ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৩১তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৩০

এইভাবেই কেটে যেতে থাকে অফিসের দিন গুলো। অফিসে নানান কাজ ব্যস্ততা আর নতুন নতুন প্রজেক্টের কাজ নিয়ে সবাই অনেকটাই কাজের চাপের মধ্যে দিয়ে সময় পার করে।

এই দীর্ঘ কয়েকটা দিন পার হওয়ার পরও মেহজাবিন আগের মতই তন্ময়কে এড়িয়ে চলে। কাজের কথা ছাড়া বাড়তি একটা কথাও বলে না সে। আর এদিকে যেনো তন্ময়ের মনের মধ্যে ব্যাকুলতা কমার কোনো নাম নেই। ছেলেটা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি তার মনে এই মিশ্র অনুভূতি গুলোর কারণ।

তবে অদ্ভুত একটা ব্যাপার সে লক্ষ্য করেছে ইদানিং, ফারিবার সাথে আদিলকে দেখলে তার আগের মতো খারাপ লাগছে না। তবে একবারে যে প্রভাব পরছে না এমনটাও নয়। কিছু দিন আগেও যদি তাদের একসাথে দেখতো তার ভেতরে কেমন আগ্নিয় শীখা জ্বলে উঠত। কিন্তু ইদানিং সবটা স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। তবে আবার খারপ লাগে যখন আদিল ফারিবার একটু বেশি খেয়াল রাখতে শুরু করে।

সে মাঝে মাঝে ভাবে এটা কেমন অনুভূতি, তার মন আসলে কি চয়। কেনো তার এই মিশ্র অনুভূতি, কেনো সে একটা নির্দিষ্ট যায়গায় তার মনটাকে আটকাতে পারছে না। তন্ময় তার নিজের উপরে নিজেই খুব বেশি বিরক্ত।

এদিকে মেহজাবিন সে নিজের সব কিছু চুপচাপ সহ্য করে নিচ্ছে। তার অনুভূতি মিশ্র নায়, সে জানে তার মন কি চায় বা কাকে চায়। কিন্তু পরিস্থিতি যেনো তাকে সেই ব্যক্তি বা অনুভূতি থেকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মেহজাবিন লক্ষ্য করে ইদানিং তন্ময় আগের মতো সারাদিন ফারিবার পেছনে পরে থাকে না, তন্ময় সারিদিন কেমন যেনো মনমরা হয়ে থাকে। সবার সাথে হেসে কথা বললেও কোথাও যেনো আগের সেই অতি চঞ্চল তন্ময় টাকে সে দেখতে পায় না।

যখন সে তন্ময় কে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তখন তার খুব ইচ্ছে হয় গিয়ে জিজ্ঞেস করতে, “কি তন্ময় সাহেব এখাবে পেঁচার মতো মুখ করে বসে আছেন কেনো”, কিন্তু তার সাহস হয় না তন্ময়ের মুখোমুখি হওয়ার। মেয়েটার ভয় হয় যদি সে তন্ময়ের সাথে কথা বলতে গেলে দুর্বল হয়ে পরে, যদি তন্ময় তার অনুভূতি গুলো বুঝে ফেল। তখন যদি তন্ময় তার অনুভূতি নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে তখন কি হবে। “না না এইসব হতে দেয়া যায় না।”

এইসব ভাবনা গুলোই যেনো তাকে টেনে ধরে রাখছে। মেহজাবিন এখন সবটাই সঠিক সময়ের হাতে রেখে দিয়েছে। তার মনে আছে ফারিবার কথাগুলো, যে ভালোবাসা মন থেকে হয়, সেই ব্যাক্তিটাকে অনুভব করেও ভালোবাসা যায়। এখন মেহজাবিনও ঠিক তাই করছে, সে তন্ময়কে ভালোবাসে ঠিকিই কিন্তু অনুভব করে দূর থেকে। সে বিশ্বাস করে তার ভালবাসা সত্যি হলে যে অবশ্যই তন্ময় কে একদিন সে নিজের করে পাবে।

সবকিছুর মধ্যে আদিলের পরিবর্তনটা একটু বেশিই চোখে পরে। সে আর আগের মত নেই, তার সেই গম্ভীর, নিয়ন্ত্রণ, একরোখা অথবা রাগি রূপটা যেনো অনেকাংশই কমে গেছে। এখন সে কোনো কিছু নিয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া করে না। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে সবার সাথে যতটা পারা যায় হেসে কথা বলে।

তবে সবকিছু মধ্যে কিছু জিনিস তার এখনো পরিবর্তন হয় নি, যেমন কাজের ব্যাপারে আর ফারিবার ব্যাপারে। সে তার কাজ নিয়ে যতটা সিরিয়াস, ফারাবাকে নিয়ে যেনো তার থেকেও বেশি সিরিয়াস হয়ে যায়।

আদিল ইদানিং ফারিবার একটু বেশি যত্ন করে তার প্রতিটা বিষয় খেয়াল রাখে। তবে এই বিষয়টা ফারিবার চোখের আড়াল হয় না। মেয়েটা সব বুঝতে পারে কিন্তু বুঝেও যেনো সে কিছুই বুঝতে চায় না। সে এখনো তার অতীত নিয়েই বাঁচতে চায়, নতুন কোনো সম্পর্কে সে নিজেকে জড়াতে চায় না। তার ভয় হয় যদি এইবারো খারাপ কিছু হয়। তাই এর চেয়ে ভালো সে একাই থাক, তার পুরোনো স্মৃতি নিয়ে।

আদিলের কথার ধরন, ফারিবার প্রতি তার যত্ন দিয়ে সে মেয়েটাকে অনেক ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করে কিন্তু ফারিবা কোনো ভাবেই তার সেই মনোভাব বুঝতেই রাজি না। তবুও আদিল ক্লান্ত হয় না সে তার অনুভূতি গুলো একটু একটু করে বুঝিয়ে দিতে চায়।

আর ফারিবা সে তার দায়িত্ব গুলো প্রতিনিয়ত খুব সুন্দর ভাবেই পালন করে যাচ্ছে। যেমন ভাবে তার পরিবারের ছোটো খাটো সব কিছু একহাতে সুন্দর মতো সামলে নেয়। তেমনি তার দায়িত্বে থাকা অফিসের কাজগুলো খুব গুছিয়ে পরিপাটি ভাবে করে।

তবে ফারিবার মধ্যেও একটা ছোট পরিবর্তন চোখে পরার মতো, যে মেয়ে আগে অফিসে এসে নিজের রুটিন মতো কাজ করতো। কারো সাথে বেশি কথা বলতো না শুধু নিজের কাজে সব মন থাকতে, সেই মেয়ে এখন সবার সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক ধরে রেখেছে। তাদের মধ্যে সব চাইতে কাছে একজন হয়ে উঠেছে মেহজাবিন মেয়েটা।

ফারিবার পরিবার বলতে শুধুই ফারদিনের পরিবারের মানুষ গুলো। তাদের বাহিরে যদি কেউ মেয়েটার মনে জায়গা করে থাকে সে একমাত্র মেহজাবিন।

-------------------------------

আজকে অফিসের পরিবেশটা খুব শান্ত। এই কয়টা দিনের কাজের চাপ আর প্রজেক্টের ব্যস্ততা মিলে সবার উপর অনেক ধকল গিয়েছে। তবে আজকে তুলনামূলক কাজ অনেকটাই কম।

তাই সবাই কাজের ফাঁকে আড্ডা দিচ্ছে, নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তবে পাশ থেকে একটা গুঞ্জন শুনা গেলো যে, কয়েকদিন পর বা আগামি মাসে অফিস থেকে ট্যুরে নাওয়া হবে।

প্রায় প্রতি বারই বছরের শেষের দিকে অফিস থেকে তিন দিনের জন্য ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়।

কারণ আদিল বিশ্বাস করে শুধু কাজ দিয়ে একটা কোম্পানির সাকসেস ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেই আফিসে কাজ করা মানুষদেরও যত্ন রাখতে হয়। তাই প্রতি বছর এই আয়োজন করা হয়। তবে এখনো অফিসিয়াল নোটিশ আসেনি।

তবুও সবার মধ্যে ঘুরতে যাওয়ার উত্তেজনা কাজ করছে।

এইসব কিছুর ফাকে তন্ময় ছিল একদম চুপচাপ, হাতে একমগ ধোয়া ওঠানো কফি নিয়ে আবির, তামান্না আর সাবরিনা শান্তার কথা শুনে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই কথার মাঝে ছেলেটার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

একপর্যায় সাবরিনা শান্তা তন্ময় কে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“কি ব্যাপার তন্ময় তোমার কি হয়েছে বলো তো।”

তন্ময় মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“না আপু, তেমন কিছু হয়নি।”

সাবরিনা শান্তা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি কি মনে করো আমরা কিছু বুঝি না? কয়েকদিন ধরেই দেখছি তুমি কেমন যেন বদলে গেছো।”

তামান্নাও মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যা আপু ঠিক বলেছে, তন্ময় সাহেব আগে সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা করতেন। এখন দেখুন, কফির মগ হাতে নিয়ে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাপারটা কেমন যেনো অদ্ভুত।”

তন্ময় ভ্রু কুচকে বললো,

“এখানে অদ্ভুতের কি দেখলেন।”

আবির মুচকি হেসে বলল,

“অদ্ভুত লেগেছে দেখেই তো বলল। তবে কোনো সমস্যা হলে বলতে পারেন। মনের মধ্যে এত চাপ নিবেন না।”

তন্ময় কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তারপর ধীরে ধীরে কফির মগটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আসলে নিজেকেই ঠিক বুঝতে পারছি না, কিছুদিন ধরে সবকিছু কেমন জানি এলোমেলো মনে হচ্ছে।”

চারজনের মাঝেই মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো।

আবির শান্ত গলায় বলল,

“তন্ময় সাহেব সব সময় কিছু প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। কিছু উত্তর ধীরে ধীরে সময়ের সাথে পাওয়া যায়। তবে দোয়া করি সেই সময়টা যেনো তাড়াতাড়ি আসে আপনার জীবনে, আপনাকে যেনো বেশিদিন ভুগতে না হয়।”

তন্ময় শুধু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিন্তু সেই হাসিটা চোখ পর্যন্ত পৌঁছালো না শুধু ঠোটের এক কোণে রয়ে গেলো।

ঠিক তখনই এইচআর বিভাগের একজন স্টাফ সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

“মে আই হেভ ইউর অ্যাটেনশন প্লিজ। গাইজ লুক এ্যাট মি, একটু আমার কখা শুনুন গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

অফিসে উপস্থিত সবাই তার দিকে তাকাতেই তিনি হাসিমুখে বললেন,

“আপনারা সকলে হয়তো ইতোমধ্যেই বিভিন্নভাবে খবরটা শুনেছেন। এবার অফিসিয়ালভাবেই জানানো হচ্ছে যে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাদের বার্ষিক অফিস ট্যুর অনুষ্ঠিত হবে। তিন দিন দুই রাতের এই ট্যুরে অফিসের সকল কর্মী অংশগ্রহণ করবেন। খুব শিগগিরই লোকেশন, সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়া হবে, সে পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন আর মন দিয়ে কাজ করুন, ধন্যবাদ।”

কথা শেষ হতেই পুরো অফিসজুড়ে আনন্দের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।

“ইয়েস!”

“অবশেষে!”

“এইবার কিন্তু অনেক মজা হবে।”

চারপাশের সবাই নিজেদের মতো করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করল।

তামান্না তো উত্তেজিত হয়ে বলেই ফেলল,

“আমি কিন্তু এবার অনেক মজা করবো ঘুরবো আর ছবি তুলব।"

সাবরিনা শান্তা হেসে বললেন,

“শুধু ছবি তুললেই হবে না, সবাই মিলে অনেক এনজয়ও করতে হবে।”

আবির মুচকি হেসে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই ট্যুরটা আমাদের সবার জন্যই ভালো হবে। কয়েকদিনের জন্য কাজের চাপ থেকে বের হতে পারবো আমরা।"

তন্ময় শুধু ছোট্ট করে বলল,

“হয়তো।”

তার দৃষ্টি অজান্তেই চলে গেল অফিসের অন্য প্রান্তে।

মেহজাবিন তখন ফারিবার পাশে দাঁড়িয়ে সবার কথাবার্তা শুনছিল। মুখে খুব একটা উচ্ছ্বাস না থাকলেও ফারিবার কথা শুনে মাঝে মাঝে হালকা হাসছিল।

এক মুহূর্তের জন্য মেহজাবিনের চোখও তন্ময়ের দিকে চলে এলো।

দু'জনের চোখ আবারও এক হলো।

কিন্তু আগের মতোই মেহজাবিন দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

তন্ময় নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর কথা বাদ দিয়ে নিজের কাজে চলে গেলো।

এদিকে ফারিবা আর মেহজাবিন কথা বলছিল, তখন সে মেহজাবিন কে জানায়,

“অফিস থেকে ট্যুরে যাবে ঠিকই কিন্তু আমি মনে হয় যেতে পারবো না।”

ফারিবার কথা শুনে মেহজাবিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“সে কি আপু কেনো।”

“আমি মায়ের কাছ থেকে কিভাবে অনুমতি নিব, এইজন্য যাব না ভাবছি।”

মেহজাবিন মন খারাপ করে বলে,

“না আপু এই কথা বললে হবে না, দরকার হলে আমি যাব তোমাদের বাড়ি, গিয়ে আন্টির থেকে পার্মিশন নিব। তবুও তোমার যেতেই হবে আমি কিছু শুনতে চাই না।”

“কিন্তু মেহ....।”

ফারিবাকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে মেহজাবিন বলে,

“কোনো কিন্তু নয় আপু আমি আছি তো, যেভাবেই হোক তোমাকে নিয়ে যাবই।”

ফারিবা আর কিছু বলল না। সে জানে, ফারদিনের মাকে বললে তিনি হয়তো সরাসরি না করবেন না। বরং মেহজাবিন যদি নিজে গিয়ে অনুরোধ করে, তাহলে রাজি হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। কিন্তু তবুও কোথাও যেন তার মন সায় দিচ্ছিল না।

নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া, নতুন স্মৃতি তৈরি করা, এসব থেকে সে নিজেকে ইচ্ছে করেই দূরে সরিয়ে রেখেছে। তার মনে হয়, যত নতুন স্মৃতি জমবে, ততই পুরোনোগুলোর সঙ্গে এক অদৃশ্য লড়াই শুরু হবে। আর সেই লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহস এখনো তার হয়নি।

ফারিবার মুখের দ্বিধাটা বুঝতে পেরে মেহজাবিন মৃদু হেসে তার হাতটা আলতো করে চেপে ধরল।

“এত কিছু ভাবছো কেন আপু? তিন দিনের জন্যই তো। সবাই একসাথে যাব, একটু ঘুরব, গল্প করব। দেখবে, অনেক ভালো লাগবে।”

ফারিবা হালকা মাথা নেরে সম্মতি দিল, কিন্তু ফারিবার কপালে ভাজ দেখে তাতে সম্মতির চেয়ে সংকোচটাই বেশি দেখা দিলো।

“দেখি, আগে বাসায় কথা বলি।”

“ঠিক আছে। তবে আমি কিন্তু হাল ছাড়ছি না। আন্টি যদি না-ও বলেন, আমি নিজে গিয়ে তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করব।”

মেহজাবিনের দৃঢ় কণ্ঠ শুনে ফারিবার মুখে এবার একটু স্বাভাবিক হাসি ফুটে উঠল যা তার চোখ দেখেই বুঝা গেলো। মেয়েটা মনে মনে ভাবল, জীবনে কিছু মানুষ হয়তো ঠিক এমনই হয়, নিজের মানুষদের জন্য বিনা দ্বিধায় লড়ে যায়।

দু'জনের কথোপকথনের মাঝেই অফিসের ভেতর আবার ট্যুর নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনা শুরু হয়ে গেল। কে কী কী করবে এসব নিয়ে সবাই নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

এদিকে আদিল নিজের কেবিনে বসে জমে থাকা কাজগুলো শেষ করতে ব্যস্ত। সামনে অফিস ট্যুর, তাই যাওয়ার আগে হাতের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুছিয়ে শেষ করে রাখতে চায় সে। যেনো পরবর্তীতে কোনো সমস্যা না হয়।

টেবিলে রাখা ফালের দিকে চোখ রেখে একের পর এক ফাইল চেক করছিল সে। কখনো কোনো ডকুমেন্টে সই করছে, কখনো আবার ই-মেইলের রিপ্লাই দিচ্ছে। ঠিক তখনই ডেস্কের উপর রাখা ইন্টারকমটা হাতে নিয়ে কল করে মেহজাবিন কে তার কেবিনে আসতে বলে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ।

“জি স্যার।”

“একবার আমার কেবিনে আয় তো।”

“আচ্ছা স্যার, আসছি।”

কয়েক মুহূর্ত পর দরজায় নক করার শব্দ হতেই আদিল মাথা তুলে বলল,

“কাম ইন।”

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল মেহজাবিন।

“জ্বি স্যার বলুন কি দরকার ছিল।”

আদিল সামনে রাখা কয়েকটা ফাইল তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এই ফাইলগুলো আজকের মধ্যেই ক্লিয়ার করে দিস। আর ট্যুরের আগে যে রিপোর্টটা জমা দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও আজ বিকেলের মধ্যে করার চেষ্টা করিস।”

মেহজাবিন ফাইলগুলো হাতে নিয়ে মাথা নাড়ল।

“ওকে স্যার।”

একটু থেমে আদিল আবার বলল,

“আচ্ছা তুই এখন নিজের কাজে লেগে যা।”

মেহজাবিন চুপ করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। মেহজাবিনকে অন্যমনস্ক দেখে আদিল জিজ্ঞেস করে,

“কি হয়েছে তোর, কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ।”

মেহজাবিন আদিলের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

“হ্যা একটু মন খারাপ।”

“কেনো।”

“ওইযে ফারিবা আপু আছে না উনি বলল উনি নাকি ট্যুরে যাবে না, বাসা থেকে হয়তো পার্মিশন পাবে না।”

মেহজাবিনের কথা শুনতেই আদিলের মুখের রং পাল্টে গেলো কিন্তু সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

“দরকার হলে তুই গিয়ে কথা বলে পারমিশন নিবি।”

আদিলের কথায় মেহজাবিনের মুখে হাসি ফুটে এলো,

“আমিও ফারিবা আপুকে এই কথাই বলেছি, আচ্ছা আমি গিয়ে পার্মিশন নিব। যেই ভাবেই হোক আপুকে নিয়ে যাব। আচ্ছা থাকো আমি আমার কাজে যাই।”

কথাটা বলেই মেহজাবিন নিজের কাজে চলে যায়। আর এইদিকে আদিলের কানে যেনো এখনো মেহজাবিনের বলা কথাটাই বাজতে লাগলো। আদিল নিজের হাতের মুঠি শক্ত করে বলল,

“এখনো মেয়েটাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে, আমি এই সুযোগ বেশি দিন দিব না।”

এদিকে ফারিবা নিজের ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল। ঠিক তখনই পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তন্ময়। চোখ তুলে তাকে দেখেই ফারিবা হালকা হেসে ডাক দিল,

“কি ব্যাপার তন্ময় সাহেব? আজকাল তো আপনাকে আড্ডা দিতে দেখাই যায় না।”

ফারিবার কথা শুনে তন্ময় থেমে গেল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“আর বলবেন না ম্যাডাম। আপনাদের বস সেই সুযোগটাই আর কোথায় রাখলেন!”

ফারিবা ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে বলল,

“সে কী তন্ময় সাহেব? এভাবে বলছেন কেন? উনি তো আপনারও বস।”

তন্ময় পাশের একটা চেয়ার টেনে ফারিবার সামনে বসে পড়ল। তারপর বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে একদম আহত সুরে বলল,

“কি যে বলেন, মিস ফারিবা! উনি যদি সত্যিই আমার বস হতেন, তাহলে কি আর এভাবে কাজের চাপে পিষে মারতেন? আমি তো এখন মনে হচ্ছে অফিসে না, যুদ্ধক্ষেত্রে চাকরি করছি!”

তন্ময়ের নাটকীয় কথা শুনে ফারিবার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। মাথা নেড়ে সে বলল,

“অতটাও বাড়িয়ে বলার দরকার নেই। কাজ তো সবাই-ই করছে।”

“সবাই করছে ঠিকই, কিন্তু আমার ভাগে মনে হয় একটু বেশিই পড়ে। আমি তো ভাবছি এইচআর টিমের কাছে লিখিত অভিযোগ দেব।”

“কিসের অভিযোগ?”

“আমার ওপর অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ।”

কথাটা বলেই তন্ময় এমন একটা গম্ভীর মুখ করল যে ফারিবা হেসে ফেলল। পর্দার আড়ালে ফারিবার হাসি না দেখা গেলেও তার চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে যে হাসছে। হাসার এক পর্যায়ে বলল,

“তন্ময় সাহেব আপনি পারেনও বটে।”

“এইভাবে যদি না বলতাম তাহলে আপনি হাসতেন বলুন।”

তন্ময় আর ফারিবা জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, দুইজনই কথার মাঝে অনেক হাসেন আর এইসব কিছু নিজের কেবিন থেকে দেখে ফেলে আদিল।

আদিল রাগে নিজের হাতের মুঠো আবারও শক্তির করে ফেলে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। চোয়াল শক্ত করে বলে,

“এই লোকটা বারবার কেনো ফারিবার কাছেই আসে। কেনো আমাকে রাগিয়ে দেয়। আমার শান্ত থাকাটা কি করো পছন্দ হচ্ছে না। সবাইকি চায় আমি হাইপার হয়ে যাই। এই লোকটার কখনো শিক্ষা হবে না এতো বড় একটা বিপদের হাত থেকে ফিরে এসেও কোনো শিক্ষা নেই তার।”

কতক্ষন এক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে রাগে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দেয় আদিল। এরপর কিছু একটা ভাবতে থাকে আর সাথে সাথে ইন্টারকমে ফোন করে কিছু একটা বলে।

বেশ কিছুক্ষন পর যখন সবাই নিজের ডেস্ক গুছিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হবে তখন একজন এইড-আর টিমের স্টাফ ফারিবার সামনে এসে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলে,

“মিস. ফারিবা, দয়াকরে বাড়িতে যাওয়ার আগে এই ফাইলটা চ্যাক করে আদিল স্যার কে দেখিয়ে তারপর যাবেন।”

ফারিবা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে ফাইলটা নিয়ে কাজে লেগে যায়। আর এদিকে সবাই বাড়ির দিকে যেতে থাকে। তন্ময়ও যাওয়ার আগে একবার ফারিবার পাশে এসে জিজ্ঞেস করে গেছে,

“আজকেও ওভার টাইম।”

ফারিবা কাজ করতে করতেই বলল,

“অনেক দিন পর করছি তো।”

ফারিবার কথায় তন্ময় অবাক হয়ে বলে,

“মিস ফারিবা আপনার কথায় অবাক না হয়ে পারি না, ওভার টাইম করেও এতটা রিল্যাক্স কিভাবে থাকেন।”

“দেখুন তন্ময় সাহেব কাজ তো কাজই, আমি কখনো কাজকে ভয় পাই না।”

ফারিবার কথায় এইবার তন্ময় মৃদু হেসে বলে,

“সত্যিই মিস. ফারিবা আমি আপনাকে যতই দেখি ততই অবাক হই। আচ্ছা আপনি কাজ করেন। চাইলে আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করতে পারি।”

“তার প্রয়োজন হবে না তন্ময় সাহেব আপনি চলে যান।”

এরপর তন্ময় আর কিছু না বলে চলে যায় আর ফারিবাও নিজের কাজে মন দিতে শুরু করে।

তন্ময় যাওয়ার কিছুক্ষন পর আদিল নিজের কেবিন থেকে বের হয়ে ফারিবার ডেস্কের সামনে আসে। আসার পর চুপ করে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে ফারিবা কে ডাক দেয়।

আদিলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ফারিবা পেছনে ফিরে উঠে দাঁড়ায়। ফারিবা আদিল কে দেখে জিজ্ঞেস করে,

“কিছু বলবেন স্যার।”

আদিল কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে ফারিবার দিকে তাকিয়ে থাকে এরপর বলে,

“গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবো বলেই তো এসেছি।”

“কি গুরুত্বপূর্ণ কথা স্যার।”

আদিল ফারিবার সামনে কিছুটা এগিয়ে এসে বলে,

“এইটা আমার মনের কথা ফারিবা, আজ হয়তো না বললে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে।”

আদিলের এমন কথায় ফারিবা চকমে যায়। তার হৃদস্পন্দন হঠাৎ করে বেরে যায়, চারপাশে এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাওয়ার পরেও তার কাপালে ঘামের বিন্দু জমতে দেখা যায়। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,

“মানে.....

চলবে....

কি এমন বলবে আদিল ফারিবাকে, আর কথাটা শুনেইবা ফারিবা কেমন রিয়েক্ট করবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন