আমাকে বিয়ে করবেন স্যার? প্লিজ স্যার… আমাকে বিয়ে করে নিন!
আদ্রিজার মুখ থেকে কথাগুলো বের হতেই যেন পুরো ক্লাসরুমে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
কেউ চোখ বড় বড় করে আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে আছে, আবার কেউ অবিশ্বাসে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। আর যার উদ্দেশে কথাগুলো বলা হয়েছে, সেই আদিত্য চৌধুরীর মুখ মুহূর্তেই রাগে শক্ত হয়ে গেল।
আদিত্য কলেজের একজন কড়া স্বভাবের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীরা তার রাগ সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে। কিন্তু আজ তার রাগের কারণটা যে এতটা অদ্ভুত হবে, সেটা কেউ কল্পনাও করেনি।
আদিত্য ধীরে ধীরে আদ্রিজার দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। চোখ দুটো রাগে জ্বলছে।
ঠা*সস করে আদ্রিজার গালে চড় বসিয়ে দিয়ে
হুংকার দিয়ে বললেন
তোমার সাহস কী করে হয় আমাকে এমন প্রস্তাব দেওয়ার?
আদ্রিজার বুকটা ধক করে উঠল।
আদিত্য দাঁতে দাঁত চেপে আবার বললেন,
তুমি কি ভুলে যাচ্ছো, আমি তোমার স্যার? তোমার শিক্ষক! আর তুমি কীভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা বললে?এখানে কী পড়তে এসেছো নাকী বিয়ের জন্য বর খুজতে এসেছো।এতোই যদি বিয়ে করতে মন চায় তো বাড়িতে বলো বিয়ে দিয়ে দিক। পড়াশোনা করতে হয় কেন যত্তসব।
আদিত্যের কণ্ঠের তীব্রতায় পুরো ক্লাস যেন জমে গেল।
কেউ আর সামান্য শব্দ করার সাহস পেল না।
অনেকে মনে মনে আদ্রিজাকে বকাঝকা করতে লাগল।
মেয়েটার মাথা খারাপ নাকি?
কেউ আবার অসহায়ভাবে আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে ভাবল,
বেচারি! এখন না জানি স্যারের হাতে কী শাস্তি পায়!
আদিত্য কিছুক্ষণ রাগী চোখে আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে থেকে কঠিন গলায় বললেন,
যাও। বাইরে যাও।
আদ্রিজা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
স্যার…
একটা কথাও না!
আদিত্য ধমকে উঠলেন।
কলেজ ছুটি না হওয়া পর্যন্ত রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। কান ধরে। একটুও নড়াচড়া করবে না। এটাই তোমার শাস্তি।
আদ্রিজা প্রথমে সাহস করে কথাটা বললেও এখন তার সমস্ত সাহস যেন উধাও হয়ে গেছে।
আদিত্যের এমন ভয়ংকর রাগ সে আগে কখনো দেখেনি।
কলিজা কাঁপছে তার। তবুও স্যারের আদেশ অমান্য করার সাহস হলো না।
গুটি গুটি পায়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল আদ্রিজা।
বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ।
চারপাশ যেন আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে আছে। মাথার ওপর সূর্যের তীব্র তাপ, তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কান ধরে!
আদ্রিজা অসহায় মুখে দুহাত দিয়ে কান ধরল।
কিছুক্ষণ পর ক্লাসরুমের জানালার দিকে একবার তাকাল সে।
ভেতরে আদিত্য আগের মতোই ক্লাস নিচ্ছেন। যেন কিছুই হয়নি।
আদ্রিজার চোখেমুখে তখন অভিমান আর অসহায়ত্বের ছাপ।
মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল,
এতটা রাগ করার কী আছে! বিয়ে করতে চেয়েছি তো… খুন তো করতে চাইনি!
কিন্তু পরক্ষণেই আদিত্যের কঠিন মুখটা মনে পড়তেই বুকটা আবার কেঁপে উঠল।
উফ! স্যারকে কথাটা বলাই উচিত হয়নি।
আর ভেতরে দাঁড়িয়ে আদিত্য পড়াতে থাকলেও মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি অজান্তেই জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
রাগে মুখটা গম্ভীরই রয়ে গেল।
_____
আদিত্য কলেজে আদ্রিজার স্যার।
ছাত্র-শিক্ষকের এই সম্পর্কটাই সবাই জানে। ক্লাসরুমে আদিত্য তার কাছে শুধুই একজন কঠোর, গম্ভীর শিক্ষক যার চোখের দিকে তাকাতেও আদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
কিন্তু এই সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও একটি পরিচয়।
আদিত্য শুধু তার স্যার নয়, তার বড় চাচার ছেলে তার আদিত্য ভাইয়া।
এই সত্যিটা কলেজের আর কেউ জানে না। শুধু জানে আদ্রিজার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী আরাবী।
আর এই গোপন সম্পর্কটাই আজ আদ্রিজার জন্য হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় লজ্জা আর কষ্টের কারণ।
কয়েক ঘণ্টা আগেও আদ্রিজা ভেবেছিল, আদিত্য ভাইয়া তাকে কিছুতেই সবার সামনে অপমান করবেন না। যতই রাগ করুন, যতই বিরক্ত হন, সবার সামনে তো আর নিজের কাজিনের সাথে এমন করবেন না!
কিন্তু আদ্রিজা বুঝতে পারেনি আদিত্য যখন কলেজের স্যার, তখন তিনি কারও ভাইয়া নন।
আর আজ সেই ভুল ধারণাটাই তাকে ভেঙে চুরমার করে দিল।
আরাবীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আদ্রিজা হঠাৎ দুষ্টুমি করে বলেছিল,
আদিত্য ভাইয়াকে সবার সামনে বিয়ের জন্য প্রপোজ করবো।
আরাবী সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলেছিল,
সত্যি, কিন্তু আমি জানি তুই পারবি না।
কেন পারব না?
কারণ তুই যতই মুখে বড় বড় কথা বলিস, আদিত্য স্যারের সামনে গেলেই তোর সাহস উধাও হয়ে যাবে।
আরাবীর কথায় আদ্রিজার জেদ চেপে গিয়েছিল।
আমি পারব। একশো বার পারব।
আচ্ছা, তাহলে বাজি?
বাজি!
আরাবী হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
যদি বলতে না পারিস, তাহলে আমি যা বলবো আমার কথা শুনতে হবে।
আদ্রিজাও এক মুহূর্ত না ভেবেই আরাবীর হাতে হাত মিলিয়ে বলেছিল,
আর যদি আমি বলে দিতে পারি?
তাহলে তুই যা বলবি, তাই হবে।
সেই বাজির জেরেই আদ্রিজা সাহস করে আদিত্যের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
তার ছোট্ট মনে তখন কত স্বপ্ন!
ভাবছিল, সবাই থাকবে সামনে, কিন্তু আদিত্য ভাইয়া নিশ্চয়ই বুঝবেন। হয়তো একটু রাগ করবেন, চোখ রাঙাবেন, পরে সুযোগ বুঝে আলাদা করে বকবেন।
কিন্তু সবার সামনে তাকে অপমান করবেন?না।
এটা আদ্রিজা কল্পনাতেও ভাবেনি।
আদ্রিজা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাটা বলেছিল। কিন্তু আদিত্যর মুখের পরিবর্তনটা মুহূর্তেই তাকে থমকে দিয়েছিল।
কঠিন হয়ে গিয়েছিল আদিত্যের চোয়াল।চোখ দুটোতে নেমে এসেছিল কঠোরতা।
তারপর এমন কিছু কথা বলেছিলেন আদিত্য, যা মুহূর্তের মধ্যে আদ্রিজার মুখের হাসিটুকু মুছে দিয়েছিল।
আদিত্যের কথাগুলো তার কানে যাচ্ছিল, কিন্তু মস্তিষ্ক যেন কিছুই গ্রহণ করতে পারছিল না।
তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছিল।
ঠোঁট দুটো কাঁপছিল।চোখের কোণে জমে উঠেছিল পানি।
সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে মানুষটাকে সে এতটা ভালোবাসে, সেই মানুষটাই আজ তাকে সবার সামনে এমনভাবে অপমান করল!
আদ্রিজার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি মাটিটা ফাঁক হয়ে যেত, তাহলে সে সেই মাটির নিচেই লুকিয়ে যেত।
কাউকে কিছু বলতে পারল না সে।শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
আদ্রিজা তাড়াতাড়ি হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেলল।
না।
সে সবার সামনে কাঁদবে না।কখনোই না।
কিন্তু চোখের পানি কি আর অভিমান বোঝে?মনের কষ্ট কি আর লুকিয়ে রাখা যায়?
তার ছোট্ট বুকের ভেতর তখন যেন এক পাহাড় সমান অভিমান জমে গেছে।
কী করে পারলেন আদিত্য ভাইয়া?কী করে?
একবারও কি মনে হলো না, সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা তার নিজের মানুষ?
একবারও কি মনে হলো না, ওই কথাগুলো শুনলে আদ্রিজার কতটা কষ্ট হবে?
একবারও কি মনে হলো না, আদ্রিজা তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন ছাত্রী হয়ে নয় একজন ভালোবাসার মানুষ হয়ে?
অবশ্য আদিত্য জানেন না আদ্রিজার মনের সেই অনুভূতির কথা।
জানেন না, তার মুখের হাসি আদ্রিজার সারাদিন ভালো করে দিতে পারে।
জানেন না, তার গম্ভীর মুখ দেখলেই আদ্রিজার বুক ধড়ফড় করে।
জানেন না, আদিত্যকে নিয়ে ভাবতে আদ্রিজার ভীষণ ভালো লাগে।
জানেন না, তার নামটা মনে এলেই অজান্তেই আদ্রিজার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
জানেন না, এই ভালো লাগাটা আর সাধারণ ভালো লাগার মধ্যে নেই।
এটা অনেক গভীর।অনেক বেশি গভীর।
আদ্রিজা সত্যি সত্যিই আদিত্যকে ভালোবাসে।
খুব বেশি ভালোবাসে।
হয়তো সেই ভালোবাসার নাম মুখে উচ্চারণ করার সাহসও তার নেই। কিন্তু নিজের কাছে তো আর মিথ্যে বলা যায় না!
আদিত্যকে নিয়ে তার মনে যে অনুভূতিটা জন্মেছে, সেটা সে যতই লুকাতে চায়, ততই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু আজ?
আজ সেই মানুষটার কাছ থেকেই এমন অপমান পেল সে।
পা দুটো কাঁপছিল।চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল আদিত্যের সেই কঠিন মুখটা।
তারপর ঠোঁট কামড়ে কান্নাটা থামানোর চেষ্টা করল আদ্রিজা।
আজ থেকে আদিত্যের প্রতি তার মনে জমে গেল এক পাহাড় সমান অভিমান।
চলবে,,,
#প্রিয়সীর_অভিমান
#পর্ব_১
#জান্নাত