#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_৪২
সকালের নাশতার টেবিলে আজ যেন অন্যরকম এক পরিবেশ। সবাই একসঙ্গে বসে নাশতা করছিল। হঠাৎ করেই ফারদিনের বাবা গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“আমার তোমাদের সবার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
কথাটা শুনে টেবিলে বসা সবাই তার দিকে তাকাল। ফারদিন মুচকি হেসে বলল,
“কী ব্যাপার আব্বু? এত সিরিয়াস দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?”
তিনি নিজের পাশেই বসে থাকা তার স্ত্রীকে একবার দেখে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“আজ ভোরে তোমাদের চাচা ফোন করেছিলেন।”
মিতু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আব্বু ফোন করে ছিল আমার সাথে কয়দিন হলো কথা হয় না, আম্মু-আব্বু ভালো আছে তো চাচ্চু?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছে।”
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
“মিতু মা, তারা তোমার জন্য একটা সম্বন্ধ পছন্দ করেছেন।”
কথাটা শুনতেই মিতু থমকে গেল। ফারদিন ভ্রু উঁচু করে বোনের দিকে তাকাল। আর পাশে বসে থাকা ফারিবা বিস্মিত চোখে মিতুর মুখের পরিবর্তন দেখছিল। ফারদিনের বাবা ধীরে ধীরে বললেন,
“ছেলেটা আমেরিকাতেই থাকে পরিবার নিয়ে। নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা আছে। পরিবারও খুব ভালো। তারা তোমাকে পছন্দ করেছে। যদি তোমার মত থাকে, তাহলে খুব শিগগিরই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে চায়।”
ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মিতু নিচু হয়ে নিজের হাতের আঙুল নিয়ে খেলতে লাগল। ফারদিন মুচকি হেসে বলল,
“আমাদের ছোট্ট মিতু টা কত বড় হয়ে গেছে এখন বিয়েও হবে?”
মিতু সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“ফারদিন ভাই, তুইও না।”
কথাটা পেয়ে মিতু লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল আর তার লজ্জা দেখে সবাই হেসে উঠল। হাসির রেশ কাটতেই ফারদিনের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“খুশির খবর তো অবশ্যই, কিন্তু ভাবতেই কেমন যেনো লাগে। এতদিন মেয়েটা আমাদের সঙ্গে ছিল। বিয়ের পর তো সেই আমেরিকায় চলে যাবে।”
তার কণ্ঠে আনন্দের পাশাপাশি স্পষ্ট কষ্টও মিশে ছিল। ফারিবা আলতো করে শাশুড়ির হাতটা চেপে ধরল। ফারদিন শান্ত গলায় বলল,
“মেয়েদের তো একদিন নিজের সংসারে যেতেই হয়, আম্মু।”
“জানি বাবা, তবুও মনটা মানতে চায় না।”
এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা ছোট্ট ফাইয়াজ হঠাৎ মুখ গোমড়া করে বলল,
“আমি কাউকে যেতে দেব না।”
সবাই তার দিকে তাকাল। সে গম্ভীর মুখে মিতুর হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
“মিতু আপু চলে গেলে আমার সঙ্গে লুডু খেলবে কে? রাতে গল্প শোনাবে কে? আমাকে বকাঝকা করবে কে?”
তার শিশুসুলভ কথাগুলো শুনে সবার মুখে হাসি ফুটলেও চোখের কোণে অদ্ভুত এক আবেগ জমে উঠল। মিতু ফাইয়াজকে কাছে টেনে নিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“আরে পাগল ছেলে, আমি এখনই কোথাও যাচ্ছি না। বিয়ে হতে তো এখনও অনেক দেরি। আর গেলেও কি তুই বড় হয়ে আপুর কাছে চলে যাবি কেমন।”
ফাইয়াজ সরল চোখে তাকিয়ে বলল,
“সত্যি আমি যেতে পারবো।”
“হ্যা পারবিতো।”
“প্রমিস?”
“একদম প্রমিস।”
ছোট্ট ছেলেটা তখনই হাসিমুখে তার কনিষ্ঠ আঙুলটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তাহলে পিঙ্কি প্রমিস।”
ফাইয়াজের কান্ড দেখে মিতুও হেসে নিজের আঙুল বাড়িয়ে দিল। ঘরের সবাই সেই দৃশ্যটা দেখে মুচকি হেসে উঠল।
…………………………………………………
মিতুর বিয়ের খবরটা জানার পর থেকে বাড়ির পরিবেশে যেন নতুন একটা ব্যস্ততা যোগ হলো। প্রতিদিনই কখনো আত্মীয়দের ফোন, কখনো বিদেশ থেকে ভিডিও কলে মিতুর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা, আবার কখনো বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে আলোচনা করা, সব মিলিয়ে বাড়িটা আগের চেয়েও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
মিতু অবশ্য আগের মতোই ছিল। সারাদিন বাড়িটা মাথায় করে রাখত। কখনো ফাইয়াজের সঙ্গে ঝগড়া করছে, কখনো ফারিবার ঘরে গিয়ে আলমারি এলোমেলো করে নিজের পছন্দের শাড়ি খুঁজছে।
ফারিবা প্রতিবারই হেসে বলে,
“এই মেয়ে, আমার আলমারিটাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেললি কেন রে?”
মিতু একটা শাড়ি হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“দেখ তো ফারিবা, এই রঙটা আমার গায়ে মানাবে?”
ফারিবা মুচকি হেসে তার কাঁধে হাত রাখল।
“অবশ্যই মানাবে কারণ তোর ওপর সব রঙই সুন্দর লাগে।”
মিতু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“হয়েছে আর পাম দিতে হবে না, তোকে কিন্তু আমার বিয়ের শপিকরে দিতে হবে, কারণ তোরটা আমি করেছি।”
“অবশ্যই করবো, আমার একমাত্র বান্ধবী আর ননদের বিয়ে বলে কথা, আমি না থাকলে কে থাকবে শুনি?”
মিতু হঠাৎ ফারিবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আই লাভ ইউ রে, বান্ধবী।”
ফারিবা হেসে তার মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে বলে,
“এইসব বলে কাজ হবে না বান্ধবী। আগে আলমারিটা গুছিয়ে দে ঠিক মতো।”
দু'জনের কথোপকথন শুনে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ফারদিন মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই ফাইয়াজ দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ভাবি, আপু, ভাইয়া আব্বু নিচে সবাই ডাকছে।”
মিতু জিজ্ঞেস করলো,
“কেন?”
“আব্বু বলেছে সবাই মিলে আজ দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া হবে।”
ফারদিন মজা করে বলল,
“তা হলে চল, আজ দেখি আম্মুর রান্নায় কে বেশি খায়।”
ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলল,
“আমি!”
মিতু হেসে বলল,
“তুই না, ফারদিন ভাই পাঁচ প্লেট খেয়ে ফেলবে দেখিস।”
“মিথ্যা কথা!”
“একদম সত্যি!”
খুনসুটি করতে করতেই সবাই নিচে নেমে গেল।
ডাইনিং টেবিলে আজ সবাই একসঙ্গে বসেছে। হাসি, গল্প আর ছোট ছোট দুষ্টুমিতে ভরে উঠল দুপুরটা।
ফারিবা একবার চারপাশে তাকাল। এই মানুষগুলো, এই হাসিমুখগুলো, এই ছোট ছোট মুহূর্ত, তার মনে হলো, আল্লাহ যেন তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পরিবারটাই উপহার দিয়েছেন।
…………………………………………………
সবকিছু যেন খুব সুন্দরভাবেই এগিয়ে চলছিল।
মিতুর বিয়ের প্রস্তুতি, বাড়ির হাসি-আনন্দ, ছোট ছোট খুনসুটি, সব মিলিয়ে প্রতিটা দিন যেন নতুন নতুন সুখের স্মৃতি হয়ে জমা হচ্ছিল। কিন্তু সুখের দিনগুলোও সবসময় একই রকম থাকে না।
একদিন বিকেলের দিকে ফারিবা রান্নাঘরে ফারদিনের মায়ের সঙ্গে রাতের রান্নায় সাহায্য করছিল। আর ফারদিন ড্রয়িংরুমে বসে ফাইয়াজের সঙ্গে দাবা খেলছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ ফারিবার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল আশ্রমের একজন কর্মচারীর নাম। ফারিবা হাসিমুখেই ফোনটা রিসিভ করেছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
“কি বলছেন এইসব আপু।”
কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করা দুটি শব্দেই পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফোনের ওপাশ থেকে তাড়াহুড়ো করে বলা হচ্ছিল,
“ফারিবা আপা, রেহানা খালা আজকেও হঠাৎ করে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দুপুরের পর থেকেই শরীরটা খুব খারাপ ছিল। কিছুক্ষণ আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমরা হাসপাতালে ভর্তি করেছি। ডাক্তার বলেছেন, অবস্থা খুব একটা ভালো না, যদি সম্ভব হয়, আপনি দ্রুত চলে আসুন। রেহানা খালা আপনাকে দেখতে চাইছেন।”
ফারিবার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ভরে উঠেছে আতঙ্কে।
ফারদিন দ্রুত উঠে এসে তার কাঁধে হাত রাখে বলল,
“কি ব্যাপার কন্যা কী হয়েছে?”
ফারিবা অনেক কষ্টে কথাগুলো বলল,
“ম্যাম... ম্যাম হাসপাতালে... ওনার অবস্থা নাকি খুব খারাপ আমাকে নিয়ে যাবে ফারদিন।”
কথাটা শুনে ফারদিনের মা বলল,
“তোদের এখনি যাওয়া উচিৎ শুধু একটু সাবধানে যাবি কেমন।”
কথাটা বলে একবার ফারিবার দিকে তাকায় এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি করল না ফারদিন বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে বলল,
“চলো।”
পুরো রাস্তা জুড়ে একটাও কথা বলেনি কেউ।
ফারিবা দু'হাত একসঙ্গে ফারদিন কে জড়িয়ে ধরে বসে ছিল আর শুধু মনে মনে দোয়া পড়ছিল।
"হে আল্লাহ... আমার ম্যামকে সুস্থ করে দিন... প্লিজ..."
বেশ কিছুক্ষন পর হাসপাতালে পৌঁছে গেলো। হাসপাতালে পৌঁছাতেই আশ্রমের কয়েকজন কর্মচারী আর বড় বড় বাচ্চাদের উদ্বিগ্ন মুখ চোখে পড়ল। সবাই করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ চোখের পানি মুছছে। ফারিবাকে দেখেই সবাই এগিয়ে এল। একজন কর্মচারী ধীরে বললেন,
“ডাক্তার বলেছেন, সময় খুব কম।”
কথাটা শুনেই ফারিবার বুকটা হুহু করে উঠল।
ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বললেন,
“এখানে ফারিবা কে রুগি উনাকে ডাকছেন।”
ফারিবা আর ফারদিন দ্রুত কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সাদা বিছানায় শুয়ে আছেন রেহানা ম্যাম। মুখটা অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা, পাশে মনিটরের ধীর শব্দ। তবুও দু'জনকে দেখেই তিনি খুব কষ্ট করে মুচকি হাসলেন।
“ফারিবা তুমি এসেছো, এখানে আসো আমার পাশে বসো।”
ফারিবা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ম্যাম আপনি ঠিক হয়ে যাবেন। কিছু হবে না আপনার।”
রেহানা ম্যাম ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“মৃত্যু আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর সত্য, মা। একদিন তো সবাইকেই যেতে হবে।”
“না ম্যাম আপনি দয়া করে এমন কথা বলবেন না।”
রেহানা ম্যাম আলতো করে ফারিবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
“কাঁদো ন মা, তুমি কাঁদলে আমার কষ্ট হয়।”
কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস ঠিক করে তিনি আবার বললেন,
“মা তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।”
ফারিবা মাথা নাড়ে বললো,
“বলুন ম্যাম।”
“আমি আমার আশ্রম আর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সব দায়িত্ব আমার ছোট বোনের হাতে তুলে দিয়েছি।”
ফারিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রেহানা ম্যাম ধীরে ধীরে বললেন,
“ও বহু বছর ধরে রাজশাহীতে একটা অনাথ আশ্রম চালায়। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দুইটা আশ্রম একসঙ্গে করে আরও বড় পরিসরে কাজ করব। তাই খুব শিগগিরই এখানকার সব বাচ্চা আর কার্যক্রম রাজশাহীতে স্থানান্তর করা হবে।”
কথাটা শুনে ফারিবার চোখ আবার ভিজে উঠল।
“কিন্তু আপনি আমাকে কিছুই বললেন না কেন?”
রেহানা ম্যাম মৃদু হেসে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বললেন,
“কারণ আমি তোমাকে চিনি, মা। আমি জানি, তুমি চাইলে এক মুহূর্তও না ভেবে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিবে।”
তিনি একটু থামলেন। তারপর স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,
“কিন্তু আমি সেটা হতে দেব না।”
ফারিবা নিঃশব্দে কাঁদছিল। রেহানা ম্যাম কষ্ট করে বললেন,
“ছোটবেলা থেকেই তোমাকে শুধু সংগ্রাম করতে দেখেছি। নিজের কথা না ভেবে সবাইকে আগলে রেখেছো। অনেক হয়েছে মা, এবার না হয় নিজের জন্যও বাঁচো।”
তিনি একবার ফারদিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আল্লাহ তোমাকে এমন একজন মানুষ দিয়েছেন, যে তোমাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”
আবার ফারিবার দিকে ফিরে বললেন,
“নিজের সংসারটা মন দিয়ে আগলে রাখবে কেমন। নিজের স্বামী, নিজের পরিবার, এদের নিয়েই সুখে থাকবে সারাজীবন। আর কোনো দায়িত্বের বোঝা আমি তোমার কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাই না মা।”
ফারিবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু আশ্রমের বাচ্চারা।”
রেহানা ম্যাম মৃদু হাসলেন।
“ওরা সবসময়ই তোমার সন্তান হয়ে থাকবে। যখন মন চাইবে, রাজশাহীতে গিয়ে ওদের দেখে আসবে। ওদের ভালোবাসো বলে নিজের সুখটাকে আর কখনো অবহেলা করবে না, আমি চাই তুমি সুখি হও ভালো থাকো, আর কোনো কষ্ট বোঝা যেনো না টানতে হয়।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ আরও দুর্বল হয়ে এলো। তিনি খুব আস্তে বললেন,
“আমি আজ নিশ্চিন্ত মা কারণ আমি জানি, আমার মেয়েটা এখন আর একা নয়, তাকে আগলে রাখার মতো একজন আছে।”
তার কাঁপতে থাকা হাতটা আলতো করে ফারিবার মাথায় রেখে তিনি দোয়া করলেন,
“আল্লাহ তোমাদের সংসারে সবসময় রহমত আর বরকত দান করুন, তোমরা সারাজীবন একে অপরের ছায়া হয়ে থেকো।”
কেবিনের ভেতর তখন শুধু কান্নার শব্দ। আর সময়, নীরবে নিজের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
…………………………………………………
রেহানা ম্যামের মৃত্যুর পর যেন অনেকটা সময় থমকে গিয়েছিল ফারিবার জীবনে। দিনের পর দিন সে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। আগের মতো প্রাণখোলা হাসিটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারত না, মানুষটা আর কখনো ফিরে আসবে না।
রেহানা ম্যামের ইচ্ছা অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আশ্রমের সব কার্যক্রম রাজশাহীতে স্থানান্তরের প্রস্তুতি শুরু হলো।
একে একে সব জিনিস গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। ছোট ছোট বাচ্চারাও বুঝতে পেরেছিল, এবার সত্যিই তাদের এই আশ্রম ছেড়ে চলে যেতে হবে।
শেষদিন সকালে ফারিবা আর ফারদিন আশ্রমে পৌঁছাল।
একসময় যে উঠোনে প্রতিদিন হাসির শব্দ ভেসে আসত, আজ সেখানে অদ্ভুত এক নীরবতা। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো একে একে এসে ফারিবাকে জড়িয়ে ধরছিল। সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে সবসময় তার হাত ছাড়া হাঁটতেই চাইত না, কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আপু... তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে না?”
ফারিবা চোখের পানি লুকিয়ে হেসে বলল,
“না সোনা, কিন্তু আমি তোমাদের দেখতে আসব।”
“প্রমিস?”
“হ্যা প্রমিস।”
একজন একজন করে সব বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরল সে। কারও কপালে চুমু খেল, কারও মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। গাড়িগুলো ধীরে ধীরে আশ্রমের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। ফারিবা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
গাড়ির জানালা দিয়ে ছোট ছোট হাতগুলো নাড়তে নাড়তে দূরে মিলিয়ে গেল। আর তার চোখের সামনে যেন জীবনের আরও একটি অধ্যায় শেষ হয়ে গেল।
…………………………………………………
বাড়ি ফেরার পরও ফারিবার মন আগের মতো হয়ে উঠছিল না। সবসময় চুপচাপ থাকত। ফারদিন সব বুঝতে পারছিল।
এক সকালে কোনো কিছু না বলেই সে বাইকের চাবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“কন্যা, চল।”
ফারিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
“উহু বলবো না কারণ আজ কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।”
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তার সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ল।
সারা দিন শহরের বাইরে নদীর ধারে, সবুজ মাঠে, প্রিয় রেস্টুরেন্টে এদিক-ওদিক ঘুরে কাটাল তারা।
কখনও একসঙ্গে আইসক্রিম খেল, কখনও নদীর ধারে হাঁটল, কখনও আবার ফারদিন পাশে ছাত্রদের থেকে গিটার হালত করে এনে তাতে সুর তুলল। সেই সুরের সঙ্গে বিকেলের বাতাসও যেন ফারিবার মন থেকে একটু একটু করে কষ্ট সরিয়ে নিচ্ছিল। ফিরে আসার সময় ফারদিন খুব আস্তে বলেছিল,
“তুমি হাসলে আমার পৃথিবীটা অনেক সুন্দর লাগে, কন্যা। তাই তোমার এই হাসিটা কখনো হারিয়ে ফেলবে না কেমন।”
ফারিবা কিছু না বলে শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। যেনো এই হাত কখনো ছাড়া যাবে না।
…………………………………………………
সময় আবার ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় ফারদিনের জীবনে এলো অনেক বড় একটা সুখবর।
তার কোম্পানিতে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বিশাল এক প্রজেক্ট পেয়ে গেল।
এই একটা প্রজেক্টই তার বহু বছরের পরিশ্রমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এনে দিল।
অফিসের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সকালে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া, গভীর রাতে বাড়ি ফেরা, মিটিং, প্রেজেন্টেশন, আর সে অফিসের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে একের পর এক অনলাইন কনফারেন্স সব মিলিয়ে নিজের জন্যও সময় পাচ্ছিল না সে।
তবুও প্রতিদিন বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে প্রথমেই ফারিবার কপালে আলতো একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে কখনো ভুলত না।
আর এই দিকে ফারিবা প্রতিদিন ভাবত সে ফারদিনকে আজই খুশির সংবাদটা দিবে, কিন্তু প্রতিবারই কিছু না কিছু হয়ে যেত। কখনও ফারদিন ক্লান্ত হয়ে ফিরত। কখনও জরুরি অফিস কল চলে আসত। কখনও আবার রাত গভীর হয়ে যেত।
সে চেয়েছিল, এই সুখবরটা এমন একটা মুহূর্তে জানাতে, যখন ফারদিন শুধু তার কথাই শুনবে।
তাই প্রতিবারই নিজের কথাটা বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে শুধু মুচকি হেসে বলত ফারদিনের কাজ শেষ হলেই বলবে।
…………………………………………………
রেহানা ম্যামের চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় একমাস। ফারিবা এখনও মাঝেমধ্যে চুপচাপ হয়ে যায়, হঠাৎ করেই জানালার বাইরে তাকিয়ে হারিয়ে যায় পুরোনো কোনো স্মৃতিতে। তবে আগের মতো আর সারাদিন বিষণ্ন থাকে না। ধীরে ধীরে আবার নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে সে।
সকালে ফারদিনকে অফিসের জন্য তৈরি করে দেওয়া, শাশুড়ির সঙ্গে রান্নাঘরে সময় কাটানো, ফাইয়াজের পড়াশোনা দেখা, আর অবসর পেলেই বই পড়া কিংবা গাছের যত্ন নেওয়া এসব নিয়েই আবার ব্যস্ত হয়ে উঠেছে তার দিনগুলো।
ফারদিন প্রতিদিনই দূর থেকে এসব দেখে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করত।
অবশেষে তার কেশবতী কন্যার মুখে আবার সেই চেনা হাসিটা ফিরতে শুরু করেছে।
এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিল ফারদিন। ঠিক তখনই মিতু দৌড়ে এসে তার পাশের সোফায় বসে পড়ল। ফারদিন ভ্রু তুলে বলল,
“এইভাবে দৌড়ে এলি কেনো।”
মিতু চারপাশে একবার তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
“ভাই, একটা জরুরি মিটিং আছে।”
“মিটিং?”
“হুম টপ সিক্রেট মিটিং।”
ফারদিন হেসে ফেলল, এরপর কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, বল দেখি।”
মিতু মোবাইল বের করে ক্যালেন্ডার খুলে তার সামনে ধরল।
“আর মাত্র চার দিন পর কী আছে তোর মনে নেই।”
ফারদিন একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই মুচকি হেসে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে ধীরে বলল,
“অবশ্যই মনে আছে।”
মিতু চোখ বড় বড় করে বলল,
“এইটা তোদের বিয়ের পরের প্রথম জন্মদিন ওর, তাঈ এইবার কিন্তু এমন সারপ্রাইজ দিতে হবে, যেন ফারিবা কোনোদিন ভুলতে না পারে।”
ফারদিন মৃদু হেসে কাপটা টেবিলে রেখে বলল,
“হ্যা রে আমিও সেটাই ভাবছি।”
“তাহলে শুরু করা যাক?”
“আগে আইডিয়া বল।”
মিতু উত্তেজিত গলায় বলতে শুরু করল,
“প্রথমে ফারিবাকে কিছুই বুঝতে দেওয়া যাবে না। সবাই এমন আচরণ করবে, যেন কারও কিছুই মনে নেই। তারপর সন্ধ্যায়..."
সে এক নিঃশ্বাসে নিজের পুরো পরিকল্পনা বলতে লাগল। ফারদিন মন দিয়ে সব শুনছিল। মাঝে মাঝে নতুন নতুন আইডিয়াও যোগ করছিল।
“কেকটা ফারিবার পছন্দের হবে।”
“হুম ঠিক আছে।”
“আর একটা সুন্দর গিফট…”
ফারদিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল,
“গিফটটা আমি অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছি।”
মিতু অবাক হয়ে বলল,
“সত্যি! কী গিফট?”
ফারদিন দুষ্টু হেসে মাথা নাড়ল।
“এখনই বলা যাবে না। তুইও জন্মদিনের দিনই দেখবি।”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ফারিবার কণ্ঠ ভেসে এল,
“মিতু, কোথায় গেলি?”
ফারিবার ডাকে দু'জন একসঙ্গে চমকে উঠল। মিতু ফিসফিস করে বলল,
“ফারদিন ভাই আর কিছু বলিস না ফারিবা এসে পড়েছে!”
ফারদিন দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা মিটিং তাহলে এখানেই শেষ।”
মিতু হেসে বলল,
“তাহলে অপারেশন 'বার্থডে সারপ্রাইজ' আজ থেকেই শুরু!”
দু'জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে যেন নীরবে একটা চুক্তি করে ফেলল। তার পরেরদিন থেকেই শুরু হয়ে গেল গোপন প্রস্তুতি।
অফিসে যাওয়ার পথে ফারদিন সুযোগ পেলেই মিতুকে ফোন করত। দু'জনে মিলে কখনো কেকের ডিজাইন নিয়ে কথা বলছে, কখনো আবার উপহার নিয়ে পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে ফারিবা এসবের কিছুই জানত না।
সে বরং অবাক হচ্ছিল, মিতু আজকাল প্রায়ই কোনো না কোনো অজুহাতে বাইরে যাচ্ছে। একদিন দুপুরে মিতুও হঠাৎ বলল,
“ফারিবা চাচিমা আসলে বলিস তো আমি একটা কাছে বাহিরে গিয়েছি।”
ফারিবা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“আবার কোথায় যাবি?”
“একটু কাজ আছে রে।”
“কী কাজ?”
মিতু তোতলাতে লাগল, এরপর একটা বাহানা করে বলে,
“এই... ওই... মানে... আব্বু টাকা পাঠিয়েছে শপিংএর জন্য ওইটাই তুলতে যাচ্ছি।”
ফারিবা সন্দেহের চোখে তাকাল। কিন্তু মিতু আর কিছু জিজ্ঞেস করার সময় দিল না, সোজা বাহিরে চলে গেলো, ফারিবা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল।
“আজকাল ফারদিন আর মিতুর আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে!”
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরতেই ফারদিন দেখল ফারিবা ড্রয়িংরুমে বসে বই পড়ছে।
চুপিচুপি পেছন থেকে গিয়ে সে দু'হাত দিয়ে ফারিবার চোখ ঢেকে দিল। ফারিবা হেসে বলল,
“ছাড়ো আমি জানি এটা তুমি ফারদিন।”
“কীভাবে বুঝলে?”
“তোমার আতরের ঘ্রাণটা আমি হাজার মানুষের ভিড়েও চিনে ফেলব।”
কথাটা শুনে ফারদিন মুগ্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে সামনে এসে বসল।
“আজ সারাদিন কী করেছো?”
“অনেক কিছুই করেছি। মা-কে রান্নায় সাহায্য করেছি, ফাইয়াজকে পড়িয়েছি, তারপর একটু বই পড়ছিলাম।”
ফারদিন মাথা নাড়ে বলল,
“ভালো খুব ভালো।”
ফারিবা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“হ্যা করো।”
“আজকাল তুমি অনেক ব্যস্ত থাকো আমরা একটুসময় কাটাতে পারি না একসাথে?"
ফারদিন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরের মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে হাসে বলে,
“অফিসের কাজ বেড়েছে তো কি অরবো বলো নতুন প্রজেক্ট কাজের চাপ বেশি।”
“শুধুই কি অফিসের কাজ?”
“আর কী হবে?”
ফারিবা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, লোকটা যেন কিছু একটা লুকাচ্ছে। কিন্তু ফারিবা আর কিছু বলল না চুপ করে তাকিয়ে রইলো।
…………………………………………………
রাতে নিজের ঘরে এসে ফারদিন আলমারির ভেতর থেকে ছোট্ট একটা মখমলের বাক্স বের করল। ঢাকনাটা খুলতেই ভেতরে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে তার মুখে শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।
খুব যত্ন করে আবার বাক্সটা বন্ধ করে আগের জায়গায় রেখে দিল। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ফারিবা। ফারদিন দ্রুত আলমারির দরজা বন্ধ করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
ফারিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী করছিলে গো?”
“কিছু না অফিসের কিছু কাগজ খুঁজছিলাম।”
“ও আচ্ছা।”
সে আর কিছু না বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। ফারদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
“আর মাত্র দুটো দিন, তারপর আমার কন্যাকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সারপ্রাইজটাই দেব তুমি কখনো ভুলবে না।”
…………………………………………………
অবশেষে চলে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিনটা। আজ ফারিবার জন্মদিন। ভোরের নরম আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল ফারিবা।
আজকের দিনটা তার কাছে সবসময়ই একটু আলাদা। ছোটবেলায় জন্মদিন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। বড় হওয়ার পর রেহানা ম্যাম আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলোই প্রতি বছর তাকে ছোট্ট করে শুভেচ্ছা জানাত। আজ রেহানা ম্যামও নেই আর বাচ্চাগুলোও তার থেকে অনেক দূরে।
সে চাইলেও যেতে পারে না তাদের কাছে। কি অদ্ভুত এক বছরের মধ্যেই কত কিছু বদলে গেলো তার জীবনে, গত বছর রেহানা ম্যাম ছিল বাচ্চারা ছিল, আর ফারদিন তার প্রেমিক ছিল। আজ তারা কেউ না থকালেও ফারদিন ঠিকই আছে তার স্বামীর রূপে। এই মানুষ টা যেনো তার জীবনে সারাটা জীবন থাকে এই একটাই চাওয়া তার।
যদি ফারদিন কখনো হারিয়ে যায় তাহলে সে কি নিয়ে বাঁচবে, ভাবতেই বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই পাশ থেকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল,
“শুভ জন্মদিন, কন্যা।”
ফারিবা ফিরে তাকাতেই দেখল, ফারদিন মুচকি হেসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ফারিবা হেসে বলল,
“তুমি মনে রেখেছ?”
ফারদিন ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমার বউয়ের জন্মদিন আমি ভুলে যাব এটা কি করে সম্ভব?”
ফারিবা হেসে ফেলল। ফারদিন আলতো করে তার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুক, অনেক সুখে রাখুক, আর তোমার মুখের এই হাসিটা যেন কোনোদিন না হারায়। আর সারা জীবন আমার পাশে রাখুক।”
ফারিবা মৃদু হেসে বলল,
“আমিন।”
দু'জনে একসঙ্গে নিচে নেমে সকালের নাশতা করল। মিতু, ফাইয়াজ, আম্মু-আব্বুও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল।
তবে মিতু আর ফারদিন এমনভাবে আচরণ করছিল, যেন এদিনটা একেবারেই সাধারণ একটা দিন। ফারিবা একটু অবাক হলেও কিছু বলল না।
নাশতা শেষ করে ফারদিন নিজের ঘরে এসে অফিসের জন্য তৈরি হতে লাগল। আজ তার পরনে একেবারে ঝকঝকে সাদা শার্ট, সঙ্গে কালো প্যান্ট আর কালো কোট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতঘড়িটা পরতেই দরজার পাশে এসে দাঁড়াল ফারিবা।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে। আজ কেন যেন ফারদিনকে অন্য দিনের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। এই সাদা বেরঙিন শার্টেও একটা মানুষকে এতো সুন্দর লাগতে পারে তার জানা ছিল না।
ফারদিন আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখে মুচকি হেসে বলল,
“এভাবে কী দেখছেন ম্যাডাম?”
ফারিবা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
“কোথায় কিছু না তো।”
ফারদিন কাছে এসে তার থুতনিটা আলতো করে তুলে দিয়ে বলল,
“আজ অফিস থেকে আসতে একটু দেরি হতে পারে। একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে কিছু মনে করো না প্লিজ, এই ডিলটা সাইন হলে আমাদের কোম্পানিটা আরো বড় হয়ে যাবে।”
ফারিবা মাথা নাড়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
ফারদিন তার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে বলল,
“আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?”
ফারিবা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“হ্যা সবসময় অপেক্ষা করবো।”
দু'জন একসঙ্গে নিচে নেমে এল। বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফারদিন বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। বাইকে ওঠার আগে একবার ঘুরে তাকাল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফারিবা।
চোখাচোখি হতেই দু'জনেই মুচকি হেসে একে অপরকে হাত নাড়ল। ফারদিন বাইকে উঠে চলে গেল। বাইকটা ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হয়ে গেলেও ফারিবা অনেকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। আজ কেন যেন তার বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠছিল।
মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক হচ্ছে নেই। কোনো এক অদৃশ্য অস্বস্তি বারবার তাকে ঘিরে ধরছে। সে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“আল্লাহ দয়া করে ওকে আপনার হেফাজতে রাখবেন।”
তারপর নিজেই মাথা নেড়ে মৃদু হেসে ফেলল।
“ইস কী যে ভাবছি আমি! নিশ্চয়ই জন্মদিন বলে একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।”
এই বলে সে ঘরের ভেতরে ফিরে গেল। ফারদিন বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই বাড়িটা আবার আগের মতো শান্ত হয়ে গেল।
ফারিবা নিজের ঘরে এসে আলমারির সামনে দাঁড়াল। আজকের দিনটা অন্য বছরের মতো নয়। এবার তার জীবনে এমন একজন মানুষ আছে, যে প্রতিটা ছোট্ট মুহূর্তকেও সুন্দর করে তুলতে জানে। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল মিতু।
তার হাতে বড় একটা শপিং ব্যাগ। মুখভর্তি রহস্যময় হাসি নিয়ে সে বলল,
“ফারিবা তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি।"
ফারিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমার জন্য?”
“হুম তবে এটা আমি দিইনি।”
ব্যাগটা তার হাতে দিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
“এটা ফারদিন ভাই তোর জন্য পাঠিয়েছে।”
ফারিবার চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অপূর্ব সুন্দর একটা শাড়ি। নরম অফ-হোয়াইট রঙের ওপর গাঢ় লাল ফুলের সূক্ষ্ম নকশা, সঙ্গে মিলিয়ে একটি ছোট্ট গয়নার বক্স। শাড়িটার ওপর হাত বুলিয়ে মুগ্ধ হয়ে রইল ফারিবা।
মিতু মুচকি হেসে বলল,
“ফারদিন ভাই বলেছে, আজ সন্ধ্যার মধ্যেই এই শাড়িটা পরে একদম সুন্দর করে রেডি হয়ে থাকতে।”
ফারিবা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
মিতু ফারিবার কানের কাছে এসে বললো,
“সেটা আমি জানি না। শুধু বলেছে, ঠিক সন্ধ্যা সাতটার আগে যেন তোকে তার ঠিক করা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাই।”
ফারিবা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“রেস্টুরেন্টে?”
“হ্যাঁ আর একটা কথা বলেছে…”
“কী?”
মিতু হেসে বলল,
“আজ কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। শুধু ফারদিন ভাইয়ে কথা মতো চলতে হবে।”
ফারিবা অসহায় মুখ করে মাথা নাড়ল।
“তোরা দুজন মিলে কি কিছুদিন ধরে এই প্ল্যানই করছিলি।”
মিতু হেসে ফারিবার গাল টেনে দিয়ে বলল,
“একটু ধর্য্য ধর, আজকের দিনটা তোর খুব ভালো কাটবে, দেখিস এই দিনটা তুই কোনো দিন ভুলতে পারবি না।”
এই বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল ফারিবা। তার চোখ বারবার শাড়িটার দিকেই চলে যাচ্ছিল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব যত্ন করে শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“আজ... আজ তোর বাবাকে সব বলব, তোর আসার খবরটাও দিব।”
তার চোখ ভিজে উঠলেও ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল না। কতদিন ধরে সে এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছে! প্রতিদিন ভেবেছে বলবে, কিন্তু ফারদিনের ব্যস্ততার জন্য আর বলা হয়ে ওঠেনি।
আজ আর কোনোভাবেই সে সুযোগটা হাতছাড়া করবে না। আজ সে ফারদিনকে বলবেই, তাদের ভালোবাসার ছোট্ট একটা অংশ পৃথিবীতে আসতে চলেছে।
এই খবরটা শুনে ফারদিন কতটা খুশি হবে, সেটা কল্পনা করতেই ফারিবার বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে উঠল।
…………………………………………………
সন্ধ্যা নামার আগেই ফারিবা খুব যত্ন করে ফারদিনের দেওয়া শাড়িটা পরে তৈরি হয়ে নিল।
অফ-হোয়াইট শাড়ির লাল নকশাগুলো যেন তার গায়ে আরও বেশি ফুটে উঠেছিল। হালকা সাজ, কপালে ছোট্ট লাল টিপ, হাতে কাঁচের চুড়ি আর খোলা চুলে কয়েকটি বেলি ফুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই কেমন নতুন লাগছিল তার।
আয়নার দিকে তাকিয়ে বারবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল সে। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। আজকের দিনটা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর একটি হতে চলেছে। আজ সে শুধু নিজের জন্মদিনই উদযাপন করবে না।
আজ সে ফারদিনকে জানাবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুখবরটা। ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে মায়াভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“আজ তোমার বাবাকে সব বলে দেব... দেখো, উনি কতটা খুশি হন তোমার খবর শুনে।”
ভাবতেই তার চোখে আনন্দের ঝিলিক নেমে এল।
সে যেন কল্পনাতেই দেখতে পাচ্ছিল, খবরটা শুনে ফারদিন বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে, তারপর শিশুর মতো হাসতে হাসতে তাকে বুকে জড়িয়ে নেবে।
ঠিক তখনই দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকলেন ফারদিনের মা। ঘরে ঢুকেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে ফারিবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুগ্ধ হয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ আমার মেয়েটাকে আজ কী যে সুন্দর লাগছে!”
ফারিবা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। তিনি এগিয়ে এসে আলতো করে তার কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
“আল্লাহ যেন সবসময় তোমার মুখের এই হাসিটা অটুট রাখেন। আজ আমার ছেলের চোখ তো আর তোমার ওপর থেকে সরবেই না।”
কথাটা শুনে ফারিবার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই মিতু দৌড়ে ঘরে ঢুকে বলল,
“ফারিবা চল, দেরি করলে কিন্তু ফারদিন ভাই আমাকেই বকবে।”
ফারদিনের মা মুচকি হেসে বললেন,
“যাও মা, আর খুব ভালো করে ঘুরে এসো।”
ফারিবা সালাম করে মিতুর সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
…………………………………………………
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল সেই রেস্টুরেন্টের সামনে। চারপাশে নরম আলোয় সাজানো পরিবেশ, হালকা বাতাস আর মানুষের আনাগোনা। মিতু চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল,
“ ফারদিন ভাই বলেছে, আমাদের বাহিরে অপেক্ষা করতে ও এলেই এঅ সাথে ভেতরে যাবে।”
ফারিবা মাথা নাড়ল। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, আর কয়েকটা মিনিট, তারপরই সে ফারদিনকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর খবরটা জানাবে।
সময় ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ফারদিনের কোনো দেখা নেই। ফারিবা মোবাইল বের করে তাকে ফোন দিল। প্রতিবারই একই উত্তর এলো,
"The number you are trying to call is currently unavailable."
ফারিবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ ওর ফোন বন্ধ কেন?”
মিতুও একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“হয়তো মিটিংয়ে আছে, একটু অপেক্ষা করি।”
আরও কিছুক্ষণ কেটে গেল। ঠিক তখনই হঠাৎ ফারিবার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো অচেনা একটা নাম্বার সে তাড়াতাড়ি করে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এল খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ।
“কন্যা।”
ফারিবার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
“ফারদিন! তোমার ফোন বন্ধ কেন? আমি কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি।”
ফারদিন খুব শান্ত গলায় বলল,
“আমি একটু ঝামেলায় ফেসে গিয়েছিলাম, অনেক কষ্ট করে ওখান থেকে বের হয়ে এসেছি, মনে হয় ফোনটা ওখানেই ফেলে এসেছি।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার বলল,
“তুমি আর একটু অপেক্ষা করো কন্যা আমি এখনি তোমার কাছে চলে আসছি।”
“আর কতক্ষণ?”
“একদম কাছেই আছি।”
কলটা কেটে গেল। ফারিবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বেশ খানিকক্ষণ পর রাস্তার ওপাশে একটা সিএনজি থামতে দেখা গেলো। সেই সিএনজি থেকে এলোমেলো অবস্থায় বের হলো একটা ছেলে। মিতুর চোখ ওপাশে পরতেই বলে উঠলো,
“ওইতো ফারদিন ভাই।”
ফারিবা তাকিয়ে দেখে ফারদিন, তাকে দেখেই ফারিবার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল বিস্ময়। অদ্ভুত ব্যাপার ফারদিনের বাইক কোথায়, এমন কি হয়েছে যে তার ফোনটা সে হারিয়ে ফেললো আর বাইকটাও সাথে নেই, বরং সিএনজি করে এখানে এসেছে।
ফারিবার চোখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ, সে দেখলো ফারদিনের সাদা শার্টটা খানিকটা এলোমেলো হয়ে আছে, চুলগুলোও অগোছালো হয়ে আছে।
দূর থেকেও তাকে কেমন যেন ক্লান্ত লাগছিল। ফারিবার বুকের ভেতরটা হঠাৎ অকারণেই ধক করে উঠল।
সে এক পা এগিয়ে যেতে চাইতেই ফারদিন দূর থেকেই হাত তুলে ইশারা করল। ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি এনে বোঝিয়ে দিল,
“তুমি দাঁড়াও কন্যা আমি আসছি।”
ফারিবাও মুচকি হেসে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
ফারদিন ধীরে ধীরে রাস্তা পার হওয়ার জন্য পা বাড়াল...
চলবে…
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্পটা কেমন লাগলো জানাবেন,কালেকের পর্বটা একটু হৃদয় বিদারক হবে তার জন্য আগেই ক্ষমাপ্রার্থী, ধন্যাবাদ 🌸]