ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোড়া পাতা দিনলিপি

২০তম পর্ব

লেখক: তেনিমা খান

#জোড়া_পাতার_দিনলিপি

#তোনিমা_খান

#অন্তিম_পর্বঃ(প্রথমাংশ & শেষাংশ)

সাঈদার মুখশ্রী অতিরিক্ত রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করল। হুঙ্কার ছেড়ে বলল,

'আমি শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি নার্গিস, ফাতিমা কোথায়?'

পাথরের মতো নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা নার্গিস এতক্ষণে তার মৃতপ্রায় চাহনি তুলল। ক্লান্ত স্বরে বলল,

'জান্নাতের পবিত্র প্রজাপতিটাকে এই জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি, আম্মি।'

সহসা সর্বশক্তির একটা চড় পড়ল নার্গিসের বাম গালে। মেয়েটি মুখ থুবড়ে পড়ল সোফায়। তবুও তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সাঈদা চেঁচিয়ে উঠে বলল,

'কিসের পবিত্র? কিসের জান্নাতের পাখি? ওর জন্মই হয়েছে অপবিত্রতার সাথে! এই অপবিত্রতাই ওর জীবন, নার্গিস। তুমি আমার নাতনিকে অপরিচিত কারো হাতে তুলে দেওয়ার দুঃসাহস কী করে করলে? তোমার পরে ফাতিমা আমাদের খানদানের সবচেয়ে সুন্দর বাচ্চা। কয়েক বছরের মাথায় ও আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান খাজানায় পরিণত হতো! আমাদের ব্যবসা কোথা থেকে কোথায় যেত, তোমার কোনো ধারণা আছে?'

নার্গিস তার রক্তবর্ণ নেত্র তুলে তাকায়। চোয়াল শক্ত করে বলল,

'আম্মি, ও আমার ছোট্ট একটা মেয়ে। এত নোংরা, নিকৃষ্ট চিন্তা ওকে নিয়ে করবেন না। আপনার মধ্যে কি একটুও দয়া নেই? আপনি জানেন, নেশাগ্রস্ত পুরুষের এক-একটা কামুক স্পর্শ কতটা যন্ত্রণাদায়ক? টাকার বিনিময়ে তারা আমাদের সাথে জড়বস্তুর মতো আচরণ করে! মনে হয় কেউ দেহ থেকে মাংস খুবলে খুবলে খাচ্ছে! আমি মা হয়ে কীভাবে আমার ছোট্ট ফাতিমাকে ওই নরকে ঠেলে দিতে পারি? আমি তো আর জয়নব সাঈদা নই—যে কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী ছিল, কিন্তু কখনোই মা হতে পারেনি। যে নিজের ব্যবসার জন্য ছোটবেলা থেকে তার মেয়ের শৈশব, কৈশোর আর স্বাভাবিক জীবনকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে!

আমি জয়নব নার্গিস! আমি একটা দুর্বল মা, আম্মি।

আমি আমার সন্তানকে সেই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে দেখতে পারব না, যেখান দিয়ে আমি গেছি। আমার পালানোর কোনো উপায় ছিল না, কিন্তু আমার মেয়ের কাছে উপায় এসেছে। আল্লাহ তায়ালার লাখ লাখ শুকরিয়া! আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় বহুবছর ধরে ছিলাম, আম্মি। আমি বহু আগেই শেষ হয়ে গেছি, কিন্তু আমার মেয়েটাকে শেষ হতে দিতে পারি না। ওর মা যা পায়নি, ও তা পাবে। আমি জানি, ও মা-বাবার ভালোবাসা পাবে। আর দশটা মেয়ের মতো পবিত্র, নিরাপদ জীবন পাবে। বিন্দুর চোখে আমি মাতৃত্বের জেদ দেখেছি, ও আমাকে কখনো নিরাশ করবে না।'

নার্গিসের চোখ বেয়ে অবাধে অশ্রু গড়াচ্ছে। বিগত সাতাশ বছরে সাঈদা এই প্রথম এমন ভাঙা নার্গিসকে দেখছে। সে চোয়াল শক্ত করে বলল,

'আমি তোকে অনেক আগেই সাবধান করেছিলাম। ভালোবাসা, স্বামী, সংসার আমাদের জন্য নয়! কিন্তু তুই সেই ভুলটাই করলি। নিজেকে শেষ করে ফেললি! তোকে দেখতে এখন একটা দুর্বল, ন্যাকা মেয়ে লাগছে, নার্গিস। সেই বিশ বছরের তেজি নার্গিস হারিয়ে গেছে, যে আমার কাঁধের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।'

'সেই নার্গিস অন্ধ ছিল, আম্মি। সে জানত না ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোবাসা কিংবা মাতৃত্ব কী জিনিস! তাকে তার মা ওই নোংরা জীবনে অভ্যস্ত করেছিল, যেখানে মায়ের ভালোবাসাও ছিল না। কিন্তু আমি যখন ভালোবাসা কাকে বলে চিনলাম, তখন সব শেষ। আমি ভালোবাসা চিনেছি ভুল মানুষের হাত ধরে। আমি আর দশটা মেয়ের মতো সাধারণ জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলাম একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে। তাই এই বিদঘুটে জীবন আমার প্রাপ্য! কিন্তু ফাতিমার তো কোনো দোষ নেই, আম্মি। আমি শুধু ওকে আমার ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে রাখতে চেয়েছিলাম; কখনোই এই জাহান্নামের মালকিন বানাতে চাইনি। ওকে ছেড়ে দিন, আম্মি!'

সাঈদা তেড়ে এসে তার চোয়াল চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বলল,

'আমি তোকে জানে মেরে ফেলব যদি ফাতিমাকে খুঁজে না পাই, নার্গিস!'

নার্গিস মলিন হেসে বলল,

'মেরে ফেলুন, আম্মি। এমনিতেও আমার বাঁচার সব কারণ ফুরিয়ে গেছে। আপনি মেরে ফেললে আমার জীবনের এই দুঃসহ ভারটা কমত! এই জীবন অনেক ভারী, আম্মি। মেরে দিন না!'

নার্গিস মৃত্যুর জন্য আকুতি জানাচ্ছে তার মায়ের কাছে। কী করুণ দৃশ্য! কিন্তু সাঈদা নামক নারীর মনে বিন্দুমাত্র দয়া জাগল না। কারণ সে প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যবসায়ী, কখনোই মা হতে পারেনি। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

'টাকার বিনিময়ে ভোগ করা খদ্দেরের প্রেমে পড়া এক বোকা মেয়ে তুই! ভীষণ বোকা! সুপ্ত তোকে কোনোদিন ভালোবাসা বা সম্মান দেয়নি, দেবেও না। শুধু শুধু নিজের জীবনটা ধ্বংস করলি।'

নার্গিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। মা কি জানে, সে কখনোই সুপ্তর কাছে ভালোবাসা বা সম্মান চায়নি? সে তো কেবল তার প্রিয় মানুষটির একটু দেখা পাওয়াতেই সন্তুষ্ট ছিল। অথচ সৃষ্টিকর্তা সেটুকুও কেড়ে নিলেন। তার কাছে হারানোর আর কিছুই নেই, তাই আজ তার মনে কোনো ভয়ও নেই।

সাঈদা পুনরায় বলল,

'আমার ফাতিমাকে চাই! এই হুরশালার পরবর্তী মালকিন ফাতিমাই হবে। ওরা কোথায় গেছে, তাড়াতাড়ি বল!'

'কোনোদিন না! আপনি আমাকে মেরে ফেলুন, আম্মি। কিন্তু এই মুখ থেকে কোনোদিন বের হবে না ওরা কোথায় গেছে।'

সাঈদা রাগ সামলাতে না পেরে সপাটে আরও একটা চড় বসিয়ে দিল। চেঁচিয়ে বলল,

'একটা বোকা, বুদ্ধিহীন মেয়ে তুই! কী করে নিজের মেয়েকে অচেনা কারো হাতে তুলে দিতে পারলি? আবার নিজেকে ভালো মা বলে দাবি করিস?'

'আমার মতো নিকৃষ্ট মা এই জগতে আর একটাও নেই। এটা আমি বিশ্বাস করি, আম্মি। তাই তো ফাতিমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি।'

সাঈদা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তড়িঘড়ি নিজের ফোনের দিকে ছুটল। কিন্তু নার্গিসের পরবর্তী কথায় তার পা দুটো স্থির হয়ে গেল।

'আর একটা কথা শুনে রাখুন। আজকের পর থেকে আমি নিজেকে আপনার ব্যবসার কোনো উপকরণ বানাব না। আমি আপনার মতো করেই এই ব্যবসার দেখভাল করব, কিন্তু কখনোই নিজের গায়ে আর কারো স্পর্শ লাগতে দেব না। এটা মাথায় ঢুকিয়ে নিন।'

সাঈদা হতভম্ব হয়ে বলল,

'মানে?'

'আমি আপনার ব্যবসায় আর নিজেকে বিলিয়ে দেব না।'

'তুই জানিস তুই আমার সবচেয়ে মূল্যবান খাজানা? এই সাঈদার খাতির যদি এখনো বাজারে থাকে, তা তোর সৌন্দর্যের জন্য! এখানে আসা পাঁচটা খদ্দেরের মধ্যে চারজনের চাহিদা থাকে তুই।'

নার্গিস মায়ের দিকে শ্রান্ত দৃষ্টি ফেলল। ছোটবেলায় বইয়ে মাতৃত্বের কত মহৎ বাণী পড়েছিল, কিন্তু বাস্তব রূপটা কত ঘৃণ্য! তার মা কখনো তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেনি, আদর করেনি, নিজ হাতে খাইয়ে দেয়নি কিংবা ঘুম পাড়ায়নি। সে জানেই না মায়েরা কেমন হয়। কোথায় সেই মহৎ মাতৃত্বের বাণী? কোথায় পাওয়া যায় অমন মা? হয়তো কেবল বিন্দুর মাঝেই পাওয়া যাবে মাতৃত্বের সেই রূপ!

তার নীরব অশ্রু আগের মতোই গড়িয়ে পড়ছে। আজ তার নিজের ওপরই করুণা হচ্ছে—একজন ব্যর্থ মায়ের সন্তান হয়ে জন্ম নেওয়ার জন্য, আর নিজে একজন ব্যর্থ মা হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য।

সে ক্ষীণ স্বরে বলল,

'এই দেহে যদি আর একটাও স্পর্শ লাগে, তবে সেদিন আপনি আমার লাশ দেখবেন, আম্মি। এখন সিদ্ধান্ত আপনার!'

বাকরুদ্ধ সাঈদা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল কেবল। তবে সে মা হিসেবে যতটা ব্যর্থ, ব্যবসায়ী হিসেবে ততটাই চতুর। সে ক্ষণিকের জন্য এই বোকা মেয়েটিকে উপেক্ষা করল; ওকে পরে সামলানো যাবে, কিন্তু এখন তার ফাতিমাকে চাই।

সে দ্রুত নিজের ফোন হাতে নিল। কাকে যেন ফোন দিয়ে তড়িঘড়ি বলল,

'নেয়ামত, ওই খদ্দেরের পরিচয় বলো তো, যে আজ বাড়িতে এসেছিল? সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে—সব বলো।'

নেয়ামত তার খাতা ঘেঁটে বলল,

মালকিন, ওনার নাম মোমিন খান। বাড়ি নেপাল বলেছিলেন। আর ফিরেও যাবেন নেপাল। এমনটাই বলেছিলেন। কিন্তু কী হয়েছে? আমার জানামতে তো আজ বিকালেই তার মাল নিয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। সে কী আসেনি?

হতবাট সাঈদা কথা হারিয়ে ফেলল।

'নেপাল? ওরা আমার নাতনিকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছে, নেয়ামত। তাদের খোঁজ লাগাও, পুলিশে খবর দাও। যত টাকা লাগে দাও। সব লোক লাগিয়ে দাও। তারা হয়তো এখনো বেশি দূরে যেতে পারেনি। আমার নাতনি যেন এই দেশের বাইরে না যেতে পারে।'

নেয়ামত হতভম্ব হয়ে গেল। তারা দ্রুত কাজে লেগে পড়ল। সাঈদা ফোন রেখে তড়িঘড়ি করে ছুটলো নিজের পরিচিত প্রভবশালী লোকদের কাছে। তার অনেক ক্ষমতাধর ব্যাক সাপোর্ট রয়েছে। যাদের হুরশালায় নিয়মিত আনাগোনা থাকে! তখন রাত আটটা বাজে। হুরশালা থেকে তার ফিরতে অনেক বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি তার মূল্য এত বাজেভাবে দিতে হবে তাকে।

নার্গিসের মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। বিড়বিড় করে বলল,

'আপনি ফাতিমাকে কোনোদিন খুঁজে পাবেন না, আম্মি। আমি আমার মায়ের কাছে হেরে গেলেও আমার মেয়ে আমার কাছে হারবে না। আমার মেয়ে অপবিত্রতার সাথে জন্ম নিলেও সে গড়ে উঠবে পবিত্রতার সাথে। আমি জানি, বিন্দু তার সব অপবিত্রতাকে মুছে ফেলে পবিত্রতায় পরিণত করে দেবে।'

সে দূর্বল দেহে উঠে দাঁড়ায়। ধীর কদমে পা বাড়ায় দোতালার দিকে। তার মাথার ওড়নাটা তখন হাতের মুঠোয়। যেটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আজ সে একজন সর্বহারা নারী ছাড়া কিছুই না। যার কিছু না থেকেও সব ছিল। কিন্তু আজ তার আর কিছুই নেই।

দূরে দেয়ালের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শাহিন বেশ আনন্দের সাথে উপভোগ করল মা-মেয়ের লড়াই। এখন দেখার পালা কে জিতে।

পা টেনে টেনে বহুকষ্টে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল নার্গিস। সে পুরো ঘরময় চোখ বুলায়। এই ঘরে কিছুক্ষণ পূর্বে একটা সুখ ছিল। এখন আর নেই। শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে। নার্গিস ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে কাবার্ড খুললো। একদম উপরের সুন্দর করে প্যাকেটের ভেতর সাজিয়ে রাখা দু'টো পোশাক নামালো। পোশাক দুটো ছুঁতেই নার্গিসের চোখ আবারো ভিজতে লাগল।

সে পোশাক দুটো বুকে চেপে ধরে সে কাবার্ড ঘেঁষে মেঝেতে বসে পড়ল। একটা ফাতিমার জন্মের পর পরা প্রথম পোশাক আর একটা সুপ্তর ফেলে যাওয়া শার্ট প্যান্ট। এইটুকুই তার সম্বল। সে পোশাক দুটো ছুঁয়ে দিতে লাগল মন ভরে। যেন বুকের ভেতর যন্ত্রণা কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তার দুঃখের যে কোনো শেষ নেই। সে নিজের দুঃখের কোনো অন্ত খুঁজে না পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

পোশাক দুটোতে অজস্র চুম্বন করতে করতে আর্তনাদের সুরে বললল,

'আমার দুঃখের তো কোনো কমতি ছিল না

তবে কেন আপনি আবার নতুন দুঃখ হয়ে আমার জীবনে আসলেন? চিরচেনা সেই নিকৃষ্ট নার্গিসকে আপনি দূর্বল বানিয়ে দিয়েছেন। যেই নার্গিস খুন করতেও দু'বার ভাবত না সেই নার্গিস আপনার সামান্য অস্তিত্বকেও কখনো মুছে ফেলতে পারেনি। তবে আপনার অংশকে কী করে মেরে ফেলত?'

তার চোখের সামিয়ানায় আজও জীবন্ত দুঃখের সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়ের দিনটি।

জীবদ্দশায় কাশ্মীরই একটি জায়গা যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহে সুপ্ত অন্ধ! ছুটি পেলেই এখানে আসা তার অভ্যাস!

সে কাশ্মীরে এসেছে আজ চারদিন। কিন্তু সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো সে সাথে করে কোনো গার্লফ্রেন্ড আনেনি। সে এতটাই জালিম ছিল যে কি-না নিজেকে ভুলতে পারবে কিন্তু নারী সঙ্গকে ভুলতে পারবে না। নারী ছাড়া সে তার দিনকে কল্পনা করতে পারে না। চারদিন সে দাঁতে দাঁত চেপে থাকলেও পঞ্চম দিন নিষিদ্ধ ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছাল।

কাঠের একটি দোচালা বিশালাকৃতির রাজকীয় ঘর। যার কোনায় কোনায় হস্তশিল্পের নিখুঁত কাজ বাড়িটির আভিজাত্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের সবুজ ঢালের মাঝে কাঠের সেই ঘরটি অপার্থিব সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সুন্দর বাড়িটির ভেতরে ঠিক ততটাই কুৎসিত গল্পের সূচনা হতো! সুপ্ত বাঁকা হেসে নিজের খাস এসিটের দিকে তাকালো। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

'তোমার কী মনে হয়, এই জায়গাটা আমার জন্য পারফেক্ট?'

ছাই রঙা সালোয়ার-স্যুট পরিহিত লোকটি চাপা স্বরে বলল,

'কাঠের ঘর দেখে অসন্তুষ্ট হবেন না সাহেব। এই কাঠের ঘরের আড়ালেই খাজানা লুকানো আছে। একবার খুঁজে পেলে এর থেকে পারফেক্ট জায়গা আপনি আর চাইবেন না।'

'খুঁজতে হবে কেন?'

'কারণ আমি যেই খাজানার কথা বলছি, তা এই হুরখানার মালকিনের একমাত্র মেয়ে। দেখতে ঠিক যেন জান্নাত থেকে নেমে আসা কোনো হুর! সহজে কেউ তার দেখা পায় না। হাতের নাগালে পাওয়া তো দূরের কথা।'

সুপ্তর ললাটে ভাঁজ পড়ল। তার দেখা মেয়েদের থেকেও সুন্দর মেয়ে আছে নাকি? সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

'তবে তুমি দেখলে কী করে?'

'আমি দেখিনি সাহেব। তবে তার রূপের অনেক চর্চা শুনেছি নামকরা খদ্দেরদের মুখে। খুব কম মানুষই তাকে হাতের নাগালে পেয়েছে। আর যারা একবার পেয়েছে, তারা কখনোই ভুলতে পারেনি সেই রূপ।'

'হয়েছে, এত বাড়িয়ে বলতে হবে না। আমি কম সুন্দরী মেয়ে দেখিনি। পরে যদি তোমার বর্ণনার সাথে না মেলে, তখন আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে,' সুপ্ত বিরক্তি নিয়ে বলল।

'না না সাহেব, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তবে চিন্তার বিষয় হলো, আপনি তাকে দেখতে পারবেন কি না! তাকে তো যে-সে গ্রাহকের সামনে আনা হয় না।'

'আমি কোন লেভেলের গ্রাহক তা তুমি এখনো বোঝোনি, সালেহ। এখন বকবক না করে ভেতরে চলো।'

'দুঃখিত সাহেব। এই গেটের ওপারে আমি যেতে পারব না। এই গেটের ওপারে শুধু গ্রাহক আর খদ্দেররাই যেতে পারে। আমার তো এত সাধ্য নেই যে কাড়ি কাড়ি টাকা গুনে ভেতরে ঢুকতে পারব।' তার কণ্ঠে বেশ আফসোস ছিল। সে চিরাচরিত সেই সকল পুরুষদের মধ্যেই পড়ে যাদের বিশ্বসুন্দরী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এই নোংরা গলিতে ঢোকার স্বপ্ন দেখে।

'আচ্ছা।'

সুপ্ত খানিক অধৈর্য ভঙ্গিতে কোমরসম লোহার গেট খুলে ভেতরে ঢুকে গেল। দোচালা বাড়িটির পাশে আরও একটা ছোট কাঠের ঘর রয়েছে। সে চারপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে এগোতে লাগল। কিন্তু আচানক তার পা দুটো থেমে গেল। সবুজ দোদুল্যমান সতেজ ঘাসের মাথা মুচড়ে দেয়া বুটজোড়া ভীষণ সতর্কতার সাথে দুই পা পিছিয়ে এলো। সে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো মূল বাড়িটির পাশের ছোট্ট বাড়িটির দিকে। খোলা দরজার ওপারে তাকাতেই দারুচিনি রঙা সরু চোখ দুটো আটকে গেল। সালেহের কথা অনুযায়ী যে সৌন্দর্যের সহজে দেখা পাওয়া যায় না, সেই সৌন্দর্যের দেখা খুব সহজেই পেয়ে গেল সুপ্ত। অবশ্য তার নিজের ভাগ্য আর রূপও ছিল এমনই বিরল।

একঝাঁক লালচে পাকা আপেলের ঝুড়ির মাঝে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির এক ঝলক দেখেই সুপ্তর চোয়াল ঝুলে পড়ল।

সাদা ধবধবে শারারা, হাঁটুর উপর অব্দি থলথল করতে থাকা ফ্রকে লতানো দেহের আকর্ষণীয় বাঁক স্পষ্ট, গলায় ফেলে রাখা একটা ওড়না, মাথার একঝাঁক চুল সাদা বান্দানা দিয়ে বেঁধে রাখা।

সে দেখতে কোনো অস্বাভাবিক নারী ছিল না, কিংবা সালেহ এর বলা, জান্নাত থেকে নেমে আসা কোনো হুর ও ছিল না। সে একটা সাধারণ নারী ছিল। কিন্তু তার সৌন্দর্য তথাকথিত এই সকল সৌন্দর্যের বর্ণনা কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সুপ্ত ভুলে বসল নারীটির সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা। দূর থেকে মনে হচ্ছে মেয়েটির গায়ে মাখন রঙা মখমালের এক চাদর বিছিয়ে রাখা। সুপ্ত নিজের উপর জোর খাটালো। কিন্তু কোনোভাবেই সে ওই সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা দিতে পারছিল না।

দেখতে দেখতেই আচমকাই নারীটি দরজার বাইরে তাকালো। দারুচিনি রঙা চোখদুটোতে আঁটকে গেল নারীটির কালো কুচকুচে চোখের মনি। সময় এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলেও, পর মুহুর্তেই নারীটি এক ঝটকায় গায়ের ওড়না দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললো। এবং খুব সাবধানে তার চোখের আড়াল হয়ে গেল। মোহগ্রস্ত সুপ্তর থমকানো চিত্ত আচমকাই দুলে উঠল গা দোলানো হাসিতে। তার উচ্চস্বরের হাসি বাঁকা হাসিতে পরিণত হলো। সে আড়চোখে তাকাতে তাকাতেই দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে অলস কদমে বাড়িটির ভেতরে ঢুকে গেল। তার এখন একটাই লক্ষ্য, ওই আড়ালে লুকিয়ে পড়া সৌন্দর্যটিকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে আনা।

বসার ঘরে থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে, কারণ একের পর এক মেয়েকে ফেরত পাঠাচ্ছে সুপ্ত। সাঈদা সরু চোখে তাকে পরখ করে গম্ভীর গলায় বলল,

'আপনি কী চাইছেন, তা বোধহয় আপনি নিজেই জানেন না, সাহেব। এত সুন্দরী মেয়েদেরও যদি পছন্দ না হয়, তবে অন্য কোথাও দেখতে পারেন।'

সুপ্ত মৃদু হেসে বলল,

'আমি যা খুঁজছি, তা আপনার কাছেই আছে। শুধু আপনি বের করছেন না।'

'কী বলতে চাইছেন?'

'সাদা শারারা পরা একটা মেয়ে ছিল বাইরের ঘরে। আমার তাকে চাই।'

সাঈদার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে আজ সারাদিন বাড়িতে ছিল না, ফিরেছে এই শেষ বিকেলে। সে তার গৃহপরিচারিকার দিকে তাকাল, যার চোখ ততক্ষণে ছানাবড়া! সাঈদা জিজ্ঞেস করল,

'সাদা শারারা কে পরেছে?'

পরিচারিকা ভয়ে ভয়ে চাপা স্বরে বলল,

'আ...আম্মা, ওটা নার্গিস বিবি!'

সাঈদার কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চতুর হাসি। সে তাচ্ছিল্য করে বলল,

'সাহেব, আপনি তো মূল খাজানায় চোখ দিয়েছেন! কিন্তু তার মূল্য দেওয়ার সাধ্য সবার হয় না।'

কথা শেষ হতে না হতেই টেবিলের ওপর তিন বান্ডিল টাকা রাখল সুপ্ত। থমথমে মুখে বলল,

'আরও লাগবে?'

সাঈদা মৃদু হকচকালো এত টাকা দেখে। ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,

'প্রয়োজনের অধিক হয়েছে বোধহয়!'

সুপ্তর মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে আয়েশ করে বসে বলল,

'রাখুন। অমন সৌন্দর্যের জন্য এতটুকু কেন এর থেকেও অধিক দেয়া যায়।'

সাঈদার মুখে প্রসন্নতার আভাস দেখাগেল। সে গৃহপরিচারিকাকে ইশারা করল সুপ্তকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেদিন থেকেই সুপ্ত সাঈদার খাস খদ্দের হয়ে উঠল।

দরজা খুলে কেউ প্রবেশ করতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নার্গিস ফিরে তাকাল। বিকেলের লোকটিকে দেখে সে মৃদু থমকাল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হালকা হেসে বলল,

'এখন কোথায় লুকাবেন, নার্গিস?'

নার্গিস চোখের পলক ফেললো। দাম্ভিকতার সাথে বলল,

'আমি কখনো লুকাইনা। শুধু সবার আমাকে দেখার ভাগ্য হয়না।'

'তবে আমি নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান!'

সুপ্ত বাঁকা হেসে আওড়ালো।

নার্গিস কোনো উত্তর দেয়নি। সেটাই ছিল তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, রাত পার হয়ে গেলেও সুপ্ত তাকে একবার ও স্পর্শ করেনি! পুরো রাত কেবল অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে গল্প করেছিল। যে গল্পগুলো বারবার এসে থামত একটিমাত্র বাক্যে,

'আমি আপনার মতো সুন্দরী নারী কখনো দেখিনি, নার্গিস। আমি আমার ধ্যানজ্ঞান খুইয়ে বসছি।'

সে পুরো দু'দিন নার্গিসের সাথে থেকেছিল। এবং দু'দিন বাদ সাঈদার থেকে অনুমতি নিয়ে সে নার্গিসের সাথে পুরো কাশ্মীর ঘুরেছিল। ওই প্রথম নার্গিস অনুভব করেছিল মুক্তির স্বাদ কেমন হয়। আর সুপ্তর সাথে প্রতিটা কদম চলার পথে সে একটু একটু করে চিনেছিল জগতে টাকার বাইরেও মূল্যবান কিছু আছে। আর সেটা হলো ছোট্ট জীবনে ভালোবাসা এবং একজন জীবনসঙ্গী থাকা অনেক সৌভাগ্যের বিষয়।

এরপর থেকে সুপ্ত যতবার কাশ্মীরে এসেছে ততবারই মোটা অংকের বিনিময়ে তাকে বেছে নিয়েছে। পুরোটা অবসর সে নার্গিসের সাথেই কাটাতো। এভাবে তিন বছর কেটে যায়। নার্গিস তখন পুরোদস্তুর একজন মারিজ এ ইশক-ভালোবাসার রোগী!

পাঁচ বছর আগের কথা। মায়ের পর বংশানুক্রমে এই বিশাল ব্যবসার দায়িত্ব নার্গিসই সামলাত। কিন্তু ফাতিমা যখন তার গর্ভে এল, তখন থেকেই জীবনটা বদলাতে শুরু করল।

ফাতিমা গর্ভে আসার পর সুপ্ত একবার কাশ্মীরে এসেছিল। তখন নার্গিস ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

'যদি আপনার কোনো অংশ আমার গর্ভে চলে আসে তবে কী করবেন?'

