ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোড়া পাতা দিনলিপি

৯ম পর্ব

লেখক: তেনিমা খান

#জোড়া_পাতার_দিনলিপি

#তোনিমা_খান

#পর্বঃ০৯

বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তালহার বাড়ি কিনেছিল। বিন্দু ঘর সাজাতে পছন্দ করত। কিন্তু দেয়ালে একটা আঁচড় লাগলেও বাড়ি ওয়ালা রাগারাগী করত। এরপর হুট করেই সে একদিন বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। অতঃপর বিন্দুকে আর কখনো দ্বিধাবোধ করতে হয়নি ঘর সাজানো নিয়ে। সে নিজের মনের মতো করে কংক্রিটের দেয়ালে আবৃত দালানটিকে ঘরে পরিণত করেছিল।

"বি.টি.এম" নেইমপ্লেটটির দিকে তাকিয়ে সুপ্ত মুচকি হাসল। নিজ মনে আওড়ালো,

"বিন্দু তালহার মুজাহিদ।"

তালহার প্রিশাকে রুমে ছেড়ে দিয়ে পিছু ফিরে তাকালো।

"কি হলো ভেতরে ঢুকছিস না কেন?"

সুপ্ত পকেটে দুই হাত গুঁজে নিরুত্তর হেলেদুলে ভেতরে ঢুকল। সেটি সত্যিই একটি ঘর ছিল। যেটাকে বলে যত্নে মোড়া ঘর। সেখানে সুখ ছিল, প্রশান্তি ছিল, দিনশেষে পুরো পৃথিবীকে উপেক্ষা করার মতো কারণ ছিল। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে টি টেবিলে পা তুলে দিল সুপ্ত। সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে আলসে মাখা কণ্ঠে বলল,

"বিয়ার হবে?"

"অনলি ম্যাংগো জুস।"

তালহার পুরো ঘর আলোকিত করতে করতে জবাব দিল। সুপ্ত ফিচলে হেসে তার দিকে ঘাড় কাত করে তাকায়। বলে,

"তারমানে বিন্দুর ম্যাংগো জুস পছন্দ?"

তালহার শান্ত দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো তার দিকে। আপাতদৃষ্টিতে সেই দৃষ্টি শান্ত হলেও তাতে কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল অতিরিক্ত কৌতুহলী না হওয়ার জন্য। সুপ্ত খিক খিক‌ করে হেসে বলল,

"চিল! আ'ম জাস্ট পিঞ্চিং ইউ।"

তালহার ভ্রুক্ষেপহীন কাউকে ফোন করল। বিশ মিনিটের মাথায় সে দরজা খুলে ছোট্ট বক্সটা ভেতরে নিয়ে এলো। সেখান থেকে একটা ক্যান বের করে টিভির সামনে ঝিমুতে থাকা সুপ্তর দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল,

"ক্যাঁচ।"

সুপ্ত তৎক্ষণাৎ ক্যাঁচ ধরতেই তার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে হাঁফ ছেড়ে বলল,

"ওহ্ থ্যাংকস! আমি ভেবেছিলাম আজকের রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে বোরিং রাত হবে। নো গার্ল, নো ড্রিঙ্কস! ও মাই গড হাউ হরিবেল!"

সুপ্ত বিস্ময় নিয়ে বলল। তার জগত কাজ, নিত্যনতুন নারী আর ড্রিঙ্কস। তালহার তার অপরপ্রান্তের সোফায় একই রকম টি টেবিলে পা তুলে দিয়ে বসল। তার আঙুলের ভাঁজে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। দৃষ্টি বড়োই উদাসীন। সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বলল,

"এরকম আর ক'দিন চলবে?"

"যতদিন না ভেতর থেকে শান্তি আসে।"

সুপ্ত ক্যানে ঠোঁট বসাতে বসাতে বলল।

"আর সেটা কবে আসবে?"

সহসা দু'জনের দৃষ্টি মিললো। সুপ্ত স্মিত হাসল কিন্তু তার কাছে কোনো জবাব ছিল না দেয়ার মতো। তালহার তার নীরবতার প্রেক্ষিতে বলল,

"এভাবে জীবন কাটিয়ে দেয়া কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।"

সুপ্ত নিরুদ্বেগ বলল,

"আমি ভালো আছি আমার জীবন নিয়ে।"

"এটাকে ভালো থাকা বলে না।"

টিভির দিকে এঁটে থাকা সুপ্তর উদাসীন দৃষ্টি গভীর হতে লাগল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

"আমি যেভাবে আছি এটাই আমার জন্য বেস্ট। নয়তো আমি আমার ভালো থাকা খুঁজতে গেলে অনেকে নিজের ভালো থাকা হারিয়ে ফেলবে।"

পরপরই ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে বলল,

"মানুষ কী করে একজনকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়? আমি তো একদিনের পর আর কারোর মাঝে আগ্রহ খুঁজে পাই না।"

তালহার উদাসীন কণ্ঠে বলল,

"হারামে কখনো আগ্রহ খুঁজে পাওয়া যায় না। হালালে আগ্রহ খোঁজ। দেখবি তা থেকে বের হওয়ার ক্ষমতাই পাবি না।"

"যেমনটা তুই?"

সুপ্ত তার পানে চেয়ে বলল। কিন্তু তালহারের কোনো জবাব আসে না। সুপ্ত উদাসীন বদনে মৃদু হাসল তার নীরবতায়। কণ্ঠ খাদে এনে বলল,

"সে একটা সাধারণ মেয়ে, তালহার।"

তালহার স্মিত হাসল। নিজেও আওড়ালো,

"সে একটা সাধারণ মেয়ে।"

সুপ্ত অবুঝ কণ্ঠে বলল,

"তার মধ্যে কী এমন বিশেষত্ব আছে?"

"যা আমি ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না।"

তালহারের কণ্ঠ ভীষণ ক্ষীণ ছিল। ক্যানে চুমুক দিতে থাকা সুপ্তর চাহনি গভীর হয়। ম্লান হেসে বলল,

"আমি কখনো ভাবিনি তালহার মুজাহিদ আরো একবার ভালোবাসতে পারবে।"

সহসা তালহার চমকে উঠল। আঙুলের ভাঁজে থাকা সিগারেটটা ঈষৎ কেঁপে উঠল। সেটি পড়তে পড়তে আরো শক্ত করে আঙুলের ভাঁজে আঁটকে গেল। সুপ্ত দৃষ্টি সরায় সিগারেটটি থেকে। চাপা এক নিঃশ্বাস ফেলল। কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,

"বিন্দুকে অযথাই নিজের থেকে দূরে রেখেছিস। ওকে গিয়ে বুঝিয়ে বল যে সবটা কাজের স্বার্থে।"

হাতের আঙুলের ডগা থেকে বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে ওঠা অন্তঃস্থল তখনো অস্থিতিশীল। তালহার এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে শক্ত কণ্ঠে বলল,

"নাহ, কোনোদিন না।"

"কেন? ও কী অবুঝ? ও ছাড়া কে আছে যে তোকে এত ভালোভাবে বোঝে?"

তালহার অস্থির দৃষ্টি ফেলছে। তার ফর্সা মুখ পীত বর্ণ ধারণ করেছে। আঙুলের ভাঁজে ঈষৎ কাঁপতে থাকা সিগারেটটা আরো শক্ত করে ঠোঁটের ভাঁজে চেপে ধরল। দৃষ্টি অদূরে দোলনায় শুয়ে থাকা প্রিশার দিকে রেখে ধিমি কণ্ঠে বলল,

"ও ছাড়া কেউ আমায় বোঝে না। এটাই আসল কারণ। আমার পেশা আর আমার স্ত্রী দু'টো ভিন্ন জগত। দু'টো কোনোভাবেই একে অপরকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমার পেশার ধারেকাছে ও আমি বিন্দুকে ঘেঁষতে দেব না। সামান্য কৈফিয়ত এর জোরেও না। তুই জানিস না আমার পেশা কত অভিশপ্ত আমার জন্য?"

সুপ্ত বিরক্তি নিয়ে বলল,

"তুই অতিরিক্ত চিন্তা করছিস‌। ওকে সবটা বুঝিয়ে বল। ওর কিছু হবে না। আমরা আছি না?

সহসা তালহারের মাঝে চেপে রাখা অস্থিরতা রা উপচে বেরিয়ে আসল। সে আচমকাই সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে অস্বাভাবিক ভাবে চিৎকার করে উঠল।

"তখনো আমরা ছিলাম। তখনো আমরা ছিলাম,সুপ্ত। কিন্তু কী হয়েছিল? ও...ওরা ..তাকে জ...জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল। তুই ভুলে গিয়েছিস? দেহে দাউদাউ করে জলন্ত আগুন নিয়ে সে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছিল একটু বাঁচার জন্য। কিন্তু.....

তালহারের কণ্ঠ জড়িতে যেতে যেতে একটাসময় আঁটকে যায়। তার চোখ টলটল করছে। পীত রঙা মুখ তখন একটু একটু করে লালচে হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে এখনি চোখমুখ ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সে কখনো কাঁদতে পারত না। তাই আজো পারল না। ভেতরে জমে জমে ভারী হয়ে থাকা অজস্র অশ্রুগুলোকে সে আজ ও ঝড়াতে পারেনি।

সুপ্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার ওই টলটলে নেত্রপানে। এই তালহারকে সে পাঁচ বছর আগেও দেখেনি। সে এক মুহুর্ত বিলম্ব করল না। সোফা ছেড়ে উঠে এসে ঝট করে কাঁপতে থাকা পুরুষটিকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত আলিঙ্গনে ভরসা জোগায়।

"ওটা অতীত তালহার। অতীত কখনো পুনরাবৃত্তি হয় না।"

তালহারের উত্তেজিত বদন নিভে আসে। ক্ষীণ স্বরে বলে,

"হয়। অতীতের পুনরাবৃত্তি হয়। বরং আরো বাজেভাবে হয়।"

সুপ্ত তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে পাল্টা জেদি কণ্ঠে বলল,

"হয় না। একদম হয় না। অতীতের পুনরাবৃত্তি হলে আমরা কখনোই আশরাফুল মাখলুকাত হতাম না। আমরা মানুষ! আমরা শুধু অতীত, ইতিহাস বদলানোর ক্ষমতা রাখি। স্বাভাবিক হ। পাস্ট ইজ পাস্ট।"

তালহার মাথা দোলালো। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

"হ্যাঁ, পাস্ট ইজ পাস্ট। আর পাস্টে করা ভুল আমি কখনো প্রেজেন্টে করব না। তাই বিন্দু কোনোদিন কিচ্ছু জানবে না। আমি তার স্বামী , সে আমার স্ত্রী। দিনশেষে আমাকে তার কাছে ফিরতেই হবে এবং আমি ফিরবোই। এতটুকুই আমাদের একমাত্র সত্যি। ওর আর কিছু জানার কোনো প্রয়োজন নেই। সেই কৈফিয়ত ও সে পাবে না, যার সাথে আমার কাজ জুড়ে আছে। ওকে আমি আমার এই পেশাগত দুনিয়ার হাওয়াও লাগতে দেব না। তাতে যা কিছু হোক না কেন!"

সুপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে। এখন শান্ত হ। একটা ঘুম দে, দেখবি ফ্রেশ লাগবে।"

ঘুম? চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ে সে চোখ বুজবে কী করে? রাতটুকু এক মুহুর্তের জন্যও তালহার আর চোখ বুজতে পারল না। বারংবার চোখের সামনে ভাসছে দেহে জলন্ত আগুন নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকা এক অবয়ব আর আর্তচিৎকার।

থাই ভেদ করে চোখে সূর্যের তীর্যক রশ্মী পড়তেই পিসির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তালহার নড়েচড়ে উঠল। সে চোখ রাখে জানালার বাইরে। সকাল হয়ে গিয়েছে।

তার দৃষ্টি আবার ফিরে আসে আগের জায়গায়। পিসির স্ক্রিনে ভাসতে থাকা হাস্যোজ্জ্বল মুখের মেয়েটির ছবিটি সরিয়ে ফেলল। এবং পুনরায় অ্যালবামটি নতুন পাসওয়ার্ড দিয়ে এনক্রিপ্ট করে টেবিল ছেড়ে উঠে আসে।

বিছানায় তখন উদাম দেহে সুপ্ত ঘুমাচ্ছিল। সে ঘর্মাক্ত টিশার্ট বদলে আরেকটা টিশার্ট পড়তে পড়তে অলক্ষ্যে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলো। তার কিছু প্রয়োজন। কিন্তু যা প্রয়োজন সেই মুহুর্তে তা তার কাছে নেই। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কবিরকে একটা মেসেজ পাঠালো। এরপর এক কাপ দুধ চিনি সহ কড়া কফি বানিয়ে বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে।

কফি হাতে টি টেবিলে পা তুলে বসল। পায়ের উপর ল্যাপটপ রেখে কফিতে চুমুক বসালো। দু'টো আঙুল তখন ব্যস্ত ভঙ্গিতে টাচপ্যাডে ঘোরাফেরা করছে। একটাসময় তার আঙুল দুটো থামে। ঠোঁটে নেয়া সদ্য চুমুকটা তার গতি হারালো। হ্যাজেল ব্রাউন রঙা চঞ্চল চোখের মনি দুটো স্থির হলো স্ক্রিনে ভেসে ওঠা দৃশ্যপানে।

ওড়না বিহীন দেহটি ঢেকে আছে খোলা চুলে। ঘন কালো ভ্রু যুগলের ঠিক মাঝ বরাবর দু'টো ভাঁজ। বইয়ে মুখ গুঁজে অনবরত দুলতে দুলতে মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করছে নারীটি। তালহারের উদাসীন মুখশ্রী আর অন্তঃস্থল একটু একটু করে উজ্জ্বীবিত হতে শুরু করল। ঠিক যেন মৃত দেহে প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে।

ওষ্ঠকোনা ভীষণ অলসতার সাথে বেঁকে যায়। সে জুম করে। বদ অভ্যাসের কারণেই হাতের উল্টোপিঠটা ছুঁয়ে দেয় মেয়েটির গাল বরাবর। ফিসফিসিয়ে বলল,

"পৃথিবীতে প্রত্যেক তালহারের জীবন যতবার তিনশ' ষাট ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে যাবে, প্রতিবার যেন একজন বিন্দু এসে তাদের বুকে জড়িয়ে নেয়।"

সে ভীষণ আদরের সাথে স্ক্রিনে থাকা মুখটিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল। তার সোফার ঠিক পেছনে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুপ্তর ঘুম জড়ানো মুখে অলসেমাখা হাসি ফুটে উঠল। যেটা ভীষণ সুন্দর ছিল। হয়তো এটাই কারণ নারীরা এক দেখায় তার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

*****

বিন্দু যখন শেষবার বইয়ে মুখ গুঁজেছিল তখন ধরণী ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। কিন্তু যখন বই থেকে মুখ তুলল তখন ধরণী ঝলমলে আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সৃষ্টিকর্তার কী অদ্ভুত মহিমা, তাই না?

সে একটু নড়তেই কোমর ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল। সে কখনোই পুরোপুরি সুস্থ সবল থাকে না। প্রতিমাসে একবার গাইনি ডাক্তারের কাছে যাওয়া তার জন্য রুটিন। কিন্তু ডাক্তার ও তেমন বিশেষ কিছু বলে না, আর না তালহার বিশেষ কিছু বলে। অনেক পরিশ্রমী মেয়ে বলে তার অসুস্থরা কখনো তেমন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে না।

সে টেবিল ছেড়ে উঠতে যাবে তখনি চোখ যায় তার কলমদানিতে। সেখানে কালো বেশ মোটা একটা কলম রাখা। সে হাতে নিলো কলমটি।

"এটা কোত্থেকে আসল? এই কলম তো আমি কখনো কিনিনি।"

বিন্দু কপাল কুঁচকে আওড়ালো। কলমটি খুব সুন্দর ছিল। সে একবার কাগজে দাগিয়ে আবার জায়গামতো রেখে দিল।

এক কাপ কফি বানিয়ে আবার রুমে ঢুকতে যাবে তখুনি কলিং বেল বাজলো। বিন্দুর পা দুটো থমকায় রোজকারের ন্যায়। বুকের বা পাশের ওঠানামা ঈষৎ বেড়ে যায়। সে ধীর কদমে গিয়ে দরজা খুললো। সামনে তাকালো না বরং সোজা নিচে দৃষ্টি রাখল। যেখানে রোজকার ন্যায় চারটা সাদা লিলিফুল স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে।

বিন্দুর দৃষ্টি বড্ডো উদাসীন। সে অবসাদগ্রস্ত বদনে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল প্রিয় ফুলগুলো। নাসারন্ধ্র থেকে একটা ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল।

আজ বাইশ দিন। প্রতিদিন লোকটির নীরব ভালোবাসাগুলো ফুল হয়ে তার কাছে আসে। কিন্তু সে আসে না। আর না তার কোনো কৈফিয়ত আসে।

একবার এসে বলুক, সবটা মিথ্যা। কিন্তু নাহ! সত্যিকে মিথ্যা বলার মতো অসৎ তালহার মুজাহিদ কখনোই হতে পারবে না। তাই তো আজ পর্যন্ত তার কোনো কৈফিয়ত আসেনি।

ফুলগুলোকে পানির গ্লাসে রেখে বিন্দু আবার পড়তে বসল। দীর্ঘ একটা বিরতির কারণে তার মধ্য থেকে পড়ার আগ্রহটা কমে গেলেও, পরিস্থিতি এই আগ্রহ ইদানিং দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাকে তালহারের মিথ্যায় গড়া সংসার থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচয় বানাতে হবে। যেন ঘরভাঙা মেয়েটি পরিবারের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

নয়টা পর্যন্ত পড়াশুনা করে কোচিং এ যাবে। নাস্তায় গতকালকের রান্নাই খেয়ে নেবে।

_________

দশটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিট। কবির বিনম্র ভঙ্গিতে তালহারের কক্ষে নক করতেই তালহার সচকিত হলো। কবিরের পেছনের মানুষ দুটোকে দেখে নিজেই উঠে এলো। বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে বলল,

"আঙ্কেল আসুন।"

রুহান আর তার বাবা ভীষণ জড়তার সাথে কক্ষে ঢুকলো। তালহার নিজেই তাদের চেয়ার এগিয়ে দিল। মৃদু হেসে বলল,

"বসুন। চা না কফি?"

রুহান তখনো দাঁড়িয়ে আছে আর সরু চোখে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে তালহারকে। রুহানের বাবা বসল। সৌজন্য হেসে বলল,

"কিছু লাগবে না। কিন্তু স্যার, আপনি যদি বলতেন আমাদের কিসের জন্য ডাকা হয়েছে। তবে আমি একটু দুশ্চিন্তা মুক্ত হতাম।"

তালহার কবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ওদুদ ভাইকে তিনটা দুধ চা দিতে বলো, কবির।"

কবির রুহানের দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে ঘাড় দোলালো। এই শালা তার প্যান্ট খুলে রেখে দিয়েছিল। তার প্যান্ট! আবারো তার চোখ ছলছল করে উঠল। স্যার কোন আক্কেলে এদের দুধ চা খাওয়াচ্ছে? এদের তো বিষ খাওয়ানো উচিত।

সে রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল।

তালহার নিজের চেয়ারে বসে মৃদু হাসল। বলল,

"দুশ্চিন্তার কিছু নেই আঙ্কেল। আমি শুধু আপনাদের সাথে কিছু কথা বলব।"

রুহান সরু চোখে চেয়ে বলল,

"কোন বিষয়ে?"

তালহার এবার দৃষ্টি রাখল রুহানের দিকে। বেশ ফর্সা সুন্দর চলনসই একজন পুরুষ। যা অন্যের চোখে নিঃসন্দেহে সুদর্শন পুরুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। সে মৃদু হেসে ভীষণ অধিকার বোধের সাথে বলল,

"আমার স্ত্রীর বিষয়ে। যে এই মুহূর্তে আপনাদের বাড়িতে রেন্টে থাকছে।"

রুহান আচমকাই নড়েচড়ে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল,

"বিন্দু?"

"মিসেস বিন্দু।" তালহার হাসিমুখে তৎক্ষণাৎ তার ভুলটি সংশোধন করে দিল। রুহানের মুখটি থমথমে হয়ে গেল। রুহানের বাবা বললেন,

"ওই মেয়েটা আপনার স্ত্রী? আমার ছোট ছেলের কাছে শুনেছিলাম সে কোনো বিপদে পড়েছে। ঢাকা শহরে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। আর আপনি বলছেন সে আপনার স্ত্রী। আপনি তো বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের মনে হচ্ছে। তবে আপনার স্ত্রী ভাড়া থাকছে কেন?"

"জি সেটাই বলার জন্য ডেকেছি। আসলে আমি একজন সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার। পেশাগত দিক থেকে আমি সর্বদাই লাইফ রিস্কি পর্যায়ে থাকি। এই পর্যায়ে নিজের পরিবার সাথে রাখা মানে শত্রুদের সুযোগ করে দেয়া। ঠিক এই কারণেই তাকে আমি দুই মাসের জন্য দূরে রাখছি।"

তালহারের কথা শেষ হতেই রুহান ব্যগ্র কণ্ঠে বিরোধ করল।

"আপনি মিথ্যা বলছেন। আমি জানি আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করেছেন। অন্য মেয়ের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে। আর তার কারণে আপনার স্ত্রী ঘর ছেড়েছে।"

তালহারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে তাকালো রুহানের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"আমায় কথা বলার সুযোগ দিন।"

সে পুনরায় বয়স্ক লোকটির দিকে তাকালো। বলল,

"আঙ্কেল তার আর আমার মাঝে ছোট্ট একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। যেটা আমি নিজ উদ্যোগে সলভ করে নেব। আপাতত ও আপনাদের ওখানে থাকবে। আর কবির, যে আপনাদের নিয়ে আসল সে ওর দেখাশোনা করবে। আশাকরি আপনারা কবিরকে কোনোরকম বাঁধা দেবেন না।"

রুহানের বাবা সৌজন্য হেসে ঘন ঘন মাথা নাড়লেন। বললেন,

"কোনো সমস্যা নেই, স্যার। আপনার স্ত্রী একদম নিরাপদেই থাকবে আমার বাড়িতে। আর আমরা তো আছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।"

"ধন্যবাদ আঙ্কেল। দয়াকরে স্যার বলবেন না। আমি আপনার ছেলের মতো।"

রুহানের বাবা প্রগাঢ় হাসলেন। কিন্তু রুহান তখনো বিশ্বাস করতে পারল না তালহারের কথা। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"আপনি কী এখনো সত্যি কথা বলছেন নাকি নাটক করছেন? আপনি পরোকিয়া করছেন আর জোরপূর্বক নিজের স্ত্রীকেও আঁটকে রাখতে চাইছেন তাই তো?"

টেবিলে দুই কনুই ঠেকিয়ে তালহার সংযত মেজাজে রুহানের কঠিন দৃষ্টি দেখল। রুহান ভেবেছিল এখন হয়তো তালহারের আসল রুপ কিছুটা দেখা যাবে। কিন্তু না। বরং লোকটি মৃদু হেসে বলল,

"আমি পরোকিয়া করলে আমার স্ত্রী নিজেই আমায় খুন করে দেবে। আপনার আগ বাড়িয়ে অন্যের বউয়ের এত চিন্তা করতে হবে না। ছোটবেলায় পড়েননি অন্যের সংসারে নাক গলাতে নেই?"

পরপরই রুহানের বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

"আঙ্কেল আপনার ছেলেকে একটু সামলে রাখবেন। ছোটবেলার শিক্ষা ভুলে গিয়েছে। অন্যের স্ত্রীর প্রতি এত আগ্রহ থাকা মোটেই ভালো না।"

সহসা রুহানের বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল। সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখল। রুহান দাঁতে দাঁত চাপল।

তালহার পুনরায় বলল,

"আপনারা কবিরকে মারধোর করেছেন সেটাও একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল।"

রুহানের বাবা বললেন,

"আপনার স্ত্রীর হয়তো বুঝতে কোনো ভুল হয়েছে। আমরা মূলত তার কথাতেই কাজটা করেছিলাম। কারণ আমাদের ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।"

"জি তা অবশ্যই। আপনারা যা করেছেন তা একদম ঠিক ছিল।"

কবির তখুনি কক্ষে ঢুকলো। তালহারের কথায় তার চোয়াল হাঁ হয়ে গেল। যা করেছে ঠিক করেছে? স্যার এটা বলতে পারল?

তালহার তাদের জোরপূর্বক দুধ চা খাইয়েই বিদায় করল।

তারা যেতেই তালহার প্রসন্ন বদনে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। সে কখনোই চায়নি বিন্দুর ওখানে কোনো ঝামেলা করতে। তাই নরমালি বিষয়টাকে হ্যান্ডেল করেছে। এর পরে যদি ওই কোচিং মালিক বাড়বাড়ি করে তবে সেটা অন্য পন্থায় সলভ করা হবে।

তারা যেতেই কবির ভীষণ দুঃখের সাথে বলল,

"স্যার, তারা যা করেছে ঠিক করেছে। এটা আপনি বলতে পারলেন? তারা আমায় রাস্তায় ফেলে ঝাড়ু, জুতা, বেলন দিয়ে পিটিয়েছে। আমার প্যান্ট খুলেও রেখে দিয়েছে।"

কবিরের চেহারা কাঁদো কাঁদো। তালহার ঠোঁটে হাত ঠেকিয়ে নীরবে দেখে তাকে। কিয়ৎকাল বাদ ভীষণ আফসোসের সাথে বলে,

"তুমি কত বড় অথর্ব হলে তোমায় কেউ রাস্তায় ফেলে পেটাতে পারে, কবির? আমি আবার তোমাকে আমার গোটা এক দুনিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে দিয়েছি। আমিও বা কত বড় বোকা। যে নিজের ই খেয়াল রাখতে পারে না সে বিন্দুর কী খেয়াল রাখবে?"

কবিরের নেত্রদ্বয় বৃহৎ আকার ধারণ করলো। সে হনহনিয়ে এগিয়ে এসে বিরোধ করে বলল,

"আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি কিন্তু সেদিন আকস্মিক....

কবিরের কথা কবিরের মুখেই রয়ে গেল। তার আগেই সে ধাড়াম করে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তালহার থুতনি থেকে হাত সরিয়ে টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে সামনে উঁকি দিয়ে তাকালো। কবির মুখ তুলে কাঁদো কাঁদো চোখে তাকালো স্যারের শান্ত মুখপানে। মিনমিনে স্বরে বলে,

"কে যেন মেঝেতে কলার খোসা ফেলে রেখে গিয়েছে স্যার। এই দেখুন। আমার কোনো দোষ নেই।"

বলেই কবির পায়ের নিচ থেকে কলার খোসাটা তুলে দেখালো। তালহারের ধৈর্যের বাঁধ ততক্ষণে ভেঙে যায়। সে রেগে ড্রয়ার খুলে একটা বন্দুক বের করে সেটি তার দিকে তাক করে বলল,

"আমার সামনে আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালে আমি তোমায় সোজা গুলি করে দেব, কবির।"

তালহারের বলতে দেরি আছে কবিরের দৌড় দিতে দেরি নেই। তালহার রেগে বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলল টেবিলে। কবিরকে দিয়ে হবে না এই কাজ। তাকে অন্য কাউকে রাখতে হবে। কিন্তু কবির বিশ্বস্ত! এই একজন-ই আছে যে শুরু থেকে বিন্দুর ব্যাপারে জানে। সে চাইলেই হুটহাট অন্য কারোর উপর ভরসা করতে পারছে না। কী করবে? ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে পড়ল। পুনরায় ফোন দিল কবিরকে। কড়া গলায় বলল,

"কবির, তুমি আমার সাথে আজ পাঁচ বছর যাবৎ আছো। আমি তোমার উপর যতটা ভরসা করি তা আর কারোর উপর করতে পারছি না। আমায় সোজাসাপ্টা বলো, তুমি কী দায়িত্ব সহকারে এই কাজটা করবে নাকি এমন বোকামি করে বেড়াবে?"

কবির উদগ্রীব হয়ে বলল,

"পারব, পারব স্যার। আমি দায়িত্ব সহকারে ম্যাডামের খেয়াল রাখব। নিজের জান দিয়ে দেব কিন্তু ম্যাডামের কিছু হতে দেব ন।"

তালহার ভ্রু ঘষতে ঘষতে মৃদু স্বরে বলল,

"আমি আরো একবার ভরসা করছি তোমার উপর। প্লীজ আমায় নিরাশা করো না, কবির।"

"একদমই না, স্যার। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।"

কবির ওভার কনফিডেন্স নিয়ে বলল। যদিও তার বুকে ভীষণ ভয়। কারণ ম্যাডাম স্যারের থেকেও ভয়ঙ্কর। নিশ্চয়ই চাকরিটা বিপদজনক।

তালহার ফোন রেখে নিজের কাজে মনোযোগ দিল। আজ এগারো দিন পরেও মাহির চৌধুরী কোনো নড়াচড়া করেনি। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না মাহির চৌধুরী দেশে আসছে; ততক্ষণ পর্যন্ত সে প্রমাণ করতে পারবে না, দেশের তেল, খনিজ সম্পদের সঠিক পরিমাণ ঠিক কত আর এর সাথে কতজন জড়িত।

*****

বারোটা নাগাদ বিন্দু তন্ময়দের ব্যাচের ক্লাস করাচ্ছিল। তাদের ব্যাচে মোট পনেরো জন রয়েছে। কিন্তু সে খেয়াল করল আজ সবাই কেমন বিচলিত। কারোর লেকচারে মনোযোগ নেই। একটাসময় বিরক্ত হয়ে সে লেকচার থামিয়ে দিল। গম্ভীর গলায় সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

"কী হয়েছে তোমাদের? একজনেও ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছ না কেন? আগামীকাল এক্সাম সেই খেয়াল আছে?"

সকলের মুখ মলিন আর নত হয়ে গেল। বিন্দু এবার নরম হলো। নম্র স্বরে বলল,

"কোনো সমস্যা হয়েছে? সমস্যা হলে আমায় খুলে বলো। তারপর নাহয় আবার পড়া শুরু করব।"

তন্ময় তার পাশে বসা দু'টো মেয়ের দিকে তাকালো। বিন্দু বুঝে নিলো সমস্যা তাদের মাঝে। সে এগিয়ে গেল। বলল,

"অনু, পল্লবী তোমাদের কোনো সমস্যা হয়েছে? আপুকে বলতে পারো। যদি সামর্থ্য থাকে সাহায্য করব।"

তার কথার মাঝেই নত শির বসে থাকা অনু আকস্মিক ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বিন্দু ভড়কে গেল। সে তড়িৎ তার মাথায় হাত রেখে বলল,

"আরে আরে কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?"

অনু জবাব দিতে পারল না। সে কেঁদেই যাচ্ছে। তন্ময় চিন্তিত মুখে বলল,

"আপু, ও কিছু বলার পরিস্থিতিতে নেই। আমি বলছি।"

তন্ময় দম ফেলল আর অনুর দিকে এক পলক চেয়ে বলল,

"আপু, আমাদের ডিপার্টমেন্টের হেড জুলফিকার স্যার আছেন। সে আমাদের জৈব রসায়ন এর লেকচারার। কিন্তু সে একজন চরিত্রহীন ব্যক্তি। তার দ্বারা আমাদের কলেজের অনেক মেয়েরা নির্যাতিত হয়েছে, ব্লাকমেইল হয়েছে। অনেকদিন যাবত তার চোখ অনুর উপর পড়েছে। অনুকে একের পর এক বাজে প্রস্তাব দিচ্ছে। সেদিন জোরপূর্বক ওকে একটা ক্লাসে আঁটকে রাখে ফেইল করিয়ে দেবে এই ভয় দেখিয়ে। আর সেখানে...."

তন্ময়ের কণ্ঠ আড়ষ্টতায় জড়িয়ে আসে। বিন্দুর মাথা হ্যাং হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সে কঠিন স্বরে বলল,

"আপুকে সবটা বলো তন্ময়। আমি তোমাদের বড় বোনের মতো।"

তন্ময় নত শির বলল,

"সেখানে ওর সাথে ভীষণ অশালীন আচরণ করার চেষ্টা করে এবং সেগুলো ভিডিও করে রাখে। দু'দিন ধরে ওই লম্পট বলছে, আজ রাতে যদি ও তার বাসায় না যায় তবে ওকে আগামীকাল মিড পরীক্ষায় বসতে দেবে না। এমনকি এই ইয়ার ও কী করে পার করবে তাও দেখে নেবে বলেছে।"

সে ভীষণ আক্ষেপ জড়িত কণ্ঠে বলল,

"ও ভয়ে আর লজ্জায় এতদিন কাউকে কিছু বলেনি। আমাদের আগে বললে আমরাই এতদিনে কোনো ব্যবস্থা করতাম। ও এই কথা আমাদের একটু আগে জানালো। এই মুহূর্তে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।"

অনু কেঁদেই যাচ্ছে। সে তাদের ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সুন্দরী এক মেয়ে। আর এটাই যেন তার কাল হয়ে দাঁড়ালো। বিন্দুর অন্তঃস্থল ঘৃণায় বিষিয়ে আসল। একজন শিক্ষক যে কি-না একটি জাতির মেরুদণ্ড। সে কী করে এতটা নিচ, নোংরা হতে পারে!

রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। সে বই রেখে দিল। অনুর মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বলল,

"এই বোকা মেয়ে! এর জন্য এমন মাথা নিচু করে কাঁদবে? এখানে তুমি কী কোনো ভুল করেছ? তবে কেন সবার থেকে সবটা লুকিয়েছো?"

অনু কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আমি কী করে এটা কাউকে বলব এই সাহস ই আমি জোগাতে পারছিলাম না, আপু। আমি বাবাকে কী করে এই কথা বলব? আমি এখন কী করব? স্যারের থেকে কী করে নিস্তার পাবো? সে আমায় মোটেও ছেঁড়ে কথা বলবে না। সে বলেছে, আমি যদি তার কথা কাউকে জানাই তবে ওই ভিডিও সে লিক করে দেবে।"

বিন্দু তার মাথায় হাত রেখে বলল,

"তুমি কী জানো ম্যাথ যত কঠিন তার সমাধান ঠিক ততটাই সহজ হয়? আমাদের জীবনের সমস্যাগুলোও এমনি। যত কঠিন সমস্যা, তত সহজ সমাধান ও রয়েছে। আমায় একটু সময় দাও, আপু তোমার সমস্যা সমাধান করে দেব। আর কালকে তুমি পরীক্ষাও দেবে।"

সকলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিন্দু তৎক্ষণাৎ ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসল। ফোনটা বের করে বুকভরা শ্বাস নিলো। আর এদিক ওদিক না ভেবে সোজা ফোন দিল তালহারকে।

তালহার মেহমেদ আর একজন অফিসারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ছিল নিজ কামরায়। বাম পকেটে থাকা ব্যক্তিগত ফোনটা ভাইব্রেট হলে সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে তা বের করে কানে ঠেকালো। নিশ্চয়ই কবির। হয়তো আবার কোনো ঝামেলা বাঁধিয়েছে।

কিন্তু কণ্ঠ শুনতেই তার ব্যস্ততা মিলিয়ে গেল।

"তালহার।"

অতি পরিচিত কণ্ঠটি শুনে তালহার ফোনটা এনে মুখের সামনে ধরলো। স্ক্রিনে ভেসে থাকা বি টি এম দেখেই তার পেশাগত ভাবভঙ্গি শিথিল হয়ে আসল।

অপরপ্রান্ত থেকে আবার ডাক আসল।

"তালহার?"

তালহার ফোন কানে ঠেকালো। চাপা স্বরে জবাব দিল,

“বলুন, মহামান্য।”

“ফ্রি আছেন?’

“আপনার জন্য অলওয়েজ।”

বিন্দুর থমথমে মুখে তাচ্ছিল্য দেখা গেল। বলল,

“তালহার মুজাহিদ আবার কবে থেকে ফ্লার্টিং করতে শুরু করল?”

“যখন থেকে তার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটে লাল দাগ পড়েছে।”

“যেই দাগ সে নিজে বসিয়েছে।”

“ওই প্রসঙ্গে না যাই মহামান্য। কী প্রয়োজন তাই বলুন।”

“আমার একটা সাহায্যের প্রয়োজন।”

“জি, সেটাই শুনতে চাইছি।”

বিন্দু অনুর ব্যাপারে সব খুলে বলল। মিহি স্বরে বলল,

“সে আমার খুব কাছের মানুষ। বিপদে পড়েছে। এক ঘন্টার মাঝে সমস্যাটার সমাধান করে দিতে হবে। আগামীকাল ওর পরীক্ষা। ওকে বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতে হবে। আমি কী আশা করতে পারি যে ইন্টেলিজেন্স অফিসার তালহার মুজাহিদ এক ঘন্টার মাঝে এই সমস্যার সমাধান করে দেবে?”

তালহারের ঠোঁটের কোনে উপহাসের হাসি ফুটে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

“আশা করতেই পারেন এবং হয়েও যাবে।”

“ধন্যবাদ।”

বলেই বিন্দু ফোন কাটতে গেল কিন্তু তালহার বাঁধ সাধলো। পেশাগত কণ্ঠে বলল,

“আমার এক ঘন্টার ফিসের ব্যপারটা কী এখন আলোচনা করব না-কি পরে?”

বিন্দুর মুখ থেকে প্রসন্নতার মিলিয়ে গিয়ে গাম্ভীর্যতা নেমে এলো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"তলহার।”

তালহার নিরুদ্বেগ একরোখা কণ্ঠে বলল,

“আমি ফিস ছাড়া কাজ করি না।”

বিন্দু দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দমন করে।

“আচ্ছা ঠিক আছে। এক ঘন্টার জন্য কত টাকা ফিস দিতে হবে আপনাকে?”

“পঁচিশ হাজার।”

“তালহার, সিরিয়াসলি? এটা অনেক টাকা। আপনি কী আমার সাথে মজা করছেন?”

বিন্দু রাগান্বিত স্বরে বলল। তালহার কপাল কুঁচকে বলল,

“আর্থিক সমস্যা থাকলে সেটা অন্য বিষয়, মহামান্য। কিন্তু আমি আপনার সাথে মজা করব কেন? আপনি টাকা দিতে পারবেন কি-না সেটা বিবেচ্য বিষয়।

“আমি এত টাকা এখন কোথায় পাবো?”

তালহারের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। মিহি স্বরে বলল,

“চাইলে বিকল্প উপায় দেয়া হবে। অন্যভাবেও ফিসটা দিতে পারবেন”

“কীভাবে?”

“এসে বলছি।”

“কখন আসছেন?”

“জ্যাম থাকলে এক ঘন্টা, না থাকলে আধা ঘন্টা।”

“ওকে।”

“আর শুনুন।”

“জি বলুন।”, বিন্দু অনাগ্রহে শুধালো। তালহার গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি এডভান্স ছাড়া কাজ করি না কিন্তু।”

বিন্দুর চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। বলল,

“আচ্ছা।”

“গুড।”

তালহার মুচকি মুচকি হেসে ফোনটা রেখে সামনে তাকাতেই তৎক্ষণাৎ তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। পেশাগত গাম্ভীর্যতা হুড়মুড়িয়ে আঁছড়ে পড়ল। মেহমেদ আর অন্য একজন অফিসার হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তালহার থতমত খাওয়া চোখে চেয়ে গলা খাঁকারি দিল। থমথমে মুখে বলল,

“কী সমস্যা?”

মেহমেদ আর অফিসারটি ঘন ঘন না বোধক মাথা নেড়ে ভাবভঙ্গি শিথিল করে নিলেন। তারা স্যারের মুখে এমন স্নিগ্ধ হাসি খুব কমই দেখেছে। নিশ্চয়ই মিস মেঘ!

~চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন