#অপ্রত্যাশিত_অনুরাগ
#মায়িশা_নুরাইন
#পর্ব_৩
--- " নাওরা, উঠবি না তুই? পানি ঢেলে দিবো নাকি? "
নাওরা ঘুম ঘুম কন্ঠে উত্তর দেয়,,
--- " মামী, এলার্ম বাজলে উঠবো। আমি তো এলার্ম দিয়েই রাখছি।"
--- " কয়টার এলার্ম দিয়েছিস?"
--- " ৮ টার। আজকে সারে দশটায় ক্লাস।"
--- " আরে ব'লদী, এলার্ম কি আদৌ দিয়েছিস? ৯টা বেজে গেছে। "
মামীর কথা শুনে নাওরার ঘুম পালিয়ে গেছে। লাফ মেরে উঠে বলে,,
--- " কি বললা !! এলার্ম বাজলো না কেন তাহলে?"
বলেই বালিশের আশে পাশে হাত দিয়ে ফোন খুজতে গিয়েই মনে পরে ফোন তো তার সাথেই নেই। তাই মামীর দিকে তাকিয়ে একটা মেকি হাসি দিয়ে বলে,,
--- " ওহহ, এলার্ম দিতে ভুলে গিয়েছিলাম বোধহয়। তুমি যাও না, আমি ফ্রেস হয়ে তাড়াতাড়ি আসতেছি।"
--- " এসবই করিস সবসময়। বিয়ে দিলে পরে টের পাবি, কত ধানে কত চাল। সকালের ঘুমটা যখন উদাও হবে তখন বসে বসে কান্না করিস। "
বলেই তিনি চলে যান। নাওরা বিয়ের কথা শুনেই নাফসানের কথা ভাবতে থাকে। মনে মনে কল্পনা করতে থাকে৷ নাফসান তাকে সাতসকালে ঘুম থেকে তুলে রান্না করতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর নাওরা সারাদিন একটার পর একটা কাজ করছে একা একা। ঘর গোছানো, রান্না করা, কাপড় কাচা ইত্যাদি। নাফসান তাকে শুধু অর্ডার দিয়ে যাচ্ছে, রান্না ভালো না হওয়ায় কথা শুনাচ্ছে। একটুও ভালো ভাবে কথাও বলছে না। এসব ভেবেই নাওরা মনের অজান্তেই চি'ল্লিয়ে উঠে।
--- নাআআ, এই নাফসানকে আমি ছাড়বো না। আমাকে জ্বা'লানোর আগে আমি নিজেই তার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দিবো।"
--- "কার জীবন আপু?"
সাফিয়ার কথায় নাওরার হুশ ফিরে। এতক্ষণ কিসব ভাবছিলো সে। এই বিয়েরই তো কোন ভিত্তি নেই, আর সে কিনা সংসার জীবনের চিন্তা করে ফেলছে। তাই এইসব উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সাফিয়াকে বলে,,
--- "কতটুকু শুনেছিস আমার কথা?"
--- " ওইতো, জীবন তেজপাতা করাটুকুই,,,"
--- " গুড, এইজন্যই তো তোকে আমি বেশি ভালোবাসি। এইভাবেই সবসময় অল্প কথা শুনবি, মাহরুর মতো সব কথা শুনে ফেলিস না। "
বলেই সাফিয়ার পিঠ চা'পড়ে নাওরা বাথরুমে চলে যায়। আর সাফিয়া তো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। আর ভাবতে থাকে,
~~ " আমার প্রশংসা করলো, নাকি টিটকারি দিলো!! "
🌿
--- " আপু আজকেও আমার জন্য চকলেট আনবা?"
--- " আজকেও মানে? আর কবে দিয়েছে তোকে?"
সাফিয়াকে মাহরু একটা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,,
--- " বলবো না, আপু বলতে না করছে।"
সাফিয়া নাওরার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,,
--- " আপু তুমি আবার মাহরুকে লুকিয়ে চকলেট দিছো। আবার বলতেছো আমাকে ভালোবাসো তুমি,,"
--- " আরে তুই কি ছোট বসে আছোস নাকি। মাহরু তো ছোট, তাই তাকেই দিয়েছি। "
--- " এহহ, যেই মেয়ে নিজে চকলেট দেখলে খুশিতে পা'গল হয়ে যায়, সে আমাকে বড় বলতেছে।
নাওরা মুখ ভোতা করে ফেলে। গতকাল মাহরুকে চকলেটটা দিতে তার যে কত কষ্ট হয়েছিলো, সেটা যদি মাহরু একটু বুঝতো!। তবুও মাহরুর মুখ বন্ধ করতে চকলেটটা দিয়ে দেওয়া লাগছিলো।
তাদের কথার মাঝেই রুবিনা বেগম খাবার নিয়ে আসে। তারা খাবার শেষ করতেই সাফিয়া নাওরা দুজনেই তৈরি হয়ে চলে আসে। সাফিয়ার কলেজ নাওরার ভার্সিটি যাওয়ার রাস্তায়ই। যেদিন নাওরার ক্লাস দেরীতে থাকে, ওইদিন সাফিয়াকে নিয়ে আগেই বেরিয়ে পরে। আজও তারা একসাথেই বের হবে। মাহরুরও স্কুল ছিলো, গতরাতে বাড়ির কাজ করেনি দেখে সকালে কান্না করে আর যায় নি। এটাই তার স্বভাব। যদিনই ক্লাসের পড়া শেষ করবে নাহ, সেদিন কান্না করে বাড়ি মাথায় তুলবে। তাই বাধ্য হয়ে তার কথাই মানতে হয়। সব-ই স্কুলে না যাওয়ার ধান্ধা।
🌿
সাফিয়াকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নাওরা ভার্সিটি চলে যায়। ক্লাস শুরু হতে আরও সময় আছে। তাই ক্লাসে না গিয়ে সোজা ক্যান্টিনের দিকে রওনা দেয়। সেখানেই তার দলবল বসে আছে।
--- " আরে মিস. মুনতাহা যে। ভালো আছেন মুনতাহা?"
রুপার কথায় নাওরা রুপাকে হালকা মা'ইর দিয়ে বলে,,
--- " বলেছি না আমাকে এই নামে ডাকবি না।
পাশ থেকে রিচি উত্তর দেয়,
--- " তো কে ডাকবে? শুধু নাফসান স্যার নাকি?"
--- " রিচি, বেশি করছিস কিন্তু। আমি কি এসব বলেছি নাকি?"
নাওরার কথায় সবাই হাসতে থাকে। নাওরার ফ্রেন্ড বলতে এরাই। রুপা, রিচি। ছেলেদের সাথে নাওরার তেমন কোন ভালো ফ্রেন্ডশীপ নেই, এমনিতেই প্রয়োজনে টুকটাক কথা বলা এই আরকি।
তাছাড়া ক্লাসের সবার সাথে নাওরার কথা হয়। তবে কয়েকজন আছে তাকে পছন্দ করে না। নাওরা মোটামুটি ধরণের স্টুডেন্ট। মনোযোগ দিলেই পড়া বুঝে যায়, তবে নাওরা তো ঘাওরা। সে মনোযোগ দিবে না। ফলস্বরূপ স্যারদের পিছনে দৌড়াতে হয় তার। নাফসানের পেছনে এই পড়ার জন্য তাকে কম দৌড়াতে হয় নি, সাথে নাফসানের অপমান তো আছেই। যদিও নাওরা তাতে মন খারাপ করে না, কারণ দোষ তো তারই। পড়াশোনা না করলে স্যাররা তো বক'বেই। তবে এই নাফসানের জন্যই সে কিছু মেয়ের চোখের কা'টা হয়ে গেছে। কারণ ক্লাসে নাফসান তাকে একটু বেশি প্রাধান্য দেয়, যেমন সে পড়া বুঝেছে কিনা, বারবার নাওরাকে পড়া ধরবে, এসবই করে। এটা নাফসান আর নাওরা দুজনই শুধু টিচার-স্টুডেন্ট ব্যপার বলেই মানে।
বাকীরা তো সেটা বুঝে নাহ।
টিচাররা ক্লাসে দুই ধরণের স্টুডেন্টকে ভালো করেই মনে রাখে। সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্ট, আর সবচেয়ে দুষ্টু স্টুডেন্ট। নাওরা দুই নম্বর ক্যাটাগরির মাঝে পরে।
তবে ক্লাসের সবাই সেটা ভালো চোখে দেখে না। এইজন্যই নাওরা কিছু কিছু মেয়ের চোখের বিষ হয়ে গেছে।
🌿
নাওরা নাফসানের গাড়িটা এখনো দেখে নি। তারমানে স্যার এখনো ভার্সিটিতে আসে নি। নাফসানের ক্লাসটা আজ সবার শেষে।
নাওরা ক্লাসে যেতেই কয়েকটা মেয়ে তার দিকে মুখ বাঁকা করে তাকিয়ে থাকে। তাদের দেখেই নাওরা ভাবতে থাকে,,
~~ "আজব তো, আমার জামাই নিয়ে আমিও বোধহয় ততটা হিং'সা করছি না, যেটা তারা স্যার নিয়ে করছে। মনে হচ্ছে নাফসান স্যারকে বোধহয় তাদের থেকে কেড়ে নিচ্ছি আমি। আরে ভাই, কেউ তোদের হওয়ার হলে এমনিতেও হবে। কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।"
--- "দড়জায় দাড়িয়ে কি ভাবছিস? ক্লাসে ঢুক,,,"
--- " হ্যা, চল, "
ক্লাসের পেছন দিকে গিয়ে তারা বসে পরে। কারণ নাওরা তো কথা বলবে, সেজন্য পেছনের সারিই বেস্ট তাদের জন্য। শেষে নাফসানের ক্লাসের সময় হতেই নাওরা ভদ্র মেয়ের মতো বসে পরে। তাকে দেখে রুপা বলে,,
--- " কিরে, হটাৎ এত ভদ্র মেয়ের মতো বসলি যে। আজ বুঝি ক্লাসে মনোযোগ দিবি?"
--- " হ্যা রে, নয়তো যদি আমার মোবাইলটা....."
এইটুকুই বলে আটকে যায়। এখনি বলে ফেলতো তার মোবাইলটার কথা, যেটা নাফসানের কাছে আছে। জানলেই তারা অনেক প্রশ্ন করা শুরু করতো। তবে নাওরা কাউকে জানাতে চায় না। এই বিয়ের কোন ভবিষ্যৎ নেই, আড়ালে রেখেই ডিভোর্স হয়ে গেলে দুজনেই মুক্তি পাবে।
হটাৎই রুপা বলে,,
--- " ও হ্যা, তোর মোবাইলটা কোথায় রে? এত করে ফোন দিলাম ধরলি না কেন? কালকের প্রজেন্টেশনটাও দিলি না।"
--- " আয়হায়, আমার প্রেজেন্টেশন। ইস, আমি তো ভুলেই গেছিলাম রে। আমার কি এইবারও মার্ক কাটা যাবে নাকি?"
--- "মন কোথায় থাকে তোর? মনটাকে কার কাছে বন্ধক দিয়ে বসে আছিস? নাফসান স্যারকে ভালোভাবে বলিস, যদি একটু কন্সিডার করেন।"
--- " মনে হয় না আর করবে। এমনিতেই রেগে আছে আমার উপর। তার উপর রাতেও বকবক করছিলাম। না জানি কি করে, এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও আল্লাহ। "
--- " কি বিরবির করছিস। মাঝে মাঝেই যে কোথায় হারিয়ে যাস তুই, বুঝি না।"
--- " বুঝবিও না রে রিচি। সংসারের কত ঝামেলা,,"
--- "এমনভাবে বলছিস, যেন নিজে বিয়ে করে সংসার সামলাচ্ছিস। '
নাওরা মনে মনে বলে,,সংসার না করি, বিয়ে তো করেছি।
নাফসান আসতেই সবাই চুপচাপ হয়ে যায়। নাফসান ক্লাসে এসে আগে নাওরার সীটের দিকে তাকায়। নাফসানকে তাকাতে দেখে নাওরা একটা মেকী হাসি দেয়। নাফসান কিছু না বলে পড়ানো শুরু করে।
ক্লাসের এক পর্যায়ে বলে,,
--- " মিস. মুনতাহা,,,আপনার প্রেজেন্টেশন কোথায়?"
--- " স্যার, সেটা তো গতকাল দেওয়ার কথা ছিলো।"
--- " হ্যা। গতকাল তো আসেন নি। নিশ্চয়ই আজ করে নিয়ে এসেছেন। "
--- "স্যরি স্যার। আজও আনি নি। "
--- " এখন বলুন আপনাকে কি শাস্তি দেওয়া যায়। পড়াশোনাকে একদম খেলা পেয়ে বসে আছেন আপনি। পড়াশোনা ভালো না লাগলে ভার্সিটিতে আসবেন না, বিয়ে করে সংসার সামলান গিয়ে। "
নাওরা একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলে,,
--- "সত্যি স্যার, আমিও তাই মনে করি। কিন্তু পরিবার সেটা বুঝে না।"
--- " বসুন আপনি। নেক্সট ক্লাসে আমার প্রজেন্টেশন হাজির না করলে আপনাকে আর ছাড় দেওয়া হবে না। এমনিতেও অনেক ভুল করে ফেলেছেন। "
-- "স্যরি স্যার আর ভুল হবে না। "
তারপর সেই ক্লাসে নাওরা আর কথা বলে নি। বরং মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করেছে। উল্টো প্রশ্ন করে আজ নাফসানের মাথা নষ্ট করেছে।
--- "স্যার ওই অংশটুকু বুঝি নি, বুঝিয়ে দেন। এইটা বুঝি নি, বুঝিয়ে দেন।
নাওরার এমন বিহেভ দেখে ক্লাসের একটা মেয়ে রেগে গিয়ে বলে,
--- নাওরা, তোমার সমস্যা কি। মাত্রই না স্যার এটা বুঝিয়ে দিলো। মাথায় কি কিছু নেই নাকি তোমার?"
মেয়েটা লামিয়া। নাফসানকে পছন্দ করে। কতভাবে নাফসানের মন জয় করার চেষ্টা করে। পড়াশোনা, সৌন্দর্য সবদিকেই ভালো আছে। এসব নিয়েই তার যত অ'হংকার। পুরো অহংকারী মেয়ে একটা!
লামিয়াকে থামিয়ে দিয়ে নাফসান বলে,,
--- "সমস্যা নেই, লামিয়া। আপনি বসুন। মিস. মুনতাহা, কি বুঝেন নি বলুন? "
নাফসানের রাগ হলেও নিজেকে কন্ট্রোল করে বুঝিয়ে দিয়েছে। এটা নাওরার অন্যরকম ফাঁদ, আজ সে ভদ্র মেয়ে হয়ে নাফসানকে জ্বা'লিয়েছে। নাফসানের এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে নাওরা ক্লাসে মনোযোগ না দিলেই বোধহয় ভালো হতো। মেয়েটা ইচ্ছে করে এমনটা করছে।
🌿
ক্লাস শেষে রুপা, রিচি চলে যায়। নাওরাই চলে যেতে বলেছে, সে নাকি নাফসানের থেকে পড়া বুঝতে যাবে। তাছাড়া তাদের বাসা নাওরার বাসার উল্টো দিকে।
নাওরা নাফসানের কেবিনের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দেয়।
--- " স্যার, আসবো? "
নাফসান না দেখেই অনুমতি দিয়ে দেয়। নাওরা ঢুকে দেখে নাফসান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
--- " স্যার, আপনার কি কিছু হয়েছে? মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন যে?"
নাওরাকে দেখেই নাফসান কিছুটা রাগা'ন্বিত স্বরে বলে,,
--- " আবার কি মাথা খেতে এসেছে নাকি? সমস্যা কি তোমার?"
--- "স্যার, আমার ফোন...."
--- " আনি নি তোমার ফোন, ভুলে গিয়েছি। একটা কাজও তো ঠিকঠাক করতে পারো না। নিজের জিনিসও গুছিয়ে রাখতে পারো না। "
--- " আপনি নিজেও তো পারলেন না। আমার ফোনটা এনে দিলেই তো এত কথার কোন দরকার ছিলো না।"
--- " নেক্সট ডে নিয়ে আসবো। আজ চলে যাও। "
--- " না স্যার,এমন বলবেন না। আমার ফোনটা আজই লাগবে।"
--- " কেন? ফোনে কি কেউ অপেক্ষা করছে নাকি? "
--- " এত কথা না বলে ফোনটা দিয়ে দেন তো।"
--- " নাওরা, ভালোভাবে কথা বলো। আমি তোমার স্যার হই। "
--- " এহহ, আপনি আমার স্যার তো ক্লাসে। ক্লাসের বাহিরে তো আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ তাই না?
--- " হুয়াট ননসেন্স! সাট আপ নাওরা, যে কেউ শুনে ফেললে বাজে কথা ছড়াবে। "
--- "ধ্যাত, কি যে বলেন না। বাজে কথা ছড়াবে কেন? ওসব বাদ দেন, আমার ফোনটা দেন তাড়াতাড়ি। "
--- " আর কতবার বলবো, আনি নি আমি। ভুলে ফ্ল্যাটেই রেখে এসেছি। আমার আরও একটা ক্লাস আছে। তুমি চাইলে ফ্ল্যাটের চাবি দিচ্ছি, নিজে গিয়ে নিয়ে আসো। ফোন আমার বেডরুমেই আছে। "
--- " স্যার আপনি আবারো আমাকে কুপ্রস্তাব দিচ্ছেন।"
--- " সাট আপ নাওরা। আমি ভার্সিটিতেই আছি। তোমাকে একা যেতে বলেছি আমি। "
নাওরা খিলখিলিয়ে হেসে ফেলে। নাফসান ফ্ল্যাটের চাবি দিতেই নাওরা শয়তানি হেসে বলে,
--- " স্যার, বুঝে শুনে দিলেন তো নাকি। না মানে, যদি আপনার বাসা থেকে কিছু নিয়ে চলে যাই তো?"
--- " গতকাল আমাকে চোর বলে আজ নিজেই চুরি করতে চাচ্ছো?"
--- " আপনার থেকেই শিখার চেষ্টা করছি আরকি।"
--- " ইডিয়েট একটা। যাও বের হও। আর বাসার চাবিটা বাহিরে দারোয়ানের কাছে দিয়ে আসবে। ওনাকে আর কিছুই বলার দরকার নেই।
--- " না স্যার, বলবো আমি নাফসান খানের ওয়াইফ। তাহলেই আর কিছু বলবে না। "
বলেই নাওরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। গতদিনই নাফসানের বাসা চিনে এসেছে। তাই সোজা নাফসানের ফ্ল্যাটে চলে যায়। নাওরা ফ্ল্যাটে গিয়েই চারপাশ ভালোভাবে দেখতে থাকে। গতদিন তো দেখতে পারে নি। চারদিক দেখতে দেখতে বলে,,
--- এত সব জিনিস দেখে মনে হচ্ছে, যেন বউ পোলাপান নিয়ে থাকে।
আচ্ছা, একটা টিভি নেই কেন? স্যার কি টিভি দেখে না নাকি?
নাওরা সব ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। মূলত নাওরা এমন কাজ কখনোই করে না। তবে নাফসানের বাসায় আসার পর মনে হচ্ছে এই জায়গাটা তার খুব আপন। সে এখানে যা ইচ্ছে করতে পারবে। তবে সত্যি তো এটাই এই সুযোগ সে বেশিদিন পাবে না। স্যার তো বলেই দিয়েছে ডিভোর্সের ব্যবস্হা করবে।
যদিও সেটাই ভালো হবে। কারণ যেই মামা-মামী এত কষ্ট করে তাকে বড় করলো, তাদের না জানিয়ে এই বিয়ের কথা শুনলে খুব কষ্ট পাবে। আর নাওরা সেটা চায় না।
কত সব চিন্তা করতে করতে কোন দিক দিয়ে যে সময় চলে যায়, নাওরা টের পায় না। হটাৎই নাওরার পেটে ডাক দিয়ে উঠে। সকালে যা খেয়ে এসেছিলো, ওইটুকুই। এখন দুপুর হতে চললো, কিছুই খাওয়া হয় নি। কি ভেবে নাওরা নাফসানের ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। ফ্রিজ খুলে কিছু ফল আর কাঁচা সবজি ছাড়া তেমন কিছুই খুঁজে পায় না। কিছু রান্নাও করা নেই। স্যার কি সব সকালে খেয়ে চলে গেলো নাকি।
আর কিছু না পেয়ে নাওরা ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বের করে ধুয়ে খেতে থাকে। তাকে এখন দেখলে যে কেউ বলবে এটা নাওরারই বাসা। আরও খালি বাসা পেয়ে নাওরা আরামে ঘুরাঘুরি করছে। এদিকে যেই কাজে এসেছে সেটাই যেন ভুলে গেছে।
তারপর নাফসানের বেডরুমে গিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এত সুন্দর গোছানো কারও রুম কিভাবে হতে পারে। গতদিন সে তো এসব খেয়ালই করে নি। চারদিক কি সুন্দর পরিপাটি। নাফসানের রুমের বাড়ান্দায় গিয়ে দেখে কয়েকটা ফুলের গাছও আছে। ফুলও ফুটে আছে। টিচার মানুষ এত সৌখিন হয় নাকি!
🌿
নাফসানা ভার্সিটি থেকে বাসায় এসে দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করে কেউ কি ওনাকে কোন চাবি দিয়ে গিয়েছে নাকি। তিনি না জানাতেই নাফসান অবাক হয়। নাওরা কি তবে বাসাতেই আছে এখনো। মেয়েটার কি কোন ভয় নেই নাকি। যতই বিয়ে হোক না কেন, কেউ তো জানে না এখনো। একজন পুরুষের বাসায় এভাবে থাকাটা তো ঠিক না। যতই হোক, নাফসান বাসায় একা থাকে। কখন কি হয়ে যায় বলা তো যায় না।
তাই নাফসান কিছুটা রেগেই বাসায় যায়। দরজা ভিতর থেকে লক করা। নাফসান কলিং বেল দিতেই নাওরা দরজা খুলে দেয়। নাফসান রেগে কিছু বলবে, তার আগেই নাওরা নাফসানের হাতের ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। তারপর বলে,,
--- "আরে আসুন না, অনেক ক্লান্ত বুঝি। একটু দাঁড়ান,,, "
বলেই হাতের ব্যাগটা সোফায় রেখে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। নাফসান তো অবাক হয়ে তাকিয়ে নাওরার কর্মকান্ড দেখছে শুধু। নাওরা রান্নাঘর থেকে একটা শরবতের গ্লাস এনে নাফসানের হাতে এগিয়ে দেয়।
--- "নেন স্যার, শরবত খান। আপনার ওইসব অরেঞ্জ জুস পাইনি। ফ্রিজে লেবু পেয়েছিলাম, তাই শরবত বানিয়ে রেখেছিলাম।"
নাফসান হতভম্ব হয়েই শরবতটা শেষ করে। নাওরা নাফসানের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,,
--- "স্যার, কেমন একটা জামাই-বউ ফীল হচ্ছে না? আমার তো হচ্ছে। মনে হচ্ছে জামাই বাসায় এসেছে, আর আমি সেবা করছি। "
নাফসান নিজের হতভম্বতা কাটিয়ে বলে,
--- "বাসায় যাও নি কেন?"
--- " যাই নি কারণ হচ্ছে, পরে যদি আবার বলেন সত্যিই কিছু চুরি করে নিয়েছি আমি। এই ভয়েই আরকি,,,"
--- " বেশি কথা বলো তুমি। আর হাতে কি তোমার?"
--- " আপেল। খুব ক্ষুধা লাগছিলো, তাই আরকি। কিছু মনে করবেন না স্যার। খেলে তো জামাইয়ের টাকায় খেয়েছি। আপনি মাইন্ড কইরেন নাহ,, "
নাওরা এসব কথায় নাফসান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। নাওরাকে সাইড কেটে নিজের বেডরুমে যায়। পিছু পিছু নাওরাও কথা বলতে বলতে যেতে থাকে। নাফসান বেড রুমে গিয়ে ফ্রেস হওয়ার জন্য শার্ট খুলতে থাকলে নাওরা থমকে যায়। সে খেয়ালই করেনি কখন সে নাফসানের সাথে বেডরুমে চলে এসেছে।
--- " ক-কি করছেন স্যার। এসব অন্যায়, আমি চলে যাচ্ছি স্যার। "
--- " দাঁড়াও। কিসের অন্যায়ের কথা বলছো? তোমাকে কি বেডরুমে আমি ডেকে এনেছি নাকি?"
বলেই নাওরার দিকে এগুতে থাকলে নাওরা ভয় পেয়ে পিছাতে থাকে।
--- " স-স্যরি স্যার। আর হবে না। এবারের মতো মাফ করে দেন। আর হবে না। "
--- " কেন? আমরা না হাসবেন্ড-ওয়াইফ।"
--- " স্যার, প্লিজ। আর হবে না। এবারের মতো মাফ করে দেন। "
নাফসান কিছুক্ষণ থেমে নাওরাকে বলে,
--- " ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসো। আমি আসছি।"
--- " ক-কি স্যার? "
--- " বলেছি ড্রয়িংয়ে যাও। আমি আসছি একটু পরেই। চুপচাপ বসে থাকবে।
--- " ধন্যবাদ স্যার। "
বলেই নাওরা এক দৌড়। নাফসান সেটা দেখে হালকা হাসি দেয়। একটু হলেও তো নাওরাকে ভয় দেখাতে পেরেছে।
অপরদিকে নাওরা রুমের বাহিরে গিয়ে বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকে। সত্যিই অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলো সে।
সে তো নাফসান আসার আগেই চলে যেতো। কিন্তু বাড়ান্দায় ফুল দেখতে দেখতে কত কি ভাবছিলো। এসব করতে করতে কখন যে কখন এত দেরী হয়ে গেলো, টেরই পায় নি। নিচ থেকে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে যখন তাকিয়ে দেখে নাফসান চলে এসেছে, তখনই তার হোশ এসেছে। তাই তো নিজের ভাব বজায় রাখতে তাড়াতাড়ি গিয়ে শরবত বানিয়ে রাখে। নাফসান আসলেও স্বাভাবিক ব্যবহারই করছিলো। তবে মনে মনে ভয় তো ছিলোই। এখন তো আরও ভয়, না জানি নাফসান ফ্রেস হয়ে এসে কি বলে,,,,
চলবে......
(অনেক বড় পর্ব দিয়ে ফেলেছি। এখন বড় করে কমেন্ট করে আমাকে চমকে দেন তো🙃)