সুপ্ত সেদিন কিছুটা ভড়কে গেলেও, পরমুহূর্তে উদাসীনভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল,

'আমার কাজ টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জন নেওয়া।‌ এরপর কী হলো, সেই দায়ভার আমার নয়।'

নার্গিসের চোখের ওপর থেকে সেদিন ভালোবাসার রঙিন চশমাটা খুলে গিয়েছিল। মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো, তাদের জন্য ভালোবাসা বা সম্মান তৈরি হয়নি। কিছুদিনের জন্য পথভ্রষ্ট হলেও নার্গিস আবার মায়ের নিয়মে ফিরে এল। এরপর সে আর কখনোই সুপ্তর কাছে নিজের সন্তানের কথা তোলেনি।

তবে সে সেই সন্তানকে নষ্টও করতে পারেনি। তাদের সমাজে সন্তান ধারণ করা নিষেধ ছিল, তাই বাচ্চাটিকে জন্ম দেওয়ার জন্য তাকে মায়ের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আম্মি কখনোই এই বাচ্চাকে আলো দেখতে দিত না, কিন্তু সে তার ভালোবাসার চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়নি। ভালোবাসার মানুষ না পাক অন্তত ভালোবাসার মানুষটির অংশ তো সে নিজের কাছে রেখে দিতে পারবে! এটাই তার কাছে সৌভাগ্যের বিষয় ছিল।

তাই সে লড়াই করেছিল ফাতিমাকে জন্ম দেয়ার জন্য। এবং দীর্ঘ নয় মাসের লড়াই শেষে সে সফল হলো ফাতিমাকে পৃথিবীতে আনতে।

কিন্তু প্রথম দর্শনেই শিশুটির স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখে সাঈদার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত আনন্দ। বংশে আরও এক সুন্দরী নারী পাওয়ার আনন্দ! জন্মের আগে যাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, সে-ই হয়ে উঠল সাঈদার সবচেয়ে প্রিয় নাতনি। এরপর থেকেই সে ফাতিমাকে নিজের মতো করে ভালোবাসতে শুরু করল।

সুপ্ত এরপর বহুবার এসেছে। প্রথমবার সে যখন ফাতিমাকে দেখেছিল, তখন ফাতিমার বয়স এক বছর। সে হেসে মেয়েকে কোলে নিয়ে বলেছিল,

'এই ছোট নার্গিস কবে জন্মাল? এর বাবা কে, নার্গিস?'

নার্গিস সেদিন ম্লান হেসেছিল, কোনো উত্তর দেয়নি। সে কখনো ফাতিমাকে কারো সামনে আনত না, তবে সেদিন ইচ্ছ করেই সুপ্তর সামনে এনেছিল তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু সুপ্তর প্রতিক্রিয়া এতটাই জঘন্য ছিল যে, এরপর সে আর কখনো ফাতিমাকে তার সামনে আনেনি। তবে ফাতিমা একটু বড় হওয়ার পর নিজ থেকেই কয়েকবার সামনে চলে এসেছিল, আর সুপ্ত তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেছে।

সে কখনোই বাবা হওয়ার যোগ্য ছিল না; তাই নার্গিসও তাকে কখনো জানতে দেয়নি যে সে এক কন্যাসন্তানের পিতা।

সুপ্ত, নার্গিস আর ফাতিমার গল্পের সমাপ্তি ওখানেই টেনে দেওয়া হয়েছিল। তাদের একে অপরের সাথে বাঁধা পড়ার কোনো অধিকার ছিল না, তবুও তারা ভালোবেসেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কঠিন বাস্তবতাই জয়ী হলো। ভালোবাসা, সম্মান আর মাতৃত্ব—নার্গিসের মতো নারীদের জন্য সৃষ্টি হয়নি!

বুকে প্রিয়জনদের শেষ চিহ্ন টুকু জড়িয়ে ধরে মেঝেতে শুয়ে থাকা নার্গিস ফিসফিসিয়ে বলল,

'আপনার মতো আজ আপনার অংশটুকুও আমায় ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু এই দেহে আর কোনোদিন কারোর স্পর্শ লাগবে না। আপনার শেষ স্পর্শটুকুই আমি আমার দেহ থেকে কখনো মুছতে দেব না। আমায় যে এই দুঃসহনীয় জীবনে আরো কিছুক্ষণ বাঁচতে হবে!'

*******

দীর্ঘ বায়ান্ন ঘন্টার সফর শেষে তালহার বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে চূড়ান্ত মুহুর্ত পার করছে।

ঘুঁটঘুঁটে তমসাবৃত ধরণীতে আগস্টের গুমোট উত্তাপ।

মালবাহী বদ্ধ ট্রাকের চলন্ত ইঞ্জিন আর ভয়ে ছমছমে হয়ে থাকা দেহের উত্তাপে মনে হচ্ছে তিনটি দেহ একটা জ্বলন্ত চুল্লির ভেতর আটকে আছে। ঘামে সবার শরীর ভিজে একাকার, কিন্তু গা মোছারও উপায় নেই এমনকি হাত নাড়ানোর সামান্য শব্দটুকুও জীবন-মরণের কারণ হতে পারে।

ট্রাকটি যখন পেট্রাপোল সীমান্তের শেষ বিএসএফ গেটের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন ঝাঁকুনি দিয়ে গতি কমে এলো। বাইরে বুটের খটখট শব্দ, বিএসএফ জোয়ানদের ভারী গলার হিন্দিতে হাঁকডাক আর ড্রাইভারের বিনয়ী সুর শোনো যাচ্ছে।

ট্রাকের কন্টেইনারে তিল ধারণের ঠাঁয় নেই। অসহনীয় উত্তাপ আর ট্রাক ভরতি পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধে নাকের পাটা বারংবার নিঃশ্বাস ফেলার অভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে। তবুও তালহার নিঃশ্বাস ফেলল না। বরং দম বন্ধ করে ভয়ে রক্তশূন্য চোখে তাকানো মেয়েটির গলার পেছনে চাপ প্রয়োগ করে মাথটিকে নিজের কাঁধের মাঝে গুঁজে দিল। নীরবে আশ্বাস দিল কিচ্ছু হবে না। বিন্দু দম আটকে চোখ ঠাঁটিয়ে বন্ধ করে তার গলায় মুখ লুকিয়ে রইল। তার বদ্ধ নেত্র বেয়ে নীরব অশ্রু অবাধে গড়াচ্ছে। দু'হাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রেখেছে ফাতিমার ঘুমন্ত ছোট্ট দেহটিকে।

বাইরের প্রতিটি শব্দ ভেতরে থাকা মানুষগুলোর বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছে।

বাইরের আওয়াজ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতেই তালহার বুকের মাঝে থাকা দেহ দুটিকে আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিল। তার শক্ত চোয়ালে অসহায়ত্ব, রাগ, আফসোস। সে পারলে হয়তো দেহ দুটিকে নিজের বুকের মাঝে একটি নিরাপদ, আরামদায়ক জায়গায় লুকিয়ে রাখতো। কিন্তু আজ সে বড্ডো নিরুপায়! কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো আজকের এই পরিস্থিতির জন্য তার প্রিয়জন দায়ী! সে কাকে দোষ দেবে? তাদের নাকি নিজের ভাগ্যকে? তার ভালোবাসা যে কেউ বুঝল না। বুঝলে হয়তো তার নিজের হাতে একমাত্র বন্ধুকে মারতে হতো না, হয়তো ফাতিমাকে এতিম হতো না, হয়তো তার স্ত্রী আর সন্তানকে আজকে এই জীবন-মরণের মুখে পড়তে হতো না!

আঁধারে তার চোখ চিকচিক করে উঠল।

বাইরে থেকে বিএসএফ জোয়ান ধাতব রড দিয়ে ট্রাকের বডিতে আর ত্রিপলে দুটো শক্ত টোকা দিল,

ঠক! ঠক!

ধাতব শব্দের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল পুরো ট্রাকে। তালহার চোখ বন্ধ করে নিলো। টৃরাক খোলার শব্দ হলো। তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি দ্বিগুণ বেড়ে গেল যেন। ট্রাকে কারোর ওঠার শব্দ হলো! তালহার নিঃশব্দে শুধু আল্লহকে ডাকছে। দুই জোড়া বুট জুতার শব্দ আলোড়িত হলো ট্রাকের ভেতরে। তারা পেঁয়াজের ভারী ভারী বস্তাগুলো বড় লাঠি দিয়ে খোঁচা খোঁচা দিয়ে দেখল যতটুকু পারল।

বাহির থেকে আবার হাঁক ছেড়ে ডাকার শব্দ আসল। ট্রাকের ভেতরের বুটজুতার আওয়াজ কমে এলো। ট্রাক বন্ধ করার বিকট আওয়াজ শোনা যেতেই তালহারের টানটান সিনা নুইয়ে পড়ল।

ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ আসতেই তালহার বহু কষ্টে ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলল। সে চোখ খুললো মাথার উপর আর চারিপাশ পেঁয়াজের বস্তা দিয়ে ছোট্ট একটা বক্স বানানো যার ভেতরে একজনের জায়গায় তারা তিনজন গুটিয়ে আছে।

বিএসএফ পেপার সই করে দেওয়ার পর ট্রাকটা আবার এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে জিরো পয়েন্টে নো ম্যানস ল্যান্ডের জায়গাটুকু পার করতে লাগল। গতির সাথে সাথে বাইরে শুধু চাকার ঘর্ষণ আর বাতাসের এক ভৌতিক সাঁইসাঁই শব্দ।

বাইরের কুয়াশা আর সীমান্ত বাতিগুলোর আলো ট্রাকের ত্রিপলের হালকা ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরের ভেতরে ক্ষণিকের জন্য হলুদ ও সাদা আলোর রেখা তৈরি করছে। শ্বাসকষ্ট যেন না হয় তার জন্য রাখা ছোট্ট একটা ফাঁক দিয়ে সেই আলোর রেখায় তালহার মাথা নুইয়ে দেখল বিন্দুর রক্তশূন্য, ভীতিগ্রস্ত মুখটা।

সে জোরপূর্বক নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে।ঘেমেনেয়ে একাকার মেয়েটির ললাটে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

'ভয় নেই। আর কিছুক্ষণ!'

আর কিছুক্ষণ!নো ম্যানস ল্যান্ড পার হয়ে একপাশে ভারতের শেষ সীমান্তের আলো। ওই তো আর কয়েক গজ দূরে বাংলাদেশের বিজিবি গেটের টিমটিমে আলো। দেয়ালে একটা টোকা পড়তেই তালহার জোরে নিঃশ্বাস ফেলে মাথার উপর থাকা দু'টো বস্তা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সরিয়ে দিল। ফলস্বরূপ একটু শ্বাস ফেলার মতো জায়গা পাওয়া গেল। দু'জনের একটু বসার জায়গা করে দিয়ে সে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'আমরা বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে গিয়েছি।'

বিন্দু জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেও দেয়ালে পিঠ ঠেকালো। সে ধাতস্থ হতেই তালহারের দিকে ফিরে তাকালো। সে ভীষণ ক্লান্তির সাথে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। তার চোখের নিচে কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছে। তার চোখ টলটল করে উঠল তার গোটা জীবনটাই তো এই মানুষটার ভরসায় নিরাপদ, সুখময়। সে কী করে তাকে এতটা কষ্ট দিল শুধুমাত্র একটা বাচ্চার জন্য?

সে ক্ষীণ স্বরে বলল,

'স্যরি!'

তালহার বদ্ধ নেত্রে মলিন হাসল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'ডোন্ট বি স্যরি! যেদিন থেকে কবুল বলেছিলাম সেদিন থেকে শুধু তোমার ভালোবাসাকে কবুল করিনি। তোমার রাগ জেদ, ভুলত্রুটি সবকিছুকে কবুল করেছিলাম। তুমি ভালোবাসলেও আমি হাসিমুখে তা গ্রহণ করব, তুমি ভুল করলেও আমি হাসিমুখে তা শুধরে দেব। এর জন্য কখনো নিজেকে ছোট মনে করবে না।'

বিন্দুর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আগে ভাবত, তাদের সম্পর্কে ভালোবাসার পরিমাপ করলে সে সবসময় জিতে যাবে। কিন্তু সেটা ভুল ছিল। লোকটি সবসময় নিজের ভালোবাসা লুকিয়ে তার ভালোবাসাকে জিতিয়ে দেয়।

বিন্দু শ্রান্ত দেহে তার কাঁধে মাথা ঠেকালো। তালহার আগের ন্যায়-ই নিরুদ্বেগ। বুকে জড়িয়ে রাখা দেহটিকে আরো দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে নিয়ে বিন্দু আঁধারে উদাসীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কিয়ৎকাল বাদ নিরবিচ্ছিন্ন নীরবতা ভেঙে বলল,

'দ্যাট ওয়াজ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ?'

'নো!'

'প্রথম কবে দেখেছিলেন?'

'তিন বছর আট মাস, পনেরো দিন পূর্বে।"

"ভালো লেগেছিল কেন?'

তালহারের ঠোঁটের কোনে উদাসীন হাসি ফুটে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'একবার আনমনে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলাম, এরপর আর তার থেকে চোখ সরাতেই পারিনি। কেন ভালো লেগেছিল তা জানি না। শুধু এতটুকু জানি তার থেকে দৃষ্টি সরাতে পারি না আমি।'

বিন্দুর অশ্রুসজল চোখে মুগ্ধতা ছুঁয়ে গেল। ওষ্ঠকোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

'তবে বিয়ের পর একমাস কোনো যোগাযোগ করেননি কেন?'

'কেসের দায়িত্বে নেপালে ছিলাম সেই মাস।'

'একটা ফোনকল ও করতে পারতেন।'

'চেয়েছিলাম সবটা কাজ শেষ করেই শুরু করব।'

'এ কেমন লজিক?'

'আমার কাঁধে প্রেশার থাকলে আমি রিল্যাক্স করতে পারি না! যতক্ষণ না ওই কাজটা শেষ করতে পারছি ততক্ষণে অন্য কাজে মনোযোগ দিতে পারি না।'

'তাহলে বিগত তিন বছর কীভাবে সংসার আর কাজ সবটা সামলেছেন?'

বিন্দু ঘাড় থেকে মুখ তুলে দেয়ালে মাথা ঠেকালো। তালহার চোখ খুলে সেভাবেই তার দিকে কাত ফিরে তাকালো। দু'জনের তখন মুখোমুখি একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তালহার ক্ষীণ স্বরে বলল,

'বিগত তিন বছর সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে কারো বুকে মাথা রাখলেই সে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। তার ওইটুকু স্পর্শ যথেষ্ট ছিল আমার সব চাপ, সব দুশ্চিন্তা এক নিমেষে দূর করে দেয়ার জন্য। কোনো প্রেশারকে প্রেশার মনে হতো না। বরং কাজের সকল প্রেশার ফিকে পড়ত আমার বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ো নামক প্রেশারের কাছে।'

বলতে বলতেই তালহার উদাসীন চিত্তে হেসে উঠল। এটাই সত্যি, বিয়ের পর তার কখনোই কাজের প্রেশার অনুভব হয়নি।

কিন্তু কখন বাড়ি ফিরবে এই প্রেশার তাকে সর্বদা তাড়িয়ে বেড়াত!

চোখে চোখ রেখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা বিন্দু ম্লান হাসল। লোকটা কখনো বলেনি সে তার কতটা প্রিয়। এই প্রথম বলল।

ট্রাকের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার শব্দে তালহার নড়েচড়ে উঠল। বাইরে থেকে মানুষের সমাগমের আওয়াজ আসছে। সে উঠতে গেলেই চোখ যায় বিন্দুর বুকে ঘুমন্ত ফাতিমার দিকে। খানিক অবাকের সুরে বলল,

'ও এত গরমে, এত বাজে জায়গায় এভাবে গভীর ঘুমে কীভাবে ডুবে আছে? এখনো নড়াচড়া নেই দেখো!'

বিন্দু মৃদু হেসে তাকে আরো আদুরে ভঙ্গিতে বুকে জড়িয়ে নিলো। ছোট্ট কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে আহ্লাদী গলায় বলল,

'ও লিলির বুকে ঘুমিয়েছে তো তাই আরামে ঘুমাচ্ছে!'

'এক সপ্তাহে সে কী করে এত লিলির পাগল হলো?'

'কারণ পাঁচ বছরের জীবনে সে কখনো মায়ের ভালোবাসা পায়নি। তাই আমার একটু ভালোবাসাতেই সে আদুরে বেড়ালের মতো গুটিয়ে গিয়েছে।'

তালহার বের হওয়ার আগেই দু'জন বিজিবি গার্ড তড়িঘড়ি করে বস্তাগুলো সরানোর ব্যবস্থা করলো। বিন্দুর মুখে আবার ভয় ফুটে উঠল। তবে পাঁচ মিনিটের মাথায় তার ভয় মিলিয়ে গেল। একজন বিজিবির কর্মকর্তা ভীষণ শ্রদ্ধার সাথে তালহারের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল,

'আপনার থেকে আমরা বেশি টেনশনে ছিলাম, স্যার। তবে ভাগ্য ভালো ছিল আজকে ওপারের টহলে সেই তেজি অফিসার ছিল না। নয়তো তার খপ্পর থেকে কেউ পালাতে পারত না।'

তালহার মৃদু হেসে বলল,

'জানি। তার জন্যই তো আজকের দিন বেছে নেয়া।'

'আপনি ম্যাডামকে নিয়ে সুস্থ সবল ফিরেছেন আমরা ভীষণ খুশি। কিন্তু আপনি জানিয়েছিলেন একজনকে মানে শুধু আপনার স্ত্রীকে পাচার করা হয়েছে। তবে ওই বাচ্চাটি কে?'

বিন্দু চকিতে ফাতিমাকে আঁচলে ঢেকে নিলো।তালহার ফিরে তাকালো। বড্ডো সহজ ভাবেই ছোট্ট জবাবে বলল,

'ও আমার মেয়ে।'

বাহির থেকে তাড়া দিল। তালহার দ্রুত বিন্দু আর ফাতিমাকে নিয়ে নেমে গেল। সেখান থেকে বিজিবির গাড়ি করেই তাকে কবিরের গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল।

বেনাপোল বাজারে কবির গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তালহার বিজিবির গাড়ি থেকে নামলো। কবির বড়সড় এক হাঁফ ছাড়লো তাকে দেখে।

এমনভাবে হাঁফ ছাড়ল যেন জীবনের সাথে তালহার যুদ্ধ করেনি সে নিজেই যুদ্ধ করেছে। সে তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে হৈ হৈ করে উপদেশ দিয়ে বলল,

'স্যার, আর যাই করেন এরপর থেকে বউ এর কথায় উঠবেন আর বসবেন। পি করতে ভুলে যাবেন কিন্তু ম্যাডামকে এটা বলতে ভুলবেন না যে, আপনি পি করতে যাচ্ছেন। নয়তো দেখেছেন-ই তো কী হয়েছে? আপনাকে দুই দেশ ঘুরিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে ম্যাডাম।'

তালহারের শান্ত মুখশ্রী ধপ করে জ্বলে উঠল ক্রোধে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

'কবির আমার মেজাজ ভীষণ খারাপ। এখন একটাও উল্টাপাল্টা কথা বললে তোমার অবস্থা আমি খারাপ করে দেব। ব্যাগটা বের করো গাড়ি থেকে।'

কবির মুখ ছোট করে নিলো।

' আমি তো ভালো কথাই বলেছি। আমার কী? এবার এই দেশ ঘুরেছে সামনের বার চার দেশ ঘুরবে। এই কবির সবসময় সত্যি কথা বলে। বউয়ের কথা শুনতে হয়, নয়তো কপালে শনি থাকে।'

বিড়বিড় করতে করতেই তার টনক নড়ে। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে দ্রুত পকেট থেকে ফোন করতে করতে ভয়ার্ত কণ্ঠে আওড়ায়,

'আরে আরে সর্মিলাকে তো বলা হয়নি আমি সকালের নাস্তা করেছি।'

সে তড়িঘড়ি করে সর্মিলা নামক তার একমাত্র স্ত্রীকে ফোন করল। গাড়ি থেকে ব্যাগ বের করতে করতে কাঁধে ফোন ঠেকিয়ে উচ্চস্বরে বলল,

'হ্যালো সর্মিলা, আমি সকালের নাস্তা করেছি। তুমি চিন্তা করো না। তুমি খেয়ে নিও কিন্তু!'

ফাতিমাকে কোলে তুলে নেয়া তালহার আশ্চর্য হয়ে গেল তার উচ্চস্বরে বলা কথা শুনে। এই ছেলে কাজের সময় বউকে ফোন দিয়ে বলছে সে নাস্তা করেছে? সে গর্জে উঠে বলল,

'কবির, সবকিছুর একটা সঠিক সময় থাকে। কমনসেন্স বলে কী কিছু নেই তোমার?'

কবির তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দিল। থমথমে মুখে বলল,

'কমনসেন্স আছে বলেই তো কাজের মাঝেও বউকে ফোন দিয়েছি স্যার। নয়তো আমার এত ক্ষমতা নেই যে বউ পালালে তাকে আরেক দেশ থেকে খুঁজে আনব।'

সদ্য গাড়ি থেকে বের হওয়া বিন্দু বাকরুদ্ধ হয়ে গেল কবিরের কথায়। ফুঁসে উঠে বলল,

'আমি পালাইনি, কবির ভাই। আমায় পাচার করা হয়েছিল।'

'কোনো না কোনো জায়গায় আপনার একটু হলেও দোষ ছিল ম্যাডাম। স্যারের উপর ভরসা রাখা উচিত ছিল।'

সে গোমড়া মুখে বলেই গাড়ির দিকে ছুটলো। বিন্দু কপাল কুঁচকে তাকালো। তালহার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আওড়ালো,

'এই কবির আমার জীবনের অর্ধেক মাথা ব্যথার কারণ।'

দীর্ঘ দশ দিন বাদ বি.টি.এম এর দরজায় কাঙ্খিত কলিং বেল বাজলো। বাড়ি জুড়ে শুধু তানিয়া আর বিন্দুর বাবা মা ছিল। তানিয়া পিপ হোলে চোখ রাখতেই তার মুখ থেকে আনন্দের চিৎকার বেরিয়ে এলো।

'বেয়ান, বিন্দু এসেছে!'

সে দরজা খুলেই এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল বিন্দুর বুকে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে বলল,

'আমার মেয়েটা সুস্থ সবল আছে। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। কোথায় ছিলি? এসব কী ছিল?'

সে উদ্ভ্রান্তের মতো বিন্দুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। বিন্দু ছলছল চোখে শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'সবকিছুর জন্য দুঃখিত মা।'

তালহার ফাতিমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

'ও অসুস্থ। ভেতরে আসতে দাও।'

বিন্দু ভেতরে ঢোকে। তার বাবা মা বলহীন দেহে দাঁড়িয়ে আছে অদূরে। বিন্দু নতমুখে এগিয়ে গিয়ে মায়ের বুকে লেপ্টে গেল। বিন্দুর মায়ের চোখে অজস্র অভিযোগ! সে মেয়েকে একটুও আহ্লাদ করল না। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'সবকিছুর শান্তিপূর্ণ সমাধান ছিল বিন্দু। বাবা মা মরে যাইনি। বাবা মাকে জানালে আমরা মিটিয়ে দিতাম সমস্যা!'

বিন্দু নিরুত্তর নিজের ক্লান্তি দূর করছে আরামদায়ক সেই বুকটিতে। সন্তানদের জগতের সব দুঃখের অন্ত বুঝি এখানেই ঘটে। আবেগঘন মুহুর্তটি কেটে যেতেই তাদের সকলের দৃষ্টি পড়ল তালহারের কাঁধে শুয়ে থাকা বাচ্চাটির দিকে। যে কি-না সবাইকে অচেনা দৃষ্টিতে পরোখ করছে। তানিয়া অবাক হয়ে গেল অত সুন্দর একটা বাচ্চা দেখে। অস্ফুট স্বরে বলল,

'ও কে তালহার?'

তালহার এক পলক ফাতিমাকে দেখে বলল,

'আমার মেয়ে।'

সকলের মাঝে ছোটখাটো বিস্ফোরণ ঘটল। তালহার সব খুলে বলল। বিন্দু ততক্ষণে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার দেহ আর সায় দিচ্ছিল না। তানিয়া আর বিন্দুর বাবা মায়ের কোনো দ্বিরুক্তি ছিল না ফাতিমার বিষয়ে। কিন্তু তারা সুপ্তর সন্তান শুনে আরো সহানুভূতির সাথে দ্রুত আগলে নিলো ফাতিমাকে।

আধা ঘন্টার মাঝে তালহার নিজের ঘরকে ডাক্তারের চেম্বার বানিয়ে ফেলল। তার কাছে সুযোগ ছিল না বিন্দুকে এখন কোথাও নেয়ার। ডাক্তার সুলেখা সব চেকাপ করে জানালেন,

'আমি আশা করছি বাচ্চা ঠিক আছে। সন্ধ্যায় রিপোর্ট আসলে সবটা জানা যাবে।'

তালহার সায় জানালো। সন্ধ্যা হতেই তালহার সবার আগে ডাক্তারের রিপোর্ট কালেক্ট করল। ডাক্তার জানালো বাচ্চা ঠিক আছে। শুধু বিন্দু দূর্বল। সকল চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে তালহার বাড়ি ফিরতেই দেখল ছোট্ট ফাতিমা পার্পেল রঙের একটা ফ্রক পরেছে। মাথায় তার চিরচেনা বান্দানা দিয়ে কোঁকড়া চুলগুলো বেঁধে রাখা।

সে তার দুই দাদু আর নানুর মাঝখানে অবুঝের মতো বসে আছে। তানিয়া আর বিন্দুর মা হিন্দি, উর্দু কিছুই পারে না। তবে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে ফাতিমার সাথে কথা বলার।

তানিয়া বহুকষ্টে বোঝানোর চেষ্টা করছে,

'হাম তোমার দাদু হই।'

বিন্দুর মা বিরক্তি নিয়ে বলল,

'আরে বেয়ান আপনি বাংলা আর হিন্দি মিলিয়ে বলছেন। ও বুঝছে না।'

এবার সে চেষ্টা করল। নিজেকে দেখিয়ে বলল,

'হাম তুমহারি নানু হোতাহু।'

ফাতিমা এবার আরো কপাল কুঁচকে নিলো। অবুঝ কণ্ঠে আওড়ালো,

'হোতাহু কেয়া হ্যায়?'

তালহার না চাইতেও তাদের কাণ্ডে হেসে ফেলল। সে এগিয়ে তাদের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। ফাতিমার হাত ধরে তানিয়াকে দেখিয়ে নরম সুরে বলল,

'Ye log keh rahe hain ki, ye tumhari dadu hain.

Aur ye tumhari nanu hain'

(তারা বলছে যে, সে তোমার দাদু হয়। আর সে তোমার নানু হয়।)

ফাতিমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। উৎসুক কণ্ঠে বলল,

'Accha ye baat? Tum meri dadu ho? Aur tum meri nanu ho?'

(আচ্ছা এই কথা? তুমি আমার দাদু হও? আর তুমি আমার নানু হও?)

তানিয়া আর বিন্দুর মা হাসিমুখে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ফাতিমা আনন্দিত কণ্ঠে বলল,

'Kya tum log mujhse pyar karoge? mere saath kheloge? mujhe lily ke siwa koi pyar nahi karta. sab nafrat karte hain. koi mere saath nahi khelta.'

(তোমরা কি আমাকে ভালোবাসবে? আমার সাথে খেলবে? আমায় লিলি ছাড়া কেউ ভালোবাসে না। সবাই আমায় ঘৃণা করে। কেউ আমার সাথে খেলে না।)

তালহারের মুখ মলিন হয়ে গেল তার কথায়। তানিয়া ছেলেকে বলল,

'এই আব্বা, ও কী বলছে?'

তালহার মলিন মুখে মাকে ফাতিমার কথা ট্রান্সলেট করে দিল। তাদের মুখ ও মলিন হয়ে গেল। তানিয়া তাকে চুমু দিয়ে হাসিমুখে বলল,

'আমরা তোমায় ঘৃণা করব কেন? তুমি তো একটা পরী। তোমায় তো আমরা অনেক অনেক ভালোবাসব।'

তালহার মায়ের কথা ট্রান্সলেট করে ফাতিমাকে বলল।

'Nanu kya keh rahi hain jaanti ho?'

(নানু কী বলছে জানো?)

'Nahi' (না)

'Nanu keh rahi hain ki woh tumhe dher saara pyar karengi. kabhi bhi nafrat nahi karengi. jaanti ho kyun?'

(নানু বলছে যে সে তোমাকে অনেক ভালোবাসবে। কখনো ঘৃণা করবে না। জানো কেন?')

'Kyun?' (কেন?)

'Kyun ki aap to ek pari ho. ek chhoti si pari. aap se sirf pyar karna chahiye, koi nafrat nahi karna chahiye.'

(কারণ আপনি তো একটা পরী। ছোট একটা পরী। আপনাকে শুধু ভালোবাসতে হয়, কোনো ঘৃণা করতে হয় না।)

ফাতিমা বিস্ময় নিয়ে বলল।

'Tum log to bohot acche ho. Main tum logon ke saath khoob khelungi.'

(তোমরা তো খুব ভালো। আমি তোমাদের সাথে অনেক খেলা করব।)

তালহার ট্রান্সলেট করে দিতেই তানিয়া আর বিন্দুর মা বলল,

'আচ্ছা, আমরা অনেক খেলব। এখন এসো আমরা একটু সন্ধ্যার নাস্তা করি।'

ফাতিমাকে ট্রান্সলেট করে দিতেই সে ঘাড় দুলিয়ে বলল,

'ওকে!'

তালহার তার মাথায় চুমু দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে ঘরে গেল। বিন্দু বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার চোখেমুখে নেই কোনো দুঃখ আর দুশ্চিন্তার ছাপ। তালহার ক্লান্ত দেহে রিপোর্টটা বিছানায় রেখে মেয়েটির পাশে বসল। মাথা নুইয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বিন্দু নড়েচড়ে উঠল। আধো আধো নয়ন মেলে তাকাতেই হ্যাজেল ব্রাউন রঙা চোখদুটো দেখতে পেল। সে দূর্বল চাহনিতে চেয়ে ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,

'রিপোর্ট দিয়েছে?'

'হু।'

'ডক্টর কী বলেছে? বেবি কেমন আছে?'

তালহার উদাসীন চিত্তে হাসল। বলল,

'বেবি তার বাবার মতোই স্ট্রং আছে।'

বিন্দুও হাসল। কাত ফিরে দু'হাতে তালহারের পেট জড়িয়ে আবার চোখ বুজলো। জিজ্ঞেস করল,

'আমার পরী কোথায়?'

'তার নানু আর দাদুর ভুলভাল উর্দু বোঝার চেষ্টা করছে।'

বিন্দু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

ফাতিমার প্রথম দিন আজ ভালো কাটলো। এখানে সবাই তাকে মাথায় করে রাখে। স্বভাবতই বাচ্চারা ভালোবাসার পাগল।

নিজের ঘর, নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতেই বিন্দু আবার তার চিরচেনা ঘরকুনো বধূবেশে চলে এলো। একটু সুস্থ হতেই সে নয়া মাতৃত্ব অনুভব করতে নেমে পড়ল। শাশুড়ির হাত থেকে খাবার নিয়ে নিলো। ভীষণ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,

'আমায় দাও, আমি খাওয়াই।'

সে জানে না বাচ্চাদের নিজের হাতে খাওয়ানোর সুখ কেমন। সে ভীষণ আনন্দের সাথে সাদা পোলাও আর গরুর মাংস আর সবজি মাখতে মাখতে বলল,

'Kya fatima lily ke hath se khana khaye gi?'

(ফাতিমা কি লিলির হাতে খাবার খাবে?)

ফাতিমা গাল ভরে হেসে বলল,

'Fatima khaye gi.'

(ফাতিমা খাবে।)

বিন্দু প্রগাঢ় হেসে তার মুখে ভাত তুলে দিল। ফাতিমা ঝটপট মুখে পুরে নিলো। খেতে খেতে বলল,

'Ye to bohot maze ka khana hai, lily.'

(এটা তো অনেক মজার খাবার, লিলি।)

'তাই?'

সে খুব মজা করে খেলো তার লিলির হাতে। খাওয়া শেষে সে দাদু আর নানুকে টাটা দিয়ে বলল,

'Dadu, nanu main sone ja rahi hoon. Aap logon se subah baat hogi. Allah Hafiz!'

(দাদু, নানু আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। আপনাদের সাথে সকালে কথা হবে। আল্লাহ হাফেজ!)

বিন্দু শাশুড়ি আর মাকে বলল,

'আমি ওকে ঘুম পাড়াই।'

তানিয়া মৃদু হেসে বলল,

'তোর শরীর দূর্বল না? ওকে ঘুম পাড়াতে পারবি?'

বিন্দু মলিন হেসে বলল,

'এমন একটা পরী বুকে থাকলে সব দূর্বলতা গায়েব হয়ে যায়, মা। তুমি চিন্তা করো না। সে আমার অর্ধেক অসুখের ওষুধ!'

সে ফাতিমার হাত ধরে ঘরে চলে গেল। জুতা খুলে মাথার বান্দানা খুলে দিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে পোশাক বদলে দিল। আর ফাতিমা সে লিলির সাথে বকবক করছে। তার কত মনের কথা! তার আম্মি কী কী করত, তার নানি তাকে কত বকতো, শাহিন তাকে উঠতে বসতে শুধু ধমকাতো সব বলতো। কিন্তু সে এটা জানত না রাতের আঁধারে নার্গিস নামক মা'টি তার ছোট্ট ফাতিমাকে কত আদর করত। যা সে দিনের আলোয় করত না!

বিন্দু তা শুনতে শুনতে মলিন হাসল। সে জানে, নার্গিসের ভেতরে একটা দূর্বল মা রয়েছে। সে ফাতিমাকে সেন্টার টেবিলে বসিয়ে পুরো গায়ে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে দিয়ে রাতের পোশাক পড়িয়ে দিল।

তারপর লাইট নিভিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। ছোট্ট নাকে নাক ঠেকিয়ে বিন্দু আদুরে গলায় বলল,

'এখন কী ফাতিমা একটু আম্মির সাথে কথা বলবে?'

'আম্মি? কোথায় আম্মি?'

ফাতিমা অবাক হয়ে উর্দুতে আওড়ালো।

বিন্দু তাকে অবাক করে নার্গিসকে ভিডিও কল দিল

নার্গিস ঘরের বদ্ধ দরজার দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে চেয়ে দ্রুত বারান্দায় চলে গেল।

ফোনের স্ক্রিনে ফাতিমার সতেজ সুস্থ সবল মুখটি ভেসে উঠতেই সে ডেকে উঠল,

'ফাতিমা! তুমি ঠিক আছো?'

মা মা-ই হয়। ফাতিমা মাকে দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে উঠে বলল,

'আম্মি, দেখো আমি লিলির সাথে লিলির বাড়িতে এসেছি। এখানে সবাই আমায় খুব ভালোবাসে।'

নার্গিস চোয়াল শক্ত করে নিজের আবেগ দমায়। নাকের পাটা ফুলে উঠে। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'তাই? তুমি খুশি?'

'খুব।'

'লিলির সাথে সুন্দর করে থাকবে। কখনো বিরক্ত করবে না। না বলে কারোর সাথে চলে যাবে না। মনে রেখো লিলি ছাড়া তোমায় কেউ কিন্তু ভালোবাসে না।'

'ওকে!'

মায়ের সাথে কথা বলে সে আরো বেশি খুশি হয়ে গেল। দিনশেষে তার সব ঠিক ছিল। তার লিলি সাথে ছিল, আম্মির সাথেও কথা হয়েছে। সে এখন একটি সুখী প্রজাপতি!

বিন্দু ফোনটা নিজের দিকে ধরলো। নার্গিস ছলছল নেত্রে বলল,

'শুকরিয়া!'

'তুমি চিন্তা করো না। আমি ওকে কখনো আমার চোখের আড়াল করব না। আমার উপর বিশ্বাস রাখো।'

'আমি তোমার উপর বিশ্বাস না করলে কখনো ওকে এভাবে ছেড়ে দিতাম না।'

'ওখানে কোনো ঝামেলা হয়েছে?'

'না, কিছু হয়নি। আমি রাখছি। বারবার ফোন দিও না।'

সে ফোন কেটে দেয়। বিন্দু আর ফাতিমা গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। তালহার নিজের অফিস থেকে একবার ঘুরে এসে রুমে ঢুকতেই দেখল অদ্ভুত মোহনীয় সেই দৃশ্য। নিজের ঘরটির সৌন্দর্য আজ অন্যরকমভাবে বদলে গিয়েছে। এই ঘরটিতে হুট করে 'স্নেহ' নামক এক অনুভূতি নিজের দুর্ধর্ষ আধিপত্য বিস্তার করে চলছে।

আড়চোখে মা-মেয়েকে দেখতে দেখতে সে ঘড়ি খুললো। তবে শার্ট খুলতে গেলে তার হাত দুটো বাঁধা প্রাপ্ত হলো। না না, এখন আর আগের মতো আর বেপরোয়া চলাফেরা করা যাবে না তো! সে তো এখন একটা মেয়ের বাবা।

'মেয়ের বাবা।'

নিজ মনে আওড়াতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে ডানে বামে মাথা নেড়ে রাতের পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। টিশার্ট ট্রাউজার পরে বের হতেই তার দেহ ভেঙে আসল। বহুদিনের ক্লান্তি!

সে মা মেয়ের অপরপাশে নীরবে পিঠ এলিয়ে দিল। কিন্তু চোখ বুজতেই তার অন্ধকার সামিয়ানায় দাউদাউ করে আগুনের লেলিহান শিখা ফুটে উঠল। সে ধপ করে চোখ খুলে ফেলল। অস্থির নিঃশ্বাস ফেলে তাকালো বিন্দু আর ফাতিমার দিকে।

ওই তো সব ঠিক আছে, সে কোনো ভুল করেনি। সে আবার চোখ বুজলো কিন্তু কোনভাবেই সে ঘুমাতে পারল না।

বিন্দু লাগাতার কারোর নড়াচড়ায় জেগে গেল। তালহারকে দেখেই ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

'কখন এলেন? আমায় ডাকেননি কেন?'

অস্থির তালহার আঁধারে চোখ মেলে তাকালো। বিন্দু এই মানুষটার সব আচরণের সাথে পরিচিত। সে এগিয়ে এসে বলল,

'কী হলো এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেন?'

তালহার ফিরে তাকালো তার পানে। তার দৃষ্টি এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে বিন্দুর বুকটা ধক করে উঠল। সে এতটা ভঙ্গুর তালহারকে কখনো দেখেনি।

'কী হয়েছে?'

তালহার নিরুত্তর তার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিল। বিন্দু হাতটি আঁকড়ে ধরে লেপ্টে গেল তার বুকে‌। তালহার দু'হাতে শক্ত করে ধরে তার ঘাড়ে মাথা গুঁজে দিল। যন্ত্রণায় চিকচিক করা চোখের কোণা দেখল না বিন্দু!

বিন্দু তার চুলে মাথায়, ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,

'কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন?'

'কিছু না।'

এই কিছু না এর মানে বিন্দু একটু ভাবতেই ধরে ফেলল। আচানক বিন্দুর মস্তিষ্ক সচল হলো।

সে তড়িৎ জিজ্ঞেস করল,

'সুপ্ত কোথায় তালহার? তার সাথে আপনি খারাপ কিছু করেননি তো?'

তালহার ক্ষীণ স্বরে বলল,

'যাই করি না কেন আমি কোনো অন্যায় করিনি।'

বিন্দুর আর এই মানুষটার কোনো কাজের উপর প্রশ্ন নেই। সে মেনে নিলো।

'আপনি যখন জানেন আপনি কোনো অন্যায় করেননি তবে এত অস্থির হয়ে আছেন কেন?'

তালহার মাথা তুললো। চোখে চোখ রেখে বলল,

'তুমি আমার কথায় বিশ্বাস করেছ?'

'আপনি গম্ভীর হলেও নিকৃষ্ট নন। কখনো কারোর সাথে অন্যায় করবেন না। যেকোনো কাজের পেছনে একটা ভালো কারণ লুকিয়ে থাকে। এর পেছনেও কোনো ভালো কারণ ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা হবে সেটাই যেটা হওয়ার ছিল। আপনি কিছু না। আল্লাহ চেয়েছেন বলেই সবকিছু হয়। আপনি কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন?'

এক মুহুর্তের মাঝেই তালহারের সব অস্থিরতা মিলিয়ে গেল। হ্যাঁ সে জেনেবুঝে, বিনা অপরাধে কাউকে কোনো শাস্তি তো দেয়নি। তবে সে কেন অপরাধবোধে ভুগবে? সে গালে গাল ঠেকালো। বদ্ধ নেত্রে ক্ষীণ স্বরে বলল,

'থ্যাংক ইউ!'

বিন্দু মৃদু হেসে তার চুলে হাত গলাতে গলাতে মাথা জাগিয়ে আলতো এক চুম্বন দিল কপাল বরাবর। মিহি স্বরে বলল,

'ঘুমিয়ে পড়ুন।'

দশ মিনিট সেভাবে হাত বুলাতেই তালহার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। বিন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে তার বুকে মাথা রাখল। ছলছল চোখে ঘুমন্ত মুখটা দেখতে দেখতে আওড়ালো,

'এই বুকটা আমার সবচেয়ে সুন্দর আর নিরাপদ জগত। আমি কখনো হারাতে চাই না এই জায়গাটা।'

বিন্দু আবার ফাতিমার পাশে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। কিন্তু অবাক হলো তালহার যখন পুনরায় চোখ মেলে তাকালো। বিন্দু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

'আমি আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম?'

তালহার না বোধক মাথা নাড়লো। আবদারের সাথে বলল,

'ওকে একটু আমার কাছে দেবে?'

বিন্দু মৃদু অপ্রস্তুত হলো।

'তা আমার কাছে এভাবে বলতে হবে কেন? ও আপনার মেয়ে না? নিন!'

তালহার বেশ অনভিজ্ঞতার সাথে ফাতিমাকে নিজের বুকে তুলে নিলো। সে কখনোই বাচ্চাদের এভাবে বুকে নিয়ে ঘুমায়নি। ভতিজাকেও ওভাবে কাছে পায়নি। তাই এই অনুভূতি তার জন্য বিরল!

বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক প্রাশন্তি বয়ে যেতেই তালহার মিইয়ে গেল। বুকের ভেতরের ছটফটানি যেন একটু একটু করে শুষে নিলো কেউ। সে ফাতিমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নিলো।

তার চোখ ভিজে উঠছে। মনে হচ্ছে এটা ফাতিমা না, এটা সুপ্ত! তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তার কাছেই আছে।

ঘোরে ডুবে থাকা তলহার মৃদু হকচকালো বুকে কেউ নাক ঘঁষে কিছু বিড়বিড় করতেই। ফাতিমা ঘুমের ঘোরে কিছু বিড়বিড় করে আবার তার বুকে গাল দাবিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তালহার মৃদু হাসল।

সৃষ্টিকর্তা কিছু কেড়ে নিলে তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেয়। সে তার বন্ধুকে ফিরিয়ে দিয়েছে আর বন্ধুরূপে একটা সন্তান ও দিয়েছে।

বিন্দু মৃদু হাসল। স্বামীর বাবা রূপটি যে তার স্বপ্নের থেকেও সুন্দর!

অতঃপর সকল অন্ধকার মিলিয়ে আলো ফুটল। জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো আঁধারের সাথেই লুকিয়ে গেল।

বারান্দায় আজ ফুলের মাঝে ছোট্ট একটি প্রজাপতি বসেছে। তারা খোশ গল্পে মগ্ন।

'Janti ho Lily, kal raat mere sapne mein koi bhi bura aadmi aakar mujhe nahi daraya.'

(জানো লিলি ,কাল আমার স্বপ্নে কোনো খারাপ লোক এসে আমায় ভয় দেখায়নি।)

ফাতিমা বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল।

'Kyunki kal jo aap mere seene par soyi thi.'

(কারণ কাল যে আপনি আমার বুকের উপর ঘুমিয়েছিলেন।)

তালহারের কণ্ঠে ফাতিমা ঘাড় কাত করে তাকালো। ট্রে হাতে তালহার বারান্দার সোফায় বসল। ট্রেটা টেবিলে রাখতেই দেখাগেল তাতে দুই কাপ কফি আর একটা নাস্তার প্লেট। যেখানে একটা ডিম, এক গ্লাস দুধ আর কিছু ফল রয়েছে।

ফাতিমা গম্ভীর গলায় বলল,

"Jhoot bolna achhi baat nahi hoti."

(মিথ্যা বলা ভালো কথা নয়।)

'Main jhoot nahi bolta. Mere paas photo hai.'

(আমি মিথ্যা বলি না। আমার কাছে ছবি আছে।)

তালহার নিজের ফোন বের করে তার মুখের সামনে ধরল। আশ্চর্য! ওইতো ফাতিমা তার বুকে শুয়ে আছে। ফাতিমা হা করে তাকালো তালহারের দিকে‌। মৃদু সুর টেনে বলল,

'Tum toh kuch zyada hi achhe ho.'

(তুমি তো একটু বেশিই ভালো।)

'Woh toh main hoon.'

(সেটা তো আমি বটেই।)

তালহার কাঁধ ঝাঁকিয়ে দাম্ভিকতার সুরে বলেই তার পেটে সুরসুরি দিতে লাগল। ফাতিমা তার গাম্ভীর্যতা ভেঙে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,

'Arey Lily ke shohar, tum toh bohot shararti ho. Aisa mat karo.'

(আরে লিলির স্বামী, তুমি তো খুব দুষ্টু! এমন করো না।)

বিন্দু আর তালহার ও তার কথায় ফিক করে হেসে উঠল। এরপর? এরপর দীর্ঘ সুখ-দুঃখের হিসেব নিকাশ শেষে পরবর্তী প্রভাতটিতে তালহার আর বিন্দুর ঝুলিতে এক টুকরো সুখ হয়ে ফাতিমা রয়ে গেল।

******

তাদের হাসি ঠাট্টার এই সময়টা এগিয়ে গিয়ে চার মাস তিন সপ্তাহ পরে স্থির হলো। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সাড়ে আটমাসের গর্ভবতী এক নারী। কিন্তু গর্ভাবস্থা সকলের জন্য সুখকর হয় না তা স্পষ্ট নারীটির চোখেমুখে।

একদফা মৃত্যুর সাথে লড়াই শেষে দীর্ঘ বারো ঘন্টা পর চোখ খুলে তাকালো বিন্দু। হাতে ক্যানুলা, মুখে অক্সিজেন, ভারী দেহটা একদম মৃতপ্রায় মানুষের ন্যায় পড়ে আছে বিছানায়। তিনটা বালিশের আড়ালে ভারী উঁচু পেটটা উঁকি দিয়ে আছে।

ঝাঁপসা চোখে সবকিছু স্পষ্ট হতেই বিন্দুর মনে পড়ল বিগত রাতের ভয়ঙ্কর সেই মুহুর্তগুলো। যখন খিঁচুনি, আর শ্বাসকষ্টে তার স্ট্রোক করার মতো গুরুতর অবস্থা হয়েছিল। সেই দৈহিক যন্ত্রণা মনে পড়তেই বিন্দুর চোখের কোল ঘেঁষে নোনাজল গড়ালো। মৃত্যু যেন একবার কাছ থেকে দেখে এসেছে। সে মাথাটা একটু বাঁকাতেই দেখল একজোড়া রক্তিম চোখ তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখের পাতা ভেজা, শক্ত চোয়ালে অভিযোগ! তবুও সে নিরুত্তর। বিন্দু মলিন হেসে নিজের নড়তে না চাওয়া হাতটা নাড়ালো। বেডের পাশে রাখা তালহারের হাতের উপর আলতো করে নিজের শাহাদাত আঙুল রাখল।

কিন্তু তালহার সরিয়ে নিলো নিজের হাতটি। আঁকড়ে ধরল কাঁধে শুয়ে থাকা মেয়ের পিঠ। যার দেহ এখনো উত্তপ্ত! জ্বরের ঘোরে ফাতিমার একটা বুকের প্রয়োজন ছিল, আর সেটা তালহারের ই বুক!

বিন্দু অতি কষ্টে অক্সিজেন মাস্কের আড়ালেই মুখ খুললো।

'আর মাত্র কিছুদিন কষ্ট করতে হবে।'

তালহারের নাকের পাটা ফুলে ফেঁপে উঠল কান্না দমানোর প্রয়াসে। থমথমে মুখে বলল,

'আর একদিন ও না। আমরা আজ রাতে সিজার করাচ্ছি।'

'তালহার!'

'নো মোর আর্গুমেন্ট! আমার ডাক্তারের সাথে সব আলোচনা শেষ। আজ রাত আটটায় তোমার সিজার।'

বিন্দুর দেহে তর্ক করার শক্তি ছিল না। সে মেনে নিলো। এমনিতেও গতকাল রাতের পর সে নিজেও সাহস হারিয়ে ফেলেছে।

'ফাতিমার জ্বর কমেছে?'

'একটু।'

'কিছু খেয়েছে?'

'নাহ। ভোররাতে একটু ঘুমিয়েছে। উঠলে খাওয়াবো।'

কিছুক্ষণের মাঝেই ফাতিমার ঘুম ভেঙে গেল। তালহার তাকে কোলে বসিয়ে একহাতে বুকে জড়িয়ে নিলো আরেকহাতে বান্দানা বাঁধা চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

'আমার পরীর কি একটু ভালো লাগছে?'

ফাতিমা দূর্বল দেহে তার বুকে মুখ ঘষে বলল,

'ভালো লাগছে।'

'চলো, তবে এখন আমরা নাস্তা করব।'

'লিলি উঠেছে?'

সে এখনো উর্দুতেই কথা বলে। তবে সে এখন বাংলা কথা অনেকটাই বোঝে। বিন্দু মৃদু হেসে তাকে দেখছে। ক্ষীণ স্বরে বলল,

'এইযে লিলি।'

ফাতিমা এগিয়ে গিয়ে তার একটা হাত আঁকড়ে ধরলো। মাথা নুইয়ে হাতের উল্টোপিঠে চুমু দিয়ে বলল,

'তুমি ভালো হয়ে যাও লিলি।'

বিন্দু ছলছল চোখে আদুরে মেয়েটিকে দেখে। আজ কতদিন বুকে নিতে পারছে না। এই জ্বরে তার খুব প্রয়োজন ছিল তার লিলির।

তালহার তাকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় খেতে গেল। ফাতিমা স্বভাবসুলভ বাহিরের খাবারে বেশ আগ্রহ পায়।

জ্বরের মুখে সে চকলেটে মাখো মাখো ডোনাটস, হ্যাম বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বেছে নিলো খাওয়ার জন্য। যদিও সকাল সকাল তালহারের এসব পছন্দ হয়নি। তবুও সে কিছু বলেনি। সে একটা ফলের বক্স ও কিনলো।

রেস্তোরার সামনের রাস্তার পাশে প্যাট্রিতে পেতে রাখা চেয়ার টেবিলে বসে তারা বাবা মেয়ে খাচ্ছে। তালহার নিজের জন্য একটা ক্রোয়াসাঁ নিয়েছে। সে সেটা খেতে খেতে অনেক মন ভুলানো কথা বলে ফাতিমাকে খাওয়াচ্ছে। তার মুখে অরুচি দেখা দিয়েছে জ্বরের কারণে।

ফাতিমা একটু সুস্থ হতেই বকবক করা শুরু করেছে। তালহারের পায়ের উপর বসা ফাতিমা ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো তালহারের মুখপানে। লালচে ঠোঁটে এক ফালি দুর্বল হাসি নিয়ে তালহারের দুই গাল আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করল,

'Lily ke shohar, kya baba aise hote hain?'

(লিলির স্বামী, বাবা কী এমন হয়?)

তালহার মৃদু হেসে পাল্টা জিজ্ঞেস করল,

'Kaise?'

(কেমন?)

ফাতিমা চটপট করে জবাব দিল,

'Tumhari tarah.'

(তোমার মতো।)

তালহার ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

'Aur main kaisa hoon?'

(আর আমি কেমন?)

ফাতিমা বড় বড় নেত্রে চেয়ে স্বগতোক্তি করল,

'Achhe ho. Bohot zyada achhe ho.'

(ভালো, খুব বেশি ভালো তুমি।)

'Achha yeh baat hai? Main tumhe achha baba lagta hoon?'

(আচ্ছা এই কথা? আমাকে তোমার ভালো বাবা মনে হয়?)

'Haan, kya tum mere achhe baba ho?'

(হ্যাঁ, তুমি কী আমার ভালো বাবা হও?)

ফাতিমা হাত গুটিয়ে নিয়ে এবার ভীষণ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো তালহারের মুখপানে।

তালহার স্মিত হাসল। মাথা নুইয়ে মেয়েটির ছোট্ট শুভ্র কপাল বরাবর ঠোঁট ছোঁয়াল। বলল,

'Yeh toh aap bata sakti hain. Bataiye kya aapko main achha baba lagta hoon?'

(এটা তো তুমি বলতে পারো। বলো তো, আমি কী তোমার ভালো বাবা হই?)

'Haan, lagte ho.'

(হ্যাঁ, হও।)

'Toh phir main hoon aapka achha baba.'

(তাহলে আমি তোমার ভালো বাবা।)

'Sach mein?'

(সত্যি সত্যি?)

ফাতিমা এবার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস চেপে শুধাল।

তালহার মাথা দুলিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল,

'Haan, kya aap mujhe baba bulaengi?'

(হ্যাঁ, তুমি কী আমায় বাবা ডাকবে?)

ফাতিমা যেন এতটুকুরই অপেক্ষায় ছিল। সে হৈ হৈ করে বলল,

'Haan haan, bulaungi.'

(হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাকব।)

'Toh phir bulao.'

(তাহলে ডাকো।)

ফাতিমা লাজুক হেসে বলল,

'Baba, Achhe baba. Lily ke shohar mere achhe baba hain. Yayyy!'

(বাবা, ভালো বাবা! লিলির স্বামী আমার ভালো বাবা। ইয়েএএ!)

তালহারের ঋজু মেরুদন্ড নুইয়ে এলো বাবা ডাকের অসহনীয় মুগ্ধতায়। সে চেয়ারে অলস দেহে পিঠ এলিয়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফাতিমার হাসিমাখা মুখটির দিকে। তার হ্যাজেল ব্রাউন রঙা চোখে আজ অপ্রতিরোধ্য আবেগের হাতছানি। সে টেবিলে হাতের খাবারটা রেখে দু'হাতে আঁকড়ে ধরল মেয়েটির ছোট্ট মুখটি। পুরো মুখ জুড়ে আদর করে দিয়ে বলল,

'আমি তোমার ভালো বাবা।'

ফাতিমার জ্বর পালিয়েছে তার ভালো বাবাকে পেয়ে। সে পরবর্তী সময়টুকু প্রজাপতির মতো লাফাতে লাফাতে খাবার খেলো আর লাফাতে লাফাতে হাসপাতালে গেল। বিন্দুর কক্ষে ঢুকতেই সে লাফাতে লাফাতে বলল,

'Lily ke shohar meri acchi baba ho gayi, lily.'

(লিলির স্বামী আমার ভালো বাবা হয়ে গিয়েছে, লিলি।)

বিন্দু প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালো তালহারের দিকে। সে মৃদু হেসে বলল,

'আমি লিলির ছোট্ট বন্ধুর ভালো বাবা হয়ে গিয়েছি।'

'আপনি সত্যি কথা বলছেন?'

তালহার হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ফাতিমা চেয়ারে বসে এবার বিন্দুর সাথে গল্প জুড়ে দিল। তারা কীভাবে ভালো বাবা-মেয়ে হলো তার গল্প। বিন্দু আর তালহার ছলছল চোখে তার গল্প শুনলো। তারা আজ প্রকৃতপক্ষে বাবা মা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

রাত আটটা খুব দ্রুত বেজে গেল। কথামতো বিন্দুকে ও.টিতে নেয়া হলো। তালহার ফাতিমাকে নিয়ে পায়চারী করছে কড়িডোরে। ফাতিমাকে সিঙ্গাপুরে এনেছিল তারা আসার দুইমাস পরে। ফাতিমাকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের মেয়ে হিসেবে পরিচয় এর কাগজপত্র বানাতে সময় লেগেছিল। তবে কষ্টসাধ্য ছিল না। ফাতিমা এখন কাগজে কলমে বাংলাদেশি এবং তাদের বড় সন্তান।

তালহারের মাঝে কোনো দুশ্চিন্তা আজ নেই। বরং সকল দুশ্চিন্তা শেষ হওয়ার প্রসন্নতা। দীর্ঘ তিন ঘন্টা পর ও.টির দরজা খুললো। একটা বাচ্চার ক্ষীণ কান্নার শব্দ ভেসে আসতেই তালহার চকিতে ফিরে তাকালো। নার্স সাদা তোয়ালেতে মুড়িয়ে একটা ছোট্ট দেহ নিয়ে এগিয়ে আসছে। ফাতিমা চেঁচিয়ে উঠল,

'Gudia bahar aagaya hain.'

(পুতুল বাইরে এসে গিয়েছে।)

তালহার ধীর কদমে এগিয়ে গেল। তার ভেতরে ঢোকার অনুমতি ছিল। কিন্তু ফাতিমাকে রাখার কোনো বিশ্বস্ত মানুষ ছিল না। তাই সে ঢোকেনি বিন্দুর সাথে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে বোধহয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু দৃশ্য মিস করে ফেলেছে।

নার্সটি অতি দ্রুত বাচ্চাটিকে এনআইসিইউতে নিয়ে গেল। যেহেতু প্রিম্যাচিউর বেবি। তালহারকে বলল,

'আপনার ছেলে হয়েছে। ওখানে গিয়ে দেখে আসুন।'

তালহার ফাতিমার হাত ধরে ধীর কদমে গিয়ে ওই কক্ষটিতে ঢুকলো। লাল আলোর ভেতরে অনেকগুলো বাচ্চা রাখা। কোনটা তার বাচ্চা? সে চোখ বুলাতেই তার চোখ আটকালো রুমের একদম কিনারায় কাঁচের ছোট্ট বক্সে মৃদু স্বরে কান্না করতে থাকা বাচ্চাটির দিকে।

সে পথভ্রষ্ট হলো না। সোজা ওই বাচ্চাটির দিকে এগিয়ে গেল। সে যতই এগোচ্ছে তার দৃষ্টি ততটাই ঝাঁপসা হচ্ছে। কারণ বাচ্চাটি দেখতে অবিকল তার মায়ের প্রতিরূপ!

বাচ্চাটির পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তালহারের ঝাঁপসা চোখ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। কিন্তু ঠোঁটের কোনে হাসি। সে কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটির ছোট্ট পা দুটি আঁকড়ে ধরল। মাথা নুইয়ে দুই পায়ের পাতায় চুমু দিল। ফিসফিসিয়ে বলল,

'তুমি তোমার মাম্মার অনেক কষ্টের পর অর্জিত এক মূল্যবান সম্পদ। মাম্মাকে সবসময় ভালোবাসবে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু তাকে দেবে। সে যত কষ্ট করেছে তোমার জন্য তার এক ভাগ ও আমি করিনি। কখনো মাকে অবহেলা করবে না।'

বাচ্চাটি নিরুত্তর ছোট ছোট চোখ বুজে হাত পা নাড়ছে। তালহার ছেলের কানের কাছে মাথা নিয়ে আজান দিল।

ফাতিমা টুকটুক করে ভাইকে দেখতে দেখতে বলল,

'ভালো বাবা, আমায় পুতুলকে দেখাও।'

তালহার মৃদু হেসে তাকে কোলে নিলো। ফাতিমার ছোট্ট হাতটি ছেলের বুকে রেখে বলল,

'এটা তোমার বড় আপা।'

ফাতিমা বিস্ময় নিয়ে বলল,

'পুতুল কত ছোট্ট ভালো বাবা।'

'তুমিও যখন জন্মেছিলে তখন এমন ছোট্ট ছিলে।'

ফাতিমা ভাইকে আদর করে দিতে দিতে বলল,

'পুতুল, তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও। আমরা একসাথে খেলা করব।'

তখনি নার্স ত্রস্ত পায়ে এসে ইংরেজিতে বেশ অসন্তোষের সাথেই বলল,

'আপনার ছেলে খুব রাগী। ডাক্তার পিঠে থাপ্পড় দিয়েছে বলে রাগে চিৎকার করে কান্না করেছে আর ডাক্তার সহ সবার গায়ে হিশি করে দিয়েছে।'

তালহার অপ্রস্তুত হলো, আশ্চর্য হলো। বোকার মতো জিজ্ঞেস করল,

'সবার গায়ে হিশি করে দিয়েছে মানে?'

নার্স থমথমে মুখে বাচ্চাটির প্রধান অঙ্গ দেখিয়ে বলল,

'এটা একটা ঝর্ণা। এখান থেকে পানি ছাড়লে তিন হাত দূরে গিয়ে পড়ে।'

তালহার তার রাগান্বিত কথার ধরণে না চাইতেও হেসে ফেললো। কিন্তু সে ঠোঁট কামড়ে হাসি থামালো। মেকি অনুতাপের সুরে বলল,

'স্যরি, সিস্টার!'

তারা দীর্ঘক্ষণ বাচ্চার কাছে বসে বেরিয়ে এলো। বিন্দুর যখন জ্ঞান ফিরতেই দেখল তালহার পুরো রুমজুড়ে হাঁটছে। আর ফাতিমা অপরপাশের বেডে শুয়ে আছে। বিন্দু নিজের নুইয়ে পড়া উদর দেখে আর্তনাদ করে উঠল,

'আমার বাচ্চা!'

তালহার চকিতে ফিরে তাকালো। মুহুর্তেই বিন্দুর সকল আর্তনাদ মিলিয়ে গেল। বাবার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে থাকা বাচ্চাটিকে দেখতেই তার চোখের পানি ছেড়ে দিল।

'আমার বাচ্চা?'

তার প্রশ্নে তালহার মৃদু হেসে এগিয়ে গেল। আর বুকের উষ্ণতায় থাকা ছেলেকে বিন্দুর বুকের উপর শুইয়ে দিল। ডাক্তার বলেছে, কৃত্রিম উষ্ণতার চেয়ে মানবদেহের উষ্ণতা বেশি ভালো। তাই সে এতক্ষন ছেলেকে বুকে নিয়ে ছিল।

বিন্দু বাচ্চাটির ছোট ছোট হাত পা ছুঁয়ে দেখছে আর অঝোরে কাঁদছে।

'ও কী ছেলে?'

'হুম, তোমার ছেলে মায়ের কষ্টের মান রেখেছে। সে পুরোই মায়ের কপি পেস্ট।'

বিন্দু অশ্রুসিক্ত নয়নে হেসে ফেললো।

'আপনার হিংসে হচ্ছে?'

'নাহ।'

'আমার মেয়ে আপনাকে আগে বাবা ডেকেছে। কই আমি তো কিছু বলিনি। আমায় তো মা বলে এখনো ডাকেনি।'

'লিলি' শব্দটাকে তুমি এখনো ডিকোড করতে পারোনি। লিলি মানেই তালহারের স্ত্রী, লিলি মানেই ফাতিমার আম্মি। আর হিংসার প্রশ্নই আসে না। ওই ভদ্রলোক যদি মায়ের কষ্টের মূল্য না দিতো তবে বোধহয় আমি ওকে বকতাম।'

বিন্দু মুগ্ধ চোখে বাবা ছেলে আর মেয়েকে দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। জিজ্ঞাসা করল,

'ওর নাম কী রাখব, তালহার?'

তালহার ঘুমন্ত ফাতিমাকে কোলে নিয়ে চেয়ার টেনে বসল তার পাশে। জ্বরের ঘোরে একটু বুকের উষ্ণতা পেলে ফাতিমা আরাম পায়।

সে মেয়ের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

'আমার মেয়ে শুভ্রা আর আমার ছেলে তুষার।'

'তুষার-শুভ্রা!'

বিন্দু স্মিত হেসে আওড়ালো। তালহারের মনে আছে তার ভুলভাল কাল্পনিক আবদারগুলোর কথা। ফাতিমার বাংলাদেশি পরিচয়ে নাম বদলে 'শুভ্রা' রাখা হয়েছে‌‌। তবে তারা ফাতিমাই ডাকে।

হাসপাতালের সফেদ সেই কক্ষটিতে রচিত হলো এক নতুন সুখময় সংসারের গল্প। যেখানে কোনো অপূর্ণতা নেই।

তবে আপাতদৃষ্টিতে হাসপাতালের সেই কক্ষটি একটা পরিপূর্ণ সুখী পরিবার হলেও তার পেছনকার বিশ্বাস, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্বের গল্পগুলো ছিল ভীষণ বেদনাদায়ক!

কিন্তু সম্পর্কে কিছু ভাঙন হয় বন্ধনটিকে আরো দৃঢ় করার জন্য। তালহার আর বিন্দু ছিল তার-ই প্রতিরূপ!

*****

সদ্য মুখে ঢোকাতে যাওয়া ফুচকাটি কেউ মুখের সামনে থেকে ছিনিয়ে নিতেই মেঘ জ্বলন্ত চোখে তাকালো নিজের বাম পাশে। জলহস্তীর ন্যায় এক কামড়ে ফুচকাটি গিলে মেহমেদ প্রগাঢ় হাসল।

'আজকে ঝাল কম হয়েছে। আরেকটু ম্যাজিক মশলা দিলে স্বাদ আরেকটু ভালো হতো!'

রণমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

'আপনাকে আমি ডেট এক্সপায়ার্ড হারপিক খাইয়ে মেরে ফেলব, মিঃ জলহস্তী! আমার খাবারের উপর নজর দেয়া আমার একটুও পছন্দ নয়।'

মেহমেদ তার হাতে থাকা ফুচকার প্লেটটা ততক্ষণে ছিনিয়ে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসে পড়েছে। গোগ্রাসে খেতে খেতে বলল,

'আরো এক প্লেট অর্ডার করুন।'

'টাকা আপনার আব্বা দেবে?'

'না, আপনি দেবেন। ঘুষ খায় আপনার বাপ চাচা। আমার বাপের সৎ টাকা আমি এইসব নোংরা খাবারে অপচয় করি না।'

'নোংরা হলে আপনি খাচ্ছেন কেন?'

'অন্যের টাকার বিষ খেতেও মজা।'

'সেটাই কাল আমি আপনার জন্য বিষ কিনে আনব। খেয়ে মরে যাবেন। অন্তত রোজ রোজ আপনার মুখটা আমায় দেখতে হবে না।'

'রোজ রোজ আপনাকে আমার মুখ দেখানোর ইচ্ছাও নেই।'

'তবে কেন আসেন?'

'রাজি হয়ে যান।'

'যেন মরার আগ পর্যন্ত আপনার মুখ দেখতে হয়?'

'দেখুন, বসের এই ইমপ্লয়ি খারাপ না কিন্তু! একটু পেটুক কিন্তু বেশ ভালো। খুব ভালো আদা চা বানাতে পারি। বিয়ের পর তিনবেলা আপনাকে আদা চা বানিয়ে খাওয়াবো।'

'এর থেকে ভালো আমি একজন চা ওয়ালাকেই বিয়ে করে নেই।'

'আর সেই চা ওয়ালা আমি।'

'আমি মরে যাব তবুও আপনাকে বিয়ে করব না।'

'তবে কাকে করবেন আপনার ওই ঘুষখোর, ক্রিমিনাল চাচার ছেলেকে?'

'মুখ সামলে কথা বলুন।'

'ঘুরতে যাবেন?'

'আপনার কাজ নেই?'

'সকাল চারটায় উঠে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কাজ করেছি যেন এক ঘন্টা ব্রেক পাই।'

মেঘের জ্বলন্ত চোখে ভাটা পড়ল। আড়চোখে চেয়ে বলল,

'আর এত কসরত কেন?'

মেহমেদ দাঁত কেলিয়ে বলল,

'যেন সঠিক সময়ে একটা পাগলকে নিজের গলায় ঝুলাতে পারি।'

সহসা তার পায়ের উপর একটা সজোরে পারা পড়ল। মেহমেদ আর্তনাদ করে উঠল,

'জংলি মেয়েমানুষ! ওটা জুতা নাকি ছুরি?'

'এটাকে পেন্সিল হিল বলে, মূর্খ গোয়েন্দা! আমায় আর বিরক্ত করলে এর থেকেও বাজে অবস্থা করব।'

মেঘ মুখ দাঁতে দাঁত চেপে বলল। মেহমেদ ফুচকা মুখে ঢুকাতে ঢুকাতে তার দিকে বিরক্তি দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।

মেঘ ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে বলল,

'চাচা আরো এক প্লেট ফুচকা দেন। আগের প্লেট এক ফকিরকে দিয়ে দিয়েছি।'

মেহমেদ নিরুদ্বেগ হাঁক ছেড়ে বলল,

'চাচা দুই প্লেট দিন। আমার শ্বশুড়ের ঘুষের টাকা। সারাজীবন খেলেও কমবে না।'

'আপনাকে কিন্তু আমি গলা টিপে মেরে ফেলব।'

মেঘ চেঁচিয়ে উঠল। ফুচকা ওয়ালা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিগত দুইমাস যাবৎ এই দু'জনকে কলেজ গেটের সামনে এভাবেই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে লড়াই করতে দেখা যায়। অথচ দু'জন ই দুজনকে ভালোবাসে।

ফুচকা দিলে মেহমেদ নিজেরটা তো খেলো তারপর আবার মেঘের প্লেট থেকেও নিয়ে নিয়ে খেতে লাগল। রাগে দুঃখে মেঘ সেই প্লেট ও তাকে দিয়ে বলল,

'নিন, খেয়ে মরে যান। যেন জীবনে খাবার খায়নি।'

মেহমেদ নিয়ে নিলো। তিন প্লেট ফুচকা খেয়ে সে বড়সড় একটা ঢেঁকুর তুললো। বলল,

চলুন, বৃষ্টি পড়ছে একটা বাইক রাইড দিয়ে আসি।'

মেঘ থমথমে মুখে বলল,

'বাবা গাড়ি পাঠাবে।'

'যতক্ষণে গাড়ি আসবে ততক্ষণে এক পাক ঘুরে আসব।'

'আর আপনার সাথে আমি কেন ঘুরতে যাব?'

'কারণ জগতে আর কোনো পাগল নেই যে নিজের কাজ ফেলে আপনাকে এই বৃষ্টির মাঝে বাইক রাইড করাবে।'

মেঘ তাচ্ছিল্য হাসল।

'স্বীকার করলেন তবে, আপনি একটা পাগল।'

'আমি পাগল না হলে আপনার মতো পাগলের পেছনে ঘুরি?'

'ইয়া আল্লাহ কোনোদিন আমি আপনাকে খুন করে জেলে যাব।'

'তার আগে বিয়ে করে দুইটা পাগল বাচ্চা পয়দা করুন। নয়তো আপনার মতো পাগলকে সহ্য করবে কে?'

মেঘের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। মেহমেদ গাল ভরে হেসে হাত বাড়িয়ে মেয়েটির ফুলকো গাল টেনে দিয়ে বলল,

'পাগল হলেও সুইট আছেন। গালটা কি আদুরে! বিয়ে করে সবার আগে এখানে দু'টো চুমু খাবো।'

'আপনাকে আমি গুলি করে দেব। ক্যারেক্টারলেস!'

'আর কোনো মারার উপায় বাদ রেখেছেন? বিয়ে করে দুটো চুমু দিন। দেখবেন আমি এমনিই মরে গিয়েছি।'

রাগান্বিত মেঘ রাগতে গিয়েও এবার ফিক করে হেসে ফেলল। মেহমেদের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি। সে জানে এই রাগ মেকি! তাই তো সে রাগায়।

'বাইকে উঠুন।'

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে মেঘ গিয়ে বাইকে উঠল। আজকে দ্বিতীয়বার সে মেহমেদের বাইকে উঠেছে। মেহমেদ তার হাতে হেলমেট দিয়ে নিজের মাথায় হেলমেট পড়ে নিলো। বলল,

'পেছনে ধরে বসুন। জোরে টান দেব।'

মেঘ কপাল কুঁচকে তার এটিটিউট দেখল। পেছন ধরল না বরং মেহমেদের পেটের কাছের শার্ট ধরল। ওমনি বৃষ্টির মাঝে একটা বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল মেহমেদ।

'আরে আরে ব্যাডটাচ করছেন কেন?'

মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,

'ব্যাড টাচ কোথায় করলাম?'

'পেট থেকে হাত সরান মিস মঞ্জুলিকা সুরসুরি লাগছে।'

'আপনি পুরুষ নামের কলঙ্ক, মিঃ জলহস্তী!'

মেঘ তেতে উঠে বলল। মেহমেদ আলাভোলা চাহনিতে চেয়ে বলল,

'আপনি শুকরিয়া করুন, আমার মতো একটা ইনোসেন্ট বর পাচ্ছেন। আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে এই মেহমেদের হাত ছোঁয়নি এমনকি বাইকের পেছনে বসার ও সুযোগ পায়নি।'

'কোনো মেয়ের দিন এত খারাপ আসেনি যে তারা আপনার হাত ধরবে কিংবা আপনার বাইকে উঠবে।'

'আপনার তবে খারাপ দিন চলছে, মিস মঞ্জুলিকা!'

সে দাঁত কেলিয়ে বলে বাইক স্টার্ট দিল। মেঘ উদাসীন চিত্তে চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শীতল ফোঁটা উপভোগ করছে। মেহমেদ এক ঝলক আয়নায় সেই মুখটি দেখে স্মিত হাসল।

মেঘ সেভাবেই বলে উঠল,

'আমার বাবা আমায় কখনো একজন গোয়েন্দার সাথে বিয়ে দেবে না।'

'তবে কী করব? গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে চা বিক্রি করতে বসব? এই গোয়েন্দাগিরি আর চা বানানো ছাড়া আমি আর কিছু পারি না।'

মেঘ হেসে উঠল। মেহমেদ বলল,

'চলুন এভাবে পারিয়ে যাই।'

'কোথায়?'

'দূর পাহাড়ে।'

'তারপর?'

'গলির মোড়ে কাজী অফিস আছে। প্রথমে বিয়ে করব, তারপর বাইক নিয়ে সোজা বান্দরবান চলে যাব, তিন দিনের হানিমুনে শেষে আপনার বাবার সামনে এসে দাঁড়াব।'

'আপনার সাথে হানিমুনে কোনো মেয়েকে মানাবে না। একটা গুঁইসাপ নিয়ে হানিমুনে যান। যে ছোঁয়ার আগেই আপনার মতো তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে উঠবে।'

'আপনি গুঁইসাপের থেকে কম কোথায়?'

মেঘ দাঁত খিচে তার পেটে একটা চিমটি কাটল। সহসা মেহমেদ গুঁইসাপের মতোই মোচড়ামুচড়ি করে উঠল।

'আরে আরে আবার ব্যাড টাচ করেছে।'

মেঘ খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। মেহমেদ শ্রান্ত স্বরে বলল,

'আপনার বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠাই।'

'আচ্ছা।'

'যদি না করে দেয় তবে পালিয়ে যাব।'

'আচ্ছা।'

মেহমেদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। কপাল কুঁচকে বলল,

'আমি কিন্তু মজা করছি না।'

'আমিও মজা করছি না।'

দৈবাৎ মেহমেদ একটা উল্লাসে ভরা চিৎকার দিয়ে উঠল।

'আরেএএ মিস মঞ্জুলিকা রাজি হয়ে গিয়েছে!'

মেঘ স্মিত হেসে তার পিঠে মাথা এলিয়ে দিল। আমরা যাকে ভালোবাসি নাকি যে আমাকে ভালোবাসে—এই দু'টো অপশনের মাঝে দ্বিতীয়টাকে বেছে নেয়া তার কাছে সুখকর মনে হয়েছে। জীবন ছোট্ট! সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করতে নেই।

~পরিশিষ্ট~

মধ্যাহ্নের প্রহর। আকাশে সূর্যের তেজি আলোর আধিপত্য। জনজীবন ব্যস্ততায় মুখরিত।

কলিং বেল বাজতেই তালহার কোলে থাকা তিন মাসের ছেলেকে বিছানায় নামাতে গেল। কিন্তু ওমনি ছেলেটা গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। তালহার বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে আবার কোলে তুলে নিলো। বিড়বিড় করে বলল,

'বলেছিলাম মায়ের আহ্লাদী হতে। সে হয়েছে বাবার আহ্লাদী!'

সে উদাম দেহের ছেলেকে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে নিয়ে দরজা খুলতে গেল। বাবা ছেলে মাত্র গোসল করে বের হয়েছে। মা-মেয়ে গোসল করছে। একটু পর তারা সবাই মেহমেদ আর মেঘের বিয়ের দাওয়াতে যাবে। তারা পালিয়ে বিয়ে করেছে। পরবর্তীতে তাদের সসম্মানে আবার বিয়ে দেয়া হচ্ছে।

দরজা খুলতেই কবিরের মুখটা ভেসে উঠল। সে যারপরনাই বিরক্তি নিয়ে বলল,

'স্যার বলেছিলেন বারোটায় বের হবেন। এখন বাজে একটা।'

'বাচ্চাকাচ্চার ঘরে টাইম মেইনটেইন করা কঠিন, কবির। ভেতরে এসো।'

তালহার পথ ছেড়ে দিল। কবির ভেতরে ঢুকে বলল,

'থাক সমস্যা নেই স্যার। এই সুযোগে ছোট স্যারকে দেখা হয়ে যাবে।'

'তুমি তো উপহার পাঠালে। নিজে আসোনি কেন?'

'স্যার, আপনি ইদানিং যা দৌড়ের উপর রাখছেন তাতে শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। নেহায়েৎ আজ মেহমেদ স্যারের বিয়ে বলে একটু অবসর পেয়েছি।'

তালহার প্রত্যুত্তর করল না। কবির বলল,

'স্যার, দিন ছোট স্যারকে একটু কোলে নেই।'

তালহার ছেলেকে তার কোলে দিল। স্বস্তি পেল ছেলে কান্না করে ওঠেনি দেখে। সে খানিক সাবধানী কণ্ঠে বলল,

'নাক, কান আর চুল ধরবে না।'

'কেন?'

'বারণ করেছি ধরবে না।'

বলেই তালহার নিজের ঘরে গেল ছেলের পোশাক আনতে।

কবির এক মহা কৌতুহলী ব্যক্তি। যা বারণ করবে তা করাই তার কাজ। সে কপাল কুঁচকে তুষারের নাকের ডগা ছুঁয়ে দিল।

'কই কিছু হয়নি তো।'

সে বিড়বিড় করে এবার নাকে একটা চাপ দিল। এরপর কান ধরল, খাঁড়া খাঁড়া চুলগুলোকে নুইয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু চুলগুলো মোটে নুইছেই না।

সে বিড়বিড় করে বলল,

'কেমন চুল। স্যারের মতো ঘাড়ত্যাড়া!'

'নাক, কান চুল সব ই তো ধরলাম...

বলতে গিয়েই সে থেমে গেল। মিনিটের মাথায় ছোট্ট বাচ্চাটি রাগে লাল হয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তার নাক কান অস্বাভাবিক লাল হয়ে গিয়েছে আর চুলগুলো খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছে।

'একি একি কাঁদছ কেন? আঙ্কেল তো কিছু কর....'

কবিরের এই বাক্যটিও অসম্পূর্ণ থেকে গেল তার পুরো মুখশ্রী আকস্মিক গরম পানিতে ভিজে উঠল। হতভম্ব কবির আশ্চর্য হয়ে তাকালো নিজের মুখ আর গায়ের দিকে। সব ভিজে গিয়েছে।

তার দৃষ্টি আটকালো তুষারের প্রধান অঙ্গের দিকে। যেটা চুলের মতোই খাঁড়া হয়ে ঝর্ণার মতো পানি ছাড়ছে।

সে আচমকাই ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে কাঁদো কাঁদো গলায় চিৎকার করে উঠল,

'স্যারররর! ছোট স্যার আমার গায়ে হিশি করে দিয়েছে। আমার নতুন পাঞ্জাবী, মেহমেদ স্যারের বিয়ে!'

তার কান্না করার উপক্রম! তালহার ছুটে বের হলো ঘর থেকে। ছেলের লাল মুখ দেখে বুঝে গেল সে মারাত্মক রেগে আছে।

সে গম্ভীর মুখে কবিরের দিকে তাকালো। যে পাঞ্জাবীতে মুখ মুছতে ব্যস্ত।

তালহার দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞাসা করল,

'তুমি ওর নাক কান ধরেছ কবির? '

'একটু ধরেছিলাম স্যার!'

'তোমায় আমি বারণ করিনি?'

'আমি কী জানতাম নাক কান ধরলে রাগে হিশি করে দেবে?'

'তোমায় আমি কেন সাবধান করেছিলাম? আসলে আমি এখন হারে হারে বুঝতে পারছি যে কাজের ক্ষেত্রে যে গড়মিল গুলো হয় তাতে শতভাগ তোমার দোষ!'

তালহারের রাগান্বিত স্বরে কবির কাঁদো কাঁদো চোখে তাকালো। বলল,

'স্যার কোনো ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন নেই যে ও আপনার আর ম্যাডামের ছেলে।'

তালহার কঠিন চোখে তাকালো তার দিকে। কবির নিজেকে সংযত করল। তালহার মানিব্যাগ থেকে চার হাজার টাকা বের করে তার হাতে দিয়ে বলল,

'ওইদিকে কম ওয়াশরুম। ফ্রেশ হয়ে নতুন পাঞ্জাবী কিনে পড়ে নাও। ততক্ষণে আমরা তৈরি হয়ে বের হচ্ছি।'

কবির দ্বিরুক্তি করল না। চলে গেল।

তালহার হতাশার দৃষ্টিতে তাকালো ছেলের দিকে। যে এখন নিষ্পাপ চোখে এদিক ওদিক দেখছে।

বিয়ের ভেন্যুতে মানুষের সমাগম। তালহারের পুরো অফিসের সবাই আছে সেখানে। সবশেষে তালহার তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভেন্যুতে ঢুকতেই সকলের উৎসুক দৃষ্টি তাদের উপর পড়ল। এই প্রথম সকলে আনুষ্ঠানিকভাবে তালহারের পরিবারকে দেখছে।

খিলজি মাহমুদ হাসিমুখে এগিয়ে এসে আলিঙ্গন করল। বিন্দুর সাথে কথা বলল। ফাতিমাকে দেখে খিলজি মাহমুদ বললেন,

'তালহার তোমার কাছে জান্নাতের পরী রয়েছে।'

মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তালহার মৃদু হাসল। বলল,

'তা তো ঠিক স্যার।'

ফাতিমা আজ বিন্দুর সাদা জামদানী শাড়ির সাথে মিলিয়ে সাদা ফ্রক আর মাথায় সাদা বান্দানা বেঁধেছে। পায়ে সেই চিরচেনা ব্যালেরিনা শ্যু। বিন্দু আজ ও তার কোনো অভ্যাসে পরিবর্তন হতে দেয়নি।

বধূবেশে থাকা মেঘ তাদের দিকে তাকালো। পুরো ভেন্যুর মাঝে সবচেয়ে সুন্দর, প্রশান্তিদ্বায়ক কোনো দৃশ্য যদি থেকে থাকে তবে সেটা তালহার আর তার পরিবার। যে কি-না এক মুহুর্তের জন্যও তার মেয়ে আর স্ত্রীর হাত ছাড়েনি। মেঘ মৃদু হেসে এগিয়ে আসল তাদের কাছে। সে আজ ও তালহারের খুব ভালো বন্ধু হয়ে থেকে গিয়েছে। ফাতিমা আর তুষারকে আদর করে সে বিন্দুর দিকে তাকালো। তার হাত ধরে বলল,

'তালহারের স্ত্রীর চেয়ে, তালহারের সন্তানের মাকে বেশি সুন্দর আর স্নিগ্ধ লাগছে।'

বিন্দু মৃদু হাসল। মেঘের প্রতিটা কথায় এখনো তালহার জুড়ে থাকে। সে বলল,

'আমার সৌন্দর্যই তো তালহার।'

সেই ছোট্ট বাক্যে তালহার ফিরে তাকালো স্ত্রীর পানে। গম্ভীর, ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারা এই মানুষটাকে এই মেয়েটি সবসময় নিজের মতো করে বুঝে এসেছে। দিনশেষে সব সম্পর্কগুলোর কাছে হেরে যাওয়া তালহার শুধুমাত্র এই এক সম্পর্কে জিতে গিয়েছে। স্বামী হিসেবে সে প্রতিবার জয়ী হয়েছে শুধুমাত্র বিন্দুর কারণে।

মেঘ চলে যেতেই বিন্দু এগিয়ে এসে তালহারের হাত আঁকড়ে ধরল। তালহার ও মৃদু হেসে তার হাতটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল,

'আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসার জন্য শুকরিয়া!'

বিন্দু স্মিত হাসল।

বৈবাহিক সম্পর্কে একে অপরের বিশ্বাস, ভরসা, কম্প্রোমাইজ থাকা খুব প্রয়োজন। নয়তো সেই সম্পর্কের ভিত্তি কখনো মজবুত হয় না। সম্পর্কে সামান্য অবিশ্বাস, সন্দেহ বড় একটি ফাটল ধরানোর জন্য যথেষ্ট হয়! আর সম্পর্ক ধরে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,

সম্পর্কে কখনো তৃতীয় ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র জায়গা না দেয়া।

বিন্দু আর তালহার ছিল এক ডালে জুড়ে থাকা দুটি পাতা। যারা হাজার দফা বন্য হাওয়ার প্রকোপেও ঝড়ে পড়েনি। তারা সব ঝড় পেরিয়ে আজ ও সেই ডালে একই সাথে পাশাপাশি জুড়ে আছে। আর তাদের এই বন্ধনের নাম বৈবাহিক সম্পর্ক।

এটি ছিল তাদের সাদামাটা বৈবাহিক জীবনে আঁছড়ে পড়া ছোট্ট একটি ঝড়ের গল্প। যার নাম জোড়া পাতার দিনলিপি।

~সমাপ্ত~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন