ঞান ফিরেছে মেয়েটার। শরীরটা ভেঙে গেছে। প্রীয়তা বেশি সময় দাঁড়ালো না। তার এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কি আছে? সে তার জীবনের সব থেকে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছে আজ। আচ্ছা তাকে কি এভাবেই এই চারদেয়ালের মাঝে আজীবন বন্দি থাকতে হবে? প্রীয়তা নিজেকে ধমকালো। এসব প্রশ্ন কেন! সে নিজের ঘরে ফিরে আলমারি খুলে একের পর এক শাড়ি বের করলো। তার কাছে কিছুই করার নেই। কোন বিদ্রোহ করার শক্তি নেই। সে নিজেকে বিক্রি করে রুশার মুক্তি কিনেছে। এখন মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা হয়তো সব থেকে সহজ সমাধান হবে। 
প্রীয়তা একটা অফ-হোয়াইট রঙের শাড়ি বেছে নিল। ব্যপারটা এমন নয় যে এটাই তার আলমারির সবথেকে সুন্দর শাড়ি। তবে কেন যেন এটাই পড়তে ইচ্ছে হলো। সে শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। এ ঘরে কোথায় কোথায় ক্যামেরা লাগানো তা সব অজানা। স্বইচ্ছায় মান ইজ্জত নিলামে উঠানো যাবে না। 
ঠিক তখনই শেহতাজ মহলে ফিরে এল। আরফি অপেক্ষায় ছিল শেহতাজের। সে আসতেই আরফি এগিয়ে এলো, “মহলের সব ফুটেজের কপি নিয়ে নিয়েছি।”
“গুড। আপতত তোর জরুরি কাজ মহলে নজর রাখা। কোথায় কি হচ্ছে সব খবর রাখা। আমি প্রীয়তাকে নিয়ে বের হবো একটু।”
“কোথায় যাবি?”
“বিয়েতে।”
“কার বিয়ে?”
“মেঘ আর নীলিমার।”
আরফি একেবারে থমকে গেল। সে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই শেহতাজ ওকে থামিয়ে বলল, “পরে সব জানাবো। আপতত এটুকুই জেনে রাখ।”
আরফিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে সোজা মহলে প্রবেশ করলো। মহলে সব কিছু একদম স্বাভাবিক। শেহতাজ নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দেখল, প্রীয়তা নেই। ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। শেহতাজ এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা না করেই ঘুরে বেরিয়ে গেল। তার গন্তব্য রুবাইয়ের ঘর। দরজা খুলতেই রুবাই চমকে তাকাল। শেহতাজকে দেখে তার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল। রুবাই উঠে দাঁড়াল, “ভা…ইয়া...”
শেহতাজ দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে ধীর পায়ে রুবাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। রুবাইয়ের বুক কাঁপছে। শেহতাজ খুব শান্ত গলায় বলল, “তোর পাপের কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই, রুবাই।”
রুবাইয়ের চোখ ছলছল করে উঠল, “ভাইয়া, আমি…”
“চুপ।” এই একটা শব্দে রুবাই থেমে গেল। “তুই যা করেছিস, তার শাস্তির জন্য অপেক্ষা কর।”
রুবাই মাথা নিচু করল। শেহতাজ বলল, “তবে ছোট ছোট কিছু নেকি করার সুযোগ মানুষকে দেওয়া যায়। যদি এতে বড় পাপের খেসারত কিছু কম দিতে হয়।”
“কী করতে হবে?”
শেহতাজ ঘড়ির দিকে তাকাল, “ঠিক এক ঘণ্টা সময়।”
“কিসের?”
“এক ঘণ্টার মধ্যে নীলিমাকে মহলের গেটে এনে দাঁড় করাবি।”
রুবাই যেন বজ্রাহত হলো, “কি?”
“শুনতে পাসনি?”
“ভাইয়া...রুশা মানে নীলিমাকে?”
“হ্যাঁ।”
রুবাইয়ের চোখ বড় হয়ে গেল, “কিন্তু কীভাবে? ও তো বিছানায়…”
শেহতাজ এবার ঠান্ডা গলায় বলল, “সেটা তোর বিষয়। তোর হাতে এক ঘণ্টা। আরামে চিন্তা কর। কীভাবে ওকে বের করবি। তবে একটা কথা মনে রাখিস। মহলের কাকপক্ষীও যদি টের পায়...তাহলে সব দায় তোর। শাস্তিও তোর। পরিণতিটাও তোর।”
রুবাইয়ের শরীর শীতল হয়ে গেল। শেহতাজ আর কিছু বলল না। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। রুবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর শরীরের সব ভার ছেড়ে দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। ও কীভাবে বের করবে? ওর বাবা জানলে ওকে জ্যান্ত কবর দেবে। 
শেহতাজ এবার সরাসরি রুশার ঘরের দিকে গেল। দরজা খুলতেই তার চোখে প্রথমে পড়ল আদিবা। আদিবা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, “স্যার।”
শেহতাজের চোখ বিছানার দিকে গেল। রুশার জ্ঞান ফিরেছে। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। কপালে ভাঁজ। মুখে প্রচণ্ড অসুস্থতার ছাপ। ‌শেহতাজ এগিয়ে গেল, “জ্ঞান ফিরেছে?”
আদিবা মাথা নাড়ল, “জি স্যার। কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা করছে। ওষুধ দিয়েছি।”
শেহতাজ কয়েক সেকেন্ড রুশার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “বের হতে হবে তোমরা প্রস্তুত হও।”
রুশা ধীরে চোখ খুলল। কিন্তু তার দৃষ্টি ঝাপসা। আদিবা প্রশ্ন করলো, “কোথায়?”
“কাজ আছে।”
“আপনি কি মহলের সবাইকে জানিয়ে দিতে চান যে রুশা ম্যাডাম সুস্থ হয়ে উঠছেন? উনারা আরো ভয়ংকর কিছু করে ফেলবে রুশা ম্যাডামের সাথে।”
শেহতাজ আদিবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো, মেঘ এসব বিশ্বাসী লোক পায় কোথায়!! সে খুব নরম গলায় বলল, “ইম্প্রেসিভ।”
শেহতাজের কথায় আদিবা থেমে গেল। শেহতাজ এবারও কোনো ব্যাখ্যা দিল না। “আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। বেশি সন্দেহ হলে মেঘের অনুমতি নিয়ে নাও। তবে প্রস্তুত হও। যেতে হবে।”
রুশা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু শেহতাজ ইতিমধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার বলল, “আদিবা।”
“জি?”
“ওকে প্রস্তুত করো। রুবাই আসছে।”
“জি স্যার।”
শেহতাজ বেরিয়ে গেল। রুশা আর আদিবা দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়লো। আদিবা সরাসরি মেঘকে কল করলো। মেঘের অনুমতি ছাড়া সে এক কদম নড়বে না। আদিবা কল করতেই মেঘ রিসিভ কররো। মেঘকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আদিবা বলল, “মেঘ স্যার, মাত্র শেহতাজ স্যার এসেছিলেন। বললেন, রেডি থাকতে বাহিরে যেতে হবে। কিছুই বুঝতে পারছি না। কি করবো? রুশা ম্যাডামের মাত্র জ্ঞান ফিরেছে।”
মেঘ সবটা শুনে বুঝলো। শেহতাজ ইচ্ছে করেই বোধহয় বিয়ের কথাটা বলে নি। তার কি বলা উচিত? না থাক। আগে মেয়েটা তার সামনে এসে দাঁড়াক। সব সামনেই জানুক। মেঘ বলল, “ঠিক আছে। আমাকে আপডেট দিও। আপতত শেহতাজ যা করতে চাইছে করতে দাও।”
আদিবাও চতুর গুপ্তচরের মত বলল, “ওকে বস।”
মেঘ কলটা কেটে দিল। সে কাজি অফিসে বসে বিভিন্ন কাগজপত্র ঠিক করছে। রাফি আর ইমরান এক প্রকার নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে দৌড়ে এসেছে অরুপের কলে। ইমরান এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না ব্যপারটা সত্যিই ঘটছে। ও এই নিয়ে কম হলেও ৭০ থেকে ৮০ বার প্রশ্ন করে ফেলেছে এগুলো কি সত্য কি না। রাফি ওদিকে চেঁচিয়ে চলেছে সে হবে বিয়ের সাক্ষী। অরুপ এক প্রকার ঝগড়া শুরু করেছে তাকে কেন সাক্ষী হবার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। রৌদ্দুর মাত্রই এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সে এই বিয়েতে বিন্দু মাত্র খুশি নয়। তার নিজের বড় ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে লম্বা প্লান ছিল। কিন্তু এসব এমন কেন!!
দুপুর পেরিয়ে গেছে বহু আগে। শেহতাজ নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজায় দাঁড়াতেই তার চোখ আটকালো সামনে। প্রীয়তা তৈরি হচ্ছে। তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট শাড়ি, সমগ্র শাড়িতে রুপালি কাজ। ভেজা চুলগুলো খোলা। কয়েক গোছা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। মুখে তেমন কোনো সাজ নেই বললেই চলে। তবুও ঘরের এই আলোয় মেয়েটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। শেহতাজ দরজার কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। প্রীয়তা আয়নায় নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে চলেছে। হঠাৎ আয়নায় শেহতাজের প্রতিবিম্ব দেখে থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল, “আপনি?”
শেহতাজের দৃষ্টি তখনও তার ওপর, “এর থেকে সুন্দর কিছু নেই?”
প্রীয়তা ভ্রু কুঁচকে নিজের শাড়ির দিকে তাকাল, “এটা ভালো না?”
শেহতাজ মাথা নাড়লো, “ভালো। তবে তোমার সামনে ফিকে পড়ে যাচ্ছে।”
প্রীয়তা থমকে গেল। শেহতাজ যেন নিজের কথাটার গুরুত্বই বুঝল না, “যাই হোক। জলদি রেডি হও। বের হতে হবে।”
প্রীয়তা অবাক হয়ে তাকাল, “বের হতে হবে? এই মহল থেকে বাইরে নিয়ে যাবেন আপনি আমাকে? কোথায়?”
শেহতাজ এবার তার দিকে এগিয়ে এল, “মাই ডিয়ার ওয়াইফি, তুমি প্রথমবার আমার কাছে কিছু চেয়েছো। সেটা দিতে কি আমি দেরি করতে পারি?”
“মানে?”
“কোনো মানে নেই। মেঘ অপেক্ষা করছে। আমাদের যেতে হবে। ”
প্রীয়তার মুখ মুহূর্তে বদলে গেল। চোখ বড় হয়ে গেল, তার গলায় অবিশ্বাস, “মেঘ?”
শেহতাজ সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিল। “তুমি খুব বেশি সময় নষ্ট করো।”
প্রীয়তা অবাক। সে বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু। শেহতাজের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল। প্রীয়তা ঠিক বুঝে উঠলো না। সে চোখে কাজলটা লাগাতে গিয়েও লাগালো না। শেহতাজের কোন প্রতিক্রিয়া নেই। প্রীয়তা আবার কাজল হাতে তুলে টেনে নিলো চোখে। ঠোঁটটা রাঙিয়ে নিল। শেহতাজ শুধু চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করে গেল। মনে মনে শুধু বলল, “কি দরকার ছিল ঠোঁটে এসব রঙ টং ভরার। সুন্দর ঠোঁট টাকে জামা কাপড় পড়িয়ে দিল।”
প্রীয়তা লিপিস্টিক নিচে রেখে বলল, “চলুন আমি রেডি।”
শেহতাজ কিছুই বলল না। সে দরজার দিকে এগিয়ে চলল। প্রীয়তা তার পেছনে কদম মেলালো। নিচে আনজুম আরা বেগম আর রুপমনি বেগমের জিজ্ঞাসাবাদের একটা সেশন চলল, যে তারা কোথায় যাচ্ছে। শেহতাজ পরিষ্কার বলল, “একটা ইনভাইটেশন আছে।”
মহলের সকলেরই খটকা লাগলো। প্রীয়তাকে নিয়ে বের হচ্ছে শেহতাজ ব্যপারটা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কি বা করার আছে তাদের বিশ্বাস করা ছাড়া? 
শেহতাজ মহলের বাহিরে একটু দূরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। ঠিক এতটা দূরে যেখানে মহলের ক্যামেরা গুলোর দৃষ্টি যায় না। বেশ লম্বা সময় শেহতাজ আর প্রীয়তা গাড়িতে অপেক্ষা করলো। প্রীয়তা প্রশ্ন করতে হাঁসফাঁস করছে। বেশ অনেকক্ষণ নিজেকে দমিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আর পারলো না। সে বলল, “আচ্ছা আমরা যে এখানে বসে আছি, কিন্তু রুশা বেরিয়ে আসবে কিভাবে? মহল ভরা মানুষ। ওকে আমাদের লুকিয়ে আনলে হতো না?”
“না। রুবাইয়ের দায়িত্ব ওকে নিয়ে আসা।”
“রুবাই কি সব জানে?”
“না। নীলিমাও জানে না।”
প্রীয়তা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল, “তার মানে সারপ্রাইজ?? হায় আল্লাহ! মেয়েটা খুশিতে পাগল না হয়ে যায়।”
শেহতাজ শুধু দেখে গেল প্রীয়তার খুশি। তার কাছে এই মানুষগুলো নতুন। সে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে মানুষের স্বার্থ দেখে। লোভ, অর্থ, প্রতিপত্তি এসব ছাড়া শেয়ার কিছুই শেখেনি জীবনে। কিন্তু এই মানুষগুলো অদ্ভুত। এরা একে অপরের জন্য বাঁচে। কিন্তু কেন?
ওদিকে মহলে রুবাই যুদ্ধ করছে নিজের সাথে। কিভাবে সে রুশাকে বের করবে মহল থেকে? সে কিছুতেই তার ভাইয়ের কথার বাইরে যেতে পারবে না। সে তার বাবাকে বিশ্বাস করলেও ভাইকে করে না। শেহতাজ চরম পর্যায়ের হিংস্র। রুবাইয়ের হাতে সময় কম। ঘড়ির কাঁটা যেন আজ তার বিরুদ্ধে ছুটছে। সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকলো কি করবে? এরপর উঠে মহল একটা চক্কর দিল। সবাই ব্যস্ত নিজেদের কাজে। সাথে সাথেই আসরের আজান পড়লো। আল্লাহ যেন নিজেই রুবাইকে পথ দেখিয়ে দিলেন। রুবাই এক প্রকার দৌড়ে স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে গেল। ওখান থেকে একজন সাহায্যকারীর পোশাক নিয়ে দৌড়ে মহলে প্রবেশ করলো। একে একে প্রায় সকলেই নামাজের ঘরে প্রবেশ করছে। আসরের নামাজ বেশি সময় লাগবে না। তাকে খুব দ্রুত সব করতে হবে। রুবাই এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে পৌঁছালো রুশার ঘরে। রুশা বিছানায় আধশোয়া। আজ তার আর বিশেষ অভিনয় করতে হলো না। রুশার শরীর ভঙ্গুর প্রায়। সে রুবাইয়ের দিকে তাকাতেই রুবাই এগিয়ে এসে হাপাতে হাপাতে বলল, “রুশা সময় নেই। এখনি এই পোশাকটা পড়ে নে। আসরের নামাজ চলাকালীন সময়ে বের হতে হবে না হলে সম্ভব নয়।”
আদিবা আর রুশা দুজনেই থ মেরে রইলো। তবে রুবাই থামতে দিল না। আদিবা এগিয়ে এসে পোশাকটা ওর হাত থেকে নিয়ে বলল, “আপনি একটু শান্ত হোন। আমি পড়িয়ে দিচ্ছি ম্যাডামকে।”
একটা শ্যাওলা এবং খাকি রঙের সালোয়ার কামিজ। এটা বিশেষ করে মহলের সাহায্যকারীদের জন্য বানানো। সাহায্যকারীদের যাতে সহজেই আলাদা করা যায় তারই এলিট পদ্ধতি। রুশার শরীর প্রচন্ড দূর্বল। সে রীতিমতো ঢুলছে। তাও আদিবা তাকে পোশাকটা পরিয়ে দিল। রুবাই রুশার মাথায় কাপড় টেনে দিয়ে বলল, “আমি নিচে যাবো তুই ঠিক আমার পিছু নামবি। একদমই সাথে। মাথার কাপড় তুলবি না। আমি পথ দেখিয়ে নিচ্ছি।” রুশা শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। 
রুবাই আদিবার দিকে ফিরে বলল, “এই মেয়ে, তোমার নাম জানি কি? যাই হোক। আমি আর রুশা নেমে যাবার পর তুমিও নেমে যাবে। দেরি করবে না। নামাজের ঘর থেকে সকলে বের হওয়ার আগে নামবে।”
“ঠিক আছে ম্যাডাম।”
অবশেষে রুবাই রুশাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। রুশার শরীর দুর্বল। মাথা ভার। হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে। তাও রুবাই তাকে সামলে নিল। দুজনেই মহলের একেবারে পেছনের দিকে এসে পৌঁছালো। আদিবাও পিছু নেমে এলো। এই পেছনের সাইডে সাধারণত কেউ থাকে না। মেইন ফটক থেকে বেরিয়ে উঁকি দিতেই শেহতাজের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। রুবাই রুশাকে নিয়ে ছুটে গেল গাড়ির কাছে। রুশাকে দেখতেই শেহতাজ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। আদিবাও এসে পৌঁছালো। তারা ভেতরে বসলো। রুবাই শেহতাজের মুখের দিকে তাকিয়ে হাত জোর করে বলল, “প্লিজ ভাইয়া। তুমি যা বলেছো আমি তাই করেছি। তুমি ভবিষ্যতেও যা বলবে আমি তাই করবো। তাও আমাকে মাফ করে দাও।” 
প্রীয়তা, রুশা, আদিবা সবাই রুবাইয়ের দিকে অবাক চোখে তাকালো। তারা এসব ঘটনা কিছুই জানে না। শেহতাজ জানাতেও ইচ্ছুক নয়। সে রুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাসায় যা। ফিরে এসে কথা হচ্ছে।”
এটুকু বলেই গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলো। নিজেও উঠে বসলো। এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করেই গাড়ি ছেড়ে দিল। আদিবা সাথে সাথে মেঘের ফোনে নিজেদের লোকেশন পাঠিয়ে দিল। রুশার তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সে যে মুক্তির খুশি উৎপাদন করবে সেটুকুও করতে ব্যর্থ। 
শেহতাজ পানির বোতলটা পেছনে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওকে একটু পানি খাওয়াও। নীলিমা বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি গাড়ি হাসপাতালের দিকে নেবো?”
রুশা বাধ সাধল, “ঠিক আছি আমি।”
প্রীয়তা নির্বাক চোখে দেখলো শুধু। শেহতাজ রুশার জন্য অন্য মানুষ। কিন্তু কেন? এমন কি কারন থাকতে পারে এর পিছে? প্রীয়তার এমন ভাবনার মাঝেই রুশা প্রশ্ন ছুড়লো, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“পৌছালে জানতে পারবি। আগে পৌঁছাই।”
রুশা আর প্রশ্ন করল না। সিটে আরেকটু হেলে চোখ বন্ধ করে রাখলো। 
চলবে…? 
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন