ফন্ট সাইজ:
থিম:
Dark obsession

৩য় পর্বরক্তিম রাত ও মায়াবী সুর

লেখক: Faiza noor

Dark Obsession

​Writer: Faiza Noor
Part: 3
​রোমের মধ্যরাত। ম্যানশনের চারপাশ নিঃশব্দ, কেবল বাইরের ভারী বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে বিজলীর চমক পুরো ঘরকে আলোকিত করে দিয়ে যাচ্ছিল।
​নূর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। তার মন ভীষণ অস্থির। এই সুবিশাল রাজকীয় ঘর, দামী রেশমি পর্দা কিংবা হাত বাড়ালেই পাওয়া ঐশ্বর্য—কোনো কিছুই তার মনকে শান্ত করতে পারছিল না। সে বারবার আয়নায় নিজের গলার দিকে তাকাচ্ছিল, যেখানে এনজোর দেওয়া হীরের নেকলেসটি জ্বলজ্বল করছে। এনজো লোকটা ঠিক কতটা ভয়ংকর, তা সে কাল রাতের পর থেকে আরও বেশি অনুধাবন করতে পারছে।
​হঠাৎ করেই পুরো ম্যানশন জুড়ে বিকট শব্দে সাইরেন বেজে উঠল! লাল বিপদসংকেতের আলো পুরো ঘরের দেয়ালে নাচতে শুরু করল।
​নূরের হাত থেকে চিরুনিটা খসে নিচে পড়ে গেল। তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। কী হচ্ছে এসব?
​দরজা এক ঝটকায় খুলে ভেতরে প্রবেশ করল এনজো। তার গায়ে কোনো স্যুট নেই, পরনে কেবল কালো শার্ট—যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার এক হাতে ভারী ৯ মিমি কোল্ট পিস্তল। এনজোর ধূসর চোখে তখন এক হিংস্র দানবের রূপ, যা দেখলে যেকোনো শক্ত মানুষের রক্ত হিম হয়ে যাবে।
​"নূর! আমার কাছে এসো, এখনই!" এনজোর কণ্ঠস্বর ধাতব অস্ত্রের মতো শোনালো।
​নূর ভয়ে একপা পিছিয়ে গিয়ে বলল, "এনজো... কী হচ্ছে বাইরে? এই সাইরেন কিসের?"
​এনজো কোনো কথা না বলে দুই পদক্ষেপে নূরের সামনে এসে দাঁড়াল। সে নূরের হাত ধরে এক টানে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। নূরের কাঁপা শরীরটাকে নিজের বাঁ হাতের শক্ত বেষ্টনীতে আঁকড়ে ধরে সে খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "ঢাকার কিছু ইঁদুর ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছে, সোনা। তারা ভেবেছে এনজো ডি’অ্যাঞ্জেলোর সাম্রাজ্যে আঘাত করা এতই সহজ।"
​ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বাইরে বিকট গুলির শব্দ হলো—ঠাঁই! ঠাঁই!
​নূর ভয়ে চিৎকার দিয়ে এনজোর শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। সে নিজের মুখটা এনজোর চওড়া বুকে লুকিয়ে ফেলল। চারপাশের এত রক্তক্ষয়ী হিংস্রতার মাঝেও এই লোকটার বুকটাই যেন নূরের কাছে একমাত্র আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছিল, যা তাকে চরম বিভ্রান্ত করছিল।
​এনজো নূরের মাথায় আলতো করে নিজের চিবুক ঠেকালো। তার বাঁ হাত নূরের পিঠে খুব আলতো করে বুলাতে লাগল—যেন সে নূরের ভয় ভাঙাতে চাইছে। কিন্তু তার ডান হাত পিস্তল উঁচিয়ে ছিল ঘরের বন্ধ দরজার দিকে।
​"ভয় পেও না, নূর," এনজো নূরের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "যতক্ষণ এনজোর বুকে নিঃশ্বাস আছে, পুরো পৃথিবীর কোনো বুলেট তোমার শরীর স্পর্শ করতে পারবে না।"
​ঘরের বাইরে ফ্যাবিও আর অ্যালেনের চেঁচামেচি আর দ্রুত গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। শত্রুপক্ষের কয়েকজন আততায়ী সিকিউরিটি ভেদ করে ওপরের তলায় চলে এসেছিল।
​হঠাৎ ঘরের কাঠের দামী দরজাটা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে ঢুকল দুজন কালো মুখোশধারী লোক। তাদের হাতে অটোমেটিক রাইফেল।
​"ডি’অ্যাঞ্জেলো! আজ তোর খেলা শেষ!" তাদের একজন চিৎকার করে উঠল।
​নূর আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু এনজো বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে মুহূর্তের মধ্যে নূরকে নিজের শরীরের পেছনে আড়াল করে এক হাত বাড়িয়ে পরপর দুটো গুলি চালাল—ঠাঁই! ঠাঁই!
​প্রথম আততায়ীর মাথায় সরাসরি গুলি লাগল, সে রক্তে ভেসে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। দ্বিতীয়জন গুলি চালানোর আগেই এনজো নূরের কোমর ধরে একটু ঘুরে গিয়ে তার বুক লক্ষ্য করে আরও দুটি বুলেট চালিয়ে দিল। লোকটা সাথে সাথেই নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
​পুরো ঘরে বারুদের তীব্র গন্ধ আর রক্তের ফোঁটা ছিটিয়ে পড়ল। নূর থরথর করে কাঁপছিল। সে চোখ খুলে মেঝেতে পড়ে থাকা লাশ দুটো দেখে মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো তার।
​"এনজো... আপনি..." নূরের কণ্ঠ দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছিল না।
​ঠিক তখনই নূর খেয়াল করল, এনজোর কালো শার্টের বাঁ হাতা বেয়ে গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। রিফ্লেক্স অ্যাকশনে ধাক্কা সামলাতে গিয়ে শত্রুর একটি বুলেট এনজোর হাত ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে।
​"আপনার গায়ে রক্ত! আপনি ইনজুরড!" নূরের নিজের অজান্তেই তার গলা দিয়ে এক ব্যাকুল আর্জি বেরিয়ে এলো। সে এনজোর ক্ষতস্থানটার দিকে হাত বাড়াল।
​এনজো নূরের এই ব্যাকুলতা দেখে তার রাক্ষসে রূপটা যেন এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল। তার ধূসর চোখে ভেসে উঠল চরম এক তৃপ্তি আর পাগলামি। সে বুলেটের ব্যথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আহত হাত দিয়েই নূরের হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল।
​"তুমি আমার জন্য চিন্তা করছ, নূর?" এনজো নিচু, মায়াবী গলায় বলল, "এই সামান্য রক্ত তো কিছুই না... তুমি যদি বলো, আমি এখনই নিজের পুরো বুক চিরে আমার হৃদয়টা তোমার হাতের তালুতে এনে রেখে দিতে পারি।"
​"আপনি একটা পাগল!" নূর কাঁপা গলায় বলল, তার চোখে তখন জলের ফোটা। "নিজের প্রাণ নিয়ে কেউ এভাবে খেলা করে?"
​"আমি পাগল নই, সোনা... আমি তোমার প্রেমে আসক্ত এক উন্মাদ," এনজো নরম হেসে বলল।
​রাত ৩টা।
​ম্যানশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবার কঠোর করা হয়েছে। আততায়ীদের লাশ সরিয়ে ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে। ফ্যাবিও নিশ্চিত করেছে যে ঢাকার সেই পুরোনো শত্রু গ্যাংয়ের সবাইকে খতম করা হয়েছে।
​বিশাল বারান্দায় বসে ছিল এনজো। তার গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। বারান্দার গাঢ় লাল সোফায় নূর চুপচাপ বসে ছিল। ঘটনাগুলোর আকস্মিকতায় তার শরীর এখনও হালকা কাঁপছিল।
​এনজো কোণায় রাখা তার পুরোনো অ্যাকোস্টিক গিটারটি হাতে নিল। সে সোফায় নূরের ঠিক পাশে এসে বসল। তার শরীর থেকে দামী পারফিউম আর হাল্কা অ্যান্টিসেপটিকের মিশ্র গন্ধ আসছিল।
​এনজো গিটারের তারে আঙুল ছুঁয়ে এক মিষ্টি ও বিষাদময় সুর তুলল। রোমের রাতের বাতাস আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সাথে সেই সুর মিশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করল। এনজো নূরের চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে একদম নিচু, হৃদয় স্পর্শ করা কণ্ঠে গাইতে শুরু করল:
​♪ "Blood on my hands, but a prayer in my heart...
Even through the fire, we won’t fall apart...
I’ll bleed for your smile, I’ll die in your light...
You are my safety in this dangerous night." ♪
​গানটির প্রতিটি লাইন নূরের বুকের গভীরতম জায়গায় গিয়ে আঘাত করল। একজন মানুষ কতটা অন্ধভাবে ভালোবাসলে রক্ত ঝরার পরও এমন মায়াবী সুর তুলতে পারে?
​নূর আস্তে করে এনজোর সুস্থ হাতটার ওপর নিজের ছোট হাতটা রাখল। সে এনজোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি আমাকে এত আগলে রাখেন কেন, এনজো? কেন চার বছর আগের সেই এক্সিডেন্টের কথা উঠলেই আপনি বিষয়টাকে এড়িয়ে যান? কী লুকিয়ে রাখছেন আমার থেকে?"
​এনজো গান থামিয়ে দিল। তার আঙুল গিটারের তারের ওপর স্থির হয়ে গেল। তার ধূসর চোখে মুহূর্তের জন্য এক গভীর অন্ধকার ও অপরাধবোধ ভেসে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল।
​সে গিটারটি পাশে রেখে নূরের মুখটা দু’হাতে ধরে একদম নিজের কাছাকাছি নিয়ে এলো। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল।
​"কিছু রহস্য অজানাই ভালো, নূর," এনজো ফিসফিস করে বলল, তার চোখ নূরের ঠোঁটে স্থির, "তুমি শুধু এটুকু জেনে রাখো—চার বছর আগে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এই জীবনে আর দ্বিতীয়বার আমি সেই ভুল করব না। পুরো পৃথিবী যদি তোমার আর আমার মাঝে দাঁড়ায়, আমি পুরো পৃথিবীকে ছাই করে দেব।"
​এনজো আলতো করে নূরের কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। দীর্ঘ সেই ছোঁয়ায় ছিল ব্যাকুলতা আর এক আধিপত্যের আশ্বাস।
​নূর আর এনজোকে ঠেলে দূরে সরাতে পারল না। সে চুপচাপ এনজোর চওড়া বুকে মাথা রাখল। বাইরে তখন রোমের বৃষ্টি থামার নাম নেই, আর ম্যানশনের ভেতরে এক মাফিয়া ডন আর তার শিকারের মধ্যে গড়ে উঠছিল এক বিষাক্ত, অথচ ভীষণ মায়াবী সম্পর্ক।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্বরক্তিম রাত ও মায়াবী সুর শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন