#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_৪০
চার পাশে ফজরের আজান ভেসে আসতেই নতুন একটা দিনের সূচনা হলো। আজকের সকালটা অন্যসব সকালের মতো নয়।
আজকের সূর্য যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল, বাতাসে যেন অন্যরকম একটা প্রশান্তি। চারপাশে উৎসবের আমেজ। যে দিনটার জন্য দুটি মানুষ এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে, অবশেষে সেই দিনটাই এসে গেছে।
আজ ফারদিন আর ফারিবার জীবনের সে কাঙ্খিত সময়টা, তাদের বিয়ে। সকালের নরম আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিল না ফারিবা। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে শুয়ে ছিল সে।
মনে হচ্ছিল, সবকিছু যেন স্বপ্ন। কয়েক বছর আগেও যে মেয়েটা নিজের ভবিষ্যৎ বলতে কিছুই কল্পনা করতে পারত না, আজ সেই মেয়েটাই নিজের নতুন জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
“ফারিবা ঘুম ভাঙেনি নাকি?”
রেহানা ম্যামের কণ্ঠ শুনে ফারিবা উঠে বসল।
“জ্বি ম্যাম উঠছি।”
রেহানা ম্যাম ভেতরে এসে মৃদু হেসে বললেন,
“আজ কিন্তু অলসতা করার কোনো সুযোগ নেই। আজ আমাদের কনেকে অনেক সুন্দর করে সাজাতে হবে যেনো জামাই বাবাজি চোখ ফেরাতে না পারে।”
ফারিবা লজ্জায় মাথা নিচু করে হেসে ফেলল।
রেহানা ম্যাম এগিয়ে এসে তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ রহমতে অবশেষে দিনটা চলেই এলো।”
এই ছোট্ট কথাটুকুতেই ফারিবার বুকটা কেমন যেন ভরে উঠল। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে আশ্রমের উঠোনে ছোট ছোট বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। কেউ ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে। কেউ অতিথিদের জন্য চেয়ার পরিষ্কার করছে। আবার কেউ চিৎকার করে বলছে,
“আজ কিন্তু আপুর বিয়ে!”
তাদের নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস দেখে অজান্তেই হেসে ফেলল ফারিবা। ঠিক তখনই একটা ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। হাতে ছোট্ট একটা বেলি ফুলের মালা। হাপাতে হাপাতে বলল,
“আপু এটা তোমার জন্য, আমি নিজের হাতে বানিয়েছি।”
ফারিবা হাঁটু গেড়ে বসে তার সমান হয়ে পরম মততা মাখা কন্ঠে বলল,
“সত্যিই তুমি বানিয়েছো?”
মেয়েটা গর্ব করে মাথা নাড়ল।
“হুম। সুন্দর হয়েছে আপু?”
ফারিবার চোখ ভিজে উঠল। সে আলতো করে মেয়েটার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“হ্যা খুব সুন্দর হয়েছে, এইটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপহার।”
ছোট্ট মেয়েটা খুশি হয়ে হেসতে হাসতে দৌড়ে চলে গেল। ফারিবা অনেকক্ষণ মালাটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই আশ্রম, এই মানুষগুলো, এই ছোট্ট ছোট্ট মুখগুলো, সবকিছুই তার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, বিদায়ের কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু আজ তার চোখে কোনে কোনো প্রকার ভয়ের ছাপ নেই।
কারণ সে জানে সে কাউকে হারিয়ে কোথাও যাচ্ছে না। বরং নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার হাত ধরে আরেকটা পরিবারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দূরে কোথাও তখন সকালের রোদ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। আর সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। দুটি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বন্ধনের দিকে। ফারিবা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই আশ্রমের ছোট্ট উঠোনটা যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল।
“আপু উঠে গেছে!”
কে যেন চিৎকার করে উঠতেই একঝাঁক বাচ্চা দৌড়ে তার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়াল। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে ছোট্ট একটা শুভেচ্ছা কার্ড, আবার কেউ শুধু তার হাতটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছোট্ট মেয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপু, তুমি বিয়ে হয়ে গেলে আমাদের ভুলে যাবে না তো?”
প্রশ্নটা শুনে ফারিবার বুকটা হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল। সে নিচু হয়ে মেয়েটার দুই গাল আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
“পাগলি একটা! মানুষ কি নিজের পরিবারকে ভুলে যায়?”
“তাহলে তুমি আসবে?”
“শুধু আসবই না, তোমাদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসব। আর জানো, তোমরা যখনই আমাকে ডাকবে, আমি চলে আসব।”
“সত্যি তো।”
“হ্যা ১০০% সত্যি।”
মেয়েটা খুশি হয়ে ফারিবাকে জড়িয়ে ধরতেই আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য বাচ্চারাও একে একে তাকে জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তে ফারিবা যেন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ বলে মনে করছিল। রক্তের কোনো সম্পর্ক নয়, তবুও এই ছোট ছোট মানুষগুলোর ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
…………………………………………………
সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়তেই শহরের অন্য প্রান্তেও ব্যস্ততা বেড়ে গেল। আজ ফারদিনদের বাড়িতেও যেনো উৎসবের ঢেউ।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই সকাল থেকেই বাড়ি আনন্দে মাতিয়ে তুলেছে। ড্রয়িংরুমে কেউ গল্প করছে, উঠোনে কেউ ফুল সাজাচ্ছে, আবার কেউ বারবার ঘড়ি দেখে বলছে,
“বরকে তাড়াতাড়ি তৈরি করাতে হবে, না হলে বরযাত্রী নিয়ে যেতে দেরি হয়ে যাবে”
ঠিক তখনই মিতু ট্রে হাতে ফারদিনের ঘরে ঢুকল।
ঘরে ঢুকেই সে হেসে ফেলল। ফারদিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
“এই যে বর সাহেব।”
ফারদিন ঘুরে তাকিয়ে মিতুকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু বলবি।”
“বলবো তে অবশ্যই।”
“হ্যা তহলে বল।”
“বলছিলাম যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি স্বপ্ন দেখছিস?”
“কোই না তো।”
“মিথ্যা বলার দরকার নেই। তোর মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, তুই তোর কন্যার কথাই ভাবছিস।”
ফারদিন একটু হেসে মাথা নিচু করে বলল,
“তা ওর কথা না ভেবে কার কথা ভাববো বল।”
মিতু মুচকি হেসে ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে বলল,
“আর কয়েক ঘণ্টা পরই তো সারাজীবনের জন্য ফারিবাকে পাশে পেয়ে যাবি।”
কথাটা শুনে ফারদিন গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
“জানিস মিতু, আজকে বারবার মনে হচ্ছে আল্লাহ আমার জীবনে যত নিয়ামত দিয়েছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামতটাই হলো ফারিবা।”
মিতু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে আজ কোনো দুষ্টুমি নেই। শুধু আছে তৃপ্তি, কারণ এত বছর ধরে সে নিজের ভাইকে যতটা সুখী আজ দেখছে, ততটা আর কোনোদিন দেখেনি। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফারদিনের বাবা ভেতরে ঢুকলেন।
তার হাতে সুন্দর করে ভাঁজ করা অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি, সঙ্গে মিলিয়ে পাগড়ি আর মেরুন রঙের শাল। ছেলের সামনে এসে তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর নিজের হাতে শেরওয়ানিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“আজ তোমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিন বাবা।”
ফারদিন দু'হাতে শেরওয়ানিটা গ্রহণ করে বলে,
“জ্বি, আব্বু।”
তার বাবা ছেলের কাঁধে হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন,
“আজ থেকে তুমি শুধু ফারিবার একজন স্বামী নও, একজন অভিভাবকও হবে। মনে রাখবে, স্ত্রীকে ভালোবাসা সহজ, কিন্তু সারাজীবন সেই ভালোবাসার সম্মান রাখা অনেক বড় দায়িত্ব।”
ফারদিন মাথা নিচু করে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, আমি কখনো তাকে কষ্ট দেব না।”
বাবা সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি বাবা তুমি একজন আদর্শ স্বামী হবে, তবে খেয়াল রেখো মেয়েটার জীবনে কিছু নেই তুমি ছাড়া, সে তোমাকে আগলে ধরে বাঁচতে চায় তাকে সব সময় আগলে রাখবে, কখনো তাকে মাঝ পথে ছেড়ে যাবে না।”
ফারদিন তার বাবার দিকে তাকিয়ে ছলছল নয়নে বলে,
“আমি তোমার কথা মনে রাখবো আব্বু কখনো ফারিবাকে ছেড়ে যাব না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওকে আগলে রাখবো।”
ছেলের এমন আবেগঘন কথা শুনে সে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দেয়। এরপর ছেলেকে তৈরি হতে বলে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে ফারদিনকে তৈরি করতে শুরু করল। ওফ-হোয়াইট শেরওয়ানিতে তাকে আজ যেন অন্যরকম লাগছিল। মিতু চারপাশ ঘুরে দেখে হঠাৎ বলল,
“এক মিনিট!”
সে দৌড়ে গিয়ে আলমারি থেকে একটা ছোট্ট আতরের বোতল নিয়ে এল। হালকা করে ফারদিনের শেরওয়ানিতে আতর ছিটিয়ে দিয়ে বলল,
“এইবার ঠিক হয়েছে।”
ফারদিন হেসে বলল,
“তুই না থাকলে আমার কী হতো বল তো?”
মিতু গর্ব করে বলল,
“কি আর হতো, তোর বিয়েটাই হতো না।”
ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। হাসির মাঝেই ফারদিন আরেকবার জানালার বাইরে তাকাল। আজ আকাশটা অসম্ভব নীল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীটাও যেন আজ তাদের দু’জনের নতুন জীবনের সাক্ষী হতে সেজে উঠেছে।
…………………………………………………
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে তখনও কিছুটা সময় বাকি। চারদিকে আত্মীয়-স্বজনের ব্যস্ততা, হাসি-আড্ডা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এক অন্যরকম উৎসবের রূপ নিয়েছে।
ফারিবা নিজের ঘরে আয়নার সামনে চুপচাপ বসে ছিল। লাল বেনারসির ভারী আঁচলটা বুকের কাছে টেনে ধরে একবার নিজেকে আয়নায় দেখল। আজ সত্যিই কি সে নতুন একটা জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে?
ঠিক তখনই দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকলেন রেহানা ম্যাম। আজ তিনি অতিথি নন, একজন মায়ের মতোই এসেছেন। ভেতরে ঢুকেই কিছুক্ষণ চুপচাপ ফারিবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখে বললেন,
“মাশাআল্লাহ, আমার মেয়েটাকে এই শাড়িতে খুব সুমানাবে!”
ফারিবা উঠে দাঁড়াতেই রেহানা ম্যাম তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনে ছিল অদ্ভুত উষ্ণতা। কয়েক সেকেন্ড পর তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“আমার এখনো মনে আছে, অনেক বছর আগে এই আশ্রমের দরজায় ছোট্ট একটা মেয়েকে প্রথম দেখেছিলাম? সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলত না। আর আজ সেই মেয়েটাই নিজের নতুন জীবনে পা রাখতে যাচ্ছে।”
কথাগুলো শুনে ফারিবার চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল,
“আপনি না থাকলে আজ আমি এই জায়গায় আসতেই পারতাম না, ম্যাম। আপনারা সবাই মিলে আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন।”
রেহানা ম্যাম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন,
“না মা। আমি শুধু তোমার হাতটা ধরেছিলাম। হাঁটতে কিন্তু তুমি নিজেই শিখেছ। আর তুমি সবকিছু করার চেষ্টা করার সাহস দেখিয়েছো বলেই আমরা তোমার পাশে থেকে তোমাকে সাহায্য করতে পেরেছি।”
এরপর তিনি নিজের ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা মখমলের বক্স বের কর ফারিবার দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“এটা তোমার জন্য।”
ফারিবা অবাক হয়ে বক্সটা খুলতেই ভেতরে দেখতে পেল খুব সুন্দর একটা ছোট্ট সোনার লকেট। খুব দামি কিছু নয়। কিন্তু লকেটটার ওপরে ছোট্ট একটা ফুলের নকশা করা। ফারিবা উপহার টা দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
রেহানা ম্যাম মুচকি হেসে বললেন,
“জীবনে যত ঝড়ই আসুক, নিজের পরিচয়টা কখনো হারাতে দিবে না। আর এই লকেটটা তোমাকে সেই কথাই মনে করিয়ে দেবে, যে তুমি সবসময় এই ফুলের মতোই পবিত্র।”
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ফারিবা।
হাউমাউ করে কেঁদে উঠে রেহানা ম্যামকে জড়িয়ে ধরল। ঘরের ভেতরে উপস্থিত অনেকেরই চোখ ভিজে উঠল সেই দৃশ্য দেখে।
…………………………………………………
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো। আলোয় আলোয় ভরে উঠেছে পুরো বাড়ি। চারদিকে আত্মীয়-স্বজন, অতিথিদের কোলাহল, হাসির শব্দ, শিশুদের ছুটোছুটি সব কিছু মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
অন্যদিকে বরবেশে তৈরি হচ্ছে ফারদিন।
ওফ-হোয়াইট শেরওয়ানি, বুকজুড়ে সূক্ষ্ম জরি কাজ, হাতে একটা ঘড়ি। কাধে মেরুল শাল, মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দিতেই সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
“মাশাআল্লাহ!”
মিতু সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল বের করে কয়েকটা ছবি তুলে বলল,
“এই ছবি আমি আমার ভাবিকে দেখাব। যেন বুঝতে পারে আজ আমার ভাইটাকে কতটা স্মার্ট লাগছে।”
ফারদিন হেসে মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই তার বাবা কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“চলো বাবা, আজ থেকে তোমার নতুন জীবনের পথ চলা শুরু।”
খুব ছোট্ট একটা বাক্য। কিন্তু কথাটা শুনেই ফারদিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। কত বছর আগে সে কল্পনা করেছিল এই দিনটার কথা। আজ সত্যিই সেই দিনটা চলে এসেছে। সে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।
তারপর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বরযাত্রীদের গাড়িগুলো একটার পর একটা এগিয়ে চলল ফারিবার সেই আশ্রমের দিকে।
…………………………………………………
ওদিকে….
ফারিবার বাড়িতেও ব্যস্ততার কোনো শেষ নেই।
নিজেরঘরে বসে আছে ফারিবা। লাল বেনারসিতে তাকে যেন একেবারে অন্যরকম লাগছে। চোখে হালকা কাজল, লম্বা চুলে বেনুনি মাথাভর্তি ফুল সাথে ঘোমটা, গলায় গয়না, হাতে লাল-সাদা চুড়ি।
আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে ঠিক যেন গল্পের কোনো রাজকন্যা।
সবাই ফারিবাকে ঘিরে বসে ছিল, সবাই এই বিয়ে নিয়ে অনেক আগ্রহী কেনোনা এই আশ্রমে তারা প্রথম বারের মতো এমন আয়োজন দেখেছে। সবাই ফারিবার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ প্রশংসা করতে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় বাহির থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে এল,
“বর চলে এসেছে...!”
কথাটা শুনতেই ঘরের ভেতর হইচই পড়ে গেল। সবাই ব্যস্ত হয়ে বাইরে চলে গেল বরকে দেখার জন্য। শুধু ফারিবা চুপচাপ বসে রইল ঘরের ভেতরে। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে। আজ থেকে তার জীবনের পরিচয় বদলে যাবে। আজ থেকে সে শুধু ফারিবা থাকবে না, সে
কারও স্ত্রী হবে। এই ভাবনাটাই তাকে যেনো অদ্ভুত এক আবেগে ভরিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই রেহানা ম্যাম ধীরে ধীরে এসে তার পাশে বসলেন। মেয়েটার থুতনিটা আলতো করে তুলে মায়াভরা চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
“মাশাআল্লাহ, বলেছিলাম না এই শাড়িতে তোমাকে বেশ মানাবে। আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে মা।”
ফারিবার চোখে তখন চিকচিক করছে জল।
রেহানা ম্যাম তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“কাঁদছিলে কেন?”
ফারিবা মৃদু গলায় বলল,
“জানি না ম্যাম, আজ খুব বেশি খারাপ লাগছে।”
রেহানা ম্যাম হাসে বললেন,
“এটাই স্বাভাবিক মা, তবে আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন।”
তিনি আলতো করে ফারিবার হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
“শোনো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু ভালোবাসায় টিকে থাকে না। সম্মান, ধৈর্য, ক্ষমা আর বিশ্বাস এই চারটা জিনিস যদি ধরে রাখতে পারো, তাহলে কোনো ঝড়ই তোমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
ফারিবা মাথা নাড়ে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, আমি চেষ্টা করব।”
রেহানা ম্যাম তার কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
“আল্লাহ তোমাদের দুজনকে সবসময় সুখে রাখুক।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আবার ডাক এল,
“কনে প্রস্তুত তো?”
মিতু দৌড়ে ঘরে ঢুকে হাসতে হাসতে বলল,
“কোথায় দেখি তো আমার ভাবি কে, মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর লাগছে, ফারদিন ভাইতো আজকে তার কন্যার উপর থেকে চোখ সরাতেই পারবে না,
এবার চল তোর রাজপুত্র অনেকক্ষণ ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শুনে লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে ফারিবা। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। আজ সত্যিই তাদের অপেক্ষার শেষ হতে চলেছে।
…………………………………………………
সন্ধ্যার আকাশের কমলা আভা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ির উঠোনটা আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে আছে। সবার চোখে-মুখে আনন্দের ছাপ। আজকের এই মুহূর্তটার জন্যই যেন এতদিনের সব অপেক্ষা।
ঘরের মাঝখানে সুন্দর করে সাজানো আসনে পাশাপাশি বসে আছে ফারদিন আর ফারিবা।
ফারিবার পরনে গাঢ় লাল বেনারসি, মাথাজুড়ে লাল ওড়না। লাজে তার চোখদুটো নিচু, দু'হাতের আঙুল একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে বারবার।
তার পাশেই বসে আছে ফারদিন। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামার ওপর ওফ-হোয়াইট শেরওয়ানি, মাথায় টুপি। বাইরে থেকে নিজেকে যতই শান্ত দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন, তার চোখের গভীরে স্পষ্ট ধরা পড়ছে উত্তেজনা আর আবেগ।
কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেব সবার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত নসিহত করলেন। বিবাহের গুরুত্ব, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি নিকাহর আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। প্রয়োজনীয় তথ্য পড়ে শোনানোর পর তিনি স্নিগ্ধ কণ্ঠে ফারিবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনি কি, নির্ধারিত মোহরানায় উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে ফারদিন আয়ানকে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন, যদি আপনি রাজি থাকেন তাহলে বলুন কবুল?”
প্রশ্নটা শুনে ফারিবার বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল। সে একবার খুব আস্তে চোখ তুলে পাশে বসে থাকা ফারদিনের দিকে তাকাল। ফারদিনও মৃদু হাসি নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। সেই আশ্বাসভরা দৃষ্টি যেন মুহূর্তেই তার সমস্ত দ্বিধা দূর করে দিল।
ফারিবা মাথা নিচু করেই শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
কাজী সাহেব নিয়ম অনুযায়ী আবারও একই প্রশ্ন করলেন। এবারও সে বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
তৃতীয়বার প্রশ্ন করা হলে ফারিবার ঠোঁটে লাজুক একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে আনন্দের অশ্রু চিকচিক করছিল। সে ধীরে, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ... কবুল।”
এরপর কাজী সাহেব মুখ ঘুরিয়ে ফারদিনের দিকে তাকালেন।
“আপনি কি, নির্ধারিত মোহরানায় উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে ফারিবা নূর ইসলামকে আপনার স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন, যদি রাজি থাকেন তাহলে বলুন কবুল?”
প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করা মানুষটার মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল। আলহামদুলিল্লাহ কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল”
ফারদিন কাজিকে দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস অরার সুযোগ না দিয়ে একবারেই তিন কবুল বলে তার ফারিবাকে সারা জীবনের জন্য তার করে নেয়। ফারদিনের এমন কান্ড দেখে সকলে হেসে ওঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে একসঙ্গে ভেসে উঠে,
“আলহামদুলিল্লাহ!”
কেউ দুরুদ পড়তে লাগলেন, কেউ দু'হাত তুলে নবদম্পতির জন্য দোয়া করলেন। পুরো পরিবেশটা যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
এরপর কাজী সাহেব নিকাহনামা এগিয়ে দিলেন।
প্রথমে ফারিবা কাঁপা হাতে নিজের নাম লিখল। তারপর কলমটা ফারদিনের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সে মুচকি হেসে নিজের স্বাক্ষর করল।
একটি স্বাক্ষর, মাত্র কয়েকটি অক্ষর কিন্তু সেই কয়েকটি অক্ষরের মধ্য দিয়েই দুটি আলাদা জীবনের পথ চিরদিনের জন্য এক হয়ে গেল।
আজ থেকে তারা আর শুধু একে অপরের ভালোবাসার মানুষ নয়। আজ থেকে তারা একে অপরের হালাল জীবনসঙ্গী।
ফারদিন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। এত বছরের অপেক্ষা, এত স্বপ্ন, এত দোয়া সবকিছুর পর অবশেষে আল্লাহ তাদের হালাল সম্পর্কে বেঁধে দিয়েছেন। তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
পাশে বসে থাকা ফারিবার চোখও ভিজে উঠেছে। সে আস্তে করে দু'হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। আল্লাহ এত সুন্দর এককা দিন তার কপালে লিখে রেখেছিলেন সে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
বিয়ের কার্যক্রম শেষ হতেই মিতু দৌড়ে এসে ফারিবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“অবশেষে তুই আমার ভাবি হয়েই গেলি!”
ফারিবা হেসে বলে,
“তুই তো আগেই আমাকে ভাবি বানিয়ে ফেলেছিলি।”
“সেটাতো অফিশিয়ালি ছিল না, আজ থেকে অফিশিয়ালি তুই আমার ভাবি।”
চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। ঠিক তখনই ফারদিনের মা এগিয়ে এলেন। তার হাতে একটা ছোট্ট ভেলভেটের বাক্স। তিনি খুব স্নেহ করে ফারিবার পাশে বসে বাক্সটা খুললেন।
ভেতরে ছিল একটা পুরোনো কিন্তু খুব যত্নে রাখা সোনার লকেট। তিনি নিজ হাতে সেটা ফারিবার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“এটা আমার শাশুড়ি আমাকে দিয়েছিলেন। তারপর আমি এতদিন ধরে আগলে রেখেছি। আজ থেকে এটা তোমার।”
ফারিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলে,
“আন্টি...”
তিনি আলতো করে ফারিবার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে বললেন,
“আজ থেকে আর আন্টি না, মা বলে ডাকবে কেমন।”
শব্দটা শুনেই ফারিবার চোখ ভিজে গেল। জীবনে বহুদিন পর কেউ তাকে এত সহজে নিজের মেয়ে বলে গ্রহণ করল। হঠাৎ করেই তার সেই ভদ্র মহিলার কথা মনে পরে গেলো যে ভদ্রমহিলা তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ফারিবা সব চিন্তা বাদ দিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“মা...”
একটা মাত্র শব্দ, কিন্তু শব্দটার মধ্যে জমে ছিল বহু বছরের না পাওয়া ভালোবাসা। ফারদিনের মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
“আজ থেকে তুমি শুধু আমার ছেলের স্ত্রী নও। তুমি আমার মেয়েও।”
এমন আবেগঘন পরিবেশ দেখে চারপাশে অনেকেরই চোখ তখন ভিজে উঠেছিল।
…………………………………………………
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হতে শুরু করেছে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ব্যস্ততা ধীরে ধীরে শেষের দিকে। বাড়ির উঠোনে এখন আর আগের মতো কোলাহল নেই। আত্মীয়স্বজন কেউ গল্প করছে, কেউ আবার বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আর ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে ফারিবা।
আজ প্রথমবারের মতো নিজের পরিচিত সেই আশ্রম ছেড়ে নতুন জীবনে পা রাখতে হবে। যদিও আশ্রমটাই ছিল তার পৃথিবী, তবুও আজ মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে যেন কিছু একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। রেহানা ম্যাম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে বসলেন।
মেয়েটার মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে মৃদু স্বরে বললেন,
“কাঁদছো কেন মা?”
ফারিবা মাথা নাড়ল।
“জানি না ম্যাম... আজ খুব অদ্ভুত লাগছে।”
রেহানা ম্যাম মৃদু হেসে বললেন,
“যেদিন তোমাকে প্রথম এই আশ্রমে এনেছিল, সেদিনও তুমি কেঁদেছিলে। আজ আবার কাঁদছো। কিন্তু পার্থক্যটা জানো?”
ফারিবা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল।
“সেদিন তুমি সব হারিয়ে এখানে এসেছিলে। আর আজ তুমি নিজের একটা সুন্দর পরিবার পেয়ে এখান থেকে যাচ্ছো।”
কথাটা শেষ করেই তিনি ফারিবাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন।
“খুব সুখে থাকো মা। কখনো নিজেকে একা ভাববে না। এই আশ্রমের দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা থাকবে।”
ফারিবার চোখের পানি আর বাঁধ মানল না। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি মাঝেমধ্যে আসব, এই বাচ্চাদের ছেড়ে থাকতে পারব না।”
রেহানা ম্যাম হেসে বললেন,
“আমরা অপেক্ষা করে থাকব।”
ঠিক তখনই আশ্রমের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো দৌড়ে এসে ফারিবাকে ঘিরে ধরল। কেউ তার হাত ধরে আছে, কেউ ওড়না আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে সবসময় বলত ফারিবা আপু শুধু আমার, সে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“আপু তুমি চলে গেলে রাতে আমাকে গল্প কে শোনাবে?”
ফারিবার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেল।
“আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না, পাগলি। সুযোগ পেলেই চলে আসব। আর তুইও আমার বাসায় আসবি কেমন।”
মেয়েটা শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“সত্যি?”
“একদম সত্যি।”
এরপর একে একে সব বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরল সে। এই মানুষগুলোই তো ছিল তার প্রথম পরিবার। আজ তাদের ছেড়ে যেতে কষ্ট তো হবেই।
…………………………………………………
বাইরে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সবকিছু নীরবে দেখছিল ফারদিন। সে বুঝতে পারছিল, এই বিদায়টা ফারিবার জন্য কতটা কঠিন। তাই সে কোনো তাড়া দিল না। বরং ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফারিবার পাশে দাঁড়াল।আস্তে করে বলল,
“কন্যা...”
ফারিবা চোখ মুছে তার দিকে তাকাল। ফারদিন মৃদু হেসে বলল,
“চলো, তোমার নতুন ঠিকানায়?”
ফারিবা একবার পুরো আশ্রমটার দিকে তাকাল। এই উঠোন, এই গাছগুলো, এই বারান্দা, এই ছোট ছোট মুখ, সবকিছুকে চোখভরে দেখে নিল। তারপর ধীরে ধীরে ফারদিনের দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। ফারদিন শক্ত করে সেই হাতটা ধরে নিল। কিন্তু কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিল না। শুধু হাতের মুঠোটা আরও একটু শক্ত করে ধরলো।
তার সেই স্পর্শ যেন নীরবে বলে দিল,
"এবার থেকে আর একা নও তুমি, আমি সবসময় তোমার পাশে ঠিক এইভাবেই আছি।”
…………………………………………………
বেশ কিছুক্ষন পর গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে থামল ফারদিনদের বাড়ির সামনে। পুরো বাড়িটা নরম হলুদ আর সাদা আলোর মালায় ঝলমল করছে। গেটজুড়ে তাজা ফুলের সাজ, উঠোনজুড়ে আত্মীয়-স্বজনের ব্যস্ততা। নতুন বউকে একনজর দেখার জন্য সবাই যেন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল।
গাড়ির দরজা খুলতেই ফারদিন প্রথমে নেমে এল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিল ফারিবার দিকে। ভারী লাল বেনারসি, গয়নার ভার আর সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ফারিবা ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। এক মুহূর্তের জন্য সে চারপাশে তাকাল। এত মানুষের মাঝেও অদ্ভুত এক অচেনা অনুভূতি বুকের ভেতর জায়গা করে নিল। আজ থেকে এটাই তার নতুন ঠিকানা।
ঠিক তখনই ফারদিনের মা এগিয়ে এলেন, ফারিবাকে বরণ করে নিতে, মুখভর্তি স্নেহের হাসি নিয়ে তিনি ফারিবার সামনে দাঁড়ালেন।
“এসো মা অনেক অপেক্ষা করেছি তোমাকে এ বাড়িতে বরণ করে নেওয়ার জন্য।”
কথাটা শুনেই ফারিবার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। ছোটবেলা থেকে মা ডাকটা যেন তার জীবনে শুধু একটা অপূর্ণতা হয়েই ছিল। অথচ আজ একজন মানুষ কত সহজেই তাকে মা বলে আপন করে নিলেন। বরণের সব নিয়ম শেষ করে তিনি আলতো করে ফারিবার কপালে চুমু খেলেন।
“আজ থেকে এই বাড়িটা শুধু আমাদের নয়, তোমারও। কোনোদিন নিজেকে অতিথি ভাববে না, সবাইকে আপন মনে করে থাকবে, এখন থেকে তুমি আমারদের আর আমরা তোমার সব।”
ফারিবা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু গড়িয়ে পড়ার আগেই সে নিচু হয়ে শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করল। তিনি দ্রুত তাকে তুলে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন।
“সুখে থেকো মা।”
একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতু এতক্ষণ সবকিছু চুপচাপ দেখছিল। হঠাৎ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“বাহ চাচিমা, এটা কিন্তু ভারি অন্যায়, নতুন মেয়েকে পেয়ে পুরোনে মেয়েকে ভুলে গেলে।”
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। ফারিবা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। ঠিক তখনই ফারদিনের বাবা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। মুখে শান্ত একটা হাসি নিয়ে তিনি বললেন,
“মা, সংসার মানে শুধু সুখ নয়। দায়িত্বও আছে, বোঝাপড়াও আছে। তবে একটা কথা মনে রাখবে, আজ থেকে তুমি এই পরিবারেরই একজন। কোনো কষ্ট হলে মনে চেপে রাখবে না। মিতু যেমন আমাদের মেয়ে, তুমিও ঠিক তেমনই।”
শব্দগুলো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু ফারিবার কাছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আশ্বাস। সে মাথা নিচু করেই বলল,
“জ্বি আব্বু আমার মনে থাকবে।”
আব্বু ডাকটা শুনে মানুষটার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এদিকে মিতু আবারও শুরু করল।
“আচ্ছা অনেক ইমোশনাল কথা বার্তা হয়েছে। এবার আমার ভাবিকে নিয়ে ভেতরে যাই। সারাদিন না খেয়ে বসে আছে মানুষটা।”
ধীরে ধীরে সবাইবার সাথে ভেতরে প্রবেশ করল ফারিবা। ড্রইংরুমটা সুন্দর করে সাজানো। আত্মীয়স্বজন একে একে এগিয়ে এসে তাকে দোয়া করছিলেন। কেউ মাথায় হাত রেখে দোয়া দিচ্ছেন, কেউ আবার মিষ্টি মুখ করিয়ে দিচ্ছেন।
সবকিছুর মাঝেও ফারিবার বারবার মনে হচ্ছিল, এত আপন মানুষগুলো কি সত্যিই তার জন্য অপেক্ষা করছিল? যে মেয়েটা এতদিন নিজের বলে কাউকে পায়নি, আজ সেই মেয়েটাই এতগুলো সম্পর্কের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।
মুহূর্তের জন্য সে পাশ ফিরে তাকাল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ফারদিন। চোখে সেই চেনা শান্ত হাসি। দুজনের চোখ এক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফারদিন খুব আস্তে মাথা নাড়ল। কোনো কথা বলল না। তবুও সেই ছোট্ট ইশারাটুকুই যেন বলে দিল,
“ভয় পেও না কন্যা আমি তো আছিই।”
ফারিবা অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলল। হয়তো সত্যিই, আজ থেকে তার আর একা পথ চলতে হবে না। রাত অনেকটা গভীর হয়ে এসেছে। সারাদিনের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, আত্মীয়স্বজনের ভিড় আর একের পর এক নিয়মকানুন শেষে বাড়িটাও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে।
বাড়ির করিডোরে এখনও হালকা ফুলের ঘ্রাণ ভাসছে। দূরে কোথাও আত্মীয়দের চাপা হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন এক জীবনের প্রথম রাত। এদিকে মিতু আর বাড়ির কয়েকজন মিলে ফারিবাকে নিয়ে গেল ফারদিনের ঘরের সামনে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিতু দুষ্টু হেসে বলল,
“আচ্ছা ভাবি, এখন থেকে কিন্তু এই রুমটাই তোর রাজ্য। ফারদিন ভাই যদি বেশি বিরক্ত করে, আমাকে বলবি। আমি ছোটবেলা থেকেই ওকে ঠিক করার দায়িত্বে আছি।”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হেসে উঠল, সাথে ফারিবাও হাসলো, আরও কিছুক্ষণ মজা করে সবাই একে একে চলে গেল। দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরটা খুব বেশি সাজানো নয়। সাদা পর্দা, ছোট্ট বুকশেলফ, জানালার পাশে একটা চেয়ার, আর বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সাদা আর লাল ফুল। ফারিবা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে চারপাশটা দেখছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করল ফারদিন। দু'জনের মাঝখানে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
ফারদিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল,
“কী ভাবছো, কন্যা?”
ফারিবা জানালার দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল,
“ভাবছি সবকিছু কত তাড়াতাড়ি বদলে গেল।”
ফারদিন ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“ভয় লাগছে?”
ফারিবা সত্যিটাই বলল,
“একটু।”
ফারদিন কিছু না বলে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“আজ থেকে তোমার জীবনে শুধু একটা জিনিস বদলেছে, তোমার ঠিকানা। কিন্তু তোমার স্বপ্ন, তোমার পড়াশোনা, আশ্রমের বাচ্চারা, তোমার ইচ্ছাগুলো কোনোটাই বদলাবে না। আমি কখনো চাইব না, আমাকে পেয়ে তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলো।”
কথাগুলো শুনে ফারিবা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো আবারও ভিজে উঠেছে। ফারিবা ধীরে ফারদিনের গালে হাত রেখে মায়াভরা কন্ঠে বলল,
“তুমি সবসময় এত সুন্দর করে কথা বলো কীভাবে ফারদিন?”
ফারদিন হালকা হেসে বলল,
“সুন্দর করে বলতে পারি কি না জানি না। তবে একটা কথা সত্যি…”
সে একটু থামে বলল,
“আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসিনি, সম্মান করতেও শিখেছি।”
ফারিবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভরে উঠল।
সে খুব আস্তে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। ফারদিনও কোনো দ্বিধা না করে সেই হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। দু'জনেই কিছুক্ষণ নীরব।
সেই নীরবতার মধ্যেই যেন হাজারটা না বলা কথা লুকিয়ে ছিল।
জানালার বাইরে পূর্ণিমার আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। ফারদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“মনে আছে, একদিন নদীর ধারে বসে একটা ছোট্ট বাড়ির স্বপ্ন দেখেছিলাম?”
ফারিবা হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“মনে আছে।”
“আজ মনে হচ্ছে, সেই স্বপ্নের প্রথম দরজাটা খুলে গেছে।”
ফারিবা ধীরে ধীরে তার কাঁধে মাথা রাখে বলল,
“আর আমি চাই, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমরা এভাবেই পাশাপাশি হাঁটি, সুখে, দুঃখে, প্রতিটা পথে।”
ফারদিন আলতো করে তার মাথায় হাত রাখে বলে,
“ইনশাআল্লাহ, কন্যা। যতদিন আল্লাহ লিখে রেখেছেন, ততদিন তোমার হাসিটা আগলে রাখার চেষ্টা করব।”
বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছিল। আর সেই রাতের নীরবতায়, দুইটা মানুষ নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। শুধু একে অপরের পাশে সারাজীবন থাকার নীরব অঙ্গীকার নিয়েই নতুন জীবনের প্রথম রাতটাকে স্মৃতির পাতায় রেখে দিল।
…………………………………………………
দিনগুলো যেন নিজের ছন্দে এগিয়ে চলছিল। দেখতে দেখতে বিয়ের পরও কয়েক মাস কেটে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সংসার, নতুন সম্পর্ক সবকিছুর সঙ্গেই ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিল ফারিবা। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ তাকে এতটা আপন করে নিয়েছিল যে, মাঝে মাঝে সে নিজেই ভুলে যেত একদিন এই বাড়িতে সে নতুন ছিল।
সকালে ফারদিন অফিসে যাওয়ার আগে দু'জনে একসঙ্গে নাশতা করা, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফারিবার বিদায় জানানো, অফিসে পৌঁছেই ফারদিনের ছোট্ট একটা মেসেজ, ফেরার পথে ফুল নিয়ে আসা, এসবই ধীরে ধীরে তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ফারিবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হয়েছে। পাশাপাশি আগের মতোই আশ্রম আর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের কাজেও সময় দিচ্ছিল সে। সংসার আর নিজের স্বপ্ন দুটোই খুব সুন্দরভাবে সামলে নিচ্ছিল।
ফারদিনের ছোট্ট স্টার্টআপটাও ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছে। নতুন নতুন প্রজেক্ট, নতুন ক্লায়েন্ট, অফিসে বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা। ব্যস্ততা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেলেও একটা অভ্যাস আজও বদলায়নি। দিন যতই কঠিন হোক, রাতে বাসায় ফিরে প্রথম খোঁজটা সে এখনও তার কেশবতী কন্যারই নিত।
আর ফারিবাও প্রতিদিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত, কখন কলিংবেলটা বেজে উঠবে।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যেই কেটে যাচ্ছিল তাদের নতুন সংসারের দিনগুলো। দু'জনেই ভেবেছিল, হয়তো এভাবেই একসঙ্গে বুড়ো হয়ে যাবে তারা। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, জীবন সবসময় ঠিক সেই পথেই চলে না।
চলবে…
ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্পটা কেমন লাগলো জানাবেন, ধন্যবাদ 🌸