ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়েরটানে

১ম পর্ব

লেখক: আশু

বিয়ের দিন বউ পালিয়ে যাওয়ায় তার ছোট বোনকে বিয়ে করেছে অর্জুন তালুকদার। নামদামি বিজনেসম্যানের বউ পালিয়েছে ব্যাপারটা রীতিমতো ভাইরাল। এদিকে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও হিমিকে বিয়ে করতে হয় রগচটা এই বিজনেসম্যানকে। 

বিয়ের সন্ধ্যায় যখন পুরো তালুকদার ম্যানশন আলো ঝলমল করছিল, ঠিক তখনই খবরটা আসে—অর্জুনের পাত্রী, অর্থাৎ হিমির বড় বোন হিয়া অন্য কারও সাথে পালিয়ে গেছে। তালুকদার পরিবারের সুনাম আর নিজের আত্মসম্মান মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম। ক্ষোভে-রাগে অর্জুন তালুকদার এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়,হিমিকে বিয়ে করার। বংশের সম্মান বাঁচাতে পরিবারের চাপে আর কোনো উপায় না পেয়ে রাজি হয়ে দাঁড়াতে হয় হিমিকে।
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই অর্জুন এক মুহূর্ত দেরি করেনি। মিডিয়ার তুমুল শোরগোল আর গুঞ্জন এড়াতে হিমিকে নিয়ে সোজা ফ্লাইটে ওঠে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে। কিন্তু হিমি বুঝতে পারেনি, এই দ্বীপে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
সমুদ্রের এক নির্জন ওয়াটার ভিলার বিলাসবহুল সুইটে পা রাখতেই ভেতর থেকে দরজা লক করার ভারী শব্দটা হলো। হিমির পরনে এখনো লাল বেনারসি, গায়ে গয়নার ভারী চাপ। ভয় আর অনিশ্চয়তায় দরজার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল সে।
অর্জুন তার স্যুটটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল। ঘড়ির স্ট্র্যাপ খুলতে খুলতে ধীর পায়ে এগোলো হিমির দিকে। তার চোখে কোনো ভালোবাসার ছোঁয়া নেই, আছে একধরনের নিষ্ঠুর আর হিংস্র চাহনি।
"কী ভেবেছিলে? বোন পালিয়েছে বলে তুমি বেঁচে যাবে?" অর্জুনের কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে যেন আগ্নেয়গিরি জ্বলছিল। "তালুকদার বাড়ির সাথে খেলা করা অত সহজ নয়।"
অর্জুন এক ঝটকায় হিমির গায়ের ভারী ওড়নাটা টেনে ফেলে দিল। হিমির হাত ধরে নিজের দিকে হিঁচড়ে এনে শক্ত করে ধরে বলল, "তুমি রাজি হয়েছ তোমার বাবা-মায়ের সম্মানের জন্য, আর আমি তোমায় এনেছি আমার ইগো আর অপমানের বদলা নিতে। আজকে তুমি শুধুই অর্জুন তালুকদার-এর বউ।"
হিমি জোর করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু অর্জুনের লোহার মতো শক্ত হাতের শক্তির সামনে তা ছিল একেবারেই তুচ্ছ। অর্জুন যখন জোর করে তার কাছে আসতে চাইল, তখন রাগে, ঘৃণায় আর অভিমানে হিমির ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সব ভয় ঝেড়ে ফেলে তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
"হাত সরান বলছি! আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না! আপনাকে আমি বর তো দূর, মানুষ বলেও গণ্য করি না! কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি... আমার বয়ফ্রেন্ড আছে!"
কথাটা বলা মাত্রই সুইটের আবহাওয়া যেন জমে পাথর হয়ে গেল। অর্জুনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের তারা দুটো রগে লাল হয়ে গেল। হিমির কাঁধে তার হাতের চাপ দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
"কী বললে?" অর্জুনের গলা দিয়ে খাঁটি পশুর মতো গর্জন বেরিয়ে এলো। "বয়ফ্রেন্ড আছে? আর তুমি সেই নোংরা সত্যিটা গোপন করে আমায় বিয়ে করলে?"
হিমি কোনো ভয় না পেয়ে অর্জুনের চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, "হ্যাঁ, আছে! আপনি জোর করে আমায় বিয়ে করতে পেরেছেন, অর্জুন তালুকদার, কিন্তু আমার মন কোনোদিন আপনার হবে না! আপনার মতো একটা অমানুষকে আমি ঘৃণা করি!"
অর্জুনের ভেতরের উগ্র রগচটা স্বভাবটা এক মুহূর্তে সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। হিমির শেষ কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালল। সে হিমিকে এক ধাক্কায় বিছানার ওপর ফেলে দিল এবং পরক্ষণেই তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। হিমির হাত দুটো মাথার ওপর শক্ত করে চেপে ধরে হিংস্র হেসে বলল,
"ভালোবাসা? মন? ওসব ফালতু আবেগ দেখার সময় আমার নেই! তুমি কার মন কাকে দিয়েছ, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আজ রাতে এই ঘরে শুধু একটা জিনিস সত্যি—তুমি অর্জুন তালুকদারের বিবাহিতা স্ত্রী। আর তোমার ওই বয়ফ্রেন্ডের নামটা মনে রেখেই আজ রাতে তোমাকে আমার অধিকার মেনে নিতে হবে!"
ঘরের আলো আর সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন ঢেকে দিল তাদের মাঝের সেই বিষাক্ত, সংঘাতময় মুহূর্তকে।
বিয়ের প্রথম রাতটা দুটো মানুষের মধ্যে কোনো মিলন ঘটায়নি, বরং রেখে গেছে গভীর ক্ষত আর অনতিক্রম্য দূরত্ব।
পরদিন সকালে মালদ্বীপের ঝলমলে রোদের আলো যখন ওয়াটার ভিলার কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে এলো, তখন পুরো ঘর জুড়ে কেবল শ্মশানের নীরবতা।
বিছানার একপাশে থমথমে হয়ে বসেছিল হিমি। তার ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুল, কালকের ছেঁড়া-ফাটা লাল বেনারসি আর চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের মতো কালচে জলের দাগ স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল কাল রাতের তাণ্ডবের কথা। কিন্তু তার চে চোখে ভয়ের কোনো চিহ্ন ছিল না, ছিল কেবল এক তীব্র অবজ্ঞা আর বরফশীতল ঘৃণা।
বাথরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে বের হলো অর্জুন। পরনে সাধারণ ব্ল্যাক টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে একবার হিমির দিকে তাকাল। কাল রাতের সেই হিংস্রতা অর্জুনের চেহারায় আর নেই, কিন্তু তার জায়গায় এসেছে এক অহংকারী, উদাসীন স্থিরতা।
হিমির দিকে না তাকিয়েই সে টেবিলের ওপর রাখা পারফিউমের বোতলটা তুলল। ঠান্ডা গলায় বলল, "তৈরি হয়ে নাও। ১০ মিনিটের মধ্যে ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসো। বাইরে ক্যামেরা নিয়ে রিপোর্টাররা ছাঁকনি দিয়ে খুঁজছে। আমার বউ মুখ অন্ধকার করে বসে আছে—এই ছবি বাজারে বিক্রি হতে দেওয়া যাবে না।"
হিমি একটা শব্দও করল না। এমনকি অর্জুনের দিকে ফিরেও তাকাল না।
অর্জুন কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে হিমির সামনে দাঁড়াল। হিমির চুপ থাকাটা তার রগচটা স্বভাবকে আবার উস্কে দিচ্ছিল। সে হাত বাড়িয়ে হিমির চিবুক ধরে ওপরের দিকে তুলতে গেল, "আমি যখন কথা বলি, আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলবে, হিমি।"
ঝটকা মেরে অর্জুনের হাতটা সরিয়ে দিল হিমি। তারপর ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। অর্জুনের ঠিক মুখোমুখি হয়ে চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, "আমার ওপর তোমার অধিকার তো কাল রাতেই জোর করে প্রমাণ করে নিয়েছ, অর্জুন তালুকদার। বিজনেসের বাইরেও যে আপনার একটা উগ্র, ছোটলোক চেহারা আছে, সেটা তো দেখিয়ে দিলেন। আর কী চান? অভিনয়? মিডিয়ার সামনে হাসিমুখে বউ সাজা? ওটা আমি পারব না।"
অর্জুনের চোখ দুটো ছোট হয়ে এলো। কিন্তু সে এবার চিৎকার করল না। হিমির এতটা কাছাকাছি এসে দাঁড়াল যে তাদের নিঃশ্বাস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
"অভিনয় তোমাকে করতেই হবে, ডার্লিং," অর্জুনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত হাসি। "কারণ তোমার ওই ঢং-মার্কা বয়ফ্রেন্ড যে কোম্পানিতে চাকরি করে, ওটার ৮০% শেয়ার তালুকদার গ্রুপের। তুমি মিডিয়ার সামনে একটু ভুল নাটক করলে, কাল সকালে তোমার ওই ভালোবাসার মানুষটি রাজপথের ভিখারি হয়ে যাবে। তারপর ওর বডিটাও হয়ত রাস্তার পাশে থাকবে। এতেও খারাপ না লাগলে তোমার বাবা মা 
আছেনই।"
কথাটা শুনে হিমির শক্ত মুখাবয়ব মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়ল। চোখের মনি দুটো কেঁপে উঠল তার। "আপনি... আপনি কীভাবে জানলে ওর কথা?"
"আমি অর্জুন তালুকদার," অর্জুন পকেটে হাত গুঁজে শীতল কণ্ঠে বলল। "তোমাদের সব হাঁড়ির খবর আমার টেবিলে থাকে। তাই বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না। এই রাজকীয় বন্দিদশা মেনে নাও, আর সোজা হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাসো। না হলে কার কী ক্ষতি হবে, তা নিশ্চয়ই তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না?"
হিমি রাগে দাঁত চেপে বলে উঠল,,"আপু একদম ঠিক করেছে।"
অর্জুন বলে উঠল,,"তা অবশ্য ভুল বলোনি। সে বাঁচলেও তুমি তোহ্ বাচতে পারবে না সুইটহার্ট! "
হিমি বুঝতে পারল, অর্জুন শুধু উগ্র নয়, অত্যন্ত নির্মম এবং চতুর। নিজের ভালোবাসাকে বাঁচানোর জন্য হিমি দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা গিলে নিল।
"ঠিক আছে," হিমি ধীর কিন্তু কঠিন গলায় বলল, "পুতুল নাচ দেখতে চান তো? দেখাব। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি ভয় দেখিয়ে অভিনয় করাতে পারবেন—কিন্তু যে জখম আপনি আমাকে দিলে, সেটার মূল্য আপনাকেও একদিন চুকোতে হবে।"
অর্জুন কোনো জবাব দিল না। শুধু এক পলক হিমির আত্মবিশ্বাসী, জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। 
অদ্ভুতভাবে, হিমির এই চোখের ঘৃণা অর্জুনকে কেমন যেন এক অজানা অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে দ্রুত ড্রেসিং রুমের দিকে পা বাড়াল, আর হিমি দাঁড়িয়ে রইল নিজের প্রতিশোধের আগুন বুকে চেপে।
#হৃদয়ের_টানে সূচনা পর্ব
#আশু

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন