ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৩৭তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৩৬

বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফারদিন আর ফারিবার সম্পর্কটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছিল। তাদের ভালোবাসায় ছিল না কোনো বাড়াবাড়ি, ছিল না কোনো নাটকিয়তা। ছোট ছোট যত্ন, অসংখ্য খুনসুটি আর একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাসেই গড়ে উঠেছিল তাদের পৃথিবী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবাই এখন তাদের চিনে। ক্যাম্পাসে একসঙ্গে হাঁটা, ক্যান্টিনে বসে এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খাওয়া, ক্লাস শেষে গাছতলায় বসে গল্প করা এসব যেন তাদের প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গিয়েছিল। সবাই যেনো তাদের প্রেমের উদাহরণ দিয়ে যেতো।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শেষ হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। আকাশজুড়ে কালো মেঘ জমে আছে। হঠাৎ করেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল।

সবাই দৌড়ে বারান্দার নিচে আশ্রয় নিল। শুধু ফারিবা লাইব্রেরির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ সে ছাতা আনেনি। এমনিতে সবসময় তার ব্যাগে একটা ছোট ছাতা থাকে কিন্তু আজকে আনতে ভুলে গিয়েছে।

ঠিক তখনই পিছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল, কন্ঠটা শুনে ফারিবা পেছনে তাকাতেই ফারদিনকে দেখতে পায়। ফারদিন ফারিবার দিকে এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলে,

“কি গো কন্যা, বৃষ্টি দেখছো নাকি আমার জন্য অপেক্ষা করছো?”

ফারিবা কিছু বলতে যাবে তখন খেয়াল করলো ফারদিনের পুরো শরীর ভিজে একাকার। হাতে একটা ছাতা, কিন্তু সেটাও বন্ধ। ফারিবা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এইভাবে ভিজেছো কেন?”

ফারদিন একগাল হেসে উত্তর দিল,

“তোমার কাছে আসতে গিয়ে।”

“সে কি, সাথে ছাতা থাকতেও কেনো ভিজতে গেলে।”

“ছাতা ছিল তাতে কি, তাই বলে কি বৃষ্টি বিলাস করবো না। এই আবহাওয়ার আনন্দ নেব না।”

ফারিবা বিরক্ত হয়ে নিজের ওড়না দিয়ে ফারদিনের মুখ আর মাথা মুছে দিয়ে বললন,

“সবসময় বারাবারি করলে চলে, জ্বর এলে কিন্তু আমি দেখতে আসব না।”

ফারদিন মুচকি হেসে বলল,

“তুমি যদি সত্যিই না আসো, তাহলে জ্বর সারবে কি করে।”

ফারিবা অসহায় মুখে মাথা নাড়ে বলে

“তোমার কাছে উত্তর সবসময় তৈরি থাকে তাই না। একটা কথাও মাটিতে পরতে দাও না।”

“এইটা কেমন কথা ফারিবা, তোমার কথা কি করে মাটিতে পরতে দেই বলো। তোমার মত করে তোমার কথা গুলোও আমার কাছে অনেক মূল্যবান।”

ফারদিনের কথা শুনে ফারিবা হেসে ফেলে, হঠাৎ করে বৃষ্টি আরো জোরে নামতে শুরু করে। ফারদিন ধীরে ধীরে ছাতাটা খুলে ফারিবার মাথার ওপর ধরল।

নিজে অর্ধেক ভিজে থাকলেও ছাতা পুরোটা ফারিবার দিকে ধরে রেখেছে।

কিছুদূর হাঁটার পর ফারিবা খেয়াল করল, তার একফোঁটাও বৃষ্টি লাগছে না, অথচ ফারদিনের কাঁধ আর হাত ভিজে গেছে। ফারিবা ছাতাটা ঠিক করে ধরে নিয়ে বলল,

“ছাতা এইভাবে ধরতে হয়, আর তুমি কিভাবে ধরেছো। ঠিক মতো ধরো আমাকে ছাতার নিচে রেখে সে নিজে ভিজে চলেছে।”

ফারিবার কথা শুনে ফারদিন খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমার কিছু হবে না কিন্তু তুমি ভিজে অসুস্থ হলে আমার কষ্ট হবে।”

এই সাধারণ কথাটাই যেন ফারিবার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে নরম করে ছুঁয়ে দিল। সে আর কিছু বলল না, আর কোনো প্রতিবাদের সুরও তুললো না। শুধু নিঃশব্দে ফারদিনের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

ফারদিন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই ফারিবা খুব আস্তে বলল,

“জানো ফারদিন আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়।”

“কিসের ভয়।”

“যদি কোনো দিন তোমাকে হারিয়ে ফেলি, তখন আমি কি নিয়ে থাকবো ফারদিন।”

ফারিবার এমন কথা শুনে ফারদিন এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে আলতো করে ফারিবার কপালে টোকা দিয়ে বলল,

“তুমি এত হারানোর কথা ভাবো কেন, কন্যা? আমি তো তোমার কাছে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমি এসেছি সারাজীবন তোমার পাশে থাকে তোমাকে আগলে রাখার জন্য।”

ফারদিনের কথা শুনে ফারিবা শুধু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। ফারদিন আলতো করে ফারিবার গাল টেনে দিল আর ফারিবা অপলক তার দিকে তাকিয়ে রইলো। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো, আল্লাহ কি সত্যিই তার কপালে এতোটা সুখ লিখে রেখেছে? আর এই সুখ আর কপালে সইবে তো।

------------------------------------------

কিছুদিন পর….

সেদিন ছিল শুক্রবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস ছিল না। সকাল থেকেই ফারিবা তার সেই অনাথ আশ্রমে ব্যস্ত ছিল। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে পড়ানো, তাদের সঙ্গে খেলাধুলা, তারপর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের কিছু কাগজপত্রের কাজ সব মিলিয়ে কখন যে বিকেল হয়ে গেছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি।

সব কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীরে একটু বিশ্রাম নিতে অফিস রুমে যাওয়ার পথে আশ্রমের গেটের দিকে তার চোখ চলে যায়। ফারিবা একটু খেয়াল করে দেখতে পায় একটা বড় গাছের নিচে বাইকের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারদিন।

হাতে একটা কাগজের ব্যাগ। ফারিবা অবাক হয়ে এগিয়ে এসে বলল,

“তুমি এখানে কখন এলে।”

ফারদিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“বেশিক্ষন হয়নি মাত্র দুই ঘন্টা হয়েছে।”

ফারিবা অবাক হয়ে বলে,

“দুই ঘণ্টা!”

“হুম।”

“তবে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলে যে ভেতরে এলেনা কেনো।”

ফারদিন চোখ ছোটো করে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে বলে,

“দারোয়ান টা কি নতুন।”

“হ্যাঁ ”

“এই দারোয়ান আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি।”

ফারিবা কপালে হাত দিয়ে বলে,

“তাহলে আমাকে ফোন করলে না কোনো। ফোন করলে তো আমি বেরিয়ে আসতাম।”

ফারদিন মাথা নাড়িয়ে বলে,

“তুমি বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলে। বিরক্ত করতে ইচ্ছে করছিল না গো।”

কথাটা শুনে ফারিবার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।

সে ধীরে বলল,

“কত কষ্ট করে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে যে, এটা বুঝি খুব ভালো হলো।”

ফারদিন হাসল বলল,

“দরকার হলে তোমার জন্য ঠিক এইভাবে সারাটা জীবন অপেক্ষা করতে পারি, আমার কখনো কোনো কষ্ট হবে না।”

তারপর হাতে থাকা কাগজের ব্যাগটা এগিয়ে দিল বলল,

“নাও এটা তোমার জন্য।”

“কি আছে এতে।”

“খুলেই দেখো।”

ফারিবা কাগজ টা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখল তার প্রিয় জিনিস ফুচকা নিয়ে এসেছে ফারদিন। ফুচকা দেখে ফারিবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে খুশি হয়ে বলে,

“আচ্ছা তুমি জানলে কীভাবে আজ আমার এটা খেতে ইচ্ছে করছিল।”

ফারদিন মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বলল,

“জানি না তবে হঠাৎ করেই মনে হয়েছিল আমার কন্যার আজ ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে তাই নিয়ে এলাম।”

ফারিবা হেসে বলল,

“আমার মনে হয় তুমি একজন জাদুকর, কিভাবে যেনো আমার মনের কথাগুলো বুঝে যাও।”

ফারদিন মুচকি হেসে উত্তর দিল,

“আমি কোনো জাদুকর নই কন্যা, আমি শুধু তোমায় ভালোবেসে তোমার মন পড়তে শিখেছি। যেনো তুমি কোনো কিছু চাওয়ার আগেই আমি তোমার জন্য সব কিছু নিয়ে আসতে পারি।”

ফারদিনের এমন কথা শুনে প্রতিবার ফারিবা অবাক হয়, সাথে আল্লহকে ধন্যবাদ জানায় তার জীবনে একজন এমন প্রেমিক পুরুষকে পাঠানোর জন্য।

কথা শেষে দু’জনে আশ্রমের মাঠে বসে ফুচকা খেতে থাকে, হঠাৎ একটা ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে ফারিবার কোলে উঠে বসে। ফারদিন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,

“এই যে ছোট্ট ম্যাডাম, আমার গার্লফ্রেন্ড কে পুরো দখল করে নিয়েছো দেখছি!”

মেয়েটা নিষ্পাপ মুখে উত্তর দিল,

“দখল কোথায় করলাম ফারিবা আপু তো আমার।”

ফারদিন নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরে বলল,

“ফারিবা আপু যদি তোমার হয়, তাহলে আমি কার, এখন আমার কি হবে। আমার তো কেউ রইলো না।”

মেয়েটা কিছুক্ষণ ভেবে মুখে একরাশ ভাব নিয়ে বলল,

“নাটক কম করো ভাইয়া, আমি জানি তুমি আপুর, কিন্তু আপুর তোমার না, ফারিবা আপু শুধু আমার।”

কথাটা বলেই ছোটো মেয়েটা ফারিবাকে জড়িয়ে ধরে আর মুহূর্তেই তিনজনই হেসে উঠে। আর সেই হাসির শব্দে সন্ধ্যার নীরবতাটাও যেন মিষ্টি হয়ে উঠেছিল। ফারিবা তখন চুপচাপ ফারদিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মনে মনে শুধু একটাই দোয়া করছিল,

“হে আল্লাহ... এই মানুষটার হাসিটা যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।”

----------------------------------------------

আশ্রমের বাচ্চাদের সঙ্গে সারাদিন কাটানোর পর সন্ধ্যার দিকে ফারিবা ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অফিসে কিছু কাগজপত্র গুছিয়ে রাখছিল।

ঠিক তখনই অফিসের ইনচার্জ রেহানা ম্যাম দরজায় এসে দাঁড়ালেন। মৃদু হেসে ফারিবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ফারিবা, একটু আমার রুমে আসবে মা?”

ফারিবা ফাইলগুলো টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মতি দিল,

“জ্বি ম্যাম আসছি।”

রেহানা ম্যামের রুমে ঢুকতেই তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটা নীল রঙের ফাইল তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

“এটা তোমার জন্য।”

ফারিবা অবাক হয়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এটা কী ম্যাম?”

রেহানা ম্যাম চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে বললেন,

“আগামী সপ্তাহে আমাদের ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের বার্ষিক অনুদানের একটা মিটিং আছে। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, সিইও, ডিরেক্টর আর অনেক সম্মানিত অতিথিরা আসবেন।”

তিনি একটু থেমে আবার বললেন,

“এবার আমরা চাই, শুধু মুখে মুখে সাহায্য না চেয়ে একটা বাস্তবসম্মত প্রজেক্ট তাদের সামনে তুলে ধরি। যাতে তারা বুঝতে পারেন, তাদের একটা ডোনেশন কতগুলো শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।”

ফারিবা মনোযোগ দিয়ে কথা গুলো শুনছিল। রেহানা ম্যাম এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আমি চাই, এই প্রজেক্টটা তুমি তৈরি করো।”

কথাটা শুনে ফারিবা যেন একটু থমকে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আমি?”

“হ্যাঁ, তুমিই।”

“কিন্তু ম্যাম... এখানে তো আমার চেয়েও অনেক বেশি অভিজ্ঞ সম্পূর্ণ মানুষ আছেন।”

রেহানা ম্যাম মমতা নিয়ে হাসলেন এরপর বসা থেকে উঠে সোজা ফারিবার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“অভিজ্ঞতা সব সময় যোগ্যতার মাপকাঠি হয় না, মা। এই আশ্রমের গল্প, এই বাচ্চাদের কষ্ট, তাদের স্বপ্ন এইসব কিছু তো সবচাইতে ভালো তুমি বোঝো। কারণ তুমিও তো একদিন তাদেরই একজন ছিলে। তোমার চেয়ে সুন্দর করে এই গল্প আর কেউ বলতে পারবে না।”

ফারিবা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। রেহানা ম্যাম আবার বললেন,

“আমি চাই, এমন একটা প্রজেক্ট তৈরি করো, যেটা দেখে অতিথিরা শুধু হাততালি নায়, বরং এই শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।”

ফারিবার বুকের ভেতর কেমন একটা দায়িত্ববোধ কাজ করল। সে দৃঢ় গলায় বলল,

“আমি চেষ্টা করব ম্যাম। ইনশাআল্লাহ আপনাদের কাওকেই নিরাশ করব না।”

রেহানা ম্যাম স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,

“আমি জানি তুমি পারবে।”

------------------------------------------------

কয়েকদিন পর…

গত তিন রাত ধরে ঠিকমতো ঘুমায়নি ফারিবা।

কখনো ল্যাপটপে প্রেজেন্টেশন বানিয়েছে, কখনো আশ্রমের শিশুদের ছবি আর তথ্য সংগ্রহ করেছে, আবার কখনো বাজেট হিসাব মিলিয়েছে।

তার এই ব্যস্ততার কারণে গত কয়েকদিন ফারদিনের সঙ্গেও খুব একটা সময় কাটানো হয়নি।

ফারদিন অবশ্য একবারও অভিযোগ করেনি।

বরং প্রতিদিন রাতে ফোন করে শুধু একটা কথাই বলত,

“কাজ শেষ হলে আমাকে ফোন দিও। আমি জেগে থেকে তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।”

ফারদিনের এই ছোটো ছোটো যত্ন, ফারিবার পরিস্থিতি বুঝতে পারা, এইসব কিছু যেনো ছেলেটার প্রতি তাকে আরো দুর্বল করে তোলে। ফারদিন তার জীবনে আসার পর থেকে যেনো তার জীবনে কোনো কিছুর আফসোস নেই। আর কোনো কিছু অপূর্ন নেয়, ফারদিন যেনো সব কিছু পরিপূর্ণ করে দিয়েছে তার জীবনে।

ইভেন্টের দিন…

সকালের প্রথম সূর্যের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আজকের দিনটা ফারিবার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের ওড়নিটা আরেকবার ঠিক করে নিল।

আজ তার পরনে সাদা রঙের খুব সুন্দর একটা থ্রি-পিস। জামার গলায় আর হাতার কিনারায় সূক্ষ্ম সাদা সুতোয় করা নকশা। একেবারে সাধারণ সাজ। লম্বা ঘন কালো চুলগুলো আলগা করে বিনুনি করা। হাতে শুধু একটা ঘড়ি। আর কয়েকটা সাদা কাঁচের চুড়ি।

মুখে কোনো ভারী সাজ নেই। তবুও তাকে দেখলে মনে হচ্ছিল যেনো সকালের শিশিরে ভেজা সাদা শিউলি ফুল। ফারিবা ব্যাগে ল্যাপটপ, প্রজেক্ট ফাইল আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে এল।

বাহিরে বেরিয়ে আসতেই সে থমকে গেল। বাইক নিয়ে আগেই এসে দাঁড়িয়ে আছে ফারদিন। আজ তার পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট যেনো সে আগে থেকেই জানতো ফারিবাও একই রঙের জামা পরবে।

ফারিবা এগিয়ে আসতেই ফারদিন যেন কয়েক সেকেন্ড কথা বলতেই ভুলে গেল। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সি তার কন্যার দিকে। ফারদিনকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফারিবা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

ফারদিন ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর খুব আস্তে বলল,

“একটা কথা বলব?”

“হুম বলো?”

“আজ তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে, আমার মনে হচ্ছে, যদি আজ কেউ তোমাকে দেখে, তাহলে কেউ না কেউ তো আজ তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নিবেই।”

ফারদিনের আজব কথায় ফারিবা হেসে ফেলল। এরপর ফারদিনের নাক আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,

“আবার শুরু করেছো আজব কথা। ”

ফারদিন মাথা নেড়ে বলল,

“না, সত্যি বলছি। আজ আমার কেশবতী কন্যাকে দেখে মনে হচ্ছে, আকাশ থেকে যেনো এক টুকরো সাদা মেঘ নেমে এসেছে।”

লজ্জায় ফারিবার গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল। ফারিবাকে লজ্জা পেতে দেখে ফারদিন মুচকি হাসে, এরপর ফারিবার কপালের পাশে উড়ে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,

“আজ কোনো টেনশন করবে না, একদম নার্ভাস হবে না, আমি জানি তুমি পারবে। কারণ তুমি শুধু একটা প্রজেক্ট উপস্থাপন করতে যাচ্ছো না। তুমি অনেকগুলো শিশুর ভবিষ্যতের জন্য লড়তে যাচ্ছো।”

এক মুহূর্তের জন্য ফারিবার সব ভয় যেন মিলিয়ে গেল। সে শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ফারদিন হেলমেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“চলো কন্যা... আজ তোমাকে জিততেই হবে।”

ফারিবা হেলমেট পরে বাইকের পেছনে বসল।

ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বাইকটা ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।

------------------------------------------

এদিকে ইভেন্টটা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আজকের দিনটা ফারিবার কল্পনার চেয়েও ভালো কেটেছে। স্টেজে দাঁড়িয়ে প্রথমে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলেও, ধীরে ধীরে সে নিজেকে সামলে নিয়েছিল।

আশ্রমের শিশুদের জীবন, তাদের স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি করা তার প্রজেক্ট উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হলরুমজুড়ে করতালির শব্দ ভেসে উঠেছিল।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নতুন করে আশ্রমের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছে। রেহানা ম্যাম তো আনন্দে বারবার ফারিবার মাথায় হাত রেখে বলছিলেন,

“আমি জানতাম মা, তুমিই পারবে। আজ তুমি শুধু আমাদের মুখ উজ্জ্বল করোনি, এই বাচ্চাগুলোর ভবিষ্যতের জন্যও একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছ।”

ফারিবা শুধু মুচকি হেসেছিল। এই প্রশংসার চেয়েও তার কাছে বড় ছিল একটা বিষয় আজ সে সত্যিই আশ্রমের জন্য কিছু করতে পেরেছে।

সব কাজ শেষ করে বাইরে বের হতেই চারপাশে সন্ধ্যার নরম আলো নেমে এসেছে।

গেটের ঠিক সামনেই বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারদিন। তার হাতে ছোট্ট একটা বাক্স। ফারিবাকে দেখেই মুখভর্তি হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো ফারদিন।

“অভিনন্দন, ম্যাডাম সব কিছু সুন্দর ভাবে প্রজেন্ট করার জন্য।”

ফারিবা অবাক হয়ে বলল,

“তুমি কি করে জানলে, যে সব কিছু ঠিকঠাক মতো হয়েছে।”

ফারদিন ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“বারে আমার গার্লফ্রেন্ড কী অ্যাচিভ করবে, সেটা আমি না জানলে কে জানবে শুনি?”

কথাটা বলেই বাক্স টা তার হাতে ধরিয়ে দিল।

ফারিবা খুলে দেখল, ভেতরে ছোট্ট একটা কেক।

সাদা ক্রিমের ওপর খুব সুন্দর করে লেখা,

"I'm Proud Of You, My Keshoboti Konna.”

লেখাটা পড়তেই ফারিবার চোখ দুটো ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে ফারদিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত কিছু করার কী দরকার ছিল?”

ফারদিন খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,

“আজ তুমি জিতেছো। আর তোমার প্রতিটা ছোট্ট জয় আমার কাছে উৎসবের মতো। তাই উদযাপন তো করতেই হবে।”

ফারিবা কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে হেসে ফেলল। সেই হাসিটাই যেন ফারদিনের কাছে দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল।

----------------------------------------------------

কিছুক্ষণ পর বাইকটা শহরের কোলাহল ছেড়ে নদীর পাশের শান্ত রাস্তায় এসে থামল।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপরে হালকা বাতাস বইছে। দু’জনে পাশাপাশি বসে কেক কাটল।

প্রথম টুকরোটা ফারিবা তুলে ধরতেই ফারদিন মাথা পেছনে সরিয়ে বলল,

“না, আগে একটা কথা বলো।”

“কী কথা।”

“আজকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটা কে?”

ফারদিনের এমন আজব প্রশ্ন শুনে ফারিবা সবসময় হেসে ফেলে, সে তার হাসি কোন মতে থামিয়ে বলল,

“সেইটা আমি কি করে জানবো বলো তো।”

“আরে এটাও জানো না, আমি বলছি দাঁড়াও। সেই ব্যাক্তি টা হলো ফারদিন সাহেব। কারণ তিনি আজ তার কেশবতী কন্যার জন্য এত সুন্দর সারপ্রাইজের আয়োজন করেছে।”

ফারিবা হেসে কেকটা তার মুখে গুঁজে দিল,

“নাটকবাজ লোক একটা।”

ফারদিন মুখভর্তি কেক নিয়েই বলল,

“আরে কন্যা নাটকবাজ নয়, প্রেমিক পুরুষ।”

দু'জনেই একসঙ্গে হেসে উঠল। হাসির শব্দটা নদীর বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরবতা তারপর হঠাৎ ফারদিন খুব শান্ত গলায় বলল,

“জানো কন্যা, আমি সবসময় একটা স্বপ্ন দেখি।”

ফারিবা তার দিকে তাকাল।

“কী স্বপ্ন?”

ফারদিন দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“একদিন আমাদের একটা ছোট্ট বাড়ি হবে। খুব বড় কিছু না, ছোট্ট একটা বাড়ি। সামনে অনেক ফুলের গাছ থাকবে। তুমি সকালে গাছে পানি দেবে, আর আমি চা বানিয়ে আনব। বিকেল হলে আমরা আশ্রমের বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে বের হব। তারা বাড়িটা মাথায় তুলে রাখবে, আর আমরা বসে বসে তাদের দুষ্টুমি দেখব।”

সে একটু থেমে মুচকি হেসে আবার বলল,

“আর রাতে তুমি আমার পাশে বসে বই পড়বে, আর আমি তোমার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে গিটারে প্রেমের সুর তুলবো। এইটুকুই আমার চাওয়া, এর থেকে বেশি কিছু আমার চাই না। শুধু তুমি আমার পাশে সারাটাজীবন থাকলেই হবে।”

ফারিবা চুপচাপ শুনছিল। তারপর খুব আস্তে নিজের মাথাটা ফারদিনের কাঁধে রেখে বলল,

“আল্লাহ চাইলে অবশ্যই তোমার সব স্বপ্নই একদিন সত্যি হবে ফারদিন।”

ফারদিন মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকাল এরপর ফারিবার মাথার উপরে নিজের মাথা ঠেকিয়ে আকাশের চাঁদ উপভোগ করতে থাকলো।

—----------------------------------------------

দেখতে দেখতে আরো কয়েক মাস কেটে গেছে।

এদিকে ফারদিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ হয়ে এসেছে। বন্ধুদের অনেকেই ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করতে শুরু করেছে। কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিচ্ছে।

কিন্তু ফারদিনের স্বপ্নটা ছিল একটু আলাদা।

সে সবসময় চাইত নিজের পরিচয়টা নিজের হাতেই গড়ে তুলতে। তাই চাকরির পেছনে না ছুটে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ থেকেই নিজের একটা স্টার্টআপ নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। তার কয়েকজন কাছের বন্ধু আর একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ছোট পরিসরে নতুন একটি প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার পরিকল্পনা এগোতে থাকে।

কাজটা সহজ ছিল না। দিনের পর দিন মিটিং, প্রেজেন্টেশন, হিসাব-নিকাশ, নতুন নতুন পরিকল্পনা সবকিছু মিলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।

কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝেও একটা জিনিস কখনো বদলায়নি। ফারিবার জন্য তার সময়। সারাদিন যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম মেসেজটা যেত ফারিবার কাছেই।

আর রাতে যত ক্লান্তই থাকুক, ফারিবার কণ্ঠ না শুনে তার ঘুমই আসত না। এইজন্যই হয়তো বলে যদি ইচ্ছে থাকে তবে হাজার টা ব্যাস্ততার মধ্যে প্রিয় মানুষ কে সময় দেয়া যায়। আর যদি ইচ্ছে না থাকে তাহলে খালি সময়েও ব্যস্ততার বাহানা খুঁজে বেরায়।

একদিন দুপুরে ফারিবা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল। হঠাৎ করে তার ফোনটা কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফারদিনের নামটা। ফারিবা মুখে হাসি ফুটিয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে উত্তেজিত কণ্ঠে ফারদিন বলল,

“কন্যা, তুমি এখন কোথায়?”

“লাইব্রেরিতে আছি কেনো।”

“বের হও।”

“এখন?”

“হ্যাঁ, এখনই।”

“ফারদিন, আমি পড়ছি কিছুদিন পর আমার পরিক্ষা।”

“আজকে কোনো অজুহাত শুনব না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে নামো।”

কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল সে। ফারিবা বিরক্ত মুখে নিচে নেমে এল। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ফারদিন। চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখবরটা সে পেয়ে গেছে।

ফারিবা এগিয়ে গিয়ে বলল,

“এবার বলো, এমন কী হয়েছে এতো জরুরী তলবে ডাকলে কেনো।”

ফারদিন কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ করে ফারিবার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে হেসে বলল,

“এই কন্যা।”

“হুম বলো।”

“আমাদের স্টার্টআপের প্রথম প্রজেক্টটা আজ অফিসিয়ালি অনুমোদন পেয়েছে।”

কয়েক সেকেন্ড ফারিবা স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। পরের মুহূর্তেই তার মুখ ভরে উঠল আনন্দে।

“সত্যি বলছো তুমি।”

“আলহামদুলিল্লাহ সত্যি বলছি।”

কথাটা শেষ হতেই ফারিবা সব ভুলে গিয়ে আনন্দে ফারদিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরল।

তার চোখ দুটোও আনন্দে চিকচিক করে উঠেছে।

“আমি জানতাম তুমি পারবে ফারদিন। আমি সত্যিই জানতাম।”

ফারদিন মুগ্ধ হয়ে ফারিবার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো এই পৃথিবীতে অনেক মানুষই তার সাফল্যের অভিনন্দন জানাবে।

কিন্তু এই একটা মেয়ের চোখে নিজের জন্য এত গর্ব দেখে তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব অর্জন যেনো আজ সার্থক হয়ে গেছে। ফারদিন চাইলেই এই কথাটা ফোনে বলতে পারতো, কিন্তু এখন যেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে হয়তো এই হাসি মাখা মুখটাই দেখা হতো না। ফারদিন আজ ফারিবার খুশি হওয়া দেখে নিজের সাথে ওয়াদা করে নিল, এই হাসি খুশি মুখটা দেখার জন্য সে সব কিছু করবে।

চলবে…

ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আর গল্পটা কেমন লাগছে গঠনমূলক মন্তব্য দিয়ে জানাবেন, ধন্যাবাদ 🌸

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন