#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব: ২৪
-কষ্ট হচ্ছে?
-খুব।
-কেন?
-জানি না।
-মিস করছ তাকে?
---------
-নিশ্চুপ কেন?
------
-Do you love him?
-i don't know....
-তাহলে কষ্ট হচ্ছে কেন?
-জানিনা আমি,জানিনা।
-হাহাহা....।কান্না করছো কেন?
-----
-ভেঙ্গে পরছো কেন?এটাই তো নিয়তি। মায়া বাড়ালে,তার কথা ভাবলে তোমারই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে।
-ভাবতে চাই না আমি তাকে ।ভাবতে চাই না।তবুও মনে পরে। প্রতিটি ঘন্টা,প্রতিটি মিনিট,প্রতিটি সেকেন্ড। গেথে গেছে সে আমার নিউরনে।না চাইলেও সে আমার মাথায় এসে পরে।আর ভালো লাগে না এই দহন।তার মায়ায় পড়ার আগেই আমি ক্ষত-বিক্ষত।কীভাবে মুছব আমি তাকে আমার মাথা থেকে ।বলে দাও তুমি বলে দাও। কি করব আমি।সে কি অনুভব করে,যা আমি অনুভব করি?নাকি সবই আমার ভুল ধারণা।
-" ফিরে যাচ্ছো না কেন?"
-" যদি সেও ভুল বুঝে। আর সবার মতো যদি সেও আমার চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দেয় আমাকে ভুল বুঝে। তখন কি করবো আমি। তার চোখে তাচ্ছিল্য দেখার সাধ্য আমার নেই। তাইতো দূরে সরে এসেছি। অনেক দূরে।
-" তুমি কী নিশ্চিত?তুমি তার থেকে দূরে সরে এসেছো।
- " মানে?"
- " মানে কিছুই না। যে তোমার মাঝেই বসবাস করে। প্রকৃত পক্ষে তুমিই যার অস্তিত্ব। তাকে কিভাবে ভুলবে। তার প্রতিটি নিশ্বাস তোমার মনে গেথে গেছে। তোমার প্রতিটি হৃদস্পন্দন তার গান গায়। তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ তার প্রতিক্ষা করে। নিঃস্ব তুমি তাকে ছাড়া।পাগল প্রায় অবস্থা তোমার। সামান্য পথের দূরত্ব এসব হার মানাবে কেমন করে। যে এখন তোমার নিশ্বাসে বাস করে তাকে কীভাবে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। তুমি যে জড়িয়ে গেছ তার নেশায়।
এটা যত তারাতারি বুঝতে পারবে ততই মঙ্গল।"
-" কী বলছো তুমি এসব। না তেমন কিছুই না। আসলে ওনার কাছে ছিলাম তাই কিছু দিন একটু মায়ায় পরেছিলাম। এখন তো দূরে আসি সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি জানি সব ঠিক হয়ে যাবে।
-" হাহাহা......। বোকা তুমি। দূরে এসে যে তার সাথে আরও জড়িয়ে পরেছো। সেই দিকে খেয়াল আছে কি তোমার।
-"তবে সেও আমাকে অনুভব করে? সেও কি পুড়ে আমার জন্য?
--................
--কি হলো?কোথায় গেলে?উত্তর দিয়ে যাও।উত্তর দিয়ে যাও।এভাবে হারিয়ে যেয়ো না।
চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো রিধি। পাশের টেবিলের ফুলদানি টা ছুড়ে মারলো আয়নায় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল আয়না। শব্দ শুনে দৌড়ে মেয়ের ঘরে আসলেন অয়ন চৌধুরী। লাইট জ্বালাতেই দেখতে পেলেন মেয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। এসেই এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলেন। গ্লাসে পানি ভরে খাইয়ে দিলেন রিধিকে। তারপর মেয়ের মাথাটা নিজের কুলে রেখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগনেন। শান্ত হলো রিধি।
হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অয়ন চৌধুরী বললেন-" কিরে মা ভয় পেয়েছিস।"
রিধি মাথা নাড়িয়ে না করলো
-" তাহলে খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছিস।"
রিধি এবারেও মাথা নাড়িয়ে না করলো।
রিধির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে প্রায়। মেয়ের মুখ টা দেখে বাবার মন ধক করে উঠলো। চোখ থেকে চশমা খুলতেই অশ্রু কণারা ঝরে পরলো চোখ থেকে। বাবাকে কাঁদতে দেখেই রিধি হাত বাড়িয়ে বাবার চোখের পানি মুছে দিল।
জড়ানো কন্ঠে বললো-" কী হয়েছে আব্বু? কাঁদছো কেন তুমি?
অয়ন চৌধুরী গলা ধরা কন্ঠে বললে-" মারে তুই আমার একটা মাত্র মেয়ে। আমাদের প্রথম সন্তান। একমাত্র রাজকন্যা তুই। তোর এক কথায় আমি আমার ডাক্তারি, তোর মা, পরিবার সবাইকেই রেখে চলে এসেছি। শুধু তোর মুখে হাসি দেখার জন্য। তোকে সুস্থ করা জন্য। কিন্তু আমি বেশ কিছু দিন ধরে দেখছি তুই কিছু নিয়ে ডিপ্রেশনে ভুগছিস। তুই ভালো নেই। তোর চোখ- মুখ কেমন হয়ে গেছে। কি হয়েছে মা? তোকে জিঙ্গেস করলেও কিছু বলিস না। তোর মুখে হাসি দেখার জন্য আমি এতো কিছু করছি। কিন্তু সেই হাসি হাসি মুখ টা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে।"
শান্ত হয়ে বাবার কথা শুনলো রিধি। খানিক থেমে অয়ন চৌধুরী আবার বললো-" মারে তুই। আবার আগে মতো হয়ে যা না। সব সময় হাসি খুশি থাক। তোর হাসি মুখটা না দেখলে যে আমার খুব কষ্ট হয়। হৃদ প্রতিদিন কল করে। এমনকি তোর মা সহ সবাই আমাকে প্রতিদিন কল করে। কিন্তু তুই কারো সাথে কথা বলিস না। তোর মা তো সেদিন কান্না করে দিয়েছিল তোর সাথে কথা বলার জন্য। তবুও তুই কথা বললি না। কেন এমন করছিস মা। কেন নিজেকে এভাবে সকলের থেকে গুটিয়ে নিচ্ছিস। প্লিজ আগের রিধি হয়ে যা না মা।"
বাবার মনের এমন কষ্টের কথা শুনে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রিধি। তার নাক-মুখ দিয়ে গরম নিশ্বাস বের হচ্ছে।
অয়ন চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন-" অনেক রাত হয়েছে মা। তোকে এখন ঘুমাতে হবে। ডাক্তার বলেছে সকাল সকাল উঠে হাটার চেষ্টা করতে। আর সকালে উঠলে হলে তো আগে ঘুমাতে হবে। ঘুমা তুই।"
রিধিকে রেখে অয়ন চৌধুরী যখন চলে যাবে। রিধি তখন আব্বু বলে কেঁদে দিলো। মেয়ে কাছে আবার এসে বসলেন অয়ন চৌধুরী।
অয়ন চৌধুরী এসে বসতেই রিধি কান্না করতে করতে বললো-" আমি বুঝতে পারিনি আব্বু। আমার জন্য তোমরা এতো কষ্ট পাচ্ছো। সত্যিই অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে আমার। আমি আবার আগের মতো স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করবো।
মুচকি হেসে মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে চলে গেলেন অয়ন চৌধুরী। মেয়েটা তার এখনো অবুঝ। একটু কিছু হলেই রেগে-মেগে একাকার। সেই ছোট্ট রিধি এখনো অভিমানে গাল ফুলায়। বাবা-মায়ের কাছে যে সন্তান কখনো বড় হয় না।
____________
কেটে গেছে আরও দশ দিন। রিধি এখন আগের থেকে অনেক সুস্থ। দুই-এক পা করে কদম ফেলার চেষ্টা করে সে। পরিবারের সকলের সাথেও বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আগের মতো এড়িয়ে চলে না। স্বভাব সুলভ হাসি মুখেই সকলের সাথে কথা বলে। তবে হৃদের সাথে এখনো কথা হয়নি তার। কিছুটা অভিমানও পুষে রেখেছে।
-"প্রথম প্রথম কিছু দিন তাকে কল করেছিলো কিন্তু সে ধরে নি। কই এখন তো আর তাকে কল করে না। বাবার কাছ থেকেই যা খোঁজা নেওয়ার নেয়। আমার সাথে কথা বলার জন্য আগের মতো জোর করে না। একটুও ভালোবাসে না আমাকে। এতো তারাতারি হাল ছেড়ে দিলো। বুঝি বুঝি সব বুঝি। নিশ্চিত নতুন আরেকটা ধরেছে। তাই আমাকে এখন আর ভালো লাগে না ইগনোর করে। ধুর যা ইচ্ছে করুক। আমার কি? আমিই বা এতোসব ভাবছি কেন। নাহ আর ভাববো না।'"
শেষের কথা গুলো ফোনের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো রিধি।
__________
ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালাচ্ছে হৃদ। পাশেই বসে আসে জাবিদ। একটু পর পর মুচকি মুচকি হাসছে হৃদ। হৃদের মন-মুতলুবি কিছুই বুঝতে পারে না জাবিদ। এই ভালো তো এই খারাপ। তবে হৃদের মনের মধ্যে যে এখন শয়তানি কোন বুদ্ধি কাজ করছে তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে জাবিদ।
জাবিদকে এক ধ্যানে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হৃদ প্রশ্ন করলো-" কী হয়েছে জাবিদ?"
জাবিদ ধরা পরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো-" ঐ না মাাানে স্যার এমনি।"
-" তাহলে এভাবে আমার মুখে দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন?"
-" আসলে স্যার। সত্যি কথা বলতে কি আপনার মনের মধ্যে কি চলছে তা ধরা চেষ্টা করছিলাম। "
হৃদ মুচকি হেসে বললো-" আমার মনের মধ্যে কি চলছে তা ধরা সাধ্য তোমার নেই জাবিদ। তাই বৃথা ব্রেইনকে এতো চাপ দিয়ো না।"
-" স্যার বলছিলাম কি। আপনি কি প্রেমে পরেছেন।"
-" বাহ্ জাবিদ। তুমিতো ভালোই গেস করতে পারো?'
কিছু বললো না জাবিদ। জানালার দিকে মুখ করে মাথা চুকাতে লাগলো।
খানিক বাদে জাবিদ আবার জিঙ্গেস করলো-" আপনি একটা জিনিস খেয়াল করেছেন স্যার ?"
-" কী বলতো?
-" আপনি কিন্তু ইদানিং একটু বেশিই রিধিকে মিস করেন।
-"মানে?
-" মানে রিধি কানাডা যাওয়ার পর থেকে। কথায় কথায় আপনি রিধির কথা বলেন। এই যেমন" রিধি এখানে থাকলে এটা করতো; ওটা করতো। এখানে যেতো; ওখানে যেতো ইত্যাদি আরকি।"
বলি বুজি। আর না বলেও উপায় কি আছে বলো-
---""সে যে আছে।হুম সত্যিই সে আছে।আমার খুব কাছে।আমার অন্তঃস্থলে।ভাবনার চেয়েও বেশি কাছে। প্রকৃত অর্থে আমিতেই হয়তো তার অস্তিত্ব,তার বহিঃপ্রকাশ।যেই আমিই তার পরিচয় বহন করি।তাকে কীভাবে নিজের থেকে আলাদা করা যায় তার মন্ত্র সত্যিই আমার জানা নেই। জানা থাকলে অনেক আগেই তার প্রয়োগ করে জীবনের এই দুটানার সমাপ্তি ঘটাতাম। তাকে অনুভব করি প্রতি ন্যানো সেকেন্ড, সেকেন্ড,মিনিট,ঘন্টা।কেনই বা এমন হয় তা মহান রাব্বুল আল-আমিন ব্যথিত হয়তো কেউ জানে না।স্মৃতির পাতায় সে আছে খুব সুন্দর করে সাজানো গল্পের মতো। অবচেতন মনে মুচকি হাসিটার কারণও সেই মানুষটাই হয়। গাছের সদ্য ফোটা তাজা ফুলটি গাছে থাকা অবস্থায় যতটা ম্রীয়মান,সৌরভময়, অমলিন।গাছ থেকে খন্ডায়িত হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফুলটি মলিন, জৌলুশহীন রূপ ধারণ করে। নিমিত্তে ফুলটির পূর্বে কল্পায়িত সেই সৌন্দর্য্য আর থাকে না।পরিনয়ে সৌন্দর্য্য বর্ধন সেই পবিত্র ফুলটির অবস্থান হয় আলিতে,গলিতে বা মানব পদ পৃষ্ঠের নিচে চাপা পড়ে মিশে যায় মাতৃ ধরনীর বুকে। তার স্মৃতির গুলো আমার কাছে সদ্য ফোটা ফুলের মত ম্রিয়মান আছে। তবে যদি স্মৃতি গুলো ঝরে যায়;তাহলে তা খুব যতনে মনস পটে রেখে দেব। মিশে যেতে দেব না ধরনীর অন্তঃস্থলে। কারণ শত শত মানুষ,দালান-কোঠা,পতি-পত্তির মাঝেও আমি খুব নিরবে- নিবৃতে শুধু তাকে নিয়েই ভাবতে ভালোবাসি।"
কথা গুলো একনাগাড়ে বললো হৃদ। জাবিদ তো হা হয়ে গেছে। মানে হৃদ রিশাদ চৌধুরী হৃদ এগুলো বললো। অবিশ্বাস্য !
অবাকের মাত্রা কাটিয়ে জাবিদ বললো-
-" স্যার। আপনি কী তাহলে রিধিকে ভালোবেসে ফেলেছেন।'
জবাব দিলো না হৃদ। মুখের হাসি ম্রীয়মান রেখে গাড়ি চালানোই মনোযোগ দিল।
#চলবে.........?