৯৮.
রাতের গভীরতা সানন্দাপুরকে ছেয়ে নিয়েছে। রুপমহলের বিশাল প্রাসাদ আজ অস্বাভাবিক নীরব। প্রীয়তা সেই যে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরেছে। তখন থেকেই ঘর বন্দি হয়ে বসে আছে। তার আর কোথায় বা যাবার আছে? রুশা ছাড়া এ বাড়িতে তার আপন বলতে তো কেউ নেই। যাওয়ার জায়গা ও নেই। দিনকে দিন রুবাইয়ের সাথে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে পাহাড় জমেছে। সে পাহাড়ই হয়তো এখনো আটকে রেখেছে প্রীয়তাকে ঘরের মধ্যে। মহলে রুশার অনুপস্থিতি নিয়ে যে ঝড় তুফান উঠেছে সে সব সে জানে। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত সে কিছুই জানে না। জানতেও চায় না। রুশাকে আর কেউ এ মহলে আনতে পারবে না। এর থেকে বেশি সুখকর আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু এ চার দেয়ালের মাঝে সে এখন বন্দি। সে কি কথার খেলাপি করে পালিয়ে যেতে পারে? না না সে এখনই কিছুই করবে না।
প্রীয়তার ধ্যান ভাঙলো দরজা খোলার শব্দে। সে ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত ১০ টা বেজে গেছে আরো বেশ অনেকটা আগে। দরজা খুলে শেহতাজ ঢুকলো। তার হাতে একটা বিশাল বড় কালো ব্যাগ। প্রীয়তা অবাক হয়ে তাকালো। কিন্তু প্রশ্ন করলো না। প্রশ্ন করা তার স্বভাব নয়।
শেহতাজ ব্যাগটা খাটের ওপর রেখে চেনটা খুলতেই ভেতরে ঝকঝকে স্বর্ণমুদ্রা ঝলমল করে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্য প্রীয়তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারলো না। শেহতাজ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “এই তোমার মোহরানা।”
প্রীয়তা স্তব্ধ, “কি?”
শেহতাজ তার দিকে তাকালো, “তুমি এখন থেকে আমার বৈধ। সব দেনমোহর পরিশোধ।”
প্রীয়তা বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। তার মাথায় যেন কিছু ঢুকছে না। এত স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সে করবে কি? এগুলো সে পেলোইবা কোথায়? কেনই বা শেহতাজ এমন কিছু করলো?
প্রীয়তা বলল, “... এগুলো?”
“তোমার অধিকার।”
“কিন্তু...”
শেহতাজ তাকে থামিয়ে দিল, “কোনো কিন্তু না। গুনে নিও। সব হিসেব মতোই আছে।”
প্রীয়তা নির্বাক। তার ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেয়া উচিত? এই লোকটার কি মাথায় সমস্যা? বিয়ে তো করেছে জোর জবরদস্তি করে। আবার এসব দিয়ে হবে কি! আর এই স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে এখন সে করবে কি? রেখেছে তো ঘর বন্দি করে। এগুলো কি খাবে নাকি মাথায় ঢালবে সে?
শেহতাজ আর কিছু বললো না। শুধু নিজের হাতের ঘড়ি খুলে টেবিলে রাখলো। আলমারি থেকে পোশাক বের করে চুপচাপ ওয়াশ রুমের দিকে এগিয়ে বলল, “ঠোঁটে এসব রঙ দেবে না, জঘন্য লাগে দেখতে। এসে এসব পরিষ্কার চাই।” এক মুহূর্তও না থেমে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল শেহতাজ।
প্রীয়তা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। সে বিছানা ছেড়ে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। এখনো সাজ পোশাক ছাড়া হয় নি। ঠোঁটটা ভালো করে দেখলো। কি দারুন লাগছে! এই লোকটার পছন্দই খারাপ। প্রীয়তা আরেকটু গাঁড় করে লিপস্টিক দিলো। মেকআপ যেহেতু তুলতেই হবে আরেকটু ঘষে মেজে তুললে খারাপ কি?
প্রীয়তা আরেকটু ব্লাস দিয়ে গালটা লাল লাল করলো। ঠোঁটের লিপস্টিক আরেকবার গাড় করে নিজেকে দেখেই হেসে পড়লো। এরপর বিছানার উপর থেকে কালো ব্যাগটা নিচে নামালো। এগুলো তার কোন কাজের নয়। এগুলো দিয়ে কি সে তার মুক্তি কিনতে পারে? কিন্তু সে কি আসলেই মুক্তি চাইছে?
বেশ কিছু সময় পর শেহতাজ ঘরে এসেই প্রথম নজর ফেলল প্রীয়তার ঠোঁটে। গাড় লিপিষ্টিক দেখে সে প্রচন্ড বিরক্ত হলো। সে টাওয়াল হাত থেকে ফেলে বলল, “২ মিনিট সময় এসব পরিষ্কার করো। নাহলে আমি করলে ভালো লাগবে না।”
প্রীয়তা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কতৃত্ব কাটাচ্ছেন? আমি বন্দি আমি জানি কিন্তু…”
শেহতাজ প্রীয়তাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে ধরলো। একেবারে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল মেয়েটাকে। দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে চলল, ঠিক এত কাছে। শেহতাজ হাস্কি স্বরে বলল, “আমি যেটা বলেছি সেটা করো। আমি কিন্তু পরিষ্কার করতে হাত লাগাবো না।”
প্রীয়তা শেহতাজের ইঙ্গিত বুঝে দ্রুত দুহাতে ঠোঁট আড়াল করে চেপে ধরলো। শেহতাজ দুষ্টু হাসি হেসে ওকে ছেড়ে টাওয়াল তুলে নিয়ে বলল, “২ মিনিট শেষ হতে চলল ওয়াইফি।”
প্রীয়তা এক প্রকার তাড়াহুড়ো করে টিস্যু দিয়ে নিজের ঠোঁট জোরজবরদস্তি করে মুছতে লাগলো। সেসব দেখে শেহতাজ শুধু মৃদু হাসলো। প্রীয়তা কোন কথা না বলে আলমারি থেকে নিজের পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। শেহতাজ ততক্ষণে আরাম কেদারায় বসে ফোনে মনোযোগী। প্রীয়তা বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি শোবো কোথায়? ডিভান তো সরিয়ে নিয়েছেন।”
“গতরাতে কোথায় শুয়েছিলে?”
“আমি অসুস্থ ছিলাম। তাই হুঁশ জ্ঞান ছিল না। আজ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। তাই আপনার সাথে অন্তত বিছানায় শোবো না।”
“সমস্যা অবশ্য হবারই কথা…! তবে তুমি নিজেকে সামলাতে না পারলে আই ডোন্ট মাইন্ড একচুয়ালি।”
প্রীয়তা বোকার মত তাকিয়ে রইলো শুধু। শেহতাজ বলল, “তাছাড়া এখন তুমি বৈধ।”
প্রীয়তা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি আমার ধৈর্য্যের পরিক্ষা নিচ্ছেন।”
শেহতাজ ফোনে চোখ রেখেই বলল, “চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ো। নাহলে আমি তোমার সহ্যের পরীক্ষাও নিতে পারি। You know what I mean.”
প্রীয়তা রাগে দুঃখে ধুম করে বিছানায় বসে পড়লো। মনে মনে যত শত গালাগাল জানতো সব ছুঁড়ে কাঁথা টেনে শুয়ে পড়লো। এই লোকের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। যখন তখন এসে জাপটে ধরবে আর না হলে চেপে ধরবে। বেশরম লোক একটা। তার উপরে পেয়েছে বৈধ বৈধ জপনা।
ওদিকে সুখনীড় প্যালেসের বিশাল বাড়িটা নিস্তব্ধ। দিনের সমস্ত কোলাহল, অতিথিদের হাসি, ব্যস্ততা সবকিছু যেন রাতের অন্ধকারে হারালো। শুধু মাঝে মাঝে দূরের কোনো পাখির ডাক কিংবা বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ সেই নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে।
মেঘের ঘরে অন্যরকম শান্তি। রুশা গভীর ঘুমে। এতদিনের ক্লান্তি, ভয়, দুশ্চিন্তা আর মানসিক যুদ্ধের পর আজ প্রথমবার তার ঠাঁই তার সুখের বুকে। মুখে প্রশান্তির ছাপ। যেন বহু বছর পর সে নিরাপদ কোনো আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তার সব স্থায়ী। মেঘ দীর্ঘক্ষণ তার বুকে ঘুমন্ত পাখিটাকে দেখে গেল শুধু। তাকে ছুঁয়ে বারবার বিশ্বাস করতে চাইছে এসব সত্য। এভাবেই রাত কাটলো। শেষ রাতের দিকে সেও ঘুমের কোলে ছুটলো।
ভোরের আলো ঠিকঠাক ফুটে উঠতেই। সবার আগে রুশার চোখ খুলল। তখন মাত্র সূর্য আকাশের কোণে উঁকি দিয়েছে। সুখনীড় প্যালেসের বাগানে শিশির জমে আছে ঘাসের পাতায়। চারপাশে এক ধরনের পবিত্র নীরবতা। সে উঠে ঘুমন্ত মেঘের নীরবতায় আটকালো। এই মানুষে সে বার বার আটকায়। রুশা উঠে একবার পুরো বাড়ি টহল দিলো। কাঁকন সুলতানা তাকে পড়ার নতুন শাড়ি দিলো। রুশা একেবার গোসল সেরে মেঘের ঘুম ভাঙাতে এগোলো। সকাল পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রুশা নরম গলায় বলল, “মেঘ...”
মেঘ বেশ কিছুক্ষন পর চোখ খুলে তাকাতে রুশাকে দেখেই চমকে উঠলো। যেন ভুত দেখে ফেলেছে। রুশাও একটু চমকালো। কয়েকমুহূর্ত পর হুট করে মেঘের মনে পড়লো তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সে বোকা বোকা হেসে পড়লো।
রুশা সদ্য গোসল সেরে এসে কাঁকন সুলতানার দেয়া আরেকটা শাড়ি পড়ে নিয়েছে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল, “এত সকাল সকাল গোসল করেছো কেন? আমি তো কিছু করি নি।”
রুশা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল, “নষ্ট মাইন্ড। কোথাও লেখা আছে সকালে গোসল করা যাবে না?”
“না না। আমার তো দেখে খুব ভালো লাগছে। ক্যারি অন। আমি তোমাকে দিনে ২০/২৫ বার গোসল করানোর দায়িত্ব নিয়ে বসে আছি। শুধু একটু সুস্থ হও।” এটুকু বলেই মেঘ দুষ্টু হাসি দিয়ে চোখ টিপ দিলো।
রুশা মাথা থেকে টাওয়ালটা খুলে ছুড়ে দিলো মেঘের দিকে, “যাও ফ্রেশ হও আগে। যত সব বাজে কথা।”
মেঘ হেসে উঠে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় দাঁড়াতেই মেঘের চোখ আটকালো নিচে বাগানে ইমরানের উপর। বাগানের এক কোণে চিন্তিত মুখে ইমরান বসে আছে। এত সকালে একা? মেঘ অবাক হলো। ইমরান সাধারণত মন মরা হয়ে বসে থাকার ছেলে না। মেঘ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখে চলল ইমরানকে। তারপর নিচে নেমে এলো। ডায়নিং জমজমাট। রুশা কাঁকন সুলতানার কাছে এগোতেই মেঘ বাগানের দিকে হাটলো। ইমরান মেঘকে আসতে দেখেও অবাক হলো না। যেন সে মেঘের অপেক্ষাই করছিল। মেঘ চেয়ার টেনে পাশে বসে বলল, “কী ব্যাপার? তুই এত সকাল সকাল এখানে? শরীর খারাপ নাকি মন?”
ইমরান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুই এত সকালে করছিস কি? আমি জীবনে কোন সদ্য বিবাহিত পুরুষকে এত সকালে উঠতে দেখিনি। তুই কি পারিস নি?”
“চুপ কর স্টুপিড। একটু শপিংয়ে যেতে হবে। রুশার জন্য অনেক কিছু কেনাকাটা করতে হবে। তার উপরে আমি ওকে বিয়ের গিফট দিইনি।”
“আমাদের গ্রুপের সবথেকে আনরোমান্টিক মানুষ নাকি আমি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমি অন্তত তোর থেকে রোমান্টিক আছি। তুই ব্যাটা বিয়ের রাতে বউয়ের জন্য কিছু নিয়ে যাসনি। এটা কিছু হলো!!!”
“আরে দিয়েছি, মা দিয়েছে।”
“মাম্মাস বয়, এবার মায়ের আঁচল থেকে বের হও। বউয়ের আঁচলে ঢোকার সময় হয়ে গেছে তোমার।”
“এখনো সময় দিচ্ছি আঁচলটা খোলার। যেদিন ঢুকে পড়বো না… আমাকে আর খুঁজে পাবি না।”
ইমরান হাসলো, “সে যাক আমার তোর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। সত্যি বলতে আমি তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
মেঘ ভ্রু কুঁচকালো, “আমার জন্য?”
ইমরানের গলার স্বর গম্ভীর হল, “তুই অন্য কারো কাছ থেকে জানার আগে আমি তোকে জানাতে চাই।”
মেঘ চুপ করে রইলো। ইমরান কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে প্রস্তুত করলো, “তুই জানিস, আমি বাবাকে কলেজের ইতিহাস নিয়ে একটা রিসার্চে সাহায্য করছিলাম।”
মেঘ মাথা নাড়লো, “হুম।”
“এই সানন্দাপুর আর আমাদের কলেজের ইতিহাস নিয়ে একটা বড় ডকুমেন্টারি তৈরি হচ্ছে।
সামনে কলেজের দুইশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানটা ছোট কিছু না। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক অতিথি আসবে। যারা এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ছিল, তারাও আসবে। তো সেখানেই একটা ডকুমেন্টারি প্রেজেন্ট হবে। এই জন্যই অনেক পুরোনো তথ্য, পুরোনো নথি, ছাত্রদের ইতিহাস সব সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি দারুন কিছু একটা খুঁজে পেয়েছিলাম। একটা মানুষকে।”
“কাকে?”
“একজন ব্রিটিশ নাগরিক ইলিয়ানা ডিসুজা।”
নামটা শুনেই মেঘের মুখের সমস্ত স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেল। ইলিয়ানা ডিসুজা সম্পর্কে মেঘ তো ইমরানকে কিছু জানায় নি। প্রীয়তা যে এসব কাগজপত্রের ছবি দিয়েছিল তাও ইমরান জানে না। মেঘ তাও নিজেকে স্বাভাবিক রাখলো। জানে না থাক। এখন এসব জানানো গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সত্য জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইমরান মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “জানিস এটা কে? শাহরিয়ার শেখের প্রাক্তন প্রেমিকা।
আমি বিদেশি সব স্টুডেন্টদের লিস্ট করতে আব্বুকে সাহায্য করছিলাম। তখন আব্বুই আমাকে বলল যে ইনি শাহরিয়ার শেখের এক্স গার্লফ্রেন্ড ছিলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগে। রুপ মহলের মানুষদের তো মুখোশের অভাব নেই আর না আছে এদের কালো কীর্তির অভাব। তাই একপ্রকার কৌতূহলবশতই আমি স্পেসিফিকলি ইলিয়ানা ডিসুজার সম্পর্কে সকল খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করি। যে ঠিকানা অফিস বুকে দেয়া ছিল সেখানেই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি।”
“পেরেছিলি?”
ইমরান মাথা নাড়লো, “না। দুর্ভাগ্যবশত পারিনি। উনি এখন কোথায় আছেন কেউ জানে না। যে ঠিকানা দেয়া সেটা উনাদের পুরাতন বাড়ির ঠিকানা। এখন ওখানে কেউ থাকে না। শুধু একটা বিষয় জানতে পেরেছি। ইলিয়ানা ডিসুজা আর শাহরিয়ার শেখের একটা সন্তান ছিল। অবৈধ।”
মেঘের চোখ বড় হয়ে গেলো, “কি বললি অবৈধ?”
“হ্যাঁ। যতদূর সোর্স থেকে জানতে পেরেছি শাহরিয়ার শেখের সাথে ইলিয়ানার বিয়ে হয়নি কখনোই। তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। শাহরিয়ার শেখ ভালোও বাসতেন। তবে এই সম্পর্কটা না রুপমহলের শেখরা মেনে নিয়েছিল আর না ইলিয়ানার বাবা মেনে নিয়েছিল। এরপর ইলিয়ানাকে ইউকেতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। আর তখনই জানা যায় যে ইলিয়ানা প্রেগন্যান্ট। কিন্তু এরপর ইলিয়ানার কি হয়েছে, তার সন্তানের কি হয়েছে কোন খোঁজ নেই। আর এই বিষয়টা শেখ পরিবার পুরোপুরি গোপন করে রেখেছে।”
মেঘ যেন কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করছে। ইমরান বলল, “আমি যখন এসব তথ্য খোঁজার চেষ্টা করলাম কিছুই পেলাম না। শুধু এইটুকুই রিপোর্ট আছে যে ইলিয়ানা প্রেগন্যান্ট ছিল। এটা তখনকার ঘটনা যখন রুশা আর শেহতাজের বিয়ের তোড়জোড় চলছিল। আর এরপর তো আমাদেরকে শাহরিয়ার শেখ রুশাকে কিডন্যাপিংয়ের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। তো… আমি জেল থেকে ছুটেই রুপমহলে গিয়েছিলাম। আব্বু আমার ক্যারিয়ার নিয়ে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। মামলায় পড়া মানে আমার ভবিষ্যৎ শেষ। তার উপরে আমার প্রচন্ড রাগ হয়েছিল। আমি তো রুশাকে তেমন কোন মারাত্মক ওষুধ দেইই নি যে রুশা এতদিন অসুস্থ থাকবে। সব মিলিয়ে এক প্রকার রাগ নিয়েই গিয়েছিলাম।”
“তুই আমাকে তো কিছু বলিস নি?”
“মেঘ আমি তোকে জড়াতে চাইছিলাম না। এমনিতেই আমার সাথে রুপমহলের ছত্রিশের আখড়া। যত গোপনে বিষয়টা সমাধান করা যায় এটাই চাইছিলাম। আমি তো শুধু ব্লাকমেইল করতে চেয়েছিলাম। যাতে মামলাটা সরিয়ে নেয় আমাদের সকলের উপর থেকে। আর কোনরকম ডিস্টার্ব না করে আমাদের।”
“তুই কাজটা ঠিক করিস নি। ওরা সুবিধার না।”
“আমার মাথায় এসব ছিল না। তাছাড়া তুই যে এত দূরে এগিয়ে গেছিস সেটাও আমি জানতাম না তখন। আমি চাইনি কোনভাবেই এই মামলার জন্য ঝামেলা বাড়ুক।
তো…রুপমহলে গিয়ে আমি শাহরিয়ার শেখের সাথে একপ্রকার চুক্তি করি। তিনি যদি আমাদের বিরুদ্ধে করা কেস না তুলে নেয়, তাহলে আমি ইলিয়ানা ডিসুজার সত্য সব প্রকাশ করে দেবো। আর অদ্ভুতভাবে উনি খুব ঘাবড়ে যান। আমার কেন যেন মনে হয়েছে এই ইলিয়ানার রহস্য অনেক গভীর। আর হয়তো এই কেলেঙ্কারির কাহিনী কেউ জানে না। যদি জানত তবে তিনি অন্তত এত ঘাবড়ে যেতেন না। তারপর নিজে উনি নিজে থেকেই কেস তুলে নেন।”
মেঘ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, “তোর কাছে ঠিক কত দূর অব্দি প্রমাণাদি আছে? আই মিন ঠিক কি কি আছে?”
“তেমন কিছু না। তবে ইলিয়ানা ডিসুজার বান্ধবী হ্যানরি রিকার্ভোর সাথে কথা বলে যা জেনেছি এইটুকুই। তিনি তেমন বলতেও পারেননি।”
“হ্যানরি রিকার্ভো? তার খোঁজ তুই কোথায় পেলি?”
“আমাদের কলেজেরই। একই ব্যাচে ছিল ইলিয়ানা আর হ্যানরি।”
“তুই এসব খোঁজ কোথা থেকে পেয়েছিস? এসব কি শাহরিয়ার শেখ সব জানে?”
“আরে না। আমি বলি নি। আমি শুধু বিশ্বাসযোগ্য কিছু প্রমাণ দেখিয়েছি বাকি কিছু না। আমি দেখিয়েছি যে আমি অনেক কিছু জানি। জানিসই তো মানুষ সাহস আর দৃঢ়তাকে ভয় পায়।”
“আর শেহতাজ? ও জানে তোর আর শাহরিয়ার শেখের এসব?”
“ও জানে কিনা, সেটা আমি জানি না। তবে আমার ধারণা জানে না। হয়তো ইলিয়ানার ব্যপারেও কিছু জানে না। শাহরিয়ারের সাথে শেহতাজের সম্পর্ক ভালো নয়। কেমন একটা টেক্কা দেয়া টাইপ। একই মহলে বাপছেলে দুটোই আলাদা দুটো সম্রাজ্য চালাচ্ছে।”
ইমরান কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলল, “একটা জিনিস। কয়েকদিন আগে শাহরিয়ার শেখ আমাকে দেখা করতে ডেকেছিলেন। রুপ মহলে গিয়েছিলাম আমি। তখন আমাকে জানান উনি আমার আর রুবাইয়ের বিয়ে দিতে রাজি তবে একটা শর্তে। আমি যেন তোকে আর রুশাকে পারমানেন্টলি আলাদা করার ব্যবস্থা করি। উনি রুশাকে কিছুতেই মহল থেকে বের হতে দেবেন না। তো আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম উনার এই কথায়। রুশা তো অসুস্থই তার উপর রুপমহলে বন্দি তাহলে এখানে তোদের আলাদা করার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে। উনি আমাকে বলেন আমার শুধু এটুকু করতে হবে যে তোর প্রতিটা আপডেট উনাকে দিতে হবে।”
“এরপর?”
“আর কি। আমি বলেছি আপনার মেয়ে আপনি থাকুন। ওকে বিয়ে করতে হলে আপনার অনুমতি দরকার নেই। আমি মহল থেকে এমনিতেই ওকে নিয়ে যেতে পারি। আমি অন্তত বিশ্বাসঘাতক নই।”
মেঘ আর কোনো কথা বলল না। চেয়ারে হেলান দিয়ে ইমরানের মুখে তাকিয়ে রইলো। কি অদ্ভুত এই মানুষ গুলো। ইমরান বলল, “কিন্তু তোর পিছে শাহরিয়ার শেখ লোক লাগিয়ে রেখেছিল বোধহয়। তুই পুরো ঘটনা শোন, সেদিন আমি যখন দেখা করতে যাই এরপর মহল থেকে বেরিয়ে যেতেই আমাকে শেহতাজেল লোকরা ধরে নিয়ে যায় আবার। এটা খুব স্বাভাবিক। ও ভেবেছিল আমি কিছু একটা করছি গোপনে ওর বাবাকে সাহায্য করতে। আমাকে বেশ কয়েকবার বিশ্বাসঘাতক ও বলেছে। তখন বুঝেছি হয়তো ও ভাবছে আমি আমার বন্ধুদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছি ওর বাবার সঙ্গে মিলে। আমি ওকে ঠিক একই দৃঢ়তা দেখিয়েছি। কিন্তু ওই জায়গায় সবটা সামলে ছিলেন ওই দিন শাহরিয়ার শেখ নিজে এসে। তিনি একেবারে ধুপ করে বলে ফেললেন আমি ওনার মেয়ের জামাই। আমার কাছে বেশ অবাক লেগেছিল। আমি তো ওনার অফার ফিরিয়ে দিয়ে তারপর বেরিয়েছিলাম। তারপরেও উনার সে কি তেজ!”
মেঘ চুপচাপ শুনলো। সে একবার হিসাবগুলো মিলিয়ে নিল। শেহতাজের ঘরে সেই জন্ম নিবন্ধন। একজন মানুষের দুই দুটো জন্মনিবন্ধন। দুই জায়গায় বাবা এক হলেও মা আলাদা। এই রহস্যটা খুব গভীর। এটা সমাধানই হয়তো পারে তাকে নিশ্চিত করতে যে প্রীয়তা শেহতাজের কাছে সুরক্ষিত কি না।
খেলাটা ঠিক জমেও জমছে না। মেঘ ধীরে বলল, “আর সময় নেই। রহস্য ভাঙা ফরজ হয়ে গিয়েছে।”
“মানে?”
“চন্দ্রমহলের রহস্যের একটা বড় ছক্কা আমার হাতে। ওটাই সমাধান করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।”
“কেমন ছক্কা?”
“চল পরে বলছি।”
“মেঘ আমরা প্রীয়তাকে ভুলে যাচ্ছি না তো? আমরা একটা জীবনের সাথে কোন রকম কম্প্রোমাইজ করতে পারি না।”
“প্রীয়তাকে ভোলার প্রশ্নই আসছে না। তবে এখন ওর জন্য সবথেকে সুরক্ষিত মনেহয় রুপমহল। কিছু হিসেব মেলানো বাকি আছে ইমরান। চল সময় নেই, আগে নাস্তা করবো তারপর বেরোতে হবে।”
“কোথায় বের হব?”
“আগে শপিং এ যাব তারপর কারো সঙ্গে দেখা করতে। চল সময় নেই।”
মেঘ উঠে হাঁটতে লাগলো। ইমরানও মেঘের পিছে এগোলো। ডায়নিং এ ইতিমধ্যে সকলেই এসে ভিড় জমিয়েছে। রাফি এই সকালেই বাড়ি থেকে ছুটে এসেছে। ইমরান ওকে দেখেই বলল, “কিরে রাফি ব্রাশ করে এসেছিস? নাকি এখান থেকে করবি?”
“তোর মত আমি লেট রাইজার না। আমি সেই ভোর ৬টা উঠেছি। ব্রাশ করে কবিতা লিখেছি তারপর এসেছি।”
“আবার কবিতা!”
অরুপ হেসে বলল, “বিশ্বকবি রাফিদ্রনাথ বলে কথা।”
রাফি সোজা রুশার পাশে বসে বুকপকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলল, “তোদের বিয়ে উপলক্ষে আমার তরফ থেকে একটা সুন্দর কবিতা উপহার। ওদের কথায় কান দিস না। কবিতায় ফোকাস কর।”
আদিবা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পড়লো, “আপনি কবি? সিঙ্গেল মানুষের মনে আবার এত দুঃখ কিসের? ছেকা খেয়ে কবি হয়েছেন?”
“আমি জন্মগত স্বভাব কবি। এর জন্য প্রেম কিংবা ছেকার দরকার নেই।”
আদিবা মুখ ভেংচি কেটে বলল, “তো শোনান দেখি কেমন কি লেখেন।”
রাফি কটমট চোখে তাকিয়ে কাগজটা খুলে বলল, “সবাই মনোযোগী হও। আমি এবার কবিতা আবৃত্তি করবো।”
উপস্থিত সকলেই মনোযোগী হলো। অরুপ আর ইমরান কোন রকম হাসি চেপে বসে রইলো। রাফি দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে পড়তে লাগলো, “কবিতা ‘শুভ বিবাহ’
পাজি লোকে ডাকলো কাজি,
বর কনে সবাই রাজি।
কাজি পড়ালো বিয়ে
টুপি মাথায় দিয়ে
বন্ধুরা সব বেজায় খুশি
সাক্ষি দিল কবি রাফি।”
আদিবা কবিতা শুনে হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ইমরান, অরুপ, মেঘ আর রুশাও হেসে পড়লো। রাফি ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে পড়লো আদিবার দিকে। আদিবা হাসতে হাসতে বলল, “এই কবিতার জন্য তুমি এখনো নোবেল পাও নি কেন?”
রাফির আদিবার কথাটা ভারি পছন্দ হলো। আদিবা যে তার মজা নিচ্ছে এসব সে গোনায় ধরলো না। সে মৃদু হেসে বলল, “খুব শীঘ্রই আমার কবিতার বই বাজারে আসবে। তখন দেখবে বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলবে আমার বই।”
রুশা বলল, “কবিতাটা কিন্তু খুব সুন্দর হয়েছে। তবে বেশিই ছোট। বড় বড় কবিতা চাই এরপর থেকে। “
“আরে অবশ্যই। তুই ছাড়া কেউ আমার গুন মূল্যয়ন করে নারে রুশা।”
ইমরান বলল, “পাজি লোকে ডাকলো কাজি। কি দারুন মিলিয়েছিস। আমার মন চাইছে এটা মেঘের সম্মন্ধিকে পাঠিয়ে দেই।”
রাফি মুখটা গোমরা করে বলল, “তুই বন্ধু নাকি শত্রুরে আমার? দাঁড়া তোর নামে একটা কবিতা লিখবো। কবিতা ‘ইমরান নামের শয়তান ছেলেটা’।”
হাসি মজা চললো আরো কিছুক্ষণ। নাস্তা শেষ করেই মেঘ উঠে দাঁড়ালো। অরুপ আর ইমরানও প্রস্তুত ছিল। মেঘ কাঁকন সুলতানার দিকে তাকিয়ে বলল, “মা আমি একটু বের হবো। রুশার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে।”
কাঁকন সুলতানা হেসে বললেন, “ঠিক আছে।”
মেঘ রুশাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, “তোমার কিছু চাই?”
রুশা মাথা নেড়ে না বোঝালো, “এখনই বের হবে?”
“দুপুরের আগেই ফিরে আসবো।”
রুশার চোখে মুহূর্তের জন্য একটা চিন্তার ছায়া পড়লো। গতরাতে শাহরিয়ার শেখ এ বাড়ি থেকে যেভাবে গিয়েছেন এতে তিনি এত সহজে তো শান্ত হবেন না। রুশার চিন্তিত মুখ মেঘ খুব বুঝতে পারলো। সে আস্তে করে রুশার হাত ধরলো, “এভাবে তাকিও না। আমি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি না। তোমার কাছে ফিরে আসার জন্যই যাচ্ছি।”
রুশা কিছু বললো না। শুধু মৃদু মাথা নাড়লো। মেঘ বেরিয়ে গেলো। অরুপ রাফির দিকে তাকিয়ে বলল, “কিরে কবি যাবি তুই?”
“না এই গরমে মার্কেটে ঘুরার এনার্জি নাই। তোরা যা। আমি আরামে বাসায় থাকি।”
ওরা সকলেই বেরিয়ে গেল।
চলবে…?
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই}