#আমার_মন_তোর_পাড়ায়
#সায়মা_খানম_বৃষ্টি
#পর্ব : ০১
-"আব্বু এটা কখনোই সম্ভব না! রোদ এগারো বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। আ'ম নাউ টুয়েন্টি ওয়ান। তোমরা কি করে ভাবতে পারলে একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে আমার বিয়ের কথা?"
-"তোমাদের বিয়ে করিয়ে রাখবো বলেছি। এখনই সংসার করতে হবে না। রোদ বড় হলে তখন আবার অনুষ্ঠান করে তোমাদের বিয়ে পড়ানো হবে।"
-"নো আব্বু, আই কান্ট! আমাদের এইজ গ্যাপ তুমি দেখতে পাচ্ছো না? পসিবল নাহ, নিজের থেকে দশ বছরের ছোট একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করা। আমি এখন বিয়ের কথা ভাবতেও পারবো না। আমি নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চাই।"
-"তুমি তোমার ক্যারিয়ার গড়ো আমরা তো আর বাঁধা দিচ্ছি না। তবে তোমার রোদ'কেই বিয়ে করতে হবে। এটাই আমার লাস্ট কথা।"
-"আমি বুঝতে পারছি তোমরা কেনো আমাকে রোদে'র সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছো! তোমরা যাই করে নাও না কেনো, আমার ড্রিমস পূরণ করা থেকে আমায় থামাতে পারবে না।"
রুদ্র তার কথা শেষ করে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। পিছন থেকে মেঘ শান্ত স্বরে বলে,
-"রুদ্র! তোমার আর রোদে'র বিয়ের ডিসিশনটা আমার।"
রুদ্র দাঁড়িয়ে পরে। উল্টো ঘুরে থেকে শীতল কণ্ঠে বলে,
-"আব্বু! আমি ছোট থেকে তোমার সব কথা শুনে আসছি। হায়ার স্টাডির জন্য বাহিরে পাঠাতে চেয়েছো চলে গিয়েছি। তবে এই কথাটা আমি শুনতে পারবো না। আম সো সর্যি! রোদ'কে বিয়ে করা পসিবল না। এন্ড অলসো! আমার নিজের বিজনেস দাঁড় করার ড্রিমস আমি ছাড়বো না।"
-"এই রোদ! নিচে নামছিস না কেনো?"
নিচ থেকে উচ্চস্বরে অরিনে'র ডাকে রোদ অতীতের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। এই কথাগুলো সে এগারো বছর বয়সে শুনতে পেয়েছিল। আজ সতেরো বছরের কিশোরী হয়ে বুঝতে পারছে।
ওই কথাগুলো বলে রুদ্র সেদিন রাতেই চলে যায়। এরপর আর সে লন্ডন থেকে এ'বাড়ি আসেনি। তবে যোগাযোগ রেখেছে। তার জেদের কাছে হার মেনে সবাই এখন চুপ হয়ে গেছে। রোদে'র মনে হয় কোথাও না কোথাও রুদ্রে'র বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য সে দায়ী। তার সাথে বিয়ের কথা বলেছিল বলেই তো সেদিন রাগের মাথায় বাড়ি ছেরেছিল।
রোদ নিজের রুমের দেয়ালে একপাশে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। সাদা রঙের পর্দা সরিয়ে সামনের দেয়ালে অনিমেষ চোখে তাকিয়ে বলে,
-"কেনো রুদ্র ভাই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হোননি সেদিন? আমি কি আপনার নিকট এতটাই অপছন্দের? অথচ সবাই যে বলে পুরুষের মনে জায়গায় করে নিতে আমার এক ঝলকই যথেষ্ট। তাহলে আপনার মনে কেনো আমার জায়গা নেই? আমি তো আপনাকে গত দু'টো বছর ধরে মনেপ্রাণে ভালোবেসে আসছি। আপনার উপস্থিতিতে আমি আপনার থেকে দূরে থেকেছি এই ভয়ে আপনি আমার কোনো কাজে রেগে না যান। কিন্তু আপনার অনুপস্থিতিতে আমি আপনারা রাগ, ধমক পুরো আপনিটাকেই প্রচন্ড মিস করেছি। দু'টো বছর ধরে আপনার প্রতি আমার জন্ম নেওয়া অপ্রকাশ্য ভালোবাসার দহনে নিজেকে পোড়াচ্ছি। আচ্ছা! এখন তো আমি বড় হয়ে গেছি। এখন কি আপনি আমকে ভালোবাসবেন? পছন্দ করবেন? আপনি তো আমাকে ঠিক করে দেখেননি। আমি চাই না আপনি আমার রূপ দেখে ভালোবাসুন। আমি আপনার মোহ নই মায়া হতে চাই। যে মায়ার জাল আপনি চাইলেও কখনো ভেদ করতে পারবেন নাহ, রুদ্র ভাই!"
অরিন মেঘা রোদে'র রুমে ঢুকে তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দু'জনেই একসাথে এগিয়ে গেলে রোদ তাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে চুপ হয়ে যায়। পর্দা টেনে দিয়ে উল্টো ঘুরে তাকাতেই অরিন বলে,
-"এখন থেকে দা'ভাইয়ের ছবি দেখে তার সাথে আর একা একা কথা বলতে হবে না। আজ থেকে দা'ভাইকে স্বচক্ষে দেখতে পাবি। দা'ভাই কিছু সময়ের মাঝেই চলে আসবে। মামু এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠিয়েছে।"
অরিনে'র কথায় রোদে'র দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে। আজ কতগুলো বছর পর সে তার রুদ্র ভাইকে সামনে দেখতে পাবে। দীর্ঘ সাত'টা বছর পর সে ফিরছে। এতগুলো বছরে ভিডিও কলে দেখে থাকলে সামনা-সামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
তাকে দেখার তৃষ্ণায় রোদ তার আপলোড করা সব পিক প্রিন্ট করিয়ে নিয়ে এসে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছে। রুদ্রে'র লন্ডনের থাকাকালীন পিকও তার কাছে রয়েছে। পিকগুলো তাকে রায়ান দিয়েছে। রুদ্রে'র জন্য তার পাগলামোর কথা তার ভাই বোন সবাই জানে। পিকগুলো যেন বাড়ির বড়রা দেখতে না পায় তাই সে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখে। তার খুব করে যখন রুদ্র'কে মনে পরে তখন এই ছবিগুলো দেখে একা একাই কথা বলে। রুদ্রে'র ছবির কাছে তারই নামে অভিযোগ করে। তার ফোনের গ্যালারি এমনকি বালিশের নিচেও রুদ্রে'র ছবি আছে।
রোদ'কে নিরুত্তর দেখে অরিন কপাল কুঁচকে বলে,
-"এই রোদ! কোন ভাবনায় চলে গেলি?"
রোদ ছোট শ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়ায়। ঢোক গিলে বলে,
-"তোদের আমার উপর রাগ হয় না?"
অরিন ঠোঁট কামড়ে বলে,
-"রাগ হবে কেনো?"
-"রুদ্র ভাই তো আমার জন্যই সেদিন বাড়ি ছেরে চলে গিয়েছিলেন।"
মেঘা তার বাহু চাপড়ে বলে,
-"কি যা তা বলছিস? আমার ভাই তোর জন্য বাড়ি ছাড়বে কেনো? দা'ভাইয়ের ইচ্ছে ছিল স্টাডি শেষ করে ওখানেই নিজের একটা বিজনেস দাঁড় করাবে। তাই চলে গেছে।"
-"কিন্তু আমার সাথে বিয়ের কথা শুনে তো রেগে গিয়েছিলেন।"
অরিন তার গাল টেনে দিয়ে বলে,
-"তোকে এমনি এমনি ভাইয়া বলদি বলে নাহ। তুই তখন ছোট ছিলি বলে বিয়ের কথায় দা'ভাই রেগে গিয়েছিল। আর এমনিতেও দা'ভাই বুঝে নিয়েছিল মামু তাকে এইদেশে রাখার জন্য বিয়ের বাধনে বাঁধতে চেয়েছিলেন। তুই এখন এগুলো নিয়ে না ভেবে নিচে চল। সবাই তোকে ডাকছে।"
মেঘাও এগিয়ে এসে বলে,
-"হ্যাঁ এগুলো ভাবিস না। দা'ভাই তোর উপর রেগে বাড়ি ছারেনি। তার ড্রিমসের জন্য বাড়ি ছেরেছিল। এখন তো ফিরেও আসছে। তাই আর এগুলো ভেবে মন খারাপ করিস না। চল।"
রোদ মাথা নাড়িয়ে তাদের দু'জনের সাথে নিচে নেমে আসে। ড্রইংরুমে সবাই ব্যস্ত গোছানো নিয়ে সাথে রুদ্রে'র পছন্দের সব খাবার তৈরিতে। রায়ানে'র জন্যও রান্না করছে। রায়ান'ও রুদ্রে'র সাথে আসছে।
রোদ'দের তিন'জনকে দেখে ছ'বছর বয়সী ইবনান আহমেদ ইফাদ দৌঁড়ে আসে। অরিনে'র পর সে হয়েছে। এখন আহমেদ ভিলায় সবচেয়ে ছোট সদস্য বলতে সে-ই একজন। ইফাদ গাল মুখ ফুলিয়ে বলে,
-"রোদু'পু! তুমি কত ঘুমোও? তোমার জন্য অপেক্ষা করতে যেয়ে আমাদের সবার পেটে ইঁদুরের রেস শুরু হয়ে গেছে।"
তার কথায় রোদ, মেঘা, অরিন তিন'জনই হেসে দেয়। রোদ তার ফুলো ফুলো গাল দু'টো আলতো করে চেপে ধরে বলে,
-"তাহলে তো তুই নিজেই আজ সব খাবার একাই শেষ করে দিবি।"
ইফাদ ভাবুক মুখ করে বলে,
-"উমমম চেষ্টা করাই যায়।"
তারা হেসে ইফাদ'কে নিয়ে খাবার টেবিলের কাছে চলে আসে। সেখানে বর্ষণ ইরিনে'র দেখা পায়। তাদের অপেক্ষায় দু'জন বসে আছে। তিন'জন চেয়ার টেনে বসলে বর্ষণ রোদে'র দিকে তাকিয়ে বলে,
-"কিরে বলদি? এতো লেট হলো কেনো ঘুম থেকে উঠতে? ভুলে যাস না এটা তোর বাপের বাড়ির সাথে সাথে শ্বশুরবাড়িও। এরকম লেট লতিফ বউ হলে তো লোকে আমাদের ছি ছি করবে।"
রুদ্র রোদে'র বিয়ের কথা সবাই জানে। রুদ্র সেদিন নাকোচ করে চলে গেলেও নদী'র এককথাই রোদে'র সাথে রুদ্রে'র বিয়ে হবে। তার সাথে মেঘ, ইহান, ইফতি, বৃষ্টি ও রাজি আছে। আকাশে'র বাবা-মা, ইহানে'র বাবা-মারও এতে অমত নেই। আকাশ সেবার বৃষ্টি'র জোরাজুরি করায় মত দিলেও এরপর আর কিছু বলেনি। সে এখনও রাজি আছে কিনা তা কেউ জানে না। তাই এই বিষয়ে কেউ তার সামনে কিছু বলেও নাহ।
বর্ষণে'র কথা শুনে রোদ জ্বলে উঠে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
-"ভাইয়া! আমাকে বলদি বলবি না, বলে দিলাম।"
-"ওহ হ্যাঁ! তােকে তো বলদের রাণী বলবো। কিরে বলদের রাণী?"
রোদ চিল্লিয়ে উঠে বলে,
-"আম্মু! ভাইয়াকে কিছু বলো। শুধু শুধু আমাকে রাগাচ্ছে।"
বৃষ্টি নাস্তার প্লেট হাতে খাবার টেবিলের কাছে আসে। চোখ রাঙিয়ে বলে,
-"এই বর্ষণ! আমার মেয়েকে কিছু বলবি না।"
বর্ষণ ভ্রু জোড়া উঁচু করে বলে,
-"ও তোমার মেয়ে হলে আমি কি?"
-"কিছু না।"
-"আজ মাম্মাস বয় হতে পারলাম না বলে এভাবে মুখের উপর বলে দিলে? মেনশন নট! আমি আমার বাপের পোলা।"
রোদ ভেংচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ইরিন পাশ থেকে বলে,
-"ভাইয়া! আগে তো তুই রুদ্র ভাইয়ের সাথে রাগ করতি রোদ'কে বলদের রাণী বলায়। এখন তুই নিজেই ওকে বলদি বলে ডাকিস।"
বর্ষণ হাই তুলে বলে,
-"ছোট থাকতে তো মানুষ কতই মিসটেক করে। ওটাও আমার একটা মিসটেক ছিল।"
রোদ তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে খাবার খেতে থাকে। বর্ষণ এবার অরিনে'র দিকে তাকিয়ে বলে,
-"এই গুন্ডি মাইয়া! ভাজির প্লেটটা দে।"
অরিন সাথে সাথে মুখ ঝামটা মেরে বলে,
-"পারবো না। হাত আছে নিয়ে নে।"
-"আয়হায়! অরু তুই তো দেখছি গুন্ডামোর সাথে সাথে এখন বেয়াদবিও শিখছিস। বড় ভাই হই তোর। রেস্পেক্ট দিয়ে কথা বল।"
অরিন মুখ বাকিয়ে নিয়ে বলে,
-"তোর মতো ঝগড়াইট্টা বড় ভাইয়ের দরকার নেই। চল যা ফুট।"
বর্ষণ তাকে কিছু বলার আগে বৃষ্টি থামিয়ে দেয়। কপালে ভাজ ফেলে বলে,
-"এই বর্ষণ! ছোট বোনদের পিছনে না লেগে দ্রুত নাস্তা করে কাজ লেগে পর। বোনের বিয়ে আর তুই এক দামড়া ভাই হয়েও বসে বসে আরাম করছিস। দ্রুত নাস্তা কর। আমি আরেকবার যদি শুনি তুই ওদের রাগিয়েছিস তাহলে তোর আব্বুর কাছে বিচার দিব।"
বৃষ্টি কথা শেষ করে রান্নাঘরে চলে যায়। বর্ষণ গা ছাড়া ভাবে পরোটা ছিড়ে খেতে থাকে। ইফাদ মিটমিটিয়ে হেসে বলে,
-"ভাইয়া! তুই আজ আরও একবার রোদু'পুদের কাছে হেরে গেলি। এর জন্যই বলে লেডিস অলওয়েজ ফার্স্ট।"
-"তুই চুপ থাক।"
বর্ষণ ভোঁতা মুখ করে তাকে বলে। ইরিন, রোদ, অরিন, মেঘা সবাই শব্দ করে হেসে দেয়। সাথে ইফাদ'ও হাসে। ওদের হাসি দেখে বর্ষণ আর মুখ ভােঁতা করে রাখে না। নিজেও হেসে দেয়।
_______________________
বাড়ির বড় সাদা গাড়ি বাড়ির ভেতরে ঢুকে থামলে গাড়ির দু'পাশ থেকে দু'জন বলিষ্ঠ দেহের যুবক নেমে আসে। দু'জনের পড়নে সাদা টিশার্টের উপর ব্লু জ্যাকেট, কালো জিন্স, চোখে কালো সানগ্লাস। বাতাসে এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে থাকা সিল্কি চুল। গাড়ি থেকে নেমে গরম অনুভব করে দু'জনেই তাদের পড়নের জ্যাকেট খুলে নেয়৷ এতে দৃশ্যমান হয় তাদের পেশিবহুল বাহু, নিয়মিত জিম করে গড়ে তোলা আকর্ষণীয় চওড়া প্রশস্ত বুক।
বাড়ির ড্রাইভার গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে নিলে রুদ্র রায়ান জ্যাকেট একহাতের বাহুতে ঝুলিয়ে অপর হাতে সানগ্লাস খুলে নিয়ে পা বাড়ায়। দু'জনের মুখেই নীরব মৃদু হাসি ফুটে আছে।
রুদ্রে'র প্রতিটা কদমে এই বাড়ির সাথে জুড়ে থাকা অতীতের স্মৃতি একে একে মস্তিষ্কে ভেসে উঠে। বাবা মায়ের উপর রাগ করে সেই কবে বাড়ি ছেরেছিল। আজ এতোগুলো বছর পর পা রাখলো। সে বাহিরে নিজস্ব বিজনেস দাঁড় করাবে বলে শুনে তারা প্রথমে তেমন একটা অমত না করেনি। কিন্তু যখন সে জানায় বছরে তিন'মাস এখানে থাকবে বাকি ন'মাস বাহিরে থাকবে বিজনেসের জন্য তখন একথা শুনে সবাই দ্বিমত করে উঠে। তাকে এ'দেশে আঁটকে রাখতে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে তার জেদে অটল থেকে আজ সফল হয়েছে। সে রায়ান আর লন্ডনে থাকা তাদের তিন'জন বন্ধু মিলে নিজেদের একটা বিজনেস দাঁড় করিয়েছে। দু বছরে অনেক প্রচেষ্টা, পরিশ্রম করে বিজনেস অনেকটা এগিয়েও নিয়েছে। এভাবে আরও কয়েক বছর পরিশ্রম করলে সেও একজন সফল বিজনেসম্যান হওয়ার নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
রুদ্র হয়তো আজও ফিরে আসতো না নিজের জেদের জন্য। সে ভেবে রেখেছিল একজন সফল বিজনেসম্যান হয়ে তবেই ফিরবে। কিন্তু ইরিনে'র বিয়ের খবর পেয়ে বাধ্য হয়েই এসেছে। যতই হোক বোন হয় তার। সে চায় না তার জন্য ইরিন নিজের জীবনের নতুন পথচলা তার প্রতি চাপা অভিমান রেখে শুরু করুক। বোনের কথা ভেবে সেই সাথে মায়ের চোখের পানি দেখে তিন'মাসের ছুটিতে এসেছে। সাথে রায়ান'কেও নিয়ে এসেছে। রায়ান আর সে একসাথেই থাকে। তবে ছুটির দিনগুলোতে রুহি রোহান এসে দু'জনকেই জোর করে বাড়ি নিয়ে যায়। রায়ানে'র দাদা অসুস্থ তাই রুহি রোহান বিয়েতে আসতে পারবে না।
রুদ্র নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখে রায়ান তার দিকে বাঁকা হেসে পুরুষালী ব্যক্তিত্ব ভুলে বাচ্চাদের ন্যায় দৌঁড়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে যাচ্ছে। রায়ানে'র সেই হাসির পেছনে লুকানো কারণ রুদ্র বুঝতে পারে। সেও নিজের গাম্ভীর্য সরু দৃষ্টি পালটে রায়ানে'র পিছু ছুট লাগায়। দু'জনেই ভুলে বসে তারা সাতাশ বছর বয়সী যুবক। এখন আর তাদের মাঝে গাম্ভীর্যের ছিটেফোঁটাও নেই। আছে শুধু একে অপরকে পাশ কাটিয়ে কে আগে ভেতরে যেতে পারে সেই উদ্দেশ্য।
________________________
বৃষ্টি টেবিল থেকে খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে এসে ভেতরে রাখে। উল্টো ঘুরে তাকিয়ে নদী'কে হাত দিয়ে গরম পাতিল ধরতে দেখে চমকে যায়। ছুটে যেয়ে নদী'র হাত চেপে ধরে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে। ভীতু নয়নে তাকিয়ে বলে,
-"আপু'ই! কি করছিলি? এখনই তো তোর হাত পুড়ে যেতো।"
নদী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
-"ছেলেটার চিন্তায় আর কোথাও খেয়াল করতে পারছি না'রে! নিজের কাছে রাখার জন্য ছোট্ট রোদে'র সাথে বিয়ে দেওয়ার কতো চেষ্টা করলাম। কিন্তু ছেলেটা মানলোই নাহ। তোদের সবাইকেও কত জোর করেছি।"
বৃষ্টি মুচকি হেসে বলে,
-"আপু'ই! তুই আমাদের সাথে কোনো জোর করিসনি। যা করেছিস ভালোর জন্যই। রুদ্রে'র সাথে বিয়ে হলে রোদ এ'বাড়িতেই থাকবে। সারাজীবন নিজের মেয়ে চোখের সামনে থাকবে এর থেকে শান্তির কি আর কিছু আছে আপু'ই? আমার মেয়েটা যে বড্ড সরল! ওকে অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে তো নিশ্চিন্তে থাকা সম্ভব হতো না। তোর প্রস্তাব আমি ওর বাবা সবাই মন থেকেই মেনে রাজি হয়েছিলাম।"
-"কিন্তু আমার ছেলেটাই সব উলোট পালোট করে দিল। তবে এবার যখন আসছে আমি আর ওকে ফিরতে দিব না। যে করেই হোক রেখে দিব। ছেলের জন্য মায়ের মন কতটা পুড়ে ছেলে কি আর তা বুঝে?"
-"আপু'ই! তুই চিন্তা করিস না। আমরা আছি তো। সবাই মিলে রুদ্র'কে বোঝাব। ও তো আর এখন ছোট নেই। বড় হয়েছে, ঠিক বুঝবে। তুই এখন এসব ভাবনা ছেড়ে ঝটপট নিজের ছেলের জন্য আয়োজন করতে থাক। ওরা এসে পরবে।"
-"হুমম তাই করছি। রায়ান'ও তো আসছে ওর সাথে তাই না?"
-"হ্যাঁ আসছে।"
-"যাক ভালো! ছেলেটাকেও কত বছর ধরে দেখি না। এত বছর পর আসছে সহজ যেতে দিব না।"
বৃষ্টি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। নদী মুখে হাসি টেনে চুলো বন্ধ করতেই ড্রইংরুম থেকে শোরগোলের শব্দ পেয়ে দু'জনেই দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে যায়। রুদ্র রায়ান চলে আসলো নাকি সেই ভেবে। ড্রইংরুমে পা রেখে সামনের দৃশ্য দেখে দু'জনেই হতবাক হয়ে যায়।
রুদ্র রায়ান দু'জনেই একে অপরকে ঠেলে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেই সাথে ছোট বেলার ন্যায় বলে যাচ্ছে,
-"আমি বড়! আমি আগে যাব।"
-"না। আমি বড়। ভুলে যাস কেনো? আমি সকালে হয়েছিলাম আর তুই রাতে। সো আমি বড়।"
-"আমি তোর একঘন্টা আগে হয়েছি। এর মানে আমি বড়। কোনো সকাল রাত নেই।"
-"বললেই হলো? আমি মানি না তোকে বড়।"
-"আমিও মানি নাহ।"
এত বড় হয়েও দু'জনের এরূপ ঝগড়ায় সবাই তাদের দেখে খুশি হওয়া ভুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরা দু'জন নাকি বেস্টফ্রেন্ড? অথচ দু'জনের মাঝে সাপে নেউলের মতো যুদ্ধ লেগে থাকে।
দু'জনের ঝগড়ার মাঝে তাদের পিছনে এসে সাজ্জাদ হোসেন ইমন দাঁড়ায়। তার সাথেই ইরিনে'র বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। ইমন রুদ্র রায়ান যে ভারসিটিতে পড়েছে সেও সেখানে পড়েছে। তবে সে ওদের দু'জনের তিন বছরের সিনিয়র। ভারসিটি থেকে রুদ্র রায়ানে'র সাথে তার পরিচয় থাকলেও তার বাবা রুদ্র'দের বিজনেসের সাথে জয়েন হওয়ায় এই পরিবারের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়।
ইমন পিছন থেকে দু'জনকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
-"শালাবাবুরা! দু'জন একসাথেই ঢুকে যাও।"
তার ধাক্কায় দু'জনেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। তবে পরে যায় না। রায়ান ঘুরে কপাল কুঁচকে বলে ,
-"ভাই! এটা কিন্তু ঠিক না। তোর কাছে বোন দিব না।"
ইমন ভেতরে ঢুকে কাঁধ ঝাকিয়ে বলে,
-"না দিলি। তুলে নিয়ে যাব।"
রুদ্র এগিয়ে এসে বলে,
-"পারলে নিয়ে দেখা।"
-"তোদের বোন রাজি না থাকলে করে দেখাতাম। কিন্তু ও তো আমাকে বিয়ে করতে রাজি। সো সর্যি ব্রাদার্স! তোদের আমার সাহস দেখাতে পারলাম নাহ।"
রুদ্র আর তাকে কিছু বলার সুযোগ পায় না। বর্ষণ পিছন থেকে দু'জনের উপর ঝাপিয়ে পরে। চিল্লিয়ে বলে,
-"এটলিস্ট দা'ভাই ভাইয়া তোরা দু'জন আসলি তবে!"
রুদ্র রায়ান পিছনে ঘুরে দু'জনেই তাকে জড়িয়ে ধরে। রায়ান তার পিঠ চাপড়ে বলে,
-"আমরা দু'জন মানুষই এতটা ভিআইপি আমাদের ছাড়া কিছুই হয় না। তাই তো চলে আসলাম।"
বর্ষণ হেসে দু'জনকে ছেড়ে দেয়। মাথা নাড়িয়ে বলে,
-"তা ঠিক। সর্যি! আমি তোদের নিয়ে আসতে এয়ারপোর্ট যেতে পারিনি। বিয়ে বাড়ির কত কাজ! খুব বিজি ছিলাম।
রুদ্র স্মিথ হেসে বলে,
-"সর্যি বলতে হবে না। উই আন্ডারস্ট্যান্ড।"
রুদ্র বর্ষণ'কে পাশ কাটিয়ে নদী'র দিকে এগিয়ে যায়। নদী ছলছল চোখে তার গালে হাত বুলিয়ে বলে,
-"বাবা কত বড় হয়ে গেছিস!"
-"আম্মু! তুমি তো আমাকে এভ্রিড্যেই ভিডিও কলে দেখো। তাহলে আজ এভাবে বলছো কেনো?"
-"ভিডিও কলে দেখা আর সামনা-সামনি দেখা কি এক? মায়ের মন তুই বুঝবি না'রে বাবা!"
রুদ্র তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-"তুমি আছ তো, তুমি বুঝিয়ে দিবে। মা বাবার কাজই তো সন্তানকে বুঝিয়ে দেওয়া। ভুল করলে ভুল শুধরে নেওয়া শিখানো।"
নদী'র কান্নার বাঁধ ভাঙে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কান্না করে দেয়। পুরো ড্রইংরুম নদী'র কান্নায় নিস্তব্ধ হয়ে আসে। রুদ্র তার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-"আম্মু! কতগুলো বছর পর এসেছি। কোথায় আদর করে কিছু খাওয়াবে তা না করে কান্না করছো। থেমে যাও। নয়তো আব্বু এসে যদি দেখে তার বউকে কান্না করিয়েছি তাহলে আমাকে এই বয়সে বাবার হাতে মার খেতে হবে।"
নদী তার ছেলের কথায় কান্নার মাঝেও হেসে দেয়। নাক টেনে রুদ্রে'র বুক থেকে মাথা উঠিয়ে নেয়। তার বাহুতে আলতো করে চাপড় দিয়ে বলে,
-"ফাজিল ছেলে! মায়ের সাথে এগুলো কি বলিস?"
রুদ্র জবাব না দিয়ে হাসতে থাকে। রুদ্রে'র হাসিমুখ দেখে নদী'র বুক হালকা হয়ে আসে। বাকিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে মা ছেলেকে দেখে যায়। রায়ান এগিয়ে যেয়ে রুদ্রে'র সামনে দাঁড়িয়ে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তবে কিছু না বলে পা চালিয়ে বৃষ্টি'র সামনে চলে যায়। তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বলে,
-"চাচি মা! আমি জানি তুমি আমাকে খুব মিস করেছো। আমি আসার খবর পেয়েই আমার চাঁদ মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিলে। তোমার অপেক্ষা শেষ হলো।"
রায়ানে'র কথা শুনে রুদ্র ঠোঁট বেকিয়ে হাসে। সে বুঝতে পারছে নদী'কে জড়িয়ে ধরেছিল বলে রায়ান বৃষ্টি'কে জড়িয়ে ধরেছে। বোঝাতে চাচ্ছে কোনোভাবেই তার থেকে কিছুতেই পিছিয়ে থাকবে না। বৃষ্টি রায়ানে'র পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
-"হ্যাঁরে বাপ! একদম ঠিক ধরেছিস। কতগুলো বছর পরে তোকে দেখলাম। অনেক বড় হয়ে গেছিস।"
রুদ্র নদী'কে ছেড়ে রায়ানে'র পিছনে যেয়ে দাঁড়ায়। তাকে টেনে বৃষ্টি'র থেকে সরিয়ে বলে,
-"চাচি মা! আমি তোমার রুদ্র বাপ। তুমি আমাকে রেখে ওকে কেনো আদর দিচ্ছো?"
বৃষ্টি থতমত খেয়ে যায়। কাকে রেখে কাকে কি বলবে ভেবে পায় না। জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে বলে,
-"তোদের দু'জনকেই তো কত বছর ধরে দেখি না। দু'জনকেই খুব মিস করেছি। একবার যখন এসেছিস সহজে আর যেতে দিচ্ছি নাহ।"
-"যাচ্ছিও নাহ।"
রুদ্র হেসে প্রত্যুত্তর করে। বৃষ্টি'র সাথে সাথে বাকিরাও তার জবাবে খুশি হয়ে যায়। ইরিন এগিয়ে যেয়ে রুদ্র'কে জড়িয়ে ধরে বলে,
-"দা'ভাই! তুই আমার বিয়েতে এসেছিস আমি খুব হ্যাপি। তুই না আসলে আমাকে কেউ বিয়ের স্টেজে নিয়ে যেতে সফল হতো না।"
-"বোনের বিয়ে তো বড় ভাই না থাকলে চলে?"
ইরিন হেসে মাথা নাড়িয়ে না বলে। রুদ্র তার মাথায় হাত বুলিয়ে রায়ানে'র দিকে তাকালে রায়ান মুখ বেকিয়ে মেঘা'র কাছে চলে যায়। তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-"মেঘা'রে! তােরে কত মিস করেছি। আমি জানি তুইও তোর ভাইয়াকে খুব মিস করেছিস?"
মেঘা সরু নয়নে তাকিয়ে বলে,
-"সত্যিই মিস করেছিস ভাইয়া?"
রায়ান রুদ্রে'র দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ায়। মেঘা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দু'টোয় কত বড় হয়ে গেছে অথচ একে অপরের পিছনে লেগে থাকার স্বভাব বদলায়নি। ইরিন রুদ্র'কে ছেড়ে দিতেই রায়ান'ও মেঘা'কে ছেড়ে দেয়।
তখন উপর থেকে মাহুয়া, শুভ্র, সায়রা, ফারিহা, নাফিসা, ইভান দা'ভাই বলে চিল্লিয়ে নেমে আসতে থাকে।
তারা কাল রাতে চলে এসেছে। মাহাদি-মিষ্টি, শুভ-দৃষ্টি, সূর্য-সৃষ্টি হলুদের দিন আসবে। নুশান-ইরা, ফাহাল-ইলা দু'দিন আগেই নাফিসা, ইভান, ফারিহা'কে নিয়ে চলে এসেছে। সাথে সাবা সাবিদ ও তার মাও এসেছে।
ওরা সবাই দৌঁড়ে নেমে এসে একসাথে রুদ্রে'র বুকে ঝাপিয়ে পরে। ওদের ঝাপিয়ে পরায় রুদ্র দু'পা পিছিয়ে যায়। তবে প্রস্তুত ছিল বলে পরে যায় না। ওদের দেখে বর্ষণ, ইরিন, মেঘা অরিন'ও ঝাপিয়ে পরে। রায়ান চোখ বড় বড় করে বলে,
-"এই! এই! আমি বাদ থাকবো কেনো? আমাকেও নে।"
রুদ্র হেসে দিতেই রায়ান'ও একপাশ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। ইমন ভ্রু কুঁচকে বলে,
-"আমি কি দোষ করেছি? আমাকে বাদ রাখছিস কেন?"
ইমন যেয়ে রুদ্র'কে জড়িয়ে ধরলে রুদ্র বলে,
-"ভাই! তুই আমাদের সবার বড়। তুই আমাদের না নিয়ে নিজে কেনো আসছিস?"
-"ওহ হ্যাঁ! ভুলে হয়ে গেছে। এক্সচেঞ্জ কর।"
এবার সবাই রুদ্র'কে ছেড়ে ইমনে'র উপর ঝাপিয়ে পরে। রুদ্র'ও যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। ইরিন পিছিয়ে যেয়ে রোদে'র পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। ইমন ওদের সবার ভাই হলেও তার তো ভাই হয় না। তাই সে দূরে সরে এসেছে।
ইফাদ ওদের সামনে দাঁড়িয়ে কপাল কুঁচকে বলে,
-"তোমরা বড় বলে এই ছোট বাচ্চাটাকে ভুলে গেলে? অথচ ছোটদের আদর সবার ফার্স্টে থাকে। আমাকে নিচ্ছো না কেনো?"
ইফাদে'র অভিযোগে রায়ান হেসে তাকে কোলে তুলে নেয়। নদী বৃষ্টি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েদের দেখতে থাকে। মেঘ, আকাশ, ইহান, ইফতি, নুশান, ইরা, ফাহাদ, ইলা নেমে আসলে সবাই একপাশে দাঁড়িয়ে পরে।
প্রথমবার যেই ছেলে তাকে বাবা ডাক শুনিয়েছে এত বছর পর তাকে দেখে মেঘে'র চোখ জুরিয়ে আসে। স্নেহের সাথে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। রুদ্র'ও তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
-"আব্বু! তুমিও প্লিজ ইমশোনাল হয়ে পরো না! তাহলে এখানের সব মহিলারা কান্না করে তাদের চোখের পানিতে বাড়ি ভাসিয়ে দিবে। লোকে দেখলে তো ভাববে আমাদের বাড়িতে বন্যা হয়েছে।"
মেঘ ছেলেকে প্রফুল্ল উৎফুল্ল দেখে নিজের আবেগ দমিয়ে নেয়। হাসিমুখে ছেলের সাথে কথা বলে। রুদ্র রায়ান আকাশ, ইহান, ইফতি, নুশান, ইরা, ফাহাদ, ইলা'র সাথেও কথা বলে নেয়। নদী যেয়ে আকাশে'র বাবা-মাকে নিয়ে আসে। আকাশে'র বাবার হার্টের সমস্যা বেরেছে বলে তাদের রুমেই থাকা হয়। সাথে ইহানে'র বাবা-মাকেও নিয়ে আসে। রুদ্র তার দাদির সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
-"কি খবর ডার্লিং? বুড়ো জামাইয়ের সাথে ভালোই আছো দেখছি।"
রায়ান তাকে ঠেলে সরিয়ে বলে,
-"রাখ তোর বুড়ো জামাই। ডার্লিং! তুমি তোমার ফার্স্ট হাজবেন্ডের কথা কি করে ভুলে গেলে?"
রুদ্র কপাল কুঁচকে বলে,
-"কীসের ফার্স্ট হাজবেন্ড? আমি ফার্স্ট। তুই সেকেন্ড।"
-"না। আকি ফার্স্ট। তুই সেকেন্ড। ভুলে কেনো যাস? আমি বড় হই তোর।"
-"আমি না! তুই ভুলে যাস। আমি বড় তোর।"
আবারও তাদের বড় ছোট নিয়ে ঝগড়া দেখে সবার হাসি মিলিয়ে যায়। নাক মুখ কুঁচকে দু'জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। রুদ্রে'র দাদা দু'জনের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেন,
-"তোদের এই ফার্স্ট সেকেন্ড বন্ধ কর। আমার বউয়ের একটাই হাজবেন্ড। আর আমি সেটা।"
রুদ্র তার দাদার কাঁধে হাত রেখে বলে,
-"শুনেছিলাম অন্যের প্রপার্টিকে মানুষ নিজের প্রপার্টি বলে দাবি করে। তবে আজ প্রথম দেখছি একজনের বউকে আরেকজন নিজের বউ বলে দাবি করে। তুমি কে ভাই?"
রুদ্রে'র দাদা হেসে তার কান টেনে ধরতেই রুদ্র চোখ মুখ খিঁচে নেয়। তিনি কান ছেড়ে দিয়ে রুদ্র রায়ান দু'জনকেই জড়িয়ে ধরেন। ভেজা গলায় বলেন,
-"কতগুলো বছর পর তোদের এই দুষ্টুমি দেখতে পেলাম। ভেবে নিয়েছিলাম তোদের বুঝি আর দেখতে পারবো না। এর আগেই চলে যাব।"
রায়ান তার কাঁধে মাথা রেখে বলে,
-"ইমশোনাল হয়ো না বুড়ো! তাহলে তোমার বউ ভাগিয়ে নিয়ে যেয়ে তোমাকে আরও বেশি ইমশোনাল করে দিব।"
তার আর দু'জনের জন্য চোখের পানি ঝরাতে হয় না। শব্দ করে হেসে দিয়ে দু'জনকে ছেড়ে দেয়। রুদ্র রায়ান আকাশে'র মার সাথে কথা বলে ইহানে'র বাবা-মায়ের সাথেও কথা বলে নেয়। তাদের দু'জনের বাড়ি আসায় পুরো বাড়ি আনন্দ উল্লাসে ভড়ে উঠে।
সাবিদে'র মা সাবা'র হাত ধরে এগিয়ে এসে রুদ্রে'র সামনে দাঁড়ান। রুদ্র তাকে চিনতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি রুদ্র'কে কিছু বলতে না দেখে হাসিমুখে বলেন,
-"রুদ্র! আমাকে চিনতে পেরেছো? আমি সাবা সাবিদে'র আম্মু।"
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলে,
-"কোন সাবা সাবিদ? আমি তো এই নামে কাউকে চিনি না।"
মুখের উপর জবাবে তার হাসি মিলিয়ে যায়। জোর করে হেসে বলেন,
-"তোমরা ছোট থাকতে একবার তোমাদের বাড়ি এসেছিলাম। এই যে এটা আমার মেয়ে, সাবা!"
রুদ্র নজর ঘুরিয়ে একবার সাবা'কে দেখে নেয়। কাঁধ অব্দি স্টাইল করে চুল কাঁটা। মুখে হয়তো একটু বেশিই মেকাপ করেছে। যার জন্য হাতের থেকে মুখ বেশি ফর্সা মনে হচ্ছে। সাবা'র পড়নের ড্রেসে চোখ পরলে রুদ্রে'র মাঝে অসন্তোষ ভাব ফুটে উঠে। লেডিস টাইট ফিট জিন্স পরে টিশার্ট পরেছে। তবে টিশার্ট এমনভাবে পরেছে তাতে করে নারী দেহের প্রতিটা বাঁক বোঝা যাচ্ছে। বাড়িতে বর্ষণ, শুভ্র, ইভান আরও কত ছেলে আছে। এর মাঝে সাবা'র এত খোলামেলা ড্রেসাপে রুদ্রে'র বিরক্তি ভাব চলে আসে। সবগুলো ছেলেই যথেষ্ট বড়। সাবা'র এরকম চলাফেরায় যদি তাদের মাঝে অন্যরকম প্রভাব পরে?
সাবা'র থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মস্তিষ্কে চাপ দিলে সেই দিনের কথা মনে পারে যায়। এতগুলো বছর নিভে থাকা চাপা ক্ষোভ যেজন জ্বলে উঠে। সাবিদে'র মায়ের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
-"হুমম চিনতে পেরেছি। আমাদের বাড়ি এসে প্রথমদিনই আপনার মেয়ে আমার হাতে থাপ্পড় খেয়েছিল।"
রুদ্রে'র কথায় উল্লাসে ভরপুর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে আসে। নদী চোখ বন্ধ করে নিয়ে মাথা নাড়ায়। সে তো ভুলেই বসেছিল রুদ্র কেমন। একরোঁখা, জেদি। যখন যা ইচ্ছে হয় বলে দেয়। সামনে কে আছে তা দেখে না।
রুদ্র সাবিদে'র মায়ের পাশ কাটিয়ে সামনে পা বাড়ায়। বা'দিকে চোখ গেলে একটা ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। বুঝতে পারে এটাই সাবিদ। পা থেকে মাথা অব্দি একবার দেখে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে। মুখ স্বভাবিক করে বলে,
-"আম্মু! আমাদের জন্য রুম ক্লিন করিয়ে রেখেছো?"
নদী এগিয়ে যেয়ে বলে,
-"হ্যাঁ দু'জনেই উপরে চল। আমি রায়ানে'র জন্য রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।"
রুদ্র রায়ান মাথা নাড়িয়ে নদী'র পিছুপিছু যায়। তাদের চলে যেতে দেখে ধীরে ধীরে ড্রইংরুম ফাঁকা হয়ে আসতে থাকে। রুদ্র কয়েক সিঁড়ি উপরে উঠে দাঁড়িয়ে পরে। ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে তাকায়। দেখতে পায় রোদ মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে। রুদ্র অপলক চোখে রোদ'কে দেখে নেয়। হলুদ ফর্সা গড়নের গায়ে লাল রাঙা গোল জামা, সেলোয়ার জড়িয়েছে। কাঁধে লাল ওড়না জড়িয়ে রাখা৷ দু'হাত ভর্তি লাল কাঁচের চুরি। ভ্রু জোড়ার মাঝে ছোট্ট কালো টিপ। হাঁটুর নিচ অব্দি লম্বা চুলগুলো মুক্ত করে রাখা। সেই ছোট বেলার মতোই গালের দু'পাশে রক্তিম আভা ছড়ানো। লিপস্টিক বিহীন রক্তজবার ন্যায় রক্তিম ঠোঁট জোড়ায় চোখ গেলে রুদ্র ঢোক গিলে নেয়। তবে রোদে'র থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় না। নিজের গোলাপি ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে নিচু কন্ঠে বলে,
"এ তো দেখছি আমার লাইফের রেড লাইট। নিজেকেও সেভাবেই সাজিয়ে রেখেছে। নো! নো! ওর থেকে দূরে থাকতে হবে। জন্ম থেকেই আমাকে জ্বালিয়ে আসছে। এই মেয়ের থেকে সাবধানে থাকতে হবে তোকে, রুদ্র! ভুলে যাস না! ইগো দেখিয়ে এই মেয়েকে রিজেক্ট করেছিলি। কোনোভাবেই এই মেয়ের প্রতি উইক হয়ে যাস না। তাহলে তোর ইগো সেল্ফ রেস্পেক্ট কিছুই থাকবে না।"
রুদ্র রোদে'র দিকে তাকিয়ে থেকে নিজমনে ব্যস্ত থাকলে রোদ চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। টানা টানা চোখ দু'টোর নিরব দৃষ্টিতে রুদ্র অস্থিরতায় দ্রুত নিজের নজর ফিরিয়ে নেয়। রোদে'র সাথে কথা বলতে নিলে তাকে অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করে। হয়তো কয়েক বছর আগে তার সাথে বিয়ের কথা তোলায় এরকম হয়। রুদ্র আর না ভেবে শব্দ তুলে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে চলে যায়।
রুদ্র দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেলে রোদ চোখের পলক ফেলে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ফুরিয়ে আসা অনুভব করলে ধপ করে সোফায় বসে যায়। সামনের টেবিল থেকে পানি নিয়ে এক ঢোকে পুরোটা খেয়ে নেয়। দু'হাতে পড়নের জামা খামচে ধরে ঢোক গিলে বলে,
-"রুদ্র ভাই! দূরে থেকে যতটা পুড়িয়েছেন কাছে এসে তার থেকেও বেশি পোড়াচ্ছেন। আপনার কয়েক সেকেন্ডের চোখের দৃষ্টিতে কি ছিল জানি না! কিন্তু আমি ভিতর থেকে প্রচন্ড দূর্বল হয়ে পরেছি। আপনার ওই গভীর চোখের দৃষ্টি এতটা ভাসা ভাসা কেনো? আমি যে বুঝে উঠতে সক্ষম নই।"
নিজের বুকের বা'পাশে ডানহাত চেপে ধরে অসহায় স্বরে বলে,
-"তার এক দেখাতেই যদি আমার এরকম বুক ব্যথা শুরু হয়ে যায়! তাহলে ভালোবাসি তা প্রকাশ করবো কি করে?"
#চলবে
[সম্পর্ক বুঝতে যাদের সমস্যা হচ্ছে এটা তাদের জন্য: বর্ষণ-রোদ, আকাশ_বৃষ্টির ছেলে-মেয়ে। রুদ্র-মেঘা, মেঘ_নদীর ছেলে-মেয়ে। রায়ান, রুহি-রোহানের ছেলে। ইরিন-অরিন-ইফাদ, ইহান-ইফতির ছেলে-মেয়ে। মেঘ, আকাশ, ইফতি তিন'জন ভাই-বোন। ইহান তাদের ফুপাতো ভাই। রুহি-রোহান দু'জন আকাশের বন্ধু। মাহুয়া, সায়রা, শুভ্র এরা আকাশ_বৃষ্টির বন্ধু-বান্ধবীদের ছেলে-মেয়ে।
#আমার_মন_তোর_পাড়ায় এই গল্পটা হলো আকাশ_বৃষ্টিদের গল্পের সিজন-২। আর তাই ওদের নাম ওভাবে দেওয়া৷ বাকিটা গল্প পড়ে বুঝে নিবেন। আশা করি, এরপর আর ওদের সম্পর্ক বুঝতে সমস্যা হবে না। ।