ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৪৬তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৪৫

ঘরের নীরবতা ভেঙে মোবাইল ফোনটা একটানা বেজে উঠলো। ফারিবা ধীরে ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে ভেসে থাকা নামটা দেখেই তার ক্লান্ত মুখে অনেকদিন পর একটুখানি হাসির রেখা ফুটে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে কলটা রিসিভ করল।

“হ্যালো মিতু।”

ওপাশ থেকে ভেসে এলো চেনা, প্রাণবন্ত একটা কণ্ঠ,

“কি ম্যাডাম, অবশেষে আপনার ফোন ধরার সৌভাগ্য হলো তাহলে, নাকি এখন এত বড় অফিসার হয়ে গেছেন যে পুরোনো বান্ধবীদের কথা মনেই থাকে না?”

মিতুর কথা শুনে ফারিবা মৃদু হেসে বলল,

“তোর একটুও পরিবর্তন হয়নি রে, এখনো আগেই মতোই আছি। ফোন রিসিভ করতেই তোর অভিযোগ শুরু।”

“আমি তো সবসময় এমনই। আচ্ছা বাদ দে এইসব কথা এখন বল তুই কেমন আছিস? অনেকদিন তোর সঙ্গে ঠিকমতো কথা হয় না রে, তুইও ব্যাস্ত থাকিস আমিও সময় করতে পারি না, কিন্তু চাচিমা এর সাথে কথা হরে তোর কথা জিজ্ঞেস করি সব সময়।”

ফারিবা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি রে, তুই কেমন আছিস।”

ফারিবা কথাটা স্বাভাবিক ভাবে বললেও মিতু ঠিকই বুঝতে পারে ফারিবার এই ভালো থাকার আড়ারের কষ্ট টা। মিতু কিছুক্ষন চুপ থেকে একটু নরম গলায় বলল,

“এইতো আমিও ভালো আছি। কিন্তু ফারিবা, তুই কি ভুলে গেছিস তুই আমার কাছে যতই লুকানোর চেষ্টা করিস না কেন, আমি ঠিকই তোর গলার আওয়াজ শুনেই বুঝে যাই যে তোর কিছু একটা হয়েছে। দেখ লুকাস না আমাকে বল, সব ঠিক আছে তো?”

ফারিবা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

“আরে তুই অযথা চিন্তা করছিস সব কিছুই ঠিক আছে। আসলে অফিসের কাজের চাপটা একটু বেশি এই আর কী।”

মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“তুই না, কোনোদিনই বদলাবি না। নিজের কষ্টগুলো সবসময় নিজের মধ্যেই আটকে রাখিস। কতবার করে আমরা বললাম সব ছেড়ে তোরা আমেরিকা তে চলে আয়। আব্বু কতবার চাচ্চু কে বলল তোদের ভিসা লাগিয়ে দিবে তোরা কেউ রাজি হতে পারলি না। কেনো রে আমরা তো তোদের আপন জন আমাদের কাছে কি থাকা যায় না। আমরা সবাই থাকতে তোরা অযথা এতো কষ্ট করছিস, কি ভাবে থাকছিস, নিজেথ কাঁধে সব দায়িত্ব নিয়ে ঘুরছিস। কেনো ফারবি এভাবে কতদিন থাকবি।”

মিতুর শেষ কথাটা শুনে ফারিবার চোখ ছলছল করতে শুরু করে সে সব বুঝেও ঞা বোঝার ভান করে বলে,

“মানো?”

“মানে মানে করিস না, আমি জানি তুই সবটাই বুঝতে পারছিস, দেগ ফারিবা এখনো তোর জীবনের অনেক সময় বাকি আছে, দয়া করে আর পাগলামি করিস না। এইবার অন্তত নিজের জীবন টা নতুন করে শুরু কর। আমি নিশ্চিত তোর এই অবস্থা দেখে ফারদিন ভাইও ভালো নেই। শোন নি আমি বলি কি তুই এবার বিয়ে কর, চাচ্চু, চাচিমা আর ফাইয়াজের কথা ভাবিস না আমরা তো আছি। আমরা ওদের নিয়ে আসবো।”

ফারিবা মিতুর কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস টানে, তার বুকের ভেতর কেমন এক হাহাকার অনুভব করে, কিন্তু কিছু বলে না নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বিষয়টা ঘোরানোর জন্য বলল,

“আচ্ছা, আমার কথা থাক না। তুই বল তোর দিন কাল কেমন কাটছে, ভাইয়া কেমন আছে। আর বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে চলল বেবি প্ল্যান করবি কবে।”

মিতুর কণ্ঠ মুহূর্তেই আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠল, ফারিবার কথা শুনে লজ্জা মাখা কন্ঠে বলল,

“আমরা ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। এখানকার জীবনটা অনেক ব্যস্ত, তবে ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি, আর বেবি প্ল্যান ও করে ফেলবো একটু সময় দে। আর শোন, তোকে একটা সুখবর দেওয়ার জন্যই আজ ফোন করেছি।”

ফারিবার কৌতূহলী হয়ে বলল,

“সুখবর?”

“হুম, আমরা বাংলাদেশে আসছি তোর ভাইয়ার এক কজিনের বিয়ে তাই আমরা সবাই আসছি। আগামী সপ্তাহেই আমাদের ফ্লাইট।”

ফারিবা যেন কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না,

“সত্যি বলছিস?”

“একদম সত্যি, এতদিন পর নিজের দেশ, নিজের মানুষগুলোর কাছে ফিরব ভাবতেই কেমন যেন ভালো লাগছে। আর তোকে না দেখে কিন্তু আমি ফিরব না। আমরা আগের মতো আড্ডা দিব মজা করবো।”

অনেকদিন পর ফারিবার চোখে সত্যিকারের আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল।

“আমি তোকে খুব মিস করিরে, মিতু। তুই আসলে তোকে অনেক জোরে জড়িয়ে ধরবো।”

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,

“আমিও তোকে খুব মিস করেছি, পাগলি। এবার কিন্তু কোনো অজুহাত চলবে না। তোকে নিয়ে অনেক ঘুরব, অনেক গল্প করব। এতদিনের সব অভিমান একসাথে মেটাব বুঝলি।”

ফারিবা মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“আচ্ছা, ঠিক আছে তোরা সাবধানে আয় তারপর সব হবে।”

এরপর দু'জন আরও অনেকক্ষণ গল্প করতে লাগল। কলেজ জীবনের দুষ্টুমি, পুরোনো স্মৃতি, বন্ধুদের খবর একটার পর একটা বিষয় নিয়ে হাসি-আড্ডায় কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়।

অনেকদিন পর ফারিবার মুখে এমন নির্ভার হাসি ফুটে উঠল। অনেকক্ষণ গল্প করার পর দু'জনেই কলটা কেটে দিল।

ফোনটা বিছানার পাশে রেখে ফারিবা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। অনেকদিন পর মিতুর সঙ্গে কথা বলে তার মনটা যেন একটু হালকা লাগছে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

জানালার বাইরে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। জীবনে কী অপেক্ষা করছে, সে জানে না। তবে অনেকদিন পর মনে হলো, হয়তো সামনে নতুন কোনো অধ্যায় অপেক্ষা করছে আর হয়তো তার জীবনেও সুদিন আসবে।

লাইটটা নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল ফারিবা। সারাদিনের ক্লান্তি আর নানা ভাবনার ভিড়ে একসময় ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো।

বাইরে তখন রাত আরও গভীর হচ্ছে। আর সেই গভীর রাত নীরবে অপেক্ষা করছে আগামী দিনের নতুন সূচনার।

…………………………………………………

এদিকে রাত অনেকটাই গভীর হয়ে এসেছে। নিজের ঘরের ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে আছে আদিল। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা। হালকা বাতাস এসে বারবার তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

দু'হাত পকেটে গুঁজে অপলক দৃষ্টিতে সে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ সারাদিনের প্রতিটি মুহূর্ত বারবার ফিরে আসছে তার মনে। বিশেষ করে ফারিবার সেই ক্লান্ত আর লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো যেন এখনও তার চোখের সামনেই ভাসছে।

সে জানে না, ফারিবা কেন কেঁদেছিল। সে এটাও জানে না, তার এই কষ্টের কারণ টা আদিল নিজেই কি না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনে বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আদিল ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

নিজের অজান্তেই ঠোঁট নড়ে উঠল,

“তোমাকে ভালোবেসে যদি তোমার জীবনটাই কঠিন করে দিই তাহলে সেই ভালোবাসার কোনোই মূল্য নেই, ফারিবা। কিন্তু আমার যে তোমাকেই চাই, তোমাকে ভালোবাসার পর থেকে যে আর অন্য কিছু বা অন্য কারো দিকে তাকাতেই ইচ্ছে করে না।”

কথাগুলো বলেই সে তিক্ত একটা হাসি দিল। কাউকে নিজের করে পাওয়ার এত ইচ্ছে তার জীবনে কখনো হয়নি। অথচ আজ প্রথমবার যার জন্য মনটা এভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে, সেই মানুষটার কাছেই যেন সে সবচেয়ে বেশি অপরিচিত।

হয়তো সত্যিই তার অনুভূতিগুলো ফারিবার জন্য একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো তার কাছ থেকে দূরে থাকাটাই ফারিবার জন্য ভালো। এই ভাবনাটা বুকের ভেতর তীব্র একটা ব্যথা তৈরি করলেও আদিল নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

ধীরে ধীরে মাথা তুলে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

“আমি জানি না, আমাদের নসিবে কি লেখা আছে, কিন্তু আমার যে তোমাকেই চাই ফারিবা যে করেই হোক।”

চারপাশ আবারও নীরব হয়ে গেল। শুধু রাতের বাতাস নিঃশব্দে বয়ে চলল, আর সেই বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা বুকভরা না বলা অনুভূতি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

…………………………………………………

ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে জানালার সাদা পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। বাইরে গাছের ডালে বসে ছোট ছোট পাখিরা কিচিরমিচির করে নতুন দিনের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। রাতের নীরবতা ভেঙে চারপাশ আবারও ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

ফারিবার ঘুম ভাঙল মোবাইলের অ্যালার্মের পরিচিত শব্দে। ঘুম জড়ানো চোখে হাত বাড়িয়ে অ্যালার্মটা বন্ধ করল সে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। গতকালের প্রতিটি ঘটনা একে একে মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবারও ভারী হয়ে উঠল।

কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করল। নিজের মনকে সে অনেক আগেই একটা কথাই শিখিয়েছে যে, জীবন থেমে থাকা যাবে না, পরিস্থিতি যেমনি হোক লড়াই করতে হবে। তাই কষ্ট থাকলেও নতুন দিনের শুরুটা তাকে করতেই হবে।

ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে ওযু করে ফজরের নামাজ আদায় করল সে। নামাজ শেষে দীর্ঘ সময় দু'হাত তুলে নীরবে দোয়া করল। নিজের জন্য নয়, বরং এই পরিবারের সবার শান্তি আর ভালো থাকার জন্য। দোয়া শেষ করে কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হালকা শীতল বাতাস এসে মুখে লাগতেই বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা যেন সামান্য হলেও কমে এলো।

এরপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার গাছ গুলোতে পানি দিলো, গাছের পুরোনো শুকিয়ে যাওয়া পাতা গুলো ছিড়ে পরিস্কার করছিল। ঠিক সেই সময় তার আদিলের বাড়িতে সে সুন্দর বাগান টার কথা মনে পরে গেলো, সাথে আদিলের সেই নিষ্পাপ চেহারা টা তার চোখে ভেসে উঠলো। সাথে সাথে ফারিবা মাথা ঝাকিয়ে বলল,

“না না, এইসব চিন্তা করা যাবে না। আমি উনাকে নিয়ে ভাবতেই চাই না। আমি চাইনা উনার জীবনে জড়িয়ে, উনার জীবনটাও নষ্ট করতে।”

এরপর ঘরের ভেতরে চলে এসে আলমারি খুলে অফিসে যাওয়ার জন্য একটি বোরখা বের করে গুছিয়ে রাখলো। তারপর রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখল, ফারদিনের মা ইতোমধ্যেই সকালের নাস্তা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

ফারিবা মৃদু হেসে বলল,

“মা, আপনি আবারও একাই কাজ শুরু করে দিয়েছেন?”

ফারদিনের মা পেছন ফিরে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,

“ভাবলাম তুই তো অফিসে যাবি, তাই একটু আগে আগে সব গুছিয়ে রাখি।”

ফারিবা আর কিছু না বলে ওড়নাটা কোমরে গুঁজে নিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।

“আপনি সরুন বিশ্রাম নিন, আজ নাস্তা আমি বানাবো, আর আজ নয় এখন থেকে আমি করবো এরপরে দুপুরে আপনি করবেন না হয়। আর রাতে আমি ফেরার পর একসাথে কাজ করবো বুঝলেন।”

ফারদিনের মা হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যা মা বুঝতে পেরেছি, আচ্ছা তোর সাথে মিতুর কথা হয়েছে। ও অনেক দিন ধরে তোকে ফৈন করবে ভাবছিলো।”

ফারিবা পরোটার খামিরে ময়ান দিতে দিতে বলল,

“হ্যা মা কথা হয়েছে, ওরা নাকি আগামি সপ্তাহে আসবে, ওর শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়র বিয়ে।”

“যাক আসুক এলে ওদের দাওয়াত করে খাওয়াব ভাবছি। কি বলিস করবো দাওয়াত।”

ফারিবা ফারদিনের মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,

“অবশ্যই দাওয়াত করবেন মা, আপনি এইভাবে জিজ্ঞেস করছেন কেনো।”

এরপর ফারিবা আবারো কাজে মন দিলো আর ফারদিনের মায়ের সাথে অনেক গল্প করলো। নাস্তা বানানো শেষ হওয়ার পর ফারিবা টেবিলে সব গুছিয়ে রাখলো আর ফারদিনের মা বাকিদের ডেকে আনলো। এরপর প্রতিদিনের মতো সবাই একসাথে নাস্তা করলো গল্প করলো।

খাওয়া শেষে ফারিবা নিজের ঘরে গিয়ে তৈরি হয়ে ব্যাগ নিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলো।

এদিকে আদিলও প্রতিদিনের মতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নিজের সকালের সব কাজ শেষ করে তৈরি হয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর মেহজাবিনও অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে এলো।

ডাইনিং টেবিলে ইতিমধ্যেই রহিমা বেগম নাস্তা সাজিয়ে রেখেছেন। দু'জনকে একসঙ্গে বসতে দেখে তিনি মুচকি হেসে খেতে বললেন।

আদিল আর মেহজাবিন প্রতিদিনের মতোই একসঙ্গে নাস্তা করতে বসল। খাওয়ার ফাঁকে মেহজাবিন অফিসের কিছু কাজ নিয়ে কথা বলছিল, আর রহিমা বেগম মাঝেমধ্যে দু'জনের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন।

নাস্তা শেষ করে আদিল হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বলল,

“মেহু, চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

“হ্যা ভাই চলো।”

মেহজাবিন তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। এরপর দু'জন একসঙ্গে রহিমা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গাড়ির সামনে এসে আদিল ড্রাইভিং সিটে বসল, আর মেহজাবিন গিয়ে পাশের সিটে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নিল।

গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির গেট পেরিয়ে মূল সড়কে উঠে এলো। সকালের ব্যস্ত শহর তখন ধীরে ধীরে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে। চারপাশের যানবাহনের ভিড়ের মাঝেই দু'জন ভাইবোন প্রতিদিনের মতো অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

অন্যদিকে ফারিবাও প্রতিদিনের মতো রিকশা থেকে নেমে অফিস ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল।

একবার মাথা তুলে বিশাল কাঁচঘেরা ভবনটার দিকে তাকিয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

ভবনের ভেতরে ঢুকে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল সে। ঠিক তখনই অফিসের আরও কয়েকজন সহকর্মী এসে যোগ দিল।

“গুড মর্নিং, মিস ফারিবা।”

ফারিবা মৃদু হেসে জবাব দিল,

“গুড মর্নিং।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই লিফট এসে থামল। সবাই একসঙ্গে ভেতরে ঢুকে নিজ নিজ ফ্লোরের উদ্দেশ্যে উঠে গেল। নিজের ফ্লোরে নেমে ফারিবা প্রতিদিনের মতো ডেস্কে গিয়ে ব্যাগটা রেখে কম্পিউটার অন করল। তারপর আগের দিনের কাজের ফাইলগুলো একে একে সামনে গুছিয়ে রাখল।

এমন সময় অফিসের মূল প্রবেশপথ দিয়ে আদিল আর মেহজাবিন ভেতরে প্রবেশ করল। রিসেপশনের কর্মীরা দু'জনকে সম্মান জানিয়ে শুভ সকাল বলতেই আদিল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে জবাব দিল। মেহজাবিনও সবার সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল।

লিফটে উঠে দু'জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। অফিসের আজকের কাজ নিয়েই দু'একটা সাধারণ কথা বলছিল তারা। কয়েক মুহূর্ত পর লিফট তাদের ফ্লোরে এসে থামতেই দু'জন বেরিয়ে এল।

ফ্লোরে পা রাখতেই যে যার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নতুন দিনের কর্মব্যস্ততা ইতিমধ্যেই পুরো অফিসজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কিছুক্ষন পরেই লিফটের দরজা আবার খুলে গেল। হাতে কফির ওয়ানটাইম কাপ আর কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, মুখে চিরচেনা হাসি নিয়ে তন্ময় ফ্লোরে পা রাখল।

আজ তন্ময় কে অনেকটা হালকা লাগছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার মন থেকে যেনো অনেক বড় একটা বোঝা কেটে গেছে। রিসেপশনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে পরিচিত এক স্টাফকে দেখে হেসে বলল,

“কী রফিক সাহেব, আজ সূর্যটা কোন দিক থেকে উঠেছে? আপনি দেখি আমার থেকে দেরি করে এসেছেন।”

রফিক সাহেব হেসে বলল,

“আমি তো ঠিক সময় এসেছি তন্ময় সাহেব বরং আপনি আজকে বেশি আগে চলে এসেছেন, না হলে তো আপনাকে সবার পরেই অফিসে আসতে দেখা যায়।”

তন্ময় বুকের ওপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

“এই অপবাদ আমি মানতে পারলাম না রফিক সাহেব। আমি কখনোই লেট করি না, বরং সময়টাই মাঝে মধ্যে আমার মাঝে বাঁধা হতে চলে আসে।”

তার কথা শুনে আশপাশের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এমন সময় পাশ দিয়ে যাওয়া আরেক সহকর্মী মজা করে বলল,

“ব্যাপার কি বলুন তো তন্ময় সাহেব, আজকে আপনাকে অনেকটাই খুশি লাগছে, মনে হচ্ছে সকাল সকাল কোনো লটারি জিতেছেন!”

তন্ময় কফিতে এক চুমুক দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“লটারি জিতলে কি অফিসে আসতাম? এখন পর্যন্ত আসছি মানে বুঝে নিন, ভাগ্য এখনও অফিসের বেতনেই আটকে আছে।”

আবারও হাসির রোল পড়ে গেল চারপাশে। একজন সিনিয়র স্টাফ মাথা নেড়ে হেসে বললেন,

“আফিসের সকালটা আপনার হাস্যকর কথা দিয়ে না শুরু হলে মনে হয় যেনো কাজ করার শক্তি টাই পাই না।”

তন্ময় মুচকি হেসে বলল,

“স্যার আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেনো আমি এই অফিসের অফিশিয়াল মর্নিং এনার্জি ড্রিংক।”

সবাই আবারও হেসে উঠল। হাসি-ঠাট্টার মাঝেই তন্ময় সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে নিজের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে থেকে তাকে আগের মতোই প্রাণবন্ত আর দুষ্টু মনে হলেও, তার চোখের গভীরে গতকালের স্মৃতির ক্ষীণ ছাপ এখনও রয়ে গেছে। তবে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিজের কষ্টকে আর কারও বোঝা হতে দেবে না। তাই সবকিছু নিজের ভেতরেই রেখে, আগের মতো স্বাভাবিক জীবনেই ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এরপর ধীরে ধীরে পুরো অফিসটাই ডুবে গেল কর্মব্যস্ত এক পরিবেশে। প্রতিটি ডেস্কে কম্পিউটারের কিবোর্ডে আঙুলের দ্রুত চলাচল, প্রিন্টারের শব্দ, ফোনের রিংটোন আর সহকর্মীদের নিচু স্বরের কথোপকথন মিলিয়ে অফিসের পরিচিত পরিবেশটা আবারও ফিরে এলো।

নিজের কেবিনে বসে আদিল একের পর এক ফাইল যাচাই করছিল। সামনে ল্যাপটপে বিভিন্ন প্রজেক্টের রিপোর্ট খোলা। মাঝেমধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাগজে সই করছে, আবার কখনো ইন্টারকমে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দিচ্ছে। তার গম্ভীর মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, কাজের সময় সে নিজের চারপাশের সবকিছু ভুলে যায়।

অন্যদিকে মেহজাবিনও নিজের কেবিনে বসে ট্যুর-সংক্রান্ত কিছু নথি, মেইল আর অফিসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ একসঙ্গে সামলাতে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে কোনো ফাইল নিয়ে বাইরে এসে কারও সঙ্গে দু-একটা কথা বলে আবার নিজের কেবিনে ফিরে যাচ্ছিল।

ফারিবা মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করছিল। সামনে ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো এক এক করে গুছিয়ে তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছিল। কখনো কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রাখছে, আবার কখনো নোটপ্যাডে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখে রাখছে। মুখে কোনো কথা নেই, পুরো মনোযোগ যেন শুধু কাজের দিকেই।

পাশের ডেস্কে তামান্নাও ব্যস্ত হয়ে টাইপ করে চলেছে। মাঝেমধ্যে কোনো তথ্য নিয়ে ফারিবার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে কিছু জিজ্ঞেস করছে।

“এই ডকুমেন্টটা আগে সাবমিট করব, নাকি রিপোর্টটা?”

ফারিবা স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় উত্তর দিল,

“আমার মনে হয় রিপোর্টটা আগে শেষ করাই ভালো হবে, তারপর দুটো একসাথেই পাঠিয়ে দিও।”

তামান্না মাথা নেড়ে আবার কাজে মন দিল।

এদিকে আবিরও ব্যস্ত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট তৈরিতে। এই কাজটি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সে প্রয়োজনীয় রিসার্চ করে আসছিল। প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে রিপোর্টটি প্রস্তুত করছিল সে। আজকের মধ্যে কাজটি শেষ করে জমা দিতে পারলেই যেন কয়েকদিনের জমে থাকা চাপ আর দুশ্চিন্তার একটা বড় বোঝা তার কাঁধ থেকে নেমে যাবে।

অন্যদিকে তন্ময়ও আজ সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করছিল। মাঝে একবার পাশের সহকর্মীর ডেস্কে গিয়ে কোনো ফাইল বুঝিয়ে দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এল। ফেরার সময় হালকা মজা করে বলল,

“আজ কিন্তু কেউ আমার নামে কনো অভিযোগ করতে পারবে না। আমি সকাল থেকেই ভদ্র ছেলেদের মতো করে কাজ করছি।”

কথাটা শুনে আশপাশে থাকা দু-একজন হেসে ফেলল। অফিসের গম্ভীর পরিবেশেও মুহূর্তের জন্য একটা হালকা হাসির আবহ তৈরি হলো।

…………………………………………………

সময় যত এগোচ্ছিল, কাজের চাপও তত বাড়ছিল। কেউ রিপোর্ট তৈরিতে ব্যস্ত, কেউ নতুন প্রজেক্টের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে, আবার কেউবা নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজের দায়িত্ব শেষ করার চেষ্টা করছে।

কাঁচের দেয়ালঘেরা অফিসের ভেতরে সবাই যেন নিজ নিজ দায়িত্বে ডুবে আছে। বাইরে দিনের রোদ ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে উঠলেও ভেতরের ব্যস্ততা যেনো একটুও কমল না। নতুন দিনের শুরুতেই পুরো অফিস আবারও ফিরে পেল তার চেনা কর্মচঞ্চল রূপ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অফিসের ব্যস্ততা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

একের পর এক ক্লায়েন্টের ফোন আসছে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে ফাইল আদান-প্রদান চলছে। কেউ প্রিন্টআউট নিয়ে এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যাচ্ছে, আবার কেউ ল্যাপটপ হাতে মিটিং রুমের দিকে দ্রুত পা বাড়াচ্ছে।

ফারিবা নিজের কাজ শেষ করেই থেমে থাকল না। পাশের ডিপার্টমেন্ট থেকে আসা কিছু ডকুমেন্টও যাচাই করে সিস্টেমে আপডেট দিতে শুরু করল। কাজের প্রতি তার এই নিষ্ঠা নতুন কিছু নয়। অফিসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সবাই জানে, একবার কোনো দায়িত্ব তার হাতে গেলে সেটা নিখুঁতভাবে শেষ না করে সে কখনো নিশ্চিন্ত হয় না।

কিছুক্ষণ পর মেহজাবিন নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে কয়েকজন স্টাফের সঙ্গে ট্যুর সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করল। কার কী দায়িত্ব থাকবে, কোন জিনিস গুলোর প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে, কোন কোন ফাইল আগে শেষ করতে হবে সবকিছুই একবার মিলিয়ে নিল সে।

তারপর হালকা গলায় বলল,

“যাদের কাজ আজ শেষ করা সম্ভব, তারা আজই কমপ্লিট করে ফেলুন। তাহলে ট্যুরের আগে কোনো চাপ থাকবে না। আর ফ্রি টাইম টা সুন্দর আর দুশ্চিন্তা বিহীন ভাবে উপভোগ করতে পারবেন।”

সবাই সম্মতি জানিয়ে আবার কাজে মন দিল।

অন্যদিকে আদিলও নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে পুরো ফ্লোরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কারও কাজে অযথা বাধা না দিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় কয়েকটি বিষয় বুঝিয়ে দিয়ে আবার নিজের কেবিনে ফিরে গেল।

কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে পুরো অফিসটাকে একবার দেখে তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কর্মীরা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে একজন দায়িত্বশীল সিইও হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চাইতে পারেন তিনি।

এদিকে তামান্না আর আবির পাশাপাশি বসে একটা রিপোর্টের তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছিল।

“এই ফাইলটার ডাটা আরেকবার চেক করুন তো আবির সাহেব।”

আবির নিজের কাজ পাশে রেখে শান্তভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“হুম, ঠিকই আছে। এখন শুধু ফাইনাল আপডেটটা দিলেই হবে।”

দু'জন আবার কাজে ডুবে গেল।

তন্ময়ও এখন অদ্ভুতভাবে শান্ত। মাঝেমধ্যে সহকর্মীদের ছোটখাটো কাজে সাহায্য করছে, কোথাও কোনো সমস্যা হলে হাসিমুখেই সমাধান করে দিচ্ছে। তবে আগের মতো অকারণে সবাইকে বিরক্ত করা বা দুষ্টুমি করার সুযোগ আজ সে নিচ্ছে না, কারণ সবাই এখন ব্যস্ত তাই ভাবলো কাজের মধ্যে দুষ্টুমি না করেসিরিয়াস থাকাটাই ভালো। তবুও শান্ত থাকলেও তার উপস্থিতিতে পুরো টিমের মধ্যে একটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে।

পুরো ফ্লোরজুড়ে যেন একটাই লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই সব কাজ শেষ করা। কারণ সবাই জানে, আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে বহু প্রতীক্ষিত অফিস ট্যুর।

…………………………………………………

বিকেলের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কিছুটা কমে এসেছে। সকাল থেকে একের পর এক মিটিং, ফাইল সাইন আর ক্লায়েন্ট কল শেষ করে সবাই আবার নিজ নিজ কাজেই মন দিয়েছে।

ঠিক সেই সময় এইচআর বিভাগের একজন কর্মী এসে জানিয়ে গেলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে কনফারেন্স রুমে উপস্থিত হতে হবে। আসন্ন অফিস ট্যুর সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো হবে।

খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই পুরো অফিসে যেন হালকা উৎসবের আমেজ তৈরি হলো। কাজের ফাঁকেই কেউ হাসিমুখে ট্যুর নিয়ে কথা বলছে, কেউ আবার আন্দাজ করছে কোথায় যাওয়া হতে পারে।

নির্ধারিত সময়ে একে একে সবাই কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসল। টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি করে ট্যুর গাইডলাইন শিট। কিছুক্ষণ পর আদিল এবং মেহজাবিন ভেতরে প্রবেশ করলেন।

সবাই শান্ত হলে আদিল সংক্ষেপে বললেন,

"অনেকদিন ধরেই আমাদের টিমের জন্য একটা অফিস ট্যুরের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। অবশেষে সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছে।"

তিনি জানালেন, আর তিন দিন পর, অর্থাৎ শনিবার খুব ভোরে পুরো টিম ঢাকার বাইরে চার দিনের জন্য রওনা দেবে। ট্যুর চলাকালীন সবাই অফিসের নিয়ম মেনে চলবে, সময়মতো নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত থাকবে এবং একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলবে। এছাড়া যাত্রার সময়, বাসে ওঠার স্থান, প্রয়োজনীয় পোশাক, ব্যক্তিগত ওষুধ, পরিচয়পত্র এবং জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখার বিষয়েও সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দেওয়া হলো।

কথাগুলো শুনে অনেকের মুখেই আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। কেউ মোবাইলে তারিখ লিখে রাখল, কেউ আবার পাশের সহকর্মীর সাথে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগলো। ফারিবাও চুপচাপ সব কথা শুনছিল। এবার তার মনে আগের মতো দ্বিধা নেই। বরং অজান্তেই মনে হলো, অনেকদিন পর হয়তো নিজের চারপাশের পরিচিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে একটু অন্যরকম সময় কাটানোর সুযোগ পাবে সে।

মিটিং শেষে আদিল শুধু এতটুকুই বললেন,

"বাকি তিনটা দিন সবাই নিজের অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করে ফেলবেন। যেনো ট্যুরে যাওয়ার আগে কোনো ফাইল বা দায়িত্ব ঝুলে না থাকে।"

এরপর সবাই আবার নিজেদের কাজে ফিরে গেল। তবে এবার অফিসের প্রতিটি কোণেই যেন কাজের পাশাপাশি আসন্ন ট্যুরের ছোট্ট একটা উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ল।

মিটিং শেষ হওয়ার পর আবারও সবাই নিজের নিজের কাজে ডুবে গেল। ট্যুরের উত্তেজনা থাকলেও হাতে থাকা দায়িত্বের কোনো কমতি ছিল না। বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ করার তাগিদে পুরো অফিস যেনো আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল।

একের পর এক ফাইল জমা পড়ছে, শেষ মুহূর্তের রিপোর্টগুলো যাচাই করা হচ্ছে। কেউ কম্পিউটারের সামনে বসে দ্রুত টাইপ করছে, কেউ আবার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পৌঁছে দিচ্ছে।

ফারিবাও নিজের টেবিলে মাথা নিচু করে কাজ করছিল। সামনে রাখা ফাইলগুলো একে একে শেষ করে সেগুলো নির্দিষ্ট ভাবে গুছিয়ে রাখল। মাঝে দু-একবার মেহজাবিন এসে কিছু ডকুমেন্ট নিয়ে গেল, আবার আদিলও নিজের কেবিন বসে প্রয়োজনীয় ফাইলে সাইন করে গেছে। এভাবেই কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, কেউ টেরই পেল না।

ঘড়ির কাঁটা অফিস ছুটির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আরও প্রায় কয়েক ঘণ্টা অতিক্রম করেছে। আজ কাজের চাপ একটু বেশি থাকায় প্রায় সবাইকেই অতিরিক্ত সময় থাকতে হয়েছে। অবশেষে শেষ ফাইলটিতে সই করে আদিল কলমটা টেবিলে রেখে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তাকিয়ে দেখল, অফিসের বেশিরভাগ কর্মীও ইতোমধ্যে দিনের কাজ শেষ করে গুছিয়ে নিচ্ছে।

সে নিজের কোটটা তুলে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। এদিকে মেহজাবিনও ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়েছে। ঠিক তখনই আদিল তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,

“চল, বের হওয়া যাক।”

মেহজাবিন মাথা তুলে মুচকি হেসে বলল,

“ভাই, আমি আজ তোমার সঙ্গে যাচ্ছি না।”

আদিল ভ্রু তুলে তাকাল।

“কেন?”

“তামান্না অনেক দিন ধরেই শপিংয়ে যাওয়ার কথা বলছে। আজ কাজ শেষ হতে দেরি হয়েছে ঠিকই, তবুও একটু ঘুরে যাব। আবির সাহেব আর তন্ময় সাহেবও যাবে।”

কথাটা শুনে আদিল শুধু মাথা নাড়ালো, সে প্রথমে রাজি হলো না। কারণ বোনের প্রতি সে অনেক বেশি সচেতন থাকে। কিন্তু মেহজাবিনের জোরাজোরিতে অবশেষে রাজি হয়ে বলল,

“ঠিক আছে বেশি রাত করবি না তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবি। আর তোর কিছু পছন্দ হলে কিনে নিস আমি তোর ফোনে টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি।”

“আরে ভাই আমার কাছে আছে তো, তোমার দিতে হবে না।”

আদিল কোনো কথা শুনে না, টাকা পাঠিয়ে মুচকি হেসে বলে,

“যা ইচ্ছে হয় কিনে নিস, আর সাবধানে বাড়ি ফিরবি কেমন।”

মেহজাবিনও সম্মতি জানিয়ে ব্যাগটা ঠিক করে নিল। তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই আদিলকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর ভাই শুনো, যদি তোমার কোনো অসুবিধা না থাকে, তাহলে ফারিবা আপুকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাও, আপুকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিও। রাত করে একা যাওয়ার চেয়ে ভালো তুমি নামিয়ে দিলে।”

আদিল এক মুহূর্ত চুপ করে রইল কারণ সেইরাতের পর থেকে সে ফারিবার সাথে একবারও তেমন কথা বলেনি। আদিল ভাবতে থাকে যদি ফারিবা তার সাথে অসস্তি বোধ করে তাহলে সে কিভাবে সহ্য করবে। এই সব কিছু চিন্তা করেও খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল,

“ঠিক আছে।”

কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে ফারিবার ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল। ফারিবা তখনও সব কিছু গুছিয়ে রাখছিল। কিছুক্ষণ পর আদিল ফারিবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

“মিস ফারিবা।”

সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠে নিজের নামটা শুনে ফারিবা কেঁপে উঠল। অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল। তাকাতেই চোখে পড়ল আদিলকে।

সারাদিনের ব্যস্ততার ক্লান্তি স্পষ্ট তার মুখে। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, গলায় বাঁধা টাইটা একটু আলগা, কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে কয়েক গোছা চুল। চোখ দুটো আগের মতোই গভীর ও স্থির, কিন্তু আজ সেই দৃষ্টির কঠোরতার আড়ালে যেন একফোঁটা নীরব ক্লান্তি আর অদ্ভুত কোমলতা লুকিয়ে আছে। মুখে কোনো হাসি নেই, তবুও তাকে দেখলে অকারণেই এক ধরনের নিশ্চিন্ত অনুভূতি জেগে ওঠে।

ফারিবা কয়েক মুহূর্ত তার দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের অস্থির মনটাকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। তারপর নরম সুরে বলল,

“জ্বি স্যার বলুন।”

আদিল নিজেকে যথেষ্ট শান্ত আর স্বাভাবিক রেখে বলল,

“তোমার কাজ শেষ হলে চলো তোমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেই।”

বেশ অনেকদিন পর আদিল তাকে পৌঁছে দেয়ার কথা শুনে সে তাকিয়ে ছিল লোকটার দিকে। অজান্তে ফারিবার কথাটা শুনতে বেশ ভালোই লাগলো। দুইদিন ধরে আদিলূর চুপ থাকাটা কোনো ভাবেই ফারিবার মন মানতে পারছিলো না। ফারিবা কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,

“স্যার আমি একা যেতে পারবো আমার জন্য আপনার কষ্ট কর….”

ফারিবাকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে আদিল বলল,

“এখানে কষ্টের কিছু নেই, আমি তো ওই রাস্তা দিয়েই যাই। আর তোমাকে আমি আরো কয়েকবারই পৌঁছে দিয়েছি তাহলে আমার মনে হয় না কোনো সমস্যা হবে। সব গুছিয়ে নেমে এসো আমি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে আনছি।”

কথাটা বলে আদিল বেড়িয়ে গেলো, ফারিবা তার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো। এরপর ফারিবা সব কিছু গুছিয়ে নিলো। কিছুক্ষন পর অফিসের প্রধান প্রবেশদ্বার দিয়ে বেরিয়ে এলো। এসে দেখে আদিল গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে।

ফারিবাকে দেখে আদিল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিল। ফারিবা ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। আদিল ফারিবার পাশের দরজা লাগিয়ে দিয়ে সে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। এরপর গাড়ি চলতে শুরু করে, গাড়িটা ধীরে ধীরে অফিস চত্বর ছেড়ে ব্যস্ত শহরের রাস্তায় উঠে এল।

সন্ধ্যার ঢাকা তখন আলোয় ভরে উঠেছে। রাস্তার দুই পাশে একের পর এক দোকানের সাইনবোর্ড জ্বলছে। গাড়ির জানালার বাইরে শহর ছুটে চলেছে নিজের ছন্দে। কিন্তু গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত এক নীরবতা। রেডিওতে খুব আস্তে একটা পুরোনো গান বাজছিল। আদিল রাস্তায় চোখ রেখেই গাড়ি চালাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর আদিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য শান্ত স্বরে বলল,

“আজ অনেক কাজ হয়েছে। ক্লান্ত নিশ্চয়ই?”

ফারিবা জানালার বাইরে তাকিয়েই মৃদু হাসে বলে,

“হ্যাঁ একটু ক্লান্ত।”

আবারও নীরবতা, এই নীরবতা অস্বস্তিকর নয়।

বরং দু'জনের মাঝখানে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে ছিল। আদিল আর তেমন কোনো কথা বলল না, আর না ফারিবা বলল। তবুও দু'জনেরই মনে হচ্ছিল, এই নিরব পথচলাটাও যেন অনেক কথার চেয়ে বেশি কিছু বলে দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ফারিবার বাড়ির সামনে এসে থামল। ফারিবা ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজা খুলল।

নেমে যাওয়ার আগে একবার আদিলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“ধন্যবাদ স্যার নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”

আদিল শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ভালো থাকবেন। কাল দেখা হবে।”

ফারিবা গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় আদিল তাকে থামিয়ে বলে,

“মিস ফারিবা আপনার যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে ট্যুর যাওয়ার দিন আপনি চাইলে আমার আর মেহুর সাথে যেতে পারেন।”

“না স্যার আপনাদের কষ্ট হবে আমি সবার সাথে বাসে করে যেতে পারবো।”

আদিল কিছুক্ষন থেমে বলে,

“আমাদের কষ্ট হবে না বরং আমার মনে হয় মেহু খুব খুশি হবে।”

ফারিবা আর কিছু বলতে পারলো না, সম্মতি জানিয়ে আদিলকে বিদায় জানিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়।

আর ফারিবা বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে সেখানেই অপেক্ষা করলো। ফারিবা ধীরে ধীরে গেট খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।

আদিল গাড়ির ভেতর থেকেই তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না মেয়েটার অবয়বটা চোখের আড়াল হয়ে গেল।

তারপর স্টিয়ারিংয়ের ওপর আলতো করে হাত রেখে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। আজও সে ফারিবার মনের ভাব বুঝতে পারলো না, তবে সে আজকে ফারিবার স্বাভাবিক কথা শুনে বুঝতে পারলো মেয়েটা হয়তো তার সাথে আর রাগ করে নেই। সে মনে মনে বলল, আরো কিছুকা সময় দেয়া উচিৎ, কারণ কিছু সম্পর্ককে সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

ঠোঁটের কোণে একটুখানি ম্লান হাসি ফুটে উঠল তার। পরমুহূর্তেই গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। রাতের নরম বাতাস কেটে গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় মিলিয়ে গেল তার কালো গাড়িটা।

আর অন্যদিকে, বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে করতেই ফারিবা একবার অজান্তেই পেছন ফিরে তাকাল। গাড়িটা তখনও কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ছিল। কেন জানি বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল তার। পরমুহূর্তেই সে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে চলে গেল।

চলবে…

(ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন