ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমার নামের পাশে

২য় পর্ব

লেখক: Ariyan Ahmed Tasin

তোমার নামের পাশে


পর্ব ২ — অচেনা মানুষটা আপন হয়ে গেল
সকালের আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকতেই আরোহীর ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। গত রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল। অধীর খুব বেশি কথা বলেনি, অথচ তার কয়েকটা কথাই আরোহীর মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি করেছিল। “তুমি এলে, সবকিছু একটু বদলে গেছে।” কথাটা কি শুধু স্বাভাবিকভাবে বলা, নাকি তার ভেতরে অন্য কোনো অর্থ ছিল? আরোহী নিজেও জানত না কেন সে কথাটা এতবার মনে করছে। পাশে তাকিয়ে দেখল অধীর ঘরে নেই। বিছানার অন্য পাশটা গুছানো। টেবিলের ওপর একটা ছোট কাগজে লেখা, “সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হতে হয়েছে। নাশতা না করে থেকো না।” আরোহী কাগজটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মানুষটা সামনে থাকলে এত গম্ভীর, অথচ আড়ালে এতটা খেয়াল রাখে! কাগজটা ভাঁজ করে রেখে সে তৈরি হতে গেল।
নিচে নামতেই সামিরা বেগম বললেন, “আরোহী, এসো মা। তোমার জন্য নাশতা রেখেছি।” আরোহী বসতেই মেহরিন পাশের চেয়ার থেকে বলল, “ভাবি, আজ ভাইয়া অফিসে যাওয়ার আগে তিনবার জিজ্ঞেস করেছে তুমি ঘুম থেকে উঠেছ কি না।” আরোহী অবাক হয়ে বলল, “সত্যি?” মেহরিন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। তারপর আবার বলল, ভাবি যেন নাশতা না করে বের না হয়।” নুসরাত হেসে বলল, “অধীর ছোটবেলা থেকেই এমন। যাকে নিজের মানুষ মনে করে, তার ব্যাপারে খুব যত্নশীল। শুধু মুখে প্রকাশ করে না।” আরোহী চুপ করে রইল। তার মনে হলো, অধীরকে সে যতটা চিনেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে মানুষটার স্বভাবে।
এদিকে অফিসে অধীর নিজের কেবিনে বসে একের পর এক ফাইল দেখছিল। সামনে বসা ম্যানেজার রাকিব গত দশ মিনিট ধরে নতুন প্রজেক্টের হিসাব বুঝিয়ে যাচ্ছিল। অধীর মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল। আরোহী লিখেছে, “নাশতা করেছি। আপনি চিন্তা করবেন না।” মেসেজটা পড়ে অধীরের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। রাকিব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “স্যার?” অধীর দ্রুত ফোনটা টেবিলে রেখে বলল, “হ্যাঁ, বলুন।” রাকিব মনে মনে ভাবল, এতদিনে প্রথমবার সে তার বসকে মেসেজ দেখে হাসতে দেখল।
দুপুরে বাড়িতে তখন সবাই ব্যস্ত। হুমায়ুন কবির বসার ঘরে বসে ছোট ছেলে আরমানের সঙ্গে ব্যবসার কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। মেহরিন আর নুসরাত রান্নাঘরে সামিরা বেগমকে সাহায্য করছিল। আরোহী বারান্দায় বসে একটা বই পড়ছিল। হঠাৎ বাড়ির পুরোনো কাজের লোক কাদের এসে বলল, “বউমা, আপনাকে বড় সাহেব ডাকছেন।” আরোহী নিচে গেল। হুমায়ুন কবির তাকে বসতে বললেন। “মা, তোমার কেমন লাগছে এখানে?” আরোহী মৃদু হেসে বলল, “ভালো লাগছে।” “কোনো সমস্যা হচ্ছে?” “না।” “অধীর তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে না তো?” প্রশ্নটা শুনে আরোহী একটু লজ্জা পেল। “না, বাবা। উনি খুব ভালো ব্যবহার করেন।” হুমায়ুন কবির হাসলেন। “অধীর ছোটবেলা থেকেই একটু গম্ভীর। কিন্তু মনটা নরম। ও কাউকে ভালোবাসলে সেটা মুখে বলবে না, কাজ দিয়ে বুঝিয়ে দেবে।” আরোহী মাথা নিচু করল। কথাটা শুনে তার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
বিকেলের দিকে অধীর বাড়ি ফিরল। দরজা দিয়ে ঢুকতেই ছোট্ট রায়ান দৌড়ে এসে তার পায়ে ঝুলে পড়ল। “চাচ্চু, আজ আমার জন্য কী এনেছ?” অধীর ব্যাগ থেকে একটা ছোট খেলনা বের করে দিল। রায়ান খুশিতে লাফিয়ে উঠল। সবাই হাসতে লাগল। আরোহী দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল। অফিসে যার সামনে সবাই গম্ভীর হয়ে থাকে, বাড়িতে সেই মানুষটাই ছোটদের সঙ্গে এতটা সহজ! অধীর হঠাৎ আরোহীর দিকে তাকিয়ে ফেলল। দুজনের চোখাচোখি হলো। আরোহী দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর অধীর নিজের ঘরে গেল। দেখল আরোহী জানালার পাশে বসে আছে। সে জিজ্ঞেস করল, “আজ সারাদিন কী করলে?” আরোহী বলল, “কিছু না। সবার সঙ্গে ছিলাম।” অধীর শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, “কেউ কিছু বলেছে?” “না।” “নিশ্চিত?” “হ্যাঁ।” অধীর মাথা নাড়ল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমি চাইলে তোমার নিজের মতো থাকতে পারো। এই বাড়িতে তোমাকে কারও মন জয় করার চেষ্টা করতে হবে না।” আরোহী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “আপনি এমন বলছেন কেন?” অধীর শান্ত গলায় বলল, “কারণ তুমি নতুন। অনেক মানুষ, অনেক নিয়ম। সবকিছু একদিনে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব নয়।” আরোহী মৃদু হেসে বলল, “আমি তো ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।” অধীর তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, “আমার সঙ্গে?” আরোহী একটু থেমে বলল, “আপনার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি।” অধীরের মুখে খুব হালকা হাসি ফুটে উঠল। “ভালো।”
সন্ধ্যায় বাড়িতে একটা ছোট পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিল। হুমায়ুন কবিরের এক পুরোনো বন্ধুর পরিবার আসবে। বাড়ির সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আরোহী সামিরা বেগমের সঙ্গে নিচে বসে অতিথিদের জন্য ব্যবস্থা করছিল। অধীর বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখল আরোহী একাই অনেক কাজ করছে। সে কাছে এসে বলল, “এত কাজ করছ কেন?” আরোহী বলল, “সবাই করছে, আমিও করছি।” অধীর সামিরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, আরোহীকে এত কাজ করতে দিও না।” সামিরা হেসে বললেন, “তুমি তো এখন থেকেই বউয়ের পক্ষ নিচ্ছ!” মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এটা নতুন কিছু না, মা।” সবাই হেসে উঠল। আরোহী লজ্জায় মাথা নিচু করল। অধীর অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই বলল, “ওকে অযথা বিরক্ত করার দরকার নেই।” তারপর সে আরোহীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি উপরে যাও। আমি আসছি।” আরোহী বলল, “কিন্তু…” “কোনো কিন্তু না।” তার গলায় আদেশের সুর থাকলেও চোখে ছিল যত্ন।
রাতের অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ এসেছিল। অধীর সবার সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলছিল। তার ব্যবসায়িক পরিচিত কয়েকজনও এসেছিল। আরোহী একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। একজন অতিথি এসে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি অধীরের স্ত্রী?” আরোহী মাথা নাড়ল। “জি।” লোকটি বললেন, “আপনি ভাগ্যবান। অধীর খুব পরিশ্রমী ছেলে।” আরোহী হেসে বলল, “জি, সেটা বুঝতে পারছি।” দূর থেকে অধীর কথাটা শুনে ফেলল। তার চোখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত অনেক হয়ে গেল। সবাই একে একে ঘুমাতে চলে গেল। আরোহী নিজের ঘরে এসে দেখল অধীর বারান্দায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। সে বলল, “এখনও কাজ করছেন?” অধীর বলল, “কিছু জরুরি কাজ আছে।” “সারাদিন কাজ করেন, তারপর রাতেও?” “ব্যবসা তো থেমে থাকে না।” আরোহী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনিও তো মানুষ। একটু বিশ্রাম দরকার।” অধীর ল্যাপটপ বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। “তুমি কি আমার চিন্তা করছ?” প্রশ্নটা শুনে আরোহী থেমে গেল। “আমি… সবাইকেই তো করতে হয়।” অধীর মৃদু হাসল। “ঠিক আছে।” তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চলো, ঘুমাই।”
পরদিন সকালে অধীর অফিসে যাওয়ার আগে আরোহীকে বলল, “আজ দুপুরে আমার সঙ্গে বের হবে?” আরোহী অবাক হয়ে বলল, “কোথায়?” “জানি না। তোমার যেখানে যেতে ইচ্ছা করে।” আরোহী বলল, “আপনার তো কাজ আছে।” “কিছু সময় বের করেছি।” “কেন?” অধীর একটু থেমে বলল, “তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছা করছে।” কথাটা বলেই সে গাড়ির দিকে চলে গেল। আরোহী দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে হাসি।
দুপুরে তারা শহরের একটি শান্ত রেস্টুরেন্টে গেল। অধীর সাধারণত ব্যবসায়িক মিটিং ছাড়া বাইরে খেতে পছন্দ করত না। কিন্তু আজ সে একেবারেই অন্যরকম। আরোহী কী খেতে চায়, কী পছন্দ করে—সব জানতে চাইছিল। খাবার আসার পর আরোহী বলল, “আপনি এতদিন ধরে আমাকে দেখছেন, কিন্তু আমার পছন্দের কিছুই জানেন না।” অধীর বলল, “জানার সময় পাইনি।” “এখন?” “এখন জানতে চাই।” আরোহী হেসে বলল, “তাহলে জিজ্ঞেস করুন।” অধীর সত্যিই প্রশ্ন করতে শুরু করল। তার পছন্দের খাবার কী, কোন গান ভালো লাগে, অবসরে কী করে, কোন জায়গায় যেতে ভালো লাগে—সব। আরোহী অবাক হয়ে বুঝল, অধীর শুধু শুনছে না, মনে রাখার চেষ্টা করছে।
ফিরে আসার সময় গাড়িতে দুজন চুপচাপ বসেছিল। হঠাৎ আরোহী বলল, “আপনি কি বিয়েটা নিজের ইচ্ছায় করেছিলেন?” অধীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “শুরুতে জানতাম না এই সম্পর্কটা আমার জীবনে কী পরিবর্তন আনবে।” আরোহী বলল, “এখন?” অধীর তার দিকে তাকাল না। শুধু বলল, “এখন মনে হয়, সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না।” আরোহীর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। “শুধু ভুল ছিল না?” অধীর এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরও কিছু আছে। কিন্তু সেটা বলার জন্য আমার একটু সময় লাগবে।”
সেদিন রাতে বাড়ির সবাই ডাইনিং টেবিলে বসেছিল। হঠাৎ হুমায়ুন কবির বললেন, “আগামী সপ্তাহে সবাই গ্রামের বাড়িতে যাবে। কয়েকদিন থাকব।” সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। আরমান বলল, “ভাইয়া, আপনি যাবেন তো?” অধীর বলল, “কাজ থাকলে হয়তো পারব না।” আরোহী চুপ করে ছিল। সামিরা বেগম বললেন, “অধীর, এবার কিন্তু যেতেই হবে।” অধীর কিছু বলল না। পরে সবাই উঠে যাওয়ার পর আরোহী ধীরে ধীরে বলল, “আপনি যাবেন না?” অধীর তাকাল। “তুমি যেতে চাও?” আরোহী মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।” অধীর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “তাহলে যাব।” আরোহী অবাক হয়ে বলল, “সত্যি?” “হ্যাঁ।” “আপনার কাজ?” “কাজ পরে হবে।” আরোহীর চোখে তখন এমন এক আনন্দ ফুটে উঠল, যা দেখে অধীর কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।
সে মুহূর্তে অধীর বুঝতে পারল—এই মেয়েটার হাসি এখন তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাতের শেষদিকে আরোহী ঘুমিয়ে পড়ার পর অধীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার জীবনে ব্যবসা, সাফল্য, অর্থ—সবই ছিল। কিন্তু এতদিন সে কখনো ভাবেনি, একজন মানুষের উপস্থিতি তার পুরো পৃথিবীর অর্থ বদলে দিতে পারে। আরোহীকে সে প্রথমে শুধু নিজের জীবনের একটি নতুন সম্পর্ক হিসেবে দেখেছিল। এখন সে বুঝতে পারছে, সম্পর্কটা তার কাছে আর শুধু দায়িত্ব নয়। আরোহী তার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। তার দিনের শুরুতে যার কথা মনে পড়ে, কাজের ফাঁকে যার মেসেজ খুঁজে, বাড়ি ফেরার সময় যার মুখ দেখতে ইচ্ছে করে—সে মানুষটা আরোহী।
অধীর ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এসে ঘুমন্ত আরোহীর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে খুব নিচু স্বরে বলল, “তুমি জানো না, আরোহী… তুমি আমার জীবনটা কতটা বদলে দিয়েছ।”
আরোহী ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠল।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে আলোটা কমিয়ে দিল।
তারপর নিজের জায়গায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুম আসার আগে তার মনে শুধু একটি কথাই ঘুরছিল—
ভালোবাসা হয়তো হঠাৎ আসে না। কখনো কখনো একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই অন্য একজনের পুরো পৃথিবী হয়ে যায়।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন